Home নীতিহীন রাজ নীতিহীন রাজ পর্ব ৩

নীতিহীন রাজ পর্ব ৩

নীতিহীন রাজ পর্ব ৩
আশিকা আক্তার সোহাগী

ছোট বাচ্চারা ব্যথা কিংবা ভয় পেলে আশ্রয় খোঁজে বাবা-মার বুকে। বাবা-মা দুইহাতে আগলিয়ে নিলেই ব্যথা আর ভয় নিরাময় হয়ে যায় যেনো। কিন্তু জিয়ানার ক্ষেত্রে সেটা করা হয়নি। ছোট থেকে ব্যাথায় কান্না করলে আঞ্জুমান দৌঁড়ে আসতো কিন্তু জিয়াউল বাঁধা দিতেন।
কান্নাকাটি করে কিছুক্ষণ পর নিজে নিজেই উঠে সব ভুলে যেতো। তারপর আস্তে আস্তে যখন বুঝলো নিজের ব্যথায় সহমর্মিতা দেখানোর জন্য কেউ নেই ,সেহেতু অযথা কান্না করে এনার্জি লসের কি দরকার?

জিয়ানার বাইসাইকেল যেখানে পার্ক করা ছিলো তামান্না নিজে গাড়ি ড্রাইভ করে পার্ক করতে গিয়ে পাশের সাইকেলটাই উঠিয়ে দেয়। আর তাতেই জিয়ানার সাইকেল আলুভর্তা। জিয়ানার সাইকেলটা নিজের জমানো টাকায় কেনা।প্রথম বর্ষের পুরোটা সময় প্রাইভেট পড়িয়ে জমানো টাকার বিনিময়ে সাইকেলটা পেয়েছিলো। এমন না বাসা থেকে চাইলে দিতো না কিন্তু সে নিজের শখের জিনিস নিজেই কিনতে পছন্দ করে। জিয়ানা কুল-হেডেড গার্ল। সহজে রাগে না। এইবারও রাগলো না। সরাসরি তামান্নার কাছে গিয়ে বলল”জরিমানা দিয়ে কেটে পড়ো। ”
আত্ম অহমিকায় পরিপূর্ণ তামান্নার আঁতে ঘা লাগে তাতে। বড্ড তেজ নিয়ে উল্টো বলে”তোমার এই দুইটাকার সাইকেলের ভাগ্য যে আমার গাড়ির চাকার স্পর্শ পেয়েছে। ”
“তা হতে পারে। তোমার গাড়ি বেশ এক্সপেনসিভ। কিন্তু তুমি আমার দুইটাকার সাইকেলের দাম দিয়ে ফুটো। কুইক।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

তামান্না আর কোন কথা না বলে ক্লাসের দিকে যাত্রা করে।জিয়ানা গলা উঁচু করে বলে” এরপর যা হবে তার দ্বায় তোমার ধলা ব্যারাম। কাউন্ট করে এক দুই তিন ” পরেই কটমট শব্দে তামান্না পিছন ফিরে দেখে লাত্থি দিয়ে একটা লুকিং গ্লাস ভেঙে আরেকটার দিকে যাচ্ছে। সে দৌঁড়ে আসতে আসতেই দুই লাত্থি দিয়ে সেটাও ভাঙা শেষ। আর কোন কথা না বলে বগলদাবা করে হনহন করে হেঁটে চলে গেল।তামান্না রাগে দিকবেদিক ভুলে ভার্সিটির ছাত্র ইউনিয়ন অফিসে গিয়ে কমপ্লেইন করে।
জেনিকে ডেকে এনে জিয়ানাকে ফোন দেয়ার ত্রিশ মিনিট পর আসামি হাজির হলো। এসেই তামান্নাকে দেখেই হেসে কাছে গিয়ে ব্যাগ থেকে টাকা বের করে বলল

