Home সায়রে গর্জন সায়রে গর্জন পর্ব ৩৬

সায়রে গর্জন পর্ব ৩৬

সায়রে গর্জন পর্ব ৩৬
নীতি জাহিদ

ফজরের আজান পড়বে। হঠাৎ ফোনকল। বিরক্ত হয়ে দু দু বার কল কে*টে দিলো। তৃতীয় বার কল আসতেই ধরে খুব সুন্দর করে একটা বাণী ছুঁড়লো,
– কোন হা*রামী আমার ঘুম ছুটাচ্ছে?
– একটু আসতে পারবে হাসপাতালে?
ধড়ফড় করে বিছানা থেকে উঠে লাফ দিলো। স্তব্ধ হয়ে গেলো। জোরে জোরে দু বার শ্বাস নিয়ে বললো,
– আম স্যরি, আসছি।
ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে ওযূ করে বের হলো।নামাজ আদায় করে মনের সুপ্ত বাসনা চেয়ে নিলো উপর ওয়ালার কাছ থেকে। গায়ে টি-শার্ট জড়িয়ে বেরিয়ে গেলো, আফিয়া খালা দরজা লাগিয়ে দিলো।
হাসপাতালে পৌঁছে চোখে পড়লো ঘড়িতে ছ’টা। তাহিকে দেখে এগিয়ে এলো। সারা রাত কি এই মেয়ে বাসায় যায়নি! মুখটা কেমন শুকিয়ে গিয়েছে। তাহির মুখে আতঙ্ক। ভয়ে ভয়ে বললো,

– রাতে বাসায় যাই নি, মন সায় দিচ্ছিলো না। মনিকে কেবিনে শিফট করেছে। কাল সারা রাত হাসপাতালে কিছু অপরিচিত মুখ ছিলো। প্রথমে তেমন আমলে নেয়ার মত ছিলোনা ব্যাপার টা। কিন্তু এখন এদের একজন আমার চেম্বারে বসে আছে। ভীষণ ভয় করছে। আমি আউটডোর ভিজিটে আছি বলে সিস্টার পাঠিয়ে জানিয়ে দিয়েছি। ছোট ভাইয়া ফোন ধরছেনা। হয়তো ক্লান্ত। আর বড় ভাইজানকে তো জানানোই যাবেনা। এখন কি করবো?
লিমন তাহির চোখে মুখে ভয় দেখতে পেলো। আশপাশটা দেখলো নিরব। কিছু রোগী আছে, সিস্টার আছে। এত সকালে মানুষ কম থাকাটাই স্বাভাবিক। কিছুটা চিন্তিত গলায় বললো,

– হাসপাতালে সবচেয়ে সিকিউর রুম কোনটা?
তাহি ভেবে বললো,
– তেমন সিকিউর কোনোটাই নয়।
– মনি আপার কেবিনে কে আছে?
– আন্টি, আংকেল দুজনই আছেন।
– চলুন।
– ওখানে কেনো?
– আপনাকে ওখানে রেখে আমি আপনার কেবিনে সেই আগন্তুকের সাথে মিটিং করবো।
– কিসের মিটিং?
– তাকে আমার বিয়ের ঘটক বানাবো?
– কিহ?
– এত প্রশ্ন করেন কেনো বলুন তো? সামনে পা বাড়ান।

লিমন সরে গিয়ে তাহিকে জায়গা করে দিলো সামনে যাওয়ার। মনি এখনো ঘুমে। রেদোয়ান কেবিনের দরজা খুললো। তাহি আর লিমন যাওয়ার সময় নাস্তা নিতে ভুললো না। রেদোয়ান কিছুটা খুশি হলো ওদের দেখে। কাল রাতে ভাই-ভাবী থাকতে চেয়েছিলো জোর করে পাঠিয়ে দিয়েছে। থাকার জায়গা নেই, দুজনই অসুস্থ। বাড়িতে অনেক গুলো মেয়ে। এছাড়া মোমেনা রাত থেকে কিছু খায়নি। রেদোয়ান দুজনকে দেখে বসতে বললো। তাহি সিস্টারের সাহায্যে নাস্তা বেড়ে দিলো সবাইকে। মোমেনা নিরব। অধিক শোকে পাথর আজ। তাহি পাশে বসে খাইয়ে দিচ্ছে। লিমন অল্প একটু ভদ্রতার খাতিরে খেয়ে বেরিয়ে এলো তাহিকে রেখে। জানে তাহি জেঠুর কাছে নিরাপদ। এই লোকটা নিজেই একটা ত্রাস। মোমেনার কোনো অভিযোগ নেই। মেয়ের এমন পরিস্থিতিতে কি করে আরেকজনের মেয়েকে অভিশাপ দিবে, যখনই ভাবে চোখ ভেঙ্গে কান্না পায়।
লিমন তাহির রুমে প্রবেশ করতেই দেখতে পেলো ষন্ডা আকৃতির এক লোক বসে আছে। উচ্চতায় লিমন থেকে দু তিন ইঞ্চি বেশি হবে। লিমন দেখেই বললো,

