Home নীতিহীন রাজ নীতিহীন রাজ পর্ব ৫

নীতিহীন রাজ পর্ব ৫

নীতিহীন রাজ পর্ব ৫
আশিকা আক্তার সোহাগী

ঝগড়াঝাটি সময় সঠিক পয়েন্ট ধরে কথার আঘাত করতে পারলে যতটা আনন্দ লাগে ,মন শান্ত হওয়ার পর সেই কথাটা বলার জন্য ঠিক তারচেয়ে দ্বিগুণ বিস্বাদ লাগে। অঞ্জুমান রাগের বসে বলেই ফেলেছেন “মেয়ে তো শুধু তোমার একার? তার ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত আমি নিতেই পারবো না। আমি তো তাকে বড় করিনি। সব তোমার কৃতিত্ব। ”
এতগুলো কথা বলার কারণ জিয়াউর হকের বারাবাড়ি। আশেপাশের পাড়াপ্রতিবেশির কথায় অঞ্জুর মেজাজ বিগড়ে আছে। দুই মেয়ে দুই রকম চালচলন। নতুন জায়গায় এসে পড়েছেন বিপদে। আজ উনার কলেজের এক কলিগ তো খোচা দিয়ে বলেই ফেললেন”এমন উদ্ধতস্বভাবের মেয়েকে কেউ বাড়ির বউ করে নিবে না। বিয়ের জন্য চাই কোমল নারী ,প্রতিমারূপ মেয়ে মানুষ। এখনো সময় আছে মেয়েকে মেয়ে হিসেবে গড়ে তুলুন”

প্রথমদিন ভার্সিটি শেষ করে জেনি আর জিয়ানা দুইজনই আঞ্জুমানের কলেজে গিয়েছিলো তারপর থেকে শুরু হয়েছে কানাঘুষা। জিয়াউর মুখে তালা দিয়ে চুপ করে বসে আছেন। উনি কিছু বলছেন না দেখে আরও রেগে গেলো আঞ্জুমান। জিয়াউরের হাত থেকে রিমোট কেড়ে নিয়ে টিভি বন্ধ করে দিয়ে হনহন করে নিজ কক্ষে চলে গেলেন।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

শীত যায় যায় করছে এমন একটা ঝিম ধরানো আবহাওয়াই কাজকর্ম না থাকলে পোলাপান নানা রকম খেলাধুলা করে। বিশেষ করে ব্যাডমিন্টন ,ক্যারাম বোর্ড ,টেবিল টেনিস ইত্যাদি। নিবিড়ের ভার্সিটির বাহিরের ক্লাবটা বেশ। টিনের ঘর হলেও ভেতরে ইন্টেরিয়র বেশ ঝাঁকানাকা। একপাশে খেলাধুলা ব্যবস্থা। আরেক পাশে মিটিংরুমের জন্য অসংখ্য চেয়ার বসানো। আর ভেতরে ওপেন সিক্রেট একটা বেডরুম। সেই রুমের একপাশে দেশি বিদেশি এলকোহল সাজানো। একটা বেড ,বেডের পাশে একটা সিঙ্গেল কাউচ আর একটা বেডসাইড টেবিল। নিবিড় আপাতত রুমে বসে একটা নকশা ড্রয়িং করছে। সে টেনে-টুনে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করেছে। কিন্তু ঝুলে আছে মাস্টার্সে। সেটা আজীবনেও শেষ হবে না বোধহয়।
দরজা খোলার শব্দে নকশাটা ভাজ করে ড্রয়ারে রাখলো।

“ভাই একটা উটকো ঝামেলা হয়ে গেছে। এলাকার এক মাইয়া সুইসাইড করছে। এখন এলাকার মুরব্বিরা সেই মাইয়ার দাফন করতে দিবে না তাদের এলাকায়।এইটা নিয়ে সকাল থেকে ক্যাচাল। মাইয়ার পরিবার থেকে আমারে বারবার হাতে-পায়ে ধরতাছে খালি। যেনো আপনে একটু গিয়ে মীমাংসা করে দেন।” বলে মক্কু নিবিড়ের দিকে তাকাল।
“মানুষ মরা উটকো ঝামেলা লাগে তোর কাছে? কাহিনি খুলে বল কি হয়েছে?” রাগ নিয়ে নিবিড় প্রশ্ন করে টি-শার্টের উপর জ্যাকেট পড়ে নিলো।
“প্রতিবেশী এক পোলার লগে লটর-পটর করে পরাগায়ণ ঘটিয়ে ফেলছে। কিন্তু সেই পোলা বিয়া করবে না।আশেপাশে সবাই জানাজানি হওয়াই কাল রাতে গলায় দড়ি দিছে।আর খবর হওয়ার পর থেকেই পোলা পগার পার। ”

