না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৪৪
মাইশা জান্নাত নূরা
আইসিইউ থেকে বের হয়ে এসে অনু দেওয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে চোখ দু’টো বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিলো। কোনোভাবেই নির্ঝরের এই পরিস্থতির জন্য দায়ী হওয়া থেকে নিজের মন ও মস্তিষ্ককে বিরত রাখতে পারছে না সে।
সারফারাজ আর তেজ অনুর দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। কেউই কিছু বললো না।
কয়েক মুহূর্ত পর সারফারাজ নিজের ফোনটা বের করে একটু সাইডে এসে পিহুর নাম্বারে কল লাগালো। ওপাশ থেকে প্রায় সাথে সাথেই ফোন রিসিভ হলো। পিহু বললো…..
—”নির্ঝর ভাইকে পাওয়া গিয়েছে? আর অনু? সে কোথায়? আপনারা কি সবাই একসাথে আছেন? কতো লম্বা সময় ধরে ফোন করে যাচ্ছিলাম বন্ধ কেনো ছিলো?”
পিহুর উৎকণ্ঠিত কণ্ঠ শুনে সারফারাজ চোখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস ফেলে পরপরই শান্ত স্বরে বললো….
—”শান্ত হও তুমি আগে বউ। এতো উত্তেজিত হওয়ার মতো কিছু হয় নি। অনু, নির্ঝর দু’জনকেই পাওয়া গিয়েছে। অনুর গ্রামে এক্সিডেন্টলি নির্ঝরের পেটে ছু*রি*র আঘা*ত লেগেছিলো। এখন নির্ঝর হাসপাতালে ভর্তি আছে। অবস্থা আগের থেকে কিছুটা স্থিতিশীল। তবে এখনও পুরোপুরি বিপদমুক্ত নয় সে।”
পিহুর এপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা বিরাজ করলো। পরক্ষনেই পিহু কাঁপান্বিত গলায় বললো….
—”ছু*রির আ*ঘা*ত লেগেছে! কি বলছেন আপনি এসব? আপনারা বাকিরা ঠিক আছেন তো? নাকি আমার থেকে লুকিয়ে যাচ্ছেন পুরো পরিস্থিতিটা!”
—”সম্পূর্ণ ঘটনা পরে বলবো তোমাদের। এখন তুমি শুধু একটা কাজ করবে। বাড়িতে আমাদের বিষয়ে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে বলবে আমি অফিসিয়াল কাজে কয়েকদিনের জন্য দেশের বাহিরে গিয়েছি আর্জেন্টলি। তেজ আর নির্ঝর ট্যুরে গিয়েছে। আর অনু ওর পুরোনো বাসায় গিয়েছে। কয়েকদিন পর আমরা সবাই আবার ফিরবো। তাহলে আর কেউ চিন্তা করবে না আমাদের নিয়ে।”
—”আমরাও হাসপাতালে যেতে চাই। দয়াকরে মানা করবেন না। আপনাদের নিজের চোখে না দেখা পর্যন্ত শান্তি হবে না।”
—”ঠিক আছে। আগামীকাল সকালে ইলমা আর নীরাকে নিয়ে এসো হাসপাতালে। আমি ঠিকানাটা মেসেজ করে দিচ্ছি তোমাকে। আর যা বললাম তা মাথায় থাকে যেনো। বাড়িতে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক থাকবে তোমরা। কেউ যেনো কিছু জানতে বা বুঝতে না পারে।”
পিহু ছোট্ট করে ‘হুম’ বললো কেবল। সারফারাজ কল কাটার আগে বললো…..
—”নির্ঝরের জন্য দোয়া করিও তোমরা সবাই।”
অতঃপর সারফারাজ কল কেটে দিলো। একটু আগেও নীরা পিহুর রুমেই ছিলো। কিন্তু নির্বাণের ঘুমের সময় হওয়ায় ও নির্বাণকে ঘুম পাড়াতে চলে গিয়েছে। এখন কেবল ইলমা বসে আছে পিহুর রুমে বিছানায়। কল শেষ হয়েছে বুঝে ইলমা বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললো…..