“তোমার গাড়ি আসলেই এক্সপেনসিভ। আমার ধারণার চেয়েও বেশি। আমার সাইকেলের দাম ছিলো একুশ হাজার। যেতে আসতে রিকশা ভাড়া আশি টাকা। প্রচন্ড গরম একটা সফ্ট ড্রিংক্স খেয়েছি ত্রিশ টাকা। ও হ্যা তোমার জন্যও এনেছি মানে ষাট টাকা ড্রিংক্স। মোট একুশ হাজার একশো চল্লিশ টাকা খরচ। তোমার লুকিং গ্লাস ,সরি গাড়ির লুকিং গ্লাসের দাম পেয়েছি চৌদ্দ চৌদ্দ আটাশ হাজার টাকা। ফেরত ছয় হাজার আটশো ষাট। ”
বলে টাকাটা তামান্নার হাতে দিয়ে সবার উদ্দেশ্যে বলল “ওকে তাহলে মামলা ডিসমিস?আল্লাহ হাফেজ। ও হ্যাঁ আমার লস হয়েছে মিস ধলা ব্যারাম। আমার একটা ক্লাস কেল্লাফতে। ইটস ওকে। কাউকে না কাউকে তো ছাড় দিতেই হয়। ”

বের হয়ে চলে যায়।।তার পেছন পেছন জেনিও বের হয়ে গেল।
নিবিড় স্থির হয়ে বসে ,বদি আর সজিবের মুখ হা হয়ে আছে। কিসের মামলা কিসে ডিসমিস করলো। আসামি কে ,বাদী কে?বিচারকই বা কে? মানে সবকিছুই সবার তালগোল পাকিয়ে গেল।
“সিসি ক্যামেরার ফুটেজে প্রমাণ হয় অপরাধ আপনার মিস তামান্না। মামলা ডিসমিস সো ইউ মে গো নাও। ” বলে নিবিড় আঙুল দিয়ে দরজা দেখিয়ে দিলো।
“একটা দুইটাকার সাইকেলের জন্য সে আমার গাড়ি নষ্ট করেছে আর তুমি তাকে এমনি ছেড়ে দিলে? ”
“হাউ ক্যান ইউ বি সো ব্রুটাল? বলল না সে দুইটাকার না একুশ হাজার ছিলো দাম। একুশ টাকা নিজে কামাই করেছো কখনো? সুগার ড্যাডের টাকায় আমার সামনে ফুটানি দেখাতে এলে তোমার শরীরের অরিজিনাল ফুটেজ দেখিয়ে দিবে পোলাপান। আউট ধলা ব্যারাম। ”

অপমানে তামান্নার চোখ দিয়ে পানি ঝরতে লাগলো। ইহ জীবনে সে এতটা অপমান কখনো হয়নি। সুন্দরী আর ধনীর দোলালি হওয়াই সব জায়গায় প্রিভিলেজ পেয়ে এসেছে। সবাই ‘জো হুকুম হো হুকুম আজ্ঞে ‘ বলে চলেছে এতকাল। কিন্তু আজ তার দম্ভ যেনো নড়ে উঠলো। শব্দ করে পা ফেলে প্রস্থান করলো সেখান থেকে।
“ক্লাস শেষে এই বোম্বাই মরিচকে আমার কাছে আনবি ” বলে শার্টের কলার পেছনের দিকে টান দিয়ে চেয়ারে গা এলিয়ে দিলো নিবিড়।

ক্লাস শেষে সবাই যখন পিলপিল করে বের হচ্ছে জিয়ানা তখন রুমের এককোণে দাঁড়িয়ে। এত হুড়োহুড়ি তার পছন্দ না। আস্তেধীরে বের হয়ে দরজায় দাঁড়ানো কাবলিওয়ালার দুই সাঙ্গুপাঙ্গু দেখে “কি অবস্থা “বলে সাইট কেটে হাঁটা ধরলো।
“ভাই তোমাকে ডেকেছে। ”
“আজ সময় নেই , ফ্রি হয়ে দেখা করে আসবো। ” পেছন না ফিরে সোজা হেঁটে হেঁটেই বলে চললো।
“নিজের পায়ে না গেলে চ্যাংদোলা করে নিয়ে যেতে হবে। ”
জিয়ানার আজ ঝামেলা করতে ইচ্ছা হলো না ,চলুন বলে তাদের পেছন পেছন গেলো। মাঠের মাঝামাঝি রাস্তায় এসে থেমে গেলো অতি পরিচিত মানুষটাকে দেখে। বয়সন্ধিকালের প্রথম অনুভূতি রাফিন ইসলাম। বারবার গণিতে খারাপ করাই আব্বু একজন টিউটর আনলেন। যিনি একমাত্র জিয়ানাকে মেয়েদের মতো ট্রিট করতো। মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়া। মাঝেমধ্যে রেজাল্ট ভালো করলে চকলেট দেয়া। এইসব আদরের মানে জিয়ানা ভুল ধরে নিজের অনুভূতিকে প্রশ্রয় দিয়ে বসে।

