Home নীতিহীন রাজ নীতিহীন রাজ পর্ব ১৩

নীতিহীন রাজ পর্ব ১৩

নীতিহীন রাজ পর্ব ১৩
আশিকা আক্তার সোহাগী

বিড়াল মারার সেগুন কাঠের মোটা ডাল দিয়ে একাধারে প্রহার করে চলেছে সাত বছরের বাচ্চাকে একজন মধ্যবয়সী নারী।এক একটা প্রহারে সাপের মতো একে বেকে যাচ্ছে বাচ্চাটা , সাথে বিকট চিৎকারে মাটি পর্যন্ত কেপে উঠছে।তবুও পাষণ্ড নারীর মনে একটু দয়া উদয় হলো না।শরীরের সমস্ত শক্তি শেষ হলেই হাত যখন থামলো ,বাচ্চাটা তখন আধমরা।সেই অবস্থাতেই গলায় পাড়া দিয়ে ধরলেন। শ্বাসটা যখন শেষ ,প্রাণ নিভু নিভু। জানটা চোখে উঠে এলো। পেছন থেকে কেউ ধাক্কা দিয়ে সড়িয়ে ,বাচ্চাটাকে বুকে টেনে নিলেন। অস্পষ্ট একটা আওয়াজ বের হলো বাচ্চাটার মুখ দিয়ে ,

“”ফু-আম্মু””
চোখ মেলে তাকিয়ে দেখে ,চোখের জলে গাল বেয়ে গলা ঢল নেমেছে।
“দিস ফা*কিং টিয়ার্স” বলে হাত বাড়িয়ে টিস্যু বক্স থেকে টিস্যু নিয়ে চোখ মুছে নিলো। তারপর আপন মনে বিড়বিড় করলো,
“বেঁচে আছো তো ফু-আম্মু?তোমার কাছে একজীবন ঋণ আমার। শোধ করার সুযোগটা দিয়ো প্লিজ।”
মক্কু আর সজীব হনহনিয়ে ক্লাবে ঢুকলো। পেছনে জেনিও আছে।সবার মুখের রং কালো। নিবিড় হাত পা মেলে লম্বা একটা টানা দিয়ে তাদের দিকে দৃষ্টিপাত করে। ভাষণের পর গরমে ক্লান্ত হয়ে ক্লাবে চলে এসেছিলো রেষ্ট নিতে।ক্লান্ত চোখ অলস হয়ে লেগে আসায় ,ছোটবেলার দুঃস্বপ্ন গুলো উঁকিঝুঁকি দেয়া শুরু করলো । আর রেষ্ট ।প্রতিদিন শ্বাস প্রশ্বাস চলে পৃথিবীর ঋণ শুধু বাড়াচ্ছে। দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো একটা।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

“ভাই সমাবেশ থেকে জিয়ানা হাপিস হয়ে গেছে। বাসা ,বস্তি কোথায় নেই।এমনকি পার্কিং লটে সাইকেলটাও পড়ে আছে।” একদমে মক্কু বলে উঠে।
“চিল চিল। যা দস্যি মেয়ে নিশ্চিত কোথাও না কোথাও মারপিট করছে খোঁজে দেখ।”
নিবিড় ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বলে উঠলো।
“নো ভাইয়া। ওর ফোন কখনো সুইচড অফ থাকে না। তাছাড়া সমস্যা হচ্ছে সাইকেল ছাড়া এক পা নড়ে না। আরও একটা ব্যাপার আছে ,ওর ফ্রেন্ড মৌসুমী বলেছে সমাবেশে গিয়েছিলো হঠাৎ সাইডে চলে আসে।একটা মেয়েকে দেখেছিলো নাকি ওর সাথে কথা বলতে। তারপর ওইখান থেকে আর খোঁজে পায়নি” জিয়ানা বেশ চিন্তা চিন্তা সুরে বলল।

“তোমরা কি ভাবছো ওকে কেউ কিডন্যাপ করেছে? ওহো তাহলে তো চিন্তার বিষয়ই। ”
“ঠিক একটা মেয়েকে কিডন্যাপ করা মানে অনেক খারাপ কিছু হতে পারে।” সজীব নিবিড়ের পাশে বসে বলল।
“আরেহ আমি চিন্তায় আছি কিডন্যাপারের জন্য।আহারে তাদের কি হাল করবে পাগল মেয়েটা। ” নকল আফসোসের ভান ধরে বলল নিবিড়।
“সজীব আমি তোমাকে বললাম শুধু শুধু এখানে এসো না।চলো আমরাই আবার খুজি।” বলে বিরক্ত হয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেলো জেনি।

