Home নীতিহীন রাজ নীতিহীন রাজ পর্ব ৪২

নীতিহীন রাজ পর্ব ৪২

নীতিহীন রাজ পর্ব ৪২
আশিকা আক্তার সোহাগী

কৃত্রিম শক্তি ব্যাবহার করে বস্তুকে আঘাত করলে কম্পন সৃষ্টি হয়।সেই কম্পন তরঙ্গ আকারে আমাদের কানের পর্দায় পৌঁছায়। ফলে আমরা শব্দ হিসেবে শুনতে পাই।বস্তুর ভিন্নতার জন্য তরঙ্গও ভিন্ন হয়। ফলে শব্দও ভিন্ন শোনা যায়।
জিয়ানা এই ট্রিকস কাজে লাগাচ্ছে।কলম রুপী পিতলের চা*কুটা দিয়ে সেল্ফে রাখা প্রতিটা বইয়ে মৃদ্যু আঘাত করছে। এতে করে যে কভারে বই আছে সেটা টানটান হওয়াই টক করে শব্দ হয়।আর যেটাতে বই নেই সেটা ডক করে শব্দ করে।আর সেটাই জিয়ানা বের করে চেইক করে।নিচের রেকের সব দেখা শেষ। দ্বিতীয় সারির মাঝামাঝি এসে থামে জিয়ানা।”ঘুমিয়েছো ,ঝাউপাতা” নামের বইটা বেশ ফাঁপা ঠেকলো।জিয়ানা হাতে নেয় বইটা।এবং মুখে হাঁসি ফুটে উঠে ভেতরের অনেকগুলো ছেড়া ডায়েরির পাতা দেখে।
এই পাতা গুলাই নীলুফার ডায়েরি থেকে ছেড়া হয়েছে।একই ডিজাইনের ছাপ দেয়া।লেখা গুলাও নীলুফারই।জিয়ানা মুচকি হাঁসলো।একবার যখন ঢুকে পড়েছে এই রুমে প্রতিটা কোণায় ছাপ মারবে সে।
পাতা গুলা নিয়ে বসে পড়লো আবার ফ্লোরে।

সকাল থেকেই স্বপ্না ভাবির মুখটা একদম বিষিয়ে ছিলো।আম্মা বার কয়েক জিজ্ঞেস করে
-ব্যাথা উঠছে?
সে মাথা দিয়ে না করে।আমার সন্দেহ যায় না।তাই পেছন পেছন থাকি।কয়েকবার দেখছি কোমর ধরে শব্দহীন কাঁদতে। ল্যান্ডলাইনে রুপকদা কে ফোন দিয়ে বললাম একটা গাড়ি পাঠাইতে ভাবির মনে হয় শরীর খারাপ।রুপকদা আসতাছি বললো ঠিকই কিন্তু আসার নাম নাই।বড় ভাবিকে বার কয়েক বলার পরেও সে বিকারহীন।
ঘন্টাখানেক থেকে স্বপ্না ভাবিকে খোঁজে পাচ্ছিলাম না।তাই অনুরাধার মায়ের রুমে যাওয়ার সময় স্টোররুমের দরজায় গলিত রক্ত দেখে আমার মাথা চক্ক দেয়।দরজা ঠেলে দেখি স্বপ্না ভাবি অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে আর দুই পায়ের মাঝে নব জাতক নিথর হয়ে পড়ে আছে। আমি একটা চিৎকার দেই।গায়ের ওড়না দিয়ে বাচ্চাটাকে পেচিয়ে বুকে নেই।
আমার চিৎকারে অনুরাধার মা সবার আগে আসে। এসেই এই অবস্থা দেখে গলায় আর্তনাদ করে বলে,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

-হায় সর্বনাশ। নাড় কাটা হয় নাই।বাচ্চা বাঁচানো যাবো না।
আবার দৌঁড়ে রান্নাঘরে ছুটে। ব্লেট আর সুতা এনে সুতা বেধে নাড় কাটে। ইতিমধ্যে রুপকদা চলে আসায় গাড়ি করে ছুটি হাসপাতালের দিকে।সেদিনের কথা মনে হলেই আমার সারা শরীর হিম হয়ে যায়।আমি যদি আর একটু দেরি করতাম তাহলে সুখকে বাঁচানো যেতো না।
স্বপ্না ভাবি ইচ্ছা করেই নিজের আর সন্তানের জীবন দিতে চেয়েছিলো। তাই স্টোর রুমে গিয়ে কাউকে না জানিয়ে ব্যাথা সহ্য করার চেষ্টা করেছে।ডাক্তার জানায় এই বাচ্চার ভাগ্য ভালো। জন্ম হয়েছে অনেকক্ষণ কিন্তু আল্লাহ হায়াত রেখেছে তাই ঠান্ডা মাটিতে অনেকক্ষন থাকার পরেও বেঁচে ছিলো।
সেই যে আমি সুখকে বুকে নিয়েছিলাম। আর নামাইনি।কেনো নামাবো ও আমার সন্তান। ওর মায়ের পেটে একটু একটু করে বড় হয়েছে আর আমি প্রতিদিন ওদের খেয়াল রেখেছি।ওর মা ওকে দুনিয়ার আলো দেখাতে চায়নি কিন্তু আল্লাহ ওকে হায়াত দিয়েছেন।

