সায়রে গর্জন পর্ব ৩৭
নীতি জাহিদ
তিমির নেমেছে। বাতাসে সোদা মাটির গন্ধ। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমেছিলো অপরাহ্নে। বাগানের রজনীগন্ধা, কামিনী সুভাস ছড়িয়েছে। অনেক দিন চুলগুলো ছাটা হয়নি। বার বার কপালের কাছে চলে আসছে বাতাসের ঝাপটায়। সময় পেলো কই। গালের মাঝে খোঁচা দাড়ির আভাস। চেহারায় এতে গাম্ভীর্যের ছাপ আরো প্রগাঢ় হয়েছে। তাতে কি! জৌলুসে এখনো ভাটা পড়েনি। এতেই বোধ হয় পুরুষের আকর্ষণ লুকায়িত। বাড়ির সামনে আঙিনায় কাঠের বেঞ্চিতে নিরবে বসে আছে। এশার সালাত আদায় করে বাড়িতে আসার খবর এখনো উপরে যায়নি তা স্পষ্ট। নতুবা এতক্ষনে মেয়েটা ঝাঁপিয়ে পড়তো। পার্থিব জগতের সমস্ত চিন্তা যেন মাথার মাঝে কিলবিল করছে। আকাশের দিকে চোখ জোড়া স্থির। কপালে নরম,মোলায়ের আঙুলের স্পর্শ পেয়ে ঠোঁটের কোনে বিস্তৃত হাসি। অক্ষি জোড়া মুদিত। এই আরামটার প্রয়োজন ছিলো। সকাল থেকে একটার পর একটা ধকল যাচ্ছে।
– আমার ছানাটা কোথায়?
ফারাহ্ ফিক করে হেসে উঠলো। শাহাদ মেয়েকে ছানা ডাকলেই মেয়ে বাবার ইঙ্গিত বুঝে যায়। আরো বেশি আহ্লাদিত হয়ে বাবার কোল ঘেঁষা শুরু করে। মেয়ের বাবার মুখে ছানা শুনেই হাসি পেলো। ঠোঁট চেপে হাসি সংবরণ করে জানালো,
– আপনার ছানা উপরে, দাদী,চাচী এবং ফুফিদের নাস্তানাবুদ করে রেখেছে। বার বার সোফার হাতল ধরে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে আর ধপাস করে পড়ছে। হামাগুড়ি দিয়ে এটা, ওটা ছুয়ে ভাঙ্গার চেষ্টা। আমি বকা দিতে গেলেই আম্মু,আব্বু উলটা আমাকে বকা দিচ্ছে। তাদের একটাই কথা, যা ইচ্ছে ভাঙ্গুক,বকা দেয়া যাবেনা। বকা দেয়া মানে নাকি নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি আকর্ষণ বাড়ানো। আপাতত তার পাহারায় তার দুই ফুফু এবং চাচী নিয়োজিত।
শাহাদ হো হো করে হেসে উঠলো। দিয়ার হাত ধরে পেছন থেকে টেনে সামনে এনে পাশে বসালো। ঘাড় কাত করে দিয়ার চোখে চোখ রেখে তার গভীরতা মাপার আপ্রাণ চেষ্টা। ডান হাত রাখলো দিয়ার বাম গালে। বৃদ্ধাঙ্গুল চালাচ্ছে তুলতুলে গালে। মেয়েটা লজ্জা পাচ্ছে। হাত সরিয়ে নিলো শাহাদ। নিজেকে স্বাভাবিক করে বললো,
– আমি এখানে বুঝলে কি করে?
