Home নীতিহীন রাজ নীতিহীন রাজ পর্ব ৪

নীতিহীন রাজ পর্ব ৪

নীতিহীন রাজ পর্ব ৪
আশিকা আক্তার সোহাগী

“তুমি আমার ঘুম
তোমায় নিয়ে স্বপ্ন দেখিনা,
মিছা কথা, ঘুমালে আমি
দিন রাইতের খেয়াল রাখিনা
ওওওও…..”
গলা ছেড়ে পা উপরে মাথা নিচে এককথায় উল্টো হয়ে জিয়ানা গান গাইছে।এমন সে প্রায় দশ মিনিট থেকে লটকে আছে।জিয়াউর হকের রোল রেগুলেশন নাম্বার সাত ,বাসায় যত মিনিট দেরি হবে ফিরতে ,ঠিক তত মিনিট উল্টো লটকে থাকতে হয়। জিয়ানার শাস্তি চলছে। বাসায় ফিরতে গুনে গুনে আঠারো মিনিট দেরি করেছে। জেনি গিয়ে একটা কিল দিয়ে গান থামালো।
কিল খেয়ে আবার গাইলো

“এক ঠ্যাংয়ে নুপুর তোমার
অন্য ঠ্যাং খালি
লাগছে খুব সুন্দর
দে হাততালি”
ফিক করে হেঁসে দিলো জেনি। কারণ তার পায়েই একটা পায়েল আছে। জিয়ানার মাথার কাছে বসে বলল”সুন্দর না পায়েলটা? সজীব গিফট করেছে।”
“এসব জিনিস আমি বুঝি না আপি। একই লাগে সব। সজীব ব্রোর প্রতি তুমি সিরিয়াস?
“প্রথমে সিরিয়াস ছিলাম না। কিন্তু তার চোখে মুখে আমার জন্য অন্যরকম একটা টান দেখে কখন যেনো আমিও সিরিয়াস হয়ে গেছি। সে যে আমাকে সত্যি ভালোবাসে সেটা ফিল করি।”

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

“একটা পায়েল যেটা দৃশ্যমান সেটাই আমি ভালো না মন্দ বুঝতে পারছি না।আর তুমি চোখ মুখ দেখে সেরেব্রাল কর্টেক্সের ভেতরকার খবর বুঝে ফেলেছো?ব্রাভো।”
“ডিভাইন উইসডম পাওয়ায়ের কথা শুনেছিস? গ্রীক পৌরাণিক গল্প গুলোতে এই কথাটা এসেছে বারবার। সৃষ্টিকর্তা নিজ গুনে গুনানিত করে মানুষ বানিয়েছেন। সেখানে মেয়েদের কে এই ডিভাইন উইসডম পাওয়ার টা দিয়েছেন। মানে মন পড়ার ক্ষমতা। একটা মেয়ে এক সেকেন্ডেই একজন পুরুষের চাহনি দেখে বুঝে ফেলে তার মতলব কি। সেক্ষেত্রে ভালোবাসা বুঝা সহজ।”

“হে মাতে মোজে ক্ষ্যামা কার দো। আমার ভুল হয়ে গেছে একটা প্রশ্ন করে। এইসব প্রেম ভালোবাসার ফিলোসোফি আমার মাথায় ঢুকে না। এর চেয়ে পাঁচ কিলো টানা দৌঁড়ানো সহজ। আর কতক্ষন বাকি আছে?”
“হয়েছে সোজা হয়ে যা। আব্বু আর চেইক করবে না। আর যখন সত্যি সত্যি কারো প্রেমে পড়বি। বা কেউ তোর প্রেমে পড়বে তখন আজকের এই কথাটা বুঝবি। ”
“নো প্রিটি লেডি ,ইটস অল এবাউট লয়ালিটি এন্ড অলসো পার্ট অফ মাই ট্রেইনিং। আর যার নয়ে হয় না তার নব্বইয়েও হয় না। ”
“হয়েছে শেষ সময়। নাম। আজ তুই নিবিড়ের বাইকে উঠেছিস?তোর সাহস দেখে আমি অবাক হই জিয়ু!”
জিয়ানার পা ঘষে ঘষে প্রশ্ন করলো জেনি। পাতলা তেলতেলে পা জোড়া। কি সুন্দর স্কিন মেয়েটার।হাজার হাজার টাকা পেডিকিওর করেও এমন পা মেয়েরা পায় না। অথচ নিজ হাতে সৃষ্টিকর্তা মেয়েটাকে সাজিয়ে পাঠিয়েছেন যেনো।

