Home নীতিহীন রাজ নীতিহীন রাজ পর্ব ৭৪

নীতিহীন রাজ পর্ব ৭৪

নীতিহীন রাজ পর্ব ৭৪
আশিকা আক্তার সোহাগী

সফল রাজনীতির একমাত্র ফর্মুলা “যখন যা তখন তা হওয়া।”এর বাহিরে কেউ আচরণ করলে সে ঝরে যায়।
নিবিড় কোন সেল্টার কিংবা পার্টিকুলার পার্টির আন্ডারে চলে না।শুধু মাত্র পার্টির ট্যাগটা রেখেছে এই যা।তাই নিচ দিয়ে সবাই নিবিড়ের এগিয়ে যাওয়াকে টলারেট করতে পারছে না।এই সুযোগটাই কাজে লাগিয়েছে কেউ কেউ।
একাধারে গুলি বর্ষনের পর ম্যাগাজিন লোড করার সময় নিবিড় মাথা উচু করে তাকিয়ে লক্ষ্যবস্তুর দিকে রি*ভালবার তাক করে। একটা বড় কালো হাইস গাড়ির জানালা দিয়ে গুলি নিক্ষেপ করছিলো এতক্ষণ । তাদের উদ্দেশ্যে নিবিড় গর্জে উঠে বলে,

‘ব্লা*ডি বা*স্টার্ড। একবাপের বাচ্চা হলে মুখোমুখি লড়াই কর।কাওয়ার্ড।’
গাড়িটা এগিয়ে আসে।নিবিড় সেই গাড়ির সামনের চাকা বরাবর সুট করার সাথে সাথে গাড়িটা হেলতে দুলতে কিছুটা এগিয়ে থেমে যায়।নিবিড় আকাশের দিকে ঝুকে ডেকে জিজ্ঞেস করে ,
‘ঠিক আছিস আকাশ?মক্কু? ‘
আকাশ কপাল চেপে ধরে বলে,’এভ্রিথিং ইজ ওকে ভাই।আজ বেঁচে ফিরলে আপনার কথার আর বিন্দুমাত্র বিপরীতে যাবো না। কসম।’
মক্কু আকাশকে উদ্দেশ্যে করে বলে,

‘রুমাল থাকলে শক্ত করে চেপে ধর।আর বি*ভালবার দে লোড করে দেই?’
‘ভাই নতুন বউয়ের সামনে ওইটা বের করতে ইতস্তত বোধ করতাছিলাম তাই আনি নাই।’
‘এইডা কি বা*লের কথা কইলি? এমন সময়ে কেউ খালি হাতে আসে? এই তোর আক্কেল? ‘
‘কাম ডাউন।আকাশ ইনজুর্ড।ওর কভার দেয়ার দরকার নাই।তুই ডান পাশে দিবি আমি বা পাশে।তারপর নেতিয়ে পড়া ড্রাইভারকে উদ্দেশ্যে করে বলে,
‘জলিল চাচা?ঠিক আছেন? ‘

আকাশ জানায় ড্রাইভারের কাধে গুলি লাগছে।সে সেন্সলেস হয়ে গেছে।এরমাঝে সামনের গাড়ি থেকে নেমে আসে দুইজন কৃষ্ণ বর্ণের লোক।এরা সেই এক্সপোজ ক্যানিবাল সদস্য। যাদেরকে জিয়ানা এক্সপোজ করেছিলো।গাড়ির সামনে দুই হাতে দুইটা ধারালো সোর্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে বলে,
‘শখ নল নিবড় উইদাউট কজিং এনি ট্রাবল কাম উইথ আস।আদার ওয়াজ নো ওয়ান ক্যান সার্ভাইব। ‘
‘খালি ময়দানে ফরোয়ার্ড মার্চ করে কি আর মজা আছে?লাইম লাইটে আসতে কত রকম কাজ ,অকাজ করে এসেছি।শোন রুহানির ডগিস তোরা তোদের ম্মামিকে গিয়ে বল”সুখনীল নিবিড়ের সাথে সস্তা রেন্ডিগিরী যেনো না দেখায়।আর ভালোভালোই রাস্তা ছাড় তানাহলে কি আছে তোদের ভাগ্যে কথা দিতে পারছি না?’
কালোমানব দুইজন মুখ চাওয়া চাওয়ি করে।এরা বাংলা বুঝতে পারলেও বলতে পারে না।তাদের মুখ চাওয়া চাওয়ির মাঝেই গাড়ির পেছনের দরজা খুলে বের হয়ে আসে ছয়জন লোক।যাদের প্রত্যেকের হাতে ধারালো অস্ত্র আর দুইজনের হাতে হ্যান্ড গান। নিবিড় নিজের বি*ভালবাল তাক করেই আছে। কিন্তু ভেতরে তার অল্প ভয় জন্মেছে আকাশ আর মক্কুকে নিয়ে।

এরমাঝে মক্কুর ফোন বাজে।মক্কু একহাতে রিসিভ করে মৃদু চিৎকার করে উঠে। রি*ভালবার তাক করেই সামনে দৃষ্টি রেখে বলে,’ভাই তালহা বেইমানি করছে।ছেলেরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখে কিচ্ছু নাই।’
নিবিড় চোখ বন্ধ করে ফেলে।তবে শেষমেশ মানুষ চিনতে ভুল তার হয়েই গেলো।এইজন্যই জ্ঞানিগুনিরা বলেছে,’অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ। তালহা কখনোই চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতো না।নানা ভাবে নিবিড় পরিক্ষা করেছে সব ছিলো অতি সুক্ষ্ম। অন্য ছেলেপেলেরা যেমন টুকটাক ভুলচুক করেছে কিন্তু এই ছেলে সব সময় অভিডেন্ট আর পাংচুয়াল ছিলো।

এরমাঝেই একজন নিগ্রো চিল্লিয়ে বলে,’কাম আউট কুইকলি।’
নিবিড় আকাশ আর মক্কুকে রেখে বের হয়ে আসে।হাতে রি*ভালবার টানটান সোজা করে তাক করা শত্রু দিকে। চোখ ঈষৎ ছোট করে তাকিয়ে আছে নাক বরাবর। একজন নিগ্রো ব্যাঙ্গ করে বলল,
‘ ইউর ওয়াইফ ইজ সুপার হট।শী হেজ এক্সপোজড আস টু ডেঞ্জার।ইটস ওকে উই ,উই ডোন্ট মাইন্ড।’
পাশের জন নিজের ভরাট গলায় বলে,
‘আই হেভ অলরেডি ডিসাইডেড হুইচ পার্ট অফ হার বডি আই উইল স্টার্ট ইটিং ফ্রম।’
‘আই ওয়ান্ট টু ইট হার ইন বেড ফাষ্ট।’