প্রায় পাঁচ বছর পর দেখা।স্বাস্থ্য ভালো হয়েছে।চাপদাড়ি রেখেছে। চুলে মুরগী ছিলা করে ট্রিম করা।মানে দুই পাশে একেবারে ছিলে মাঝখানে কিছু চুল রাখা। এখন একটা পুরুষ পুরুষ ব্যাপার এসেছে উনার মাঝে।উনি নিশ্চয় জিয়ানাকে চিনবে না? বদিদের একটু দাঁড়াতে বলে এগিয়ে গেলো রাফিনের দিকে। দ্রুত পায়ে গিয়ে সাইড থেকে সালাম দিলো। রাফিন অন্যান্য স্টুডেন্ট ভেবে সালাম নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলো।
“রাফিন স্যার আমি জিয়ানা।”

ঘুরে তাকিয়ে চোখের চশমা খুলে ফেললো। জিয়ানাকে আপাদমস্তক দেখে “ওহ মাই গুডনেস। ইজ দ্যাট ইউ জিয়ু? এত বড় হয়ে গেছো। কিন্তু বেশভূষা সেই আগের মতোই আছে দেখি। চুল কি এখনো টাক্কু করে দেন আংকেল?”
জিয়ানা এবার লজ্জা পেলো কিছুটা। হাজার হোক ক্রাশ বলে কথা। এইভাবে টাক্কু হওয়ার কাহিনী কেউ বলে। তবুও মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল”আপনিও বড় হয়ে গেছেন স্যার। ”
রাফিন হেসে উত্তর দিলো”একই রকম আছো দেখি? তা তুমি প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ছেড়ে এইদিকে কেনো?”
“ট্রান্সফার স্টুডেন্ট স্যার। আম্মুর পোষ্টিং এইদিকে দিয়েছে। সহপরিবার মুভ করেছি। বাসায় আসবেন স্যার। আসি। “বলে বদি দের দিকে গেলো। বদিরা এদিকেই কান খাড়া করে ছিলো।
জিয়ানার মুড ভালো হয়ে গেছে। এখন কেউ তার সাথে বিটলামি করলে সেও ফিরতি বিটলামি করে দিবে। নো প্রবলেম। বিড়ি-টিড়ি খেতে বললে সেটাও খেয়ে নিবে। বেহুদা ক্যাচালে যাবে না। তার ক্রাশকে পেয়ে গেছে এতদিন পর। একটা ইমেজ তৈরির ব্যাপার আছে না।

ক্লাবে ঢুকেই দেখতে পেলো সিনিয়র বিটলাদের। সবগুলা মনে হচ্ছে মুখিয়ে আছে কখন ছাই দিয়ে মাছ ধরবে। জিয়ানা লম্বা করে সালাম দিলো। সালাম শুনে কেউ কেউ কাত হওয়া থেকে সোজা হয়ে বসলো। জিয়ানা পালের গুদাটাকে খুজে চলছে। সে কোথায় দ্যা সান্ডা মান্ডা কাবলিওয়ালা। পরক্ষণেই বের হয়ে এলো নিবিড়। আজ অবশ্য কাবলি পড়েনি। লোকটার সাইজ সেই। মানে লম্বার সাইজ আরকি। মনে মনে তাওবা পড়লো জিয়ানা। মহামান্য ভাই আসন গ্রহন করার পর জিয়ানা অপেক্ষায় আছে ফুল বর্ষণের। কিন্তু হায় কোথায় ফুল? কিন্তু ভেসে এলো গমগমে গলা “সিনিয়রদের সামনে ক্যাপ ,মাস্ক আর গ্লাস পড়ে থাকা বেয়াদবি। এটা জানো?”
“জি জানি। আর আমি আপাদমস্তক বেয়াদবই। বাই বর্ণ। ”
“এই ক্যাম্পাসে আমাদের সাথে বেয়াদবি করে টিকতে পারবে না। সেটা জানো?”
“জানবো না কেনো? জলে নেমে কুমিরের সাথে লড়াই কে করে?”
“গুড কিন্তু আমি কুমির না। ”