—”ছুঁ*রি লেগেছে কার! বললে যে তুমি ভাবী! সবাই ঠিক আছে তো ওরা? আর অনু? ওকে পাওয়া গিয়েছে?”
পিহু ইলমার সম্মুখে এসে দাঁড়িয়ে ধীর স্বরে বললো…..
—”আস্তে কথা বলো ইলমা৷ বাহিরে থেকে বাড়ির কেউ শুনে ফেললে সমস্যা হবে।”
ইলমা সংযত হলো। পিহু যতোটুকু জানতে পারলো সারফারাজের থেকে ততোটুকু ইলমাকে জানিয়ে দিলো। ইলমা উদাস কন্ঠে বললো…..
—”অভাগী যেদিকে যায় নদীর জল সেদিকেই শুকায়। আমার ছোট বোনটা বড্ড অভাগী ভাবী, বড্ড অভাগী।”
পিহু ইলমার কাঁধ স্পর্শ করে বললো…..
—”এভাবে বলো না ইলমা। আল্লাহ সর্বোত্তম পরিকল্পনাকারী। তার উপর থেকে ভরসা হারিও না কখনও। এখন শুধু দোয়া দরকার নির্ঝর ভাইয়ের।”
ইলমা শব্দ করে নিঃশ্বাস ফেললো কেবল।
একটা দীর্ঘ, অসহনীয় অপেক্ষার মধ্য দিয়ে পার হচ্ছে হাসপাতালে তিনটি প্রাণ। সারফারাজ, তেজ ও অনু। সময় যেনো আজ ইচ্ছা করেই ধীরগতিতে চলছিলো। প্রায় ছয় ঘণ্টা পর আইসিইউ থেকে একজন নার্স বেরিয়ে এসে বললেন….
—”রোগীর জ্ঞান ফিরেছে। আপনারা ওনার সাথে দেখা করতে পারবেন এখন।”
কথাটা শুনে ওরা তিনজনই একসাথে বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। ওদের তিনজনের ঠোঁটেই হাসির রেখা ফুটে উঠলো। কিন্তু অনুর খুশি মূহূর্তেই মিইয়ে গেলো। তীব্র ভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো অনুর ভিতরে কাজ করা সেই অপরাধবোধ। এই মানুষটার আজকের সমস্ত যন্ত্র*ণার কারণ তো সে নিজেই। যদি অনুর জন্য নির্ঝরের মনে টান না থাকতো তবে কি নির্ঝর এভাবে একা চেয়ারম্যানের বাড়িতে যেতো সে? যেতো না।
সারফারাজ আর তেজ আইসিইউ এর ভিতরে চলে গেলো।অনু বাইরে থাকা চেয়ারেই আবারও চুপচাপ বসে পড়লো।মাথাটা নিচু করে রেখেছে সে। ভিতরে যাওয়ার মতো সাহস নিজের মধ্যে জুগিয়ে উঠত পারছে না অনু।
আইসিইউ এর দরজা খোলার শব্দ কানে আসতেই নির্ঝর ধীরে মাথা ঘুরিয়ে সেদিকে তাকালো। সারফারাজ আর তেজকে ভিতরে আসতে দেখে ওর ঠোঁটে হালকা হাসির রেখা ফুটে উঠলেও অনুকে না দেখতে পেয়ে সেই হাসি মিলিয়ে গেলো। সারফারাজ আর তেজ নির্ঝরের বেডের পাশে এসে দাঁড়ালো। সারফারাজ বললো……
—”কেমন লাগছে এখন?”
নির্ঝর ধীর স্বরে বললো….
—”কিছুটা ভালো লাগছে বড় ভাইয়া। চিন্তা করো না তোমরা আমায় নিয়ে।”
তেজ বললো….