বলেই দুইজনই বিশ্রী ভাবে হাঁসতে থাকে।বন্য অন্ধকারে গাড়ির হেডলাইটে সেই হাঁসি যেনো সাক্ষাৎ পিচাশ। সাদা দাঁত ছাড়া আর কিছুই দৃশ্যমান নেই।নিবিড়ের মাথার ভেতরে সব এলোমেলো হয়ে রাগ মনে হচ্ছে লার্ভার বিস্ফোরণ হবে।রাগের পারদ কন্ট্রোললেস হয়ে তিড়বিড় করে বেড়ে যায়।হাত কেপে উঠে।পরপর দুইবার টিগারে চাপ দেয় শক্ত করে। একদম কপাল বরাবর সুট করেছে নিগ্রো দুইটার।
আকাশ আর মক্কু অবাক হয়ে তাকিয়ে। ঘটনা কি হলো উপস্থিত কেউ বুঝে উঠার আগেই ধপাস করে শক্ত রাস্তায় নেতিয়ে পড়ে কালো আফ্রিকান দুইজনই।সাথে সাথেই পেছন থেকে ছয়জন গর্জে উঠে।নিবিড় বুঝতে পারে রাগে তার দ্বারা আরেকটা অঘটন ঘটে গেছে।কিন্তু এখন আর পিছু হাটার রাস্তা নেই।সিলিন্ডারে আছে চার গুলি দুইটা সুট করে গাড়ির আড়ালে চলে আসে।অন্ধকারে ঠিক করে টার্গেট করা যাচ্ছে না।অপরদিকে থেকেও বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়া শুরু হলো।
নিবিড় চিল্লিয়ে বলছে,

‘এই সাইড দিয়ে নেমে আয় তোরা।ওদের কাছে যা আছে সেটা দিয়ে আমরা মোকাবিলা করতে পারবো না।এই জায়গার কিছুটা পেছনে একটা জংলা পুকুর আছে।কচুরিপানাতে ভর্তি।সেখানে গিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করতে হবে।কুইক নাম।’
অপরদিকে গুলির শব্দ শুনে জিয়ানার ছটফটানি বেড়ে গেছে।গাড়িতে ঠুসঠাস করে গুলি লাগার শব্দে হাত পা ঘামা শুরু করেছে।কোনভাবেই লক খুলা যাচ্ছে না।পুরাতন গাড়ি হওয়াই ভেতরে হইতো জং ধরে গেছে।জিয়ানার গলা শুকিয়ে আসে।রাফিনকে মেসেজ দেয়’স্যার আমার ফোনের জিপিএস অন করা। এই জায়গায় আমরা বিপদে পড়েছি।নিজে আসুন নইতো কাউকে পাঠান।যত দ্রুত সম্ভব। ‘

জিয়ানার হাত থামে নিবিড়ের গর্জনে।তার গলায় মনে হচ্ছে শ্বাস আটকে গেলো।হাত দিয়ে ধাক্কা দিতে থাকে এবার।
ছয়জনের সাথে জঙ্গল থেকে এসে যোগ দেয় আরও দশ বারোজন।এরপর ঝাপিয়ে পড়ে একত্রে।নিবিড় এই সুযোগেই ছিলো। মক্কু আকাশকে ধরে গাড়ি থেকে নামানো আগেই চা*পাতির কোপ পড়ে মাথায়।নিবিড় গর্জে উঠে আঘাতকারীর বুকে সুট করে। পরের গুলি করে তার পেছনের জনের গলায়।
মক্কু আকাশকে ছেড়ে দুইহাত দিয়ে মাথা চেপে ধরে বসে পড়ে মাটিতে।চোখের সামনে হাজার তারা ঝিলিক দেয়।সেই ঝিলিকেই ভেসে উঠে জেনির রাগী চেহারা।মক্কুর চোখ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ে।শূন্য মাথা অল্প তুলে দেখে হাতের রি*ভালবার পড়ে আছে অদূরেই।নিবিড়ের বুলেট শেষ। আকাশ হামাগুড়ি দিয়ে এসে মক্কুর কাছে যায়।পেছন থেকে আকাশে পিঠে লাত্থি পড়ায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।নিবিড়ের গলা ছেড়ে আকাশ আর মক্কুকে ডেকে উঠে।প্রচন্ড শব্দে নিকটস্থ গাছের কোন বড় পাখি ডানা ঝাপটে শব্দ করে ডেকে উড়ে গেলো।
সেই সাথে তীব্র বেগে ছুটে আসে একটা ধাতব বুলেট। নিবিড় শব্দ শুনেই লাফিয়ে পাশের গাছের পেছনে চলে যায়। মাটিতে শুকনা পাতার ফাঁকে হাতে লাগে একটা আধাভাঙা ইট।আকাশকে মাটিতে ফেলে মাথায় পা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একজন। নিবিড়ের কাছে লাগে সেটা আকাশের মাথা না।তার কলিজা।কলিজায় আঘাতের যতটা তীব্রতা ,এখনকার জ্বলুনিটা তার চেয়েও অধিক।

কালক্ষেপ না করে দৌঁড়ে কাছে গিয়ে ইটের টুকরাটা নিয়ে সেই আততায়ীর মাথায় স্বজোরে আঘাত হানে।ছিটকে দূরে পড়ে ক্রিমিনালটা।এরমাঝে মক্কু হাতে রি*ভালবারটা নিয়ে কোন রকম টলে দাঁড়িয়ে গর্জে উঠে ভাই বলে।
আকাশ তাকিয়ে দেখে পেছন থেকে একজন ছুটে আসছে চাপাতি হাতে।নিবিড় আকাশের থেকে কয়েকহাত দূরে। নিবিড় আকাশের চাউনি দেখে দ্রুত ঘুরে যায় পেছনে।চাপাতিওয়ালার তলপেটে কিক করে উল্টে ফেলে দেয়।মাটিতে পড়ে থাকা চাপাতিটা নিজ হাতে নিয়ে চিল্লিয়ে বলে উঠে,’কি উদ্দেশ্য তোদের? কার লোক তোরা? যদি কোন বোঝাপড়া থাকে তবে সেটা আমার সাথে। এদের দুইজনের গায়ে আর একটা টোকাও যদি পড়ে খোদার কসম আজকে এখানে কেউ বেঁচে ফিরতে পারবি না।সে তোদের যেই বাপই আসুক।’