“অবশ্যই আপনি কুমির নন তবে কুমির চাষী। ” বলে তার সাঙ্গুপাঙ্গুদের হাই দিলো।
এই পর্যায়ে নিবিড়ের প্রচন্ড হাসি পায়। নাকের নিচে দুই আঙুল ঘঁষে ঠোঁট কামড়ে হাঁসি আড়াল করার চেষ্টা করলো। মেয়েটাকে মোটেও বিরক্ত লাগছে না তার। বরং একই রকম মেয়ে মানুষ দেখে দেখে তার মনে হয় বোরিংনেস চলে আসছিলো।
বদি বলল”তোমাকে টেস্ট করার জন্য এখানে ডেকেছে ভাই।যতদূর জানি তুমি বেশ মেধাবী। আর আমরা মেধাবীদের কদর করি।তাদের সাহায্য করি। ফেইল করলে পাস করিয়ে দেয়া হয়। আর্থিক সাহায্যও করা হয়।বিনিময়ে আমাদের মিটিং মিছিলে সময় মতো হাজির হতে হয়। ”
“কিন্তু মেধাবীরা তো ফেইল করে না। আর আমি তো সবসময় বিরোধীদল। যে দলই সরকার হোক আমি তাদের সমালোচনা করতেই পছন্দ করি। আচ্ছা কি টেস্ট? আপনারা জনগনের সেবক হলে আমি অবশ্যই ফ্রি টাইমে জয়েন করবো। ”

সমুদ্র বললো “অন্তত চশমাটা টা খুলে রাখো। কথা বলার সময় চোখের এক্সপ্রেশন জানা জরুরি। ”
জিয়ানা ক্যাপ আর গ্লাস খুলে হাতে রাখলো। বয়কাটে কপাল আর পেছনের ঘাড় পর্যন্ত চুলে ঢাকা। চোখটা ঝলমলে ডাগর ডাগর। নিবিড় সোজা হয়ে বসলো। সমুদ্র আবার বলল”এত সুন্দর চোখ সবসময় ঢেকে রাখো কেনো?”
“আমি তো প্রকৃতির মতো উদার নয় ,যে নিজ সৌন্দর্য দেখিয়ে বেড়াবো। ”
“একটা কথাও মাটিতে পড়তে দিচ্ছো না। এতগুলো ছেলের মাঝে একা মেয়ে হয়ে দাঁড়িয়ে আছো তোমার ভয় লাগছে না?” নিবিড় ভরাট কন্ঠে প্রশ্ন করলো।

“আমি কাউকে ভয় পাই না। ”
“বেশ সাহসীদের আমরাও অ্যাপ্রিশিয়েট করি। এবার একটা ঘোষণা দাও। ” সমুদ্র বলল।
দুইবার কাশি দিয়ে নিবিড়ের টেবিলের সামনে থেকে একটা খাতা নিয়ে গোল করে পেচিয়ে “ওয়ান টু থ্রি মাইক চেইক ” বলে শুরু করলো
“একটি ঘোষণা
একটি ঘোষণা
মুরগীর ডিম খাবেন না
মুরগী হেগে শৌচে না”
এইটুকু বলায় হাসির রুল পড়লো ঘরময়। নিবিড় টেবিলে থা*প্পড় দিয়ে সবাইকে থামিয়ে দিয়ে গর্জে উঠলো “ফাজলামি হচ্ছে?”

