Home না চাইলেও তুমি শুধু আমারই না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৪৭

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৪৭

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৪৭
মাইশা জান্নাত নূরা

সকাল প্রায় সাড়ে আটটা…
খান ভিলার প্রতিটা কোণ আজ যেন উৎসবের রঙে রঙিন হয়ে আছে। ভোর থেকেই বাগান এড়িয়া জুড়ে লোকজনের হাঁকডাক শুরু হয়ে গিয়েছে। ডেকোরেশনের লোকেরা রং-বেরঙের সুগন্ধি বিভিন্ন ফুল দিয়ে পুরো বাড়ির ভেতর ও বাহির সাজানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে আছে। অনেক অতিথিরা ভীর জমিয়েছে জন্য আজ আর রান্নাঘরে রান্না বসানো হয় নি। বাড়ির একপার্শে চুলো খনন করে বেস্ট সেফ এর আওতাধীনে চলছে মজার মজার খাবার রান্নার প্রস্তুতি।

আর বাড়ির পুরুষ ও মহিলা উভয় গুরুজনরা কোন অতিথিকে কোথায় বসানো হবে, কিভাবে তাদের আপ্যায়ন করা হবে, কোথাও কোনো কাজে ত্রুটি থেকে যাচ্ছে কিনা তা দেখতে ব্যস্ত। অথচ এতো এতো কাজের ব্যস্ততার মাঝেও দোতলায় একজন বিশেষ ব্যক্তির রুম থেকে বেরুনোর কোনো খবরই নেই। ব্যক্তিটি যেনো পৃথিবীর ভিতরেই এখন অবস্থান করছেন না। ব্যক্তিটি আর কেউ না খান বাড়ির সাদাসিধে, ভদ্র-নাদান মেজো পোলা তেজওয়ার খান তেজ। তার ঘড়িতে এখনও সকাল হয় নি বোধহয়। তাই তো এখনও গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে পড়ে আছে নিজ রুমের নরম গদির উপর তেজ।
নীরা দুই হাতে কোমর চেপে তেজের রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। পাশেই আছে অনু আর ইলমাও। আর ওদের থেকে একটু দূরে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নির্ঝর।
নীরা বিরক্তি মিশ্রিত গলায় বললো…….

—”এই মানুষটার একটা অদ্ভুত প্রতিভা আছে জানো তোমরা! পুরো বাড়ি মাথার উপর তুলে ফেললেও এনার ঘুম সহজে ভাঙবে না। কাজকর্মের দিন তো আরোই না।”
অনু নিচু স্বরে বললো……
—”হয়তো রাতে অনেক দেড়ি করে ঘুমিয়েছেন, তেজ ভাইয়া।”
ইলমা কথাটা শুনে অনুর দিকে তাকালো। কারণ সত্যিই কাল রাতে অনেক রাত পর্যন্ত তেজ জেগে ছিলো। শেষ ইলমার সাথেই ছাদে কথা হয়েছিলো তেজের। ইলমা তো আগেই নিচে চলে গিয়েছিলো কিন্তু তেজ পরে কখন নিচে এসে ঘুমিয়েছে তা আর ইলমা জানে না। নীরা মুখ বাঁকিয়ে বললো…..
—”রাত দুইটার সময় ভূ*তের মতো ছাদে গিয়ে বাতাস খেয়ে এসেছে সেটা আমি নিজের চোখে দেখেছি। এখন আবার এমন ঘুম ঘুমাচ্ছে যেন তিন রাত ধরে অধিক পরিশ্রমের কারণে ঘুম তার নসিবে জুটে নি।”
নির্ঝর একটু আগেই এসেছে তাই কতোসময় হলো ওরা এখানে দাঁড়িয়ে তেজকে ডেকেছে তা সে জানে না জন্য প্রশ্ন করলো……