বাইকের চাবি নিয়ে নিবিড় বলল “চল। ” নিবিড় সহ ছয়জন গেলো ঘটনাস্থলে।
নিবিড়দের পৌরসভার শেষের ওয়ার্ডের এলাকা হওয়ায় একেবারে গ্রাম বলা চলে। বাঁশঝাড়ের নিচে এসে বাইক থামিয়ে ভিক্টিমদের বাড়ি ঢুকেই গমগমে গলায় নিবিড় বলে উঠলো “কোন শু*য়ারের বাচ্চা দাফনে বাঁধা দিছে? আজ এইখানে দুইটা দাফন হবে। মামুন চেয়ারম্যানের ওয়ার্ডে নতুন মাতব্বরের মুখটা দেখি”
ব্যস, আর কোন সাড়াশব্দ পাওয়া গেলো না। জানানার পর দাফনের জন্য লাশ উঠানোর সময় ভিক্টিমের পরিবার জিয়ে রাখা কান্না আবার শুরু করলো। একজন যুবতী বয়সের মেয়ে হেলে পড়ে বারবার মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছিলো। মক্কু গিয়ে আগলিয়ে নিলো। বারবার জড়িয়ে ধরছে মেয়েটাকে। নিবিড় হাঁক ছাড়লো মক্কু বলে। মেয়েটাকে ছেড়ে পাশে এসে দাঁড়ালো। বদি কানের কাছে গিয়ে বলল”সুযোগ পাইলেই তিননাম্বার পা দাঁড়ায়ে যায় তাই না? মরা বাড়িও ছাড় দেস না? ফালতু আদমি কোথাকার। ”

মক্কু বোঁকা হেসে বলল “আমার বুক থাকতে মাটিতে পড়বে কেনো। আসলে আমি দয়ার সাগর। ”
নিবিড় বলল” নিতম্বে এমন এক লাত্থি দিবো দয়া সব ফুটা দিয়ে বের হয়ে যাবে। ”
মক্কু মুখটা চুপসে যায়।পাশ থেকে বদি মক্কুর কানে ফিসফিসিয়ে বলে “নিজে করলে লীলা আমরা করলে বিলা।”
দাফন কাজ সুন্দর ভাবে হয়ে গেলে ওরা রওনা হলো ক্যাম্পাসের দিকে।

জিয়ার বেশভূষার জন্য ওর ব্যাচের তেমন কেউ আগ বাড়িয়ে মিশা তো দূরে থাক কথাও বলে না। জিয়ানাও মেয়েদের সাথে তেমন কমফোর্টেবল না। আগে আগে যখন মিলমিশের চেষ্টা করতো ,দেখা যেতো এদের বেশির ভাগ আলাপ বয়ফ্রেন্ড না হয় সাজগোছ আর মেয়েলি পোশা-আশাক নিয়ে। নতুনত্বের কিছু নাই। এদের সাথে আড্ডা দিলে বহির্বিশ্ব দূর কি বাত দেশের খবরও জানা যায় না। এদের গণ্ডি অতি সংকীর্ণ।
এর চেয়ে চায়ের দোকানের বয়স্কদের আড্ডা ভালো। সেখানে দেশি বিদেশি পলিটিক্স থেকে শুরু করে নেতানিয়াহুর বংশের নাড়ি নক্ষত্র বের করে তাকে প্রতিঘন্টায় কতবার মৃত্য দেয়া উচিত সেই হিসাব করা হয়ে যায়।ইন্ডিয়া পাকিস্তানের বর্ডার জটিলতার মিমাংসা হয়। র এজেন্টদের নানা অপারেশনের সাফল্য আর অসাফল্য বের করা হয়। দেশের পলাতক সিরিয়াল কিলার থেকে শুরু করে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে গিয়ে ঠেকে। একদিনে পুরো বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ঘুরে আসা যায়।