জিয়ানা কোন কথা শুনতে পাচ্ছে না।সবাই এখন গাড়ি থেকে বেশ দূরে। তবে মাঝেমধ্যে নিবিড়ের গর্জন শোনা যাচ্ছে।সেই গর্জ শুনে ছটফট করছে।পিনটা বাঁকা হয়ে গেছে লকে প্রেস করতে করতে। তবুও কাজ হচ্ছে না।জিয়ানা কোন শব্দ করছে না ইচ্ছাকৃত। কারণ সেও নিরস্ত্র।এই অবস্থায় বের হলে বরং নিবিড়ের আরও টেনশন আর দ্বায়িত্ব বেড়ে যাবে।একহাতে খুলার চেষ্টা চালানোর সাথে সাথে মেহেদী ,রাফিন আর আক্কাসের নাম্বারে কল করার চেষ্টা করছে। গাড়ির ডিকির জন্যই নাকি বনাঞ্চলের জন্যই এখানে নেট পাচ্ছে না ঠিক করে।আক্কাসের নাম্বারে কল ডুকলে জিয়ানা ফিসফিসিয়ে বলে সব।আর বাহিনী সব নিয়ে আসতে বলে কালিয়াকৈরে আগে ধামরাই শেষ হলো সেই জায়গায়। আর রাফিনকে মেসেজ দিয়েছে বেশ কয়েকটা।
অপরদিকে জিয়ানার হাত আবার কেপে উঠে নিবিড়ের গর্জনে।

রক্তের স্রোতে মক্কুর শরীর ভেসে যাচ্ছে।নিজেকে আর ধরে রাখতে পারছে না।কোনরকম রি*ভালবারটা নিবিড়ের দিকে ছুড়ে দিয়ে আবার বসে পড়ে মাথা চেপে।নিবিড়কে কেউ অস্ত্র দিয়ে আঘাত করছে না।সব ফ্রি হ্যান্ড ফাইটিং হচ্ছে।এরমাঝে একজনকে নিবিড় খুব বাজে ভাবে গাছের গোড়ায় মাথা ঠুকে দিলে অপজিটের ব*ন্দুকধারী মনে হয় নিজের টেম্পার হারালো।খুব টেকনিক করে সুট করে নিবিড়ের হাত বরাবর। অপরদিকে নিবিড় মুভ করতে থাকায় আকাশ দৌঁড়ে গিয়ে নিবিড়কে জড়িয়ে ধরে মাটিয়ে লুটিয়ে পড়ে।
শক্তিশালী ধাতব বুলেট হওয়াই সেটা আকাশের বুক ছিদ্র করে নিবিড়ের শরীরেও বিদ্ধ হয়েছে।নিবিড়ের কাছে মনে হলো হাত পা সব একসাথে আলাদা হয়ে গেলো শরীর থেকে।মাথায় নিগুঢ় অন্ধকার নেমে এলেও সেই অন্ধকার চিড়ে ভেসে এলো একটা ঝলঝলে চেহারা।আকাশ আর নিবিড়ের রক্তে মিশে একাকার।আকাশের কোন নড়াচড়া নেই।শুধু একবার বিড়বিড় করলো ‘আরিফা আ’ম সরি।’

নিবিড়ে এই প্রথম খুব ইচ্ছা হলো ছেলেটাকে একটু শাসনের পরিবর্তে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে।কিন্তু হাত মনে হয় বেইমানি করলো নিজের সাথে সে নিথর হয়ে পড়ে রইলো মাটিতে বিছিয়ে থাকা শুকনা পাতার উপর।
মক্কু হামাগুড়ি দিয়ে এসে দুইজনকেই জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে।অস্পষ্ট একটা কথায় বের হলো শুধু ,’আমার ভাই,আমার ভাই।’
পাশ থেকে একজন এসে মক্কুর মাথায় স্বজোরে লাত্থি দিয়ে ফেলে দেয় মাটিতে।আগের চাপাতির আঘাতে নতুন আঘাত পাওয়াই মক্কু ব্ল্যাক আউট।নিভে এলো চোখের দ্রুতি আর মস্তিষ্কের ধারণ ক্ষমতা।

মেহেদী রাফিনের আগে সেখানে পৌঁছায় নিবিড়ের ক্লাবের ছেলেপেলের গাড়ি।তারা যখন ভাই ভাই করে ডাকছে তখন জিয়ানা শব্দ করে গাড়ির ডিকিতে।অনেকক্ষন থেকে স্তব্ধ হয়ে আছে চারপাশ।মিনিট পাঁচেক আগে একটা বুলেটের শব্দের পর সব নিশ্চুপ।বন্য পরিবেশে এমন নিশ্চুপতা বড্ড নিষ্ঠুর ঠেকলো জিয়ানার কাছে।
ছেলেগুলা গাড়ির ডিকি খুলে জিয়ানাকে বের করে অবাক।জিয়ানা দ্রুত চারপাশ চক্কর কাটে আর বলে ,’খুব খারাপ কিছু হয়েছে সুখদের সাথে।সবাই ফোনের ফ্ল্যাশ লাইট জ্বালিয়ে আশেপাশে খুজুন।কুইক?’
জিয়ানা বলতে বলতেই স্লিপ কাটে মাটিতে।লাইট দেখানে ফেলে চিৎকার করে উঠে,’ র*ক্ত এখানে। শুকনা পাতা ভিজে আছে র*ক্তে।এখানে একটা কচুরিপানার ডোবা আছে সুখ ওদের সেখানে যেতে বলেছিলো।চলুন তো সেখানে?’

জিয়ানারা দুই মিনিট হেঁটে এসেই দেখা পায় সেই ডোবাটার।রাতের কারণে বুঝা যাচ্ছে না এটা কোন পুকুর।ছয়জনের হাতেই ফোনের ফ্লাশের আলোতে চারপাশ বেশ ভালো বুঝা যাচ্ছে।
এরমাঝে গড়গড় করে একটা শব্দ ভেসে এলো।পশু জ*বাইয়ের পর যেমন শব্দ করে কাটা গলা দিয়ে ঠিক তেমন শব্দ।শব্দের উৎসের দিকে গিয়ে একটা ছেলে আর্তনাদ করে উঠে মক্কু ভাই বলে।ঝাপিয়ে নেমে যায় পানিতে।জিয়ানা হন্নে হয়ে আশেপাশে তাকিতুকি করছে।মনে মনে নিজেকে শান্ত রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’লা ইল্লাহা ইল্লা আনতা সুবাহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জোয়ালিমিন ‘পড়তে পড়তে চারপাশে চক্কর কাটছে।ভেতরে শুকিয়ে কাঠ।
মক্কুকে দুইজন পানি থেকে বের করে আনে।অপরপাশে আকশের শার্ট ভেসে উঠতে দেখে আরও দুইজন নেমে পড়ে পানিতে।জিয়ানার পাগল পাগল লাগে।না চাইতেও মিম জেনি আর সর্বশেষ নিবিড়ের মুখ ভেসে উঠে ভেজা চোখের পর্দায়।মক্কুর ফাঁটা মাথা আর আকাশের বুকের ক্ষত দেখেই জিয়ানার নাড়িভুঁড়ি উল্টে আসে।মাটিতে হাটু গেরে বসে গলগল করে বমি করে। অনেকটা শ্লেষ্মা বের হওয়ার পর জিয়ানার বমি ভাব কমে আসে।পরক্ষণেই মাথা চাড়া দিয়ে উঠে জেনি আর মিমের বিধবা সাজের দৃশ্য।নিজেই নিজের গলা চেপে ধরে শক্ত করে।কান্না বের হতে চাইলেও সেটা বের হতে দেয় না।

