নীতিহীন রাজ পর্ব ২১
আশিকা আক্তার সোহাগী
“দো গুণা দত্তার ,চার গুণা জুজার ” এটা শিক ধর্ম গুরু নানকের কথা। মানে কাউকে দ্বিগুণ দিলে উপরওয়ালা তাকে চারগুন ফিরিয়ে দেন।”
নিবিড়ের সাথে কথাটা ওতোপ্রোতো ভাবেই মিলে গেলো।চেহারাটাই যেনো অন্যরকম দেখাচ্ছে।জ্যোতিময় চিবুক ,ঠোঁটের কোণ আর চোখের কোলে যেনো তৃপ্তির ছন্দ।জিয়ানা যে নিজের মাঝে নেই সেটা বুঝা যাচ্ছে স্পষ্ট। তাতে তার কি। নিবিড় নিজের হারানো ধন ফিরে পেয়েছে।নীলুফার একটুকরা অংশ এখন তার সাথে জোড়ে গেলো।অল্প একটু সন্দেহ থেকে খেয়াল রেখেছিলো ,এখন সুদ সমেত ফিরত পেলো।একেই বলে দো গুণা দত্তার ,চার গুণা জুজার।
অপরদিকে জিয়ানা পাথরের ন্যায় স্থির হয়ে বসে আছে। তার ভেতরে যে শব্দহীন বিস্ফোরণ হচ্ছে সেটা আপাতত দৃষ্টিতে না দেখা গেলেও ,কাছের মানুষদের কেউ কেউ অনুধাবন করলো।
নিবিড় আর জিয়ানার পর পরই জেনি আর মক্কুর বিয়ে পড়ানো হয়। জেনি কোন দ্বিমত করেনি।আঞ্জুমান বার কয়েক এসে জেনিকে টেনে উঠানোর চেষ্টা করেছে।মক্কুর মতো পাতি মাস্তান ছেলেকে জামাই হিসেবে উনি মানেন না।কিন্তু জেনি জানে বাস্তবতা। এই তিনমাসে হাড়ে হাড়ে বুঝেছে নারীর সতিত্বই একমাত্র মন্ত্র ,যেটা দিয়ে এই সমাজের টিকে থাকা যায়।কারণ সতিত্বহীন নারী কলুষিত। তাদের মুখ দেখাও পাপ।শুধু মক্কুকে একবার জিজ্ঞেস করেছে,
-আপনার কোন আপত্তি কিংবা কেউ জোরজবরদস্তি করছে নাতো?
মক্কু মাথা দিয়ে না করেছে।জেনি জানে মক্কুর পরিবার বলতে কেউ নেই। তাই তার সাথে জড়িয়ে গেলে সামাজিকতার এত দ্বায় থাকবে না।যদি সংসার না করতে চায় সেপারেট হয়ে যাবে।ধর্ষি*তার চেয়ে ডিভোর্সি তকমা শুনাও যে আরাম।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
মামুন ইসলাম একমুহূর্তও দাঁড়ায়নি যখন নিবিড় দেনমোহরের জায়গায় নূর ম্যানসনের নাম দিয়েছিলো।নিজের পাতা ফাঁদে নিজেই পড়ে গেছে। হনহন করে বের হয়ে গেছেন বাসা থেকে।
অপরদিকে ঘরের সবাই প্রচন্ড অবাক হয়েছিলো নিবিড়ের কান্ডকারখানা দেখে। কাজি যখন নিবিড়কে আলহামদুলিল্লাহ কবুল বলতে বলে। সে তিনিবার বলার পর বলতেই থাকে
-ছয়বার কবুল,নয় বার কবুল ,আঠারোবার কবুল ,ছত্রিশবার কবুল ,বাহাত্তুর বার কবুল….
তার কবুল বলা যখন থামছেই না। পাশ থেকে মক্কু হাতের উপর হাত দিয়ে বলে,
-ব্যস ভাই ব্যস।তিনবার বললেও আপনার বউ। লক্ষবার বললেও আপনারই।
-যেহেতু জীবনে একবারই বিয়ে করবো ,সেখানে মাত্র তিনবার কেনো বলব?কমছে কম হাজার পর্যন্ত বলা উচিত।
পেছন থেকে আকাশ বলে উঠলো ,
-ভাই একটু আগেও না আপনি মুখটা ফটকামাছের মতো করে রাখছিলেন? এখন হঠাৎ হাজারবার কবুল বলার এত পায়তারা। কারণ বুঝলাম না?