—”ডেকে দেখেছিস, ভাইকে?”
নীরা চোখ বড় বড় করে নির্ঝরের দিকে তাকিয়ে বললো….
—”গত ১৫ মিনিটে অন্তত ২০ বার ডেকেছি। এখন মনে হচ্ছে মাইক ভাড়া করতে হবে ওনাকে উঠানোর জন্য।”
এই বলেই আবারও নীরা দরজায় ঠকঠক শব্দ তুলে ধাক্কা দিলো আর ডাকলো……
—”মেজ ভাইয়া! ও মেজ ভাইয়া! তোমাকে উঠানোর জন্য ডাকতে ডাকতে আমার গলা শুকিয়ে এসেছে। দয়া করে দরজাটা খুলে আমায় এক গ্লাস পানি দাও।”
এবারও ভিতর থেকে কোনো শব্দ না পেয়ে নীরা একপ্রকার চিল্লিয়ে বললো….
—”ও মি.তেজওয়ার খান তেজ! দরজা খুলেন! খান বাড়ির মেজো পোলা কি কানে শুনেন না? ও মি. ভিআইপি কোম্পানির সিইও!”
নীরাকে এমন ভিন্ন ভিন্ন নাম ব্যবহার করে তেজকে ডাকতে শুনে বাকিরা ঠোঁট চেপে নিজেদের হাসি নিয়ন্ত্রণ করছে। নীরা এবার সন্দেহের চোখে নির্ঝরের দিকে তাকিয়ে বললো…..
—”আমার মনে হচ্ছে মেজ ভাইয়া ইচ্ছা করেই দরজা খুলছে না।”
নির্ঝর বললো…..

—”দেখতো দরজাটা কি আদেও ভাই ভেতর থেকে লক করে ঘুমিয়েছেন নাকি কেবল ভিড়ানোই আছে!”
নীরা হাতলটা ঘোরাতেই দরজা খুলে গেলো দেখে নিজেই নিজের কপাল চাপড়ে বললো……
—”এই বুদ্ধিটা আরেকটু আগে দিতে পারো নি তুমি ছোট ভাইয়া? শুধু শুধু দিনের শুরুতেই আমার এতো গুলো শব্দ খরচ হয়ে গেলো।”
—”মাথা ভর্তি তো বিড়ালের গু নিয়ে ঘুরিস। অন্য কেউ ঘেঁটে না দিলে তোর ব্রেইন কাজ করে নাকি?”
নীরা ওর নাকের পাটা ফুলিয়ে বললো……
—”তোমাকে তো আমি পরে দেখে নিবো। সবার সামনে আমার সম্মান নিয়ে টানাটানি করো! বেদ্দপ ছেলে।”
নির্ঝর মুখ বাঁ*কালো কেবল। অতঃপর ওরা ৪জন একসাথে রুমের ভেতরে ঢুকলো। ঘরে ঢুকেই তেজের অবস্থা দেখে ওরা সবাই অবাকের চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেলো যেনো।
ঘুমের এ কেমন ছিঁ*ড়ি! বিছানার এক কোণে বুকপার্শে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে তেজ। একটা বালিশ মেঝেতে পরে আছে।অর্ধেক কম্বল দিয়ে অর্ধেক শরীর ঢাকা আর বাকি অর্ধেক কম্বল নিচে পরে আছে ৷ মোবাইলে ফুল ভলিউমে বাজছে অদ্ভুত একটি গান……

❝ ধন কে দেখলু তুই ননী সিনা মনকে চিনলু নাই
সুনাকে চিনলু বানাকে চিনলু মনুষ চিনলু নাই।
ধন নাই বলি মোর পাখে ননী তার কাছে উঠি গলু
ধন আছে সিনা মন নাই তাকে তুই জানি না পারিলু,
গোটে দিন মিশা যগি দেলু নাহি কেড়ে কথা করি দেলু
মুই গাঁ যাই করি আসলা বেলে কেন্তা পাছরি দেলু রে
ননী ছি ছি ছি।
ছি ছি ছি রে ননী ছি
ছি-ছি ছি রে ননী ছিরে ছিরে ছি। ❞
নীরা ওর এক হাত কোমরে রেখে অন্য হাতে কপাল চাপড়ালো। এ কি অবস্থা তেজের! অনু আর নির্ঝর ঠোঁট চেপে হাসছে। ইলমা নাক সিটকে বললো…..