জন্মের পরেও মায়ের বুকের দুধ সে কোন দিনও পায়নি।না স্বপ্না ভাবি কোন দিন মুখ ফিরে তাকাইছে ওর দিকে।একটাবার যদি তাকাতো এমন মায়াকাড়া চেহারার দিকে আমি নিশ্চিত কোনদিনই মুখ ফিরিয়ে রাখতে পারতো না।সুখ ছোট থেকেই আমাকে আম্মু ডাকে। কিন্তু আম্মা ধমক দিয়ে ওকে থামাতো।আম্মার ভয় ছিলো লোকে ভাববে ওও আমার সন্তান। এতে আমার বিয়ে হবে না।
সুখ নিজেও কখনো মায়ের কাছে ভিড়েনি।ওও অবশ্য জানতোই না ওর আসল মা বাবা কে।আমি ওকে চিনাইতাম কিন্তু উল্টো ঘুরে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলতো “তাহলে জেঠু আর জেঠি যেমন রনি জনি ভাইকে আদর করে তারা আমাকে করে না কেন?”

আমার দেয়ার মতো কোন উত্তর জানা ছিলো না।আমি ওকে ভুজুংভাজুং বুঝ দিতাম।আমরা একসাথেই বড় হই।আমাদের সবচেয়ে ভালো বন্ধু ছিলো রুপকদা। সবাইকে লুকিয়ে মেলায় নিয়ে যাওয়া , গাছের মগডালের বড় আম পেরে খাওয়ানো,নৌকা বাইচ খেলা দেখতে নিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে সকল শখ আহ্লাদ পুরনের প্রদ্বীপের জ্বীন ছিলো রুপকদা।
আমাদের সাথে আরও সঙ্গী ছিলো মেহেদী ,রাফিন আর রনি জনি। তবে রাফিন ,মেহেদী আর সুখ এই তিনজন ছিলো মানিক জোর। রাফিন সবার বড় হওয়াই বুঝতো চমৎকার। রাফিনের মা গ্যাসের বিস্ফোরণে মারা যাওয়ার পর যখন রুপকদা ছোট বাচ্চা নিয়ে অকুল পাথারে পড়লো ,ভরসার হাত আম্মা বাড়ায়ে দেন।চাচারা বিদেশ চলে যাওয়ার পর থেকেই আমাদের এত বড় বাড়ির অধের্ক অংশ খালিই থাকতো।

তাই আম্মা যাকে পেতো একপ্রকার ধরে বেধেই রেখে দিতে চাইতো সবসময়। রুপকদা একহাতে আব্বাকে সাহায্য করতো আরেক হাতে বাড়ির সকল দ্বায়িত্ব পালন করতো।সারাদিন ক্লান্তশ্রান্ত হয়েই মুখ থেকে হাঁসি সরতো না।বাড়ি ফেরার সময় আমার জন্য আর বাচ্চাদের জন্য কালাই বাদাম নাহলে লেমেন জুস চকলেট আনতে ভুলতো না।সেখানে আবার স্বপ্না ভাবিরও ভাগ থাকতো। ভাবি ওইসব খেতে যে খুব পছন্দ করতো সেটা তৃপ্তি নিয়ে খাওয়া দেখলেই বুঝতাম।একবার বৈশাখী মেলায় নিয়ে গিয়ে রুপকদা আমাকে হাত ভরে কাচের রেশমি চুড়ি কিনে দেয়।আমার এইসবে তেমন শখ ছিলো না।অহেতুক টাকা খরচ মনে হতো।এই চুড়ির টাকা দিয়ে দারোয়ান চাচার মেয়ে সুমনার একটা স্কুল ব্যাগ হয়ে যেতো।রুপকদাকে মানা করলেও মানলো না।আমার ভালো লাগার চেয়ে খারাপ বেশি লাগে।বাড়ি এসে আসফাস লাগে।তাই চুড়ি গুলা খুলে আবার প্যাকেট করে রাখি।রাতের বেলা দেখি স্বপ্না ভাবি চুড়ি গুলা হাত বুলাচ্ছে।তাই আমি একটা ছোট্ট মিথ্যা বলি “এই চুড়ি গুলা তোমার জন্য ভাবি”

সামান্য কয়েকটা চুড়ির জন্য ভাবির মুখে এই প্রথম আমি হাঁসি দেখি।সুন্দর মুখটা সেদিন আরও সুন্দর লেগেছিলো।হাঁসে না কেনো স্বপ্না ভাবি? ছোট ভাই কি তাকে এতটাই কষ্ট দিয়েছে? সুখের মুখের দিকে তাকিয়ে সকল কষ্ট কি ভুলে থাকা যায় না?
এরপর থেকে রুপকদার অহেতুক চুড়ি ফিতা ,আলতা ,টিপের জিনিসের বিনিময়ে আমি স্বপ্না ভাবির মুখের হাঁসি কিনি।সুখের সাথে ভাবির হাঁসির মিল অনেক।সুখটাও গোমড়া মুখো হয়েছে কাতুকুতু না দিলে হাঁসে না।