-কষিয়ে দুইট থাপ্প*ড় দিলে কে ফটকা মাছ হয়ে যাবে দেখবি?
নিবিড় কটমট করে জিজ্ঞেস করল।
শুকনো কাশি দিয়ে আকাশ মুখে কুলুপ এটেছিলো তখন। বিয়ে হিসেবে একটু ইয়ার্কি ঠাট্টা করতে চাওয়ার শখ বেচারার সেখানেই খতম টাটা বাই বাই হয়ে গেছে।
আজ যদি সবকিছু ঠিক থাকতো ,তবে এই সময় সবাই চুপচাপ রাতের ডিনার সারতে বসতো।জিয়ানা ইতিউতি করে মাছ ছাটায় করার ধান্দায় থাকতো আর জিয়াউল চোখ রাঙিয়ে শাসাতো।আঞ্জুমান মেশিনের মতো একাধারে খেয়ে যেতো। জেনি হিসেব করতো পরবর্তী অপারেশনের কথা।
অথচ মাত্র কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে তাদের পুরো পরিবারের চিত্র একেবারেই পাল্টে গেছে।তাদের মনের সাথে আজ বাহিরের তিমিরের প্রচন্ড মিল। কোথায় আলো নেই। আজ কি অমাবস্যা? জেনি সেসবের হিসেব কবেই ছেড়ে দিয়েছে।ভালো মন্দ ,সুখ দুখ কোন কিছুই তো অনুভূত হয় না তার।তেইশ বছরের জীবনে রঙ-রুপ ,সাধ-আহ্লাদ সব বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
জেনির রুমের বিছানায় মক্কু বসে আছে।জেনি বারান্দার দরজায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো ,
-আমাকে নিজের সাথে জড়িয়ে ভুল করলেন মুসাদ্দিক।
-কেনো?
-একটা সাপের কামড়ে মানুষের মৃত্যু হয়।কিন্তু অনেকগুলা সাপের কামড়ে সেই মানুষ নিজেই সাপ হয়ে যায়।
-সাপের বিষ আমি না হয় নীলকণ্ঠ হয়ে পান করবো।তবুও সাপটা আমার ব্যাক্তিগতই থাকুক।
-আবেগ দিয়ে জীবন চলে না।
-আবেগের বয়স কবেই শেষ।
-ভুল করলেন।
-ভুল থেকেই বড়কিছুর প্রাপ্তি।
-অনুভূতি ছাড়া সম্পর্ক টিকে না।
-অনুভূতির সমুদ্র বানিয়ে রেখেছি। চোখ মেলে দেখলেই সেখানে সকাল দুপুর সারাবেলা সাঁতার কাটা যাবে।
-হেয়ালি করছেন? আমাকে দয়া দেখানোর কোন প্রয়োজন নেই।
-প্রিয়জনের প্রয়োজন আমার। এই দুনিয়াতে নিঃস্ব, পরিচয়হীন কাউকে গ্রহন করতে যদি তোমার বিবেকে বাঁধে তবে আমার কিছু বলার নেই।আর যদি আমার কথা শুনতে চাও তবে শুনো মেয়ে ,শরীর হইতো পবিত্র কিংবা নষ্ট করা যায়। তবে মনের পবিত্রতা একান্তই নিজের হাতে।আর বহুদিন আগেই সেই মনের হদিস আমি পেয়েছিলাম।শুধু তোমাদের সম্পর্কের জন্য কখনো আগাইনি।
-আমি আপনাকে কি দিবো বলেন?আমার কাছে কিছু নেই।আপনি ঠকেছেন।
-একটা পরিবার। ফুটফুটে কয়েকটা বাচ্চা।আর আমার যৌতুক হিসেবে আজীবন তোমার মুখের হাঁসি।
-ব্যস,তাতেই হবে?
-আপাতত। মানুষ মাত্রই লোভী। এগুলা পাওয়ার পর যদি অপশন থাকে তবে লোভ করতে দোষের কি?