দিয়া হেসে উঠলো। বললো,
– ম্যাজিক।
শাহাদ ও হাসে। হঠাৎ উঠে দাঁড়ায়। এগিয়ে গিয়ে কাঠগোলাপ গাছ থেকে একটা সাদা ফুল,অপরটা লাল তুলে এনে দিয়ার কানের গোঁড়ায় গুঁজে দেয়। হাত এগিয়ে বলে,
– চলো কিছুক্ষন হাঁটি। কোহিনূরকে ও দেখে আসি।
দিয়া মাথা কাত করে সম্মতি জানিয়ে উঠে দাঁড়ায়।
পাভেল চড় খেয়েছে। ইয়াজকে হাতের সামনে পায়নি। লিমনের চেহারায় ভয়ের ছাপ। ওকে কিছুই করেনি। হাতের মধ্যে প্রফেসরের ছবিসহ বায়োডাটা ধরিয়ে বলেছে এটা যেন তাহিকে দিয়ে আসে। এর চেয়ে ভালো ছিলো দুটো চড়ই না হয় দিতো। পাভেলের চিলেকোঠায় দুজন শান্ত। লিমন হাতের কাগজটা ঘুরিয়ে এপিঠ ওপিঠ দেখলো। পাভেলের হাতে কাগজটা ধরিয়ে বললো,
– ভাই এটা ডাক্তার তাহিকে দিয়ে দিবেন প্লিজ। আমি ওদিকে যাবোনা।
পাভেলের মেজাজ ও চরমে ছিলো। ঝাড়ি দিয়ে বললো,
– হ্যাঁ এবার আমার জানটাও যাক। তোকে যে কাজ দিয়েছে তুই কর। আমার আরো শাস্তি বাকি আছে।
– কিসের?
– আমি ইয়াজের ভাগের থাপ্পড়টা খেয়েছি। নিজের ভাগের টা বাকি আছে এখনো। ওটা যে কত স্পিডে মা*রবে তার ভয়ে আছি।
– আপনি কী অন্যায় করেছেন?
পাভেল নিশ্চুপ। তা যদি বুঝাতো পারতো কি অন্যায় ওর দ্বারা হচ্ছে! হায় অদৃষ্টের পরিহাস! ঘড়িতে দশটা। নিচ থেকে ডাক এসেছে। আফিয়া খালা রাতের খাবার খাওয়ার জন্য ডাক দিলো। চেঞ্জ করে তড়িঘড়ি করেই দুজন নেমে আসলো। লিভিং রুমে সবাই বসে আছে। পাভেলের দিকে শরবতের গ্লাসটা এগিয়ে দিলো শিফা। নিচের দিকে তাকিয়েই গ্লাসটা হাতে নিলো। মনের চোখ বলছে শিফা লজ্জা পাচ্ছে। ওর দিকে সবার মাঝখানে তাকানোর স্পর্দ্ধা করেনি।
– শিফা… ভেতরে যাও। দেখো ভাবীমায়েরা কি করছে?
ইমোশনের বারোটা বেজে গেলো! শাহাদের প্রগাঢ় স্বরে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে তাকালো পাভেল। শিফা আর না দাঁড়িয়ে দ্রুত পা ফেললো ডাইনিং এর উদ্দেশ্যে। হাতে গ্লাসটা নিয়ে বসে আছে পাভেল। শাহীন পাভেলের কাঁধে হাত দিতেই চমকে উঠলো। এভাবে চমকাতে দেখে শাহীন বিস্মিত হয়ে বললো,
– কিরে, এমন করলি কেনো?
অকস্মাৎ হৃদস্পন্দন বেড়ে গিয়েছে পাভেলের। নিজেকে শান্ত করতেই মুখে হাসি এনে বললো,
– কিছুনা ঠিক আছি। বের হবি কয়টায়?