বড় ভাই আর ছোট ভাই মাসের বেশিরভাগ সময় বাড়ির বাহিরে থাকতো।তাদেরকে হুমকি ধামকি দিয়েও কাজ হতো না।সেই হিসেবে রুপকদাই বাড়ির অঘোষিত পুত্র হয়ে উঠলো। আব্বার বয়স বাড়ার সাথে সাথে শরীরে নানা রোগ বাসা বাধলো।আর দায়িত্বে ঢিল পড়লো।ভাইরা থাকা আর না থাকা সমান।আব্বার অসুস্থতা আরও বাড়ে তখন,যখন নানান মানুষ ছোট ভাইয়ের নামে অভিযোগ আনেন।বেশিরভাগ মেয়ে ঘটিত।আম্মা আব্বা পারে না লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে।

এতকিছুর মাঝে একজন ছিলো বিকারহীন।মেজো ভাবি। মেহেদীর আম্মা।আমি এই জীবনে উনার মতো এমন মানুষ দেখি নাই।যখন যেটা করা দরকার মেশিনের মতো হাত চালিয়ে করে বাকি সময় ঘরে খিল দিয়ে বসে থাকতো।কেউ জিজ্ঞেস করলে উত্তর দিবে না করলে নাই।কাজ শেষ ,ঘুম শুরু। উনাকে বড় ভাবি চালাতো।এককথায় বড় ভাবির এসিস্ট্যান্ট ছিলো মেজো ভাবি।তবে উন্নতি হচ্ছিলো স্বপ্না ভাবির। আস্তে ধীরে রান্নাঘরে যাওয়া শুরু করলো। খাওয়া দাওয়ার দিকে মনোযোগ হলো।হঠাৎ হঠাৎ সুখকে কাছে ডাকে।কিন্তু ততদিনে সুখ বেশ বড় হয়ে গেছে। কেজি শেষ করে আর কিছুদিন পর দ্বিতীয় শ্রেণীতে উঠবে।সেদিন ভাবি এসে জিজ্ঞেস করে ,

-সুখ কোন ক্লাসে পড়ে নীলু?
-আমি কোন ক্লাসে পড়ি বলো তো ভাবি?
-তুমি তো এইবার মেট্রিক দিবা।
আমি হাঁসি। আমার হাঁসি দেখে ভাবি বিব্রত হয়।সুখ ছোট হলেও ছিল বেশ চৌকস।কঠিন কঠিন কাজের ছোট মাথায় সহজ সমাধান রেডি থাকতো।আমরা শীতের দিন পুকুরে নেমে খেলতাম না। কিন্তু সুখ বড় গামলায় বসে সারা পুকুর ঘুরে বেড়াতো।

আমি টিফিন না খেয়ে যে টাকা জমাতাম ,সেখান থেকে ছোট চারা গাছ কিনে বাগানে বিভিন্ন ফলের গাছ লাগানোর বুদ্ধি টাও ওর ছিলো।কয়েকবছর পর গাছে বড় হলে ফলগুলা আমি মনের সুখে বিলি করতে পারতাম।মেহেদীর জন্য অবশ্য গাছের ফল বেশিরভাগ কচি অবস্থায় নষ্ট হতো।
এলাকায় ধর্মসভায় একবার এক হুজুরের বয়ান পাই টু পাই সুখ নিজের মস্তিস্কে গেঁথে রেখেছিলো। সেখানে হুজুর বলেছিলো “দুনিয়াতে যারা ভিক্ষা করে ,হাশরের ময়দানে তারা কঙ্কাল হয়ে ঘুরবে।আবার এটাও বলেন কেউ ঘোড়ায় চড়ে ভিক্ষা করতে আসলেও তাকে ভিক্ষা দাও”
এই বয়ান শুনার পর থেকে বাসায় কোন ভিক্ষুক এলেই সুখ তাদের জিজ্ঞেস করতো,
-আপনি হাশরের ময়দানে কঙ্কাল হয়ে ঘুরতে চান?

ভিক্ষুকরা প্রথমেই পাত্তা দিতো না বাচ্চা ছেলের কথা।ভিক্ষা দিয়ে সুখ হাদিসের কথাটা ভেঙে বলতো।কাজ নাই ,অসুস্থ্য নানা বাহানা দিয়ে কেটে পড়তো তারা।আর যারা কাজ খুঁজে পায় না বলতো ,সুখ আমাকে নিয়ে এলাকায় বিভিন্ন বাড়ি গিয়ে হাউজ হেল্পিং হিসেবে রেখে আসতো।
ওর যখন চার বছর বয়স আমার নামাজ পড়া দেখে একটা ওড়না এনে আমার মতো করে মাথায় দিয়ে জায়নামাজে বসে।আমি সালাম ফিরিয়ে ওকে বলি
-আব্বু তুমি তো ছেলে ,তোমার টুপি পড়তে হবে।মেয়েরা ওড়না পড়ে।
-তুমি আর আমি তো একই আম্মু
-এক না সোনা। আমাদের শরীর থেকে মন পুরাটাই ভিন্ন করে আল্লাহ বানিয়েন।
সুখ আঙুল দিয়ে আমার বুকের দিকে দেখিয়ে বলে,
-এই যে তোমার এইখানে উঁচু আর আমার সমান এইজন্য তুমি আলাদা?
আমি কান টেনে জিজ্ঞেস করি,