“মাঠের গেইটের সামনে দাঁড়ানো কিছু ছেলেপেলে দেখেছে একটা কালো হাইস গাড়িতে উঠতে জিয়ানাকে।ভাই তোর তো একটা ফোনই যথেষ্ট। ট্রাফিক পুলিশ সব বের করে দিতে পারবে।”
“ফালতু কাজে আমার সময় নেই।চাল ফোট। আমি টায়ার্ড। মক্কু আইস নিয়ে আই যাহ। কয়েক পেগ পেটে চালান দিতে হবে। যাওয়ার আগে আসবি। যাহ” বলে হাত দিয়ে ইশারা করলো নিবিড়।
সজীব এইবার নিজেও হাল ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। তার মন ভেঙে গেছে। এই কয়েকদিন তার কোথাও মনে হয়েছে নিবিড়ের পরিবর্তন সম্ভব এবং সেটা জিয়ানাকে দিয়েই। কিন্ত আজ সে হতাশ ,চরম হতাশ।
সবাই বের হওয়ার পর পরই নিবিড় নিজের ফোন বের করে। কিছু টাইপ করে বাইকের চাবি নিয়ে বের হয়ে গেলো ক্লাব থেকে। নিবিড় কারো ঋণ রাখে না। আবার উপকারের ক্রেডিট টাও নেই না।সে চলে কিছু আপনা নীতিতেই। আর আপনা গতিতেই। মাঝখানে কিছু আং সাং মানুষ এসে যায়। তাদের জন্য হঠাৎ মনের উচাটনে বেশ বিরক্ত বোধ করে। এমন মানুষের সংখ্যা অতি সামান্য। ইদানীং আরেকজন জোর করে ঢুকে যাচ্ছে সেই ক্ষুদ্র ফর্দে।

সাদা ধপধপে দেয়ালের একপাশ পুরাটাই ছোট ছোট পাথর দিয়ে ডিজাইন করা। পুরা মেঝেতে বিছানো সাদা লোমের অত্যন্ত নরম কার্পেট। একপাশে আর্টিফিশিয়াল সাদা চেরি ব্লসমের দুইটা গাছ। নিচ থেকে সাদা কুন্ডলির মতো ধোঁয়া বের হতে লাগলো। আর সাদা লাইটিং হঠাৎ বদলে নীল হয়ে গেলো। পুরা কক্ষটাই একটা স্বর্গীয় আভায় ছেয়ে গেলো যেনো।
সেই কক্ষে প্রবেশ করলো সম্পূর্ণ বস্রহীন এক ষাটোর্ধ পুরুষ। দেয়ালের বিশেষ এক সুইচ অন করতেই কক্ষের ঠিক মাঝখান থেকে বের হয়ে এলো একটা কাফিন সম বক্স। কাফিনের ঢাকনা খুলার সাথে সাথে ,ভেতরে লাল ভেলভেট কাপড়ের মাঝখান থেকে সাদা ব্রাইডাল ড্রেস পরিহিতা এক নিদ্রিত রমণী বের হলো।মাথায় দামী পাথর খচিত এক বিশাল তাজ। ঠিক খ্রীস্টানদের বিয়ের সাজে সজ্জিত ঘুমন্ত রমণীটি।

নগ্ন পুরুষ এগিয়ে গিয়ে বিবস্ত্র করে দিলো রমণীকে। ফ্যাকাসে সাদা শরীর অনাবৃত করে ,সাইড থেকে দো মাথা যুক্ত এক ছুরি বের করলো।সেই ছুড়ি দিয়ে নিজের হাত কেটে রক্তে মেখে দিলো ঘুমন্ত রমণীর সারাশরীর।মাখানো শেষে আরেক বিশেষ সুইচ অন করলো।আর ওয়ালের একপাশ খুলে দরজা বের হয়ে গেলো।সেই দরজা ধরে ভেতরে ঢুকে টকটকে লাল তরলের বাথটাবে ডুব দিলো নগ্ন পুরুষটি। এই যেনো নিজেকে নাপাক আর অপবিত্রের সর্বোচ্চ চেষ্টা। বার কয়েক ডুব দিয়ে সেই অবস্থায় উঠে এলেন।হঠাৎ কেউ দেখলে মনে হবে রাক্ষস পুরীর সাক্ষাৎ রাক্ষস। হেটে হেটে চলে গেলো অন্ধার এক কুঠরীতে। সেখানের সুরু এক সিড়ি বেয়ে উপরের উঠতে লাগলো।প্রতি কদমে লাল তরলের ছাপ স্পট। সিড়ি বেয়ে উঠে এলো লাল আর কালো মিছেল এক ভয়ংকর কক্ষে।যার একদম সম্মুখে দুই শিং ওয়ালা জানুয়ারের মাথার আদলের এক কালো মুর্তি। নগ্ন ব্যাক্তি মাথা ঝুকিয়ে সম্মান জানালো সেই ভয়ংকর মুর্তিটির সামনে।তারপর আওড়ালো

