নীতিহীন রাজ পর্ব ২৯
আশিকা আক্তার সোহাগী
“হুমায়ুন আহমেদ বলেছেন ,আল্লাহ পাক যে জিনিস যেখানে রেখেছেন সেখানেই ভালো লাগে।আল্লাহ পাক যদি ভাবতেন চাঁদকে কাছে আনলে ভালো দেখাবে তাহলে তিনি হাতের কাছে চাঁদ এনে দিতেন।হাত দিয়ে চাঁদের দেখার ব্যবস্থা করে দিতেন।”
বলে মুচকি হেঁসে জিয়ানাকে হাই দিলো মেহেদী ইসলাম।
জিয়ানা না তাকিয়েই উঠে গেলো। তার ভালো খারাপ কোন মুডই নাই আপাতত। কথা বলতেও ইচ্ছা হচ্ছে না। এই লোকের সাথে তো একদমই না।
-ছোঁয়াচে কোন রোগ নেই। বসতে পারো পাশে।
-আই ডোন্ট লাইক ফ্যান্সি পিউপল।
বলে সামনে আগাবে তখনই সাইকেলের পেছনের চাকা টেনে ধরে মেহেদী।
জিয়ানা প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে তাকায় মেহেদীর দিকে।
-আমি মেহেদী ইসলাম।সম্পর্কে তোমার কাজিন হয়।
জিয়ানার কুঁঞ্চিত ব্রু আরও কুঁচকে যায়।তারপর তীক্ষ্ণ স্বরে বলে উঠলো ,
-আমি জিয়ানা হক। বাবা মা নির্খোঁজ মানে বেঁচেই নেই।তাদের আগে পিছে কেউ ছিলো না অর্থাৎ এই ভূমন্ডলে আমার কেউ নেই। অহেতুক সম্পর্ক পাতাতে আসবেন না মিষ্টার। আর যদি আপনাদের সম্পত্তির ব্যাপারে কোন প্রশ্ন থাকে তবে উত্তর একটাই ,আমি কোন দাবী নিয়ে কখনই যাবো না। আপনারা নিশ্চিত থাকতে পারেন।দলিল আনলে সাইনও করে দিবো।ফিকার নট। ফার্দার আর কখনো আমার সামনে কোন আত্মীয় দাবি নিয়ে আসবেন না।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
-ওকে ওকে হাইপার হচ্ছো কেনো মেয়ে।বন্ধু তো হতে পারি?
-না পারি না।আমার কোন বন্ধুও নেই।আপনাদের মতো লাটের বেটা তো আরও না।
-বাপরে কেমন দিয়াশলাই এর মতো জ্বলে উঠছো বারবার। তবে দিয়াশলাই কিন্তু নিজে জ্বলে অন্যকে জ্যোতি দেয়।
-দিয়াশলাই কাঠি নিজে পোড়ে অন্যকে জ্যোতি দেয় ঠিক আছে তবে আমার লাইটার পছন্দ।গ্যাস শেষ হলে আবার ভরা যায়।অপর দিকে নিজের জ্বলে অন্যকে আলোকিত করার মতো উদার আমি না।আল্লাহ হাফেজ।
বলে জিয়ানা টান দিয়ে দুই কদম আগানোর সাথে সাথে মেহেদী বলে উঠলো ,
-মাত্র আঠারো বছর বয়সে নিবিড় আমাদের বাড়ির পরিচালিকার মেয়েকে ধর্ষণের পর খু*ন করেছিলো।
জিয়ানার পা থেমে গেলো সেখানেই।চোখের পাতা অল্প কেপে উঠলো হইতো।কয়েক সেকেন্ড সময়ে আবার নিজেকে নিজেই শান্তনা দিলো “তাতে তোর কিছু না জিয়ানা।তুই তো জানিস সে স্যাডিস্ট এপ্রোচ। মানুষিক ভাবে স্ট্যাবল না।”
আবার সামনে চলতে শুরু করলো জিয়ানা। থেমে যেতে হলো মেহেদীর পরবর্তী কথায়।
-তার কাছে যে মেয়ে গুলো রাত কাটায় প্রত্যেকজনকে খু*ন করে নিবিড়।
এবার এমন মিথ্যাচারে জিয়ানার ধৈর্য্য ছুটে গেলো।সাইকেল ফেলে মেহেদীর দিকে এগিয়ে গিয়ে ঠাটিয়ে পরপর দুইবার থা*প্পড় লাগালো।তারপর শার্টের কলার শক্ত করে ধরে ঝাঁঝালো স্বরে বলল,
-তাতে তোর কি? তুই সেই বদ লোক না? যে ভরা সমাবেশে আমার হাজবেন্ডকে বেজন্মা বলেছিলি? তোর কথা যদি ধ্রুব সত্যও হয় আমি জিয়ানা সেটা বিশ্বাস না করে ডিঙিয়ে যাবো আলগোছে। তোকে আমি খুব ভালো করেই চিনেছি।নেক্সট টাইম নিজের এই পা*ছার মতো মুখ বন্ধ রাখবি।আর সুখের কাজে কিংবা আশেপাশে ভিড়বি না।তোর পরিবারের ধার সে ধারে না।বুঝেছিস?
মেহেদী একেবারেই অপ্রস্তুত ছিলো। এমন কিছু ঘটবে ঘুনাক্ষরেও টের পায়নি।রাগান্বিত কাছ থেকে জিয়ানাকে দেখে তার ঘোর লেগে গেলো।পাতলা ঠোঁটের উঠা নামার কার্যক্রম আর রাগে নাক লাল হয়ে যাওয়া দেখে মেহেদীর পুরুষ মস্তিস্কে একসাথে মাল্টিকালারের রং জ্বলে উঠলো যেনো।তার এই ত্রিশ বছরের জীবনে শত শত নারীকে ভোগ করার মাঝে এমন এলার্ট বাজেনি।আজ তার ছোটবেলার সেই কথাটা আবার মনে পড়লো “নিবিড়ের জিনিস গুলা সবসময় বেষ্ট হয়। আর সেটা কেড়ে নিয়ে নিজের করার জন্য মেহেদীর জন্ম।”
-তুমি কি ভার্জিন? শুয়েছো নিবিড়ের সাথে?আই মিন ইন্টি*মেট হয়েছো?