-পরিবার বিল্ডাপ করতে কর্ম লাগে। আপনি তো কিছু করেন না। নিবিড়ের হাতা হয়ে বউ বাচ্চার শখ ছেড়ে দিন।
-ভাইয়ের জন্যই আমি এখনো শ্বাস নিচ্ছি।আর কিছু করি না কে বলেছে? আমি ফ্রিল্যান্সার। ভাইয়ের রিমোট কম্পানির একজন এমপ্লোই। তবে রাজনীতির জন্য কবে কোথায় মরে পড়ে থাকবো কে জানে? এইজন্য পরিবারের স্বপ্ন দেখতে আমরা ভয় পেতাম।
-মুসাদ্দিক।
ধমকে উঠলো জেনি।হঠাৎ মরার কথা শুনে তার কেনো অন্তরাত্মা ধক করে উঠলো?
-বিয়ে হতে না হতেই ধমকা ধমকি শুরু করেছো?বাহ ভালো ডমিন্যাটিং বউ হবা মনে হচ্ছে। আমিও হাজবেন্ড ম্যাটারিয়াল। বউয়ের কথায় হক কথা।অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলবো।
-আপনি কেনো আগে এলেন না?
-ভুল মানুষটা ছেড়ে যাওয়ার পরেই সঠিক মানুষটাই আসে।
জেনি এগিয়ে গেলো মক্কুর দিকে।বুকে মাথা রেখে জড়িয়ে ধরলো আলতো করে। প্রথদিনেই মক্কু এতটাও আশা করেনি।শরীরের শিহরণ কেমন ইলেক্ট্রিক্যাল মনে হচ্ছে। জেনিকে ধরবে ,না ধরবে করে কুটোকুটি করে হেঁসে দিলো।হাঁসির শব্দে জেনি তাকে ছেড়ে সরে দাঁড়ালো। সত্যি লজ্জা পেয়েছে বেচারি। সহজ হতে নিজেই এগিয়ে গেছে অথচ এই বখাটে হেঁসেই যাচ্ছে।
-সরি সরি।আমার না বগলের নিচে। মানে তুমি যেখানে হাত রেখেছো সেখানটাই খুব কাতুকুতু। তাই হাঁসি বের হয়ে গেছে।
ফিক করে জেনিও হেঁসে দিলো।আজ ঠিক কতদিন পর তার ভেতর থেকে হাঁসি পেলো জানে না। আর না জানতে চায়।শুধু প্রাণ খুলে হেঁসে একটু বাঁচতে চায় ,কাউকে আকড়ে ধরে আয়ু ফুরানোর আগ পর্যন্ত।
“মরে পুত্র জনকের পাপে” আমার মেয়েটার সাথে ঠিক সেটাই হলো।তোমার জন্য আমার সংসার আজ খাঁ খাঁ করছে।কাউকে ক্ষমা করবো না।না তোমাকে আর না তোমার ভাইয়ের মেয়েকে।আমার এমন কোয়ালিফাইড মেয়েটা একজন রাস্তার চালচুলোহীন বখাটের স্ত্রী। ভাবতেই আমার কলিজায় হাজার তলোয়ারে আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে জিয়া।আমি কাউকে বুঝাতে পারছি না।
আঞ্জুমান রাগে দুঃখে কেঁদে কেঁদে বিলাপ করছেন।
-একজন ইনভ্যালিড লোকের আর কি করার আছে আঞ্জু?তোমার মেয়ে কি আমার মেয়ে না?তাদের ক্ষতি কি শুধু তোমার পুড়ছে আমার কিচ্ছু হচ্ছে না?
-তুমি জানতে না এদেশের সকল নিউজ চ্যানেল বুর্জোয়া মালিকদের সম্পত্তি।তারা তাদের গোলামী ছাড়া আর কিচ্ছু বুঝে না? তবে কেনো গেলে বোকার মতো মৌ চাকে ঢিল ছুড়তে?
-আমরা আমাদের জীবনে এমন অনেক কান্ড করি। যার কোন মানে নেই।এমন কি উপকারও নেই।বরং ক্ষতি তবুও সিস্টেমের পরিবর্তন আর অভ্যাসের জন্য করি।আমি না আগালে অন্য কেউ আগাবে এই আশায় একজন সচেতন নাগরিক বসে থাকতে পারে না।
-সচেতন ,সচেতন করে করে একটা সুস্থ পরিবারকে তুমি অসুস্থ বানিয়ে ফেললে তবুও তোমার এইসব উদ্ভট তত্ব বন্ধ হচ্ছে না?