—”ছি, কি রুচি! এসব কোনো গান হলো? যতো শতো খারাপ খারাপ শব্দ ব্যবহার করা প্রতিটি লাইনে।”
নীরা গিয়ে ফোনটা নিয়ে গানটা বন্ধ করে তেজের কানের কাছে মুখ নিয়ে চিল্লিয়ে ওকে ডাকলো……
—”মেজ ভাইয়া, আগুন লেগেছে আগুন। বাঁচাও। ম*রে গেলাম।”
চিৎকার শোনা মাত্র তেজ একপ্রকার লাফ দিয়ে উঠলো ঘুম থেকে। আর বললো…….
—”এ কে? কার মালে আগুন লাগলো! কে মর*লো?”
নীরা চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে আছে তেজের দিকে। বাকিদের দৃষ্টিও তেজের উপরেই স্থির এইমূহূর্তে। তেজ চোখে হালকা ডলা দিয়ে ঘুম ভাবটা কাটিয়ে সামনে তাকাতেই ওদের সবাইকে দেখা মাত্র বললো……
—”এতো সকালে তোমরা আমার রুমে কি করছো?”
নীরা বললো…..

—”তুমি জানো না আজ বড় ভাইয়া আর আমাদের ভাবীর মেহেন্দি অনুষ্ঠান!”
তেজ আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে বললো…..
—”তো আমি কি করবো? আমাকে দেখে কি তোর মেহেন্দি আর্টিস্ট বলে মনে হচ্ছে যে সাত সকালে উঠে গিয়ে ভাবীকে মেহেন্দি পড়িয়ে দিবো!”
—”নিচে ছোট থেকে বড় সবার কাজ করতে করতে নাজেহাল অবস্থা আর তুমি আদরের রাজপুত্র হওয়ার সুবাদে আজও বেলা করে ঘুম থেকে উঠবে এটা তো মানার মতো না তাই না!”
—”মানার মতো না হলেও মানতে হবে। জানিস ই তো তোরা আমার দেড়ি করে উঠার অভ্যাস। এতো ভালো অভ্যাসটা তো আমি ছাড়তে পারি না এতো সহজে।”
ইলমা বললো……

—”আপনি এটাকে ভালো অভ্যাস বলছেন কোন যুক্তিতে?”
তেজ এবার ইলমার দিকে তাকালো। মেরুণ রংয়ের লং গাউন পড়েছে ইলমা। চুলগুলো কার্ল করে ছেড়ে রেখেছে। চোখে খুব সরু করে কাজল পরেছে আর ঠোঁটে মানান সই লিপস্টিক। ওড়নাটা দিয়ে মার্জিত ভাবে সামনেটা ঢেকে দুই কাঁধের দুই পার্শে সমান ভাবে বাকিটা ঝুলিয়ে রেখেছে। তেজ গলা খাকড়ি দিয়ে নজর সরিয়ে নিলো। এমন সুন্দর, পরিপাটি হয়ে পছন্দের মানুষটি সামনে আসলে তার থেকে নজর সরিয়ে নেওয়া ভাড়ি কষ্টের। তেজ বললো……
—”জানেন না ঘুম ভালো হলে শরীর, মন উভয় ভালো থাকে! আর আমার সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠলে সারাদিন শরীরটা কেমন ম্যজ ম্যজ করে, দূর্বল লাগে, খেতে পারি না, কিচ্ছু ভালো লাগে না। তাই নিজেকে ফিট রাখতে আমার সকাল হয় ১১টার পর।”
—”একজন মানুষের সুস্থ থাকতে হবে প্রতিদিন এক নিয়মে এক সময়ে ঘুমোতে যেতে হবে আবার ঘুম থেকে উঠতেও হবে। আপনি যদি রাত ১০ টায় ঘুমাতেন তাহলে ৬ ঘন্টা ঘুমানোর পর ভোর সকালে উঠে জগিং, ইয়োগা করলে আপনার শরীর তাতে আরো ভালো ফিট থাকতো। গভীর রাতে ঘুমিয়ে এদিকে বেলা ১১টা বাজিয়ে উঠার যে অত্যন্ত বাজে অভ্যাস তৈরি করেছেন তা অবিলম্বে পরিবর্তন করা উচিত আপনার।”
তেজ হেসে বললো…..