জিয়ানা দুই পাশে মাথা নেড়ে বুঝালো না কোন ফাজলামি হচ্ছে না “ভাই আমি এই একটা মাত্রই ঘোষণা পারি। ”
সজীব বলল”আচ্ছা যাও সিনিয়রদের সাথে বেয়াদবি করবে না।”
জিয়ানা মাথা নেড়ে বের হবে তাকে থামিয়ে দিলো সমুদ্র। সে খুব এনজয় করছে এমন কাউকে পেয়ে। “আচ্ছা নিবিড়কে নিয়ে একটা নির্বাচনী স্লোগান দিলেই তোমার টেস্ট কমপ্লিট। ”
জিয়ানা কয়েক সেকেন্ড চোখ বন্ধ করে গাইলো
“নিবিড় ভাইয়ের মুরিদ হইলে
পড়ালেখা লাগে নারে
আরেহ নিবিড় ভাইয়ের মুরিদ যারা
ফেইল করে না তারা ”

এইবার বাকি সবাই চুপ কিন্তু নিবিড় নিজেই অট্টহাসি দিয়ে উঠলো। জিয়ানা তাকিয়ে দেখলো কাবলিওয়ালা ভিলেন হলেও হাসি হিরোকাট।
“টেস্ট শেষ ভাইলোক?মে আই লিভ নাও?! ক্যাপ আর গ্লাস পড়ে জিজ্ঞাসা করলো জিয়ানা। নিবিড় আঙুল দিয়ে বের হয়ে যেতে বললো।
“আরেহ যেতে দিলি কেন ইন্টারেস্টিং ক্যারেক্টার। আরেকটু বাজাতাম।” সমুদ্র বলে আফসোস করলো।
“এতক্ষন থেকে এত গুলো ছেলের মাঝে দাঁড়িয়ে ছিলো ,অথচ কোন সংকুচ কিংবা ভয় কিচ্ছু ছিলো না। তাছাড়া একবারও চোখের পাতা ফেলেনি।শী ইজ রিয়েলি সামথিং স্পেশাল। ” বলে ওয়েট পেপারটা ঘুরাতে ঘুরাতে বলল নিবিড়।

হনহন করে থানায় ঢুকলো সাদা পাঞ্জাবী আর পায়জামা পড়া ,মুখভর্তি লাল দাড়ি ,সৌম্য বর্ণের ষাটোর্ধ রিষ্ঠপুষ্ট একজন ভদ্রলোক।উনি ইউপির গণ্যমান্য চেয়ারম্যান আলহাজ মামুন ইসলাম। দারোগা পুলিশ সবাই দাঁড়িয়ে পড়লো। থানার ওসি নিজের চেয়ার ছেড়ে দিলেন। কিন্তু উনি বসলেন পাবলিকের চেয়ারেই। ওসিকে ধরে কোলাকুলি করে বললেন”যার যেটা চেয়ার সেখানে তাকেই মানাই। তোমার ওই চেয়ারের যোগ্যতা আমার নাই বাপ।” ওসি সবাই থানায় উপস্থিত সবাই মুগ্ধ চোখে চেয়ে দেখলেন জনদরদী এই নেতাকে। মামুন সাহেব আরও বললেন” আমার কিছু ছেলেপেলে নাকি খোয়াড়ে ভরছো? সে ভালো। অন্যায় করলে সাজা অবশ্যই জরুরি। তবে ওদের দোষ নাই। দোষটা আমারই। আমি আমার পার্টির ছেলেদের সামলাতে পারি না।তাই অপরাধের শাস্তি মনে হয় আমার প্রাপ্য। আমাকেও এরেস্ট করো বাপ।”

ওসি ঝুঁকে উনার পায়ের কাছে এসে বসলেন “স্যার এভাবে বলবেন না প্লিজ। ওরা যে আপনার পার্টির সেটা আমরা বুঝিনি। পৌরসভার পোলাপান যে ইউনিয়নে গিয়ে ঝামেলা করবে সেটা আমরা কিভাবে বুঝবো? সেন্ট্রি সবাইকে ছেড়ে দাও। কুইক। ”
চেয়ারম্যান সাহেব উঠে দাঁড়িয়ে আবার কোলাকুলি করে রাতের খাবারের দাওয়াত দিয়ে গেলো ওসিকে।ওসি গদগদ হয়ে বলল “এসবের কোন দরকার নাই স্যার। ”
“আরেহ তুমি হইলা এই থানার প্রধান। একবেলা খাওয়াইলে আমাদের নিজেদেরই ভালো লাগবে। ”
চেয়ারম্যান সাহেব থানা থেকে বের হয়ে গাড়ির কাছে গেলে দুইজন আফ্রিকান গার্ড দরজা খুলে দিলেন। ওসি জানালা দিয়ে দেখে কুটিল হাঁসি দিয়ে আরেক অফিসারকে বললেন” আফ্রিকান নিগ্রো বডিগার্ড নিয়ে ঘুরেন দেখি আপনাদের চেয়ারম্যান?”