-ছেলেটাকে তো নিজের মতো করে মানুষ করেছো। কি হলো তার? সেই তো হতাশার চাদরে ঢেকে গেছে ক্যারিয়ার আর ভবিষ্যৎ। অথচ আমার ট্রেনিং প্রাপ্ত জিয়ানার কাছে যাও ,এত বড় একটা ধাক্কা তুমি দিয়েছো গুনে গুনে ঠিক ত্রিশ মিনিট পর সে নরমাল হয়ে যাবে।বাস্তবতা শিখানো অতি জরুরী আঞ্জু।
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিয়ে জিয়াউল আরও বললেন,
-তবে যে আমি তোমার প্রেমে অন্ধ ছিলাম সেই আমি আজ চোখের জ্যোতি ফিরে পেয়েছি।ধন্যবাদ তোমাকে।
আঞ্জুমান কান্না থামিয়ে জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে তাকালো জিয়াউলের দিকে।
-বুঝলে নাতো? আমি তোমার মাঝে একসাথে একজন স্ত্রী ,মা ,মেয়ে ,শিক্ষিকা আর আদর্শ নারীকে দেখতে পেতাম।যার অবস্থান সকল মেয়েলি হিংসা থেকে দূরে বহুদূরে। কিন্তু আজ সেই চোখের ছানি তুমি নিজ হাতে টেনে ছিড়ে দেখিয়ে দিয়েছো তুমি আর পাঁচটা সাধারণ বঙ্গ নারীর মতোই। যে বিপদে কিংবা দূর্বল সময়ে প্রচন্ড স্বার্থপর হয়ে উঠতে পারে। বিশ বছরের মমতাকে তুড়ি মেরে অবজ্ঞাতে পরিনত করতে পারে।
রাজহাঁসের বাচ্চা পাতিহাঁসের ডেরায় নিজেকে পাতিহাঁস মনে করলেও ,পাতিহাঁস মনে মনে ভীত থাকে কারণ সে জানে এটা রাজহাঁসের বাচ্চা। যে নীলুফাকে তুমি আজ অপমান করেছো। মাত্র কয়েকদিনের পরিচয়ে আমি দেখেছি সেই নীলুফা ইয়াসমিন ঠিক নারী নামের কতটা কোমলতার প্রতীক ছিলো।পুরো পরিবারের স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তির একমাত্র মালিক হয়েও কতটা অহংকারশূন্য ছিল।জিয়ানাকে তুমি কালসাপ বলেছো ঠিক কোন হিসেবে আঞ্জু?
আঞ্জুমান মাথা নিচু করে ফেললো। রাগে যে মানুষ শয়তানের বশিভূত হয়ে যায় সেটা হাড়েহাড়ে টের পাচ্ছে আঞ্জুমান।
আঞ্জুমানকে উত্তর দিতে না দেখে জিয়াউল নিজেই আবার বলা শুরু করলো ,
-গ্রামের ফার্মটার মালিক কে? তুমি ভালো করেই জানো।আমাদের নামে পঞ্চাশ লাখ টাকার এফডিআর নীলুফা এমনি এমনি দিয়ে যায়নি সেটাও জানো।একটা বাচ্চার খরচ কি বিশ বছর আগে পঞ্চাশ লাখ ছিলো? সেই টাকা তুমি তোমার ভাইয়ের কথায় ব্যবসায় লাগিয়ে পুরোটাই যে লস খেয়েছো। সেটার জবাবদিহিতা কিন্তু জিয়ানার প্রাপ্য। তুমি আর আমি দুইজনই জানি জিয়ানা কঠিনরুপী নীলুফার ভার্সন। যার কাছে টাকা পয়সা কিংবা সহায় সম্পত্তির কোন মূল্য নেই। তার কাছে মানুষ সবার আগে। সে যেই লেবেলেরই হোক।
দরজায় দাঁড়ানোর নিবিড় পুরো কথাটাই শুনলো।তারপর দরজায় আঙুল দিয়ে টোকা দিয়ে নক করলো।দরজার শব্দে জিয়াউল থেমে গেলো তৎক্ষণাৎ। নিবিড়ের রুমে ঢুকে বলল,
