নীতিহীন রাজ বোনাস পর্ব
আশিকা আক্তার সোহাগী
“কিছু পুরুষের মস্তিষ্ক তার মাথায় থাকে না।থাকে অণ্ডকোষে ” এই ক্যাপশন দিয়ে মেহুল খান নামের আইডি দিয়ে একটা ভিডিও পোস্ট করা হয়েছে।সেখানে দেখা যাচ্ছে দৈনিক বার্তা নামের পত্রিকা অফিসের প্রধান সম্পাদক রেজা খানের এক কুৎসিত চরিত্র।রেজা খান তার সামনে বসা মেয়েটাকে সরাসরি সম্ভোগের প্রস্তাব দিচ্ছে।
মক্কু নিবিড়কে ভিডিওটা দেখালো।তারা সাভারের ডেমরা থানার ভেতরে একটা গ্রামে এসেছিল এক অসহায় পরিবারকে সাহায্য করতে।ভিডিওটা দেখে নিবিড় ফটাফট কাজ শেষ করে বাইকে গিয়ে বসে।এখন একমাত্র লক্ষ্য সরাসরি দৈনিক বার্তা অফিসে পৌঁছানো।এই আইডির মালিক জিয়ানা।জিয়ানার গোপন ভিডিও করার সিস্টেম নিবিড়ের জানা।তার মানে জিয়ানকেই এই কুপ্রস্তাবটা দিয়েছে।দাঁতে দাঁত চেপে বাইকের স্পিড বাড়ায় নিবিড়।
মক্কু খিচে বসে আছে নিবিড়ের পেছেনে।খুবই সাহস নিয়ে নিবিড়ের কানের কাছে এসে বলল,
‘ভাই আমার তিনটা বাচ্চা এতিম হয়ে যাবে।স্প্রিড একটু কমানো যায় না?’
স্পিড কমবে কী আরও ফুল হলো।বাজার পাড় হওয়ার সময় চায়ের দোকানের মুরব্বিদের মধ্যে একজন বলল,
‘হালার পুত আইজ মরবে।’
বাকিরা মাথা ঝাকিয়ে সহমত হয়।
একঘণ্টারর রাস্তা পাড় হলো মাত্র বিশ মিনিটে।এসেই রিসিপশন থেকে জানতে পারলো রেজা খান গুরুতর অসুস্থ হয়ে নিকটস্থ হাসপাতালে ভর্তি।পত্রিকা অফিস থেকে সাথে সাথেই বের হয়ে হাসপাতালে আইসিইউর সামনে সটান দাঁড়িয়ে থেকে মুমূর্ষু রেজা খানের দিকে তাকিয়ে আছে নিবিড়।
পেছন থেকে মক্কু জিজ্ঞেস করল ,
‘ভাই ঘটনা কি?নাটক করে হুদাই হাসপাতালে ভর্তি হয়ে আছে নাতো? অক্সিজেন টক্সিজেন কিছুই লাগানো নাই।এইডা আবার কেমন আইসিইউ?’
নিবিড় মুচকি হেসে হাসপাতাল থেকে বাহিরে আসতে আসতে বলে,
‘মাথার জিনিস যদি মাথায় না থেকে অন্য কোথাও থাকে ,তবে সেখান থেকে কিভাবে সেটাকে অপসারণ করা লাগে জিয়ানা সেটা খুব ভালো করেই জানে।’
‘ভাই কিছু বুঝি নাই।আমি আপনাদের মতো অত বুদ্ধিমান না।আমি শুধু মান।’
নিবিড় আর কথা না বলে উঠে বসে বাইকে।যেতে যেতে ব্লুটুথ কানেক্ট করে ফোন দেয় জিয়ানার ফোনে।জানে জীবনেও তাকে ফোনে পাওয়া যাবে না।ফোনটা শুধু নিবিড়ের সাথে বদমায়েশি করার জন্য ব্যবহার করে।
গতকাল রাতের ঘটনা।জিয়ানার টিম ঢাকার একটা নামিদামি ল্যান্ড কোম্পানির জমির প্লট নিয়ে যাবতীয় দুনম্বরি কারবার রিপোর্ট করেছে। এমন কি অধিকাংশ জমি জোরজবরদস্তি করে দখল করা।একই প্লট চার পাঁচ জনের কাছে বিক্রি করেছে এমন প্লটের অভাব নেই।শত শত মানুষ নিজের শেষ সম্বল দিয়ে একটা প্লট কিনেছে।কিন্তু জমি হস্তান্তর করতে পারছে না।সেসব প্লটের নাম্বার থেকে রেজিষ্ট্রেশন কার কার নামে হয়েছে সব নিয়ে এমন গুরুত্বপূর্ণ একটা ডকুমেন্টস জিয়ানা রেজা খানের কাছে এনেছে।নিবিড়ের সাথে থেকে জিয়ানাও এখন পাকা ঘুঘু। প্রতিটা প্রজেক্ট থেকে ডকুমেন্টস সে সব সময় সিক্রেট ক্যামেরায় ধারণ করে রাখে।
বিশেষ করে রেজা খানের কাছে আসলে সে আরও সাবধান হয়ে আসে।এমনকি যখন কোন শক্তিশালী এভিডেন্স জমা দিবে তখন সরাসরি মেইন ডোর দিয়ে জিয়ানা আসে না।আসে বিল্ডিং বেয়ে জানালা দিয়ে।কারণ প্রতিটা অফিসেই স্পাই আছে।কোন রিপোর্টার কোন নিউজ বা রিপোর্ট কভার করেছে সেটাও একটা থ্রেট।আজও জিয়ানা জানলা দিয়ে এসেছে।রেজা খান জিয়ানার কাজ কর্ম বেশিরভাগ সময় ধরতে পারে না।জিয়ানার এই ট্রিকস শিখিয়েছে নিবিড়।নিবিড়কে জিয়ানা ইদানীং ওস্তাদ ডাকে।জিয়ানা আর নিবিড়ের মজার ঘটনায় পরে আসছি।
তো রেজা খান লোকটা সৎ ,টাকার কাছে বিক্রি হয় না।তবে প্রচন্ড মেয়েবাজ।মেয়ে দেখলেই চুলবুল করে উঠে তার অঙ্গ পতঙ্গ।
একবার অফিসের ডে লং ট্রিপে জিয়ানাকে ডেকে বলেছিল,
‘জিয়ানা আপনি কী জানেন সব সময় বোরিং ড্রেসে দেখতে ভালো লাগে না।মাঝেমধ্যে ইচ্ছা হয় একটা শাড়ি কিংবা হট কোন ড্রেস যেমন বিকিনিতে দেখতে।ইচ্ছাটা পূরণ করা যায় না?’
‘আলবাত করা যায় স্যার।কেন যাবে না?আমি ওয়ান টু কা ফোর করেই আপনার ইচ্ছা পূরণ করে দিতে পারি।এর আগে লাগবে দুইটা কমলা লেবু।আর একটা সুইমিং স্যুট।’
রেজা খানের খোমা চকচক করে উঠে বলে,
‘আই নো ইট।আপনি যে প্রচন্ড বোল্ড একজন মেয়ে দেখেই বুঝা যায়।’
‘বুঝা যায় তাই না? ‘
‘কিভাবে কখন ইচ্ছাটা পূরণ করবেন তবে?’
‘আজই করছি স্যার।’
‘মাই গড। আপনি দেখি সুপার ফাস্ট? আমি তো নিশ্বাস নিতে ভুলে যাচ্ছি।’
এরপর জিয়ানা সত্যি সত্যি লোকটার নিশ্বাস বন্ধ করার যোগাড় করে ফেলেছিল। রিসোর্টের এক পেট মোটা স্টাফকে বিকিনি পড়িয়ে রেজা খানের সামনে হাজির করে।রেজা খানের চোখ কোটর থেকে বের হওয়ার যোগার হয়েছিল।জিয়ানাকে কাশতে কাশতে বলেছিল,
‘এটা কি?’