—”কিন্তু তোর চেহারা তো অন্য কথা বলছে। কি চিন্তা করছিস হুম?”
নির্ঝর অকপটে বললো….
—”অনু, কোথায়?”
তেজ ভ্রু নাচিয়ে বললো….
—”আরে ব্যাটা! নিজের ভাইদের সাথে পারসোনাল সময় কাটাতে এখন আর ভালো লাগে না তাই না? বিয়ের শখ জেগেছে খুব? বিয়ে করলে তো আর আমাদের সময়ই দিবি না। অথচ বউকে দেওয়ার জন্য তোর সারাজীবনই পড়ে আছে।”
সারফারাজ তেজের দিকে কটমট করে তাকিয়ে বললো….
—”তোর মধ্যে তো লজ্জা-শরমের কোনো বালাই নেই। এখন আমার ছোট ভাইটাকেও নিজের মতো বিগ*ড়ে ফেলছিস!”
তেজ নাটকীয় ভঙ্গিতে ওর বুকের উপর হাত রেখে বললো….
—”বাহ ভাইয়া, বাহ! হাসপাতালের বেডে শুয়ে মাত্র পাঁচ মিনিট হলো তোমার আদরের ছোট ভাইয়ের জ্ঞান ফিরেছে। তার চিন্তায় আমরা দুই ভাই যে কি পরিমাণ পরীক্ষামূলক সময় পার করলাম, তার কোনো মূল্যই সে দিলো না! নিজের পেয়ারিলালের খোঁজ নিতে শুরু করলো। আর সে বিষয়ে বলতেই সব দোষ আমার হয়ে গেলো!”
নির্ঝর ফিক করে হেসে ফেললো তেজের হিংসা পরায়ণ কথা শুনে৷ পরমুহূর্তেই পেটে হালকা টান লাগায় নির্ঝরের মুখটা খানিক কুঁচকে এলো। নির্ঝর নিজেকে সামলে নিয়ে বললো…..
—”তেজ ভাই, ক্ষমা করে দাও আমায়। আর কিছু বলবো না তোমাকে। থাকো তুমি আমার পাশেই। যতো সুখ-দুঃখের গল্প আছে সব আগে তোমার সাথেই বলবো ও শুনবো।”
তেজ নাক সিটকে বললো….
—”থাক, থাক! আর ঢং দেখাতে হবে না। তুই তোর মতোই থাক। পাঠিয়ে দিচ্ছি তোর পেয়ারীকে ভিতরে।”
সারফারাজও হালকা হাসলো। তারপর ওরা দু’জনই বাইরে বেরিয়ে এলো। বাইরে এসেই দেখলো অনু এখনও মাথা নিচু করে বসে আছে। সারফারাজ নরম স্বরে বললো….
—”ভিতরে যাও, অনু। নির্ঝর তোমাকে দেখতে চাইছে।”
অনু মাথা না তুলেই বললো….
—”ওনার এখন পর্যাপ্ত বিশ্রাম প্রয়োজন। দেখা-সাক্ষাৎ, কথাবার্তা পরেও করা যাবে।”
তেজের ভ্রু কুঁচকে এলো অনুর কথার ধরণ দেখে। তেজ কিছু বলতে যাচ্ছিলো কিন্তু সারফারাজ হাত তুলে ওকে থামিয়ে দিলো। সারফারাজ হয়তো অনুর নাকোচ বার্তার কারণ আন্দাজ করতে পেরেছে কিছুটা। অতঃপর সে অনুর পাশে বসে বললো……
—”নিজেকে দোষী মনে হচ্ছে তোমার, তাই না?”
অনুর চোখ ভিজে উঠেছে ইতিমধ্যেই। লজ্জায় সে মাথা তুলতে পারছে না সারফারাজ শান্ত স্বরে বললো….