সরাসরি এমন জঘন্য কথা শুনে জিয়ানার সারা শরীরে যেনো আগুন ধরে গেলো।সম্পর্কে এই লোকটা তার ভাশুর। হোক সৎ ভাই তবুও তো ভাই।কতটা বিকৃত মস্তিস্কের হলে কেউ এমন প্রশ্ন করতে পারে।
জিয়ানার ধ্যান ছুটে মেহেদীর তার থেকে কিছুটা দূরে ছিটকে পড়াতে।ঝড়েরবেগে নিবিড় মাটিতে পড়া মেহেদী বুকে লাত্থি দিয়ে গর্জে বলে উঠলো ,
-কু*ত্তার বাচ্চা তুই দেশে এসেই নোংরামি শুরু করেছিস?তোর বউ বাচ্চা রেখে রাস্তাঘাটে জাও*ড়ামি করার বয়েস এখনো আছে তোর? এই চোখ দিয়ে দেখেছিস না ওকে?দাঁড়া তোর চোখ উপড়ে ফেলি।
বলে আশেপাশে তাকিতুকি শুরু করলো। জিয়ানা এই প্রথম নিবিড়ের এমন উন্মাদের আচরণ দেখছে।রাগে হিসহিসিয়ে দাঁতে দাঁতের ঘর্ষণে কড়মড় শব্দ হচ্ছে যেনো।বার কয়েক নিজের ঘাড় সমান চুল ধরে টান দিলো।তারপর চোখ সাইকেলে পড়তেই এগিয়ে গেলো সেদিকে।
নিবিড় জিয়ানার সাইকেলের চাকার একটা তার একটানে খুলে আনলো। এই সময়ে মেহেদী উঠে দাঁড়ালো। আর গা ঝাড়া দিয়ে বলে উঠলো ,
-সব সময় তোর জিনিসগুলা বেষ্ট হয় ভাই।আমার কি দোষ বল? আফটার অল আমাদের তিনজনের রুচি যে একই রকম ছিলো। কিন্তু ভাগ্যক্রমে সব সময় তুই পেয়ে যাস। রাফিনের খাওয়া জিনিস কেমন টেস্ট বল তো? আমিও একটু টে….
আর কিছু বলতে পারলো না মেহেদী। জিয়ানা চোয়াল বরাবর একটা স্পিনিং কিক করেছে। মেহেদীর চোয়াল সাময়িক সময়ের জন্য প্যারালাইজড হয়ে গেলো যেনো। সে অবস্থাতেই মুচকি হেসে বা হাত দিয়ে ঠোঁট মুছে থু করে রক্তসহ থুথু মাটিতে ফেলে বলে উঠলো ,
-পছন্দ হয়েছে। বউ বাচ্চা গোল্লায় যাক।তোর বউটাই এখন লাগবে আমার নিবিড়। এমন মারকুটে একটা হিরোইন টাইপ হট বউ আমিও ডিজার্ভ করি।হোক ভাইদের খাওয়া। তাতে কি ছোট বেলায় কতকিছু শেয়ার করেছি।
হোঁ হোঁ করে হেঁসে উঠলো মেহেদী। প্রচন্ড বিদঘুটে জঘন্য সেই হাঁসি দেখে আর নিজের নামে এমন ঘৃণিত অপবাদ শোনে জিয়ানার চোখ দিয়ে আপনা আপনি পানি গড়িয়ে পড়লো। জীবন তাকে নিয়ে কি নোংরা খেলাটাই না খেলছে। কাটাছেঁড়া জীবনে আর কত স্বার্থপর মানুষকে ফেস করবে। আর কত মানুষের ভেতরের উন্মুক্ত নোংরা চেহারা দেখবে।জানে না সে।জানতেও চায় না।
নিবিড় তার নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার আগেই মেহেদী নিজের কোমড়ের কাছ থেকে বেরেটা এম নাইন পিস্তল বের করে তাক করলো জিয়ানার দিকে।নিবিড় যেখানে ছিলো সেখানেই স্ট্যাচুর ন্যায় থেমে গেলো। আর জিয়ানা অনুভূতিহীনের মতো নিজ সাইকেলের দিকে এগিয়ে গেলো।তারপর সাইকেল হাটিয়ে এগিয়ে গেলো সামনের দিকে।যেনো কিচ্ছু হয়নি।একসময় সে সন্ধ্যার আলোর মতো মিলিয়ে গেলো দৃষ্টির বাহিরে।কলেজ স্ট্রিটের এই গলিটা কলেজের পেছনের দিকে হওয়ায় বেশ নিরিবিলি। বিকেল হওয়াই মানুষ জনের আনাগোনা একেবারেই কম।
পিস্তলটা নামিয়ে সেটা দিয়ে কপাল চুলকিয়ে নিবিড়ের দিকে এগিয়ে এসে মুখোমুখি দাড়ালো মেহেদী।নিবিড়ের সাথে মেহেদীর চেহারার কোথাও একটা সুক্ষ্ম মিল আছে। এইজন্যই জিয়ানার কাছে অল্প পরিচিত লেগেছে। দূর থেকে যে কেউ দেখলেই বলবে ,এরা আসলেই দুই ভাই।কিন্তু মনের দিক দিয়ে এরা জাত শত্রু।
-অস্বীকার করতে পারবি। তুই অনুরাধাকে খুন করিসনি?
নিবিড় মুচকি হেঁসে বলল,
-অস্বীকার করে তো কাপুরুষেরা। আমি কেনো অস্বীকার করবো?তুই স্বীকার করতে পারবি? রাধাকে ধর্ষণ করেছিস তুই। তারপর তাকে সেই অবস্থাতেই আমার রুমের সামনে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলি যেনো ,আমি রিয়েক্ট করে ধাক্কা দেই।আর ছিটকে সিঁড়ি দিয়ে পড়ে মরে যাক। পারবি স্বীকার করতে?
-যেটা আমি করিনি সেটা কেনো স্বীকার করবো?