ঢাকায় মগবাজার যখন থাকতো সেখানের টং দোকানের অনেক মুরব্বিদের সাথে তার সখ্যতা ছিলো। উনারাও জিয়ানাকে খুব পছন্দ করতো। কিন্তু এখানকার সবাই অদ্ভত চোখে তাকায়। তার বন্ধুবান্ধব বলতে সেই মহিউদ্দিন দাদু ,জসিম কাকু ,উকিল আংকেল কে খুব মিস করে। সেবার যখন ইলোন মাস্কের রকেট সফল ভাবে ল্যাড করলো পৃথিবীতে মহিউদ্দিন দাদু তাদের মিষ্টি খাইয়েছে। দীর্ঘশ্বাস ফেললো জিয়ানা। সে তার বয়স্ক বন্ধুদের মিস করছে। পাশে কেউ বসার শব্দ পেয়ে জিয়ানা তাকিয়ে দেখলো উন্নত স্বাস্থ্যের অধিকারী একটা মেয়ে। গলায় মোটা চেইন ,হাতে চুড়ি ,কানে ঝুলানো দুল। হাতের অনামিকায় আংটি। টকটকে বেগুনি রংয়ের জামা। হালকা সাজসজ্জাও আছে। ব্যস,একটা টিকলি দিলেই বিয়ের কনে লাগতো। জিয়ানা কয়েকবার চোখ পিটপিট করলো। মেয়েটার সাজের ঝিলিকে তার চোখে তারা ভাসছে।মেয়েটা হেসে হাত বাড়িয়ে বলল”হাই আমি মৌসুমী।”

“মৌসুমী কারে ভালোবাসো তুমি?”
ফিক করে হেসে দিয়ে বলল “নিজের জামাইকে। তুমি মনে হয় নতুন?”
“না এক সপ্তাহ হয়ে গেছে এসেছি। তুমিই নতুন মনে হচ্ছে। ”
আবার হেসে দিলো মৌসুমী।বেশ অদ্ভুত তোমার কথাবার্তা সাথে পোশাকও। ”
“শুকরিয়া বলবো না বলবো না?”
“মানে?
“মানে তুমি কি আমার প্রশংসা করলা না সমালোচনা? ”
“আরেহ অদ্ভুত মানেই ইউনিক। আর ইউনিক মানেই সুন্দর। ”
“তাহলে শুকরিয়া।ভার্সিটিতে তুমি বউ সেজে এসেছো কেনো? ”

আবার ফিক করে হেসে দিলো মৌসুমী “শ্বশুরবাড়ি থেকে এসেছি। তাই সব পড়ে আসতে হয়েছে। এই যে এক এক জুয়েলারি শ্বশুরবাড়ির এক এক আত্মীয় দিয়েছে। এখন যদি খুলি তাদেরকে আপমান করা হবে।মান সম্মানের একটা ব্যাপার আছে না। তাই শাশুড়ী সব পরে থাকতেই বলেছেন। ”
“আশ্চার্য তোমার জুয়েলারি পড়ে থাকার সাথে তাদের মান সম্মানের কি সম্পর্ক? তাদের মান-সম্মান এত ঠুনকো কেনো? ”
“শ্বশুরবাড়ি গেলে বুঝবা এখানে কত রকম মান সম্মান আছে। বাড়ির বউ দাঁত বের করে হাসলেও মান-সম্মান নষ্ট হয়।”

“আরেহ ব্যস।দাঁত বের করলে যদি মান-সম্মান চলে যায় ,তাহলে পাদ দিলে তো বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ধ্বংস হয়ে যাবে। ”
মৌসুমী অট্টহাসি দিলো। হাসতে হাসতে মেয়েটার চোখের পানি বের হয়ে যাচ্ছে দেখে জিয়ানা আরও বলল”আরেহ পাদ তো অতি প্রাকৃতিক একটা বিষয়। এত হাসার কি আছে প্রধানমন্ত্রী থেকে পিয়ন ,কুইন ভিক্টোরিয়া থেকে আমাদের দেশের হিরু আলম সবাই পাদ দেয়। চিল ইয়ার। ”
মৌসুমী কোনরকম নিজেকে ধাতস্থ করে বলল”ফ্রেন্ড হতে পারি তোমার সাথে?”
“পারিস তবে জামাই ,সংসার আর সাজগোছ নিয়ে কথা বললে অবন্ধু করে দিবো। ”
“আচ্ছা আমরা হয় শুরু থেকেই না হয় অবন্ধু হই। ” বলে দুইজন হাত মিলালো।
পরক্ষণেই প্রফেসর ঢুকাই দুইজন ক্লাসে মনোযোগী হলো।