“সে কি বাঘ না ভাল্লুক? ভয়ের কি আছে? লোকটাকে সহজে পড়া যায় না। একটা পর্দা টেনে রাখে নিজের চরিত্রের সামনে। তাছাড়া এমন বুইড়া বেটা এখনো ক্যাপাসে কি করে সেটা জানার খুব আগ্রহ আমার ” পা ছাড়িয়ে ফ্লোরে দুইবার ঝাপ করে বলল জিয়ানা।
“খবরদার জিয়ু তুই আর উনার সাথে কথায় বলবি না। উনার সব কিছু একটা ধোয়াশা।ইবলিশ দিন রাত তালিম নেন ওদের কাছে। মেয়ে খেকু জানোয়ার সে। আগেও বলছি এখন আবার বললাম তাকে তোর জানা লাগবে না। সব ব্যাপারে এত কৌতূহল ভালো না। ”
“আরেহ টেইক আ চিল পিল।আমার উপর কারো ইন্টারেস্ট আসবে কোন দুঃখে? কোন দিক দিয়ে আমি তোমাদের মতো? তাছাড়া আমি এমনিতেই দূরেই থাকবো কাল থেকে। আই হেভ আ নিউ গোল। আচ্ছা রাফিন ভাইয়া যে এই ভার্সিটিতে তুমি আমাকে বলো নাই কেন?”

“দেখা হয়েছিলো?নিশ্চয়ই সব ভুলে হ্যাংলার মতো গিয়ে কথা বলেছিস?”
জিয়ানা বত্রিশ দাঁত বের করে উপর নিচ মাথা নাড়ালো। জেনি মাথায় একটা চাট্টি মা*রলো। “ভুলে যাস কেন সেই অপমানের কথা? কোন মানুষ যদি তোর দিকে ভালোভাবে তাকায় চোখ ফেরাতে পারবে? আমার দেখা সবচেয়ে ফ্রেশ আর স্পষ্ট চেহারা আল্লাহ তোকে দিয়েছেন জিয়ু। দেখিস না আব্বু এইজন্যই তোকে বেশি ঢেকেঢুকে চলতে বলে। ”

“মেরি মা শানত হো যা। টমবয়কে টমবয় বললে অপমানের কি আছে? তাছাড়া পিচ্চি ছাত্রী হয়ে স্যারকে কনফেশ করা অবশ্যই অনুচিত। স্যার ঠিকই ছিলো। তবে এইবার লাইন মারবো ঠিকভাবে। “বলে জেনির ওয়ার্ডপ থেকে লাইম কালারের একটা সাদাবাহার ড্রেস বের করে মিররে নিজেকে দেখলো। জেনি অবাক হয়ে দেখছে তার কর্মকান্ড। জিয়ানা জেনির চেয়ে একটু লম্বা ,স্বাস্থ্য ফিট। জেনি একটু স্থুলুকার। তাই জেনি বলল”আমার গুলা তুই পড়লে কাকতাড়ুয়ার লাগবে। কি করতে চাচ্ছিস বলবি তো?”

“একটা ফেইক আইডি খুলবো ছবি লাগবে আমার মেয়েলি সাজের। আমার তো এইসব ড্রেস নাই। কিতা করবো তাহলে?
“সত্যি পড়বি?আমার খুব শখ নরমাল সাজে তোকে দেখার? তুই নিজে পড়তে চাচ্ছিস ,আই কান্ট বিলিভ! কোন হাতি পা*দ দিলো?”
“হাতির পা*দের সাথে আমার সাজের কি সম্পর্ক? ”
“এমনেই বলে না কথার কথা।”
“তোমার হেন্স অফ হিউমার খুবই বাজে আপি। শাড়ি পড়বো। দাও। কুইক। সিদ্ধান্ত বদলানোর আগ পর্যন্ত তোমার সময়। যদিও শড়ি পড়ে রংঢং করার বয়স আমার চলে গেছে। কিন্তু ক্রাশ যে ভুল সময়ে এসে পড়লো। ”
“তোর যদি বয়স চলে যায় তাহলে আমি তো বুড়ি”