নিবিড় হোঁ হোঁ করে হেঁসে বলল,
-ছোট থেকেই তুই কাওয়ার্ড।বড় হয়েও বদলাস নাই। জিয়ানা শুধু আমার বউ না ফু-আম্মুর মেয়েও। তোর তো জেলাসীর জন্য এইবার দেশের টেম্পারেচার হাই হয়ে যাবে। তবে একটা উপদেশ দেই শোন,
“বাঘের একটা মিথ্যা চোখ আছে।বাঘের কানের পেছনে চোখের মতো কালো সাদা দাগ থাকে।যেটা পানি পান করার সময় আর মাথা নিচু করলে দূর থেকে চোখের মতো দেখায়।যার ফলে শিকার মনে করে তাকে বাঘ দেখছে।এতে শিকার ঘাবড়ে যায়।আর দৌঁড়াদৌঁড়ি শুরু করে। ফলে বাঘের খপ্পরে সহজেই পড়ে যায়।”
বলে শিষ বাজাতে বাজাতে জিয়ানা যেদিকে গেছে সেদিকে হাটা ধরলো।আর পেছনে থমথমে মুখে মেহেদী দাঁড়িয়ে রইলো।
নিবিড়ের কানে ঠং ঠং করে বেজে যাচ্ছে একটা কথায় “আমার হাজবেন্ড”
ভিডিও কলে দেখে দেখে এসেছে জিয়ানা আর মেহেদীর কথোপকথন। আর একটু পর পর তালহাকে বলেছে দ্রুত চালা।
আশেপাশে কোথাও খোঁজে জিয়ানাকে পেলো না নিবিড়। তিনঘন্টা থেকে খোঁজ করেও কোন দিকে গেছে সেটাও বের করতে পারে নাই।কেনো জানি মেয়েটাকে কাছ থেকে দেখতে ইচ্ছা হচ্ছে খুব।কে জানে দেখা হলে জড়িয়েও ধরতে পারে।
মক্কুর কল করে জানালো ,দুই বাড়ির মাঝে এক বাড়িতেও যায়নি। নিবিড় তার চ্যালাপেলাদের কিছুক্ষন ঝাড়লো। জিয়ানাকে চোখে চোখে রাখতে বলেছে চব্বিশঘন্টা। কিন্তু প্রায়ই এই মেয়ে এদের চোখে ধুলো দিয়ে হাওয়া হয়ে যায়।
মক্কু হন্তদন্ত হয়ে এসে বলে,
-ভাই ল্যাব ক্লাস হয়নি তাই ওদের বাসায় গিয়েছিলো।তারপর পাঁচ মিনিট পরেই বের হয়ে আসে।কিন্তু জেনি বলে বাসার কেউ জানে না সে বাসার এসেছিলো।এমন কি জেনির ভাই নাকি বলেছে তারা খুব সেনসেটিভ একটা বিষয় নিয়ে কথা বলছিলো তখন।সেটা শুনেই হইতো বের হয়ে আসছে।
-একটা মেয়েকে দুইটা ছেলে চোখে চোখে রাখতে পারে না। তাহলে এদের দিয়ে আমার কি কাজ বল? আজ মনে হলো জিয়ানা যতক্ষন চায় তাকে এরা ফলো করতে পারে।আর না চাইলে তার টিকিটার হদিসও এরা পায় না।বা*ল ছাল সব নিকম্মা দিয়ে আমার ক্লাব ভরা। সবগুলার পা*ছায় লাত্থি দিয়ে বের করে দিবো দাঁড়া।
বলে মক্কুর কাছ থেকে চাবি ছিনিয়ে নিয়ে বাইকে বসে।মক্কু এগিয়ে গেলে চোখ রাঙানি খেয়ে আর উঠার সাহস পায় না।
একটানে বাইক নিয়ে আবার আশেপাশে চক্কর দিলো নিবিড়। তারপর টং দোকান দেখে দাঁড়িয়ে গেলো।মাথা যখন ফাঁকা লাগে তখন একমাত্র নিবিড় স্মোক করে।এক বসাতেই এক প্যাকেট খতম করবে।কিন্তু এছাড়া বাকি সময় স্মোক করবে না।
দোকানীর কাছ থেকে বেনসন এন্ড হেজেস ব্রেন্ডের একপ্যাকেট কিনে নেয়।কালচে ঠোঁটের পুরে দিলো একটা সাদা শলাকা। বাইকের কি রিংয়ের সাথে গিটার শেপের একটা লাইটারে সাহায্যে জ্বলিয়ে নিলো সেটা। লম্বা একটা সুখ টান দিয়ে বিষাক্ত ধোঁয়া ছড়িয়ে দিলো বাতাসে।
পরপর তিনটা সেখানে দাঁড়িয়েই খতম করলো। পরবর্তীতে আরেকটা ধরাবে দৃষ্টিগোচর হলো কিছুটা দূরের ফুটপাতে হেটে যাওয়া দুইটা টোকাইয়ের দিকে। চার নাম্বার সিগারেট আর না ধরিয়ে প্যাকেট সমেত দোকানীকে দিয়ে চেপে বসলো বাইকে।
মিনিট দশেক পর হাজির হলো বস্তির সেই জায়গায় সেখানে রাব্বিরা থাকে।এবং নিবিড়ের ধারণা সঠিক প্রমাণ হলো।মক্কুকে মেসেজ করলো “পেয়েছি”।
রাব্বির ঘরের বাহিরে পাটি বিছিয়ে ছয় সাতটা বাচ্চা সহ জিয়ানা বসে খিলখিল করে হাঁসছে। পাশে মধ্যবয়সী এক মহিলা মাটির চুলায় রান্না করছে কিছু একটা।
জিয়ানার কোলে কাপড় চোপড় ছাড়া একটা ময়লা শরীরের দুই দিন বছরের ছেলে বাচ্চা বসে আছে।যার নাক ভরা সর্দি।জিয়ানা হাঁসা অবস্থাতেই নিজের প্যান্টের পকেট থেকে টিস্যু বের করে পরিস্কার করে দিলো বাচ্চাটাকে। তারপর চুমু দিলো। আর নিজের গাল এগিয়ে দিলো বাচ্চার মুখের দিকে। বাচ্চাটাও টুপ করে চুমু দিয়ে দিলো।
এতক্ষন নিবিড়ের বেশ ভালো লাগলেও এবার ভালো লাগলো না।গটগট করে পা ফেলে কাছে গিয়ে বাচ্চাটাকে দুইহাত ধরে কোল থেকে নামিয়ে জিয়ানাকে টেনে উঠালো।
সব এত দ্রুত হয়েছে জিয়ানা হকচকিয়ে গেলো।আর বাচ্চাটা ভ্যা করে কেদে রান্না করা মহিলার কোলে উঠলো।
-তোমার জন্য আমার সাড়ে তিনঘন্টা নষ্ট হয়েছে জানো? অথচ দিব্বি এখানে বসে হাহা হিহি করছো?