বাজারের এক দোকানের সামনে নিবিড়রা ব্রেক নিলো চা খাওয়ার জন্য। চা অর্ডার করে সিগারেট ধরিয়েছে মাত্রই তখনই চলে এলো নিবিড়দের অপোজিট পার্টির লোকজন। এসেই মক্কুর মাথায় ঠেলা দিয়ে বলল”সর নিবিড়ের জাঙ্গিয়া। ”
মক্কু্র শরীর রাগে রি-রি করে উঠলো। বদি হাত ধরে ঠান্ডা হওয়ার ইশারা করে বলল”আরেহ পাপ্পু ভাইয়ের মোজা যে?”
গালকাটা মকবুল বদির কথায় কান দিলো না। নিবিড়ের দিকে ঘুরে বলল”তো নিবিড় সাহেব পৌরসভার আর কোন মেয়ে টেস্ট করা বাকি আছে?” বলে খ্যাক করে হেসে দিলো।
নিবিড় সিগারেটে একটা লম্বা টান দিলো , তারপর সেটা ফেলে পায়ের সামনের অংশ পিষে বলে উঠলো “হুম আছে। তোর বাড়ির মেয়েগুলা।”

মক্কু আর বদি সহ তার দিকের ছেলেগুলা হইহই করে উঠলো। রাগে গালকাটা মকবুল দাঁড়িয়ে বলে”ক্ষমতায় আছিস ভেবে কি সাপের পাঁচ পা দেখেছিস?
“হয় সাপের কয়েক শত পা ,না হয় একটাও নেই। অবান্তর জিনিস তোরা দেখিস নিবিড় দেখে না।” বলে পকেট থেকে টাকা বের করে দোকানদারের সামনে ফেলে চলে গেলো বাইক স্টার্ট করে।
“ভাই মকবুইল্লার বার কিন্তু বেশি বাড়ছে। ওরে হালকা কইরা একটা ঢলা দেয়া দরকার না?”
বাইক থামিয়ে নিবিড় ঘুরে বলল”মশা মেরে যে আমি হাত নোংরা করি না তুই ভালো করেই জানিস। ”
“ঠিক আছে ভাই বুঝছি। আর বলা লাগবে না।”

বাইকের ব্রেকের সমস্যা হচ্ছে তাই নিবিড় নেমে কয়েকটা লাত্থি দিয়ে বলল”বাস্টার্ড বাইক। ফাক ইউ।” তারপর হনহন করে সামনে হাটা ধরলো। মক্কু সামনে গিয়ে কয়েকবার চেষ্টা করার পর স্টার্ট দিয়ে পেছন পেছন আগালো।নিবিড়ের রাগ হলেই হাঁটা দিবে। বাইকে থাকলে সেটাকে ফেলেই এগিয়ে যাবে। অদ্ভুত এই লোকটার সাথে থাকে বলে ,কতজনে কত কথা বলে। সে যে যায় বলুক সে নিবিড়ের সাথ ছাড়ে না। রাস্তা থেকে তুলে এনে তাকে আশ্রয় থেকে শুরু করে লেখাপড়া সব করিয়েছে। নিবিড় তার জন্য বাবা মা সব। নিবিড় তিনবেলা লাত্থি দিলেও মক্কুকে কেউ সরাতে পারবে না তার কাছ থেকে। আর নিবিড় কি সেটা মক্কু আর সজীব ছাড়া কেউ জানে না। যদিও পারিবারিক যে একটা ঘাপলা আছে সেটা বুঝে। তানাহলে বাবা মা চোদ্দগুষ্টি থাকতে কেউ আলাদা ফ্ল্যাট কিনে একা থাকে? একদম দরকার ছাড়া মুখ দিয়ে কথা বের হয় না। আর কত যে অদ্ভুত আচরণের আছে,সেসবের কথা বাদই দিলো।