-ওরে বাদর আর কোন পার্থক্য চোখে দেখিস না?আমার যে চুল লম্বা লম্বা আর তোর এট্টুকু।
-আমার চুল তো কেটে দেয় বারবার। তুমি তো কাটো না।আমার গুলা না কাটলে তো আমরা সেইম সেইম হতাম।
আমি হেঁসে লুটোপুটি খাই।ওর সাথে কথায় আমি পারতাম না।না অন্য বাচ্চারা পারতো।মেহেদীর সাথে গলায় গলায় ভাব থাকলেও তর্কে সুখের সাথে না পেরে সারাবাড়ি কেঁদে চিল্লিয়ে মাথায় উঠাতো।
রনি জনি আর মেহেদীর যতটা কদর ছিলো নূর ম্যানসনে সুখের তার কানাকড়িও ছিলো না।এই বৈষম্য সবাই বুঝতে পারতো।কিন্তু কেউ কোন সাড়াশব্দ করতো না।যে বাবা মার কাছেই কদর পায় না সেখানে বাকিরা আর তেমন কি?
মেধাবীর দিক দিয়ে মেহেদী ছিলো সেরা।চেহারার দিক দিয়ে রাফিন।কিন্তু দায়িত্ব আর বুদ্ধিমত্তায় সুখ ছিলো বাড়ির বড়দের চেয়েও এগিয়ে। আম্মা আব্বার কাছেও সুখ তেমন যেতো না।বাচ্চাটা বুঝতে পারতো হইতো কে তাকে সত্যি স্নেহ করে।এক আমি আর একজন ছিলো নূর ম্যানসনে। তার কাছ ছাড়া করতো না সুখ। তিনি ছিলেন আমার দাদি নূরজাহান খাতুন।

দাদি যখন একেবারেই বিছানায় পড়ে গেলেন,দরকার ছাড়া দাদির কাছে কেউ যেতো না।বাচ্চারা তো আরও দশহাত দূরত্ব বজায় রাখতো। কিন্তু সুখ সকালের মকতব পরেই একঘন্টা দাদির ঘরে কাটাতো।রিডিং পড়া শিখার পর প্রতিদিন দাদিকে সকালে পত্রিকা পড়ে শুনাতো।
আমি ইন্টার পরিক্ষা দেয়ার সময় সুখের বয়স আট চলছে। সেই আট বছর বয়সে তার মুখের একটা কথায় আমি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম দাদির ঘরের দরজায়।
“বড় আম্মা জানো প্রতিটা ভালো কাজের যেমন পুরস্কার আছে ,তেমনি খারাপ কাজেরও পানিশমেন্ট আছে।এবং এটা পরকালে তো আছেই সাথে দুনিয়াতেও ভোগ করতে হবে”
জবাবে দাদি জানতে চান,

-আব্বা এত বড় কতাখানা তুমি কেমনে শিখলা?
-মকতবের হুজুর বলেছে বড়-আম্মা।
-আমারে কেন কয়লা এই কথা?
সুখ কাচুমাচু করে নজর লুকায়।বাচ্চাদের এই একটা স্বভাব চমৎকার। তাদের চেহারা হচ্ছে মনের আয়না।মনের ভয় শংকা সব চেহারায় ভাসে।দাদি যেনো বুঝলো সেটা। তাই আবার বলে,
-আব্বা আমি আজ আছি কাল নাই।কোন কতা অর্ধেক কইবা না। মনে থাকবো?
-আমি আপনাকে অনেক পছন্দ করি বড়-আম্মা।
-হেইডা আমি জানি আব্বা।তই এই বাড়ির বাকিরা করে না।
-ফু-আম্মু আমাকে বলেছে যারা তোমাকে পছন্দ করবে না ,তাদেরকে পছন্দ করাতে যাবেও না।কারণ যারা পছন্দ করবে না ,তারা নাকি হাজারটা ভালো কারণ থাকলেও পছন্দ করবে না।কিন্তু একটা কারণেই অপছন্দ করবে।কিন্তু..

-কিন্তু?
-যে পছন্দ করবে না তার কাছে জানতে চাওয়া উচিত কেনো পছন্দ করে না।এবং কোন কারণে আমার জন্য কষ্ট পেয়ে থাকলে তার কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত।
দাদি একটা বাচ্চার কাছে এমন কথা শুনে হোঁ হোঁ করে কেঁদে উঠলেন।বৃদ্ধ শরীর কান্নার দাপটে কেঁপে কেঁপে উঠলো।আমি ভেতরে গিয়ে ধরলাম দাদিকে।আমাকে পেয়ে দাদি যেনো ভরসা পেলো। কান্নারত কন্ঠেই বলল,
-হ্যাঁ রে নীলু আমি যদি অনাচার করেই থাকি তাহলে তো তুই আর এই বাচ্চাটার সাথে বেশি করছি।তোরা কি আমারে কোনদিন ক্ষমা করবি?
আমি দাদির মুখ চিপে ধরে সুখকে বাহিরে পাঠিয়ে দিয়ে বললাম ,
-দাদি আমরা তোমাকে মাফ করছি দেখেই তোমার কাছে আসি বারবার।বুঝছো? এই খারাপ শরীর নিয়ে কাইন্দো নাতো।
-আমি যদি না বলতাম কালেমা পড়ার আগে পয়দা করা বাচ্চা আমার বংশে জায়গা নাই।আমার উত্তরাধিকার সে না। তাহলে কি ওর এত অবহেলা করবার পারতো সবাই?এই জন্যই কি সবাই ওর সাথে এমন করতে দূর দূর করে রে নীলু?

