Home নীতিহীন রাজ নীতিহীন রাজ পর্ব ৭৫

নীতিহীন রাজ পর্ব ৭৫

নীতিহীন রাজ পর্ব ৭৫
আশিকা আক্তার সোহাগী

কথায় আছে”আজকের ত্যাগ কালকের জন্য সেটা তুরুপের তাস হয়ে যেতে পারে।”
নিবিড়ের জন্য সেটাই সেন্ট পার্সেন্ট ফলে গেছে।উপ-নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে।বিনিময়ে দিতে হলো একটা ত্যাগী ,উচ্ছসিত আর চারপাশ মাতিয়ে রাখা একজন ইয়াং নেতার ঝাঁঝরা করা বুক।ধাতব বুলেটটা আকাশের পিঠের হাড় বেধ করে হৃদপিন্ডের সিক্সটি পার্সেন্ট ছিদ্র করে বুক চিড়ে গিয়ে বিধেছে নিবিড়ের কাধে।
অপরদিকে মক্কু লাইফ সাপোর্টে টুয়েন্টি টুয়েন্টি পসিবিলিটি নিয়ে আইসিওতে পড়ে আছে। মনিটরে অক্সিজেন সার্কুলেশন ,রক্তেরচাপ,হৃদস্পন্দন সহ বাকি প্যারামিটার গুলো থেমে থেমে চলছে।ডাক্তার জানিয়েছে বাহাত্তুর ঘন্টার আগে কিচ্ছু বলা যাচ্ছে না।

জেনি ঘাট হয়ে বসে আছে আইসিইউর সামনে। কেউ তাকে টলাতে পারছে না সেখান থেকে। তাই আঞ্জুমানও পাশে বসে আছে।
নিবিড়ের অবস্থা সূচনীয়।ব্লাড লস হয়েছে অতিরিক্ত। ব্লাড লাগবে অনেক।তবে বুলেট বের করা গেছে।কাধের হাড়ের বাঁকে ঢুকেছিলো।সামনে আকাশ না এলে আকাশের জায়গায় নিবিড় থাকতো সেই স্ট্রেচারে। জিয়ানা হাত মুঠোয় করে ফেলে।সে কিভাবে বাঁচবে নিবিড়কে ছাড়া?না নাহ! এতশক্ত সামর্থ্যবান লোকের কিচ্ছু হতে পারে না। জিয়ানার মস্তিষ্ক ছেলেমানুষী চিন্তা। এটাও ভাবে তাকে এভাবে কষ্ট দেয়ার জন্য একবার জেগে উঠুক শুধু জিয়ানা উচিত শিক্ষা দিবে নিবিড়কে ।

ঘন্টাখানেক থেকে জিয়ানা শুধু মাথা ঘুরিয়ে এপাশ থেকে অপাশ দেখে যাচ্ছে। ক্লাবের ছেলেদের কত বেকুলতা নিবিড়ের জন্য। জিয়ানার একটা ধারণা আজ পাল্টে গেছে।নিবিড়ের পলিটিক্যাল ভিউ ডার্টি না।কিছু অন্যই।হইতো পাওয়ার অফ অ্যাটর্নির লোভ অথবা সত্যি সত্যি দেশের জন্য প্রগতিশীল ভাবনা?
নিবিড় কোনভাবেই রুহানী কিংবা শ্যামল হাসানের সাথে হাত মিলায়নি।জিয়ানা এখনো মানুষ চিনতে পারলো না।সে নিবিড়কে ভালোবাসে ,ভরসা করে কিন্তু প্রফেশনালি পলিটিক্স এর ব্যাপারে আজকের একটু আগ পর্যন্ত তীব্র বিরোধিতা করে এসেছে।ঘরের মাঝে জিয়ানার পুরো দুনিয়া স্বামী কেন্দ্রীক হলেও বাহিরে সে স্বতন্ত্র। নাহ সে তার জায়গায় ঠিকই আছে।পলিটিক্স আর জার্নাল দুইটা ক্ল্যাশেই চলবে।এরা যদি নিজেদের মাঝে সামঝোতাই করে তবে হলুদ সাংবাদিকদের জন্ম হবে।

কিন্তু শক্তপোক্ত লোকটাকে এভাবে নিথর হয়ে থাকতে দেখতে জিয়ানার পাজরে ব্যাথা হচ্ছে। বুকে আলতো কিল দেয়।এই পাজরের ভেতরে ছোট্ট ধুকপুক করার যন্ত্রটায় আজ অসহনীয় যন্ত্রণা। আর সেই যন্ত্রণার নাম সুখনীল নিবিড়।
মেহেদী রক্ত দিয়ে বের হয়।তাদের ব্লাড গ্রুপ একই।সোসাল সাইডে এনাউন্স করা হয়েছে “আর্জেন্টলি নিডেড :এবি নেগেটিভ ব্লাড ফর ন্যাশনাল এমপি ক্যান্ডিডেট সুখনীল নিবিড়।”
ব্যাস আধাঘন্টার মাঝেই শখানেক লোক হাজির হয়ে গেলো হাসপাতাল প্রাঙ্গণে।এদের মাঝে মেয়েই বেশি।আজ আর জিয়ানার কোন জেলাসি এলো না।বরং ভালো লাগে নিবিড়ের ক্রেজ দেখে।