– ভোরে।
শাহীন শুকনো ঢোক গিলে শাহাদের দিকে তাকালো। অদ্ভুত! কথা বলছে রায়হান সাহেবের সাথে অথচ চোখ এদের দুজনের দিকে। শাহীন বিড়বিড় করে বলে,
– পাভেল বিশ্বাস কর, ভাইজানকে আমার মারাত্মক ভয় লাগছে। আসার পর থেকেই আমরা চ/ড় থা*প্পড়ের উপর আছি।
পাভেল পেঁচার মতো মুখটা করে রেখেছে। শাহীনকে উঠে দাঁড়াতে দেখায় পাভেল ও উঠে দাঁড়ায়। দেখতে পেলো শাহাদ আর রায়হান সাহেব উঠে দাঁড়িয়েছে। আফিয়া ডেকে গিয়েছে। খাবার টেবিলে নিরবতা বিরাজমান। শেফালী একসাথে বসিয়ে আবির আর শেহজাকে খাওয়াচ্ছে। শেহজা চারদিকে সব ছড়িয়ে খাচ্ছে। দিয়া ধমকাচ্ছে। শেফালী আর সুলতানা কবির দুজনই শেহজাকে আগলে নিচ্ছে। সুলতানা কবির সরাসরি বললো,
– শুনো বৌমা, আমার নাতনী এভাবেই খাবে। খাওয়া শিখুক। চামচ দিয়ে গুতিয়ে গুতিয়ে এত মর্ডান বানিয়ে খাওয়া শেখানোর প্রয়োজন নেই। গায়ে কাপড়ে মাখিয়ে খাক। এতেই তৃপ্তি। তুমি এর মাঝে এসোনা। আমার সন্তানরা সব গাট্টাগোট্টা হয়েছে। বাবুকে তো ছোট থেকেই নিজ হাতে খাওয়া শিখিয়েছি। দেখছোনা, মাশাল্লাহ কারো নজর যেনো না লাগে। নিজে খেয়ে নাও। শরীর টা তো পাটকাঠি বানাচ্ছো। কিভাবে যে বাবুকে সামলাও বুঝিনা বাপু…
স্বাভাবিক পরিবেশে এমন অস্বাভাবিক কথা বলেই রান্নাঘরে চলে গেলো সুলতানা কবির। দিয়ার দু অধর আলগা হয়ে গেলো শ্বাশুড়ির কথা শুনে। এদিকে যে বাবুর নাকে মুখে খাবার উঠে বিষম খেয়ে গেলো তা বুঝতেই পারেনি। সকলে ছুটে এসে ধরলো মায়ের বাবুকে। শেফালী তো রীতিমতো চেঁচিয়েই উঠলো,
– আম্মু…
সুলতানা কবির ছুটে এসে এমন পরিবেশ দেখে ঘাবড়ে গিয়ে শাহাদের মাথার তালুতে আলতো আলতো চাপ দিচ্ছে। দোয়া পড়ে ফুঁ দিচ্ছে। মিনিট দশেকের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতেই ইশারা দিয়ে সবাইকে বুঝালো ঠিক আছে। দিয়ার নজর প্লেটে সীমাবদ্ধ। পুরো পরিবেশটাই যখন শান্ত হলো তখন পুনরায় সুলতানা কবির প্রশ্ন করলো,
– কার বদ নজর লাগছে আল্লাহ জানে। আমার বাবুটা ঠিক মতো খেতে ও পারছেনা। তোরা সবাই একটু করে দোয়া পড়ে এই গ্লাসের পানিতে ফুঁক দিস তো।
শাহাদ এবার অসহায় চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো,
– আম্মু সব ঠিক আছে কিছুই হয়নি। আমি অন্যমনস্ক ছিলাম তাই খাবার নাকে উঠেছে। আপনি খেতে বসুন।
নওরীন শাহীনের দিকে তাকিয়ে জিভে কামড় দিলো। শাহীন মিটমিট করে হাসছে। চাপা চাপা হাসি টেবিল জুড়ে। একবার চোখ তুলে সকলকে দেখলো শাহাদ। এমন অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়বে ভাবতে পারেনি। খুব তাড়াতাড়ি খাবার শেষ করে উঠে গেলো টেবিল থেকে। যাওয়ার সময় শাহীনকে বললো,
– রেডি হয়ে যেও। আর দেরী করোনা।
– জ্বি ভাইজান।