-ওইসব কথা থাক দাদি।তোমার কি খাইতে মন চায় বল?
-তোরেও কম দূর দূর করছি? সেই তুই একমাত্র আমার কাছে আছোস বাকিরা কেউ ফুচকিও দেয় না।হেগোর লাইগা কি না করছি?
একরাশ আত্মগ্লানি ছিলো সেদিন দাদির কন্ঠে।সুখ কুরআন শেখার পরেই সবার আগে এসে দাদিকে সূরা বাকারা শুনায়।যে দাদি একদিন বলছিলো এই বাচ্চারে এতিমখানায় না দিলে সে এই বাড়ি থেকে বের হয়ে যাবে। সেই দাদি এখন প্রতিদিন সুখের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।
সুখের জন্মকালে আমিও ছোটই ছিলাম তাকে দেখবাল করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিলো না।তবে একজন লুকিয়ে সব করতো। মেজো ভাবি মানে মেহেদীর আম্মা।সুখের সকল কাজ যেমন ,খাওয়ানো ,গোসল ,নোংরা কাথা পরিস্কার সব করলেও কখনোই কুলে নিয়ে আদর করতেন না।খাওয়ানোর শেষে আমার না হয় অনুর মায়ের কাছে দিয়ে সরে যেতেন।
দিনদিন সুখের চৌকস বুদ্ধিমত্তার জন্য নূর ম্যানসনে সবাই আস্তে আস্তে তাকে কাছে টানা শুরু করলো। কিন্তু সুখ ততদিনে বুঝে গেছে এরা তার আপন কেউ না।বিশেষ করে বড়দের কাছ থেকে একটা দূরত্ব রেখে চলতো।
জিয়ানা থামে।তার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে একটু পানি খেতে হবে।তাই বের হয়ে রান্নাঘরে যায়।

কোন মিনিংফুল উদ্দেশ্যে চলতে গেলে হতাশা সবার আগে এসে ধন্না দেয়।আর লাইফের ট্যাক্স হিসেবে প্রথমেই একটু ঘৃণা ,অবিশ্বাস ঘিরে ধরে।-সাদিকুর রহমান খান
নিবিড়ের অবস্থাও সেইম।সে আপাতত কাউকেই বিশ্বাস করতে পারছে না।কাউকে মানে কাউকেই না।তাই নিজেই একটা ডেস্কটপের সামনে বসলো রনিকে সরিয়ে।আপাতত ছয়জনের টিম।নিবিড় ,মক্কু ,আকাশ,সজল,রনি ,তালহা। রনি আর সজল কুখ্যাত হ্যাকার।কুখ্যাত কারণ মাঝেমধ্যেই তারা আকাশের আইডি হ্যাক করে তার গার্লফ্রেন্ড সব এক্সপোজ করে।আর আকাশের কাছ থেকে কড়া ট্রিট নেয়।
ক্লাবের আকাশই একমাত্র সচ্ছল পরিবারের ছেলে।স্থানীয় সদর হাসপাতালের সিনিয়র সার্জন হচ্ছে তার বাবা আর গাইনি ডাক্তার তার মা। আকাশ তাদের একমাত্র সন্তান।বিলাসিতা আর প্রাচুর্যে বড় হওয়া ছেলেটা যখন এই ভার্সিটিতে ভর্তি হয় নিবিড়ের ব্যাক্তিত্ব দেখে নিজের রুচি বদলীয়ে রাজনীতিতে যোগ দেয়।লেখাপড়াতেও খারাপ হওয়াই ক্লাবে জয়েনিং আরেকটা কারণ। অনন্ত অকৃতকার্ষ হওয়া লাগবে না এই ভরসায় প্রথম প্র‍থম সহমত ভাই টাইপ কর্মী থাকলে ,তিনবছরে সে কমিটিতে জায়গা করে নিয়েছে।এখন মক্কুর পর আকাশই নিবিড়ের সবচেয়ে কাছের।

বারোটা বাজতে আর কয়েক মিনিট। একজন সম্পাদকের সাথে কিছুক্ষণ আগে নিবিড়ের কথা হয়েছে।অল ওকে।শুধু সময়টার অপেক্ষা।
নিবিড়ের ভেতরে বেশ অশান্ত ঝড় বয়ছে। মক্কুকে ইশারা করলো দুষ্টু বোতল আনার জন্য।মক্কু কিংফিশার ইমপেরিয়াল স্ট্রং বিয়ারের পাঁচটা ক্যান আর একটা অরেঞ্জ সফট ড্রিংক্স এনে রাখে টেবিলের উপর।তালহা ধার্মিক। সে হারাম পানীয় পান করে না। প্রথম প্রথম ওদেরকেও নিষেধ করতো কিন্তু কেউ শুনলে তো তার কথা।
নিবিড় ক্যানটা নিয়ে হোকটা টান দিয়ে খুলে ফেলে মুখের কাছে নেয়।কিন্তু ঠোঁটে ছুয়ানোর আগে মনে পড়লো জিয়ানার কথা।নরম উষ্ণ ঠোঁটের কথা।নিবিড়ের সারা শরীরের অদ্ভুত ভালো লাগা সাথে মস্তিষ্কের শান্তিময় একটা থিতু হয়েছিলো সেটাও। নিবিড়ের নার্ভ গুলা যেনো আবার নাড়া দিলো তখনকার মতো।ঠোঁটটাতে এখনো লেগে আছে পাগল মেয়েটা।
হাতে ধরে থাকা লাল ক্যানের দিকে তাকায়। এই তুচ্ছ নেশায় তার হবে না। তারজন্য কড়া ডোজের জিয়ানা নেশা চায়।হাতের ক্যান ছুড়ে মারে ফ্লোরে।বাকি পাঁচজন হকচকিয়ে যায়।মক্কু জিজ্ঞেস করে ,

