নীতিহীন রাজ পর্ব ২৮
আশিকা আক্তার সোহাগী
“আজকাল সবকিছুই ভার্জিন যেমন এক্সট্রা ভার্জিন ওয়েল ,ভার্জিন রেজিনের প্লাস্টিকের জিনিস শুধু মেয়ে মানুষই ভার্জিন না ”
বলে চায়ের কাপটা উঠালো সুখনীল নিবিড়।
তার সাঙ্গু পাঙ্গুরা সহমত ভাই ,একমত ভাই। ঠিক বলছেন ভাই বললেও একজন বলে উঠলো
-কেন ভাই আমাদের ভাবির সমস্যা আছে নাকি?
নিবিড় চায়ের কাপটা আস্তে করে বেঞ্চে রেখে বলল,
-আমারটার কথা আলাদা।সে নেপচুন থেকে আনিতো হিরা।আমি এই পৃথিবীর প্রাণীদের কথা বলছি।নেক্সট টাইম আমার বউ সম্পৃক্ত কোন কথা তোদের কারো মুখ থেকে শুনতে চাই না।
শেষের কথাটা বেশ কড়া সুরে বলল।
আকাশ মক্কুকে কনুই দিয়ে গুতো দিয়ে বলে,
-ভাই কেমনে কইরা আমার আমার বলে দেখছেন?কেমন অধিকার দেখায়।ওইদিন অর্ধেক বাসর সাইরাই বুঝতে পারছে ভাবি ডিফারেন্ট। আপনে কিছু বুঝছেন নাকি?
আকাশের গলা অনেকটা ফাটা বাঁশের মতো হওয়াই। মোটামুটি সবাই শুনতে পারছে তার কথা।নিবিড় তার দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো ,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
-কি বললি তুই? আবার বল?
আকাশকে কে আর পায় কে। চা টা ফেলে এক ছুটে দূরে গিয়ে বলে ,
-ভাই আমরা না গেলে তো ফুল কোর্স কমপ্লিট করে ফেলতেন।যতই অস্বীকার করেন আমরা কিন্তু সত্যিটা জানি।
নিবিড়ও বসা থেকে উঠে আকাশের দিকে এগিয়ে বলল,
-আই কাছে আই।কিচ্ছু করবো না।আস্তেধীরে সব আলোচনা করা যাবে।
আকাশ আর একটু দূরে গিয়ে বলে,
-মাথা খারাপ আমার।আপনার কাছে গেলে আজ আর রক্ষা নাই।এখন তো আমি ভাবির কাছে যাবো।বাঁচাইলে সেই একমাত্র পারবে।
“হুম যে আমার ওয়েট পাঁচ মিনিট নিতে পারে ,সে বাঁচাবে আমার কাছ থেকে তোকে? বলদ গুলা সব আমার কপালেই পড়ে ” মনে মনে বলে আবার টং দোকানে ফিরে গিয়ে দেখে সবগুলাই মিটিমিটি হাঁসছে।
-করিম চাচা সবগুলারে আজ দশ কাপ করে বুলেট চা(নাগা মরিচের চা) খাওয়াবা। নাহলে তোমার দোকান আজ থেকে বন্ধ।
বলে গটগট করে চলে গেলো নিবিড়।
জিয়ানা ক্লাস থেকে বের হয়েই আকাশের মুখোমুখি হলো। আকাশ লোক সম্মুখে ভাবি বলে লম্বা সালাম দিলো।আশেপাশের কিছু মেয়ে আড়চোখে একবার দেখে চলে গেলো।জিয়ানা কপাল ভাজ করে বলল,
-ভাবি ডাকে ভন্ড ভন্ড একটা ব্যাপার আছে।আজ থেকে আমাকে আম্মা আর কাবলিওয়ালাকে আব্বা ডাকবেন। মনে থাকবে?একদম মমতা ঘেরা ডাক। আহা।ভাবতেই ভালো লাগে কত গুলা দামড়া দামড়া মানুষ আমাকে আম্মা! আম্মা বলে ডাকছে।এখন আসি। আল্লাহ হাফেজ।
আকাশের শুকনা কাশি শুরু হলো।পাশ থেকে একজন একটা বোতল এগিয়ে দিলো।আকাশ আশেপাশে না দেখে বোতল টা নিয়ে ঢকঢক করে বোতলটা খালি করে ফেলে।