– কাকে চাই?
লোকটা ভাব ধরে বসে আছে। ডাক্তার তাহির নেমপ্লেটে টোকা দিয়ে বললো,
– কোথায় এই ডাক্তার? কতক্ষন বসিয়ে রাখবে?
– উনি আসবে না। কি প্রয়োজন আমাকে বলুন?
লিমনের আপাদমস্তক দেখে অবাক হওয়ার ভান করে বললো,
– আপনাকে কেনো বলবো?
– আপনি কি পেশেন্ট?
– যেই হই না কেনো? আপনি কি ডাক্তার?
– অ্যাপয়েন্টমেন্ট কোথায়?
– নিয়নের কারো অ্যাপোয়েন্টমেন্ট লাগে না।
– একদম নিয়ন বাতির মতো জ্বলজ্বল করছে আপনার বদন তাই না, একদমই সত্যি ভাববেন না। দেখতে বিদঘুটে লাগছে।
রাগে নিয়নের গা টা জ্বলে উঠলো।এত বড় অপমান এর আগে কেউ করেনি।

– কথা কম বলে তাহিকে পাঠান?
– আমি তাহিকে নাম ধরে ডাকার সাহস পাই না, শালা তোর এত সাহস?
নিয়ন কিছুটা ঘাবড়ে গেলো। ভুলেই তাহি বলে ফেলেছিলো। ব্যাপারটাকে এই ছেলে এত লম্বা চওড়া ভাবে দেখছে কেনো? নিজের ভাব বজায় রাখতে জোরেই বললো,

– তাহিকে তাহি বলবোনা তো কি জান বলবো?
কথার সাত পাঁচ না ভেবে লিমন নিয়নের নাক বরাবর দিলো এক ঘুষি। তাল সামলাতে না পেরে নিয়ন ও দিলো একটা। ব্যস, লেগে গেলো। ভেতরে আওয়াজ শুনে সিস্টার দরজা খুলে দেখলো এই অবস্থা। ছুটে গিয়ে তাহিকে ডেকে নিয়ে এলো। তাহি এসে দেখে ভেতরে লঙ্কাকান্ড। দুজনকে ধরে থামালো। নিয়ন একপাশে সরে গেলো।
তাহি লিমনের গালে ঠাস করে একটা চড় লাগিয়ে দিলো। স্তব্ধ হয়ে গেলো কামরা। এই নিয়ে দু দু বার মার খেয়েছে লিমন। এই মেয়ে নিজে ডেকে এনে এতটা অপমান কেনো করলো। তাহির দিকে তাকিয়ে অভিমানে মুখ ঘুরিয়ে নিলো। নিয়নের মুখে তেমন একটা ক্ষতি না হলেও লিমনের নাক দিয়ে রক্ত ঝরছে। তাহি চেঁচিয়ে বললো,

– এটা হাসপাতাল। গুন্ডামি করার জায়গা? বাইরে গিয়ে করুন।
তাহিকে দেখে নিয়ন সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বললো,
– স্যরি ডাক্তার।
পুনরায় রক্তাক্ত হাত ঝাড়তে ঝাড়তে বললো,
– ম্যাডাম, আপনার সাথে দেখা করে যেতে বললো স্যার। তাই অপেক্ষা করছিলাম।
নিয়ন যে তাহিকে সাফাই দিবে লিমন ভাবতেও পারেনি।
লিমন চড় খেয়ে চুপচাপ এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে।তাহি তাজ্জব বনে গেলো, নতুন স্যার আবার কে? প্রশ্ন ছুঁড়লো,
– কোন স্যার?
– নাফিস স্যার।
– উনি কে?
লিমন হতচকিত হয়ে গেলো। এখন কথা যেভাবেই হোক ঘুরাতে হবে। নিয়নের মুখের দিকে তাকিয়ে বললো,