-আমার জিনিস আমি কারো কাছে রাখতে পছন্দ কিংবা স্বাচ্ছন্দবোধ করি না।তবে হুটহাট বিয়ে হওয়াই প্রস্তুতিও শূন্য। তাই আগামী কাল পর্যন্ত মিসেস সুখনীল নিবিড়কে আপনাদের আমানতে রেখে গেলাম। সহিসালামতে আমাকে ফিরত দিবেন আশা করি।
তারপর আঞ্জুমানের দিকে তাকিয়ে বলল,
-আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ। আমার ফু-আম্মুর মেয়েকে আগলিয়ে রেখেছেন। তবে উনার নামে যে নোংরা কথা গুলা বলেছেন আপনার জায়গায় অন্য কেউ হলে সেখানেই পুতে ফেলতাম। ফ্রি ফ্রি তো আর মানুষ করেন নাই তাই উদার হওয়ার মিথ্যা চেষ্টা করবেন না।আজ থেকে জিয়ানার সাথে আপনাদের লেনদেন এখানেই স্পট।আসি।
আঞ্জুমানের মুখ অপমানে কালো হয়ে গেলো।পুতে ফেলা বলা আর করা যে একই জিনিস।হাটুর বয়সে একটা ছেলে তাকে এইভাবে অপমান করলো।তারপর জিয়াউলের দিকে তাকিয়ে দেখলো ,সে নির্লিপ্ত ভাবে একই ভাবে বসে আছে।রাগে কিছু কথা না হয় বলেছে। তাই বলে একদিনে সবার কাছে ভিলেন হয়ে গেলো।নিশ্চয় জিয়ানাও এখন মুখ ফিরিয়ে নিবে।এইজন্যই কি লোকে ঠিকই বলে ,পিঠের হাড় বুকে জোড়া লাগে না।
নিবিড়ের ছেলেরাই খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করেছে। মুলত মক্কুকে বলে জেনি আনিয়েছে।দশ বারোজনের খাবার সব আনপ্যাক করে ডায়নিংয়ে প্লেটে প্লেটে সাজিয়ে রাখছে।নিবিড় হন হন করে ডাইনিং পাড় হয়ে মেইন দরজায় পৌঁছানোর সময় জেনি পেছন ডাকলো।
-না খেয়ে যাবেন না ভাই প্লিজ। জিয়ু ওইভাবেই বসে থাকবি? খেতে আয়।
নিবিড় দাঁড়িয়ে গেলো। আর জিয়ানা পাথর থেকে ফট করে দাঁড়িয়ে গিয়ে ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ করে ফটাফট পাশের ওয়াশরুমে ঢুকে গেলো।নিবিড় একপ্রকার অবাক হয়েই দেখলো এই পাগলের উদ্ভট আচরণ।
মক্কু এগিয়ে এসে নিবিড়ের হাত ধরে ডাইনিংয়ে নিয়ে গেলো।বসবে তখন জিয়ানা বের হয়ে এলো। ভেজা মুখে ,ফ্রেশ ফ্রেশ একটা চনমনে ভাব নিয়ে। কারো দিকে না তাকিয়ে চেয়ার টেনে বাবু হয়ে বসে খাওয়া শুরু করলো। সবার কি খাবে তার কান্ডকারখানা দেখছে।
স্তব্ধ সবাইকে দেখে জিয়ানা মুখ ভর্তি খাবার নিয়ে বলে,
-আপনাদের কি হাতেপায়ে ধরে খাওয়াতে হবে? খেয়ে দেয়ে ফটাফট ফুটেন। ঘুম পাচ্ছে আমার।
-জিয়ু কি হচ্ছে কি? সবাইকে রেখে তুই আগে বসে গেলি কেন?এটা কেমন ম্যানার্স?
জেনি কপট গলায় জিজ্ঞেস করলো।
-আমার বিয়ে আমি আগে খাবো না? তাছাড়া একদিনে এত ধকল সব তো আমার উপর দিয়েই গেছে নাকি?