আকাশের লাশ নিয়ে যাওয়া হয়েছে আরও ঘন্টাখানেক আগেই।লাশ? হ্যাঁ লাশই তো।রুহু দেহ ত্যাগের পর মানুষটাকে আর শুধু নামে ডাকা যায় না।মরহুম কিংবা টাটকা নাম লাশ।জিয়ানার চোখে আবার নোনাজল জমে।মাথা উচু করে চোখ মেলে হাত দিয়ে বাতাস করে চোখে।পানি যেনো না পড়ে এই চেষ্টায়।নাহ কাজে দিচ্ছে না।তাই হাটু ভাজ করে মুখ লুকানোর চেষ্টা করে। হাটু ভাঁজের সময় পায়ের গোড়ালিতে চিনচিনে ব্যাথা হলো।সে হোক এইসব ফালতু ব্যাথা আজ আছে কাল নেই।কিন্তু মিমের ব্যাথা সারাজীবনের।
আহ মিম!জিয়ানার শরীর কেপে উঠে।দুইদিন আগের কমনরুমে বলা কথাটা এভাবে সত্যি হয়ে যাবে কে জানতো? সহজ সরল একটা মেয়ের ভাগ্য কেনো এতটা সীমাহীন কষ্ট লেখা? স্বামী সোহাগীও হতে পারলো না ঠিক মতো।একজীবনের কষ্ট ,হাহাকার আর শূন্যতা নিয়ে কিভাবে নিশ্বাস নিবে এই দুনিয়ায়?আর আকাশের বাবা মা ,তারাই বা কিভাবে খরচ করবে বাকি আয়ুটুকু?
জিয়ানা মাথা উঠায়। আচম্ভিতে মনে পড়ে জেনির টেস্টের কথা।জিয়ানা ব্যাথা সমেত খুড়িয়ে খুড়িয়ে এগিয়ে যায় জেনির কাছে।হাটু গেরে বসে জেনির হাতের উপর হাত রাখে।সাথে সাথেই জেনি হাত ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকায় জিয়ানার দিকে।জিয়ানা অল্প বিষ্ময় নিয়ে তাকাইয়ে আছে জেনির ভেজা মুখের দিকে।জেনি ভাঙা গলায় বলে,

‘দূর হয়ে যা আমার কাছ থেকে।এখন আমার বাচ্চাকেও খেতে এসেছিস তাই না? আর কি কেড়ে নেয়ার বাকি আছে তোর? আমার ইজ্জত সম্মান,দীর্ঘদিনের ভালোবাসার মানুষ ,শেষমেশ বেঁচে থাকার জন্য একজনকে খড়কুটোর মতো আগলে ধরলাম। তাকেও তোরা কেড়ে নেয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছিস? এখন কি আমার বাচ্চাকেও আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে চাস? বল? এরচেয়ে আমাকেই মে*রে ফেল। আমি শেষ হয়ে যাই।তবুও এই ভাঙাচোরা জীবন আর বইতে হবে না।কি হলো কথা বলছিস না কেন?’

জিয়ানার শরীর পাথরের মতো মনে হচ্ছে। ভেতরে কাপুনি অনুভূত হলো থেকে থেকে।আস্তে করে মাথা ঝুকিয়ে ফেলে।আজ হাতেনাতে প্রমাণ পেলো তার মারহাবা মার্কা ভাগ্যের। ভালো কিছু সইতেই পারে না সে।যে জেনির চোখে সব সময় দেখে এসেছে অকৃত্রিম ভালোবাসা ,স্নেহ আর যত্ন। সে চোখে আজ ঘৃণা।গলায় গুচ্ছ গুচ্ছ কষ্ট জমা হচ্ছে আবার।নজর আজ কুন্ঠিত হয়।জেনির চোখের দিকে আর তাকানো গেলো না।
পেছন থেকে জিয়াউল এসে জিয়ানাকে ধরে উঠায়।হাত ধরে নিয়ে বসায় ওয়েটিং লাউন্সের চেয়ারে।
জিয়ানার হাত গুলা নেতিয়ে আছে দুইপাশে।একটু সার নেই সেগুলাতে।অচল আর স্থির হয়ে বসে রইলো ওইভাবেই।জিয়াউল জিয়ানার মাথা নিজের কাধে আলতো করে রেখে বলে,
‘মেয়ে তোকে আমি যতটা শক্ত ভেবেছিলাম।তুই তার চেয়েও বেশি শক্ত।আম প্রাউড অফ ইউ মাই গার্ল।’
জিয়ানা কোন সাড়াশব্দ করলো না।জিয়াউল একটা পানির বোতল এগিয়ে দেয় জিয়ানার দিকে।জিয়ানা সেটা রিজেক্ট করে দেয় হাত দিয়ে।জিয়াউল আবার বলে,

‘এতটা প্রেমে পড়তে পারে আমার মেয়েরা ধারণা ছিলো না।আল্লাহর অশেষ রহমত মুসাদ্দিক আর নিবিড় বেঁচে আছে।ইনশাআল্লাহ দ্রুত রিকোভার করে উঠবে।’
‘শান্তনা দিয়ো না তো আব্বু?’
‘যেহেতু শান্তনা নামের কিছু একটা আছেই সেহেতু সেটা দিতেই হবে।’
‘আমার শান্তনার দরকার নেই।তোমার নিজের মেয়েকে দাও সেটা।’
জিয়াউলের একচোখ কেপে উঠে।নিজের মেয়ে পরের মেয়ে এমন কথা শুনতে সে অভ্যস্ত না।তবে হঠাৎ তার মনে হলো সাবকন্সিয়াস মাইন্ড নিজের আর পরের মাঝে সুক্ষ্ম একটা দেয়াল দিয়েই রাখে।এই যে এখানে আসার প্রায় দুইঘন্টা হতে চলল অথচ সে মাত্র জিয়ানার কাছে এসেছে।এতক্ষণ জেনিকেই সামলে এসেছে সে আর আঞ্জুমান দুইজনই।নিজের মেয়ে হলে নিশ্চয়ই একজন প্রথম থেকেই থাকতো জিয়ানার সাথে।গিল্টি ফিল হয় জিয়াউলের। সেসব জোর করে গিলে বলে,