—”ঠিক আছে, আপনি যখন এতো সুন্দর ভাবে বুঝিয়ে বলছেন তখন আমার সেভাবেই চলা উচিত। কাল থেকে পাক্কা রাত ১০ টায় ঘুমিয়ে ভোর ৪টায় উঠবো। যা যা করা দরকার সব করবো। কিন্তু আজকের মতো যেহেতু আমার ঘুম পূরণ হয় নি তাই ঘুমাই কেমন!”
এই বলে তেজ আবারও শুয়ে পড়লো। কম্বলটা টেনে নিজের আপাদমস্তক ঢেকে নিলো। দেখে কারোর বোঝার উপায় নেই এখানে কোনো জীবিত মানুষ শুয়ে আছে। নীরার রাগ এবার তুঙ্গে উঠে গিয়েছে। বেডসাইড টেবিলের উপর থেকে পানি ভর্তি জগটা উঠিয়ে বললো……
—”মেজ ভাইয়া তুমি যদি এখন আবার ঘুমাও তাহলে আমি এই জগে থাকা সব পানি তোমার শরীরে ঢেলে দিবো কিন্তু!”
তেজ বললো…..
—”এ যা তো এখান থেকে ছাগলের নাম্বার বাচ্চার মতো ভ্যঁবাস না।”
—”কিহ! তুমি তোমার শ্রদ্ধেয় চাচা-চাচীকে ছাগল বলে সম্বোধন করলে?”
নির্ঝর বললো…..
—”তেজ ভাইয়ের ওতো সাহস আছে নাকি? তুই জানিস না তোকে নারায়নগঞ্জের নর্দমা থেকে কুড়িয়ে এনেছিলো ছোট চাচা? কোন না কোন ছাগল ফেলে রেখে গিয়েছিলো সেখানে কে জানে?”
তেজ কম্বলের নিচ থেকে ওর হাত উঠিয়ে বললো…..
—”একজেক্টলি, আমি এটাই মিন করেছি। নির্ঝর ঠিকিই বুঝে গিয়েছে।”
নীরা ইলমার দিকে তাকিয়ে বললো……

—”আপু! তুমি অন্তত কিছু বলো এদের। তুমিই পারবা এদের থামাতে। নয়তো আজ এতো এতো অ*প*মান খেতে খেতে আমার পেট ফুলে ঢোল হয়ে যাবে।”
অনু ভাই-বোনের এই দুষ্টু-মিষ্টি ঝগড়া গুলো শুরু থেকেই দারুণ ইন্ঞ্জয় করছে। ওর নিজের তো কোনো ভাই-বোন নেই তাই এমন ধরণের বিষয় গুলো নিয়ে হাসি-মজা করার ভাগ্যও ওর কখনও হয় নি। ইলমা বললো…..
—”তেজ আপনার এবার উঠা উচিত। উঠুন। আর নির্ঝর ভাই! এবার নীরার পিছনে লাগাটা বন্ধ করুন। বেচারি নয়তো একটু পর কেঁদে ফেলবে আপনাদের কথার অ*ত্যা*চারে।”
নির্ঝর বললো…..
—”আমি তো নীরার থেকে মিনিমাম ৩ হাত দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়ে আছি পিছনে কখন লাগলাম? আর রইলো ওরা কাঁদার কথা! ও তো ছোট থেকেই ছিঁ*চ*কাঁদুনে স্বভাবের। একটু কিছু হলেই ভ্যাঁ। এতে আমরা অভ্যস্ত।”
নীরা এবার বিছানায় বসে হাত পা ছুঁড়ে বললো…..
—”এবার আমি এমন জোড়ে চিল্লিয়ে কাঁদবো যে পুরো বাড়ি মাথায় উঠে বসবে। তখন কিন্তু সবার থেকে বকা খাওয়া মাস্ট হবে তোমাদের জন্য।”
তেজ ওর মাথা কম্বলের ভিতর থেকে বের করে বললো…..
—”যা যা, বাহিরে গিয়ে প্যন প্যনা। আমার মাথা খাস না। ঘুমাতে দে। আর ইলমা, আপনাকে তো বললাম আজকের দিনটার জন্য কন্সিডার করুন। কাল থেকে, প্রমীস কাল থেকে যদি আমি সকালে না উঠি তাহলে আমার নাম পরিবর্তন করে ফেলবো।”
নীরা বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ালো। ঠিক তখনই তেজের রুমের দরজার সামনে থেকে ভেসে এলো সারফারাজের গম্ভীর কণ্ঠ….