টুং করে শব্দটা ফোনের মেসেজের শব্দ। তাহি হোয়াটসঅ্যাপ খুলেই দেখলো একটা বায়োডাটা আর কিছু ছবি। সেই প্রফেসরের। মেসেজ গুলো দেখেই ফোন রেখে শুয়ে পড়লো। কিছুক্ষন রেস্ট নিবে। এই কয়েকদিন মনিকে নিয়ে যা একটা ধকল গেলো। কম মানসিক যন্ত্রণা দেয় নি এই মেয়ে। যেদিন থেকে জানতে পেরেছে রাশেদের কেইসের সাথে এই মেয়েও জড়িত সেদিন থেকে মনিকে মনে প্রাণে ঘৃণা করে আসছে। মানবতার খাতিরে সেবা দিয়েছে প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতে ও দিবে তবে স্বজন হিসেবে কখনোই আর পরিচয় দিবেনা। নিজের কু*কর্মের জন্য পা দুটোই হা*রালো। মানুষ যা পাপ করে এই দুনিয়াতেও তার শাস্তি ভোগ করতে হয়। কি মনে করে ফোনটা আবার হাতে নিলো। লক করা এপ্লিকেশন অন করলো। সবচেয়ে পছন্দের ছবি গুলো চোখের সামনে স্ক্রল করছে। ঘোড়া উপর তাহি। ঘোড়ার লাগাম ধরেছে রাশেদ। হানিমুনে গিয়েছিলো কাশ্মীর। রাশেদের চোখে মুখে খুশী। দ্রুত স্ক্রল করতেই আরেকটি ছবি সামনে তাহির জন্মদিনের। পুরো এক হাজার বেলুন দিয়ে সাজিয়েছিলো কক্সবাজারের কোয়ার্টার। নেভির অন্য কমান্ডাররা মজা করে বলেছিলো, কমান্ডার রাশেদ পুরা বউ পাগল হয়ে গিয়েছে।’
তৎক্ষনাৎ মনে পড়লো শাহাদের সেই ধমক। শাহাদ রাশেদকে ধমকে বলেছিলো,
– ‘অতিরিক্ত করিস কেনো? তুই তোর বউকে ভালোবাসিস এটা দুনিয়াকে না দেখালে হয় না? সবার নজর আর হা হুতাশ লাগবে। আমাদের এখানে অনেক অফিসার সাংসারিক জীবনে সুখে নেই। তাদের দীর্ঘশ্বাস লাগবে। বন্ধ কর এসব। তাহি এমন একটা মেয়ে তুই শো অফ না করলেও খুব ভালো জানে তুই ওকে তোর জীবনের চেয়ে বেশি ভালোবাসিস। ‘
ভাইজানের প্রতিটি কথাই হয়তো সত্য ছিলো। হয়তো কারো দীর্ঘশ্বাস ছিলো তার বৈধব্যের কারণ। ভাইজান সবসময় বলতো, ‘সুখ কাউকে দেখাতে নেই, দুঃখ কাউকে বলতে নেই। এতে সুখের মেয়াদ কমে, দুঃখ মাথা চড়া দিয়ে উঠে।’
দুচোখ বেয়ে ঝরে পড়া অশ্রু আটকাতে ফোন রেখে দিলো। সময় পেরিয়ে গেছে টেরই পায়নি। তৈরি হয়ে নিলো। সুলতানা মঞ্জিলে যেতে হবে। শাহীন চলে যাবে। দেখা করে আসতে হবে। নিচে গাড়ি এসেছে শাহাদের। সাবিনা মেয়েকে ডাকতে এসে দেখলো মেয়ে তৈরি। বেরিয়ে পড়লো মা বেয়ে সুলতানা মঞ্জিলের উদ্দেশ্যে।
কিছুক্ষন আগে করা সহধর্মিণীর প্রশ্নের উত্তর সাজাতে ব্যস্ত। মেয়েটা কেমন উত্তেজিত হয়ে আছে। নারী জাতি মানেই নরম আবার অন্যদিকে যম। এই যেমন এখন তার মাঝে দু রকমের রূপ পরিলক্ষিত হচ্ছে। প্রথম টা জিজ্ঞাসা দৃষ্টি অন্যটা হারানোর। শাহীনের সাথে বের হবে বলে রেডি হতে চেয়েছিলো। শাহীন যেতে বারণ করলো। বাসার সবাই অমত প্রকাশ করেছে। এই শরীরে এত ধকল নেয়া বারণ। চুপচাপ খাটে বসে আছে। দিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো,
– ফারাহ্ এই প্রথম কাউকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এক্সপ্লেইন করতে যাচ্ছি। আমার নার্ভাস লাগছে। এসবে তো অভ্যস্ত নই আমি।
দিয়া তেঁতে উঠলো। রোশানল ঝাড়লো,
– কি এমন প্রশ্ন করেছি? জানতে চেয়েছি এই থাপ্পড় মিশন চাল্লাচ্ছেন কেনো? প্রথমে ভাইয়া, এরপর পাভেল ভাইয়া এরপর কে আল্লাহ জানে। বর্ণনা করুন ঝটপট।
– যদি বলি করবোনা?