-ভাই কাচের বোতল আনমু?
-নাহ।আজ থেকে ক্লাবে এলকোহল নিষিদ্ধ করা হলো।কারণ হারাম পানি যতই দামী কিংবা নামী ব্র‍্যান্ডের হোক ইথানল থাকে এতে।আর ইথানল আমাদের শরীরের মারাত্মক ক্যান্সার তৈরি করে।
-ভাই এতদিন ধরে খাইতাছি হুট কইরা কি ছাইড়া দেয়া যাইবো? আজকে খাই কাল থেকে কমামু।
বলে ক্যানে চুমুক বসায় সজল।আকাশ আর রনিও সজলএর পক্ষে।কিন্তু তালহা যেনো বিরাট সাপোর্ট পেলো তাই গলায় জোর এনে বলে,

-রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম মদের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল ব্যাক্তিকে লা’নত করেছে।শরিয়তে উম্মুল খাবায়েছ মাদককে সবধরনের জঘন্যতার আকর বলে অভিহিত করেছেন।তাছাড়া একজন মাদক সেবীর চরিত্র হয় সর্বোচ্চ খারাপ।তারা বউ আর মেয়ের পার্থক্য বুঝতে পারে না।আস্তাগফিরুল্লাহ।আল্লাহ ভাইকে সঠিক বুঝ দিয়েছনে।তাই আপনাদের সবারই তওবা করে এই হারাম পানাহার এক্ষুনি ত্যাগ করা উচিত।
-সঠিক বলেছিস তালহা।ক্লাবে যা আছে সব নিয়ে সামনের ড্রেনে ফেলে আই যাহ।
বলে সিক্রেট রুমের দিকে যায় নিবিড়। আকাশ বোকা হেঁসে হাতের ক্যানটা ঝটপট শেষ করে বলে,
-ভাই আর কিছুদিন পরেই বিয়ে করতো।আমরা আর একটু এনজয় করতে পারতাম।ভাবি দেখি ভাইয়ের ভেতর পর্যন্ত বদলায় দিতাছে। পরে আবার রাজনীতি বাদ দিয়ে তাবলীগে চলে যাবে নাতো?
মক্কুও হাতের বিয়ার ক্যানটা বিনে ফেলে বলে,

-দশজন কর্মি যদি বদলায় তবে দশজনই বদলাবে। কিন্তু একজন লিডার যদি বদলে যায় তবে পুরা টিমটা বদলে যায়।ইদানীং আমার সুস্থ স্বাভাবিক লম্বা জীবন বাঁচতে ইচ্ছা হয়।তাই এইসব হারাম জিনিস আজ থেকে ছুঁয়েও দেখবো না।
-ভাই আমিও ছুঁয়ে দেখবো না। যদি অন্য একটা ছুঁয়ার জিনিস পাই। কসম।
আকাশ এডাম আপেল ধরে বলে।
-মানে? কিসের কথা কস?
রনি জিজ্ঞেস করে।
-বউ মিয়া বউ।ভাইদের মতো বউ পাইলে পিনিক আর কাজে দিবে না।তখন এই সব আর হাতে কিংবা মুখে রচবে না।তখন শুধু বউ খাও…..
শেষ করার আগে মক্কু মাথায় চাট্টি মেরে বলল,

-সেফটি ট্যাংকির মতো মুখ বন্ধ রাখ ব্যাটা। পিনিক না তোমার ভাই বের করবে লা*ত্থি দিয়ে। তারাতাড়ি শেষ করে বাড়ি যাবি।কয়েকদিন পরেই না পরীক্ষা তোর?নিশ্চিত ডাব্বা মারবি।
মাথার পেছনে হাত বুলিয়ে বলে,
-আমার দুক্কু তো বুঝবেন না আপনেরা।কালই একটা বিয়ে করে দেখাই দিবু।আর পড়াশোনা কে করে ছ্যাহ।একটা বউ পাইলেই লাইফ ঝিংজ্ঞা লালা।
-করিস।এখন কোডিং শেষ কর।

নিবিড় জিয়ানার পেনড্রাইভ টা আবার ওপেন করতে কর‍তে আওড়ায়,
“চাঁদের নেশায় বুদ হয়েছি
ম*দে কি আর নেশা হয়?
যেই ঠোঁটে চাঁদ লেগেছে
সেই ঠোঁটে কেউ যোগ্য নয়।”
গান শেখার ফোল্ডারে ক্লিক করে দ্বিতীয় ভিডিও টা অপেন করে,
রেলস্টেশনে অনেক ভিড়ে আক্কাস ,রাব্বি আর কয়েকটা টোকাই দাঁড়িয়ে আছে। জিয়ানা ওদের পেছনে। কারণ ক্যামেরা জিয়ানার হাতে।রাব্বি জিয়ানার দিকে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে ,