‘খারাপ সময় কেটে যায় আম্মু।তবে এই সময়ের কথা গুলা থেকে যাবে।বিপদের সময় মানব মস্তিষ্ক ডানে বামে এত কিছু ভেবে কথা বলতে পারে না।তাই সাময়িক ব্লাইন্ড হয়ে অযাচিত কথা বলেই ফেলে।আবার সময়ই সব ফিরিয়ে দেয়।শুধু দাঁতে দাঁত চেপে খারাপ সময়টা পাড় করা উচিত। ‘
‘সময় সবসময় সৃষ্টি করে না আব্বু।মাঝমধ্যে খেয়েও নেয় অনেক কিছু।খেয়ে নেই হাহাকার।না পাওয়ার বেদনা।খেয়ে নেয় সুখ আর হাঁসি।আস্ত একটা মানুষ। তাই এবং আবার বারবার মনে হয় সময়ের চেয়ে নিষ্ঠুর আর কিছু নেই।’
জিয়াউল মাথা ঘুরিয়ে দেখার চেষ্টা করে জিয়ানাকে।জিয়ানা আবার বলে,
‘জীবনটা আসলে মায়ার উলে বুনা কোন শীতের পোশাকের মতো। একপাশে টান পড়লে হুড়হুড় করে পুরোটা খুলে যায়। একহাত এলোমেলো সুতা নিয়ে আমি আশাহত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার মেয়ে নই আব্বু।আমি আবার শূন্য থেকে শুরু করার মানুষ। ‘
জিয়াউল বুঝলো জিয়ানার সুক্ষ্ম অভিমান।মেয়েটারও তো পাশে থাকা দরকার ছিলো। এতক্ষণে নিশ্চয়ই নিজেকে নিজে সামলে নিয়েছে।এখন তার আর শান্তনার বাণীর দরকার নেই।জিয়াউল দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।প্রকৃতির বাহিরে চাইলেও আমরা আসলে চলতে পারি না।বায়াসাড হয়েই যায়।আজকে নিজেকে খুব সংকীর্ণমনা মনে হলো।

এরপর রাত পাকা হয়ে আসে।হাসপাতাল প্রাঙ্গন খালি হওয়া শুরু করে। শুধু রাফিন ,মেহেদী ,ফারহানা আর সাফা আছে।জিয়াউল আর আঞ্জুমানের সাথে জোর করে জেনিকেও পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।জেনির এখন আলাদা যত্নের দরকার।মেহেদী আশ্বস্ত করেছে ‘এখানে আজকের রাতটাই যদি উন্নতি না হয় তবে কাল ভোরেই ঢাকায় সিফট করাবে।সব ব্যাবস্থা করা আছে।
জেনি জেদ করে বসেই ছিলো।সে মক্কুর সাথে কথা না বলে কিছুতেই যাবে না।তার ধারণা সবাই তাকে মিথ্যা কথা বলছে।মক্কুর ভালোমন্দ কিছু একটা হয়ে গেছে।
ধারণা পাল্টায় জিয়ানার কথায়। জিয়ানা হাক ছেড়ে বলেছে,’মক্কু ভাই যখন জানতে পারবে তার সন্তানকে নিয়ে কেউ এভাবে কষ্ট করে বসে ছি্লো তখন নিশ্চয়ই খুব খুশি হবে না?’
জেনি তখন নড়েচড়ে বসে। আঞ্জুমান আর একটু জোর করার পর চলে গেছে।

সকালের পর জিয়ানা আর কিচ্ছু খায়নি।রাফিন কিছু হালকা খাবার এনে বার কয়েক সেধে গেছে। কিন্তু জিয়ানা পানি পর্যন্ত নিচ্ছে না।ফারহানাকে বাসায় দিয়ে আসতে মেহেদীও বের হয়ে যায় কিছুক্ষণ পর।
রাফিন বিধ্বস্ত জিয়ানাকে দেখে সাফাকে ইশারা করে পাশে বসার জন্য।রাফিন আজ এক নতুন জিয়ানাকে দেখেছে।গাড়িতে আহাজারি গুলা রাফিনের বুকে হাজার বুলেটের ক্ষতের মতো লেগেছে।আহত নিবিড়কে সে আবার একবার হিংসা করে। আজ যদি নিবিড়ের জায়গায় রাফিন থাকতো তবে কি জিয়ানা এমন পাগলামি করতো? নাহ করতো না।রাফিন আজ নিশ্চিত হয়েছে জিয়ানা একেবারে সেরেব্রাল কর্টেক্সের সেন্ট্রাল থেকে ভালোবাসে নিবিড়কে।
সাফা জিয়ানার চামড়া উঠে যাওয়া আঘাত প্রাপ্ত হাতের উপর হাত রেখে বলে,’কিছু একটা খেয়ে নাও জিয়ানা? নিবিড় ভাইয়া ঠিক হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। ‘

জিয়ানা চুপচাপ মাথা নিচু করে বসেই থাকে।সাফার নজর যায় জিহানার পায়ের দিকে। তাই জিজ্ঞেস করে ,
‘গোড়ালিতেও কি হয়েছে?দেখি?
‘কিচ্ছু না।’থমথমে মুখে বলে জিয়ানা।
‘মুখে কঠিন সমস্যাকে কিছু না বলে যত সহজেই কাটিয়ে উঠা যায় ,ভেতরে ধাক্কাটা ততটা সামালানো যায় না। ‘
বলে রাফিন উঠে যায় সেখান থেকে। তার আর সহ্য হচ্ছে না জিয়ানার এই কাতর চেহারা।
সাফা বলে,
‘চোখে মুখে পানি দিয়ে আসো।তুমি নিজেই না অসুস্থ হয়ে যাও আবার।চেহারার হাল দেখে কেমন বিধ্বস্ত লাগছে।’
‘নগর পুড়লে যেখানে দেবালয় এড়ায় না। সেখানে আমার নগর ,গ্রাম ,মফস্বল সব পুড়ে গেছে। তাই চেহাড়াতে ছাপ পড়বে এটাই কি স্বাভাবিক না? ।’
সাফা বলল ,
‘পায়ে রক্ত শুকিয়ে গেছে। এটাকে নেগলেক্ট করা উচিত হচ্ছে না।’
‘তেমন কিছুই না এটা।ঠিক হয়ে যাবে।’