-আরেহ আরেহ বোতলে মুখ লাগালেন কেন? এই জন্য কারো উপকার করতে নেই।যত্তসব।
বলে হাত থেকে একপ্রকার টান দিয়ে বোতল টা নিয়ে জিয়ানার পেছন পেছন চলে গেলো মিম।
আকাশ অবাকের উপর অবাক হয়ে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর আব্বা বলে আবার দৌঁড়ে ক্লাবের দিকে গেলো।তাকে সবাই পেয়েছে টা কি।যে যেমন পারছে ঝাড়ি মারছে।আর জ্ঞান দিচ্ছে শুধু। পঁচিশ বছর বয়সে নিজেকে প্রাইমারির ছাত্র মনে হচ্ছে।
জিয়ানা কমন রুমে এসেছে ফ্রেশ হবে। থ্রিউরিটিক্যাল ক্লাস করলে তার প্রচন্ড ঘুম পায়।ঝিমুনী দিয়েই অর্ধেক ক্লাস পাড় হয়।তারপর যদি হয় মিনিমিনে গলার টিচার ,তবে মনে হয় কানেকানে কেউ ঘুম পাড়ানির লড়ি শোনাচ্ছে।ঘুমের রেশ কাটানোর জন্য তার এখন পানির ঝাপটা দরকার।
ওয়াশরুমে ঢুকে আগে টয়লেটে ঢুকলো। মিম বেসিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। বাহির থেকে দুইটা মেয়ে এলো আলোচনা করতে করতে। আলোচনার ট্রপিক নিবিড় কেনো জিয়ানাকে বিয়ে করলো।তারা বিশ্বাস করতে পারছে না।
-আমার মনে হয় নিবিড়কে ব্ল্যাকমেইল করে বিয়ে করেছে এই অদ্ভুদ মেয়ে।
অপরজন বলে উঠলো ,
-আমার তো মনে হয় ব্ল্যাক ম্যাজিক করেছে।নিবিড় ভাইয়ের রুচি তো অত্যন্ত উন্নত। এমন ছেলে ছেলে দেখতে মেয়েকে কেন বিয়ে করতে যাবে?
-ঠিক বলেছিস।আবার সত্যি নাও হতে পারে। এমনি হইতো নিবিড়ের নামের সাথে জড়িয়ে ফর্মে থাকতে চায়। নিবিড় ভাইয়ের বিয়ের কি দরকার? যেখানে পুরো ক্যাম্পাস উনার একরাতের বউ হইতে রাজি।
-হ্যাঁ ঠিক।কয়েকদিন আগে একটা ভিডিও আপ দিয়েছে দেখেছিস? কি শার্প জোলাইন দেখেছিস? আহা আমার গলা শুকায়ে যায়।উনাকে তামান্নার সাথেই মানায়।
এদের কথোপকথনে মিমের মেজাজের ঘরে আগুন লেগে গেলো যেনো।গলা খাকি দিয়ে বলে উঠলো ,
-ওই হাগা-মুতার জায়গায় এত কথা কিসের? বাথরুমে বেশি কথা বললে মুখে গন্ধ হয়। যদিও তোমরা এমনিতেই সেফটি ট্যাংকি।যত্তসব ফালতু চিফ মাইয়া।অন্যের জামাইয়ের দিকে খারাপ নজর দেয়।
মেয়ে দুইটা মিমের দিকে একপ্রকার তেড়ে গেলো। জিয়ানা বের হয়ে তুড়ি বাজিয়ে সবার এটেনশন তার দিকে ঘুরিয়ে বলে,
-নিবিড় কি বলিউড কিংবা হলিউডের হিরো? একে তো কালা তার উপর আবার রেকর্ড মারহাবা। জিয়ানা হকের দিন এত খারাপ আসে নাই তোমাদের এই সো কলড ভন্ড নেতাকে ব্ল্যাকমেইল বা ব্ল্যাক ম্যাজিক করবে।মানুষের রুচি। ইয়াক। চল মিম একে মিম।
জিয়ানা যে ওয়াশরুমে মেয়ে দুইটা টের পাইনি।তাই নিয়ানাকে দেখে তারা চুপসে গেলো।
-তুই শুনেছিস কি সব বাজে কথা বলছিলো? চল নিবিড় ভাইকে বিচার দিয়ে আসি?