চোখদ্বয় সূক্ষ্ম, স্মিত। ভ্রুদ্বয় কুঞ্চিত। কোমড়ে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে তর্জনি আঙ্গুল উঠিয়ে শাসালো,
– আমাকে কি ফিডার খাওয়া বাচ্চা মনে হয়? আপনি যে নওরীন আপুর সামনে ভাইয়াকে চড়টা মা*রলেন বুঝলেন কতটা অসম্মানজনক ব্যাপারটা?
– তাহলে ওকে সবাই কিডন্যাপার, রে*পিস্ট তকমা লাগানোটা কি খুব সম্মানজনক হতো?
দিয়া যেন আকাশ থেকে পড়লো। মস্তিস্ক কর্ম সম্পাদনা বন্ধ করেছে। চরম বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে স্বামীর দিকে। কি বললো এগুলো। শাহাদ নিজেকে আশ্বস্ত করে দিয়াকে কাছে টেনে এক হাতে আগলে ধরে বুকের মাঝে দিয়ার মাথাটা চেপে ধরলো। দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বললো,
– শাহীন,পাভেল,নোমান,লিমন,তানভীর এবং ইয়াজ এরা আমার কাছে সন্তানতুল্য। শাহীন, নোমান, লিমন এবং পাভেলকে নিজের কাছে রেখে মানুষ করেছি। বাকি রইলো তানভীর এবং ইয়াজ। তানভীরকে নেভিতে পেয়েছি আর ইয়াজকে রাজনীতির ময়দানে। যখন থেকে আব্বু রাজনীতি করে। ইয়াজ তখন ছোট। ওর বাবা অপজিশন ছিলো তবে সৎ। তৎকালীন সময়ে ওর বাবার লিডারই উনাকে মে*রে ফেলে। আব্বু আমাকে নিয়ে উনাকে দেখতে গিয়েছিলেন। অনেক সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে তবে একা, মা ছোট থাকতে মা*রা যান। থাকে দাদীর সাথে। প্রথমদিনই মায়া লেগে যায়। এরপর থেকে ও আমার সাথে আছে সেই অনেক কাহিনি। আর আমার দূর্ভাগ্য এই যে ‘সিক্স স্পাইডার’ মিলে এমন একটা অকাজ করেছে আমাকে বাঁচাতে, তারই ভুক্তভোগী মনি এবং ওরা। আগ বাড়িয়ে বেশি বুঝে করেছে।
দিয়া মাথা উঠিয়ে প্রশ্ন করতে চাইলে শাহাদ মাথাটা আরো চেপে ধরে বলে,
– উহু, শেষ হয়নি। ওদের দলের নাম দিয়েছে ‘ সিক্স স্পাইডার ‘। ভালো কাজই করতো তাই বাধা দিই নি। ইয়াজ, খালেদ পারভেজের বেতনভুক্ত ছিলো। গোয়েন্দা ডিপার্টমেন্টে আইটি এক্সপার্ট হিসেবে আছে।সব ইনফরমেশন পেতাম। এয়ারপোর্ট থেকে মনিকে উঠিয় নিজেদের আস্তানায় রেখেছে। মনি বাঁচতে পালিয়েছে। বেহুশের মধ্যে পালাতে গিয়ে এই এক্সিডেন্ট করেছে। আরও ব্যাপার আছে, শুনবে?
– কি?
– খালেদ পারভেজ ক্লেইম করছে মনিকে ওর লোকজন রে*ইপ করেছে। ওর লোকজন হিসেবে নাম দিয়েছে ইয়াজের। জেলে গিয়েও এসব বলছে। অন্যদিকে মনি ইয়াজকে চিনে ফেলেছে। এখন আমার হাতে ইয়াজকে দেশের বাইরে পাঠানো ছাড়া উপায় নেই। একমাত্র লন্ডন ওকে শেল্টার দিবে। অন্য দেশ দিবেনা। কারণ ও ইন্টারন্যাশনাল অনেক ইনফরমেশন হ্যাক করেছে। সব মিলিয়ে আমি ভীষণ চিন্তিত।
ধীর গলায় বলল,
– ভুল তো করেই ফেলেছে এখন উনাকে বাঁচিয়ে দিন।
– বাঁচাতে তো হবেই। দেখা যাক। আল্লাহ সহায় ।
অকস্মাৎ দিয়া শাহাদকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। নাক কুচকে বলে,
– আর ওই সাইকোকে বিয়ের কথা…
শাহাদ মুখ টিপে হাসছে। এই হাসি দেখানো বারণ। তাই আড়ালে তা লুকিয়ে বললো,
– আরেক বিয়ে করার ক্ষমতা কি আমার নেই?