“ওহ লুসিফার। আর কতদিন? আর কতবছর? এই অপেক্ষার শেষ কোথায়?”
পৃথিবীর সকল ধর্মের একটাই প্রতিদ্বন্দ্বী সেটা শয়তান।কিন্তু কিছু মুর্খ সেই শয়তানেরও উপাসনা করে নিজ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য।

মায়ের সাথে আদর করে কথা বলতে হয়
বাবার সাথে সম্মান দিয়ে
স্পাউসের সাথে সত্যি কথা
ভাইয়ের সাথে মন দিয়ে কথা
বোনের সাথে আদর দিয়ে কথা
বাচ্চাদের সাথে উৎসাহ দিয়ে
বন্ধুদের সাথে আনন্দের সাথে কথা বলতে হয়
(এ পি জে আবুল কালাম)

উনার সব গুলা কথা জিয়ানা মনে মনে স্মরণ করেও কিডন্যাপারের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় খোঁজে পেলো না।গাড়ির দরজায় দাঁড়ানোর সাথে সাথে তাকে স্কোপালামিন বা শয়তানের নিশ্বাস নামে পরিচিত পাউডার ছুড়ে মারে।তারপর তাদের বশবতী হয়ে নিজেই গাড়িতে উঠে পড়ে।
একটা চৌকির স্ট্যান্ডের সাথে হাত পিছমোড়া করে বেধে রেখেছে। মাথা হালকা ঝিমঝিম করছে। ছোট একটা খুপরির মতো টিনের ঘর। চৌকি ছাড়া দ্বিতীয় কিছু আর নেই এই ঘরে।সুনসান নির্ভর চারপাশ। পূর্বাহ্ণ গিয়ে যে মধ্যাহ্ন চলছে বুঝা যাচ্ছে টিনের চালের তাপের কারণে। মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সব দেখে নিলো সে।
জিয়ানা নিশ্চিত হলো তার নিউজ লিক হয়ে সেল হয়ে গেছে। এখন ঠান্ডা মাথায় এখান থেকে বের হতে হবে।চিন্তা হচ্ছে জিয়াউলের জন্য।

জোরে জোরে শব্দ করে কাশতে লাগলো যেনো কেউ আসে এই রুমে।কাজ হলো জিয়ানার ট্রিক্সে।দুইজন ঢুকলো একজন মধ্যবয়সী আরেকজন হ্যাংলা পাতলা লম্বা অল্পবয়সী ছেলে। তবে সে আবার বিশেষ সাজগোজ করেছে। যেমন সিল্কের প্রিন্টের শার্ট যার আবার তিনটা বোতাম হা করে খোলা। সাথে স্ক্যানি জিন্স। পায়ে স্যান্ডেল। হাতে অনেক গুলা বেসলাইট। গলায় আবার রুপার চেইন।চুল স্পাইক করা। জিয়ানা তার দিকে তাকিয়ে বিমূর্ত হয়ে বলে উঠলো ,

“ওয়াও। আপনি কি সাল্লু ভাইয়ের রিলেটিভ?”
চেংড়্যা বিরক্ত হয়ে একটু এগিয়ে এসে বলে,
“মানে? সাল্লু ফাল্লু কে?”
“আরেহ সালমান খান?আপনি তো তার একদম জেরস কপি। বডি উঠবে উঠবে করছে। ওয়াও সত্যি আপনি তার বংশের কেউ নিশ্চিত?”
এইবার চ্যাংড়ার মুখে বিরক্ত সড়ে আলাদা একটা গ্লো এসেছে। কিন্তু মধ্যবয়সী লোকটার এক ধমকে সেটা কেটে গেলো।
“ওই চপ।বেশি টপটপ করলে থাবড়া দিয়ে মুখের মানচিত্র পাল্টায় দিমু। মাইয়া মানুষের কথা আমার মস্তিষ্কে আগুন জ্বালায়ে দেয়।”