ওসি হাবিব উল্লাহ প্রবেশ করলেন মামুন হকের বাড়িতে। এটা নতুন বাড়ি তাদের। পুরাতনটা পরিত্যক্ত। একটা দূর্ঘটনায় পুরো পরিবার ধ্বংস হয়। শুধু বেঁচে যায় গুটি কয়েক মানুষ। মামুন ইসলাম ,উনার দুই স্ত্রী ,দুইপুত্র ,বড় ভাইয়ের মেয়ে আর মা ছাড়া বাকি একারোজন মানুষ ,ততকালীন সংসদ সদস্য মোজ্জাম্মেল ইসলাম মামুন ইসলামের পিতা সহ বিভস্য ভাবে খুন হন একদিনে।বাড়ির কর্মচারী আর কাজের লোক মিলে প্রায় বিশজন মানুষের লাশ বের করা হয় সেদিন ভোরবেলা সেই পরিত্যক্ত বাড়ি থেকে।সেদিনের পর থেকে নিখোঁজ একমাত্র বোন নীলুফা ইয়াসমিন।সেদিন মামুন ইসলাম নিজের ডান হাতও হারিয়েছেন। এখন একটা আর্টিফিশিয়াল হাত লাগানো।পুরাতন ফাইল ঘেঁটে ঘুটে এসেছেন ওসি সাহেব।

আলহাজ্ব মামুন ইসলাম আর বড়পুত্র রাফিন ইসলাম তাকে সদর দরজা থেকে রিসিভ করলো। দুই জন হেল্পিং হ্যান্ড ছাড়া আর কাউ কে দেখা গেলো না। মার্বেল পাথর দিয়ে কারুকার্য করা ট্রিপ্লেক্স বাসা। বনেদি পরিবারের বনেদি রুচি প্রতিটা জিনিসই সেই পরিচয় দিচ্ছে।
লাক্সারিয়াস সোফায় বসতেই মনে হলো এতদিন নিতম্বের উপর অত্যাচার করা হয়েছে। বসার সাথে সাথে ছোট ছোট গ্লাসে হরেকরকম পানিয় এলো। বড়লোকেরা এটাকে ওয়েলকাম ড্রিংক্স বলে। দেখে দেখে হলুদগ্লাস নিলো।জনাব হাবিব প্রশ্ন করলো বড় আদবের সাথে “যতদূর জানি আপনার আরেকজন পুত্র আছেন।উনাকে দেখছি না?”

“একটা না। দুটো আছে। মেজো পুত্র দেশের বাহিরে আর ছোটটা পার্টির কাজে ব্যাস্ত। এসে পড়বে কিছুক্ষনের মাঝে। আর মহিলারা সবাই অন্দরে। পরহেজগার সবাই পরপুরুষের সামনে আসা নিষেধ ,আমার আম্মার কড়া নির্দেশ।আমার আম্মা আবার খুব কড়া। এখনো আমাকে শাসনে রাখেন। বলে মিষ্টি করে হেঁসে দিলো। রাফিন নিরব দর্শকের ভূমিকায় আছে।
হাবিব মিলাচ্ছে এই লোক ঘরে বাহিরে সব জায়গায় সমানভাবে জনপ্রিয়।
ডিনারের পর হাবিব অধীর আগ্রহ নিয়ে বসে আছে ,কখন এরা ঘুষ অফার করবে। আর তার বোতমের সিক্রেট ক্যামেরায় সেটা ধরা পড়বে। কিন্তু ঘটলো সম্পুর্ন উল্টো ঘটনা ঘুষের পরিবর্তে একটা পার্সিয়ান বিড়াল গিফট করলো হাবিবের মেয়ের জন্য। কোন ক্লো না পেয়ে বিড়ালটা নিয়েই হাঁসি মুখে প্রস্থান করলো।