‘স্যার আপনি না বললে ,সব সময় বোরিং ড্রেস আপনার ভালো লাগে না।’
‘হ্যাঁ সেটা আপনাকে বলেছি।’
‘ওহো আপনি তো আমার নাম কিংবা বলেন নাই আপনাকে। তাছাড়া বোরিং ড্রেস বলতে আমি ইউনিফর্মকেই বুঝতাম।’
রেজা খান হাতের ইশারায় সরে যেতে বলে। চেয়ারে ঠেস দিয়ে চোখ বন্ধ করার সাথে সাথেই লোমশ অর্ধবয়স্ক কালো ভুড়িওয়ালা গার্ডের বিচ্ছিরি চেহারা ভেসে উঠে। সাদা ব্রাসিয়ারের নিচে কমলা রঙের দুইটা মাল্টা উঁকিঝুঁকি দিচ্ছিল।কি জঘন্য দৃশ্য।সাথে সাথেই মাথা ঝাকিয়ে দাঁড়িয়ে যায় রেজা খান।আর প্রতিজ্ঞা করে এই মেয়েকে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ধরে কথা বলতে হবে।তা না হলে এমন গজব বেজ্জতি হওয়ার সমুহ সম্ভাবনা আছে।
এবারও যখন জিয়ানা গুরুত্বপূর্ণ কথায় ব্যাস্ত লোকটার চোখ তখন জিয়ানাকে মেপে নিচ্ছে।এত বিরক্ত হচ্ছিল জিয়ানা। ফটাফট সিদ্ধান্ত চেঞ্জ করে ফেলে সে।এই লোকের আজ চূড়ান্ত শিক্ষা দিবে।তাই জিয়ানা সরাসরি জিজ্ঞেস করে ,
‘স্যার আপনার কি আমাকে খুব ভালো লাগে? ‘
রেজা কিছুটা হকচকিয়ে গেলেও বলল,
‘এত দিনে বুঝলে? আমি যে তোমাকে আমার কাছে পেতে চাই। একেবারে কাছে।’
‘আমি কি এখন আপনার কাছে যাবো?’
‘কত কাছে? আমি তো অনেক কাছে চাই। ‘
এরপর খুব বাঁজে একটা কথা বলে।জিয়ানা সবটা হজম করে জিজ্ঞেস করে ,
‘আমি একদম কাছে যেতে পারি স্যার।এর আগে একটু এক্সারসাইজ করে নেই চলুন।ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ। এতে কাছাকাছি আসা যায় দ্রুত।’
‘আমার যে এক্সারসাইজে অভ্যাস নেই?’
লোভে জিহ্ব লোকটার মনে হচ্ছে বের হয়ে আসবে।জিয়ানা দাঁড়িয়ে বলল,
‘আমাকে ফলো করুন স্যার।হয়ে যাবে।’
ব্যাগটা আবার পিঠে জড়িয়ে পেটে ব্লেট আটকে ছোট ছোট জাম্পিং শুরু করলো। রেজা খান যেন কপি ক্যাট। সেও উৎফুল্ল হয়ে জিয়ানাকে অনুসরণ শুরু করল।জিয়ানা এরপর সাবধান ,আরামে দাঁড়া এসেম্বলি শুরু করে। রেজা খানও তাই করে।সাবধানের পর দ্বিতীয়বার যখন আরামে দাঁড়া বলল ,রেজা খান দুই পা ফাঁক করে হাত পেছনে নিয়ে দাঁড়িয়ে গেল।আর জিয়ানা নিজের বাম পা সামনে এগিয়ে ডান পা পেসার শোয়েব আখতারের বলের গতির মতো ঘণ্টায় ১৬১ কিলোমিটার বেগে বসিয়ে দিল রেজা খানের দুই পায়ের ফাঁকে।
রেজা খান কি জানতো এই আরামে দাঁড়ানোই তার জীবনের শেষ আরামে দাঁড়ানো? লোকটা চোখ উল্টে সাথে সাথেই লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। আর জিয়ানা যেভাবে জানালা দিয়ে এসেছিল সেভাবেই বের হয়ে যায়।
ওয়ার্কিং ওমেনদের ওয়ার্ক প্লেসে হ্যারাসমেন্ট নতুন না।প্রতিটা সভ্য দেশ থেকে শুরু করে অসভ্য দেশে নারীদের জন্য জব করা একটা চ্যালেঞ্জিং। উপমহাদেশে এই সমস্যা আরও বিকট।সরাসরি বুলিংয়ের শিকার না হলেও অনেকেই খুব বাজে অভিজ্ঞতার মাঝে দিয়ে যায়।সাধারণত কোন নারীর প্রমোশন কিংবা অফিসে ভালো পজিশনে থাকলে তাকে নিয়ে টিটকিরি করে বলা হয়,’বসের রুমে যত সময় দেয়া যায় ততই প্রমোশন।’ এখানে মেধা শ্রমের চেয়ে নারীর শরীরকেই যেন বেশি প্রমোট করে থাকে সহকর্মীরা।কতজন পারে জিয়ানা হতে? তবে সবারই অল্প স্বল্প জিয়ানা হওয়া উচিত।
মধ্যাহ্নের স্তব্ধ রুক্ষ প্রকৃতির মাঝেও সতেজ মন নিয়ে নিবিড় বাড়ি ফিরে। নূর ম্যানসনের গেটে এসে দেখে দশ বারোজন রিপোর্টার দাঁড়িয়ে আছে। এদের দেখে সতেজ মনটা নিম খাওয়াই পরিনত হল যেন।
বিরক্তিকর একই প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে নিবিড়ের হালুয়া টাইট হয়ে গেছে।তবুও এরা পিছু ছাড়ে না।শার্প চেহারা আরও শার্প করে শক্ত মুখে এগিয়ে যায় বাইক নিয়ে।মাঠের মাঝামাঝি যেতেই সবাই ঘিরে ধরল তাকে।দুইজন গার্ড দ্রুত এগিয়ে একজন বাইক নিয়ে গেল।আরেকজন রি্পোর্টারদের সরানোর বৃথা চেষ্টা করছে।
ভীড়ের মাঝে ঠেলা ধাক্কা করেই কালো করে লম্বা একটা অল্প চুলের রিপোর্টার নিজের রেকর্ডার এগিয়ে দিয়ে প্রশ্ন করে ,
‘আপনি যদি স্বতন্ত্র ভাবে নির্বাচিত না হোন তবে নিজের মাঝে কি কি পরিবর্তন আনতে চান বা অটোম্যাটিক পরিবর্তন আসবে?’
‘পরিবর্তন যদি কিছু আসেই তবে সাধারণ জনগণের আসবে।আমি যেমন আছি তেমনই থাকবো।’
অভ্যাসগত ভাবে লায়ন কন্ঠে কাটকাট জবাব দেয় নিবিড়।
‘মানে?’
‘মানে বেষ্ট রেখে যারা সেকেন্ড বেষ্ট বেছে নিবে দুর্ভাগ্য তো তাদের। ‘
‘স্যার মামুন ইসলামকে নিয়ে নানা গুঞ্জন এখনো চলে মিডিয়া পাড়ায়।কেউ কেউ বলে উনি সুইসাইড এটেমড করেছিলেন।এই ভাবে আপনি যদি ক্লিয়ারলি কিছু বলতেন?’