মিম রেগে বলল। তখন জিয়ানা তাকে সাইড হাগ করে ওয়াশরুম থেকে বের হতে হতে বলল,
-মিম দুগুনে ডিমের বাচ্চা।অল্পতেই এত হাইপার হলে চলে? আর নিবিড় কে? ওর কাছে বিচার দিবি কেন? সে কি জাজ?ফালতু আদমি একটা ফ্রি ফ্রি বিয়ে করে পগারপার।পাঁচদিন হতে চলল অথচ খোজখবর তো দূর কি বাত একটা সিঙ্গেল কলও করে নাই। তাকে আমি গুনাতে ধরি না।ভাবছি একটা সুগার ডেডি ধরে ভেগে যাবো।
-ছিঃ কি সব চিন্তা তোর।
-আগে শেষ করতে দে মেরি মা।আমি ভেগে গেলে কি হবে জানিস? লোকে বলবে নিবিড়ের বউ ভেগে গেছে।যে লোক বউ সামলাইতে পারে না সে কিভাবে এলাকা সামলাবে?
বলে হেঁসে কুটোকুটি হলো জিয়ানা।সাইড থেকে মিম পিঠে একটা কিল দিয়ে বলল,
-একটু মেয়েলি কাপড় পড়তে পারিস না? তাহলেই তো সবার মুখ বন্ধ হয়ে যাবে।তোর যে ফিগার নায়িকা ফেইল। মেয়েগুলা জেলাসিতে জ্বলে মরে খাক হয়ে যাবে।
-সোসাল সাইটে একটা মিমস দেখিসনি? “অত দামীদামী জামা কাপড় পড়ে কি হবে? জীবনের সবচেয়ে সুখের মুহূর্ত কাটে কাপড় ছাড়া। ”
বলে একটা দৌঁড় দিলো। মিমের কান গরম হয়ে উঠলো এমন এডাল্ট জোক্স শুনে। সেও পেছন পেছন ছুটলো।জিয়ানা মাঠে দৌঁড়ে এসে বলল,
-ওকি তুই আমার জোক্স শুনেই লাল হয়ে যাচ্ছিস?বাসর ঘরে তো মেলট হয়ে যাবি। সরি তুই তো ডিম তুই হবি সিদ্ধ ডিম।
মিম তেড়ে গিয়ে ধরতে চাইলো। জিয়ানা আবার ছুটলো।কিছুটা ছুটাছুটির পর জিয়ানা হঠাৎ চিৎকার করে উঠলো।সামনে সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট পড়া ফর্মাল ড্রেসাপে এক ছেলে এগিয়ে আসছে তাদের দিকে।জিয়ানা ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো।মিম দাঁড়িয়ে পড়লো নিজের জায়গায়।
জিয়ানা হেঁসে হেঁসে হাত জড়িয়ে ধরে কথা বলছে।একবার লোকটার খোচাখোচা দাঁড়ি ধরে দেখছে। আবার পেটে ঘুষি মেরে খিলখিলিয়ে হেঁসে উঠছে।
মিমি ভাবছে এত দিলখোলা মানুষ কেমনে হয়?কোন জড়তা যার নেই সেই জিয়ানা।বাস্তববাদী এই মেয়েটাকে সৃষ্টিকর্তা চমৎকার ভাবে বানিয়েছে।মিমের বাবা একজন সামান্য দপ্তরি। মিমদের পাঁচ ভাইবোনের সংসারে দিন কাটানো যেনো যুদ্ধ জয়ের মতো।
জিয়ানার দুইটা টিউশনি মিমকে দিয়েছে। নিজে এখনো টিউশনি খোজে পাচ্ছে না। বাসা থেকে খরচ নেয় না।যতদূর জানে ফ্ল্যাটের ভাড়া বাবদ খাওয়ার খরচ সহ দশহাজার লাগবে।এই মেয়ের কাছে একটাকাও নেই। অথচ দেদারসে ঘুরছে ফিরছে।যদি বলা হয় কি করবি? কাল কিভাবে চলবি? উত্তর একটাই। ফিকার নট ইয়ার।
মিমের ধ্যান ছুটে গেলো হঠাৎ হটকারিতায়। কোত্থেকে নিবিড়ের কয়েকটা চ্যালাপেলা এসে,উক্ত ব্যাক্তিটির কলার ধরে ঝাকাচ্ছে।মিম দৌঁড়ে কাছে গেলো।
জিয়ানা ব্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ দেখলো। তারপর কলার ধরা ছেলেটাকে ছেচকা টান দিয়ে ছাড়িয়ে বলল
-ওই কি হচ্ছে টা কি?গুন্ডামী সব জায়গায় নাহ?