-উস্তাদ! এত ভীড়ের মাঝে উঠমু কেমনে?
-একটু আগে না বললি তোর হা*গা ধরছে?এখন ভীরের মাঝখানে গিয়ে একটা পা*দ দিবি। যাহ।
নিবিড় হাঁসছে।
রাব্বি কথা মতো কাজটা করলো মনে হয়। রাব্বির চারপাশ একটু পাতলা হয়ে গেলো। জিয়ানা এগিয়ে গিয়ে বলে ,
-সাব্বাস ব্যাটা।দুইদিন হা*গিস না তোরে নিয়ে এক জায়গায় যামু।
-কই উস্তাদ? না হা*গলে পেট ফুইল্লা মইরা যামু না?
-সেটাও তো কথা।
-কই নিবেন কইলেন নাতো?
-কাবলিওয়ালার ক্লাবে।যেখানে বইসা তারা গু গোবর খায়।ওদের ওগুলার গন্ধ অতি বিশ্রী। সেই হিসেবে তোর পা*দ কিছুই না।

-আপনে খাইছেন উস্তাদ?
-হোপ ব্যাটা হারাম খামু কেন? সব অপরাধ মাফ হবে বান্দার হক মারা আর হারাম খাওয়ার মাফ নাই।তোরা যে বিড়ি খাস এইজন্য তোদের জাহান্নামে কড়া তেলে ভাজা হবে।
-আল্লাহ উস্তাদ আর বইলেন না। আর খামু না। কসম খোদার।
-আল্লাহ বল।আল্লাহর নিরানব্বই নামের মাঝে খোদা নাই।
-আল্লাহর কসম আর খামু না।
-সাব্বাস।
নিবিড়ের হাঁসি এবার থামে।জিয়ানা মজার ছলে ওদের যেভাবে শিখাচ্ছে একই রকম নীলুফা ইয়াসমিন নিবিড়কে নানা জিনিস শিখাতো।উনার চোখে দুনিয়া সরল সোজা ছিলো। কাউকে ঘৃণা করতো না ,কষ্ট মনের মাঝে রাখতো না।কিন্তু নিবিড়ের দুনিয়া যে ঝিকঝাকের মতো উঁচুনিচু।একদন্ড সহজ করে ভাবার কোন সুযোগ তার নেই।
দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আর কিছু করার নেই।এই জটিল জীবন আর কখনোই সহজ হবে না।জিয়ানা কি করছে দেখার জন্য ফোনটা হাতে নিলো।তখনই মক্কু নক করে জানালো সময় হয়ে গেছে উপরের আসতে হবে।
জিয়ানা আবার পড়া শুরু করলো বাকি পাতা গুলা।

সবকিছুই ঠিকঠাক চলছিলো।তবে বছরখানেক পর হঠাৎ করেই দাদি অসুস্থ হয়ে পড়লো।ডাক্তার জানালো যখন তখন অবস্থা যায় যায়।তাই চাচারা দেশে আসলেন তিনদিনের মাথায়।কিন্তু এসেই দাদিকে পেলেন না।
দাদি মারা যাওয়ার খবর শুনে আব্বা আর চাচাদের মাঝে বাকবিতন্ডা ঝগড়ায় রুপ নিলো।দাদির গোসল জানাযা কবরের ব্যবস্থা না করেই তিন ছেলে সম্পত্তি নিয়ে পড়ে রইলেন।দাদির নিথর দেহের পাশে আমি আর সুখ একমনে কুরআন পড়ি।বড় হয়ে বুঝতে পারি কুরআন নাজিল হয়েছে জীবিতদের জন্য মৃত্যুদের জন্য না।কিন্তু নিজেকে শান্তনা দেয়ার সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে প্রার্থনায় মনোনিবেশ করা।সুখ কেঁদে কেঁদে বাচ্চা কন্ঠে সূরা মূলক পড়ে আর দাদিকে ফু দেয়।হুজুরের কাছে শুনেছে সূরা মূলক কবরের আযাব কমায়।তাই সে টানা সেই কাজই করছে।

আব্বা আর চাচাদের ঝগড়া চলার মাঝখানেই উকিল আসলেন সাথে দাদির রেগুলার ফলোয়াপ ডাক্তার।উনারা সবাইকে দাদির ঘরে ডেকে নিলেন।শান্ত হয়ে বসতে বলে একগাদা দলিল বের করলেন।হঠাৎ চাদরের নিচ থেকে শুয়া দাদি নড়ে উঠাতে সবাই ভয় পেয়ে ঘর থেকে বের হয়ে যায়।আর বিছানায় মরা দাদি জ্যান্ত হয়ে উঠে অকুল হয়ে কান্না শুরু করে।উকিল দলিল এগিয়ে দিলে দাদি হাতের ছাপ দেয় ফটাফট। আমি আর সুখ অবাক চোখে চেয়ে দেখি শুধু।
ঘরে আব্বা আগে ঢুকে ,পরপর সবাই।সবার চোখ মুখে প্রশ্নবোধক চিহ্ন। সবার দ্বিধাদ্বন্দ্ব দূর করে উকিল যেটা বলে সেটা শুনে ,কারো কারো রুহ শরীর ছেড়ে আসমানে উঠে যায়।
উকিলের কথাটা ছিলো এই,