অন্য আরেকজন রিপোর্টার প্রশ্ন করল।
‘আমি আগেও বলেছি।আমার পরিবার খুব কঠিন এক ট্রমার মাঝে দিয়ে গিয়েছে।সেই ট্রমায় ভেতরে ভেতরে কে কতটুকু ভেঙেছে আমরা কাছে থাকার পরেও বুঝতে পারিনি।উনি মারাত্মক কাজ পাগল লোক ছিলেন।কাজের মাধ্যমে নিজেকে ডুবিয়ে রেখে সেই ট্রমার সাথে লড়াই করতেন।শেষ ছয় মাস এতটাই কাজে বিভোর হয়ে ছিলেন যে শরীরের দিকে একদম খেয়াল করেননি।মারাত্মক স্ট্রেস থেকে উনার ব্রেইন স্টোক হয়।’
নিবিড়ের ঘাড়ে পেছন থেকে টেপ করল কেউ।নিবিড় ঘাড় ফিরিয়ে দেখে ,ঢোলা একটা কালো পাজামা সেট পড়ে চুল টেনে উপরে খোপা করে আড়মোড়া ভাঙছে জিয়ানা।নিবিড়কে বলল,
‘আপনি ভেতরে গিয়ে রেষ্ট করুন। আমি এদের কিচাইন শুনছি।’
নিবিড় ভেতরে যেতে নিয়েও দাঁড়িয়ে গেল। জিয়ানা সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলল,
‘দেশে কি খুন ,লুটপাট,দূর্নীতির অভাব নাকি আপনাদের মিথ্যের ফুলঝুরির আকাল পড়েছে? আমার হাজবেন্ডের পেছনে পড়ে আছেন কেন? নাকি ফুটেজ খাওয়া ধান্দা এ্যা?সুখনীল নিবিড় যেটাই বলে সেটাই রিলে হয়ে যায় দেখে দিনরাত উনার পেছনে পড়ে আছেন?ওয়েট আ মিনিট আপনারা গে টে নন তো?’
উপস্থিত সাংবাদিক নামের সাংঘাতিক পাবলিক গুলো হকচকিয়ে গেল।একজন নারী রিপোর্টার প্রশ্ন করল,
‘ম্যাম আপনিও তো একজন জার্নালিস্ট। আপনার তো আমাদের পরিস্থিতি বুঝা উচিত?’
‘হ্যাঁ বুঝি বলেই তো বললাম।নিউজের জন্য আমি কি আপনার হাজবেন্ডের পেছনে ঘুরি? ‘
‘আমার হাজবেন্ড তো আর সুখনীল নিবিড় না?’
মেয়েটার মুখটা হঠাৎ কেমন পিংকিস ভাব এসেছে জিয়ানা খেয়াল করল।চোখ ছোট ছোট করে ভাবলো,
‘হিরোকাট জামাই নিয়ে এই এক জ্বালা।সব শাকচুন্নিদের নজর লাগে।নাহ আজ সুখকে বলতেই হবে এই টাইপ নায়কের চেহারা পাল্টাতে হবে।এত মাঞ্জা মাইরা ঘুরাফেরা নট এলাও।’
মনের কথা সাইডে রেখে বলল,
‘আপনার হাজবেন্ড সুখনীল নিবিড় কিভাবে হবে? আপনি কি জিয়ানা হক? তাছাড়া আমি কোন ব্যাক্তির পেছেনে ঘুরে তার মুখের কথায় রিপোর্ট করি না।আমি তথ্য আর প্রমাণের প্রেক্ষিতে নিউজ মেইক করি।’
‘সত্যি ম্যাম আপনি রাতারাতি অনেক নাম কামিয়েছেন।আপনার মতো সাহস আসলে খুব কম জার্নালিস্টের থাকে।ম্যাম আপনার অফিসের প্রধান প্রকাশকের স্ক্যান্ডাল সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন?’
‘কী স্ক্যান্ডাল বলুন তো? আমি আজ ছুটিতে আছি তো।নিউজ দেখা হয়নি।বাই দ্যা সড়ক ,আপনি কি নতুন বিয়ে করেছেন নাকি?’
‘কিভাবে বুঝলেন ম্যাম?’
‘পুরুষ মানুষ দুইবার স্নো পাউডার মাখে।এক ,নতুন বিয়ে করলে ,দুই পরকিয়া করলে।যেহেতু আপনি ইয়াং সেহেতু পরকিয়া পর্যন্ত যান নাই।তাই গেইজ করেছি।’
নিবিড় কিছুটা দূর থেকে হাক ছাড়ল ,
‘জিয়ানা কাম ইন সাইড।’
‘যাই হ্যাঁ? পতি পরমেশ্বর। উনার কথা না শুনলে বিপদ।আল্লাহ হাফেজ।’
বলে দৌঁড়ে নিবিড়ের পাশে হাটতে হাটতে বলে,
‘এই আপনার এইসব মাঞ্জা মারা বন্ধ করবেন কবে?বিয়াইত্তা বেডার এত কিসের সাজগোছ? হ্যাঁ? মাথায় জেলের পরিবর্তে নারকেল আর এত ব্র্যান্ড ফ্যান্ড জামা কাপড়ের পরিবর্তে গুলিস্তান। কবে না জানি আমি আপনার মুখে এসিড ছুড়ে মারি।’
নিবিড় বাঁকা হেসে জিজ্ঞেস করে ,
‘রেজা খানকে কী করেছ?’
‘ডিম ফাটিয়ে দিয়েছে।বুইড়া খাটাশ ব্যাটার জন্মের মতো শিক্ষা দিয়েছি।’
‘ভালো করেছ তানাহলে আজ তার মাথাটা শরীর থেকে আলাদা করে দিতাম।’
‘ওহো আমার বেলা ষোল আনা।আর আপনার বেলা? ওইসব শাকচুন্নিদের চোখ যদি আমি উপড়ে ফেলি তবে?’
নিবিড় জিয়ানার গাল টেনে আড়চোখে চায়।তার বউ ইদানীং মারাত্মক জেলাস হয়।জেলাসে যখন রেগে গাল গুলা লাল হয়ে উঠে তখন নিবিড়ের প্রচন্ড প্রেম পায়।এখনও পাচ্ছে। তাই আলতো করে গালটা টেনে ধরে।জিয়ানা হাত ঝটকায় সরিয়ে নিবিরের বাহুতে পাঞ্চ করে বলে,
‘আপনাকে আমি চান্দি করে দিব সুখ।প্রচন্ড মেজাজ খারাপ আছে কিন্তু?’
নিবিড় কথা বাড়ায় না।হাত ধরে ঢুকে যায় নূর ম্যানসনে।
সদর দরজায় পা দিয়েই জিয়ানা দেখে ফাইজা নিজ স্বামীর পাশে বসে আছে।কাল রাতে বেড়াতে এসেছে এই চলতি ফিরতি বাদ্যযন্ত্র কম ন্যাকাযন্ত্র বেশি।ফাইজা হা করে নিবিড়কে দেখছে।জিয়ানা বিড়বিড় করে বলল,
‘ওয়ান্স আ ভেটকি লোচন অলয়েজ ভেটকি লোচন। লুচু ছেরি কোনহানকার।’
জিয়ানার বিড়বিড় করা দেখে মেহেদী সোফা থেকে ডেকে বলল,
‘এই যে ক্ষীণচন্দ্র? কাকে গালিগালাজ করছেন? ‘
‘ক্ষীণচন্দ্র?’