এক চ্যালা এগিয়ে এসে বলল,
-ভাবি! ভাই জানলে এই হা*লারপুতের খবর আছে। আপনি সরেন আমরা দেখতাছি ব্যাপারটা।
এতক্ষণে ভদ্রলোকের জবান ফোটলো ,
-জিয়ু তোদের ক্যাম্পাসের অবস্থা সত্যি খুবই খারাপ।আর এরা তোকে ভাবি ডাকছে কেন?
-কারন সে নিবিড়ের স্ত্রী।নিবিড়ের সবকিছু রিজার্ভ।হাত দেয়া তো দূরের কথা ,তার উপর কেউ নিশ্বাসও ছাড়তে পারবে না।
নিবিড় হেঁটে আসতে আসতে বলল।
জিয়ানার কুঞ্চিত ব্রু আর একটু ভাজ হলো।নিবিড় এসে খপ করে জিয়ানার হাত শক্ত করে ধরে জিজ্ঞেস করলো ,
-ক্যাম্পাসে এখন প্রায় সবাই জানে তুমি আমার স্ত্রী।আমার একটা ওয়েট আছে। অথচ তুমি এই খোলা মাঠে পরপুরুষকে জড়িয়ে ধরেছো?
জিয়ানা মুচড়িয়ে হাত ছাড়িয়ে বলল,
-গুন্ডামীর সময় শুধু স্ত্রী না? ভন্ড লোক ছাড়ুন।আমি যাকে ইচ্ছা তাকে ধরবো। ধরে গলায় ঝুলে থাকবো আপনার কি? আপনি কি করেন আমি জানি না? নিজের বেলায় লীলা আর আমার বেলায় বিলা?
ভদ্রলোক এগিয়ে এসে নিবিড়ের হাত থেকে জিয়ানার হাত ছাড়িয়ে বলল,
-এইজন্য আমি চাইনি তুই ঢাবি ছেড়ে এখানে ভর্তি হোস।বাসায় চল। আমি সরাসরি এখানে এসেছি।জেনিকে বলেছি সে ক্লাস করে চলে যাবে।
জিয়ানা আড়চোখে একবার নিবিড়কে দেখলো।দাঁতে দাঁত যে চেপে ধরে আছে বুঝা যাচ্ছে। আর একটু জ্বালানোর জন্য ভদ্রলোকের হাত জড়িয়ে ধরে বলল,চলো।
নিবিড়ের রক্ত মনে হচ্ছে ফুটা শুরু করলো। শিরা উপশিরা ফুলে চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো।হেচকা টানে নিজের কাছে নিয়ে বলল,
-জিয়ানা! মেজাজ কিন্তু অত্যাধিক খারাপ হচ্ছে? আমার সামনেই তুমি অসভ্যতা করছো?