নিবিড় ঠিক জিয়ানার পাশের চেয়ারটাতে বসে জিয়ানার প্লেট নিজের দিকে টেনে নিলো।এবার সবাই আরও আবাক। জিয়ানা চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে দেখছে ভণ্ড নেতার কাজকর্ম। জিয়ানার এটো খাবার এক লোকমা মুখে দিয়ে বলে,
-বিয়ের দিনে স্বামী স্ত্রী একে অন্যের এটো খাবার খেতে হয়। এতে মহব্বত বাড়ে।
তারপর প্লেট আবার জিয়ানাকে ঠেলে দিয়ে উঠে গেলো।জিয়ানা ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে আবার খাওয়া শুরু করে বলল,
-ফাজলামি হচ্ছে? ফ্রি ফ্রি বিয়ে করেছেন আবার মহব্বত? আপি আমার বিয়ে তো হাওয়া হাওয়া। তোমারটা তো ভ্যালিড। মিষ্টি টিষ্টি কিছু খাওয়াবে নাকি এই পর্যন্তই?
-আরেহ হাওয়া হাওয়া হবে কেন?ভাই বাহাত্তর বার কবুল বলছে। আমি না থামাইলে চলতেই থাকতো।
মক্কু খেতে খেতে বলল।জিয়ানা তখনো একমনে খাচ্ছে। নিবিড় চোয়াল শক্ত করে জিয়ানার বাহু ধরে টান মেরে দাঁড় করিয়ে বলল,
-ফাজলামি আর আমি দুই মেরুর বাসিন্দা। মুখ সামলিয়ে আমার সাথে কথা বলতে আসবে।ফার্দার তোমার বাকুয়াজ একদম সহ্য করবো না।
-আহা লাগছে ছাড়ুন।আর খেয়ে দেয়ে ফুটুন।একদিনে আমার মস্তিষ্ক এরচেয়ে বেশি ড্রামা নিতে পারবে না।
নিবিড় হাত ছাড়লো না।বরং আরো একটা শক্ত করে ধরে টানতে টানতে দরজার দিকে নিয়ে গেলো।পেছন পেছন সবাই এগিয়ে এলো।
-বিয়ের পর বাপের বাড়ি থাকার নিয়ম নেই।যদিও এটা তোমার বাপের বাড়ি না।যেভাবে বিয়ে হয়েছে সেভাবেই স্বামীর ঘরে যাবা। চলো।
-সে না হয় যাবো। তবে এমন ঢ্যাংগা ঢ্যাং করে নাকি?যান বিয়ের বাজার সদাই বেনারসি সব আনোন।সাথে মিষ্টি।কিপটা লোক কোথাকার ছাড়ুন।বিয়ে করে মাথা কিনে নিয়েছেন নাকি? আপনার কথায় আমাকে চলতে হবে?
হাত ছাড়িয়ে ড্রয়িংরুমে আসার সাথে সাথে আঞ্জুমানের সামনে পড়ে আর সেভাবেই দাঁড়িয়ে যায় জিয়ানা।নিজেকে সামলিয়ে চমৎকার হেঁসে বলে,
-শুকরিয়া চাচিজান।আপনার আদর যত্নের কোন ক্রুটি ছিলো না। আই নেভার আন্ডারস্ট্যান্ড ফর ইভেন আ সিঙ্গেল ডে দ্যাট ইউ আর নট মাই ওউন মম। আর একটা দিন থাকি এই বাসায়? কাল চলে যাবো প্রমিজ।
বলে নিজের রুমের দিকে গেলো জিয়ানা।
আঞ্জুমান নিরব হয়ে শুনে গেলো সব। কিছু কিছু ক্ষোভ মানুষের নিজ অন্তর চিড়ে বের হয়।সেটা মনে মনে না পুষলেও হঠাৎ একদিন বিস্ফোরণের মতো প্রকাশ পায়। সেই বিস্ফোরণে সব লণ্ডভণ্ড হয়। ছিন্নভিন্ন হয় সম্পর্ক। তরোয়ালের আঘাতের চেয়ে যে মুখের কথার আঘাত বেশি ভারিক্কি পড়ে। সেই আঘাত না যায় সারানো ,আর না যায় ভুলা। নিজের ভুল বুঝতে পারলেও সেটা আর ফেরত নেয়া যায় না।তাই তো ভাবিয়া বলিয়ো কথা ,বলিয়া ভাবিয়ো না।
নিবিড় সহ মক্কু আর বাকিরাও চলে গেলো তৎক্ষনাৎ।
জিয়ানা বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখলো তাদের প্রস্থান। পেছন থেকে জেনিও এসে পাশে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো ,
-এমন ভাবে ট্রিট করা ঠিক হলো?এখন থেকে কিন্তু ঠিকঠাক ব্যবহার করতে হবে। স্বামী হয় তোর।
-স্বামী? দুই মিনিট ভাবতেও কেমন যেনো লাগে। উনি পি টি এস ডি রোগী। মানে পাষ্ট ট্রমাটিক ডিসঅর্ডারে ভোগছেন।আমাকে আজ নিজের বাড়ি নিলে কাল লাশ পাবে।দাম্পত্য জীবন স্বাভাবিক তো দূর কি বাত আমি একটা দিন স্বামী সোহাগীও হতে পারবো না। এখন বল স্বামী হিসেবে তুমি এমন মানুষকে নিয়ে কি ভাবতে?