মনি হাসপাতালে সমানে পাগলামি করে যাচ্ছে। ঘুমের ইঞ্জেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখছে। হাসপাতালে দুই সু/ই/সা/ইড করার চেষ্টা করেছে। প্রচুর র*ক্তপাত হয়েছে। ডাক্তারের পরামর্শ হলো যা চায় তাই দিতে। মনির বাবা, রায়হান সাহেবের কাছে হাত জোড় করে বলেছে শাহাদ যেন চুক্তিতে হলেও মেয়েকে বিয়ে করে মেয়েটাকে বাঁচায়। একমাত্র মেয়ে ম*রে যাবে। এই কথা শোনা মাত্র রায়হান সাহেব ভাইয়ের সাথে সব রকমের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করেছে। উপায় না পেয়ে কিছুক্ষন আগে শাহাদকে সব জানায়। পাশে ছিলো দিয়া। সবই শুনেছে। যদিও শাহাদ বলেছে চাচার সাথে কিছুক্ষন পর কথা বলবে। এখন শাহীনের সাথে বের হবে। বর্তমান পরিস্থিতি এই দাঁড়ালো।
শাহাদের আরেকটা বিয়ের কথা শুনে দিয়া একদম নিশ্চুপ হয়ে গেলো। এতক্ষন জ্বলে উঠা মেয়েটা নিস্তেজ হয়ে বললো,
– আপনি মনিকে অনেক স্নেহ করেন তাই না?
– স্বাভাবিক নয় কি? ছোট থেকে মানুষ করেছি। সব বায়না ছিলো আমার কাছে।
দিয়ার হঠাৎ মনে হলো শাহাদের সাথে ওর সম্পর্ক মাত্র তিনবছরের। এর মাঝেই শাহাদের দেয়া অপমান,কষ্ট সব সহ্য করেও প্রচন্ড রকম ভালোবাসে। বিয়ে ব্যতিত কোনো র*ক্তের সম্পর্ক নেই শাহাদের সাথে সেখানে মনিতো র*ক্ত। একে অন্যের সংস্পর্শে অনেক বছর, শিশুকাল থেকে। শুকনো ঢোক গিললো দিয়া। বুকের দ্রিম দ্রিম আওয়াজটা মনে হলো কানে বাজছে। হাত কাঁপছে। নিজের সাথে যুদ্ধ করে শাহাদের দিকে তাকালো। শাহাদ গভীর ভাবে দিয়াকে পর্যবেক্ষন করলো। আচমকা বলে উঠলো দিয়া,
– মনিকে বিয়ে করলে আমার জায়গা কোথায় হবে? এখানে না আগের গেস্ট রুম টাতে?
কাট কাট উত্তর,
– আমার বুকে।
– আর মনি?
– আমি কি জানি? তার ঘরে হয়তো।
– স্ত্রীর শোভার ঘরের ব্যবস্থা করা আপনার দায়িত্ব।
– করলাম তো।
– একজনকে বুকে অন্যজনকে বাইরে?
– একটা বুকে তো একজনেরই জায়গা হবে। এখন যদি বলো বুক ভাড়া করলে পাওয়া যায় তাহলে আমি আরো দুটো ভাড়া করতে চাই। একটা আমার শেহজা ছানার জন্য আরেকটা সেভিংস। ওর ভবিষ্যত ভাইয়ের জন্য। যদিও আমার ছানা আমার প্রাণ, তবে বুকে আগে তার মায়ের স্থান।
– আপনি কি বাংলা বুঝেন না?
– আমার এক্সেন্ট কি ইংলিশ?
– মনি কই যাবে?
– আমি কি জানি?
– আপনার স্ত্রী কোথায় থাকবে সেটা আপনি জানেন না?
– জানি তো বুকে।
– শেহজার বাবা!