—”নির্ঝর নিজের ইচ্ছাতেই তোমাকে বাঁচাতে গিয়েছিলো, অনু। ওকে কেউ বাধ্য করে নি।”
অনু এবার কাঁপা গলায় বললো….
—”কিন্তু ভাইয়া! সবকিছুর পরেও আজ উনি যে এই অবস্থায় এসে দাড়িয়েছেন তার জন্য তো আমি নিজেকে দায়ী হওয়া থেকে মুক্ত করতে পারছি না।”
—”হুম এমন চিন্তা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে না পারাটা স্বাভাবিক। কিন্তু একটা সত্যি কথা কি জানো! আজ যদি তোমার কিছু হয়ে যেতো তাহলে নির্ঝর নিজেকে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারতো না।”
অনু নিঃশব্দে কেঁদে ফেললো সারফারাজের কথায়। ওর উল্টো প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হলো, “কেনো নির্ঝরের ওর প্রতি এতো টান!” কিন্তু পারলো না৷ শব্দ গুলো ওর গলা পর্যন্ত এসেও ঠোঁটের ভাঁজ কাটিয়ে বের হতে পারলো না। সারফারাজ আবারও বললো…
—”নির্ঝর এখন তোমাকে খুঁজছে। তাই নিজের অপরাধবোধকে একটু সরিয়ে রেখে ভিতরে যাও। কারণ এই মুহূর্তে তোমার প্রয়োজনটা ওর কাছে সবচেয়ে বেশি।”
অনু ধীরে মাথা তুলে কান্নায় ফুলো ফুলো লাল হয়ে আসা চোখ দু’টো নিয়ে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলো সারফারাজ ও তেজের দিকে। পরপরই সে উঠে আইসিইউ এর দরজার সামনে দাঁড়ালো। বুকের ভেতরটাতে ভাড়ী কিছু অনুভব করছে সে। সেখানেই কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো সে। ওর মন ওর মস্তিষ্কের দিকে প্রশ্ন ছুড়ছে হয়তো! ভিতরে যাবে কি সে? নাকি ফিরে যাবে আগের স্থানে?
অবশেষে দোটানা থেকে নিজেকে মুক্ত করে অনু ওর চোখে লেগে থাকা অবশিষ্ট পানিটুকু মুছে দরজাটা ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করলো। বিছানায় শুয়ে থাকা নির্ঝর আবারও দরজা খোলার শব্দ শুনে সেদিকে তাকালো। অনুকে দেখামাত্রই ওর ফ্যাকাশে মুখে হালকা স্বস্তির ছাপ ফুটে উঠলো। অনু মাথা নিচু করেই দাঁড়িয়ে রইলো দরজার কাছে। কেবিন জুড়ে নীরবতা বিরাজ করছে৷ কয়েক মুহূর্ত পর নির্ঝরই নীরবতা ভেঙে বললো…..
—”এতো দূরে দাঁড়িয়ে আছেন কেনো? আমাকে কি এখন এতোই ভয়ং*কর দেখাচ্ছে যে একটু কাছাকাছি এসে দাঁড়ানো যাবে না?”
অনু সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বললো…..
—”না, না। তেমন কিছু না।”
—”তাহলে কাছাকাছি এসে দাঁড়ান!”
অনু এবারও নড়লো না। নির্ঝর ভ্রু কুঁচকে বললো….
—”অনু?”
অনু ধীরে ধীরে মুখ তুললো। চোখ দু’টো লাল হয়ে আছে কান্নায়। নির্ঝরের বুকের ভেতরটা কেমন যেনো করে উঠলো অনুর এমন দশা দেখে৷ অনু কাপান্বিত কন্ঠে বললো…..
—”আ-আমার আপনার সামনে আসার কোনো অধিকার নেই।”
নির্ঝর কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ওর দিকে। অতঃপর বললো….
—”এমন কথার মানে কি?”