-নিবিড় ভাই না হয় পেসেন্ট। ট্রিটমেন্ট করলে ঠিক হবে। আমাকে দেখ এলাকার বিখ্যাত বখাটের বউ। না আছে পরিবার ,না আছে মাথা গোজার ঠায়। ক্লাবে তো আর সংসার পাতা যায় না।যদিও আমি খুশী। কলুষিত এই আমাকে জেনেশুনে কে গ্রহণ করবে। সেখানে মুসাদ্দিক নাকি গোপনে আমাকে পছন্দ করতো বলেই আজ বিয়ের জন্য এগিয়ে এসেছে। একজন ঢাকঢোল পিটিয়ে সারা পৃথিবীকে জানিয়ে ভালোবেসে বিপদে কেটে পড়েছে। আরেক জন গোপনে ভালোবেসে বিপদে আগলিয়ে নিয়েছে।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরও বলল জেনি,
-নিবিড় ভাই কেমন সেটা আমরা তো এই কয়েকদিনে ভালো করেই জেনেছি।আমার মনে হয় উনার সাহারা হওয়া উচিত তোর। লোকটা অনেক দুঃখী।নিজের পরিবারের কাছে কিচ্ছু পায়নি। এখন তুই উনার একমাত্র পরিবার।
পরিবার কথাটা জিয়ানার কানে চিনচিন করে উঠলো যেনো।যে পরিবারের গর্ব সে করতো সেটাই তো নিজের না। তারও তো কেউ নেই। নিবিড়ের থেকে নেই আর তার সত্যি সত্যি নেই। দুইজন দুঃখী মানুষের এক হওয়ার কোন দরকার ছিলো কি?কে কার সাহারা হবে।সেখানে দুইজনেরই দুঃখের শেষ নেই।
অনেকক্ষণ দুইবোনের জীবনমুখী আলোচনা চললো।ঘন্টা দেড়েক পর দরজায় আবার নক হলো।জিয়ানা দরজা খুলে হা হয়ে গেলো।কারণ আকাশ অনেকগুলো মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জিয়ানাকে দেখে সালাম দিয়ে বলে উঠলো ,
-ভাবি! ভাই বিশ কেজি মিষ্টি পাঠাইছে। রাত হওয়াই দোকানে আর মিষ্টি ছিলো না।
-ফাজলামি করেন? এত মিষ্টি দিয়ে কি হবে?
কপট রাগ নিয়ে জিজ্ঞেস করলো জিয়ানা।জেনি এগিয়ে এসে দেখে অবাক হয়ে আছে সেও।
নীতিহীন রাজ পর্ব ২০
-ভাই বলছে আপনাকে মিষ্টি দিয়ে গোসল করতে। আপনার আচরণে নাকি সুইটনেস নাই। ও হ্যাঁ জেনি ভাবিকে বলেছে মিষ্টি বালতিতে রস সহ ঢেলে জিয়ানা ভাবিকে চুবিয়ে রাখতে।
বলে এক ছুটে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেলো।এদিকে জিয়ানার মেজাজ সপ্তম আকাশে। জেনি পেছন থেকে জিয়ানার মাথায় খাট্টি মেরে বলল,
-নে এবার নিজের হাওয়া হাওয়া বিয়ের মিষ্টি খা।গাধি কোথাকার।