গা*জা খেয়ে মক্কুর কন্ঠ ভারী হয়ে গেছে। তবুও খেয়েই চলেছে। নিবিড়ের দিকে একবার তাকিয়ে আবার টান দিলো। মাঝেমধ্যে নিবিড় লিমিট ছাড়া নেশা করে। কি দুঃখে যে এমন করে তার মাথায় ঢুকে না। শা*লা এমন এক লাইফ না আছে ঘর না আছে পর। সেই দুঃখেই এইসব ছাই পাস খায়। কিন্তু চেয়ারম্যানের পুত্রের কি এত দুঃখ কে জানে। ভারী গলায় বদিকে ডেকে ফিসফিয়ে বলল ,যদিও নেশায় ফিসফিসানি না মোটামুটি জোরেশোরে শোনা যাচ্ছে “বইদ্দা জানিস আজ কি দেখেছি? মিস ধলা ব্যারাম চুমু খাইছে।”
বদি খ্যাকখ্যাক করে হেঁসে বলল “সেতো প্রতিদিন আমাকেও খায়। ”

“স্বপ্নে?”
বদি রাগে মাথা নাড়িয়ে বলল “তুই কেমনে জানলি?হা*লার পু হা*লা তুই আমার স্বপ্নে উকিঝুকি মারিস?”
“তোর স্বপ্ন আমি পু*ন্দি না।আর কথা শেষ করতে দে।ভাইজানরে চুমু খাচ্ছিলো। ভাইজান দেখতে ভদ্র হলেও হেব্বি পুংটা আছে। ঘরে বউরে খায় বাহিরে….. বলে আবার খ্যাকখ্যাক করে হেঁসে উঠলো।
নিবিড় পা দিয়ে একটা লাত্থি দিয়ে বলল “চুমু তোদের পু*ন্দে ভরে দিবো আর একটা কথা বললে। ”
এইবার সজীব বলল”আমি নিশ্চিত তোর নেশা হয়েছে আজ। তোর যে আত্মগরিমা ছিলো নেশা হয় না।অথচ গালি দিচ্ছিস। মানে তোর অহংকার আজ সেটা আজ শেষ। মানে খতম। মানে টাটা। মানে বাই বাই। মানে……. “নাক ডাকা শুরু করলো।

আবার জেগে উঠে বলল”চাচা এত বোতল খালি কেনো?হেনা কোথায়? প্রেমের সমাধি ভেঙে জেনি যায় চলে যায়….
বদি আর মক্কু পাশ থেকে সমসুরে আ আ আ আ… বলে উঠলো।
নিবিড় টলমলে পায়ে উঠে ভেতরে ঢুকে গেলো। টান দিয়ে খচখচ শব্দে টিনের দরজা লাগালো। বিছানায় এক রমনি অল্প পোশাকে আবেদনময়ী ভঙ্গিতে শুয়ে আছে। ঘুরে ঘুরে দেখছে সুদর্শন সাদা পাঞ্জাবী পরিহিত এই পুরুষকে।
“নাম কি চেনা চেনা লাগে?”
“আমি আপনার এডভোকেটের স্ত্রী মিসেস সেলিম।”
“এই পেশায় কবে থেকে?”
“আপনার জন্য আজ থেকে।বাসায় যেদিন আপনার সাথে দেখা ,সেদিনের পর থেকেই আমার ঘুম হারাম করে দিয়েছেন। তারপর ভাবলাম একরাত আপনাকে পেলে জীবন ধন্য হয়ে যাবে।”