রাত কত হলো কে জানে?চারপাশ কিছুটা ঝিমিয়ে এলেও পুরোপুরি ঘুমাইনি।অবশ্য হাসপাতাল কখনো ঘুমাও না।জিয়ানা এখনো বসা হাসপাতালে লাউন্সে।পাশের দুই চেয়ার মিলে রাব্বি আর আক্কাস শুয়ে হা করে ঘুমাচ্ছে।হাজার বলার পরেও এরা যায়নি।মেহেদী আর রাফিনও আছে সাথে।আপাতত দুইজনই সাদা শলাকা টানতে গিয়েছে।জিয়ানার কিছু টানার নেই।আপাতত নিজের জীবন ছাড়া।কারো পায়ের শব্দে মাথা তুলে তাকায়।
মুহুর্তেই চোখে র*ক্ত জমা শুরু হয়।তালহা নির্লিপ্ত মুখে দাঁড়িয়ে আছে সামনে। তালহা পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিয়ানার মুখের দিকে।সারা দুনিয়ায় হাজার হাজার কিলোমিটার পালিয়েও মানুষ নিজের মনের থেকে পালতে পারে না।তালহা শুধু সারাজীবন ব্যবহার হয়ে এসেছে।কেউ তাকে করুনা ছাড়া দুদন্ড ভালোবাসেনি।কারো চোখে নিজের জন্য মমতা নামের কোন জিনিস খুঁজে পায়নি।

কিন্তু দিনের পর দিন জিয়ানাকে পাহারা দেয়ার খাতিরে সে একেবারে কাছ থেকে দেখেছে জিয়ানাকে।তালহার কাছে লাগে জিয়ানা উড়তি ফিরতি একটা ফিনিক্স পাখি।যার ডানায় হাজার স্বপ্ন।তালহা তাকাতো না জিয়ানার দিকে।সে কারো চোখের দিকেই তাকাতে পারে না।চোখের মায়া বড় মায়া।কিন্তু সেদিন বৃষ্টিতে লম্ফঝম্প করা জিয়ানার দিক থেকে সে দৃষ্টি সরাতে পারেনি।এরপর গরমে যখনই তালহা জিয়ানার পেছন নিতো প্রতিবারই ঠান্ডা ড্রিংক্স কিনে কাউকে দিয়ে তালহার কাছে পাঠিয়ে দিতো।তালহা হেঁসে হেঁসে প্রতিবারই একসেপ্ট করতো আর ভাবতো এই মেয়ের সাথে পারা অতি কঠিন।তার জন্য নিবিড়ই ঠিক আছে।একবার ব্যাথা পেলো কি যত্ন করে জোর করে যত্নের সাথে ট্রিটমেন্ট করিয়েছে।যে যত্ন খালি চোখে দেখা যায় না।মন দিয়ে অনুভব করতে হয়।
মাসখানেক আগে নিবিড়ের কিছু বিদেশীদের সাথে গোপন একটা চুক্তির জন্য কনফারেন্স ছিলো।সেখানে জিয়ানাকে তালহা প্রায় চব্বিশ ঘন্টাই পাহারা দিয়েছে।জিয়ানার ফ্ল্যাটে নিবিড় ঢুকে যখন প্রায়ই জিয়ানাকে কোলে করে এপাশ থেকে ওপাশ যেতো প্রতিবারই তালবার কেমন একটা ভোতা কষ্ট হতো।তাই নিবিড়কে বলে কিছুদিন পাহারার কাজ সে করেনি।কিন্তু তাতেও শান্তি মিলেনি তার।এই যে আজ চলে যাচ্ছে সারাজীবনের জন্য তবুও একবার না দেখে গেলেই নয়।
তালহার নজর জিয়ানা আজ চট করেই ধরে ফেলেছে।এটা একজনের পুরুষের নজর। তবে কামনার নজর না।যে নজরে রাফিন তাকায়।যেখানে কৃতজ্ঞতা আর সামান্য মায়া মিশ্রিত থাকে।জিয়ানা সরাসরি চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,

‘কেনো করলেন এটা?’
তালহা পলকহীন তাকিয়ে থাকে।তালহার সামনে জিয়ানা দাঁড়িয়ে যায়।মুখোমুখি স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে মুখে বাঁকা হেঁসে আবার বলে,
‘আপনার সাহস আছে বলতে হচ্ছে? আর কেউ না জানুক আপনি তো বুঝতে পেরেছেন আমি আপনাকে চিনে ফেলেছি?’
‘যদি বলি আমি চেয়েছি বলেই চিনেছেন?’
জিয়ানার ব্রু যুগলের মাঝখানে সুক্ষ্ম একটা ভাঁজ পড়ে।তালনা উল্টো ঘুরে যেতে যেতে বলে,
‘আমি কারো কাছে ঋণী থাকি না।আপনার দেয়া সামান্য যত্নের জন্য আজ শেষবারের মতো এলাম।’
কিছুটা দূরে গিয়ে আবার ফিরে তাকায়।জিয়ানা বলে উঠে ,
‘সুখনীল নিবিড়কে এখনো চিনেন নাই। যেখানেই যান না কেনো আকাশের মৃত্যুর জন্য দ্বায়ী আপনি।সুখ আবার যার যেটা প্রাপ্য সেটা দিতে কার্পণ্য করে না।’
‘আলবিদা প্রিন্সেস ‘