জিয়ানা বুঝলো এই গুন্ডার সাথে বিশেষ সুবিধা করতে পারবে না। তাই মুখটা হঠাৎ কাঁদো কাঁদো করে বলে,
“আমাকে কিডন্যাপ করেছেন কেন? বিক্রি করিয়া দিবেন? ”
“না। আমাদের অর্ডার শুধু কিডন্যাপ করা বাকি কিছু জানি না।” চিকন আওয়াজে চ্যাংড়া গুন্ডাটা বলল।
জিয়ানার কাছে লাগলো অনেক গুলা মুরগীর বাচ্চা চিউচিউ করলো যেনো। এই যে কিডন্যাপ হয়েছে। প্রচন্ড সিরিয়াস ইস্যু। মানে জীবন মরণ ব্যাপার কিন্তু তার পেট ফেটে হাঁসি পাচ্ছে।নিজেকে সামলিয়ে বলল,
“শুনুন আমার প্রচন্ড ক্ষুধা পেয়েছে। একটা বিফ বার্গার আর বাবল টি খাওয়ান না প্লিজ? ও হ্যা বার্গারে টমেটো দিতে না করবে। লেটুস পাতা দুইটা হবে। ওকে?”

“শা*লি হানিমুনে আসছো এমন ভাব করতাছো? ” বলে জিয়ানার গালে সজোরে একটা চড় দিলো মধ্যবয়সী গুন্ডা।
চড়ে জিয়ানার ঠোঁট কেটে গেলো আর মাথায় ঝিমঝিম ভাবটা বেড়ে গেলো। এই চড় হজম করে ফেইক কান্নার ভাব ধরে গুন্ডা টু এর দিকে তাকিয়ে বলে,
“দেখলেন সাল্লু ভাই আপনার বস কেমন?কুরবানীর আগেও তো পশুকে ভালো মতো খাওয়াই আর আমি তো মানুষ। ”
বস কথাটা ইগোতে লাগলো চ্যাংড়ার। সাথে সাথেই প্রতিবাদ করে উঠে বলে,
“কিসের বস। এইখানে আমাদের কোন বস নাই। সবাই সমান।
গুন্ডা ওয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে
“আর আপনে হাত তুললেন কেন? সামনের বাজার থেকে একটা বার্গার নিয়ে আসেন যান।” তারপর পকেট থেকে টাকা বের করে দিলো।
“ওয়েট ওয়েট আমার ব্যাগটার ভেতরে একটা পানির বোতল আছে ,সেটা কেউ যেনো না খায়।ওইটাতে বিষ মিশিয়ে রাখছি।” জিয়ানা দুঃখী ফেইস করে বলে উঠলো।
হকচকালো দুই কিডন্যাপার।

“বিষ ক্যান? ”
“আরেহ আমার বয়ফ্রেন্ড আমাকে ডিচ করে আজ বিয়ে করছে। তাই আমি স্বীদ্ধান্ত নিয়েছে সে যে মুহূর্তে কবুল বলবে আমিও টপকে যাবো। এক হিসেবে আপনারা আমার উপকারী করলেন।বার্গারটা খাওয়ার পর খুন করে দিয়েন। তাহলে আমার আর পাপ হবে না। ”
বেক্কেল হয়ে গেলো কিডন্যাপার দুইজন।তখন ঘরে প্রবেশ করলো একজন নিগ্রো। জিয়ানা তাকে দেখেই বলে উঠলো ,
“আরেহ এই কাইল্লা কে?অন্ধকারে তো দেখাই যাচ্ছে না।”
ফ্যাসফ্যাসে একটা হাঁসি দিলো গুন্ডা টু।কিন্তু গুন্ডা ওয়ান আবার ধমকে উঠে বলে,
“এরাই অর্ডার দিয়েছে। এখন তোমাকে নিয়ে ফুর্তি করবে।কাইল্লা কি জিনিস হাড়ে হাড়ে বুঝবা। ”
ভেতর ভেতর জিয়ানা একটু ঘাবড়ে গেলো। নিগ্রোর যে শরীর নিশ্চিত ছয় ফিটের উপর। ভেতরকার পরিস্থিতি যেমনই থাক ,বাহিরের সেটা দেখাবে না আর না সে দমে যাওয়ার পাত্রী ,

“আরেহ এমন নিগ্রো তিন চারটা সামলাতে পারবো। ফিকার নট। কিন্তু সবার আগে আমি এই সাল্লু ভাইকে সময় দিতে চাই। ” বলে চোখ টিপ দিলো। আর অত্যন্ত লাস্যময়ী হয়ে একটা খিলখিল করে হাঁসি দিলো।”
উপস্থিত প্রতিটা পুরুষের বিষম খাওয়ার অবস্থা যখন তখন আবার বলে উঠলো ,
“কিন্তু আমি অনেক ক্ষুধার্ত। তাই এইবার বার্গার আর পিজ্জা দুইটাই লাগবে।ও হ্যা পিজ্জায় ব্ল্যাক অলিভ দিবেন না।আই ডোন্ট লাইক ইট। ”