– আশ্চর্য পাবলিক আপনি বলবেন তো আপনি নাফিস স্যারের লোক। এতক্ষন শুধু শুধু ঝামেলা করলেন সাথে আমার গালে তিনশ বিশ ভোল্টের চ*ড় উপহার দিলেন। চলুন আমার সাথে।
লিমন কিছু একটা ইশারা দিলো। নিয়ন বুদ্ধিমানের মত ধরে ফেললো। তাহি নাছোড়বান্দা। পথ আটকে বললো,
– নাফিস কে?
নিয়ন আত্মবিশ্বাস নিয়ে না ঘাবড়ে বললো,
– লে. কমান্ডার শাহাদের বন্ধু।
– আচ্ছা, আমার সাথে দেখা করতে কেনো বলেছে?
– শাহাদ স্যারের বোনের এক্সিডেন্ট হলোনা, ভেবেছিলো আপনার কিছু হলো কিনা? আপনি তো লে.কমান্ডার রাশেদের মিসেস…
লিমন নিশ্চিত বুঝতে পারছে নিয়ন কথা গুলিয়ে ফেলছে। খালেদ পারভেজ এখনো ধরা পড়েনি ইয়াজ জানিয়েছে। তার জন্য হাসপাতালে তাহি যদি কোনো রকম এসব ঝামেলার কথা জানতে পারে অনেক বিপদ। পরিস্থিতি সামলে বললো,

– মি. নিয়ন আপনাকে মূলত পাঠিয়েছে লে.কমান্ডার রাশেদের কিছু জিনিসপত্র মিসেস রাশেদের কাছে পৌঁছে দিতে। নাফিস স্যার তো আমাকে দুদিন আগেই ইনফর্ম করেছিলো। আপনি কিসব ছন্নছাড়া কথা বলছেন। আর নিচে এত সব সিকিউরিটি বসিয়েছেন কেনো? সাধারণ মানুষ ভয় পেয়ে যাচ্ছে।
– ওহ হ্যাঁ তাই তো। আমি তো জিনিস গুলো গাড়িতে ফেলে রেখে এসেছি। আপনি আসুন আমার সাথে।
কথা না বাড়িয়ে লিমনের হাত ধরে বেরিয়ে এলো। তাহি হতবাক। দুইটা পাগল এক সাথ হলে যা হয় তাই হয়েছে এতক্ষন। একে তো মনির চিন্তায় দিশেহারা, এর মাঝে উটকো ঝামেলা।

ঘড়িতে সকাল সাতটা শাহাদ ফ্রেশ হয়ে একটু মেডিটেশন করছে। অল্প এক্সারসাইজ করে শেহজাকে ঘুমের মধ্যে আদুরে চুমু দিয়ে খাটে বসলো। হাতে পেপার নিয়ে এক নজর চোখ বুলালো। স্বাভাবিকের চেয়ে অস্বাভাবিক খবরই বেশি। হ/ত্যা,
ধ/র্ষ/ন,এসব দেখতে ভালো লাগছেনা। ফরিদের শাস্তি হয়েছে শুনেছে। পুরোটা বিস্তারিত জানতে হবে। উপর মহল থেকে খবর পাঠিয়েছে দেখা করতে। অনেক দিন কাজ থেকে দূরে। এরই মাঝে দিয়া রুমে ঢুকতে ঢুকতে বললো,

– কমান্ডার সাহেব খেতে চলুন।
দিয়ার কমান্ডার মুচকি হেসে পেপারটা সরিয়ে বধূর দিকে তাকিয়ে দেখলো। খয়েরী একটা তাতের শাড়ি গোল্ডেন জরিতে কাজ। ছিপছিপে দেহে একেবারে মিশে গিয়েছে। মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়েছে কামরা জুড়ে। এত সুন্দর মায়া কেনো? খুব পছন্দের গানের দুটি লাইন আওড়ালো,
– ডুবেছি আমি তোমার চোখের অনন্ত মায়ায়
বুঝিনি কভু সেই মায়াতো আমার তরে নয়
ভুলগুলো জমিয়ে রেখে বুকের মণিকোঠায়
আপন মনের আড়াল থেকে
ভালবাসবো তোমায়।
উঠে দাঁড়িয়ে প্রেয়সীকে কাছে টেনে বললো,
– অপূর্ব লাগছে, ঠিক যেন ভোরের শিশির।
– আর কত উপমা পাবো?
– যতটুকু আছে এই হৃদয়ে।
– হয়েছে, দিন দিন দুষ্টু হচ্ছেন।
– এই যাহ এজন্যই কারো ভালো করতে নেই। আগের শাহাদই ভালো ছিলো। সামনে দাঁড়ালে তো তখন শাহাদ বধূর হাত পা কেঁপে উঠতো…