যেতে যেতে হাত নেড়ে বলে তালহা।জিয়ানার কপালের ভাঁজ দ্বিগুণ হয় কারণ তালহার পকেট থেকে কিছু একটা পড়েছে।জিয়ানা দ্রুত সেটার কাছে যায়।একটা খাদি কাপড়ের রুমাল আর একটা মটর বাইকের দোকানের মানি রিসিট। রুমালটাতে উল্টা এবিসিডি দিয়ে এক লাইনে কিছু লেখা।জিয়ানা মুঠোয় নিয়ে প্যান্টের পকেটে ভরে ফেলে।একটু আগের বলা তালহার কথা তার কানে বাজে “আমি কারো কাছে ঋণী থাকি না?’
ঋণ? জিয়ানার কাছে কিসের ঋণ তালহার? পাহারা দেয়ার সময় মাঝেমধ্যে সফট ড্রিংক্স কিনে তাদের দিতো।দুইবার জোর করে ধরে বিরিয়ানি খাইয়েছে।সেটা করেছে সারাদিন লুকিয়ে পাহারা দিতে গিয়ে ছেলে দুইটার নিশ্চয়ই ক্ষুধা পায় এই ভেবে।একবার কলোনির গলিতে অটোরিকশার সাথে বাইক এক্সিডেন্ট করে পায়ে ব্যাথা পেলে জিয়ানা ফার্মাসিতে ধরে নিয়ে গিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিয়েছিলো।এইতো? ও হ্যা আরেকদিন বস্তিতে পিকনিকে জোর করে ধরে খাইয়েছিলো।এছাড়া কোন দিন অন্যকোন উপকার করেছে বলে তো মনে পড়ে না।
মানি রিসিট মেলে দেখে।মেসার্স জাহান মটরস এর একটা বিল।বাজারের মাঝামাঝির দোকান।
জিয়ানা যেয়ে আবার চেয়ারে বসে।

সবাই আস্তে আস্তে চলে গেছে।তবে নানা বাহানায় জিয়ানার পায়ের কাছে রাব্বি আর আক্কাস মুখ খুলে ঘুমিয়ে আছে। জিয়ানা মুচকি হাঁসে আক্কাসের কিছুক্ষণ আগের রাব্বির কথা শুনে”নিবিড় ভাই মাইরি হেব্বি টেনটন।মরতে মরতে দুই হালার পুতরে গাইড়া দিয়ে গেছে।”
জিয়ানা রাব্বির মাথায় হাত রেখে আস্তে করে ডাকে।রাব্বি ফট করে উঠে বসে ঘাড় চুলকায়।রাব্বির পায়ের আঘাতে আক্কাসও উঠে বসে।জিয়ানা তাদেরকে জিজ্ঞেস করে ,
‘বাজারে জাহান মটরস টা কার দোকান জানিস?’
‘কেরা না জানে? ওইটা তো নিবিড় ভাইয়ের বাপের দোকান।’
আক্কাস বলে।
‘কাল থাইকা বিরাট ছাড় দিবো ওই দোকানে।একটা লটারিও আছে।কেউ কেউ মাগনা মটরসাইকেলও পাইতে পারে।’
গলায় অন্যরকম টোন নিয়ে রাব্বি বলে উঠে।জিয়ানার কপাল সোজা হয়।চেয়ারে গা সম্পুর্ন হেলান দিয়ে বলে,
‘সকাল হলে এই দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবি।কে কে গেলো মনোযোগ দিয়ে দেখবি।দুইজন পালাক্রমে পাহারা দিবি।মনে থাকবে?’
আক্কাস আর রাব্বি সুবোধ বালকের মতো মাথা নাড়ায়।

অল্প ফ্যাকাশে অন্ধকার ছুটোছুটি করছে চারপাশে।পুরোপুরি আলোর জন্ম হয়নি এখনো।কি দীর্ঘ একটা রজনী।আহা! বিষাদের দিবস গুলাতে পৃথিবীর ঘূর্ণন যেনো হ্রাস পায়।
বিল্ডিংয়ের নিচে আকাশের সদ্য কবরের পাশে পা মেলে মাটিতে বসে আছে মিম।পোষ্টমার্টামের ঝামেলা এড়াতে তাড়াতাড়ি আকাশের কবরের ব্যাবস্থা করেছে আত্মীয়স্বজন।
মাটিতে বিছিয়ে থাকা মিমের শাড়ির আচলে পিপড়ারা খেলা করছে।ওরা হইতো লাল শাড়িকে লাল গালিচা ভেবে আমোদ আহ্লাদ করছে।
সারারাত চেষ্টা করেও কেউ মিমকে সেখান থেকে সরাতে পারেনি ।সন্ধ্যায় আকাশ বাসা থেকে বের হওয়ার সময় বলে গেছে “লাল শাড়ি পড়ে বসে অপেক্ষা করবা আমার জন্য।চুল বাধবা না।আজ আমি ইউটিউব দেখে তোমাকে বেনি করে দিবো আরিফা।মনে থাকবে? স্বামীর জন্য অপেক্ষা করা সুন্নত। ”
মিম ফিক করে হেঁসে দিয়েছিলো।কথায় কথায় আকাশের ফতোয়া দেয়াটা খুবই হাস্যকর লেগেছে তার কাছে।
আবার গরম পানি জমা হয় নেত্রপল্লবে।মিম আর কখনোই বেনী করবে না আকাশ।সে আর কখনোই বেনীওয়ালী হবে না।