সবাই ধরাধরি করে গাড়িতে উঠানোর সময় মক্কু বিরবির করে বলে,
‘ভাইকে নিয়ে গেছে।রুহানী।’
আকাশের নার্ভ নেই।জিয়ানা হাত ধরে গাড়িতে উঠানোর সময়ই টের পেলো।হু হু করে উঠে অন্তরাত্মা। তিনজন গাড়িতে করে ছুটে আকাশ আর মক্কু কে নিয়ে হাসপাতালের দিকে।বাকি তিনজন থাকে জিয়ানার সাথে।এরমাঝে মেহেদী এসে উপস্থিত হয়।সে জানায় গাড়িতে বসেই নিবিড়ের ফোন ট্র‍্যাক করতে পেরেছে।লোকেশন আশেপাশেই।
জিয়ানা বলে মক্কু আরা আকাশের অবস্থার কথা। আর মক্কু বিড়বিড় করে বলেছে রুহানীর কথা।মেহেদী বলে,
‘এই একটু পরেই রেজাউলের খামার বাড়ি। সেখানেই আছে তবে।’
জিয়ানা ছুটতে ছুটতে বলে,’তবে দ্রুত চলুন।’

জিয়ানার পাকা রাস্তা ধরে হাটার সময় আক্কাস আর রাব্বি আর একটা ছেলে একটা আধমরা গেরেজের ট্রায়াল বাইককে চড়ে বটবট শব্দ করতে করতে হাজির হয়।
জিয়ানারা আটজন ভাগ হয়ে যায় তিন গ্রুপে।খামার বাড়ির চারপাশ তারের বেড়া দেয়া।মেহেদী বেড়ার একটা পিলারের লাত্থি দিয়ে ফেলে দেয়।বেড়ার সেই দিকটা মাটিতে পরে যায়।আর সেদিক দিয়ে সবাই জাম্প করে ভেতরে ঢুকে।সবাই নিচু হয়ে আলাদা আলাদা ভাবে আগাতে থাকে সেদিকে ,যেদিক থেকে মানুষের কথার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিলো।অনেক গাছ গাছালির জন্য আড়াল করে আগাতে পারছে জিয়ানারা।তবে খামার বাড়ির ছাদ থেকে দুইটা বড় বড় টার্গেট লাইট অনবরত এদিক থেকে ওদিকে টহল দিচ্ছে।
মেহেদী জিয়ানাকে বলে,ভেতরে কতজন আছে আমরা জানি না।রাফিন পুলিশ নিয়ে আসছে।তাই আমাদের একটু অপেক্ষা করা উচিত।’

‘না আমি একমিনিট অপেক্ষা করতে রাজি না ভাইয়া।আমার সুখকে ওরা নিশ্চয়ই এখানে অতিথি করে আনে নাই?’
মেহেদী পূর্ণদৃষ্টিতে তাকায় জিয়ানার দিকে।ঘেমে একাকার অবস্থা।চোখ ভেজা।এই প্রথম মেয়েটা তাকে উল্টাপাল্টা ছাড়া সোজাসাপটা ভাইয়া ডাকলো।কেমন আপন আপন অনুভূত হলো মেহেদীর।আপনই তো তার বোন হয়।
মেহেদীর ভাবার মাঝেই জিয়ানা ঘরের দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে গেছে।মেহেদীও পায়ে পায়ে জিয়ানার কাছে যায়।
জিয়ানা কাঠের জানালার ফাঁকে চোখ রেখে কিছুক্ষণ দেখে বলে,
‘অনেক বেশি মানুষ ভেতরে। ‘
মেহেদী ফিসফিসিয়ে বলে,

‘আমি ফাঁকা একটা গুলি ছুড়ি।তবে বেশিরভাগ বেরিয়ে আসবে বাহিরে।আর তখন তুমি ভেতরে ঢুকে যাবে।’
জিয়ানার পছন্দ হয় মেহেদীর প্রস্তাব।মেহেদী একসাইডে চলে গিয়ে গুলি ছুড়ে টহল দেয়া লাইট ম্যানের উপর।অভ্যস্ত না হওয়াই গুলি গিয়ে লাগে কোন ধাতব পিলারে।আর ‘টং করে একটা শব্দ বের হয় শুধু। ‘
গুলির আওয়াজে ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে অস্ত্র হাতে কয়েকজন।চারপাশে চিল্লাচিল্লি শুরু হয়ে গেছে।যারা বের হয়েছে জিয়ানা তাদের পেছন দিয়ে গিয়ে ভেতরে ঢুকে দরজা আটকে দেয় ঘরের।

বড় ফাঁকা একটা ঘরের একপাশে অসংখ্য পাটের বস্তায় ভরা কিছু খামাল করে রাখা।আরেকপাশে কৃষি কাজের ব্যবহারের যন্ত্রপাতি। মাঝামাঝি রুহানি আর শ্যামল হাসান একটা ছোট্ট টেবিলের সামনে বসে আছে কাঠের টোল টাইপ একটা চেয়ারে।তাদের ঠিক পাশেই লোহার চেয়ারে হাত পা বাঁধা র*ক্তাক্ত নিবিড়। হাত পা নেতিয়ে থাকলেও মাথা না ঝুকিয়ে পেছনে ঠেক দিয়ে রেখেছে। জিয়ানার ঠোঁট কেপে উঠে।বেঁচে আছে তো এই আশঙ্কায় পা বাড়ায়।কিন্তু ঢুকার সাথে সাথেই পেছন থেকে একজন আচম্বিতে গিয়ে গলায় ছুরি ধরে।আরেকজন এসে হাত বেঁধে ফেলে।শ্যামল হাসান আর রোহানী কিটকিটিয়ে হাঁসছে।শ্যামল হাসান বাকা হেঁসে বলে,
‘ওয়েলকাম বউমা।এত ফাষ্ট এখানে তোমাকে আশা করিনি আমরা।’
‘ভুলটা আমাদেরই আংকেল।এরা হাজবেন্ড ওয়াইফ আবার ডাবল প্লে রুল করতে পারদর্শী। ‘
‘তা তো বটেয়।তানাহলে সেদিন চুক্তি করেও নিবিড় চুক্তি ভঙ্গ করতো না।ওর জন্য আমার কোটি কোটি টাকা গচ্ছা গেছে।’