-এ্যাই ভন্ড লোক আপনাকে কে বলেছে আমাকে খোঁজতে। হাত ছাড়ুন। ফালতু আদমি।
-জিয়ানা
-সুখ
-তোমার কত বড় আমি জানো? বিন্দু মাত্র মেনার্স নাই?
-সম্মানিত ভন্ড নেতা আপনাকে সম্মান করতে আমার বয়েই গেছে।
নিবিড় টেনে নিজের কাছে এনে জিজ্ঞেস করলো ,
-একটু ভয় ডর করে না তাই না? সারাটা শরীর শুধু কলিজা? একটু আগে কার গায়ে হাত তুলেছো জানো? চেয়ারম্যানের পুত্রের উপর।
-তো কি হয়েছে? প্রেসিডেন্ট হলেও আমার যায় আসে না।এমন নোংরা মানুষ আমি দ্বিতীয়টা দেখি নাই।
পাশ থেকে মহিলা বলে উঠলো ,
-আফা রান্ধা শ্যাষ। বাইরা দিমু এহন?
-হ্যাঁ মর্জিনা আপা।আমার প্রচন্ড ক্ষুধা লেগেছে।সকালের পর সারাদিন কিচ্ছু খাওয়া হয়নি।
বলে নিবিড়ের কাছ থেকে হাত ছাড়িয়ে গিয়ে আবার পাটিতে বসলো।রাব্বি আর আক্কাস নামের ছেলে দুইটা এলো হাতে টুকরা কলাপাতা সমেত।
নিবিড় কপাল ভাজ করে এদের কীর্তিকলাপ দেখে যাচ্ছে।জিয়ানা আবার সেই রুগ্ন নগ্ন বাচ্চার দিকে হাত বাড়ায়। কিন্তু বাচ্চাটা আসে না।বাচ্চার দৃষ্টি অনুসরণ করে জিয়ানা পেছনে ফিরে দেখে নিবিড় কটমট করে তাকিয়ে আছে। জিয়ানা বাচ্চাটেকে আঙুল দিয়ে কাছে আসার ইশারা করে বলে,
-আয় বাপ।একে গুরুত্ব দেয়ার কিছু নাই।তুই ভোটার নস যে এরা তোকে গুনায় ধরবে। তাছাড়া এই লোক আগাগোড়া ভন্ড।
রাব্বি আর আক্কাস এগিয়ে গিয়ে সালাম দিয়ে বলল,
-ভাই আপনারে কই বসতে দেই?
-নেতারা ভোটের আশায় সবজায়গায় বসতে পারে।পাটিতে বসে যান কাবলিওয়ালা। আমরা খাই আপনি লোকমা গুনেন।
বলে জিয়ানা কলাপাতা থেকে লটকা খিচুড়ি খাওয়া শুরু করলো। মাঝেমধ্যে অল্প করে কোলের বাচ্চাটাকেও দিচ্ছে।আবার খাওয়ার মাঝেমাঝে নিজের হাত এমন ভাবে লিকিং করছে যা দেখে নিবিড়ের গলা শুকিয়ে গেলো।
নজর আশেপাশে ঘুরিয়ে আবার সেই জিয়ানার দিকেই স্থির হচ্ছে বারবার।জিয়ানা এমন ভাবে খাচ্ছে মনে হচ্ছে অমৃত্য।একটা স্টিলের প্লেটের উপর কলা পাতায় অল্প একটু খিচুড়ি রাব্বি নিবিড়ের দিকে বাড়িয়ে দিলো।
নিবিড় খিচুড়ির দিকে ভালো করে নজর দিলো ,টেলটেলে হলুদ পানির ভেতরে চাল আর ডালের মাঝে ছোট ছোট টুকরার আলু ,মিষ্টি লাউ আর ফুলকপি সাতার কাটছে। নিবিড় একবার জিয়ানার দিকে তাকালো।সে দিব্বি আঙুল চেটে খেয়ে যাচ্ছে।
আইডাই করে হাতে নিলো প্লেট টা।কিন্তু এই জিনিস খাওয়ার সিস্টেম যে বুঝতে পারছে না।চামচ ছাড়া তো অসম্ভব। জিয়ানা কিভাবে খাচ্ছে দেখার জন্য চোখ উঠিয়ে দেখে জিয়ানা তার একদম সামনে।
রাব্বি পানি ঢালছে আর জিয়ানা নিজের হাত ধোঁয়ে নিবিড়ের হাত থেকে প্লেট নিয়ে নিজের হাতে নিলো।তারপর চার আঙুল বেকিয়ে মাঝখানে জায়গা করে বৃদ্ধা আঙুল দিয়ে সাপোর্ট দিয়ে এক লোকমা উঠিয়ে নিবিড়ের মুখের কাছে ধরে বলল,
-নেন খান।সস্তা খাবারেও অনেক সময় পূর্ণ তৃপ্তি পাওয়া যায়।
নিবিড় মন্ত্রপুতের ন্যায় ঠোঁট জুড়া আলাদা করে। জিয়ানা সেই আলাদা ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে নিজের হাত এগিয়ে খাইয়ে দেয়।
নিবিড়ের কাছে সত্যি সত্যি অমৃত লাগছে খাবার টা।জিয়ানা বারাবার দিচ্ছে নিবিড় বাধ্যগত হয়ে খেয়ে যাচ্ছে।খাওয়া শেষে জিয়ানা কানের কাছে চুপিচুপি বলে,
-ওই যে বাচ্চাটা রবি আর আপনার মাঝে কোন পার্থক্য নেই।সেও নিজ হাতে খেতে পারে না।
নিবিড় গভীর চোখে দেখে তার অর্ধাঙ্গিনীকে, সত্যি আজ আকাশের চাঁদ তার কাছে নেমে এসেছে কি?যে চাঁদের অপার্থিব আলোয় আলোকিত তার হৃদয়।তার রুক্ষ জীবনের কোমল চাঁদের ছোয়ায় আজ প্রাণের স্পন্দন।
“We shall be getting old together কাবলিওয়ালা ”
“We shall be getting old together কাবলিওয়ালা ”
“We shall be getting old together কাবলিওয়ালা ”
কানে বারবার একই কথা রিপিট হওয়াই নিবিড় হুড়মুড়িয়ে উঠে বসলো বিছানা থেকে। পাশ থেকে ফোন বের করে সময় দেখলো।রাত পনে দুইটা। জিয়ানাকে বাসায় দিয়ে এসেই শুয়েছিলো এগারোটার দিকে।কতদিন পর কোন প্রকার নেশা ছাড়া নিবিড়ের এইভাবে ডিপস্লিপ হলো সেই হিসেব জানে না।
পরক্ষণেই মনে পড়লো একটু আগের স্বপ্নের কথা। জিয়ানা নিবিড়ের পিঠে ঝুলে ঝুলে বলছে “উই শ্যাল বি গেটিং ওল্ড টুগেদার কাবলিওয়ালা ”
মাথার চুল পেছনে একসাথে দুইহাত দিয়ে ধরে হাটুতে ভর দিয়ে ঝুঁকে বসলো। আর স্মৃতির ক্যানভাসে জিয়ানার সাথে কাটানো সেই মুহূর্তের চিত্র জাবর কাটতে থাকলো।
নিবিড়কে খাওয়ানোর পর জিয়ানা বাচ্চাদের কাছে বিদায় নেওয়ার সময় রাব্বি জিজ্ঞেস করে ,
-বেহেস্তি খাবারে কি খিচুড়ি থাকবে ওস্তাদ?