—”কি করছিস তোরা এখনও এখানে? মেহেন্দি অনুষ্ঠান দুপুরের আগে শেষ না করলে সন্ধ্যায় গাঁয়ে হলুদ করা হবে না আর আজ। মেহেন্দি শুখাতে তো তোদের মেয়েদের কম সময়ের প্রয়োজন হয় না আর তরফে তরফে সাজার জন্য এক্সট্রা সময় লাগে।”
সারফারাজের কন্ঠ কানে পড়তে না পড়তেই তেজ লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালো। বালিশের পাশ থেকে টি-শার্টটা নিয়ে পড়ে নিলো। এলোমেলো চুল গুলোতে হাত বুলিয়ে ঠিকঠাক করলো। আর কম্বলটাও ভাঁজ করতে শুরু করলো। নীরা, ইলমা, অনু আর নির্ঝর সারফারাজের দিকে তাকিয়ে আছে। নীরা বললো……
—”দেখো না বড় ভাইয়া! মেজ ভাইয়া এখনও বিছানা থেকেই উঠছে না। সব দেড়ি মেজো ভাইয়ার জন্যই হচ্ছে।”
তেজ সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদের স্বরে বললো…..
—”এই তুই কি চোখে কম দেখিস? জলজ্যান্ত মানুষটা উঠে দাঁড়িয়ে আছি আমি তা চোখে পড়ছে না কিভাবে?”
বাকিরা আবার ঘুরে তাকালো তেজের দিকে। মুহূর্তের মধ্যেই তেজের এমন পরিবর্তন দেখে ওদের সবার মুখ হা হয়ে গেলো। সারফারাজ বললো…..
—”ফ্রেশ হয়ে নিচে আয় সব। মেহেন্দি আর্টিস্টরা এসে বসে আছেন।”
তেজ বললো…..
—”আমি বুঝতে পারছি না একটা বিষয়, মেহেন্দি অনুষ্ঠানটা হলো মেয়েদের জন্য সব মেয়েরা নিজ নিজ হাতে মেহেন্দি পড়বে সেখানে আমরা ছেলেরা উপস্থিত থেকে কি করবো, ভাইয়া?”
নীরা বললো…..

—”আজ মেয়েদের পাশাপাশি ছেলেরাও মেহেন্দি পড়বে তাই সব ছেলেদের সেখানে উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক।”
এতো সময় পুরো বিষয়টা ইন্ঞ্জয় করলেও নীরার কথা শুনে নির্ঝর, তেজ দু’জনের মুখ-ই হা হয়ে গেলো যেনো। তেজ বললো….…
—”ভাইয়া! তোমার আদরের ছোট বোনের মাথার সব তাঁর অল্প বয়সেই ছিঁ*ড়ে গিয়েছে। কাইন্ডলি তুমি ওকে পাবনা মেন্টাল হসপিটালে এডমিট করার ব্যবস্থা করো। ওর কথা আর নেওয়া যাচ্ছে না। যাস্ট নেওয়া যাচ্ছে না।”
নীরা মুখ ভেঙালো তেজের কথা শুনে। ইলমা বললো…..
—”সারফারাজ নিজেই এই অফার রেখেছেন আমাদের সামনে। তাই তার কাছে বিচার দিয়ে পার পাবেন না আপনারা আজ।”
—”হোয়াট? ভাইয়া! প্লিজ বলো তুমি এমনটা করার কথা বলো নি!”
সারফারাজ ওর দু’কাঁধ একসাথে উঁচিয়ে বুঝালো ‘সে কি জানে!’ ইলমা আবারও বললো…..
—”পিহু ভাবীকে মেহেন্দি পড়ানো হবে তাই আমরা বোনেরা মিলে সারফারাজ ভাইয়ের হাতে পিহু ভাবীর নামটা মেহেন্দি দিয়ে লিখে দেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছিলাম তার কাছে। তখুনি সারফারাজ ভাই বলেছেন, তিনি মেহেন্দি পড়বেন তবে তার সমবয়সী বা ছোট যে সকল পুরুষরা আছেন সবাইকেই মেহেন্দি পড়তে হবে। তাই আপনাদের কোনো না শুনতে আমরা রাজি নই।”
তেজ বললো…..