-আশ্চর্য! এই আপনি বারবার ওকে এভাবে টেনে নিচ্ছেন কেনো? আবার টিজিং করছেন বাড়ির লোকের সামনে? গুন্ডামী সব জায়গায় খাটে না জনাব।ছাড়ুন আমার বোনকে।
নিবিড়ের হাত নরম হয়ে গেলো।বোন? এটা কি জেনির ভাই?
জিয়ানার দিকে তাকিয়ে দেখে চোখ হাসছে। এই মেয়ে ইচ্ছা করে তাকে এমন বেইজ্জতি করলো।
জিয়ানা জুনায়েদের দিকে এগিয়ে গেলে। জুনায়েদ জিজ্ঞেস করলো ,
-তোকে বারবার স্ত্রী স্ত্রী করলো কেন?
-পাগল আদমি।
একপ্রকার জোরেই বলে চলে গেলো জিয়ানা।
চ্যালাগুলা এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে ,
-ভাই ভাবি কি আপিনাকে পাগল বলল?
নিবিড় কটমট করে তাকালো তাদের দিকে।আজকাল তাকে কেউ ভয় পাচ্ছে না।এই পাগল মেয়ের জন্য সবার ভয় কেটে যাচ্ছে।যে যেমন পারছে উদ্ভট প্রশ্ন করছে।রাগে কিড়মিড় করে আবার ক্লাবের দিকে হাটা ধরলো।
কিছুদূর গিয়ে জিয়ানা বল,
-ভাইয়া আমার তো ল্যাব ক্লাস আছে একটা। শেষ করে চলে আসবো।তুমি চলে যাও।
পেছনে ফিরে দেখে মিম পেছন পেছন আসছে।জিয়ানা মিমকে ডেকে পরিচয় করিয়ে দিলো জুনায়েদের সাথে।জুনায়েদ তাকিয়ে দেখলো পিচ্চি একটা হ্যাংলা মেয়ে। স্বাস্থ্য অত্যাধিক খারাপ। তবে চোখ আর ঠোট গুলো খুবই সুন্দর। একদম গ্রামীণ ফ্রেশ একটা ভাব আছে।
মানুষ তার ব্যাবহার দিয়ে যেমন মানুষকে আপন করতে পারে। আবার ব্যাবহার দিয়েই আপনকে পর করতে পারে।
জিয়ানার ল্যাব ক্লাস হয়নি। তাই সে আগেই চলে আসে জিয়াউলের বাসায়।দরজায় নক না করে নিজের চাবি দিয়ে খুলে ভেতরে ঢুকে সবাইকে সারপ্রাইজ দিবে ভেবেছে।কিন্তু নিজেই যে এত বড় সারপ্রাইজ পাবে আশা করেনি।
জিয়াউলের বেডরুমে আঞ্জুমানের একাধারে বলা কথায় জিয়ানার কাছে মনে হলো ,সে নদীর পাড়ের বালুর কিনারা। যেটা ঝুরঝুর করে ভেঙে মিশে যাচ্ছে নদীতে।
-জিয়া সারাজীবন তোমার এই উদারতায় আজ আমাদের এই হাল।সত্যতা ধুয়ে পানি খাও এখন।বারবার বলেছিলাম জিয়ানার সাথে জুনায়েদের বিয়েটা দিয়ে দাও।তাহলেই তো নীলুফার ওয়ারিশ সব জুনায়েদের হয়ে যেতো।
পাশ থেকে জুনায়েদ একপ্রকার চিল্লিয়ে বলে উঠলো ,
-আম্মু প্লিজ।যদিও আমি জানতাম জিয়ানা আমার কাজিন।কিন্তু ওকে আর জেনিকে কখনো আলাদা করে দেখিনি।এই ট্রপিক বাদ দাও।অন্য সমাধান খোঁজে বের করো।
-অন্য কি সমাধান বাকি আছে? তুমি দামী ফ্ল্যাট কিনে লুন দ্রুত শোধ করতে অফিস থেকে ঘুষ খেয়ে মামলা খাবে। আর আমরা ভর্তুকি দিবো? এটা ভাবলে কি করে? আমাদের কি অবস্থা তুমি দেখতে পারছো না? এখন পর্যন্ত দুই টাকা দিয়ে পরিবারের পাশে কখনো দাঁড়িয়ে দেখেছো কেমন লাগে?