-ফলমূল আর পাখির গোস্তের কথা শুনেছি। খিচুড়ি আছে কিনা জানি না? কেন? তোর বেশি পছন্দ?
-কাল রাইতের পর আইজকের রাইতে খাইতাছি তাই মনে হইতাছে এইটাই বেহেস্তি খাবার।
জিয়ানা একপ্রকার দৌঁড়ে গিয়েই রাব্বিকে জড়িয়ে ধরে বলল,
-ওস্তাদ সরি রে বাবু।আমার একমাস থেকে টিউশনি নাই।তোদেরকে কিচ্ছু দিতে পারিনি এই সাত দিন।কাল থেকে টিউশনি পাওয়ার চেষ্টা করবো। আর না খেয়ে থাকতে হবে।প্রমিজ।
বলে হাতের বাহু দিয়ে চোখ মুছে ফটাফট চলে আসলো সেখান থেকে। একবারের জন্যও পেছনে তাকালো না।নিবিড় কিছু পল স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো সেইভাবেই।তারপর রাব্বিকে কাছে ডেকে জিজ্ঞেস করলো ,
-ওও তোদের এখানে এইজন্য আসে? মানে তোদের খাবারের দায়িত্ব নিয়েছে?
-শুধু খাবার না এই যে মর্জিনা খালা সহ আমরা আটজন সবার খাওয়া আর আমাদের তিনজনের পড়ার টাকা ওস্তাদ দেন।আক্কাস স্কুলে যায় না।ফাকি দেয় তাই ওস্তাদ ওরে আপাতত দেয় না।
নিবিড় সোজা হয়ে গেলো।সেতো অনেক ডলার ইনকাম করে।তার সব ডলার জমা হচ্ছে শুধু ব্যাংকে।পার্টির টাকায় ক্লাব চলে। নিবিড় চাইলেও তো এই পুরো বস্তির বাচ্চাদের পড়ার দায়িত্ব নিতে পারে।তার মাথায় কখনো এই চিন্তা আসেনি কেন? অথচ মাসে দুইটা প্রাইভেট পড়িয়ে এই ছোট মেয়েটা আটজন মানুষের দায়িত্ব নিয়ে বসে আছে।কত আর পায় সে প্রাইভেট পড়িয়ে। সর্বোচ্চ সাত বা আট হাজার।
ঘাড় ঘুরিয়ে সাইকেল হাটিয়ে আস্তেধীরে এগিয়ে যাওয়া জিয়ানার দিকে তাকালো।এই মেয়েটা কি জিয়ানা নাকি নীলুফা ইয়াসমিন। যে একবার এক ভিক্ষুককে রান্নাঘরে চালের ড্রামের কাছে নিয়ে বলেছিলো “আপনার যত ইচ্ছা নিয়ে নেন।”
নিবিড়ের সিনা হঠাৎ চওড়া অনুভূত হলো।হৃদপিন্ডের আকার মনে হচ্ছে বড় হয়ে যাচ্ছে সুক্ষ্ম গর্ব মিশ্রিত আনন্দে। এই মেয়েটা তার বউ ,জায়া ,অর্ধাঙ্গিনী। চমৎকার পাগলাটে একটা মেয়ে। যে নিবিড়ের কাছে একটা স্কুল। যার কাছ থেকে শিখার আছে অনেক অনেক কিছু।বয়স না ,আসল ফ্যাক্ট জিন।বাবা মায়ের জিন যে বাচ্চারা ৪০% পায় সেটার জন্যই মানুষের ভেতরে মনুষ্যত্ব বোধ কড়া বা হালকা হয়।কই নিবিড় তো রাজনীতি করে।লোক দেখানোর জন্য হলেও তো তাদের জনসেবা মূলক কাজ করতে হয়। কখনই এইসব চিন্তা আসেনি।আসবে কীভাবে তার তো দূষিত রক্ত।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজ পকেট থেকে ওয়ালেট বের করে বড় চারটা নোট মর্জিনা খালার হাতে দিয়ে বলল,
-আপনার স্বামী কোথায়? কেউ নেই দেখবাল করার?
-কারখানায় কাম করতে গিয়ে মইরা গেছে।কোলে বাচ্চা নিয়ে আমিও কাম করতে পারি না।তাই রাস্তায় ভিক্ষা করতাম।একদিন রাস্তায় মাথা ঘুইরা পইড়া রইছিলাম। কেউ দেইক্ষাও দেখে নাই।কিন্তু আপাই নিয়ে ডাক্তার দেখাইয়া কইছে শরীর দূর্বল আপাতত কোন কাজ কিংবা ভিক্ষা করার দরকার নাই।কয়েকদিন পর পর আইসা চাল ডাল আর বাজার করে দিয়ে যায়।আপার সাথে আরও কিছু ছাত ছাত্তিও আহে মাঝেমধ্যে।
মহিলা এইটুকু বলেই হাপিয়ে গেছে।প্রচন্ড দূর্বল সেটা বুঝা যাচ্ছে।
নিবিড় বলল,
-ওই আপা আসলে বলবেন তাকে আর আপনাদের নিয়ে ভাবতে হবে না।আমার লোকজন এসে প্রতি সপ্তাহে আপনাদের জন্য পর্যাপ্ত খাবার আর অন্যসব জিনিস দিয়ে যাবে।ঠিক আছে।আজ এই টাকাটা রাখেন।সবার কাপড় চোপড় কাল দিয়ে দিয়ে যাবো।
তারপর রাব্বিকে কাছে ডেকে জিজ্ঞেস করে ,
-তুই না বোতল টোকাইতি?