ভারি পা টেনে দাঁড়িয়ে যায়। তার পরিবারের সবাই চলে গেছে।আকাশদের আত্মীয় স্বজন সবাই মিমকে দোষ দিয়েছে।তার রাশি ভালো না।অপয়া মেয়ে। বিয়ের দুইদিনেই স্বামীকে খেয়েছে।মিমের আব্বা মিমকে সাথে নিয়ে যাওয়ার জন্য অনেক জোরাজোরি করেছে।মিম একদম নড়াচড়া করেনি।কেনো করবে? যেখানে তার স্বামী আছে সেখানেই সে থাকবে।এটা তার অধিকার।
পা টেনে টেনে তিনতলায় উঠে। দরজা হা করে খোলা।এখনো আত্মীয় স্বজন অনেকেই আছে।মিম সোজা হেঁটে আকাশের রুমে ডুকে যায়।কাবার্ড থেকে আকাশের পড়া শার্ট নিয়ে নাকে ধরে ফুপিয়ে উঠে।এইতো তার স্বামী মিশে আছে এই শার্টে।কে বলে সে দুনিয়া থেকে চলে গেছে?
ফুপানো একসময় আহাজারিতে রুপ নেয়।সারারুমের ফ্লোরে গড়াগড়ি শুরু করে মিম।জ্যান্ত মানুষের শরীর থেকে চামড়া ছিলে নিলেও এতটা কষ্ট মনে হয় হবে না।যতটা কষ্ট মিমের হচ্ছে।এরমাঝেই আকাশের মা মিসেস রত্না এসে দাঁড়ায় রুমের দরজায়।ঝড়ের পর বিধ্বস্ত প্রকৃতির মতো অবস্থা উনার।মিম হুড়মুড়িয়ে উঠে দাঁড়ালো। দৌঁড়ে গিয়ে রত্নার পা জড়িয়ে ধরে আহাজারি করে বলে,’মা আমাকে বের করে দিবেন না দয়া করে?আমি উনার ঘরেই থাকতে চাই।আমি এই ঘরেই সারাজীবন কাটিয়ে দিতে পারবো।একটু দয়া করুন।আমাকে উনি বলে গেছেন অপেক্ষা করতে। আমি উনার কথার অবাধ্য কি করে হই?’

রত্না মিমের দুই বাহু ধরে দাড় করিয়ে বলে,’তোমার পুরা জীবন পড়ে আছে।এখনো কেউ তেমন জানে না নিশ্চয়ই তোমার বিয়ের কথা?ফিরে যাও নিজের পরিবারের কাছে।এখানে কেউ নেই তোমার।’
হাত ধরেই একপ্রকার জোর করে টেনে দরজার বাহিরে আনে মিমকে।মিম আবার পায়ে পড়ে যায়।রত্নার চোখ মুখ জ্বালা করে।কলিজা চৌচির হয়ে ফালা ফালা তার।কত স্বপ্ন আর আহ্লাদে আসে একটা মেয়ে স্বামীর ঘরে সেটা উনি জানেন।এই মেয়েটাকে চোখের সামনে দেখলে কষ্ট যে আরও দ্বিগুণ বাড়বে।এটা সে কাকে বুঝাবে?
সেই সময় নিচ থেকে উপরে উঠে একজন ষাটোর্ধ মহিলা।রত্না উনাকে দেখে আরও ভেঙে পড়ে।মহিলাটা নিচে মিমের দিকে তাকায়।আচল সরে ঘাড়ে লাল জমাট বাধা চিহ্ন দেখে ঝুকে যায় মিমের দিকে।নিচ থেকে আচল ঝেড়ে মিমের মাথায় ঘোমটা দিয়ে বলে,

‘রত্না আমাদের বাড়ির বউকে তুমি বের করে দিচ্ছো কোন সাহসে? একদিনের হোক বা একঘন্টার সে এই বাড়ির বউ।আকাশের সমস্ত জিনিসের উপর তার অধিকার সবার আগে।’
রত্না ‘আপা গো ‘বলে ঝাপিয়ে পড়ে মহিলার বুকে।বেশ শক্ত সামর্থ্য একজন মহিলা হয়েও হো হো করে কেঁদে দেয় আছিয়া বেগম।ড্রয়িং রুমে ঢুকেই কান্নারত গলায় হুংকার ছাড়েন।
‘বাসা খালি করো।সবাই সবার বাসায় গিয়ে আমার ভাতিজার জন্য নামাজে দাঁডিয়ে দোয়া করো।রত্না আর তুমি বউ ,নাম যেনো কি?’
পাশ থেকে কেউ একজন বলে ‘আরিফা মিম।’
‘মিম! যাও পরিস্কার হয়ে নাও।ওযু করে আসো। সবাই আকাশের জন্য দোয়া করবো।আল্লাহর জিনিস আল্লাহ নিয়ে গেছেন।হায়াৎ মউতের কথা কেউ জানে না।আহাজারি করলে রুহুর কষ্ট হয়।’
মিম চলে গেলে আকাশের ফুপু রত্নার দিকে ঘুরে বলে,

‘আকাশ গেছে কিন্তু তার অংশ দুনিয়াতে রেখে গেছে রত্না।ডাক্তার মানুষ হয়েও তোমরা এত বড় ভুল করতাছিলা? ‘
‘আপা মেয়েটা একেবারেই অল্পবয়সী। ওকে এই দোহাই দিয়ে আটকিয়ে রাখি কিভাবে?’
‘সেটা সময়ই বলবে।আর তোমরা সারাজীবন ক্যারিয়ারের পেছনে দৌঁড়াইছো শুধু। আকাশরে নিয়া কোনদিন কোথাও ঘুরতে গেছিলা? নাকি স্কুলের কোন প্রোগ্রামে হাজির হইতে পারছিলা কোনদিন? ওর গার্জয়ানের নামের জায়গায় সারাজীবন আমি ছিলাম।কত কত অভিযোগ করতো ছোটবেলায় তোমাদের নিয়ে।দামী জামা কাপড় আর নামী দামী স্কুল কলেজে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।মনে রাইখো পঁচিশ বছর সময় পাইছো ছেলেকে কাছে রাখার। আর ওই মেয়েটা স্বামীকে পঁচিশ ঘন্টাও পায় নাই।ওর কষ্ট তোমাদের চেয়ে কোন অংশে কম না।’
ড্রয়িং রুমে এখন পিনপতন নিরবতা। এতক্ষণ সবাই মিমকে গালমন্দ করছিলো।বিশেষ করে আকাশের চাচা চাচিরা।আকাশদের এই বিল্ডিংটা সহ দুইটা প্রাইভেট ক্লিনিক আছে।আকাশের বউকে তাড়াতে পারলে আর কোন মালিক থাকবে না একসময়।এই লোভেই সবাই রত্নাকে উস্কে যাচ্ছিলো।