জিয়াউল উচ্চস্বরে প্রশ্ন করলো। আঞ্জুমান তাকে বাঁধা দিয়ে বলে,
-জিয়ানাই একমাত্র সমাধান।নীলুফার নামে যেহেতু ফার্মের জমিটা। তাই সেটার মালিক জিয়ানা।ওও যদি লিখে দেয় কিংবা বিক্রি করে টাকা দেয় তবেই সমাধান হবে।এছাড়া আমাদের আর কোন অপশন নাই।সরাসরি তো এইভাবে বলা যাবে না।তাই আমি ভেবেছি ওই গুন্ডার কাছ থেকে ডিভোর্স নিয়ে জুনায়েদের সাথে বিয়ে দিবো।এক হিসেবে জিয়ানারও ভালো এতে।আমার ছেলে ওকে ভালো রাখবে ওই মাস্তান ছেলেটার থেকে।
-বিপদে পড়ে তুমি একেবারে শয়তানের কবজায় চলে গেছো আঞ্জু।আমি তোমাকে চিনতে পারছি না।আমার আঞ্জু আর আজকের এই আঞ্জুর সাথে কোন মিল নেই।
বড্ড হতাশাগ্রস্ত হয়ে বলে উঠলো জিয়াউল।আঞ্জুমান গর্জে উঠে প্রশ্ন করলো ,
-তুমি আর তোমার মেয়ের বাড়াবাড়ির ফল আজকের এই আমি। চাকরি থেকে সাসপেন্স হয়েছি।তোমার ইনভ্যালিড হওয়া। আমার মেয়ের ইজ্জত হারানো।সামাজিক সম্মান ধূলিসাৎ সব তো আমারই ক্ষতি হয়েছে।ওই মেয়ের কি হয়েছে বল? সে তো দিব্বি পাখা মেলে ঘুরে বেড়ায়। আমি সেবা যত্ন করে বড় করেছি আর এই সামান্য জিনিস আশা করতে পারি না?
-আম্মু তুমি জিয়ানার কাছে যদি এমনিতেও চাও। ওও দিয়ে দিবে।ওইসব সংসারীক প্যাচ ওও বুঝে না।তাছাড়া আজ দেখলাম যার সাথে বিয়ে হয়েছে সেই লোকটাকে।মনে হলো জিয়ানার প্রতি বেশ পজেজিভ।
-পজেজিভ না ছাই জুনায়েদ।তুই তো জানিস না কিচ্ছু। ওই ছেলেদের সকল সম্পত্তিও জিয়ানার মায়ের নামে উইল করা। তারা বেদখল করে খাচ্ছে।তাই প্যাচে ফেলে বিয়েটা করেছে।দেখবি কিছুদিন পর সব সম্পত্তি নিয়ে ছুড়ে ফেলে দিবে জিয়ানাকে।
জিয়ানার আর শোনার সাহস হলো না কিছু।আস্তে করে যেভাবে এসেছিলো।সেভাবেই বের হয়ে গেলো বাসা থেকে। চমৎকার অযাচিত একজন মানুষ হিসেবে সে বেঁচে আছে।
বিল্ডিং থেকে বের হয়ে চারপাশ দেখলো।তারপর আকাশের দিকে তাকালো।এমন কি কোন নিজের মানুষ আছে এই আকাশের নিচে? কিছুক্ষণ ভাবলো।চিন্তার সাগরে হাতরেও একটা নামও মনে পড়লো না।
সাইকেল না চালিয়ে হাটিয়ে রাস্তা দিয়ে চলতে শুরু করলো। কিছুটা পথ এসে ফোন বের করে একটা পত্রিকা অফিসে মেইল সেন্ড করলো। মিনিট দশের পর ফোন এলো সেই অফিস থেকে। ফোনের ব্যাক্তি জিজ্ঞেস করলো ,
-আপনি কি কনফার্ম করছেন আমাদের অফারটার?
-জ্বি?