“সিউর?”
“হানড্রেট পার্সেট ”
নিবিড় টেবিলের ড্রয়ার থেকে ওলের পিং কালারের একটা হ্যান্ডকাপ বের করলো। রমনী ঘোর লাগা দৃষ্টিতে দেখে চলেছে সবকিছু। আর প্রতিমুহুর্তে পুলকিত হচ্ছে।
একটা বেল্ট টাইপ রিবর্ন ,একটা ফিতা টেবিলের উপর রাখলো।
রমনী মুচকি হেঁসে বলল”আই লাভ ওয়াইল্ডনেস। ”
“মি টু লেডি।ক্যান আই স্টার্ট?”
“প্লিজ।”
হাতজোড়ায় হ্যান্ডকাপ লাগিয়ে বেডের সাথে আটকিয়ে দিলো। রিবর্নটা মুখে বাধঁতে গেলে রমনী একটু বিচলিত হলো।
“আই ডোন্ট লাইক এক্সট্রা নয়েজ “বলে মুখ বেঁধে দিলো। ফিতাটা দিয়ে পা বেধে নিজের বেল্ট খুলে হাতে নিলো। দুই কদম পিছিয়ে গিয়ে বাঁকা একটা হাঁসি দিয়ে বলল”আজকের রাতের কথা সারাজীবন মনে রাখবি।

“চাই না ছেলে তুমি
অন্য কারো হও
পাবে না কেউ তোমাকে
কারণ তুমি ভালো নও ”
গেয়ে গেয়ে করিডোর ধরে হেঁটে চলেছে জিয়ানা। নিচে একটা দশ বারো বছরের ছেলের বোতল কুড়ুনো দেখে থেমে গেলো।উপর থেকে ডাক দিলো “ওই পিচ্চি নাম কি?”
ছেলেটা ডানে বামে ঘুরে উপরে তাকিয়ে দেখে বলল”রাব্বি মিয়া।”

“কাঁচের বোতল চলবে?”
“কই পামু?”
“আমি দিবো। একটা ক্লাস আছে করে আসি। তুই এইখানেই থাকবি। ওকে?”
“ওক্কে আফা।”
“আফা না ,বল ওস্তাদ ”
“ওক্কে ওস্তাদ।”
জিয়ানা আবার গেয়ে গেয়ে ক্লাসে ঢুকে গেলো। দুই মিনিট পর প্রফেসর ঢুকে লেকচার শুরু করলেন। হঠ্যাৎ থেমে জিয়ানাকে উদ্দেশ্য করে বললেন “ক্লাসে নো ক্যাপ ,নো মাস্ক। আদার ওয়াইজ ইউ মে লিভ।”
জিয়ানা খাতা ব্যাগে ভরে আস্তে করে বের হয়ে গেলো ক্লাস থেকে। নিচে নেমে পিচ্চিটাকে পেলো না। আশেপাশে খুজে পুকুর পাড়ে পেলো। জিয়ানাকে দেখে দৌঁড়ে এলো।

“আমি পর্থমে ভাবছি আফনে বেডা মানুষ ,পরে কতা হুইন্না বুঝছি। ”
জিয়ানা পিচ্চিটার বস্তা এক হাতে নিলো।আরেক হাত দিয়ে গলা জড়িয়ে ধরে হেঁটে যাচ্ছে। ময়লা একটা লাল গেঞ্জি যেটা অনেক বড় তার সাইজের চেয়ে ,একটা রকচটা জিন্স।নগ্ন পা কাদায় মাখামাখি।চুলে আবার ফুটবল প্লেয়ারের মত কানের সাইডে চিকন করে দুইটা দাগ কাটা।দাঁত গুলো বেশ বড়বড় আর ময়লা। হাতের নখের নিচেও কয়েক মন বালু আটকে আছে। খুটিয়ে খুটিয়ে দেখে জিজ্ঞেস করলো “কে কে আছে পরিবারে?”
“এক পংঙ্গু বাপ খালি। সারাদিন হুইয়া থাহে। কাম কাজ কিচ্ছু করতে পারে না। ”
“মা কি মারা গেছে?”