জিয়ানা ভ্রু কুচকে প্রশ্ন করে। নিবিড় এগিয়ে গিয়ে জিয়ানার হাত ধরে দ্রুত রুমের দিকে যেতে নেয়।এই দুইজনের এখনই বিতর্ক প্রতিযোগিতায় শুরু হবে নিবিড় জানে।তাই দ্রুত প্রস্থানের চেষ্টা করে সে।কিন্তু জিয়ানা ছেড়ে দেয়ার পাত্রী না।তাকে ক্ষয় হয়ে যাওয়া চাঁদ বলবে আর সে ছেড়ে দিবে? উমহু বিলকুল নেহি।মেহেদীর দিকে তেড়ে যেতে নিলে নিবিড় দুইহাত দিয়ে জিয়ানার পেট আকড়ে ধরে হাটা ধরল রুমের দিকে।জিয়ানা মোচড়ামুচড়ি করতে করতে বলা শুরু করল,
‘দেখুন গরুবেষক? আপনার গরুমি গরুবেষণায় কাজে লাগাবেন।আমার পেছনে লাগতে আসলে ভালো হবে না বলে দিলাম?’
‘আহা জিয়ানা। ক্ষীণচন্দ্র মানে তোমাকে অল্পবয়সী চাঁদ বলেছে।রাগের কি হল?’
বলে রাফিন মেহেদীর মাথায় গাট্টি দিয়ে সিঙ্গেল সোফায় বসে।নিবিড় মুচকি হেসে বলে,
‘এবার চলো।’
মেহেদী বাঁকা হেসে বলে,
‘দেখ নিবিড় তোর বউ কথায় কথায় কিন্তু আমাকে অপমান করে।ভালো হবে না বলে দিলাম?’
‘তোরা দুইজনই সমান।আমাকে এর মাঝে টানিস কেন?’
বলে নিবিড় জিয়ানাকে আরও শক্ত করে ধরে।জিয়ানা আর মেহেদী দুইজনই গর্জে উঠে বলে ,
‘সুখ। নিবিড়। ‘বলে।
নূর ম্যানসনে বাচ্চারা কি তালাতালি করবে? জিয়ানা আর মেহেদীর ঠোকাঠুকি লেগেই থাকে।এদের ঝগড়া দেখেই কাটে সারাবেলা।
দুপুরে খাওয়ার পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জিয়ানা আর নিবিড় কাজ করেছে নিজেদের কক্ষে।জিয়ানার ল্যান্ড কোম্পানির ডকুমেন্টস আর কোন নিউজে পাবলিশ হবে না।নিবিড় বলল,
‘পাবলিস হলেও ল্যান্ড কোম্পানির বিশেষ কোন ক্ষতি কিংবা ক্ষতিগ্রস্তদের কোন লাভ হবে না।দুই একজন উকিলের পকেট ভারি হবে শুধু। দুই একটা মামলা হবে কিছু টাকা দিয়ে সেই সব মামলা এক চুটকিতেই মিমাংসাও হয়ে যাবে।’
জিয়ানা সাথে সাথেই এক চুটকি বাজিয়ে বলে,
‘আমিও এক চুটকিতে আইডিয়া পেয়ে গেছি।এই ডকুমেন্টস দিয়ে যদি ব্ল্যাক মেইল করে ওদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা আর কিছু জমি হাতিয়ে নেয়া যায়।তবে কেমন হবে?’
‘খালি দুনম্বরি বুদ্ধি না?’
মাথায় টোকা দিয়ে বলল নিবিড়।জিয়ানা টোকা দেয়ার স্থানে ঘষে বলে,
‘আহা টাকাটা যারা ঠকে গেছে তাদের দিলাম।আর জমিটা কোন অর্ফানে দান করে দিলাম।’
‘ওদের হাত অনেক লম্বা।তোমাকে খুঁজে বের করতে কয়েক ঘন্টাও লাগবে না।’
‘নো ব্রো নো।সমাধান এই বাড়িতেই আছে।আপনাদের বেইজমেন্টের কথা ভুলে গেছেন? সেখানে যে অবৈধ শক্তিশালী স্পেক্ট্রাম বসানো আছে। মোবাইল সহ যাবতীয় নেটওয়ার্ক আর সেলুলার ডেটা বন্ধ করে দেয়।আমি সেখানে বসে যদি তাদের মেইল করি তবে কি আমাকে ট্রেক কিংবা আইডেন্টিফাই করতে পারবে?’
‘নেট বন্ধ করলে তুমি সেন্ড করবে কীভাবে?’
‘তাই তো কীভাবে বলুন তো?’জিয়ানা হতাশ হয়ে প্রশ্ন করে।
‘একশোটা চুমু দিলে বলব।’
বলে নিবিড় বিছানায় শুয়ে পড়ে।জিয়ানাও পাশে শুয়ে বলে,
‘আমি আপনার স্ত্রী সো আপনার সবকিছুর ফিফটি পার্সেন্ট আমারও।তাই আপনার বুদ্ধির হাফ আমার। এখন হাফ সমাধান বলেন।বাকিটা আমি বুঝে নিব।’
‘দুঃখিত।’
‘সুখ?’
‘১০০।’
‘সর ব্যাটা।ফালতু বুদ্ধি লাগবে না।আসছে বুদ্ধির জাহাজ আমার।’
আগের নিবিড় হলে রেগে তেড়ে যেত জিয়ানার দিকে কিন্তু এখন তার রাগ জিয়ানার জন্য গায়েব হয়ে গেছে। তুই কেন প্রচন্ড খারাপ ভাষায় গালাগালি দিলেও নিবিড়ের যে জিয়ানার উপর রাগ আসবে না এটা সে নিশ্চিত। মাথার নিচে হাত দিয়ে শান্ত ভাবে বলল,
‘আপনি থেকে সরাসরি তুই?’
জিয়ানা এবার নরম হয়।নিবিড়ের বুকে শুয়ে বলে,
‘বলুন না সুখ? রাতে দিব অনেক গুলা।আমি আপনার মতো হুটহাট রোমাঞ্চের মুড অন করতে পারি না।এখন টেনশনে মাথা কাজ করছে না।আপনার একটু বুদ্ধি ধার দেন না প্লিজ?’
‘সত্যি দিবে তো? গাইগুই করবে নাতো? ‘
‘হুম।’
‘জিসুর কসম?’
‘জিসু কে?’
‘আমাদের মেয়ে?’
‘কোত্থেকে এল?’
‘আসবে।’
‘মেয়েই কেন? ছেলে নয় কেন?’
‘আমাদের প্রথম মেয়েই হবে।’
‘নোপ ছেলে হবে।গর্বিত জিনিস ওয়ালা বাচ্চা।’
‘গর্বিত জিনিস?’
জিয়ানা চোখের ইশারায় নিবিড়কে কিছু একটা দেখায়।নিবিড় জিয়ানাকে নিচে ফেলে চাপা দিয়ে বলে,
‘এত পাজি মেয়ে আমি কোথায় দেখিনি।সত্যি আল্লাহ তোমাকে কি মাটি দিয়ে বানিয়েছে?’
‘মনে হয় আফ্রিকার মাটি দিয়ে কারণ আফ্রিকার মানুষ সবচেয়ে সাহসী। এবার রোলা কোস্টারগিরি বন্ধ করে আমাকে উপায় বলুন?’
নিবিড় সরে গিয়ে বলে,
‘একটা নতুন ফোন লাগবে।যেখানে অনুমতি ব্যাতিত কোন এপস থাকবে না।ফোনের মুড হবে এরোপ্লেন মুড।একটা শক্তিশালী পাসওয়ার্ড থাকতে হবে।গিপিএস অফ থাকবে।সেই ফোন দিয়ে মেইল সেন্ড করে ফোন আজীবনের জন্য বন্ধ করে রাখতে হবে।আর অবশ্যই মেইল এড্রেসটাও নতুন হবে।ব্যাস।’
জিয়ানা শোয়া থেকে উঠে নিবিড়ের গলা জড়িয়ে ধরে চুমু দিতে থাকে।
আবার এসেছেন কাছে? আপনার জন্য আমি প্রেগু হয়ে গেলাম। আপনার অশরীরী বাতাস লেগেছে আমার।এখন আমার কি হবে? আমি তো নিজেই বাচ্চা। বাচ্চা পালবো কিভাবে? তারপর এই গন্ডারের বাচ্চা নিশ্চয় গন্ডারই হবে।জ্বালিয়ে পুড়িয়ে আমাকে খাক করে দিবে।সারাদিন ডুডু খাবো ডুডু খাবো বলবে।
-খেলে খাবে আমার বাচ্চাই তো?