‘আপনার তো টাকা। আর আমার ড্যাডকেই যে কেড়ে নিয়েছে সেটা?’
‘পলিটিক্সে কোন ইমশনাল ফুলদের পাত্তা নেই।এখানে আমি আত্মীতা করতে গিয়েই ধরা খেয়েছি বেটি।’
কাধের ব্যাথাটা চিনচিনিয়ে নিচে নামছে আবার ঝমঝমিয়ে মাথা চাড়া দিয়ে উপরে উঠে যাচ্ছে।শরীর ঘেমে ছপছপ হয়ে যাচ্ছে তবুও নিবিড় তার গলা যথাসাধ্য স্বাভাবিক রেখে বলে উঠে,
‘আই ফিল পিটি ফর ইউ শ্যামল হাসান।পলিটিক্সকে মুদির দোকান ভেবে দুনম্বরি কারবার করবেন আর আমি নিবিড় সেসবে সাথ দিবো? যেটা করেছি সব ভান। কালকের মাঝে আপনার সব বো*ম করে বিস্ফোরিত হয়ে আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে যাবে।’

‘পলিটিক্স একটা ব্যাবসায়ীক প্রতিষ্ঠান। সবার জন্যই।তোমার বাবা দাদারাও সেই পথেই হেটেছে।আমরা জানি তুমিও সেটাই অনুসরণ করবে।শুধু সব একা ভোগ করতে চাচ্ছো তাই তো? এবার জাহান্নেমে গিয়ে সব ভোগ করবে।ভালোই ভালোই সব হিসসা দিতে চেয়েছিলাম সেটা তো পছন্দ হলো না? শত্রুতা যখন করেছোই সেটার ফল তো ভোগ করতেই হবে মামা?এবার নিজের জান আর স্ত্রীর জীবনের পরোয়া করলে ভালোই ভালোই সব প্রমাণ কোথায় রেখেছো সেটা বলে দাও?’

‘প্রকাশ্য শত্রুর চেয়ে সুবিধাবাদীরা বেশি ক্ষতিকর। আপনাকে আমি কোন দিনই না বন্ধু আর না আত্মীয় মেনেছি।মানুষের চামড়ার উপর গিদরের চামড়া যার তাকে সুখনীল নিবিড় গুনায় রাখে না।আর যে আপনার কাছে বিক্রি হয়েছে প্রমাণ তার কাছেই আছে।সে নিজ দ্বায়িত্বে সব নিউজ চ্যানেলে দিয়ে এসেছে।’
জিয়ানা অবাক হয় এদের কথাবার্তায়। নিবিড় মাথা ধীরে সোজা করে স্থির চোখে তাকায় সামনে।আহত চিতার মতো স্থির নজর।চোখের পাশটাই কালচে হয়ে ফুলে আছে।ঠোঁটের নিচেও কাটা। সেখানে র*ক্ত শুকিয়ে আছে।
এরমাঝে একজন এসে জিয়ানাকে চেইক করার জন্য আগালে নিবিড় গর্জে উঠে ,’ডোন্ট টাচ হার।’
রুহানির চোয়াল শক্ত হয়ে যায়।বসা থেকে দাঁড়িয়ে গিয়ে বলে,

‘কে কোথায় আছিস ওর বউকে ভালো মতো চেক কর।আর যাহ উন্মুক্ত করে দিলাম যা খুশি তাই কর।’
দুইজন এগিয়ে এসে জিয়নার কোমরে হাতানো শুরু করলে নিবিড় র*ক্তে মাখা ঠোঁট হিসহিসিয়ে বলে,
‘শু*য়রের বাচ্চা। জেন্ত পুতে ফেলবো।ছাড় ওকে?’
শ্যামল হাসান কুটিল হেঁসে বলে,
‘দেখো আমি মামা শ্বশুর হই।এইসব তরল রসিকতা আমার সামনে করো না।যে কাজের জন্য এনেছি ফটাফট সেটা শেষ করে ফেলো।’
রুহানী কিটমিটিয়ে হেঁসে আবার চেয়ারে বসে বলে,’আপনার হিসাব আর আমার হিসেব আলাদা আংকেল।’
জিয়ানার দিকে তাকিয়ে বলে,
‘পা ধরে মাফ চাও জিয়ানা।তোমার অবস্থান আমার পায়ের নিচে সেটা তোমার হাজবেন্ডের দেখা উচিত। মাফ করলেও করতে পারি।’

নিবিড় রক্তাক্ত অবস্থাতেও গোগানি ছাড়ে। পাশ থেকে একজন এসে নিবিড়ের পেটে আবার ঘুঁষি মারে।নিবিড়ের চোখের সামনে অসংখ্য তারা ভেসে উঠে।যারা উজ্জ্বল হয়ে ঘোলা হতে শুরু করলো। কানে একশো রেলগাড়ী চলার শব্দ একসাথে হচ্ছে।
জিয়ানা হুড়মুড়িয়ে রুহানীর কাছে গিয়ে হাটু গেড়ে বসে। নিবিড়ের মোচড়ামুচড়ি বাড়ে।রুহানী ইশারায় হাত খুলে দিতে বলে।এবার নিবিড়ের রক্তের লালা ঝরা মুখে হাঁসি ফুটে।
জিয়ানার বাধন খুলে দেয়ার সাথে সাথে জিয়ানা রুহানীর পা চেপে ধরে। মাথা নিচু করে ফেলে।রুহানী অট্টহাসি দিয়ে চেয়ারে হেলান দেয়।জিয়ানা নিচু হয়েই আড়চোখে নিবিড়ের দিকে তাকায়।তারপর রুহানি চেয়ার থেকে বাতাসে।বাতাস থেকে সোজা স্বজোরে দেয়ালে আছড়ে পড়লো।জিয়ানা এক পা আর এক হাতে ডিগবাজি দিয়ে নিবিড়ের পাশের ছেলেটাকে ঘাড় বরাবর হাতের গাদা দিয়ে আঘাত করে। তৎক্ষনাৎ সাইড চেঞ্জ করে অপরপাশের খালি চেয়ার দিয়ে গুন্ডাটার মাথায় মারে।শ্যামল হাসান হা হয়ে গেছে।