“জীবনের ভয় কার না আছে স্যার?”
“তবে এইবার মাঠে নেমেছে যে শক্তপোক্ত ভাবেই।টেনে হিঁচড়ে অতীতে বের করে আনলো বলে। ”
“সাবধান জলে নেমে কুমিরের সাথে খেলতে গেলে কুমিরই হওয়া লাগবে। বাঘ না। ”
একসাথে দুইজনই হোঁ হোঁ করে হেসে দিলো।

জিয়াউল হক কিছু পুরাতন নথিপত্র ঘাটাঘাটি করছিলেন। আঞ্জুমান এসে হায় হায় করে মাস্ক নিয়ে উনার নাকে মুখে চড়িয়ে দিয়ে বলে”এখনই হাঁচি শুরু করতে। পুরাতন কাগজ ঘেটে কি সুখ পাও সেটাই বুঝি না আমি। ”
“আমিও তো বুঝি না আঞ্জু। মাথার উপর বিরাট দায়িত্ব। এখনো ফিফটি পার্সেন্ট হিসেব আমি মিলাতে পারিনি। বাচ্চাটার কাছে জবাব দেয়ার মতো উত্তর যে এখনো আমার কাছে নেই। ”
“এইবার একটু সহজ হও। মানুষের জীবন আজ আছে কাল নেই। এইভাবে ভয়ে ভয়ে কাটানোর কোন মানে হয় না। এরচেয়ে ভালো সব পরিস্কার করে বলে দাও। ”

“সময় আসুক।আ’ম সিটিং ইন আ প্যাচড স্টেট ”
“নীলু যে রুপক মন্ডলের নাম বলতো ,উনাকে খুঁজে পেলেই মনে হয় সব হিসেব পেয়ে যেতে তাই না?”
“হ্যাঁ কিছুটা। ওই সময় সাগর ভাই আরও কিছু নাম বলেছিলেন কিন্তু সব যেনো হাওয়াই মিলিয়ে গেছে। ”
“ওদের বাড়িটা?”
“সেটা পরিত্যক্ত। কেউ থাকে না। তবে আমি কয়েকবার গিয়েছিলাম। সন্দেহজনক কিছু পাইনি। ”
“এভাবেই চলুক না। পরে কেঁচো খুড়তে সাপ বের হয়ে যাবে। ”
“সেটা নাহয় মানলাম কিন্তু এইভাবে দুইজন মানুষ তো অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে না? ”

জিয়ানা ক্যাম্পাসের মেইন গেইটে রিক্সার জন্য দাঁড়িয়ে । তখন সামনে দিয়ে সিনিয়র কিছু মেয়ে যাচ্ছিলো। কিছুটা দূর গিয়ে আবার ঘুরে জিয়ানার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো “তুমি তামান্নার গাড়ি ভেঙেছো?”
জিয়ানা মাথা দিয়ে হ্যাঁ বুঝালো। একটা মেয়ে এগিয়ে এসে বলল “সাবধানে থেকো সে কিন্তু যেসে কেউ না। নিবিড় ভাইয়ের গার্লফ্রেন্ড। এখন অবশ্য ব্রেকাপ। কিন্তু জোড়া লাগতে কতক্ষন? তাছাড়া তামান্না ভার্সিটির সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে। ওর অনেক চামচাও আছে। ”
“সতর্ক করার জন্য শুকরিয়া আপনাদের।কিন্তু নিবিড়ের গার্লফ্রেন্ড হলে তো রেপুটেশন খারাপ হওয়ার কথা।আফটার অল উনি খেয়ে ছেড়ে দেন। তাই না?”