—”আপনার আজকের এই অবস্থার জন্য তো আমিই দায়ী। যদি আমার জন্য আপনার মনে টান না থাকতো, তাহলে আপনি কখনও একা সেখানে যেতেন না। আজ আপনাকে এভাবে হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকতে হতো না।”
কথাগুলো বলতেই আবারও চোখ ভিজে উঠলো অনুর। অনু আবারও বললো….
—”আমার জন্যই আপনি এতো কষ্ট পাচ্ছেন।”
নির্ঝর অনুর উপর দৃষ্টি স্থির রেখে নিরব রইলো কিয়ৎক্ষণ। অতঃপর বললো….
—”আমি যা করেছি নিজের ইচ্ছাতেই করেছি। তাই নিজের উপর অযথা দোষ চাপাবেন না।”
অনু মাথা নিচু করে বললো….
—”তবুও…!”
—”তবুও বলতে কিছু থাকছে না আর।”
নির্ঝর ওর কণ্ঠে এবার সামান্য দৃঢ়তা ফুটিয়ে তুলে বললো….
—”আপনি জানেন, আমি সবচেয়ে বেশি কষ্ট কখন পেয়েছি?”
অনু বিস্মিত চোখে তাকালো নির্ঝরের দিকে। নির্ঝর বললো….
—”যখন আমার জ্ঞান ফিরলো তারপর আমি আপনাকে আমার পাশে দেখতে পেলাম না তখন।”
—”আমি ভেবেছিলাম আপনি হয়তো আমার উপর রাগ করে আছেন।”
নির্ঝর মৃদু হেসে বললো…..
—”আপনার উপর রাগ করে থাকতে পারবো না কোনোকালেও আমি এ কথা জেনে রাখুন।
অনু কিছু বললো না। নির্ঝর আবারও বললো….
—”তবে একটা বিষয়ে আমি সত্যিই রাগ করেছি।”
—”কোন বিষয়ে?”
—”আপনি আমাকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছেন, এই বিষয়ে।”
অনু ওর দৃষ্টি পুনরায় নামিয়ে বললো…..
—”না, মানে! আসলে আমি…!”
—”আমার দিকে তাকান, অনু।”
অনু ধীরে চোখ তুলে তাকালো নির্ঝরের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে দু’জনের চোখ এক হলো। নির্ঝর চেয়ে রইলো অনুর মায়া মাখানো চোখ দু’টোর দিকে। অতঃপর বললো….
—”এখন একটা প্রশ্নের উত্তর দিবেন?”
—”কি প্রশ্ন?”
—”চেয়ারম্যানের বাড়িতে যখন আমি আপনাকে বলেছিলাম দরজা খুলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাহারাদারটির উপর হা*ম*লা করতে তখন আপনি কোনো প্রশ্ন ছাড়াই আমার কথা মেনে নিয়েছিলেন কেন?”
অনু থমকানো স্বরে বললো…..
—”আমি-আমি তো..!”
নির্ঝর অনুর কথা কেড়ে নিয়ে নিজে শেষ করতে বললো…
—”কারণ আপনি বিশ্বাস করেন যে আমি আপনার কোনো ক্ষতি হতে দেবো না। তাই না?”
অনু উত্তর দিতে পারলো না। নির্ঝর ওর ঠোঁটের কোণে ম্লান হাসি ফুটিয়ে বললো….
—”ঠিক একইভাবে, আপনাকেও বিশ্বাস করতে হবে যে আপনার জন্য আমি যা করেছি তা নিয়ে আমার কোনো আফসোস নেই। একটুও না।”
অনুর চোখ থেকে টপটপ করে পানি গাল গড়িয়ে পড়লো।সে কাঁপা গলায় বললো….
—”আপনি এত ভালো কেনো?”
নির্ঝর মৃদু হেসে বললো….