অপরদিকে প্রচন্ড ব্যাথায় নিবিড়ের শরীরে যেনো টগিবগে গরম লার্বার স্রোত।চোখের সামনে ফুলকি ঝড়ছে।হাড় গুলা মনে হয় খসে পড়তে চাচ্ছে শরীর থেকে।অসহ্য ব্যাথায় মস্তিষ্কের নিউরনে ছুটাছুটি বন্ধ করে দিয়েছে।তারা ধর্মঘট করতে চাচ্ছে যেনো।ব্যাথাটা কাধ থেকে উৎপন্ন হয়ে সারা শরীর ছড়িয়ে দিচ্ছে।
জিয়ানা চিল্লিয়ে উঠে বলে,’ওর শরীরের এক এক ফোটা রক্তের বিনিময়ে তোদের শরীর থেকে রক্তের নহর বয়বে আজ।আমি জিয়ানা হক কসম করে বলছি আজকে এখান থেকে একটাকেও জীবিত বের হতে দিবো না।’
দ্রুত সাইডে রাখা যন্ত্রপাতি থেকে পিচফর্ক উঠিয়ে আনে।এরমাঝে জানালা দিয়ে আক্কাস আর রাব্বি ঢুকে যায়।জিয়ানা দ্রুত সেই পিচফর্ক এনে সামনে যাকে পাচ্ছে একাধারে সর্বশক্তি দিয়ে মে*রে যাচ্ছে।রুহানীর কাছে শ্যমল হাসান দৌঁড়ে যায়।দরজা ভেঙে মেহেদী প্রবেশ করে।দ্রুত গিয়ে নিবিড়ের হাত পা খুলে দেয়।বা কাধে দুই ইঞ্চি ছিদ্র হতে গলগল করে রক্ত ঝরছে।পকেট হাতরে রুমাল বের করে সেটা দিয়ে চেপে ধরে শক্ত করে। নিবিড়ের চোয়াল শক্ত হয়ে নাক দিয়ে জোরে নিশ্বাস ছাড়ে।

মেহেদীকে লাত্থি দিয়ে উল্টিয়ে ফেলে দেয় গার্ডের পোশাক পড়া একজন। জিয়ানা দৌঁড়ে এসে পিচফর্ক দিয়ে স্বজোরে আঘাত করে পিঠে।তখন আক্কাশ রাব্বি আর ক্লাবের দুইজন ভেতরে ঢুকে।জিয়ানাকে পেছন থেকে লত্থি দিয়ে ফেলে দেয় গার্ডদের একজন।এরা কয়েকজন খাকি পোশাক পড়া।জিয়ানা মাটিতে পড়েই স্প্রিং এর মতো হাটু ভাজ করে জাম্প করে উঠে পড়ে।জিয়ানার তিন পাশে তিনজন।একজন এসে পাঞ্চ করলে জিয়ানা দুইহাত দিয়ে আটকায়।পাশের জন্য ঘুষি ছুড়ে মুখ বরাবর। একটু সাইড হয়ে ঘুরে যাওয়াই ঘুষিটা ঠোঁটে লেগে কেটে যায়।থু করে র*ক্ত ফেলে ডান পা ঘুরিয়ে বাম পা দিয়ে হুক কিক করে পরপর কয়েকটা।

নিবিড় উঠে দাঁড়ালো। পায়ের শক্তি কমে এসেছে।কিন্তু মনের শক্তিতে টলমলে এগিয়ে যায় জিয়ানার দিকে।নিচ থেকে পিচফর্কটা উঠিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে হাতের সাহায্যে।এরপর যে গার্ডটা জিয়ানাকে চেক করেছিলো সেটার দিকে এগিয়ে পিচফর্কটা পিঠে গেথে দেয়।চিৎকারে বদ্ধঘরে ইকো হয়ে ফিরে আসে।টান দিয়ে খুলে আবার গেথে দেয় বাহুতে।জিয়ানা ফাইটিং থামিয়ে শঠ নিবিড়কে দেখে আৎকে উঠে।অনবরত র*ক্ত ঝরছে নিবিড়ের কাধ থেকে।
নিবিড় টলে উঠে ধপ করে বসে পড়ে মাটিতে।জিয়ানা দৌঁড়ে নিবিড়কে আগলে নেয়।
নিবিড় টলানো মাথা নিয়ে জোর করে জিয়নার দিকে তাকায়।মেয়েটা শব্দহীন কাঁদছে।কি আদুরে লাগছে মেয়েটাকে।নিবিড়ের কষ্ট কমে আসে।সে মনে মনে খুব চেয়েছে জিয়ানা কখনো নিজের পরিবারের জন্য প্রকাশ্যে কাঁদুক। আজ কাঁদছে তার জন্য।নিবিড়ের চোখে ভেসে উঠে আকাশ আর মক্কুর নিথর শরীর।ভাঙা কন্ঠে জিজ্ঞেস করে ,
‘আকাশ, মক্কু?’

জিয়ানার চোখের পানি এবার বাঁধভাঙ্গে। নিবিড় চোখ বন্ধ করে শরীর ছেড়ে দেয় জিয়ানার উপর।রাফিন সহ পুলিশ আসে এর মাঝেই।
অচেতন্তার প্রারম্ভে নিবিড়ের মন আর মস্তিষ্ক থেকে যেনো একটা নতুন চেতনা ছিটকে বেড়িয়ে এলো।নিবিড় একান্তই যাদের ভালোবেসেছে তারাই তার জন্য বুক পেতে দাঁড়িয়েছে।

তবে সে যদি সত্যি সত্যি এদেশের আপামর বাঙালির ভালোবাসা অর্জন করতে পারে? তবে?সে যদি মাও সেতুং ,লেলিন আর ফ্রিদেল কাস্তদের মতো এক যুগোপযোগী সিস্টেমের দিকে ধাবিত হয় তরুনদের নিয়ে। তবে কি পরিবর্তন সম্ভব? নিবিড় তো জাষ্ট ফেস অফ পার্টি।আসল নির্দেশনা তো সব আসে কেন্দ্র থেকে।বিপুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েও যদি মাও সেতুং সেদিন তাতু নদীর তীরে নব্বই হাজার মুক্তিফৌজ নিয়ে আন্দোলন করে চিনের হাল বদলাতে পারে। তবে এত তথ্য প্রযুক্তির যুগে সে কেনো পারবে না?সে কেনো পারবে না তাতু নদীর ঝুলন্ত কাঠের ব্রিজের উপর ঝাকেঝাকে অগ্নিদগ্ধ বীরদের মতো নিজেকে জ্বালিয়ে পেছনের জনের জন্য সুগম রাস্তা বানাতে? কেন সে একজন চেঞ্জমেকার হবে না?তার জন্য তার পার্টির জন্য তার ছেলেরা যদি মৃত্যুতে বিনাদ্বিধায় আলিঙ্গন করে নিতে পারে ,তবে নিবিড় কেনো স্বচ্ছ রাজনীতি করবে না?
নিবিড়ের শরীর ঝাক্কি দিয়ে উঠে।অতিরিক্ত ব্লাড লসে শরীর ফ্যাকাসে পাথর হয়ে আসে।
দুইটা কাপুনি দিয়ে নিবিড়ের মুখ দিয়ে ফেনা বের হয়।সে ট্রামালাইজড হয়ে যাচ্ছে।শরীর পাথরের মতো শক্ত হয়ে এলো।