” আমি নূরজাহান খাতুন আমার সকল স্থাবর অস্থাবর ,সোনা দানা বাড়ি ঘর ,কারখানা সহ যাবতীয় সহায় সম্পত্তি দুইভাগে ভাগ করিয়া। উক্ত সম্পত্তির বাড়ি আর জমিজামা নীলুফা ইয়াসমিন আর কলকারখানা মিল সুখনীল নিবিড়ের নামে হেবা করিলাম।”
বিনা মেঘে বজ্রপাত হলো নূর ম্যানসনের। আব্বা আম্মা মানে আমাদের পরিবার ছাড়া দুই চাচার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো।তারা কানাকড়িও পেলো না। আর ভাবলো সব আমাদের চক্রান্ত।

কয়েকদিন পর মামলা মুকাদ্দমা করে তারা ফিরে গেলেন আবার।সব শান্ত হওয়ার কথা থাকলেও ভেতর ভেতর কিছু অশান্ত চলছিলো।আর সেটার নায়ক আমার বড় ভাই মাজাহার ইসলাম আর উনার স্ত্রী মাহমুদা ভাবি।
তারা প্রতিনিয়ত আমার কাছে ইনিয়ে বিনিয়ে জানতে চান তাদের কবে লিখে দিবো।আমার তখন পুরাদমে বিয়ের ঘর আসা শুরু হলো।আম্মার ইচ্ছা আর পড়াশোনার দরকার নাই এইবার সংসার করি।কিন্তু আব্বার ঘোর বিরুধ। আব্বার মতের জন্য আমাকে অনার্সে ভর্তি করানো হলো।সুখের তখন নয় বছর বয়স।
জমিজামা ,দলিল পারিবারিক কলহের জন্য আমি অনেকদিন এলোমেলো ছিলাম।তাই অন্য বিষয়ে আমি তেমন একটা খেয়াল না করলেও হঠাৎ স্বপ্না ভাবির আচরণে তুমুল পরিবর্তন লক্ষ্য করি।
এবং এরকিছুদিন পর থেকে আমাদের পরিবারে যেনো রাহুরদশা শুরু হলো। আমি আর সুখ ছাড়া বাড়ির সবাই নানা উদ্ভট জিনিস উপলব্ধি করতো।আম্মা আমাকে আরও বেশি বেশি আমল করার জন্য তাগিদে রাখেন।আমি যা যা করি সুখ আমাকে অনুসরণ করতো।

বাড়ির শান্তি যেনো হাওয়াই মিলিয়ে গেলো।এরমাঝে আম্মা একদিন বলল ,সে নাকি কাল ভয়ংকর একটা পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে। স্বপ্ন না বাস্তব আম্মা বলতে পারে না। শুধু বলে এই পরিবারের সবাই সবাইকে খু*ন করতে মাথা ছাড়া দা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো।পাশে ছিলো আলখাল্লা পড়া কিছু অদ্ভুত মানুষ। আম্মার এই কথা বাড়ির পুরুষ সমাজ বিশ্বাস করলো না।কিন্তু মহিলা সমাজ বিশ্বাস করলেন।কারণ গাছের একটা ফলও ভালো পাওয়া যেতো না।সবগুলার মাঝখানে পচা বের হতো।উপর দিয়ে টাটকা ফল কিন্তু ভেতরে গলগলে পঁচা।এরমাঝে অনুরাধার পা মাচা থেকে একটা লাউ আনার পর সবার ধারণা স্পষ্ট হয়।কারণ লাউয়ে ছিলো মরা মাছ,কিছু কাগজ আর আমাদের বাড়ির ছেলে বাচ্চাদের ছবি।মেয়ে বলতে বড় ভাইয়ের এক বছরের বাচ্চা মাইমুনা। আর অনুরাধা।তাদের ছবি ছিলো না।

নীতিহীন রাজ পর্ব ৪১

আম্মা এই লাউ দেখে হাউমাউ করে কান্না শুরু করলেন। আর আব্বা বাধ্য হয়ে বড় কিছু হুজুর আর মাওলানা আনলেন।উনারা বাসায় পা দেয়ার সাথে সাথেই বলে দিতেন ভয়ংকর কালো যাদু করা হয়েছে আপনাদের উপর।
আমি বুঝলাম এই সম্পত্তি খুব ভারি পড়বে আমার আর সুখের উপর।আমি সবার সম্মুখে বলে দিলাম। আমি চাচাদের সহ তিনভাগে ভাগ করে সম্পত্তি দিয়ে দিবো।তোমরা ব্যবস্থা করো।কিন্তু বাধ সাধলো আমার দুই ভাই।
এই সম্পত্তি কাল হলো আমার ভাইপুদের জন্য।সবচেয়ে বেশি যে ক্ষতি হলো আমার সুখের। আমার বাচ্চাটা একেবারেই অস্বাভাবিক হয়ে গেলো।

নীতিহীন রাজ পর্ব ৪৩