নিবিড় নিজের রাগ কমানোর জন্য সবসময় হাঁটাহাঁটি করে। হেঁটেই ক্যাম্পাসে পৌঁছালো। মক্কুও পেছনে এসে বাইক সমেত দাঁড়ালো। সামনে তাকিয়ে দেখলো জিয়ানা আর বদির বোন মৌসুমী কথা বলতে বলতে এগিয়ে আসছে।
হঠাৎ পাশ থেকে কাদা পানি ছিটকে পড়লো জিয়ানার গায়ে। ঘটনা এত দ্রুত ঘটলো জিয়ানা বুঝে উঠতে পারলো না কি হলো। আশেপাশের সবাই হাসাহাসি শুরু করলো। মৌসুমী জিয়ানার সামনে আড়াল করে দাঁড়ালো। কারণ সে সাদা জর্জেট শার্ট পড়েছে। পানিতে সেটা ট্রান্সপারেন্ট হয়ে ভেতরের অন্তর্বাস স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মৌসুমী বলল “তোর ব্যাকপ্যাকটা সামনে ধর। তাহলে সমস্যা হবে না। ”

জিয়ানার সেসবে খেয়াল নেই। সে পাশের ছেলেটার দিকে তাকিয়ে আছে। তারপর সে অবস্থাতেই ঘুরে বলল” আজ তক্কেতক্কে ছিলি না?কখন সুযোগ হবে পানি ছুড়ার?এটা কি ড্রামার সেট? কেউ নায়িকার গায়ে পানি ছিটিয়ে দিবে সে কেঁদে ভাসাবে তারপর নায়ক এসে শার্ট খুলে তার সম্মান বাঁচাবে? আমার সম্মান এত সস্তা না। শরীর নিয়ে না আমি প্রাউড ফিল করি না হেজিটেড। ” আশেপাশের যারা হাসাহাসি আর ফোন বের করে ভিডিও করছিলো জিয়ানা তাদের উদ্দেশ্যে বলল”শার্ট খুলে দিবো? ভালো মতো দেখা যাবে।” বলে শার্টের বোতামে হাত দিয়েছে ওমনি দেখে কেউ একটা জ্যাকেট তার গায়ে পড়িয়ে দিচ্ছে। উপরে তাকিয়ে দেখে রাফিন ইসলাম। রাফিন হাত ধরে বলল “চল জিয়ু। ”
জিয়ানা আর কোন সাড়াশব্দ করলো না।

নিবিড় পুরো ঘটনা দাঁড়িয়ে দেখে পানি নিক্ষেপকারীর দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল”কে? ”
ছেলেটা আমতা-আমতা করে বলল”মানে?”
“যেটা জিজ্ঞেস করেছি সোজা উত্তর না বাঁকা আঙুল?”
“ভাই আমার কোন দোষ নাই। আপনাদের লোকই নির্দেশ দিছে। ”
নিবিড়ের ভ্রু কুচকে গেলো “আমাদের মানে? ”
“সমুদ্র ভাই।” বলে কেটে পড়লো ছেলেটা।
নিবিড় মক্কুর দিকে জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে তাকালো। মক্কু বলল”ভাই সমুদ্র ভাই তামান্নার সাথে রিলেশনে আছে। কয়েকদিন আগে তার ফোনে তামান্নার ছবি সহ কন্টাক্ট নাম্বার থেকে কল আসলে আমার সন্দেহ হয়। একটু খোঁজ নিয়ে দেখি কমনরুমের চিপাই দুইজন চুম্মাচুম্মি করতাছে। বলে কান ধরে ফেললো।
“ঠিক এইজন্য বদিকে বলেছিলাম বোন বিয়ে দেয়ার আগে দশবার ভাবিস।কাপড় পোড়লে বদলানো যায় কিন্তু কপাল পুড়লে… ” থেমে আবার জিজ্ঞেস করলো

“আর এই জিয়ানা মেয়েটার কি খবর?
“ভাই আমি ঠিক বলতে পারবো না কি খবর। যাদেরকে ওর পেছনে লাগিয়ে ছিলাম ,কাল তারা আমার কাছে মাফ চেয়েছে। বলেছে অন্য কাজ দিতে। এই মেয়ের মাথা খারাপ। ”
“খুলে বল।” ক্লাবের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলল নিবিড়।
“দুইজন এর পেছন পেছন ক্যাম্পাস থেকে বের হয়েছিলো। কিন্তু মাঝপথে যেয়ে নাকি মাইয়া অদৃশ্য হয়ে যায়।তার ঠিক পাঁচ মিনিট পর তাদের দুইজনের পেছনে দাঁড়িয়ে ভাউ করে ভয় দেখাইছে। এইভাবে কয়েকবার করছে। সেই দুইজনকে নিয়ে মার্কেটের আশেপাশের এলাকা থেকে প্লাস্টিকের বোতল টোকাইছে। সেখান থেকে বস্তিতে গিয়ে একগাদা টোকাই পোলাপানের সাথে পিকনিক করছে। লাগে ওরাধুরা গানের সাথে টানা চল্লিশ মিনিট নাচাইছে। আমার পাঠানো দুই পোলারে বগলদাবা করে নিয়েই সারাদিন টইটই করে ঘুরছে। দিনশেষে তাদেরকে একশো করে টাকা দিছে পারিশ্রমিক হিসেবে। আর ফোন নাম্বার নিয়ে রাখছে কাল আবার বোতল টোকাবে। সমস্যা এখানেও না। পোলা দুইটার আত্মীয় নাকি দেখে ফেলছে তারা বোতল টোকাইতাছে। ”