“না। বাপে পংঙ্গু হবার পরে আরেক বেডার লগে হাংজ্ঞা বইসে। ”
জিয়ানা হেঁসে বলল “মা সম্পর্কে এমনে বলতে নেই রাব্বি।”
“পেটের খিদায় কি সব ওস্তাদ?এই যে আমি আর আব্বা সারদিনে একবেলা খাইয়া থাহি। বাইচ্চা আছি না? আম্মা কেন খাওয়ার লোভে আমগোরে ফেলায়া গেলোগা?”
“খেয়েছিস সকালে?”
“একেবারে হাইঞ্জাবেলা(সন্ধ্যাবেলা) খাই। ”

“সারাদিনে কত পাস এই বোতল বিক্রি করে? ”
“কপাল ভালা থাকলে দেড়শো দুইশো পাই।নাহলে ষাইট সত্তর। ”
কথা বলতে বলতে তারা পৌঁছে গেলো নিবিড়দের ক্লাবঘরে। এই সময় শুধু বদি আর জুনিয়র কিছু ছেলেপেলে থাকে। জিয়ানাকে দেখে বদির মুখটা বিষিয়ে গেলো। এক প্রকার ঝাঁঝালো কন্ঠেই জিজ্ঞেস করলো “কি চায়?”
“আপনাদের দুষ্টু পানির নিষ্পাপ বোতল গুলো দেন।”
“মানে?”
“আরেহ ভাই ম*দের খালি বোতল গুলা দেন এই পিচ্চিরে। “বলে অপেক্ষা না করে সাইট থেকে নিজে নিজেই বস্তায় ভরে দুই আঙুল দিয়ে সালাম দিয়ে বের হয়ে গেলো।
“কোথায় বিক্রি করিস?”
“বাজারের ভাঙ্গারীর দোকানে। ”

কয়েক দোকান ঘুরেও কাচের বোতল বিক্রি করতে পারলো না।তারা প্লাস্টিক ছাড়া নেয় না। শেষমেষ জিয়ানা দুইশো টাকা দিলো রাব্বি কে। আর সাথে নিয়ে বিরিয়ানি খেলো। রাব্বির খাওয়া দেখে জিয়ানা আর খেলো না। তার নিজেরটাও পার্সেল করে দিয়ে দিলো। রাব্বিকে বিদায় করে জিয়ানা নিজের রাস্তায় হাটা ধরলো সাইকেল কিনতে হবে। এইভাবে রিক্সা আর পায়ে হেঁটে আর পুষাচ্ছে না।তারপর একটা খেয়াল এলো মাথায় রাব্বি যেদিকে গেছে ঘুরে সেদিকে যাওয়া শুরুলো।কাচের বোতল গুলোর শেপ চমৎকার। এগুলাকে ক্রাফটিং করলে ইজিলি সেল করা যাবে। কিছুটা যাওয়ার পর যা দেখলো তার চক্ষু চরাকগাছ। রাব্বি মিয়া তার বয়সী আরও কয়েকটা ছেলের সাথে ধুমসে সিগারেট টানছে। জিয়ানাকে দেখে রাব্বি চমৎকার হাঁসলো। যেনো বিড়ি টানা একটা শিল্প। “এই তোদের বয়স হইছে বিড়ি খাওয়ার?” জিয়ানা কপাল কুচকে জিজ্ঞেস করলো।

“আফা আমরা যে লাইনে আছি এই হানে বিড়ি খুব হালকা জিনিস। “বলল সবচেয়ে বড় ছেলেটা। জিয়ানা ব্রু কুচকে বুঝার চেষ্টায় আছে। এরা কি কিশোর গ্যাংয়ের কেউ।
“কি লাইন আমাকে বলা যাবে?”
“লাইন আর কি ধান্দা। আমরা টোকাইরা সারা শহরের অলিগলিতে ঘুরাফেরা করি। আর চোখের সামনে যা সত্য দেহি হেইডা বেইচ্চা চলি। ”
“নাম কি তোর?”
“আক্কাস কিন্তু সবাই আইক্কা ডাহে। ” বলে হাঁসতে লাগলো। জিয়ানা বুঝতে পারলো বাহির থেকে যা দেখা যায় সবকিছু আসলে তেমন না।