-হ কিন্তু এহন তো টোকাই না।ওস্তাদ আমারে কইছে আমি তার ভাই।টোকাইগিরি করলে তার মানসম্মান থাকবে না।আমার কাজ পড়াশোনা করা। এমনিতেই আমি নাকি আপনার মতো আদু ভাই। অনেক পিছায়ে আছি।
নিবিড় শুকনা কাশি দিয়ে বলল,
-ঠিক আছে আজ আসি।তোদের ওস্তাদ এখন আমার বউ। তার দায়িত্ব মানেই আমার দায়িত্ব।
নিবিড়ের কথা শুনে বাচ্চারা নিবিড়কে জড়িয়ে ধরলো একপ্রকার হইহই করে।আক্কাস বলে উঠলো ,
-আরেহ ব্বাস। ভাই আফনে তো লটারি জিতে গেছেন। একে বউ দুয়ে বডি গার্ডও। ওস্তাদ হেব্বি মাইর পিট করতে পারে। আপনার দ্বারে কাছে কেউ ঘেষতে পারবে না।
নিবিড় মুচকি হেঁসে বলল,
-জিতেছি তাহলে বল? তোদের ওস্তাদ কি তাহলে ঠকে গেছে?
-না নাহ কি বলেন যে ভাই?আপনি হইলেন দাবাং হিরো আর ওস্তাদ দাবাং হিরোইন।মাপে মাপ বজার বাপ। এক্কেরে একের জুটি।
তর্জনি আর বৃদ্ধা আঙুল গোল করে চমৎকার বুঝালো আক্কাস।নিবিড় চমৎকার করে হাসলো।এই প্রথম রাব্বি আর আক্কাস নিবিড়ের হাসে দেখলো।
জিয়ানা অনেকটা দূর এগিয়ে গেছে।নিবিড় বাইক নিয়ে কিছুটা এসে পেলো তাকে।অন্যদিনের চেয়ে বেশ চুপচাপ হেঁটে যাচ্ছে। নিবিড়ের দিকে তাকালো না পর্যন্ত। বার কয়েক নিবিড় গলা খাকি দিলেও জিয়ানা যখন তাকালো না। তখন নিবিড় প্রশ্ন করলো,
-কারো মাথার অসুখ মনে হচ্ছে ভালো হয়ে গেছে? তানাহলে এত শান্ত কেনো চারপাশ?
জিয়ানা একমনে হেঁটেই চলেছে তখনও।
-কেউ যখন চুপ থাকে তাকে একদম হুতুম পেঁচার মতো লাগে।বুচা নাকটা আরও বসে যায় যেনো।
জিয়ানার কোন প্রতিত্তোর না পেয়ে নিবিড়ের টনক নড়লো।সে তার অভ্যাসের বহির্ভূত আচরণ করছিলো এতক্ষণ। ছিঃ ছিঃ দুই দিনেই বিয়ে করে কি হাল তার ,ছ্যাহ!
দুইজনই চুপচাপ আরও কিছুটা হাটার পর একটা মেকানিকের গ্যারেজে থামলো। চাকাটা ঠিক করে বিল চাইতে আসলে জিয়ানা নিবিড়ের দিকে তাকিয়ে বলে,
-দিন টাকা দিন। আপনি নষ্ট করেছেন।তাই ভর্তুকি আপনারই দেয়া উচিত।
নিবিড় বিনাবাক্যে টাকা বের করে দিলো।প্রথমে মেকানিক ছেলেটা গাইগুই করলেও পরে টাকাটা নেয়।জিয়ানা সাইকেলে উঠে বসলে নিবিড় আটকিয়ে বলে,
-বেশ রাত হয়ে গেছে।বাইকে উঠো। সাইকেল এই গ্যারেজে থাক।কাল আমি তোমার বাসায় পৌঁছে দিবো।
-রাতদিন সব সমান আমার কাছে।আপনি চলে যান।আমি সেফলি পৌঁছে যাবো।
-এত ডিপ্লোমেটিক আন্সার দিচ্ছো কেনো? আর ছোট্ট এই মস্তিষ্কে এত দায়িত্ব নেয়ার কি দরকার?
-ছোট্ট ছোট্ট দায়িত্ব গুলাই আমার জীবনকে স্মুদলি ক্ষয় করতে সাহায্য করে। তানাহলে অভার থিংকিং মাথায় কিলবিল করে।
নিবিড় হাত থেকে সাইকেল ছাড়িয়ে রেখে দেয়। তারপর জিয়ানাকে ধরে বাইকের কাছে নিয়ে বলে,
-জোর করে সামনে বসিয়ে নিয়ে যাবো? নাকি নিজ ইচ্ছায় যাবা?
জিয়ানা আর প্রতিত্তোর না করে উঠে বসে বাইকে।নিবিড় বাইক স্টার্ট করতে করতে প্রশ্ন করলো
-কি এত ওভার থিংকিং শুনি?
-দুনিয়াতে যার কেউ নাই,মাথা গোজার ঠাই নাই।তার জন্য তো ওভার থিংকিং ফরজ। কিন্তু ওভার থিংকিং তো দূর কি বাত আমার থিংকিং করতেই পছন্দ না। না কারো উপর আশা আছে। আর না ভরসা আছে।সো লাইফ ঝিংগা লা লা।
-হিউম্যান সাইকোলজি বলে “যে মানুষ অন্যের উপর যত বেশি আশা রাখে ,সে তত বেশি মানুষিক অশান্তিতে ভোগে।” এইজন্যই তুমি অলয়েজ চিল এন্ড ফাইন।ওও হ্যাঁ তোমার যে বিয়ে হয়েছে। জলজ্যান্ত একটা বর আছে সেটা ভুলে যাও নাকি?