নিবিড় জিজ্ঞেস করলো “আর কিছু জানছিস? মানে কাদের সাথে মিশে বা পরিবারের সম্পর্কে? ”
“বয়স্ক দারোয়ান ,পিয়ন কিংবা বাচ্চাদের সাথে আগ বাড়িয়ে কথা বলে। আর সবাইকে এভয়েড করে চলে। পরিবারের মা মহিলা কলেজের শিক্ষিকা ,জেনিকে তো চিনেন বড় বোন আর বড় ভাই চাকরি করে। সবাই নরমাল।খালি বাপ শালা আর এই মাইয়াই এবনরমাল। ভোরের আলো ফোটার আগেই নাকি বাপ বেটি রাস্তায় নেমে দৌঁড়ানো শুরু করে। এইটুকুই জানছি ভাই। ”
নিবিড় বিছানায় শুয়ে পড়ে আঙুল দিয়ে চলে যেতে বলল।
সিগারেট হাতে নিয়ে নিবিড় আওড়ালো

“শুভ্রবাসান দেহ তার,
করে মানুষের অপকার।
চিতায় তারে পুড়িয়া মারে,
তবু সে উহ আহ না করে (কালিদাস)”
“চোখজোড়া যে বডড পরিচিত তোমার। তবু কেনো চিনি না? ”

নিকটস্ত একটা রেস্টুরেন্টে এসে রাফিন জিয়ানাকে বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসতে বলল।জিয়ানা বাথরুমে ঢুকে পড়ে আর রাফিন একটু সাইডের একটা টেবিলে বসে টুকটাক খাবার অর্ডার করলো। মিনিট দশেকের পর জিয়ানা বের হয়ে এলো। মাস্ক ক্যাপ সবকিছু কাদায় মাখামাখি। তাই সব খুলে ব্যাগে রেখেছে। চুলেও লেগেছে কিন্তু সেটা তো আর খোলা যাবে না। তাই পানি দিয়ে কোনরকম ময়লা সরিয়ে এসে বসলো। রাফিন একপলক দেখে মাথা নিচু করে ফেলে মুচকি হাসি দিলো। জিয়ানা খেয়াল করলো উনার হাসি কিন্তু বিশেষ পাত্তা দিলো না। হয়তো অদ্ভুত লাগছে দেখতে তাই হাসছে। হাত তুলে ওয়েটারকে ডাক দিলো”ওই মাম্মা?”
রাফিন ঝুঁকে বলল”আস্তে লেডি আস্তে। আমি অর্ডার দিয়েছি অলরেডি। তোমার পছন্দের স্ন্যাকস সব। ”
জিয়ানা ভ্রু কুচকে বলল”স্যার আমার পছন্দ যে এখন অনেক চেঞ্জ হয়ে গেছে।সুগার আর ওয়েল ফ্রি খাবার এখন পছন্দ। ”

“আর মানুষের ক্ষেত্রেও কি পছন্দ চঞ্জ হয়ে গেছে? ”
জিয়ানা মুচকি হাসলো রাফিনের ইংগিতময় কথা শুনে। শার্টের কলার কাধ থেকে দুই হাত দিয়ে উঁচু করে ধরে আছে। ভেজার কারনে শরীরে যে অস্বস্তি হচ্ছে সেটা থেকে বাঁচতে এমন করে রেখেছে।
“তখনকার টমবয় এখনো টমবয়ই আছে স্যার।”
“রিলেশনে আছো?”
“হুম ”