দিয়া ঝাপটে ধরলো শাহাদকে। মেয়েটা অকস্মাৎ শান্ত হয়ে গেলো। এমন ভাবে ধরলো মনে হলো কেউ কোনো সম্পদ কেড়ে নিবে শক্ত পোক্তভাবে না সামলালে। শাহাদের অভিপ্রায় হতেই জড়িয়ে ধরে বললো,
– ইটস ওকে, মজা করেছি। আর করবোনা। বি নরমাল ফারাহ্, বি নরমাল। আই প্রমিজ আর করবোনা।
আফিয়া খালা বাইরে থেকে ডাক দিলো নাস্তার জন্য। দিয়াকে নিয়ে বেরিয়ে আসলো ডাইনিং এর উদ্দেশ্যে।
টেবিলের দিকে পা বাড়ালো। সবাইকে দেখে মৃদু হাসলো। খাবার টেবিলে পছন্দের খাবার গুলো দেখে হেসে সকলের সাথে গল্প করতে করতে মুখে তুললো। ফোন টা অন করতেই সাথে সাথে রিংগিং। চমকে উঠলো। ভাবলো কার এত তাড়া। ফোন রিসিভ করেই সালাম দিলো। অপর পাশ থেকে শাহাদকে কথা বলার সুযোগটাই দিলোনা। লাইনটা কেটে গেলো। যা শুনলো টেবিল থেকে উঠে দাঁড়ায়। সামনে বাবা,মা, দিয়া, ভাই-বোন সবাই বসে আছে। পুনরায় বসে পড়লো। শাহাদ চিন্তিত ভঙ্গিতে দেখে শাহীন প্রশ্ন ছুড়লো,

– ভাইজান কোনো সমস্যা?
শাহাদ নিরব। খেয়েই যাচ্ছে। রায়হান সাহেব প্রশ্ন করলো, সুলতানা কবির প্রশ্ন করলো। কারো কোনো প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে। আচমকা শাহীন ভয় পেয়ে গেলো। শাহাদ বেসিনে হাত ধুয়ে টিস্যুতে হাত মুচছে। শাহীন খাবার খেয়ে হাত ধুয়ে শাহাদের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললো,
– ভাইজান আপনি কাল ফিরলেন তাই,আমি আপনাকে জানাতাম…
কথা পুরোপুরি শেষ করার আগেই শাহীনের গালে চড় পড়লো একটা। ডাইনিং রুম কেঁপে উঠলো। দিয়ার হাত চেপে ধরলো নওরীন। সুলতানা কবির,রায়হান সাহেব সকলে আঁৎকে উঠলো। শাহীন মাথা নত করে রেখেছে। এখনো কারো উপলব্ধি হলোনা প্রকৃত কারণ। শাহীনের গায়ে শাহাদ হাত তুলেছে এটা কেউ ভাবতেই পারছেনা।
– কত বড় ভুল করেছো তুমি জানো?
ঠান্ডা মাথা প্রশ্ন ছুঁড়লো শাহাদ। শাহীন শাহাদের চোখে আজ ক্রোধ দেখছে। হয়তো শাহীনেরই ভুল।