মানুষের রং দেখে যেমন গিরগিটিও অবাক হয় তেমনি নির্বুদ্ধিতা দেখেও অবাক লাগে।এই যে আকাশ সব ছেড়ে চলে গেলো।একসময় এখানে উপস্থিত সবাইকেই তো যেতে হবে।তারা যে আজ অন্যের জিনিসের উপর লোভ করছে সেগুলা যদি প্রাপ্তিও হয় এর কানাকড়িও তো নিতে পারবে না। কে সরাবে এদের চোখের পর্দা? আছিয়া বেগম জানেন না।চারপাশে মানুষে ভরা কিছু বাড়ির আসল মানুষটাই নেই।আর আসবেও না কখনো।বয়স্ক বুকে চাপ অনুভূত হয়।আস্তে করে বসে পড়ে সোফায়।চোখ বন্ধ করার সাথে সাথেই কানে বাজে কাল রাতের কথা,’
‘ফুপ্পি কাম তো সেরে ফেলছি?’
‘বিয়েই যদি না করতে পারলি আর কি কাম?’
‘ওইটাই করেছি দাদার মেয়ে।কেমন দিলাম?’

‘তোকে কে মেয়ে দিবে আকু? তোর যে মাথায় সমস্যা আছে। যে কেউ একমিনিট কথা বললেই বুঝে যাবে।’
‘ওয়েট ওয়েট তুমি বিশ্বাস করছো না তো? ওকে দুইদিন পর বউ উইথ বাচ্চা নিয়ে যাইতাছি তোমার বাড়ি দাঁড়াও।’
‘আচ্ছা তবে আমিই কাল যাচ্ছি। তোর আম্মু ফোন দিয়েছিলো।মেয়েটাকে ভয় টয় দেখাস না বাপ? বিটলামি পড়ে করিস তানাহলে তোকে পাগল ভেবে প্রথম দিনেই পালাবে।পড়ে লোকে নানান বাজে কথা বলবে।’
বলেই প্রচন্ড হেঁসে ছিলেন আছিয়া বেগম। চোখের কোনা বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে।কেউ চলে যাওয়ার আগে কেনো একটু বুঝা যায় না? তবে আর একটু ভালো সময় কাটানো যেতো।আর একটু মূল্যায়ন করা যেতো।উফফ। এত কেনো কষ্ট আপনজন বিয়োগে?

মেডিসিনের বিটকেলের গন্ধ এইসব ঝাচকচকে ক্লিনিং গুলাতে না থাকলেও একটা হাসপাতাল হাসপাতাল গন্ধ থাকেই।পায়ের আঘাতটায় চিনিচিনে ব্যাথা নিয়েই এগিয়ে যায় জিয়ানা।ডাক্তারের কক্ষের দরজায় টোকা দেয় মৃদু শব্দে।ভেতর থেকে দরজা খুলে যায়।জিয়ানা দরজায় দাঁড়িয়ে বলে,
‘সুখনীল নিবিড়ের ওয়াইফ আমি।ওকে একটু দেখবো অনুমতি দেন।’
‘উনি এখন ইনটেনসিভ কেয়ারে আছেন ।ইনফেকশনের ভয় আছে।ভেতরে যাওয়া যাবে না।’
‘শুনোন ডাক্তার। এক মিনিটের জন্য প্লিজ।জাষ্ট একমিনিট।’
‘সেটা তো আপনি বাহির থেকে গ্লাসের ভেতর দিয়েই দেখতে পারেন?’
‘আমি দেখতে যাবো নাতো?’
‘তবে?’
‘একটা থা*প্পর মারবো।’

ডাক্তারের শুকনা কাশি শুরু হয়।টেবিলে রাখা গ্লাসের উপর থেকে কোস্টার সরিয়ে পানি খেয়ে স্বাভাবিক হয়ে বলে,
‘ইসকিউজমি?’
‘রাখুন আপনার ইসকিউজমি।কাধে একটা না দশটা গুলি লাগলেও এমন দানবের মতো মানুষের কিচ্ছু হয় না।আপনাদের মেডিসিন আর ট্রিটম্যান্ট নিশ্চয়ই কাজের না।কুইক অনুমতি দেন। তানাহলে সুখের থা*প্পর যে কাউকে দিয়ে দিতে পারি?’
জিয়ানার কথায় কোন রাখা ঢাক নেই।ডাক্তার জিয়ানার মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেঁসে বলে,’এখন বুঝতে পেরেছি কেনো নিবিড় আপনাকে স্ত্রী হিসেবে বেছে নিয়েছে।’
‘এমন ভাবে বলছেন যেনো আপনি ওর বুজম ফ্রেন্ড?’
‘জ্বি সেটাই।চলুন নিয়ে যাচ্ছি ওর কাছে।তবে থা*প্পর এলাও না।বাড়িতে নিয়ে গিয়ে থা*প্পড় কিল চ*ড় যা ইচ্ছা দিয়েন।’

আইসিউতে যাওয়ার সাথে সাথেই জিয়ানাকে অদ্ভুত একটা শূন্যতা ঘিরে ধরে।হা করে নিশ্বাস ছেড়ে চারপাশে তাকিতুকি করে। এমন মেশিনে ঘেরা রুমের মাঝে নড়াচড়াহীন নিবিড়কে দেখে তার ভেতর আত্মার কাপণ ধরে।
অনেকবার ফটোতে নিজের বাবা মায়ের ছবি দেখলেও স্মৃতিতে তারা আসে না।ভাইকে কখনো দেখেনি।স্মৃতি তো দূরের কথা।তবে কে আছে তার? এই যে এই মানুষটাই। সুখ? সে তো নিথর হয়ে পড়ে আছে ওই শুভ্র মেডিসিনের গন্ধের বিছানায়। যে কিনা অল্প কিছু দিনেই তাকে ঘিরে রেখেছে এক পৃথিবী ভালোবাসা দিয়ে।সে ছাড়া তো জিয়ানার অবস্থা পানি ছাড়া মাছের মতো।