—”একটা ছেলে কতো কষ্ট করে নিজের সম্মান অর্জন করে আজ সেই সম্মানের উপর তোমরা মেহেন্দি দিয়ে ফুল আঁকাবে ভাবতেই আমার অন্তরটা ফেঁ*টে চৌ*চি*র হয়ে যাচ্ছে।”
ইলমা বললো…..
—”সামান্য ২দিনের জন্য স্থায়ী হওয়া রংয়ের ভারে যদি আপনার সম্মান নষ্ট হয়ে যায় তাহলে আপনি খুবই দূর্বল সম্মানের অধিকারী মি.।”
তেজের অবস্থা এখন ঠিক ছেড়ে দে মা কেন্দে বাঁচি এমন হয়ে দাঁড়িয়ে। সারফারাজ শান্ত স্বরে বললো……
—”আজ এমন করছিস ঠিকই। কিন্তু যেদিন তোরও আমার মতো সময় আসবে সেদিন নাচতে নাচতে নিজের প্রিয়মতার নাম হাতে লিখে নিবি বুঝলি!”
তেজ বললো…..
—”হ্যাঁ, হ্যাঁ ঐসব বলেই এখন শান্তনা দাও আমায়।”
নির্ঝর বললো….
—”তেজ ভাই! তুমি একা তো নও আমিও আছি তোমার দলে। ছোট থেকে আমরা একে-অপরের সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে চলি তাই আজও সম্মানের ফালুদা হলে তোমার একা সেটার স্বাদ গ্রহন করতে হবে না সমানতালে আমিও করবো। তাই চিল করো।”
তেজ দাঁতে দাঁত চেপে বললো….

—”তুই তো লাইলির প্রেমে দিওয়ানা হয়ে মজনু হয়ে আছিস। তোর কষ্ট আর আমার কষ্ট সমান হবে না। সর সামনে থেকে।”
এই বলে তেজ টাওয়াল নিয়ে সোজা ওয়াশরুমে চলে গেলো। উপস্থিত বাকিরা নি:শব্দে হাসলো কেবল। সারফারাজ বললো…..
—”তোরা নিচে যা সব। বাকি থাকা কাজ গুলো গুছিয়ে নে ততোক্ষণে তেজ নিচে চলে আসবে। আমি রেডি হবো।”
ওরা মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। সারফারাজ নিজ রুমে চলে গেলো বাকিরাও নিচে চলে গেলো।
মেহেন্দি আর্টিস্টরা ইতোমধ্যেই বাগানের মাঝখানে সাজানো বিশাল ফুলের মঞ্চে বসে পড়েছেন। চারদিকটা গাঁদা, রজনীগন্ধা, গোলাপ আর সাদা জুঁই ফুল দিয়ে নিখুঁত সুন্দর ভাবে সাজিয়েছে ডেকোরেশনের লোকেরা। এছাড়াও হলুদ আর সবুজ রংয়ের উন্নতমানের কাপড় দিয়ে বাঁধানো হয়েছে জায়গাটা। ছোটরা দৌড়াদৌড়ি করছে আর বড়রা গল্পে মশগুল হয়ে আছে। মেয়েরা কেউ মোবাইলে ছবি তুলছে তো কেউ ভিডিও করছে। ঠিক তখনই নীরা মন্ঞ্চে এসে দাঁড়িয়ে তালি দিয়ে চিৎকার করে করে বললো…..
—”স্টপ! স্টপ! সবাই একটু চুপ করো এবার! কারণ আজকের অনুষ্ঠানের প্রধান ২ আসামিকে এখন মন্ঞ্চে আনা হবে। সবার ফোকাস এখন তাের উপর পড়া দরকার।”
সারফারাজ ও পিহুকে আসামি বলে সম্বোধন করায় সবাই একসাথে হেসে উঠলো। তেজ বললো….