এতক্ষণে সাল্লু গুন্ডা গলে গ হয়ে গেছে।সে বাকি দুইজনকে ঘর থেকে বের করে দিলো একপ্রকার জোর করেই। জিয়ানা ততক্ষণে আর একটু আবেদময়ী হওয়ার চেষ্টা করছে।লাইফের এই পর্যায়ে এসে তার মনে হচ্ছে ,নাহ মেয়ে হওয়া বেশ উপকার। বিশেষ করে এই লিপ্সাযুক্ত পুরুষের সমাজে।কিন্তু মেয়েলি স্বভাব বহির্ভূত জিয়ানা ,নিজেকে আজ অসহায় আবিষ্কার করলো।একটু ঢং ভং আর ন্যাকামিও যে জায়গা বিশেষ কাজে দেয় আজ হাতে নাতে প্রমাণ পেলো।এইজন্যই তামান্নার তিনটা বর হয়ে গেছে আর সে সিঙ্গেল।
সাল্লু গুন্ডা ততক্ষণে জিয়ানার বেশ কাছে চলে এসেছে।জিয়ানা একটু লাজুক ভাব নিয়ে বলল,
“সত্যি তুমি সালমানের কেউ না? ক্যান আই টাচ ইউ? আমার বিলিভ হচ্ছে না এত হ্যান্ডসাম কেউ এক্সিস্ট করে। ”
তুমি ডাক শুনে চ্যাংড়া আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়লো। তার এই গুন্ডামীর জীবনে কোন মেয়ে এমন ভাবে বলা তো দূর কি বাত তাকিয়েও দেখেনি।সেখানে এমন এক স্মার্ট মেয়ে তার প্রশংসা করছে।

“করো না টাচ করো। ” বলে মুখ এগিয়ে দিলো।
জিয়ানা অসহায় হয়ে বলল”হাত বাঁধা সম্ভব না। ”
সাল্লু চালু চিজ ফট করে দূরে চলে গিয়ে বলে,
“ভাই বারবার সাবধান করেছে। তুমি নাকি ডেঞ্জারাস মাইয়া।কথা কম চল আমরা একটু রোমান্স করি। তোমাকে আমার হেভি ভালো লেগেছে।”
জিয়ানা গাল ফুলিয়ে ডং করে বলল,
“যাহ তোমার সাথে নো রোমান্স। ” পরক্ষণেই চমকে উঠে বলে,
“আচ্ছা একটা গেইম খেলি চল। যদি তুমি বলতে পারো তাহলে আমি এই অবস্থায় তোমাকে রোমান্স করতে দিবো। আর যদি না পারো আমার তোমাকে টাচ করতে দিতে হবে। রাজি? যদিও মনে হচ্ছে তুমিই জিতে যাবা কারণ বেশ বুদ্ধিমান লোক তুমি ”
সাল্লু ভাই শার্টের কলার টা একটা ঝাড়া মেরে বলে,

“চল রাজি আমি।”
“আমি যে কথাটা বলবো তুমি যেটা পাঁচ বার টানা বলবা। ওকে?”
সাল্লু গুন্ডা উপর নিচ মাথা ঝাকিয়ে হ্যাঁ বুঝালো।
“‘লীনা নিল,নীলা লীলা নিল না’ বল ”
সাল্লু বোকা হয়ে হা হয়ে গেলো
“কিসের লীলা লীলা নিল।বুঝি নাই আবার বল।”
আবার বলল ” লীনা নিল,নীলা লীলা নিল না”
“লীনা নিল। লিলা লালা নিলা না।”
খিলখিলিয়ে হেঁসে দিয়ে জিয়ানা বলে,
“একবারই তো পারলা না। তুমি হেরে গেছো।”
“না না হবে না এটা। তুমি ঢপ দিচ্ছো। ”
“ওমা তুমি দেখি ইমানদার গুন্ডা না।শুনো গুন্ডা মাস্তান যাই হও ,জীবনে নিজের মুখের কথার একটা ওয়েট রেখে চলবা।আচ্ছা আবার অন্য একটা বলছি না পারলে কিন্তু এইবার তুমি চিটার হয়ে যাবা।”
“রুলারে লড়াই ‘ বল পাঁচ বার। ”
এইবার একবারও বলতে না পেরে রেগে গিয়ে জিয়ানার হাতের বাধঁন খুলে দিলো। আর জিয়ানা ঝাড়া মেরে উঠে চওড়া একটা হাঁসি দিয়ে বলে
“খেলা হবে।”