-এতে কিন্তু লাইফ রিস্কি আছে। আপনাকে বন্ড সাইন করে তবেই জয়েন করতে হবে।
-জ্বি আমার আপত্তি নেই।
-একবার কন্ট্রাক্ট পেপারে সাইন করলে কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের আগে বের হওয়ার কোন ওয়ে নাই।
-ঠিক আছে।
-ওকে তাহলে আপনার এড্রেসে তিনদিনের মাঝে আমরা সমস্ত পেপার আর ডকোমেন্টস পাঠিয়ে দিবো।আপনি সাইন করে রিসেন্ড করবেন।এবং সর্বোচ্চ গোপন রাখবেন নিজের এই পেশা সম্পর্কে। এক্সপোজ হলে আমাদের কোম্পানি কোন দ্বায়বার নিবে না।
-ঠিক আছে।
বলে জিয়ানা ফোন কেটে দিলো।তার তো কোন পিছুটান নেই।সিক্রেট ইনফর্মার হিসেবে সে এখন অফিসিয়ালি কাজ করতেই পারে।এতে করে এই জীবনের প্রতি তিক্ততা আসা বন্ধ হয়ে যাবে। দুই সিক্রেট ইনফর্মার হলে “Je Mujita” কাজ গুলাও সহজ হয়ে যাবে।
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আকাশের দিকে তাকালো।আকাশে আজ অর্ধচন্দ্র। আচানক নিবিড়ের মুখটা ভেসে উঠলো চোখের পাতায়। কিছুদিন মনে হয় নেশাটেশা বেশি করেছিলো লোকটা।হুটহাট ফোন দিয়ে চাঁদ চাঁদ করতো।অথচ সামনে যখনই পড়ে হয় টুটি চেপে ধরবে। নাহয় চর থাপ্পড়। নিবিড়ের দিক থেকে মনোযোগ সরিয়ে খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হেঁসে প্রশ্ন করলো ,
-এত প্রহসনের জীবন দিয়ে ভালোবাসা না দেখালেও পারতে? এরচেয়ে গ্রামের সকিনা জরিনা হওয়া ভালো।
ধপ করে কেউ পাশে বসায় বিরক্ত আর ইচ্ছা ছাড়াই পাশ ফিরে দেখে সেদিনের সেই ত্যাদড় লোকটা।
কালচারাল প্রোগ্রামের আর আছে একদিন।খাবারের বন্দোবস্ত হয়ে গেছে।ডেকোরেশনের কাজ শুরু হয়েছে ইতিমধ্যে। সিকিউরিটি আর মনিটরিং সব কাজ প্ল্যান করে রাখা।
সকাল থেকে দুপুরের মাঝে সকল কালচারাল কমপিটিশন হয়ে যাবে। বিকেলে আলোচনা সভা। তারপর প্রধান অতিথি পুরস্কার বিতরণী করবেন।শেষে সবাইকে বিরিয়ানির প্যাকেট দেয়া হবে।
মক্কু সব প্ল্যান আবার চেইক করে দেখছে।নিবিড় সারাদিনের পর মাত্র একটু ফ্রি হয়েছে। তাই চেয়ারেই গা এলিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে আছে।আর জিয়ানার কথা ভাবছে।এই মেয়ের চেহারা একপ্রকার আরশির মতো।মাথায় কি চলে সেটা চেহারার দিকে তাকালে ফট করে ধরে ফেলা যায়।তখন নিবিড়কে জ্বালানোর জন্য নিজের ভাইকে কেমন করে ধরলো। সেটা ভেবে নিবিড়ের ঠোঁটে হালকা হাঁসির প্রলেপ দেখা গেলো।মক্কু সেদিকে খেয়াল করে প্রশ্ন করলো ,
-ভাই জিয়ানার কথা ভাবতাছেন তাই না?