—”আসামি বললি কেনো? এখন তো সবাই ভাববে আমাদের বড় ভাইয়া আর ভাবী বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে নয় বড় কোনো ব্যংক ডা*কা*তি করে এসেছে সম্মাননা নিতে।”
নীরা জিভ বের করে বললো….
—”একপ্রকার ডাকাতিই তো করেছে বড় ভাইয়া। আমাদের ভাবীকে উঠিয়ে নিয়ে এসে বিয়ে করেছে, তার মন চুরি করেছে। এটা কি কম!”
নীরার কথায় সমর্থন জানাতে উপস্থিত সবার মধ্যে সঙ্গে সঙ্গে হৈ পড়ে গেলো। ওদের বাকি বন্ধু-বান্ধব, কাজিনরা ২ ভাগ করে দাড়িয়েছে। সকলেই লাল ও সবুজের মিশ্রণে এক ডিজানের পোশাক পড়েছে। এক ভাগে সব ছেলেরা পান্ঞ্জাবি-পায়জামা ও গলায় একটা করে ওড়না ঝুলিয়ে নিয়েছে। অন্যতরফে সব মেয়েরা শাড়ি পড়েছে পাশাপাশি ফুলের গয়না তো আছেই। নীরা ছেলেদের দিকে তাকিয়ে উচ্চস্বরে বললো….
—”বর পক্ষ প্রস্তুত?”
ওরা সবাই একসাথে বললো…..
—”প্রস্তুত!”
নীরা এবার মেয়েদের দিকে তাকিয়ে বললো…..
—”আর কনে পক্ষ তোমরা?”
মেয়েরাও একসাথে চিৎকার করে বললো…..
—”আমরাও প্রস্তুত!”

এরপর ফুলের ঝুড়ি হাতে ছোট ছোট বাচ্চারা সব ছেলে ও মেয়েদের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। মূলত পিহু ও সারফারাজ যখন ওদের দুই পক্ষের মাঝ দিয়ে তৈরি করা লাল কার্পেট বিছানো রাস্তাটা ধরে মন্ঞ্চের দিকে একসাথে এগিয়ে যাবে তখন ওরা ২ পাশ থেকে সমান তালে ফুল ছিটাবে ওদের দু’জনের উপর। কিয়ৎক্ষণ পর নির্ঝর সারফারাজকে নিয়ে লাল কার্পেটের সামনে এসে দাঁড়ালো। নির্ঝর অতঃপর ছেলেদের সারিতে চলে গেলো। পরপরই ইলমা আর অনু দু’জনে মিলে পিহুকে সাজিয়ে লাল কার্পেটের দিকে আনছিলো। পিহুর পরণে ছিলো সবুজ শাড়ি, হাত ভর্তি লাল কাঁচের চুড়ি, মাথার চুলগুলো একপাশ দিয়ে বিনুনি করে তাতে গাঁদা আর জুঁই ফুল পড়ানো হয়েছে, হালকা মেকআপ করিয়েছে, হরিণের ন্যায় টানা টানা দু’চোখ কাজলে রাঙানো রয়েছে। আর পিহুর মুখশ্রী জুড়ে লাজুক হাসি বিরাজ করছে। সারফারাজের চোখ যেনো এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেলো পিহুর উপর। তেজ নির্ঝরের কানে ফিসফিস করে বললো…..

—”নিজ্ঝরিয়ারে…বড় ভাইয়া মনে হয় ব্লিঙ্ক করতেও ভুলে গিয়েছে ভাবীকে দেখার পর।”
নির্ঝর ঠোঁট চেপে হাসলো। পিহুকে সারফারাজের সামনে এনে দাঁড় করানো হলো। পিহুর বুকটা অন্যরকম অনুভূতিতে উঠানামা করছে। সে পারছে না সারফারাজের দিকে চোখ তুলে তাকাতে। পরপরই সারফারাজের ধ্যান ভাঙলে পিহুর হাত ধরে সারফারাজ লাল কার্পেটের উপর দিয়ে আস্তে আস্তে হেঁটে সামনের দিকে এগোতে শুরু করলো। বাকিরা প্লান অনুযায়ী ওদের উপর ঝড়া ফুলের বৃষ্টি করছে। এরপর ওরা দু’জনে মন্ঞ্চে রাখা আসনে বসলো। আর্টিস্টরা খুব সুন্দর করে মেহেন্দি পড়িয়ে দিলো ওদের দু’জনের হাতেই। তবে সারফারাজ কোনো ডিজাইন করে নি কেবল পিহুর পুরো নামটা লিখেছে ডান হাতের তালুতে।
মেহেন্দি দেওয়া শেষ হলে তেজ মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে বললো…..