মহিলারা যখন রাগ করেন তখন দুইটা উপকার হয়। এক,শব্দ দূষণ কমে যায়। কারণ তারা একেবারে মিউট হয়ে যান।আর দুই,ঘরের প্রতিটা কোণা ঝকঝকে তকতকে হয়ে যায়।কারণ মুখ বন্ধ হলেও হাত চলে বুলেট ট্রেনের গতিতে।
আঞ্জুমান মেয়ে আর স্বামীর প্রতি রাগ করে আজ কলেজ ছুটি নিয়ে ইচ্ছা মতো ফার্নিচার গুলোকে ঘষামাজা করছেন।ভাবখানা এমন এগুলা ফার্নিচার না স্বয়ং জিয়াউরের পিঠ।
মর্জিনা বেওয়া মেয়ের ভাবসাব দেখছে শুধু। জায়গা মতো মুখ খুলে বারুদের ঘরে আগুন লাগাবেন সেই সুযোগ খুঁজে চলেছেন।ঠিক তখনই জেনি হন্তদন্ত করে বাসায় ঢুকে জিজ্ঞেস করলো ,
“জিয়ু ফিরেছে আম্মু?”
আঞ্জুমান সোফায় বসে পড়ে চুপ করে থাকলেন।জেনি উত্তর পেয়ে ডায়নিংয়ে গিয়ে একগ্লাস পানি খেলো। তারপর কাছে এসে বলে,

“থানায় চলো।মিসিং ডায়েরি করতে হবে।আব্বুর খোঁজ পেয়েছো?”
“হ্যাঁ সক্কাল সক্কাল ঢাকায় গেছে। ফোনটাও ফেলে গেছে। একটু আগে ফোন করে জানিয়েছে।আর জিয়ানার জন্য টেনশন করতে না করেছে। আমি এদের হাবভাব কিচ্ছু বুঝি না। এত জ্বালা আর সহ্য হয় না।” বলে হাতের ময়লা ন্যাকড়াটা ফ্লোরে ছুড়ে মারলো।
“চিন্তা করার কথা কেউ না করলেই কি সেটা আসা বন্ধ থাকে? জিয়ু কখনোই ইরেস্পন্সিবল না। সাইকেলটাও না নিয়ে কোথায় যেতে পারে। ” জেনি সোফায় গা এলিয়ে বসে বলে উঠলো।
“তোদের আর আজাইরা চিন্তায়ে কামড়াই। অন্যের ঝামেলা জামাই নিতেও পারে বাপু।মাইয়া দুইটাই বড় হইছে দেইখা শুইনা বিয়া দিয়ে দিবি তানা।দামড়ি মাইয়াদের ছাইড়া রাখছে।যেদিন কেলেংকারী করবে সেদিন বুঝবি।এমন মাইয়া হইয়া বন বাদারে ঘুরে ,না জানি কোন আকাম কুকাম করে বেড়ায়। ” অত্যাধিক বিরক্ত হয়ে মর্জিনা বেওয়া বললেন।

“আহ আম্মা এখন তুমি দয়া করে শুরু করো না। এমনিতেই মাথার রগ দপদপ করে জ্বলছে আমার।”
“গরীবের কথা বাসি হইলে ফলে। পরে পস্তাবি খুউব।”
“শুনো আম্মা আমাদের ভাগ্যের একটা খারাপ দিক কি জানো?তুমি হাজারটা ভালো কথা বলো ফলবে না একটাও।কিন্তু খারাপ কথা ফলে যায় দ্রুত ।”
পরক্ষণেই জিয়াউল হন্তদন্ত হয়ে প্রবেশ করে জেনিকে জিজ্ঞেস করলো ,
“কতক্ষণ থেকে জিয়ানা নিখোঁজ? ”
“১১টা থেকে আব্বু।”
জিয়াউল ঘড়ি দেখে হিসেব করলো। এখন বাজে বিকেল ৫টা। তারমানে ৬ঘন্টা থেকে হদিস নেই। উনি আর দাঁড়ালেন না। যেমন ভাবে এসেছিলো সেভাবেই বের হয়ে গেলো।