নিবিড় উত্তর দিলো না। তবে হাঁসি মিলিয়ে গেলো দেখে মক্কু আবার প্রশ্ন করলো ,
-আপনারই তো বউ ভাই।স্বীকার করতে লজ্জা কি? প্রেমে পড়ে গেছেন নিশ্চিত।
-জানি না রে মক্কু।তবে ওর দিকে তাকালে আমার মস্তিস্ক শান্ত হয়ে আসে।হৃদপিণ্ডে শীতল এক স্রোত বয়ে যায়।চোখ স্থির হয় ওর চেহারার দিকে বারবার।আজকাল অন্য কোন নেশা আর মস্তিস্ক ঠান্ডা করতে পারে না।
শান্ত সুরে চোখ বন্ধ করে মাথা চেয়ারে রেখেই বলল নিবিড়।
-বউয়ের নেশা বড় নেশা ভাই।আমার তো খালি ছটফট লাগে।জলজ্যান্ত একটা বউ আছে। অথচ আজ পাচঁদিন থেকে একা একা ঘুমাই।একটা বাসা নিতে হবে ভাই।ব্যালেন্স ভাঙ্গার সময় হয়েছে।
-তোর প্ল্যানটা চমৎকার। কিন্তু আমার প্ল্যান পাঁচ দিন আগেই শেষ। এরপর আর কোন রাস্তা নেই। আগানোর সব পথ বন্ধ।আমাদের সম্পর্কের কোন বর্তমান কিংবা ভবিষ্যৎ নাই।
-আপনে যদি আগান আমার মনে হয় জিয়ানা বাঁধা দিবে না।সেদিন নিজের চোক্ষে দেখছি। ওওই কিভাবে আপনার সেবা করছে।একটু তারছেড়া মেয়ে তবে ভেতরটা অসাধারণ। কারো প্রতি কোন অভিযোগ রাখে না।জেনি নিজেও বলে ,জিয়ানার মাঝে একটা সফট মেয়ে আছে যেটা শুধু তার প্রিয় মানুষের জন্য বরাদ্দ।খুবই এম্প্যাথিক সে । আর তার ভেতর বাহির এক। কোন আলাদা সত্ত্বা নাই।
-হয়েছে তোর গুনগান গাওয়া? উকালতি ভালোই পারিস?
-ভালো কথার ভাত রুটি কোনটাই নাই।তবে আমি চাই আপনে সুখী হোন ভাই।বেয়াদবি যদি না নেন একটা কথা বলি।ডাক্তারের কাছে যান।থেরাপি নিলে অবশ্যই আপনার এই ফোবিয়া কেটে যাবে।
-লাত্থি চিনোস? বিয়ে করেই বেডাগিরী শুরু করছিস? আমার কোন সমস্যা নেই। সমস্যা নারী প্রজাতি। এরা জঘন্য। এদের শরীর সব নষ্টের মূল। শরীর দেখিয়ে সব আদায় করতে চায়।আমার দ্বারা এদের সাথে কোন সদ্ভার সম্ভব না।না জিয়ানা আর না অন্য কেউ।
-তাহলে বিয়েটা কেন করলেন ভাই? আপনে যদি একবার মুখ দিয়ে না করতেন ,তবে তো আর কারো ক্ষমতাও ছিলো না আপনাকে রাজি করানোর।
নীতিহীন রাজ পর্ব ২৭
-কারন ওই মেয়েটাকে অন্য কেউ ছুঁয়তে পারবে না।সে নিবিড়ের লিখিত সম্পত্তি আর সম্পদও । সারাজীবনের বৈধ্যতার দলিল সহ সম্পত্তি ,যা নিবিড়েরই থাকবে।
মক্কু দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো।কেমন জটিল মানুষ।অদ্ভুত সব চিন্তা। না ধরবে আর না ছাড়বে। কি করে আর কি ভাবে কিচ্ছু বুঝা যায় না।তখন তালহা নামের একটা ছেলে দৌঁড়ে এসে বলে,
-ভাই! ভাবির সাথে এই লোকটা কলেজরোডের ফুটপাতে বসে গল্প করছে।
বলে ফোন বের করে ছবি দেখায়।ছবি দেখেই নিবিড় হঠাৎ অগ্নিমূর্তি ধারণ করে গর্জে উঠলো ,
-বা*ষ্টার্ড মেহেদী….