-আমার কাতুকুতু লাগবে।
-এই জন্য বলি অত নড়াচড়া করবে না। সুড়সুড়ি ভেঙে যেতো এতদিনে।
-ফাজলামি করছেন?
-হ্যাঁ।
-একদম ফাজলামি করবেন না। খবরদার?
-করবই।
-মুখে মুখে তর্ক কইরেন নাতো যান ফুটেন।
-তাহলে কিসে কিসে তর্ক করবো?
-আপনি কি স্বপ্ন?
-হ্যাঁ।
-এমন ভণ্ড স্বপ্ন আর দ্বিতীয়টি হয় না।
-আসল ভণ্ডামি এখন শুরু করবো।
বলেই নিবিড় হঠাৎ মানুষ থেকে ষাড়ে পরিনত হল।তেড়ে এলো জিয়ানার দিকে।লাফ দিয়ে জিয়ানা বিছানা থেকে নামে।চোখ ছোট করে তাকায় বিছানায়। অর্ধ নাঙ্গু হয়ে ঘুমিয়ে আছে নিবিড়।এতক্ষণ তবে এই বিচিত্র দৃশ্য সব স্বপ্ন দেখছিল জিয়ানা।নিজেই নিজের মাথায় গাট্টা দেয় জিয়ানা।নিবিড়ের দিকে তাকায় আবার।
নাঙ্গু পাঙ্গু হয়ে ঘুমানোর অভ্যাস এই বদ লোকের।নিজের কিসমিস দেখিয়ে কি শান্তি পায় কে জানে।আজ একটা উচিত শিক্ষা দিবে জিয়ানা।
নেইলপালিশ নিয়ে নিবিড়ের নিপলকে কেন্দ্র করে মনের মাধুরি মিশিয়ে আলপনা আঁকলো।কাজটা করেছে অতি সাবধানে।নিবিড় ঘুমেও খুব এলার্ট থাকে।
দুই একবার নড়াচড়া করে আলপনা ভষ্কিয়ে ফেলেছে নিবিড় ।সে ফেলুক তবুও দেখতে সুন্দর লাগছে।লোমগুলা ডিস্টার্বিং।
সেগুলার জন্য ডিজাইন মন মতো হয়নি।
ফোন বের করে ফটাফট কয়েকটা ছবি ক্যাপচার করে। তবে ক্যামেরার ফ্ল্যাশে নিবিড়ের ঘুম ভেঙে যায়।জিয়ানার হাতে ফোন দেখে নিজের শরীরের দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠে ‘জিয়ানা’ বলে।
জিয়ানা সব ফেলে দৌঁড় শুরু করল দরজার দিকে।
নিবিড় দরজা পর্যন্ত যেয়ে আর যেতে পারে না। রাগে দাঁতে দাঁত ঘষে ওয়াশরুমে ঢুকে যায়।কিন্তু পানিতে কি নেইলপালিশ উঠে? আজ জিয়ানার খবর আছে।
একদৌঁড়ে জিয়ানা করিডোরে মাঝামাঝি চলে আসে।করিডোরের শেষ মাথায় সাদা ধোঁয়া দেখে নিরব পায়ে এগিয়ে যায়।পিলারের আড়ালে লুকিয়ে থাকে কারণ লোকটা মেহেদী। সে ফিসফিসিয়ে কথা বলছে আর সাদা শলাকা টানছে।জিয়ানা বিড়াল পায়ে আর একটু এগিয়ে যায়।এবার স্পষ্ট শুনতে পায়,
‘জেরিন ম্যাম আপনি তো জানেনই আমাদের সেক্টরের বিউটি উইথ ব্রেইন রেয়ার।বাট উই আর ফরচুনেট টু হ্যাভ ইউ। ইউ আর মোষ্ট বিউটিফুল লেডি ইন আওয়ার ইন্সটিটিউট। ‘
জিয়ানা ঘাড় চুলকে তাড়াতাড়ি ফোন বের করে জুম করে মেহেদীর ভিডিও করা শুরু করল।ঘি মাখলেও নাকি কু*ত্তার লেজ সোজা হয় না ,তেমনই এই ব্যাডাও ভালো হবে না।তবে ফারহানার সামনে খুব ভালো হয়ে থাকে ইদানীং। মাসখানেক আগে টুইন বেবি গার্ল হওয়াই মেহেদী এখন বেশ ভদ্র হয়ে চলে। বিশেষ করে কুলসুমের একটা কথায় তার লক্ষণীয় পরিবর্তন নজরে এসেছে।
‘পিতার কৃতকর্মের ফল ভোগ করে তার মেয়েরা।পিতার সকল পাপের কাফফারা দুনিয়েতে তার মেয়েদের জীবনের উপর দিয়ে শোধ করা হয়।’
মেয়ে দুইটাকে চোখে হারায় মেহেদী।সত্যি পুরুষ যতই খারাপ হোক কিন্তু বাবারা কখনই খারাপ হতে পারে না।
হঠাৎ তার মনে হল,আই হাই নেইলপালিশ তো পানি দিয়ে উঠানো যাবে না।সুখ নিশ্চিত ঘষে লাল করে ফেলেছে এতক্ষণে। ফারহানার এই নেইলপালিশ আয়েশা এনেছিল। ফেরত দেয়া হয়নি।আজ কাজে লাগিয়েছে।কিন্তু এই জিনিস তো রিমুভার ছাড়া উঠানো সম্ভব না।তাই মেহেদীর ভিডিও ক্লোজড করে হাটা ধরে ফারহানার রুমের দিকে।যতটুকু ভিডিও হয়েছে ততটুকু দিয়েই কোপকাত করা যাবে।
এত রাতেও ফরহানা জেগে। বেবিদের ফিড করানোর জন্য অধিকাংশ রাত তাকে জেগেই থাকতে হয়।জিয়ানা ঘরে ঢুকে ঘুমন্ত ডিংকে দেখল।সে এই দুইজনের নাম দিয়েছে ডিং আর ডং। ডং তার মাম্মির বিএম খাচ্ছে।ইদানীং জিয়ানার ইচ্ছা হয় নিজের শরীরে নিবিড়ের সন্তান ধারণ করতে।কিন্তু নিজ ইচ্ছাকে চেপে রাখে।তার অনেক কাজ বাকি।এত রিস্কের কাজ সে মা হলে করতে পারবে না।এমনিতেই নিবিড় তার কঠিন পিছুটান হয়ে দাঁড়িয়েছে।নিজ সন্তান হলে নিশ্চিত সেটা আরও প্রবল হবে।দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ফরাহানার কাছ থেকে নেইলপালিশ রিমুভার নিয়ে নিজের রুমে ফিরে।
জিয়ানার ধারণাই সঠিক।ঘষে ঘষে চামড়া উঠানোর যোগাড় করে ফেলেছে নিবিড় ।জিয়ানাকে দেখে দুই ভ্রুর মাঝখানে কঠিন ভাজ করে ফেলে নিবিড়। জিয়ানার কাছে লাগে সেটা ভ্রু না ইন্ডিয়া পাকিস্তানের বর্ডার রেডক্লিফ। যুদ্ধ ঘোষণা হবে যেকোন মুহূর্তে। মুচকি হেসে কটন প্যাডে রিমুভার লাগিয়ে অলতো করে মুছে উঠিয়ে দেয় নেইলপালিশ। ছোট ঠোঁটজোড়া গোল করে ফু দিয়ে থাকে অনবরত। নিবিড়ের বিরক্ত শিথিল হয়ে আসে। ভ্রুর ভাজ মিলিয়ে যায়।রিমুভারে জ্বালা করছে জায়গাটা। কিন্তু জিয়ানার ফু তে আরামবোধও হচ্ছে।
‘তুমি যে একটা বাচ্চা জানো?এইসব কাজ বাচ্চারা করে।’
‘সুখ গরীব বলে সবাইকে বিলিটল করতে নেই।তাছাড়া আমি বাচ্চা না আপনি ওল্ডি। ‘
‘আমি ওল্ডি?’