কলাতলি বাজারে এসে নিবিড় বাইক থামালো।ফোন বের করে আশেপাশে হেঁটে হেঁটে সব দেখতে লাগলো।কাচাবাজারের একপাশে একটা কালো হাইস গাড়ি দাঁড়ানো দেখলো।কিন্তু গাড়ির ভেতর কেউ নেই।রাস্তাটা বেশ চিপা।গাড়ি রাখার জন্য অন্য গাড়ি পাস করতে বহু প্যারা খেতে হচ্ছে।
মেইন রোডে একটা বড় পিকাপ ভ্যান দাঁড়ানো দেখে সেদিকে গেলো নিবিড়।
পিকাপে বসা হেল্পার আর ড্রাইভারকে দুইটা বড় নোট দিয়ে বলে,
“হাইসের পেছনে ইচ্ছা মতো ধাক্কা দিবি।যেনো থেতলে যায়। ”
ড্রাইভার কথা মতো সেটাই করলো কিছুক্ষণের মাঝেই সেখানে একটা ঝটলা ভেজে গেলো। আর মাইক্রোর গাড়ির ড্রাইভার এসেই পিকাপের গাড়ির ড্রাইভারকে মারতে লাগলো।এদিকে ড্রাইভার তল থেকে নিবিড়কে খোঁজতে শুরু করেছে।বলল,সমস্যা নাই। সে বাঁচাবে। এখন তাকে বাঘের গুহায় রেখে বান্দা লা পাতা।
সবাই মিলে ড্রাইভারকে ছাড়িয়ে দিলো।জরিমানা হিসেবে পিকাপের ড্রাইভারের পকেট থেকে সেই দুই হাজার টাকা দিয়ে ছেড়ে দিলো।

এই জন্যই বলে টাকার লোভ বড় লোভ।টাকা তো পেলোই না সাথে বোনাস হিসেবে গণপিটুনি ফ্রি।
মাইক্রোর ড্রাইভারকে নিবিড় ফলো করতে শুরু করলো। তকে অন্য একজন একটা প্যাকেট দিলো। সেটা নিয়ে কয়েকটা চিপা গলি পাড় হয়ে হাটতে হাটতে একটা ফাকা জায়গা বের হলো।এইবার সেই ড্রাইভার তাকিবুকি করে চারপাশে নজর ঘুরিয়ে দেখে নিলো। তারপর ঝোপের মতো একটা জায়গায় পাশে একটা ডোবা সেটার ধার ঘেঁষে কয়েক কদম পড় হয়েই ছোট একচালা টিনের ছাপড়া নজরে এলো।দশ হাত দূর থেকেও দেখা যায় না ঘরটা। জঙ্গলী লতাপাতায় ঢেকে রেখেছে এমন।
লোকটা টিনের দরজায় দুইটা টোকা দিলো তাতে অল্প
একটু খোলে গেলো। হাতের সেই ব্যাগটা অল্প ফাঁকা দরজা দিয়ে ঢুকিয়ে দিয়ে ব্যাক করলো।নিবিড় জঙ্গলের আড়ালে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে।

ড্রাইভার যাওয়ার পর শব্দহীন পায়ে ধীরগতিতে সেই ঘরের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো।ভেতর থেকে শুনতে পেলো সেই পরিচিত খিলখিল শব্দের হাসি। আর কারো নাক দিয়ে গোঙানির শব্দ।নিবিড়ের হাত মুঠো করে ফেললো।ঘৃণায় বমি চলে এলো। পা বাড়ালো ফিরে আসবে। তারপর মনে হলো সবসময় কানে না দেখে চোখেও দেখা উচিত। কোমড়ে গুজা রিভালবারটা টেনে লোড করে নিয়ে ,ট্রিগারে আঙুল রেখে এগিয়ে গেলো আবার।
টিনের দরজায় দুই টোকা দিলো তখনকার মতো।একইভাবে এখন আর কোন ফাঁকা হলো না।নিবিড় নিজেই হাত দিয়ে টেনে দরজা খুলে আগে রিভালবার ঢুকিয়ে সম্পুর্ণ ভেতরে ঢুকে গেলো।

নিবিড়ের মুখ কয়েক ইঞ্চি হা হয়ে গেছে।হতবিহ্বল , হতাবাক , স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
“হাই কাবলিওয়ালা। ” বলে চমৎকার একটা হাঁসি দিয়ে পিজ্জায় কামড় বসালো জিয়ানা।
রুমে তিনজন ব্যাক্তি বিছানার চাদর দিয়ে একসাথে বাঁধা। টুকরা চাদরের অংশ দিয়ে মুখও বাঁধা। প্রত্যেকেই ইচ্ছা মতো পেদানো হয়েছে চেহারা দেখেই বুঝা যাচ্ছে।এরমাঝে একজন নিগ্রোও আছে।আর জিয়ানা কালো অভার সাইজ হুডি আর কার্গো প্যান্ট পড়ে এক পা খাটে ভাজ করা আরেক পা মাটিতে রেখে কাঠের খালি চৌকিতে বসে পিজ্জা আর বার্গার খাচ্ছে।রিভালবার আবার কোমড়ে গুজে খাটের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো।
নিবিড়ের দিকে একটা স্লাইস বাড়িয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলো ,