এই নিবিড় ছাড়া আসলে কেউ নেই তার। কেউই নেই।কোথায় কোনদিন তার কেউ ছিলো না।তাবদ দুনিয়ায় সে একা।শূন্য ,নিঃস্ব । এইজন্য জিয়াউল বারবার বলেছিলো ,’কারো উপর নিজের সুখ ছেড়ে দিবি না জিয়ু।সুখ নিয়ে সুখের মানুষ সুযোগ পেলেই উড়ে যায়।
দুই হাত দূর থেকে দাঁড়িয়ে থেকে চলে আসে জিয়ানা।হাত ব্যাকুল হয়ে আছে নিবিড়কে একটু ছুয়ে দেয়ার। কিন্তু সেটা এই মুহূর্তে সম্ভব না
অপেক্ষা ভোরের। একটা নতুন চ্যালেঞ্জের। একটা নতুন শুরুর।হয় সে সবাইকে নিয়ে বাঁচবে নইতো সবার সাথে সেও হারিয়ে যাবে।তার পরিবার চায়।মা বাবা ভাই স্বামী সব চায়।সবার মতো তারও কঠিন সময়ে মাথায় হাত বুলানোর মমতা চায়।নিবিড়ের পুরো পরিবার আছে।কিন্তু জিয়ানার এক নিবিড় ছাড়া কেউ নেই।তাই বসে বসেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো।

সকাল দশটা নাগাদ মক্কুর অবস্থা অবনতি হলো।তাকে ঢাকায় শিফট করানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।ব্রেইনে আঘাত প্রাপ্ত হওয়াই ব্যাপারটা জটিল হয়ে গেছে। ডাক্তার জানিয়েছে মিরাক্কেল না হলে সারাশরীরে উনি সুস্থ হবেন না।কোন না কোন অঙ্গহানী হবেই।এমনও হতে পারে সাময়িক স্মৃতিশক্তিরও হেরফের হচ্ছে।তাই উনারা আর রিস্ক না নিয়ে তাদের মেইন ব্রাঞ্চে পাঠিয়ে দিচ্ছে।
নিবিড়ের সেন্স আসে এর মিনিট পাঁচেক পর।কিন্তু কথা বলার মতো অবস্থাতে নেই।জিয়ানাকে দুইমিনিটের অনুমতি দেয়া হয়েছে।তাই জিয়ানা চোখে মুখে পানি দিয়ে চুলে হাত খোপা করে পিপি পড়ে ঢুকে যায় নিবিড়ের কাছে।এই সুখকে জিয়ানার একেবারেই অচেনা লাগলো।কাছের মানুষ তো একেবারেই লাগছে না।কিছুক্ষন আগের বেকুলতা সময়ের সেটাকে গিলে নিয়েছে যেন।নেতিয়ে পড়া সুখ কখনো সুখ ছিলো না।এটা নিবিড়।
ঝুকে নিবিড়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,

‘সাতে পাঁচে থাকা পাবলিক যারা তাদের আমার বিশেষ পছন্দ না।কিন্তু আপনি আমার ধারণার চেয়েও বেশি। একেবারে সতেরো পঞ্চাশে থাকা পাবলিক।কিন্তু আমি আদর্শবর্তী নারীরও না যে সেক্রিফাইস করে যাবো শুধু?’
দীর্ঘ একটা শ্বাস নেই।তারপর আবার বলে,
‘আপনার মতো অসভ্য রাশভারি মানুষকে আমার ভালোবাসা জন্মের ভুল হয়েছে।এরপর থেকে পাই টু পাই সব ভালোবাসা ফিরিয়ে দিবেন।
না আমি সুখের জন্য লোভী নই।আমার জন্য কোন বিশাল সুখের সমুদ্রের দরকার নেই।আমার জন্য একবিন্দু শিশিরকনা পরিমান সুখটাও অনেক বেশি।আমি সেটা আকড়ে ধরে আজীবন কাটিয়ে দিতে পারবো।তবে সেই একবিন্দু সুখটুকু সলিড হতে হবে।আপনার পিউরেষ্ট লাভ নিয়ে আমি সন্তুষ্ট। তবে সব কিছু নিজের ঘাড়ে রাখা ব্যাপারটা খুব ইরিটেটিং। আপনি হইতো আমাকে ভালোবেসে সব সময় আড়ালে রাখতে চেয়েছেন কিন্তু এতে আমাদের সম্পর্কে বিশ্বাস জিনিসটা নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে।
জানি না আর দেখা হবে কিনা? তবে আপনি একা নন সুখ? সারা পৃথিবী আপনার পাশে আছে।কিন্তু আমার আপনি ছাড়া কেউ নেই।এই শূন্যতা আমি আর মেনে নিতে পারছি না।আমি একটা শেষ চেষ্টা করবো।হইতো দেখা হবে ,নইতো….’

নীতিহীন রাজ পর্ব ৭৪

হাসপাতালের কেবিল থেকে বের হয়ে লম্বা করিডোর ধরে হাটা শুরু করলো জিয়ানা।প্রতিটা কদমে তার সাথে নিবিড়ের দূরত্ব বাড়ছে।এখন মাথার ভেতরে কোন বোধ কাজ করছে না। সব ফাঁকা যেনো।সাক্ষাৎ আজরাইলের দুয়ার থেকে ঘুরে এলে বুঝি এমনই লাগে।জিয়ানার গলা থেকে তিতঘুটে একটা স্বাদ উঠে এলো।বুঝতে পারলো পেটে পিত্তি পড়েছে।কাল সকালের পর থেকে দাঁতে কিছু কাটা হয়নি।
ওষুধ আর ধকলে বিভোর ঘুমের মাঝে নিবিড় স্বপ্নের ঘোরে অনুভব করলো ,’নীলুফা আর জিয়ানা পাশাপাশি একটা মোমবাতি হাতে দাঁড়িয়ে আছে।
এবং নিবিড় চমৎকার একটা জিনিস অনুধাবন করলো “মোমের গোড়ায় অন্ধকার।”

নীতিহীন রাজ পর্ব ৭৬