—”আজকের অনুষ্ঠানের আরেকটা বিশেষ আকর্ষণ বাকি আছে সবার জন্য।”
সবার কৌতুহলী দৃষ্টি তেজের উপর স্থির। তেজ সারফারাজের দিকে তাকিয়ে বললো…..
—”বড় ভাইয়া ও ভাবী নিজ গলায় গান গেয়ে এই মেহেন্দি অনুষ্ঠানটাকে পূর্ণতা দিবে।”
সঙ্গে সঙ্গে আবারও হৈ পড়ে গেলো। সবাই খুব এক্সাইটেড গান শোনার জন্য। পিহু বিস্ময়ের চোখে তাকালো সারফারাজের দিকে। সারফারাজ বললো…..
—”তোদের খুশির জন্য হাতে মেহেন্দি পড়েছি এবার মাফ কর আমাকে। আমি এই সব গান টানে বড্ড কাঁচা। এসব আমার দ্বারা হবে না।”
পিহুও যেনো সুযোগ পেলো। তাই সেও সারফারাজের তালে তাল মিলিয়ে বললো……
—”আমিও পারি না এসব গান গাইতে। গলার স্বর ভিষণ বেসুরে। গান করলে তোমরা সবাই পালাতে বাধ্য হবে বিশ্বাস করো!”
কিন্তু ওরা সবাই তো মানতে নারাজ। গান ওদের দু’জনকে আজ গাইতেই হবে। বেসুরে হলেও গাইতেই হবে। যখন কোনোভাবেই মানানো গেলো না তখন সারফারাজ উঠে দাঁড়িয়ে তেজের হাত থেকে মাইক্রোফোনটা নিয়ে গাইতে শুরু করলো…..

❝ ওর হাতে মেহেন্দি (২)
এপিটে না ওপিটে
আমার নামটা খুঁজি…..
ওর হাতে মেহেন্দি (২)
এপিটে না ওপিটে
নামটা লিখেছো কি…?
সবুজ শাড়ি পরে লাগছে সেই তোমাকে
বেণী করা চুলে ফুলের বাগান সাজে।
ছবির মতো তুমি, হাসছো বসে বসে
চোখ তুলে দেখো শুধু, দেখো এই আমাকে।
মেহেন্দি হাত দিয়ে, ঢেকেছো মুখ তোমার।
পর্দা সরাও এবার, পারি দেবো প্রেমের দুয়ার। ❞
পিহু লজ্জায় যেনো নুইয়ে পড়ছে। পরপরই নীরা পিহুর কাঁধ ধরে ওকে উঠিয়ে সারফারাজের পাশে এনে দাঁড় করালো। পিহুর তো দু’হাত ভরে মেহেন্দি দেওয়া। তাই সারফারাজ পিহুর মুখের সামনে মাইক্রোফোনটা ধরলো। পিহু গান শুরু করলো……

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৪৬

❝মেহেন্দি রঙ দেখো, গাঢ় হয়েছে কত!
হলে যত গাঢ়, তত ভালোবাসা পাবো।
হাতের তালু বলে, গল্প আমাদের।
নাম লুকাবো না আর, চিনুক সবায় তোমাকে
মেহেন্দি হাত দিয়ে,
ঢেকেছি মুখ আমার
পর্দা সরাবো এবার
পারি দাও প্রেমের দুয়ার।
আমার হাতে মেহেন্দি (২)
এপিটে না ওপিটে,
নামটা পেয়েছো কি…?
আমার হাতে মেহেন্দি (২)
এপিটে না ওপিটে,
নামটা পেয়েছো কি…..?❞

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৪৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here