“খাবেন? ডমিনোজ স্পেশাল বার্বিকিউ পিজ্জা ইউথ এক্সট্রা চিজ।এটা খাওয়ার জন্য একঘন্টা থেকে বসে ছিলাম।আর এই তিনটাকে কেল্লাচ্ছিলাম।খালি খালি বসে থাকতে আমার ভালো লাগে না। ”
নিবিড় হাঁসবে না রাগবে বুঝে উঠতে পারলো না।এমন ভুলাবালা চেহারার একটা মেয়ে ,অদ্ভুত তার সব আচার আচরণ। মাঝেমধ্যে তার মতো শক্ত মানুষও খাবি খায়। না আছে কোন অস্বস্তি ,না ভয় ডর। নাক দিয়ে বড় করে একটা শ্বাস নিয়ে আস্তে করে সামনে গিয়ে বসে জিজ্ঞেস করলো
“কি ধাতু দিয়ে তৈরি তুমি? কিডন্যাপারের আস্তানায় বসে তাদের দিয়ে পিজ্জা আনিয়ে পিকনিক করছো? একটুও ভয় লাগে না?”
জিয়ানা একটু অবাক হয়েও হলো না।সুখনীল নিবিড় শান্ত মেজাজে তার সাথে কথা বলছে। এটাও হয় বাহ।খেতে খেতে উত্তর দিলো ,

“অষ্টধাতু। ভয়ের কি আছে। যখন মরবো তখন দেখা যাবে। কাল মরবো বলে আজ খাওয়া নাওয়া বাদ দিয়ে শোক পালন করবো? আর আমি আবার অত খারাপ না খাওয়ার জন্য এদের সেধেছি।জিজ্ঞেস করুন!”
“কে আছে এর পেছনে?তোমার মতো পাগলের সাথে কার শত্রুতা? ” জিয়ানার ঠোঁটের কোনা থেকে পিজ্জার চিজ তর্জনী আঙুল দিয়ে মুছে জিজ্ঞেস করলো নিবিড়।
জিয়ানা হালকা বিষম খেলো।এই লোক কি মাতাল হয়ে এখানে এসেছে নাকি? একবার ভাবলো জিজ্ঞেস করবে ,শুকনা বা ভেজা খেয়ে এসেছে।তারপর ভাবলো না থাক বাঘের খাঁচায় বসে নতুন করে সিংহের সাথে জড়ানো ঠিক হবে না।

“আপনি কিভাবে জানলেন আমি এখানে? আমি তো ভেবেছি আপনিই।”
বলে সাল্লু গুন্ডার মুখ থেকে কাপড় সরিয়ে পেট বরাবর একটা লাত্থি দিয়ে বলে
“সাল্লু ভাই বলেন তো কে আমাকে কিডন্যাপের জন্য আপনাদের হায়ার করেছে?”
সাল্লু গুন্ডা নিবিড় দিকে তাকিয়ে ফোলা গাল নিয়ে আস্তে করে বলে
“সমুদ্র ভাই।”
জিয়ানা আর একটা লাত্থি দিয়ে বলে ,
“ওই তোরে গুতায়ে গুতায়ে কথা বের করা লাগবে ? সব বল।”
“সমুদ্র ভাই সন্ধ্যা পর্যন্ত আমাদের দ্বায়িত্ব দিছে। একটু পরে আইসা এরে নিয়ে যাইতো। আয়ায়া মাগো। ” জিয়ানা পায়ের পাড়া দিয়ে দাঁড়িয়ে বলে ,
“এরে কি? বল ম্যাডাম। ”
“ম্যাডাম ,ম্যাডাম। ”

আরেক পিস পিজ্জা মুখে কামড় দিয়ে নিগ্রোটাকে একটা কিক দিলো। বের হবে আবার গিয়ে আরেকটা কিক দিলো মধ্যবয়সী গুন্ডাটাকে। কাকিয়ে উঠলো লোকটা।
আরেক পিস পিজ্জা নিয়ে সাল্লুর মুখে সম্পুর্ণ পুরে দিয়ে বলে
“সাহায্য করার জন্য শুকরিয়া। মনে রাখবো
দরজার দিকে আসার সময় সাল্লু জিজ্ঞেস করে ,
“ম্যাডাম আমার চেহারা কি সত্যি সালমান খানের মতো?”

নীতিহীন রাজ পর্ব ১২

অরুণের বিদায়ের সময় হয়ে এলো। সন্ধ্যা হতে বেশি দেরি নেই। কখন অন্য বাহিনী চলে আসে ঠিক নেই।তাই জিয়ানা উত্তর না দিয়ে বের হয়ে আসে। কিন্তু নিবিড় কাছে গিয়ে বলে,
“জঙ্গলী দাঁত ওয়ালা শু*য়রের মতো তোর চেহারা।”

নীতিহীন রাজ পর্ব ১৪