জিয়ানাকে টেনে বুকে এনে চেপে ধরে প্রশ্ন করে নিবিড়।জিয়ানা ক্যাক করে উঠে বলে,
‘ব্রো আপনি ওল্ডি হয়েও হেব্বি পাওয়ার আপনার।আঃ সুখ হচ্ছেটা কী?’
নিবিড় কুটকুট করে হেসে দুষ্টুমি বাড়ায়।নিবিড় আরও নিবিড় হয় জিয়ানার দিকে। ভালোবাসায় ফালাফালা করে দেয় জিয়ানাকে।জিয়ানাও হারিয়ে যায় সেই ভালোবাসার সমুদ্রে।দুইনেই ভাসে সেই সুখ সমুদ্রের ঢেউয়ে।
মানব চরিত্র যত বিচিত্র তারচেয়েও বেশি বিচিত্র মানব অনুভূতি। প্রতিদিন এই চিরচেনা স্পর্শে জিয়ানা পুলকিত হয়।বছর পর বছর যায় তবুও সেটা প্রথম দিনের মতোই মিষ্টি মধুর।
সকাল হতে না হতেই সুখুর ডানা ঝাপটানো শুরু হয়।চাঁদ চাঁদ বলে মুখের ফেনা বের করে ফেলে।ওহো পাখিদের মনে হয় মুখের ফেনা হয় না।না হোক সেটা কথার কথা।
ওয়াশরুম থেকে জিয়ানা বের হয়।পেছন পেছন নিবিড়। শত চেষ্টা করেও জিয়ানা নিরবে নিভৃতে একদিন গোসল করতে পারেনি এই বাড়িতে।নিবিড় তার সাথে থাকবেই।তবে যেদিন কাজে ব্যাস্ত থাকে সেদিন জিয়ানা নাচতে নাচতে একাই গোসল করে নেয়।
পেছন থেকে নিবিড় বলল,
‘ব্লাউজটা বেশি হট।এটা পড়ে রুমের বাহিরে যাওয়া যাবে না।’
জিয়ানা ফট করে খুলে ফেলে বলে ,
‘বাঁচুয়া।এই আটসাট জিনিস আমারও ভালো লাগে না। তবে আপনার একটা ট্রি-শার্ট পড়ি?’
নিবিড় মুচমি হেসে বলে কিচ্ছু পড়া লাগবে না।চলো আমরা ঘরেই থাকি।জিয়ানা বলে,
‘মিডিল স্ট্যাম্প উড়িয়ে দিবো।’
‘লসটা কার?’
‘আপনারই।ধার করে হিশু করতে হবে।’
বলেই খিলখিলিয়ে হেসে উঠে।নিবিড় আলমারি খুলে বলে,
‘একটা মেয়ে মানুষ এতটা বোল্ড কেমনে হয়? আমারই লজ্জা লাগে মাঝেমধ্যে।’
‘আপনার ইয়ের ছবি ওয়ালপেপার দিতে দিতে আমি বোল্ড হয়ে গেছি।’
এরমাঝে ধপধপ পায়ে জ্যাক এসে বলে,
‘মম আব্দুল্লাহ আমার প্যান্ট পড়েছে।এখন আমার ওয়ারের জন্য কিচ্ছু নেই।হোয়াট শুড আই ডো?
‘প্যান্ট ছাড়া ঘুর বাপ।তোর যেটা আছে সেটা গর্বের জিনিস। আর গর্বের জিনিয়া ঢেকে রাখতে নেই।যাহ।’
‘মম ড্যাডও তো পড়েছে।ড্যাডের কি নেই? ‘
‘খুব আছে।ওইটা নিয়েই যত বড়াই….
নিবিড় ফট করে এসে মুখ চেপে ধরে জিয়ানার।এই মেয়ে বাচ্চাদের সাথেও মেপে কথা বলতে জানে না।জ্যাক এসে নিবিড়ের পায়ে পাঞ্চ করতে করতে বলে,
‘লিভ হার।লিভ মাই মম।’
নিবিড় একপা দিয়ে জ্যাককে পেচিয়ে ধরে। কিন্তু সুবিধা করতে পারে না।জ্যাক পায়ে কামড় বসায় আর জিয়ানা হাতে।এরমাঝে আয়েশা এসে জ্যাককে টানতে থাকে।তার আদরের পিতাকে দুইজন মিলে মারছে।সে সহ্য করতে না পেরে ভ্যা করে কেঁদে দেয়।
দুইজন গভর্নেন্স এসে দুইজনকে নিয়ে বেরিয়ে গেলে নিবিড় জিয়ানার বুঁচা নাকিটা টেনে বলে,
‘মুখে কিছু বাজে না?’
জিয়ানা নাক বন্ধ থাকায় প্যান প্যানিয়ে বলে,
‘আরেহ প্রাচীন কাল থেকে পুরুষের গৌরবের জিনিস এটাই।বিশ্বাস হচ্ছে না? আচ্ছা আপনি ১৬শ শতকের পুরুষদের ইতিহাস পড়লেই জানতে পারবেন।তারা যুদ্ধনীতির পাশাপাশিই নিজেদের কডপিস দেখিয়ে বুঝাতো আই এম হিম্মতওয়ালা।আর যার যত বড় কডপিস সে তত বড় ক্ষমতাওয়ালা।ভেতরে কিছু থাকুক আর নাই থাকুক।
এদের মাঝে ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম হেনরি ছিলো সবার আগে।উনার একটা বর্মের কডপিস সত্যির চেয়ে এত বড় করে লিডসের রয়্যাল আর্মারিজে প্রদর্শিত করা আপনি অবিশ্বাস করতে পারবেন না। গুগলে সার্চ করে দেখুন?’
নিবিড় রাগে টগবগ করে ফুটছে।জিয়ানা আড়চোখে দেখে আবার বলে,
‘তাছাড়া অঞ্চল বেঁধে…..
‘শাট আপ জিয়ানা।নো মোর সিঙ্গেল ওয়ার্ড এবাউট দিস ট্রপিক।কুইক রেডি হয়ে নিচে আসো।ব্রেকফাস্ট করে বের হতে হতে দেরি হয়ে যাবে।’
বলে গটগট করে বেড়িয়ে যায় নিবিড়।জিয়ানা শান্তির নিশ্বাস ছাড়ে।এখন নিজ ইচ্ছায় রেডি হওয়া যাবে।আজ নভ তে IOC (ইন্টারন্যাশনাল অর্ফান কেয়ার) সংস্থা থেকে লোক আসবে।এরা ওয়ার্ল্ড ওয়াইজ এতিমদের নিয়ে কাজ করে থাকে।এরা নভ তে আসছে মূলত শফিক আহমেদের তদারকিতে। এদের মাধ্যমে লিং আপ থাকলে বাচ্চাদের খুব সহজেই মিশনারিজ স্কুল গুলোতে লেখাপড়ার সুযোগ পাওয়া যাবে।তাছাড়া আঠারো বছর পর এইসব সংস্থার মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ থাকে।
মিনিট পাঁচেক পর দরজায় নক হলে জিয়ানা ফিরে তাকায়।জেনি নতুন শাড়ি পড়ে খচখচ শব্দ উৎপন্ন করে এগিয়ে এসে জিয়ানার পিঠে ধুম করে একটা কিল দিয়ে বলে,
গাধি কি পড়েছিস এটা?ট্রি শার্টের সাথে শাড়ি কে পড়ে?’