—”এতোটাও ভালো মানুষ না আমি। শুধু আপনার বেলাতেই আমার সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়।”
অনু ঠোঁট কাঁ*ম*ড়ে দাঁড়িয়ে রইলো। নির্ঝর বললো…
—”এবার তো কাছে আসুন।”
অনু দ্বিধাগ্রস্ত পায়ে এগিয়ে এলো। বিছানার পাশে এসে দাঁড়াতেই নির্ঝর কষ্ট করে নিজের হাতটা সামনের দিকে বাড়িয়ে বললো….
—”হাতে হাত রাখুন।”
অনু থমকালো নির্ঝরের কথায়। কয়েক সেকেন্ড নির্ঝরের হাতের দিকে তাকিয়ে রইলো সে। অতঃপর নিজের হাতটা রাখলো অনু নির্ঝরের হাতের উপর। নির্ঝর অনুর হাতটা মুঠো বন্দি করে নিয়ে বললো…..
—”আপনাকে আমি কেনো বাঁচাতে গিয়েছিলাম জানেন?”
অনু কিছু না বললেও ওর চোখে জানার কৌতুহল ঠিক ফুটে উঠলো। নির্ঝর বললো…..
—”আপনার উপর শুরু থেকেই আমার দূর্বলতা কাজ করতো। আপনার অতীত, বর্তমান অবস্থা জানার পর সেই দূর্বলতার মাত্রা বেড়ে গিয়েছে। নিজের লাইফ নিয়ে সিরিয়াস না থাকা আমিটাও নিজের ফিউচার নিয়ে ভাবতে শুরু করেছিলাম। সমস্ত খারাপ অভ্যাস ছেড়ে-ছুড়ে ভালো হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আপনার আশেপাশে থাকার চেষ্টা করতাম। খারাপ স্মৃতি গুলো মনে করে আর যেনো নিজের ক্ষ*তি না করে বসেন সেই দিকে খেয়াল রাখার চেষ্টা করতাম। আপনার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠতে দেখলে আমার মনে তৃপ্তি কাজ করতো। তেমনি আপনার দু’চোখ নোনাজলে ভিজে উঠলে বুকের বা’পাশটায় বড্ড যন্ত্রণা করতো। আপনার কান্না সহ্য করার ক্ষমতা আমার নেই অনু। আপনার থেকে দূরে থাকাও আমার পক্ষে আর সম্ভব না। মনের কথা মনে পুষে আমাদের মধ্যে আর দূরত্ব বাড়াতে চাই না।”
কথা গুলো বলে নির্ঝর থেমে গেলো। অনু বিস্ময়ের নজরে দেখছে নির্ঝরকে। চোখের পলক পর্যন্ত পড়ছে না একটাবারের জন্য ওর। নির্ঝর আবারও বললো…..
না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৪৩
—”আমার সর্বক্ষণের সঙ্গী হবেন? বিনিমনে আপনার দুঃখ গুলো আমায় দিবেন সব আর আমার সুখ গুলো আপনার নামে করে নিবেন! আমায় আপনার ছায়াসঙ্গী হতে দিবেন? বিনিময়ে যেমন বৃষ্টি হলে, চড়া রোদ উঠলে ছাতা বা বৃক্ষতলে মানুষ নিজেকে লুকাতে পারে তেমনই আপনার খারাপ অতীত যখন স্মরণ হবে, নিজের ক্ষতি করার ইচ্ছে জাগবে তখন আমার বুকের মাঝে জায়গা করে নিজের দুঃখ গুলো ভুলতে পারবেন! আপনাকে ভালোবাসার সুযোগ আমায় দিবেন? বিনিময়ে আমার মন, প্রাণ সব উজার করে দিবো আপনাকে অফুরন্ত ভালোবাসা সেখানে জমে রাখতে পারবেন! বলুন না অনু! হবেন আমার অর্ধাঙ্গিনী? দিবেন আমায় নিজের দুঃখের মালিকানা?”
নির্ঝর জানে না অনুর জবাব কি আসবে। সে কি মানবে নাকি না করে দিবে! নানান চিন্তা কাজ করছে ওর মন ও মস্তিষ্ক জুড়ে।