-সেটা তো কাগজে কলমে কাবলিওয়ালা। বিয়ে মানে একসাথে বৃদ্ধ হওয়ার প্রতিশ্রুতি। একে অন্যের পরিপূর্ণ হওয়ার ওয়াদা। এক হিসেবে বেশ ভালো হয়েছে।আমার লাইফে নরমাল ব্যাপার নাই। তাই এই এবনরমাল বিয়ের জন্য আমি কখনো আশাও রাখবো না আপনার উপর। ফলে আশাহতও হবো না।
নিবিড়ের মনে হলো তীক্ষ্মণ কিছু বিধলো বুকের বাপাশে।চিনচিন করে উঠলো যেনো।জিয়ানার সম্পর্কে তার আজ একটা নতুন ধারণা জন্ম নিলো।মেয়েটা প্রচুর আত্মসম্মানী।কারো কাছে সাহায্য সে আশা করে না।এমন কি অধিকারবোধও দেখায় না কোন সামাজিক সম্পর্কের দোহাই দিয়েও।সে আত্মার সম্পর্ক গুলোকে গুরুত্ব দেয়।
একই সাথে সম্মান আর ভালো লাগা ঘিরে ধরলো নিবিড়কে।যতই দিন যাচ্ছে মেয়েটা ততই হৃদয়ের কাছে চলে যাচ্ছে।
ভালো লাগাটা বেশিক্ষণ টিকলো না।রাস্তার সাইডে অশ্লীল কাপড়ে একটা মেয়ে একটা ছেলের সাথে খুবই ঘনিষ্ঠ ভাবে বসে হাসাহাসি করতে দেখে। বাইকের স্প্রিড হাই করে মিনিট পাঁচেকের পর জিয়ানাকে তার নতুন বাসার সামনে নামিয়ে দিয়ে বিনাশব্দে বাইক নিয়ে প্রস্থান করে নিবিড়।
জিয়ানা একপলক দেখে মাথা নিচু করে ঢুকে পড়ে বাসায়।
মক্কুকে সবাই ঠেলে পাঠাচ্ছে বারবার। কিন্তু সে অনড়।একবার ধমক খেয়েছে। আজকে আর তার সাহস নেই।অন্যদিকে জেনিও গাল ফুলিয়েছে।তার মাথা আপাতত হ্যাং। আকাশ গিয়ে তালহাকে বলল,
-সজল আর রনির জন্য আজ ভাই যেহেতু এত খেপছে তাই ওরাই ডাকবে।
সজল এগিয়ে এসে বলল,
-ভাই পা দুইডা ধইরা কই।আজকে বাঁচায়ে দেন।এরপর কঠিন গার্ড দিমু।
-কঠিন গার্ডেও কাম হইবো না। ভাবি মারাত্মক চালাক। তার নাগাল পাওয়া সহজ না।
বলে মাথা চুলকালো রনি।সজল আর রনি দুইজনই প্রথম বর্ষের স্টুডেন্ট। এরা একেবারে জুনিয়র হওয়াই পাহারার দায়িত্ব পড়েছে তাদের উপর।কিন্তু বাচ্চা দুইটা ছেলেকে জিয়ানা প্রায়ই ঘোল খাওয়াই।
মক্কু হুংকার ছেড়ে জিজ্ঞেস করে ,
-এই গু খাওয়া ব্রেইন নিয়ে তোরা পলিটিক্স করতে চাস?একটাও সাহস নাই।সব কবুতের কলিজা পালিস?
আকাশ বসা থেকে দাঁড়িয়ে বলে,
-ভাই সাহস নিয়ে প্রশ্ন হবে না। আমি সাত মাস এলাকার প্রতিটা বিল্ডিংয়ের বাড়িওয়ালার দরজায় হুদাই বেল বাজাইয়া দৌঁড় দিতাম।সেটাও আবার সিসিক্যামেরা থাকার পরেও।
সজল এগিয়ে এসে গর্বের সাথে বলে,
-হুরু ভাই কি যে কন। আমি ক্লাস চলা কালিন ম্যাডামকে ফুল দিয়ে প্রপোজ করছিলাম।
রনি গর্বের সাথে হেঁটে এসে মাঝখানে দাঁড়িয়ে বলে উঠলো ,
-ভাইসব। আপনাদের এইসব কাজ যদি সাহসের কাতারে পরে। তবে আমাকে বীরের মর্যাদা দেয়া হোক।কারণ আমি পাতলা পায়খানা নিয়েও একঘর মানুষেরই সামনে পা*দ দিয়েছি।
মক্কু হোঁ হোঁ করে হেঁসে উঠল। আকাশ আর সজল গিয়ে রনিকে মারা শুরু করল।বাকি পোলাপান হৈচৈ করেই যাচ্ছে।
তখনই খট করে ক্লাবের দরজা খুলে গেলো। নিবিড়কে দেখে সবাই একদম ভেজা বেড়ালের মতো চুপসে গেল মুহুর্তেই।
নিবিড় দুইহাত মেলে লম্বা একটা আড়মোড়া ভেঙে বলে উঠলো ,
-কালকের মাঝে সবাই টিউশনির খোঁজ দিবি।ভার্সিটির আশেপাশে হতে হবে।আর ফ্যামিলি বাসার স্টুডেন্ট হবে। প্লাস এক্সট্রা কোন ছেলে থাকবে না এমন পরিবার লাগবে। তবেই মাফ পাবি সবাই।
সকাল এগারোটা। জেনি কিছু টুকটাক কেনাকাটা করতে নিকটস্থ শপিংমলে এসেছে। বাহিরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি মাথায় নিয়ে পেছন পেছন মক্কুও এসে হাজির। জেনি মক্কুকে দেখেই দ্রুত হাটা শুরু করলো।
মক্কু পেছন পেছন গিয়ে একাধারে সরি ,মাফ চাই।আর কখনো খাবো না।নানা কথা বলে চলেছে।জেনি সেদিকে কর্ণপাত না করেই হেটে চলেছে সমানতালে।
-জেনি জান। শোনো রাজনীতি করলে মাঝেমধ্যে আড্ডায় এইসব একটু আকটু খাইতেই হয়।যে যত ভালো পোলাই হোক বাঁচতে পারে না।আর পোলাপান এত সাধে ,না করতে পারি না।এরপর খাব না কসম।
বলে জেনির মাথায় হাত রাখলো। জেনি কপাল কুঁচকে হাত জটকা মেরে সরিয়ে দিয়ে বলে উঠলো ,
-মুসাদ্দিক বাড়াবাড়ি আমার পছন্দ না।আপনি প্রতিদিন রাতেই খান।আমি আপনার ভয়েস শুনেই বুঝতে পারি।আপনি কি জানেন ,মাতালরা বউ আর মেয়ের পার্থক্য বুঝতে পারে না।মানে পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট পুরুষ হচ্ছে মাতাল পুরুষ।
মক্কু জিহবায় কামড় দিয়ে বলল,
-আর খাবো না।যাও কথা দিলাম।পোলাপানদের দিয়ে সরে যাবো।
-বাচ্চা বাচ্চা ছেলে গুলাকে আপনারা এইসব খাইয়ে নষ্ট করছেন।আবার সামনে দেখান খুব জনসেবা করেন।
-একটা গ্রুপ রাজনীতিতে যোগদানই করে মাল খাইতে…
বলে আবার জিহবায় কামড় দিয়ে ফেলে মক্কু।জেনি অগ্নি দৃষ্টিতে তাকায়।মক্কু ফটাফট কান ধরে উঠবস শুরু করলো।আশেপাশেই অনেকেই তাকিয়ে দেখছে।জেনির বেশ আনইজি লাগা শুরু করলো এইবার।সাথে হাসিও পাচ্ছে।
মক্কুর কাছে গিয়ে কান থেকে হাত ছাড়িয়ে দিলো।কাছে যাওয়ার পর দেখলো শরীরের বেশিরভাগ ভেজা।কালবিলম্ব না করে নিজের ওড়না দিয়ে মাথা মুছা শুরু করে বলল,
-এরপর যদি আবার খান তাহলে কি শাস্তি দিবো বলেন?