জিয়ানা ‘সুখ ‘বলে গলা ছেড়ে একটা চিৎকার করে উঠে।নিবিড় ঠোঁটের কোনা বাকিয়ে আস্তে করে বলে ,
‘আমি কাউকেই ভালোবাসি না চাঁদ।কারণ আমি যাদের ভালোবাসি তারা হারিয়ে যায়।’
রাফিন আর মেহেদী সহ ক্লাবের ছেলেরা নিবিড়কে ধরে বাহিরে নিয়ে আসে।ভেতরের বাকি কাজ পুলিশ করবে।
এম্বুলেন্সে জিয়ানা আর রাফিন উঠে নিবিড়ের সাথে।রাফিন আঘাতপ্রাপ্ত স্থান চেপে ধরে আছে শক্ত করে।হাত ভিজে যাচ্ছে তার।জিয়ানা নিচে বসে নিবিড়ের ডান হাত নিজের মুঠোয় নিয়ে বসে তাকিয়ে আছে তার মুখের দিকেই।হাত ঠান্ডা হয়ে আসছে ক্রমান্বয়ে। জিয়ানার মনে ভয় ডুকে।চিৎকার দিয়ে কান্না পায়।চোখ দিয়ে আজ পানির বহর।যে জিয়ানা সারাজীবন মনে করতো অন্যদের চোখে ল্যাক্রিমাল গ্রন্থির আকার বড় আর তার ছোট। তাই পানি আসে না সেই জিয়ানা আজ উপলব্ধি করলো ভরসা আর স্বস্তির জায়গা নড়বড়ে হলে ল্যাক্রিমাল গ্রন্থি নিজে নিজে বড় হয়ে যায়।
জিয়ানা কান্নাটা গিলে নেয়ার চেষ্টা করলো ,কিন্তু সেটা দলা পাকিয়ে কন্ঠানালীর রাস্তা বন্ধ করে দিতে চাইছে।তবুও কোন রকমের মুখে বলল জিয়ানা,

-খবরদার সুখ চোখ বন্ধ করবেন না। আপনি এখনো আমাকে একটুও ভালোবাসলেন না।আপনি মরতে পারেন না।আমার সারাদুনিয়ার কাছে কোন এক্সপেকটেশন না থাকলেও আপনার আছে।বুঝতে পেরেছেন?আপনি যদি মরে যান।কখনই ক্ষমা করব না। সবাইকে আমি ইন্সট্যান্ট ক্ষমা করলেও সারাজীবন আমি আপনাকে ক্ষমা করব না।বুঝেছেন আপনি? শুনতে পারছেন সুখ?
আমাকে একা রেখে যাবেন না।আমার কেউ নেই আপনি ছাড়া। আপনি আমার অভ্যাস, আপনি আমার শরীরে মিশে গেছেন।চলেই যদি যাবেন তবে অভ্যাস করালেন কেনো? কেনো কাছে টানলেন?খবরদার একটুও চোখ বন্ধ করবেন না।জিয়ানা কোন ছেলে খেলা না। তার ভালোবাসা এত সস্তা না।ভালোবাসা শুধু নিবেন দিবেন না সেটা হবে না।বুঝতে পেরেছেন? ভন্ডনেতা? কাবলিওয়ালা আমার কষ্ট হচ্ছে খুউব।আপনি না আমাকে কাঁদতে দেখতে চেয়েছেন দেখুন আমি আপনার জন্যই আকুল হয়ে কাঁদছি।আমার জমানো সব চোখের জল আপনার জন্যই পড়ছে।এই চোখের জল বৃথা হতে দিবেন না প্লিজ।প্লিজ প্লিজ চোখ খুলুন।সুখ।
নিবিড়ের দুইগালে আলতো ঘনঘন চাপর দিয়ে বলেই যাচ্ছে জিয়ানা।
বিশ থেকে পঁচিশ মিনিট পর হাসপাতে পৌঁছায় এম্বুলেন্স। নিবিড়কে নিয়ে ঢুকে যায় লাল বাত্তিওয়ালা রুমে।জিয়ানা পা মেলে বসে পড়ে সেটার সামনেই।

এখানে একা একটা নিস্য দ্বীপের মতো বসে আছে জিয়ানা।এই কসমোপলিটান শহরে জিয়ানা একা।তার বাবা-মা ,ভাই কেউ নেই। যে ভাগ্যের সাথে এটাচ হয়ে গিয়েছিলো সেও আজ নিথর হয়ে পড়ে আছে চারদেয়ালের মাঝে।
জিয়ানার ভাগ্যটাই কেমন যেনো? কোন সম্পর্কই বেশিদিন ভালো থাকে না।
যে কেউ এখন জিয়ানার দিকে তাকালে দেখতে পেলো এতিম নিঃস্ব বিধ্বস্ত এক তরুণী এলোমেলো হয়ে বসে আছে।যার চোখে না আছে ভয় আর না নতুন করে কষ্টের অনুভূতি। শুধু নতুন করে আবার একা হবার একটা সঙ্কা।
কিন্তু সৃষ্টিকর্তা যাকে কিচ্ছু দেন না তাকে দেন অসীম শক্ত মনোবল। যার কাছ থেকে সব কেড়ে নেয়া যায় কিন্তু এমন একটা মনোবল থাকে যেটার জোরে বাহির থেকে তাকে দিব্বি স্বাভাবিক মনে হয়।
‘যার নাই আবাহন তার নাই বিসর্জন।’ জিয়াউলের এই নীতিটা জিয়ানা ধারণ করতে পারেনি।সে নিবিড়ের সাথে জুড়ে গেছে।তাই আবাহন না চাইতেও এসেছে। এবার তাই বুঝি তারই বিসর্জনের পালা?