“আমিও কি জয়েন্ট করতে পারি তোদের দলে? তবে আমি একটা কাজ করে দিবো ফ্রিতে। এতে তোদের আবার প্রমোশন হবে। টোকাই থেকে বোতল বিক্রেতা। কাচের বোতল গুলো আমি রংচং দিয়ে সাজিয়ে দিবো। তোরা গলিতে গলিতে ঘুরে বিক্রি করবি আর আগের মতই যে যার ধান্দা করবি কোন সমস্যা নাই। রাজি?”
আক্কাস বলে উঠলো “এতে আফনের কি লাভ? ”
“লাভ আপাতত নাই তবে ভবিষ্যতে যখন সাংবাদিক হবো তোদের কাছ থেকে ইনফরমেশন কিনবো। এইজন্য এখন সুসম্পর্ক রাখছি। বুঝেছিস?”
বাচ্চাগুলা সব একসাথে মাথা নাড়িয়ে বলল “ওক্কে আফা।”
জিয়ানা তাদের সংস্কার করে ওস্তাদ শিখিয়ে দিলো।

নিবিড় ক্লাবে বসে ফোন ঘাটছে। এমন সময় সমুদ্র আর সজীব এলো। দুইজনই কি নিয়ে যেনো হেঁসে কথা বলছে। নিবিড়ের চোখ আটকালো পিপলস ইউ মে নো এর একটা আইডিতে। কুঞ্জবন নামে সাদা শাড়ি পড়ে এক সাইট হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা মেয়ে।লম্বা চুল ছেড়ে দেয়া কোমড়ের অনেকটা নিচ পর্যন্ত। আকাশের দিকে মুখ থাকায় চেহারা স্পষ্ট না। আইডিতে কিছুক্ষণ স্টক করে দেখলো কিছু নেই শুধু দুইটা ফটো। একটা পিপি আর একটা কভার ফটো। অনাকাঙ্ক্ষিত নাম শুনে চোখ সরালো ফোন থেকে। সমুদ্র বলছে “মাইরি এমন মাইয়া বাপ জন্মে দেখি নাই।”
বদি জিজ্ঞেস করলো “ঘটনা কি? ”

সজীব বলা শুরু করলো “আমি আর সমুদ্র ফুটবল খেলা দেখছিলাম পাড়ার কলেজের মাঠে। ছেলেরা খেলার বিরতির সময় রাস্তার সাইডে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছিলো। হাত থেকে ফুটবল ছুটে গিয়ে পড়ে রাস্তায় আর সেখানেই ছিলো বম্বাই মরিচ জিয়ানা হক। আর বলটা তার পায়ের কাছেই পড়ে।ফুটবল খুব সুন্দর করে পা দিয়ে পাস করে ফিরিয়ে দেয় ছেলেদের। কিছু বিটলা ছেলে তাকে অফার করে খেলার। জিয়ানা মানা করলে তারা বুলিং শুরু করে।”
সজীব থামলে সমুদ্র বলল”একজন বলে খেলবে না কেনো মামনী? পিরিয়ড চলে?”
“না চলে না গো খনিকের পোলা। আর চললেও কি এখন স্যানিটারি প্যাড আছে উন্নত ধরনের। তোমাদের বাসার মা-বোনদের মতো ত্যানা পড়ে না কেউ। ”

ভাই লিটারেলি আম শকড। একটা মেয়ে এতটা বোল্ড কেমনে হইতে পারে। পুরা বিশজন ছেলের জবান মনে হলো ঘ্যাচাং করে কেটে দিয়েছে মেয়েটা। আমার তো এই মেয়েকে এখন দেখার খুব লোভ হচ্ছে। ”
সব শুনে নিবিড় সোজা হয়ে বসলো। বদি এগিয়ে এসে বলল” আমাদের ক্লাবের আশেপাশে যেখানে কোন মেয়ে আসে না ,অথচ সে দেদারসে এসে বোতল গুলা নিয়ে গেছে।”

নীতিহীন রাজ পর্ব ৩

নিবিড় বেশ কড়া গলায় জিজ্ঞেস করলো “বোতল দিয়ে কি করবে?”
“সাথে একটা টোকাই ছিলো। তাকে হইতো দিয়েছে।দুইদিনে আইসা পুরা ক্যাম্পাস তুলকালাম করে ফেলছে এই মেয়ে। আজ নাকি প্রোফেসর বের করে দিয়েছে ক্লাস থেকে। ”
“চোখে চোখে রাখিস তো কিছুদিন “নিবিড় বদিকে বলে উঠে বের হয়ে গেলো।

নীতিহীন রাজ পর্ব ৫