চেঁচিয়ে উঠলো দিয়া। হালকা হেসে শাহাদ মুখ চেপে ধরলো দিয়ার। মেয়েটাকে একেবারে রাগিয়ে দিয়েছে। মেয়েটা হাঁপাচ্ছে। মুখের উপর থেকে হাত সরিয়ে দিয়ার অধরে নিজের অধর আলতো স্পর্শ করলো। শাড়ির অতলে নির্মেদ পেট ধরে বললো,
– কমনসেন্সের এত অভাব হলে হয়না ফারাহ্। স্ত্রী তো আমার একজনই। সে আছে ইনশাআল্লাহ সেই থাকবে।এমন সিচুয়েশনে শাহাদ ইমরোজের এংগার থাকে হায়েস্ট স্টেজে, ভয়ে তটস্থ থাকতো ইউনিট। ডিপার্টমেন্টে অফিসাররা দূরে থাকতো ভয়ে। অথচ আজ?
– কি আজ?
দিয়াকে কাছে টেনে কোলে বসিয়ে গলায় মুখ ডুবিয়ে নেশালো গলায় বললো,
– শুষষ…ডোন্ট ডিস্টার্ব।
একদিকে রাগ, অন্যদিকে শাহাদের আবেদন। ফোনটা বেজে উঠলো। ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠা নাম দেখে দিয়া গাল ফুলিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো। এক হাতে ছটফট করা দিয়ার মুখ চেপে ধরেছে অন্য হাতে ফোন।
– বলেন চাচাজান..
….
– ভাই বোনকে বিয়ে করার নিয়ম তো ইসলামে নেই…
….
আচ্ছা…হুম…আচ্ছা।
….
কিন্তু চাচাজান মাফ করবেন। আপনার মেয়ে পা হারিয়েছে নিজ কর্মগুণে। তবে আমি যতদুর শুনেছি মেয়েরা মাঝে মাঝে বাপের কুকর্মের শাস্তি ও পায়। এম. সাফায়েত মজুমদারের কথা মনে আছে।ব্লু ডায়মন্ড।
….
– একটু সাবধানে থাকবেন। আরেকটা কথা, মেয়ে সুস্থ না হলে মেন্টাল এজাইলাম আছে আমার পরিচিত। জানাবেন। ধন্যবাদ।
দিয়া মনোযোগ দিয়ে শুনছে কথোপকথন তবে শেষ কথাটাতে খটকা লাগলো। তাহলে এতক্ষন শাহাদ মজা নিলো? কত বড় সাহস। এখন শাহাদ মিটমিটিয়ে হাসছে। শাহাদের হাতের তালু কিছুটা ঢিলে হতেই কামড় বসিয়ে দিলো। হাতে কামড়ের আভাস পেয়ে আর্তনাদ করে উঠলো। দিয়া কিছুটা দূরত্বে গিয়ে প্রশ্ন ছুড়লো,
– কে এই এম সাফায়েত মজুমদার?
– আছে একজন। কাছে আসো।
– নাহ।
দিয়া ঝট করে উঠে সামনে হাঁটা দিতেই খপ করে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে মানুষটা। কেমন ছটফট করছে চিংড়ি মাছের মতো। এক হাতেই কোমড় ধরে শুন্যে উঠায় প্রিয়তমাকে। বারান্দায় দোলনায় স্ত্রীকে কোলে নিয়ে বসে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে হবে।
সায়রে গর্জন পর্ব ৩৬
রেদোয়ান ফোনে বেশি চেঁচাচ্ছিলো। স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়ে আসতে এম.সাফায়েত মজুমদারের নাম নিলো। যিনি শাহাদের প্রয়াত শ্বশুর, দিয়ার বাবা। দিয়া জানেও না বাবার এই ছদ্মনামের কথা, নিজের নাম এম. সাফায়েত হিসেবে ব্যবহার করতেন। সব অন্যায়ের শেষ আছে। রেদোয়ান সাহেবের ও পাপ মোচনের সময় হয়ে এসেছে।
দুহাতে,চোখে,মুখে আদুরে স্পষ্ট ছুঁয়ে দিলো প্রিয়তমার। গলায় মুখ ডুবিয়ে একটা কথা বললো,
– এতটাও মোলায়েম হওয়া উচিত নয় ম্যাডাম, যাতে করে আপনার হাসবেন্ড আপনাকে সামনে পেলে দুনিয়া ভুলে যায়। তুলতুলে বেড়াল একটা।