মেয়েগুলা হকচকিয়ে গেলো যেনো ,তারপর কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বলল”নতুন আসছো তাই জানো না অনেক কিছু। উনার গার্লফ্রেন্ডরা বেশিরভাগ টিসি নিয়ে চলে যায়। পরবর্তীতে তাদেরকে আর কেউ দেখেও না। আর এইভাবে পাবলিকলি নিবিড় নাম নিয়ো না। এখানে উনারাই সব।উনাদের ইশারা ছাড়া এখানে কিচ্ছু হয় না” বলে চলে গেল।
জিয়ানা ভ্রু কুচকে চিন্তায় মশগুল ,মেয়েগুলোর সাথে ব্ল্যাকমেইলিং করা হয় নাতো। জিয়ানার চিন্তা ছুটে গেলো সাইসাই করে পাশ দিয়ে বাইক চলে যাওয়াতে। একেবারে কানের পাশ দিয়ে গেলো দেখে বলে উঠলো “কোন শা*লার পুত রে?”

অদূরে গিয়ে বাইকটা দাঁড়িয়ে পড়লো। আর হেলমেট খুললে জিয়ানা থতমত খেলো। আরেহ কাবলিওয়ালা যে। নিবিড় এক আঙুল দিয়ে জিয়ানাকে কাছে ডাকে।সে দ্রুত পায়ে গিয়ে সালাম দিয়ে কান ধরে দুঃখিত বলল। আর মক্কু কে নেমে দাঁড়াতে বলল। মক্কু নিবিড়ের দিকে তাকালে সে সম্মতি দেয়। মক্কু নামার সাথে সাথেই জিয়ানা গিয়ে উঠে বসে পড়ে। নিবিড় ভ্রু কুচকে পেছনে ফিরে দেখলো। কিন্তু মক্কু এগিয়ে এসে বলল”আরেহ তোমার সাহস তো কম না। ভাইয়ের বাইকে যে কেউ উঠতে পারে না। ”

“ভাইয়ের চ্যালা হওয়া লাগে? তাছাড়া আপনাদের জন্য আমার দেরি হয়ে গেছে। এখন রিকশা পাচ্ছি না। আমাকে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব আপাদেরই। আমাকে মার্কেটে ছেড়ে দিলেই হবে। ”
নিবিড় বিনাশব্দে বাইক স্টার্ট করলো। আর ফুল স্পিডে প্রস্থান করলো। মক্কু হা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এই মেয়ে কি ভাইয়ের চ্যালা হয়ে তার জায়গাটা খেয়ে দিলো নাকি?
কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে তামান্না সবটা দেখে রাগে ফুসতে থাকে।
মার্কেটের কিছুটা আগে এসে হার্ডব্রেক করলো নিবিড়।হঠ্যাৎ ব্রেকে জিয়ানা নিবিড়ের পিঠের সাথে বাড়ি খায়।হুড়মুড় করে বাইক থেকে নেমে গেলো। সে কিছু বলার আগেই নিবিড় বলল”

নীতিহীন রাজ পর্ব ২

যতই পুরুষের বেশ ধরো ,শরীর প্রতিমুহুর্ত জানান দেয় নারীত্বের। নাইস ফিগার। ” মুচকি হেসে বাইক ঘুরিয়ে চলে গেলো। বিমুঢ় বেক্কেল আর মেজাজ খারাপ করে কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে থাকলো জিয়ানা।
একটা মসজিদের উদ্বোধন জন্য চেয়ারম্যান মামুন ইসলাম এসেছেন। নিবিড়ও পাশে দাঁড়িয়ে। উদ্বোধন শেষে মোনাজাতের পর নিবিড় বলল”আমি বের হচ্ছি চেয়ারম্যান সাহেব। “চেয়ারম্যান সাহেব মুচকি হেসে কানের কাছে গিয়ে বলল”মাঝেমধ্যে আব্বা ডাকতেই পারো ,যেহেতু তোমার আম্মা প্রতিদিন আমার সাথে রাত্রিযাপন করে। ”
নিবিড় চেহারা অপরিবর্তিত রেখে হাত শক্ত করে মুঠ করে ফেলে।

নীতিহীন রাজ পর্ব ৪