‘জিয়ানা পড়ে। ‘
‘বিশ্রী লাগতাছে।’
‘সুখ বলছে ঠিকই আছে’
‘তুই লুঙ্গি পড়লেও তো বলবে ঠিকই আছে। ‘
‘ইভেন কিছু না পড়লেও বলে।’
‘বেহায়া।’
‘শুকরিয়া।তবে তুমি খুব হায়াওয়ালী মহিলা তিন বাচ্চা নিয়ে ঘুরো। তুমি কি মহাভারতের কুন্তি? আকাশ-বাতাস আর বজ্র থেকে বাচ্চা কুড়িয়ে পেয়েছো? মন্ত্র পড়ে বলেছো “হে অগ্নি দেবতা মুজে এক সন্তান দিজিয়ে। আর্জুন হগা উসকি নাম।” নাকি স্বামী পরাগায়নের ফসল সব? ‘
‘চুপ কর অসভ্য মেয়ে।তুই বাচ্চা নিচ্ছিস না কেন?’
‘তিনটা সিক্রেট কাজ করছি আপি।এমন সব জায়গায় যেতে হচ্ছে ,দিন রাত বলে কোন সময় নাই।প্রেগু হলে কি সম্ভব? দেখা যাবে বিল্ডিংয়ের চিপায় গিয়ে পেট সহ আটকে গেলাম।’
বলে চুল টেনে খোপা করে নেয় জিয়ানা।
‘তাই বলে বাচ্চা নিবি না?’
‘নিবো।সুখ আর একটু মানুষ হোক।তাছাড়া…
‘কি?’
‘দাম্পত্য লাইফ এনজয় করছি। ‘
বলেই সবগুলো দাঁত বের করে হাসে জিয়ানা।জেনি মেকি রাগ দেখিয়ে বলে,
‘তো আমরা করছি না?’
‘সত্যি করে বল তো আপি বাচ্চারা বেঠিক সময়ে জেগে গেলে তোমরা কি করো?’
জেনি আরও কয়েকটা কিল দিয়ে বলে,
‘চুপ থাক নির্লজ্জ। তাড়াতাড়ি আয়। বাচ্চারা তোর সাথে যাবে বলে এখানে এসেছে।কি জাদু করেছিস তুই জানিস?’
‘মিম এসেছে আপি? ওকেও তো আসতে বললাম এখানে।’
‘এতক্ষণে চলে আসার কথা।’
জিয়ানার উদ্ভট পোশাকে এই বাড়িতে এখন আর কেউ অবাক হয় না।কিছুদিন আগে নিবিড় আর সে লুঙ্গি পড়ার প্র্যাক্টিস করেছিল।কিন্তু লুঙি কেলেঙ্কারি অত্যাধিক বেশি।সকালে উঠে নিবিড়ের লুঙ্গি ঠিকঠাক থাকলেও জিয়ানারটা হয় খাটের মাথায় না হয় ফ্লোরে।এরপর পিন দিয়ে লুঙ্গি আটকে শুয়াই একদিন নিবিড়ের পায়ে গুতো লাগায় সব লুঙ্গি গার্ডদের দিয়ে দিয়েছে।
অভার সাইজ ট্রি-শার্টের সাথে শাড়ি পড়া দেখে ফাইজার হাজবেন্ডের নাকে মুখে খাবার ঢুকে কাশি শুরু হয়।লোকটা ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেছে।
মেহেদী আড়চোখে জিয়ানাকে দেখে বলল,
‘নিবিড় তোর শান্তির জীবনে এই সমস্যাকে কীভাবে আবিস্কার করেছিস?’
‘শাট আপ।’
বলে নিবিড় চেয়ার টেনে বসে।জিয়ানা মুখ বাঁকা করে বলে,
‘জেরিন ম্যাম ইউ আর মোষ্ট বিউটিফুল লেডি ইন আওয়ার ইন্সটিটিউট।’
মেহেদীর হাওয়া ফুঁস।ফারহানা ডাইনিং থেলে কটমট করে তাকিয়ে আছে তার দিকে।মেহেদী সুবোধ বালকের মতো কিছু বুঝে না টাইপ ভাব করে নিজের প্লেট টেনে কাছে আনে।
গভর্নেন্স একটা ডিস বড় ওভেন ডাকনা দিয়ে ঢেকে ডাইনিংয়ের মাঝখানে রাখে।সবার দৃষ্টি সেদিকেই স্থির হয়।জিয়ানা হাত তালি দিয়ে বলে,
‘প্রিয় জনগনস আর অপ্রিয় গরুবেষক সবাই শুনোন।
বিদেশী শেফ ছাটাই করার পর সবাই কম বেশি দুঃখ পেয়েছেন আমি জানি।অনেকেই অনেক দিন বিদেশী ডিস খান না।তাই আমি জিয়ানা হক আপনাদের এই কষ্ট বুঝতে পেরে নিজেই একটা কোরিয়ান ডিস রান্না করেছি।ঢাকনা সরিয়ে বলল,
‘ট্যানটানান….. বিবিমবাপ।’
বড় একটা বোলে নানা রকম সবজি মাংস ,মাছ ডিম আর সালাদ সাজানো।খাবারটা দেখেই মেহেদী ফোন বের করে ফেইক ভাবে বলে,
‘৯৯৯ এ কল দিয়ে একটা এম্বুলেন্স ডেকে রাখি। মনে হচ্ছে আজ সবার হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে?’
জিয়ানা কপাল কুচকে বলে,
‘এই আপনাকে কে খেতে বলেছে হ্যাঁ? ‘
রাফিন মুচকি হেসে বোলটা নিবিড়ের দিকে ঠেলে দিয়ে বলে ,
‘সমস্যা নেই ইটস লুকস ইয়াম্মি।নিবিড় খাবে।’
নিবিড় রাফিনের হাত ধরে তার দিকে ঠেলে বলে,
‘তোর ছাত্রী সো তোর আগে খাওয়া উচিত।নে কুইক শুরু কর।’
জিয়ানা এদের সবার ঠেলাঠেলি দেখে চোখ ছোট ছোট করে জেনির দিকে তাকায়।জেনি দাঁড়িয়েই ছিল।সে বাচ্চাদের দিকে যেতে যেতে বলে,
‘আমি বাসা থেকেই খেয়ে এসেছি। এরমাঝে নীলয় তোয়দকে নিয়ে ভেতরে ঢুকে।পেছন পেছন মিমও আসে।
জিয়ানা এগিয়ে গিয়ে তোয়দকে আদর করে নীলকে টেনে চেয়ারে বসিয়ে নিজের ডিস এগিয়ে দেয়।নীলয় করুন চোখে জিয়ানার দিকে একবার তাকিয়ে মিমকে বলে,
‘মিম আমাকে বাঁচান?’
নীলয়ের করুন চেহারা দেখে মিম হো হো করে হেসে উঠে। এতদিন পর সবাই মিমের হাসি দেখে বিমোহিত হয়। আর নীলয় অভিভূত হয়ে মুগ্ধ চোখে অপলক চেয়ে থাকে।
জিয়ানার রান্না সবার এরূপ ন্যাগ করা দেখে রাগে ফুসতে ফুসতে নিজেই খাবারটা মিক্সড করে নিজের মুখে দিয়ে খাওয়া শুরু করল।কিন্তু শুরুর আগেই শেষ হয়ে ইয়াক ইয়াক করে একটা খালি প্লেটে ফেলে বলে,
‘ছিঃ এত জঘন্য খাবার একটাও আর দুনিয়াতে নেই।’
সবাই এবার হো হো হেসে উঠে।নিবিড় জিয়ানাকে টেনে নিজের পাশে বসিয়ে বলে,
‘রান্নাঘর তোমার উপযুক্ত না।সেখানে তোমাকে যেতে হবে না।’
‘রান্নাঘর তার নাকি সে রান্নাঘরের উপযুক্ত না?’