– ছুটির আর কদিন আছে?
– পনেরো দিন।
শাহাদ ফোন বের করলো। কাকে যেন ফোন দিলো। ফোন দিয়ে একটু দূরে গিয়ে কথা শেষ করে আগের জায়গায় এসে শাহীনকে বললো,
– মালদ্বীপের টিকিট কেটে দিয়েছি, বৌমাকে নিয়ে ঘুরে আসো। বারোদিনের দিন ঢাকায় ল্যান্ড করবে। সকলের সাথে দেখা করে চলে আসবে। আমার পরবর্তী নির্দেশ আসা অবধি এখানে পা রাখবেনা। ক্লিয়ার!
– জ্বি ভাইজান।
নওরীনের দিকে তাকিয়ে বললো,
– বৌমা আমি খুবই দুঃখিত তোমার সামনে তোমার স্বামীর গায়ে হাত তুললাম। ও যে ভুলটা করেছে তা জানলে চড় টা আমার জায়গায় আব্বু বা আম্মু
মা রতো। আব্বু আম্মু কোনো সন্তানের গায়ে হাত তুলতে পছন্দ করেন না। আমি চাইনা আমি ব্যতীত কেউ ওর গায়ে হাত তুলুক। আব্বু, আম্মুর চেয়ে ওরা তিনজনই আমার শাসনে বড় হয়েছে। শাহীন আমার হাতে গড়া। ও এত বড় ভুল করবে সেটা আমি মেনে নিতে পারছিনা।
নওরীন মাথা নেড়ে বললো,

– ভাইজান আপনি যা করবেন নিশ্চয়ই আমাদের ভালোর জন্য করবেন। ভুল করলে শুধরে দিবেন। এতে আমাদের কারো কোনো অভিযোগ নেই।
শাহাদ রুমের দিকে এগিয়ে যেতেই বললো,
– ফারাহ্ তৈরি হয়ে নাও, মনিকে দেখতে যাবো। আব্বু আম্মু আপনারা যেতে চাইলে চলুন। শেহজা থাকুক শেফালী আর শিফার কাছে। ততক্ষন শাহীন আর নওরীন তো বাসায় আছেই।
শেফালী বললো,
– জ্বি ভাইজান যান আপনারা আমরা আছি।

কেবিনের টিভিতে যখন দেখতে পেলো শাহাদ দেশে তখন থেকে মনি চেঁচামেচি শুরু করেছে শাহাদের জন্য। বাধ্য হয়ে রেদোয়ান সাহেব শাহাদকে ফোন দিলো। পুরো কথা শেষ করতেও পারলেন না, মনি এর আগে চিৎকার শুরু করলো। যদিও তিনি রাতে জানতেন না শাহাদ এসেছে। চিকিৎসার জন্য বাইরে গিয়েছে এটা জানতেন। ওর শরীরের অবস্থাও বেশ ভালোনা বুঝতে পারছেন তাই হয়তো রায়হান সাহেব কিছু জানান নি। মেয়ে যে শাহাদকে অনেক আগেই থেকেই পছন্দ করে তা দুজনই জানতেন। সাহস করে বলেননি ভাইকে কারণ শাহাদ মনিকে বোনের চোখেই দেখে এসেছে এটা সকলের জানা। মনির বেহায়াপনাকে প্রশ্রয় দিলে নিজের মান ইজ্জত খুইয়ে বসতেন। কেবিনের দরজায় টোকা পড়তেই মনি লাফিয়ে উঠলো। বলতে লাগলো,
– দরজা খুলো আমার শাহাদ এসেছে।
মোমেনা ছলছল চোখে দরজা খুলে দিতেই দেখতে পেলো শাহাদ, দিয়া, সুলতানা কবির এবং রায়হান সাহেব এসেছেন। উনারা ভেতরে ঢুকতেই মনি কেঁদে দিলো। এক হাত দিয়ে শাহাদকে ডেকে বললো,