অপরপাশে মেহেদী আর রাফিন খুব উদ্ধিগ্ন হয়ে কথা বলছে। হুড়মুড় করে মানুষ জমা হওয়া শুরু করলো সেখানে।মিনিট পাঁচেকের মাঝে কানায় কানায় মানুষের পূর্ণ হয়ে গেলো হাসপাতাল প্রাঙ্গণ।এরমাঝেই জেনি জিয়াউল আর আঞ্জুমান হুড়মুড় করে ঢুকে সেখানে।
একজন নার্স কি যেনো বলল জেনি ঢলে পড়ে নিচে।আঞ্জুমান আর জিয়াউল ধরাধরি করে চেয়ারে বসে।আঞ্জুমানের ছটফটানি নিষ্পল তাকিয়ে দেখছে জিয়ানা।কাতর জিয়াউলের মুখটাও দেখলো খুতিয়ে।
এরমাঝে লাল শাড়ি এলোমেলো বধূ সাজে দৌঁড়ে সেখানে প্রবেশ করে মিম।শাড়ির কুচির ভাজ মনে হয় খুলে গেছে।কেমন পায়ের কাছে প্যাচিয়ে যাচ্ছে।আচ্ছা চারপাশ এমন মিউট কেন? জিয়ানা কিচ্ছু শুনতে পাচ্ছে না।শুধু সব দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট।

ডাক্তার নার্সদের ছুটোছুটি করতে কষ্ট হচ্ছে এই ভীড়ের মাঝে।তাই একজন ওয়ার্ডবয় এসে সবাইকে সাইড করে দিচ্ছে বারবার।এরমাঝে এক রুম থেকে বের হয়ে এলো ডাক্তার। উনি কিছু একটা বলতেই মিম ফ্লোরে বসে যায়।আর আকাশের বাবা বুক চেপে পড়ে যায় শক্ত ফ্লোরে। আকাশের মা স্তব্দ হয়েই দাঁড়িয়ে। জিয়ানার কিচ্ছু দেখতে বা শুনতে ইচ্ছা হচ্ছে না।সে চোখ বন্ধ করে ফেলে দেয়ালে মাথা হেলান দেয়।
জীবনে যখন কিছু ঘটে না,তখন একেবারেই ঘটে না।আবার যখন ঘটে তখন হড়বড়িয়ে সব ঘটে যায়।ভালোরা তখন গাল ফুলিয়ে রাখে মুখ অন্যদিক করে।
অনেকক্ষণ পর জিয়ানা না চাইতেও চোখ মেলে।একটা স্ট্রেচার সামনে এনে রাখে একজন ওয়ার্ডবয়।যেটাতে সাদা কাপড় দিয়ে ডাকা কেউ।আকাশের মা বিকট চিৎকার করে উঠে।মিমকে টেনে তুলে শক্তি দিয়ে চ*ড় দিয়ে নিজেই নিজের বুকে কিল দেয়া শুরু করল।
জিয়ানা এলোমেলো পায়ে উঠে দাঁড়ালো।ফ্লোরে পড়ে মাথায় ঠুকে আহাজারি করা মিমের কাধে হাত রাখে।মিম ঝাপিয়ে পড়ে জিয়ানার বুকে।জিয়ানা এবার কথা শুনতে পারে,

‘আমার তো প্রয়োজন শুরু আগেই ফুরিয়ে গেলো জিয়ানা।আমার চার আঙুলের কপালে কেনো চারকোটির দুঃখ লেখা ?আমার উনাকে এনে দাও।একবার জিজ্ঞেস করি,কেনো এই মোহে ফেলে উনি চলে গেলেন?কেনো আমার শরীরে থেকে সোহাগের চিহ্ন মুছার আগে উনি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেন?কেনো আমার তার সাথে দুইদিনও সংসার করা হলো না? উফ আমি এই জীবন কিভাবে বয়ে বেড়াবো?আমাকেও উনার সাথে মাটির নিচে রেখে আসো কেউ।কেউ কি আমাকে একটু ভালোবাসো না? তবে কেনো শুনছো না আমার কথা?আমাকেও কবর দাও তোমারা।ওই স্বার্থপর লোকটার মতো আমাকেও কবর দিতে নিয়ে যাও।আমি এই আলোবাতাস সহ্য করতে পারছি না।আমার গলায় হাজার মণের কষ্টের দলা আটকে আছে।মালাকুল মাউত আপনি কেনো আমাকে চোক্ষে দেখছেন না? উনাকে যেহেতু নিতে পেরেছেন তবে আমাকেও নেন।আমাকে এই বিষাক্ত পৃথিবীতে ওই লোকটার দুইদিনেই কেনো মোহে ফেলে গেলো?চলেই যদি যাবে তবে কেনো এত যত্ন করলো?কেনো মিছে মায়ায় জড়ালো?আমি কি চেয়েছিলাম? কেনো আমাকে লোভ দেখিয়ে এখন স্বার্থপরের মতো চুপচাপ শুয়ে আছে?প্রতারক। কখনোই মাফ করবো না আপনাকে আমি! আপনি একজন স্বার্থপর লোক।আমি আপনাকে ঘৃণা করি।’

জিয়ানাকে ছেড়ে হুড়মুড় করে উঠে দাঁড়ালো মিম।স্ট্রেচারে শুয়ে রাখা আকাশের উপর গিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে। তারপর ঢলে পড়ে ফ্লোরে।মিমের পরিবারের সবাই এসে হাজির হয় সেখানে।তারা একসাথে আহাজারি করছে।মিমের মা মিমকে গালাগালি করছে অপয়া অলক্ষ্মী বলে।মিমের বোন জ্ঞানহীন মিমকে টেনে নিজের কোলে নেয়ার চেষ্টা করছে।
আহ জিয়ানার আর কিচ্ছু সহ্য হচ্ছে না।হাতের কাছে একটা কিছু পেলে মাথায় আঘাত করে এই অসহ্যকর পরিস্থিতি থেকে চিরমুক্তি নিতো।
হঠাৎ এসকেপিষ্ট মন জিয়ানাকে মনে করিয়ে দিলো।আজ যদি তোরও এমন পরিস্থিতি হয় তোকে সামান্য শান্তনা দেয়ার মতোও কেউ নেই জিয়ানা।তোর মা বাবা ভাই কেউ নেই।স্বামী নামের মানুষটাও কেমন ফাঁকি দেয়ার চেষ্টা করছে।

নীতিহীন রাজ পর্ব ৭৩

মায়ের মুখ মনে করতেই জিয়ানার চোখে ভাসে আঞ্জুমানের রান্নাঘরে ব্যাস্ত তেলতেলে মুখ।নীলুফা তার কাছে শুধুই কাগজের ফটো।যার সাথে কোন স্মৃতি নেই।তাই তো স্মৃতির খাতায় মা নামটা তার ধূসর হতে হতে একসময় নাই হয়ে গেছে।
অদূরে জিয়াউল আর আঞ্জুমান জেনিকে ধরে শান্তনা দিচ্ছে।মিমের আহাজারি কমে এসে নেতিয়ে পড়েছে নিজ মায়ের কোলে।মেহেদীকে রেবেকা মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।শুধু বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে জিয়ানা একা।

নীতিহীন রাজ পর্ব ৭৫