মেহেদী বলে উঠে দৌঁড় শুরু করে বাহিরের দিকে।জিয়ানা বিবিমবাপের বোল নিয়ে পেছন পেছন ছুটে মেহদীর।খাওয়াতে না পারুক মাথায় তো ঢালতে পারবে?
এদের ছুটোছুটিতে বাচ্চারাও যোগ দেয়।বড়রা ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে খেতে থাকে।
কুলসুম আর রেবেকা বকাঝকা করতে থাকেন দুইজনকেই। কিন্তু এদের ছুটোছুটি শেষ হবার নয়। ঝগড়া করলেও মাঝেমধ্যে মিলে রাফিন আর নিবিড়কে ঘোল খাওয়াই এরা।পুরা নূর ম্যানসন এখন প্রাণবন্ত শুধু মাত্র জিয়ানা আর মেহেদীর জন্য।
পূর্ণচাঁদ আজ আকাশে।জোসনার আলোয় আলোকিত চারপাশ।তাই কৃত্রিম আলো নিভিয়ে ঝুলবারান্দার দোলনায় বসে জিয়ানা আকাশ দেখছে।চাঁদের আলোয় আজ নক্ষত্র গুলো বড্ড ফিকে লাগছে।ইদানীং নক্ষত্র গুলো দেখতে জিয়ানার ভালো লাগে না।কেন লাগে না সে জানে না।হইতো ছোটবেলার শোনা গল্পে জানা হয়েছিল বাবা-মা আকাশের তারা হয়ে যায় এই জন্য।লক্ষ কোটি তারার মাঝে তাদের খুঁজে পাওয়া কিংবা কল্পনা করাও যে প্রচন্ড বোকামি। এটা বাচ্চারা মানলেও প্রাপ্তবয়স্ক কেউ মানে না।দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জিয়ানা রুমে উঁকি দেয়।
নিবিড় আয়েশাকে কোলে নিয়ে রুমের এই মাথা থেকে ওইমাথা হেঁটে হেঁটে ঘুম পাড়াচ্ছে।আয়েশা ছাড়া বাকি সব বাচ্চাই আজ থেকে নভো তে থাকবে।নিবিড় আর জিয়ানা প্রচন্ড ব্যাস্ত। তাই তাদের সময় দিতে পারছে না।তাছাড়া ফস্টার চাইল্ড আর নিজদের চাইল্ডের একটা সুক্ষ্ম বৈষম্য নিবিড় খেয়াল করেছে নূর ম্যানসনে।কিছুদিন পর হইতো তারা হীনমন্যতায় ভোগতে পারে।তাই তাদের সেখানেই রেখে এসেছে।তবে আয়েশা যাবে না।সে নিবিড়ের জন্য প্রচুর কান্নাকাটি শুরু করেছিল।আপাতত সে আছে নূর ম্যানসনেই।
জিয়ানা নিজের কোল থেকে ল্যাপটপ পাশে রেখে নিবিড়কে দেখে মুগ্ধ চোখে তাকায়।প্রসস্থ কাঁধে আয়েশা মাথা দিয়ে একহাতে গলা জড়িয়ে ধরে হামি দিচ্ছে।নিবিড় গুনগুন করে গান গাইছে,
‘ নিশি রাত বাঁকা চাঁদ আকাশে।
চুপিচুপি দোলা দেয় বাতাসে,বাতাসে….”
আর পিঠে চার আঙুল সমান্তরাল রেখে ধীরেধীরে টেপ করছে।জিয়ানার মনটা স্নিগ্ধ ,সতেজ মুগ্ধতায় পূর্ণ হয়ে যায়। কে জানতো মিসোজিনি সেই নেতাটা একটা মেয়ের প্রেমে ঢুবে যাবে? কেউ কি বলতে পারতো,কাঠখোট্টা নেতাটার এত এত সুইট বৈশিষ্ট্য আছে? কে জানতো কথায় কথায় ঠাটিয়ে থা*প্পড় মারা লোকটার শক্ত হাত এতটা যত্ন করতে পারে? কে জানতো পরিবারকে প্রচন্ড ঘৃণা করা ছেলেটা আসলে পরিবারের জন্য কাতরাতো?কে জানতো ,যে ছেলেটা মা শব্দটা উচ্চারণ না করেও মাকে অসম্ভব রকম ভালোবাসতো? কেই বা জানতো ভালোবাসার নাম মুখে অস্বীকার করা ছেলেটার হৃদয়ে সাত আসমান সম ভালোবাসা লুকানো ছিল?
বাচ্চা দেখলে চোখ মুখ কুচকে ফেলা ছেলেটা এখন বাচ্চার ডায়পার বদলানো থেকে শুরু করে ঘুম পাড়ানো সব করে থাকে। কি সুন্দর মমতা দিয়ে আয়েশাকে ঘুম পাড়াচ্ছে।
আচম্বিতে জিয়ানার ঝলমলে চেহারা থেকে আলো নিভে গিয়ে আধার কালো হয়ে যায়।এইভাবে আদর করে ঘুম পাড়ালে কেমন লাগে সে জানে না।তাকে এভাবে ভালোবেসে কেউ ঘুম পাড়ায়নি।সারাদিন ট্রেনিং আর স্কুল করে সে এতটাই ক্লান্ত থাকতো বিছানা সোফা যেখানে সেখানেই ঘুমিয়ে যেত।জিয়াউলকে ছোট বেলায় তেমন পায়নি।তার পোষ্টিং প্রত্নতত্ত্ব অঞ্চলে থাকতো।ট্রেনিং দেয়ার জন্য কয়েক বছর জিয়ানাকে নিজের কাছে রেখেছিল।ততদিনে জিয়ানা বড়। কোলে নিয়ে ঘুম পাড়ানোর দরকার পড়েনি।তাছাড়া আঞ্জুমানের সময় কোথায় ছিল?
আবার চাঁদের দিকে তাকায় জিয়ানা।নিবিড়ের এত এত ভালোবাসা পাবে বলেই হইতো অন্য কোন ভালোবাসা সে পায়নি।হইতো নিবিড়ের তীব্র যত্নের জন্য শৈশবটা অবহেলায় কেটেছে।এই যে এখন একটা চুল পড়লেই নিবিড় ব্যাস্ত হয়ে পড়ে এর কারণ খুঁজে বের করতে।অথচ দীর্ঘসময় সে বেল্লু মাথা হয়ে ঘুরতো।
দোলনার দোল বাড়াতে জিয়ানার ধ্যান ছুটে।পার্ফিউমের গন্ধে বুঝে নিবিড় বসেছে।জিয়ানা নিবিড়ের কাধে মাথা রেখে ডাকে,
নীতিহীন রাজ শেষ পর্ব
‘সুখ?’
‘হুম?’
‘কোলে নিয়ে ঘুম পাড়ালে কেমন লাগে?’
নিবিড় ঘুরে জিয়ানার দিকে তাকায়।ফট করে টেনে জিয়ানাকে নিজের কোলে নিয়ে বলে,
‘নিজেই দেখ কেমন লাগে?’
জিয়ানাকে বুকে মিশিয়ে গুনগুনিয়ে গান ধরে নিবিড়,
‘ওগো চাঁদ তুমি কি জানো না
সে যে আজ নাম ধরে ডাকলে
অনুরাগ জড়ানো চোখে
এই নীল জোসনায় কাছে আসবে।