– শাহাদ ভাই…
জড়িয়ে ধরার জন্য দু হাত মেলে ধরলো মনি। কামরা জুড়ে শশ্মান নিরবতা। মনে হচ্ছে নিশ্বাসের শব্দ শুনা যাবে। মনি থেকে চোখ ঘুরিয়ে শাহাদ চাচাকে বললো,
– ডাক্তার কি বলেছে?
বড় একটা নিশ্বাস ফেলে বললো,
– দুদিন পর আবার চেক আপ করবে, ড্রেসিং করতে হবে। কিছুটা শুকালে তখন বাসায় নিতে পারবো।
মনি এবার জোরে বললো,
– শাহাদ ভাই আমাকে ধরো। আর তোমার সাথে এই মেয়েটাকে কেনো এনেছো? বের হয়ে যেতে বলো।
শাহাদ এতক্ষন মনির দিকে তাকায় নি সরাসরি। এখন সরাসরি তাকিয়ে বললো,
– উত্তেজিত হয়োনা মনিকা। তোমার এখন বিশ্রামের প্রয়োজন। আর এটা আমার দায়িত্ব পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে আমার সহধর্মিণীসহ দেখতে যাওয়া।
– ও শাহাদ ভাই তুমি তো জানো আমি তোমাকে কত্ত ভালোবাসি, জানো আমি তোমার জন্য সিঙ্গাপুর যেতে চেয়েছিলাম বাবাকে মিথ্যা বলে ওখানেই আমাকে এয়ারপোর্ট থেকে কিডন্যাপ করে। তোমাকে ভালোবেসে আমি কি পেলাম।
সকলে চমকে উঠলো। শাহাদ নিজেকে স্থির রাখলো। দিয়া শাহাদের হাত খামছে ধরলো। মনে হচ্ছে সবগুলো নখ বিঁধে যাচ্ছে হাতে। দিয়ার দিকে তাকাতেই মেয়েটার চোখে মুখে ভয়। শাহাদ বরফ শীতল গলায় বললো,

– নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি আকর্ষণ ব্যাপারটা শয়তানের প্ররোচনায় হয়। তুমি পিতৃসমতুল্য ভাইয়ের দিকে চোখ দেয়াটা অবশ্যই অন্যায়। যা করেছো তার জন্য মাফ চাও আল্লাহর কাছে। তোমার কাজ কিছুই আমার অজানা নয়। তুমি যদি ভেবে থাকো আজ আমার আফসোস হচ্ছে তোমার এই অবস্থার জন্য। আমি বলবো একদম হচ্ছেনা। নিজে যেচে এই পথ বেছে নিয়েছো। শুকরিয়া আদায় করো যে সম্মান বেঁচে আছে। আছে না?
মোমেনা চেঁচিয়ে উঠলো,
– কি বলছো শাহাদ এসব?
– চাচী আস্তে? আপনার মেয়ে ছাড়া হাসপাতালে অনেক রোগী আছে যারা প্রকৃতপক্ষে অসুস্থ আমি চাইনা সিনক্রিয়েট করি। তবে ও সুস্থ হলে জেনে নিবেন ওর অন্যায়ের খাতায় কি কি জমা হয়েছে।
দিয়া হঠাৎ অনলের মত ফুসলে উঠে বললো,
– আজ যদি তুমি বিছানায় না থাকতে যে মুখ দিয়ে বলেছো সিঙ্গাপুরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলে ওই জিভ আমি ছি/ড়ে ফে*লতাম। আমি তো এখানে আসতেই চাইনি শেহজার বাবা বলায় এসেছি। তোমার জন্য আমার আফসোস হচ্ছেনা। কেনো হচ্ছেনা সেটা নিশ্চয়ই মনে করাতে হবেনা? সুলতানা মঞ্জিল যে তোমার জন্য নিষিদ্ধ তুমি সেটা জানোনা? কোন সাহসে মুখে বলে আমার স্বামীকে ভালোবাসো।
– ফারাহ্ স্টপ। চাচ্চু আমি আসছি। কিছু লাগলে জানাবেন। আর মেয়ের জন্য কত ফ্যাসাদে সামনে আপনাকে পড়তে হবে দেখেন। সব জায়গায় আপনার আর আমার নাম বেচে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করে এসেছে। কাল রাত থেকে আমার বন্ধুর সিকিউরিটি টিম হাসপাতালে ছিলো। ওকে অলরেডি মে*রে ফে*লার হুমকি ও বাতাসে আসছে।
রেদোয়ান আজ স্তব্ধ। রায়হান সাহেব রেদোয়ানকে নিয়ে বের হলো কেবিন থেকে। ভাইকে জানানো প্রয়োজন মেয়ে সম্পর্কে। শাহাদ দিয়াকে নিয়ে বের হয়ে এলো।