মক্কু জীবনে এই প্রথম আজ কোন নারীর এইটুকু মমতা পেল। তার বখাটে মন ইমোশনাল হতে চাচ্ছে। আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছা করছে এই রমনীকে।নিজেকে সামলিয়ে বলে উঠলো ,
-তাহলে ব্রেকাপ করে দিয়ো যাও।
জেনি খিলখিয়ে হেসে উঠে বলল,
-সত্যি সত্যি ব্রেকাপ করবো। তবে আপনার হাড্ডির সাথে।
তাদের কয়েক কদম পেছনে সজীব স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে মিষ্টি হাসিখুশি একটা জোড়াকে।হঠাৎ করে মনে হচ্ছে মক্কুকে বড্ড বেমানান লাগছে জেনির পাশে।পুরানা ক্ষতের সুক্ষ্ম ব্যাথা আজ যেনো মাথাচাড়া দিয়ে উঠল।
মক্কু টেনে জেনিকে জুয়েলারি শপে নিয়ে যায়।সজীব নিজেও পেছন পেছন যাচ্ছে।কেনো যাচ্ছে জানে না।অন্যের সুখ দেখে নিজেকে ঝালাই করার জন্য হইতো।
-মুসাদ্দিক। আমি গোল্ড পড়ি না।অহেতুক টাকা নষ্ট হবে।চলুন এখান থেকে।
জেনি মক্কুর বাহু ধরে টেনে বলল,
-আমার বউকে আমি দিবো।তুমি এত কথা বলার কে? চুপচাপ দাড়িয়ে থাকো।সিম্পল কিছু নিবো।
সজীব বুকে হাত ঘষা শুরু করলো। বেকার থাকা কালিন জেনি প্রাইভেটের টাকা দিয়ে শার্ট ,ঘড়ি ,বেল্ট নানা জিনিস কিনে দিতো তাকে।সজীব কিছু দিতে চাইলে বলতো “চাকরি হোক।সব সুদে আসলে নিবো”সজীবের ধ্যান কাটলো জেনির মৃদ্যু ধমকে।
-মুসাদ্দিক। আমি এগুলা পড়বো না।একটা রিং নেই শুধু। অহেতুক টাকা নষ্ট না করে সেভিংক্স করুন।ইন ফিউচারে কত দরকার পড়বে।
-ওরে আমার হিসেবি বউ রে। আমার এ যাবত কালের সব জমাই আছে। খরচ হয় নাই কিছুই। আচ্ছা তাহলে একটা চেইন নাও সব সময় পড়ার জন্য আর হাতের একজোড়া বালা সাথে আংটি।ফাইনাল।
তারপর দোকানদারের দিকে তাকিয়ে বলল,
-চেইন ,চুড়ি আর রিং দেখান।
সজীব দেখেই চলেছে এদের কার্যক্রম। মাসখানেক আগে তার স্ত্রীকে একজোড়া বালা গড়িয়ে দিয়েছিলো। পাতলা বলে সেকি রাগ তার। সজিবের কষ্ট যেনো হু হু করে বেড়ে চলেছে।
দাম দেখে জেনির মাথায় হাত। প্রায় পাঁচ লাখ টাকা বিল এসেছে।জেনি মক্কুকে চোখ দেখিয়ে বলে শুধু রিংটা নিবো। এটার বিল করেন। মক্কুর জোড়াজুড়িতেও কাজ হলো না।আটত্রিশ হাজার টাকার একটা রিং নিয়ে জেনি টানতে টানতে বের করে আনলো তাকে।
-জেনি তুমি আমাকে একেবারেই গরীব ,হতদ্ররিদ ভাবো? আমার বউকে টুকটাক কিছু দেয়ার শখ কি থাকতে পারে না?
জেনি এগিয়ে গিয়ে মক্কুর বাহু জড়িয়ে ধরে হাতের নতুন আংটি টা দেখতে দেখতে বলল,
-আইসক্রিম খাবো মুসাদ্দিক। তারপর ব্রিজের নিচ থেকে অনেক গুলা কাচের চুড়ি কিনে দিবেন। ঠিক আছে?
মক্কু জেনির কানে কানে কিছু একটা বলল।যেটা শুনে বাহুতে কিল দেয়া শুরু করল।
-লাগবে না আপনার কিছু দেয়া।যান ভাগেন। ফালতু লোক কোথাকার।
-প্রোগাম শেষ হলে আমরা একটা ফ্ল্যাট নিবো।ওকে? টুনাটুনির সংসার হবে আমাদের।তবে আমি একটা ভয়ে আছি।
জেনি জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে তাকায় দেখে মক্কু মুখে মেকি ভয়ের ভাব নিয়ে বলে,
নীতিহীন রাজ পর্ব ২৮
-আমার বউ টা এত মিষ্টি পাছে আমার ডায়াবেটিস না হয়ে যায়।
-মুসাদ্দিক?
হোঁ হোঁ করে হেঁসে উঠল মক্কু।সজীবের আর দেখার ধৈর্য্য হলো না।এগিয়ে গেলো মক্কু আর জেনির দিকে।রাগে হিংসায় সে জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে।