সব ঝামেলা শেষ। সবাই এখন সুরক্ষিত। ইয়াজ কিছুক্ষন আগে জানিয়েছে খালেদ পারভেজকে বর্ডার থেকে ধরেছে। তবে সে ভয়ে শাহাদের সামনে আসবেনা। তানভীর ও হেড কোয়ার্টারে ঢুকে বসে আছে। বিপদে পড়েছে পাভেল। শাহাদ সকালে ফোন দিয়ে জানিয়েছে ইয়াজকে নিয়ে বাসায় যেতে। ইয়াজ কিছুতেই যাবেনা। শেষ মেষ একাই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো। কপালে আজ দুঃখ। লিমনকে ফোন দিতেই জানালো লিমন সঙ্গে যাবে।
নিজের বাসায় এসে চুপ করে বারান্দায় বসে আছে। তাহির কাছ থেকে টানা অপমানিত হয়েই যাচ্ছে। জবটা ছেড়ে দিয়েছে সেদিনই। ছাড়েনি, ওরাই বলেছে আর না যেতে। রেজাল্ট দিয়েছে স্নাতকের। মোটামুটি একটা রেজাল্ট করেছে। টিউশনিটাও চলে গিয়েছে। মনের মাঝে শান্তি না থাকলে যা হয়, তাই হচ্ছে। নিজেকেই নিজে দুষছে এত বড় ভুল কি করে করলো। তাহিকে ভালোবাসাটা বড্ড অন্যায় হয়েছে। বড় ভাইজান যদি এই প্রশ্ন করে কি উত্তর দিবে? কিছুতেই ভাইজানের মুখোমুখি হওয়া যাবেনা। ভাইজান কিছুক্ষন আগে ফোনে ভার্সিটির একজন স্যারের বায়োডাটা আর ছবি পাঠিয়েছেন। আগামীকাল ওকে নিয়ে ক্যাম্পাসে যাবে। স্যারকে যে তাহির জন্য দেখছে তাও জানিয়েছে। আচ্ছা তাহি কি এই বিয়েতে মত দিবে? এতক্ষন যত রাগ ছিলো সব পানি করে আবার তাহিকে ফোন দিলো। তাহি চেম্বারে পেশেন্ট দেখছিলো। পেশেন্ট চলে যাবার পর ফোন রিসিভ করলো। ধমকেই বললো,

– কি সমস্যা?
– ডাক্তার তাহি একটা কথা জানার ছিলো?
– কি?
– আপনাকে যদি কেউ বিয়ে করতে বলে করবেন?
– বেয়াদপের মত কথা বলছো কেনো?
– জাস্ট জানতে চাইলাম।
– না…
– আরেহ অপেক্ষা করুন কথা শেষ করি। ছেলেটা আমি না ম্যাচিউর কেউ। আপনার সাথে মানাবে এমন।
তাহির মনে হলো এই সুযোগ একে বুঝানোর। সাথে সাথে বললো,
– তাহলে ভেবে দেখতে পারি৷
লিমন চুপ করে আছে। তাহি নিরবতা ভেঙ্গে বললো,
– পাত্র কে?
– ভাইজান দেখছে, আমার ভার্সিটির প্রফেসর।
– ভাইজান যা বলেন তাই হবে।
– আচ্ছা রাখি স্যরি এতদিন ডিস্টার্ব করার জন্য।
– স্যরিটা আরো আগে বলা উচিত ছিলো।
– জ্বি, ভুল হয়েছে আমার। আজকে দিনটা আমার খুব খারাপ গিয়েছে জানেন। আপনার চড় দিয়ে শুরু হলো, আপনার পাত্রের ছবি দেখে শেষ হলো।

সায়রে গর্জন পর্ব ৩৫

– বাহ ভালো তো। আমাকে ও দিও পাত্রের ছবি।
– দিয়েছি হোয়াটসঅ্যাপ চেক করুন। আমি রাখছি। আপনার নাম্বার আমি ব্লক লিস্টেড করবো এখন। যত মজা দুষ্টুমি যাই করি, সত্যি ভালোবেসেছিলাম। দুনিয়ার নিয়ম কানুন মানিনি। রাখছি ভালো থাকবেন।
লাইন কেটে যেতেই তাহির দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। হঠাৎ মনে হলো ভাইজানের সাথে দেখা করতে হবে। আগেই তো জানিয়েছে বিয়ে করবেনা। রাশেদের স্মৃতি নিয়ে থাকতে চায়। কেনো কেউ বুঝেনা তাহিকে? সবাই নিজের মতো করে ওর জীবন সাজাতে চায়। বিয়ে করলে যে রাশেদ হারিয়ে যাবে।

সায়রে গর্জন পর্ব ৩৭