“কে সে যদি বলা যায় আর কি?” কিছুটা হতাশ দেখালো রাফিনকে।
“রিলেশন তো একটা না স্যার। আচ্ছা ফাস্ট থেকে বলি রিলেশন উইথ ফ্যামিলি মেম্বার ,রিলেশন উইথ বুইড়া বেটাস এন্ড অলসো রিসেন্টলি উইথ সাম বাচ্চাস। ”
রাফিনের চেহারায় হঠাৎ আলো খেলে গেলো মনে হলো। নিজের হাত বাড়িয়ে জিয়ানার হাত ধরে বলল”সেদিনের জন্য সরি জিয়ু। তোমার বয়স অল্প ছিলো।ওই বয়সে সবাই একটা ফ্যান্টাসিতে ভুগে। তোমাকে হার্ডলি না বললে তুমি লেখা পড়ায় খারাপ হয়ে যেতে। ”

“স্যার আমি জানি আপনার তখন রিলেশন ছিলো। অত সেন্টি জিয়ানা খায় না।আর সত্যি ফ্যান্টাসি ছিলো। আপনি প্রথম আমার সাথে গার্লি ট্রিট করেছে। দ্যাট হোয়াই আই ওয়াজ রং পাথ। তো মনে হচ্ছে সানজানা আপুর সাথে আপনার ব্রেকাপ হয়ে গেছে? আপু তো বিয়ে করে বাচ্চা ফুটিয়ে ফেলেছে আপনি এত পিছিয়ে কেনো?”
“সানজানাকে তুমি চেনো?অবশ্য অস্বাভাবিক না তোমার ডিপার্টমেন্টের সে। আর ব্রেকাপ আমার পক্ষ থেকেই হয়েছে। আমার নিজের মন বসছিলো না। মন অন্য কোথাও ছিলো সেটা বুঝতে অনেকটা দেরি করে ফেলেছি। ক্যান আই টাচ ইউর নোস জিয়ু?”

জিয়ানা একটা দেয়াল ফাটা হাসি দিলো। আশেপাশের কয়েকজন হঠাৎ উচ্চহাঁসির শব্দে ঘুরে দেখলো। রাফিন একটু ইতস্তত করে আবার বলল “আস্তে আস্তে ”
“স্যার আমাকে তো দেখছেন কেমন আমি। আমার মতো মেয়ে মনে হয় বিয়ে বাচ্চা সংসার আচ্ছা সব বাদ দিলাম ন্যাকা মেয়েদের মতো প্রেম-ফ্রেম করতে পারবে? আমার ওইসব ধাচে নেই। তবে অস্বীকার করছি না। আপনি এখনো আমার ক্রাশ। প্রথমদিন ক্যাম্পাসে আপনাকে দেখে লাভ-ডাব বিট বেশি হয়েছিলো সত্যি ,তবে আপনার পরিচয় পাওয়ার পর সব ফুশশশস…..”

ওয়েটার খাবার আনলো তখন। সত্যি সব স্ন্যাকস জিয়ানার পছন্দ। ক্যাশুনাট সালাদ উইথ এক্সট্রা চিজ , ওয়েফার আইস্ক্রিম ,মিন্ট লেমেনডা ,বাটার সাসলিক। মুচকি হেসে জিয়ানা বলল”আম ইমপ্রেসড স্যার। এতদিন পরেও সব মনে রেখেছেন। ” বলে একটা সাসলিকের স্টিক নিয়ে খাওয়া শুরু করলো। ইশারায় রাফিনকে খেতে বলল।রাফিন জিয়ানার খাওয়া দেখছে। হঠাৎ বলে উঠলো
“ক্যাম্পাসে কখনো মাস্ক খুলবে না জিয়ু।তাহলে আমার খুব সাংঘাতিক ক্ষতি হয়ে যাবে। আর আমার পরিচয় পেয়ে কিসের কি বুঝলাম না খুলে বল।”
জিয়ানা মুচকি হেসে বলল”স্যার আপনাকে চিন্তে কষ্ট হচ্ছে। আপনার পছন্দ কিন্তু একেবারে আমার সাথে যায় না। আপনার লম্বা চুল পছন্দ ,সরু নাক ওয়ালা শ্যামা মেয়ে আর শর্ট মেয়ে পছন্দ যে আপনার বুক পর্যন্ত হবে। এগুলা ক্যাম্পাসের সবাই জানে। আপনি আর সানজানা আপু ক্যাম্পাসের আইডল কাপল ছিলেন। ও হ্যাঁ মাস্ক কাল থেকে আর পড়বোই না। আমার আবার সাংঘাতিক ঘটনা দেখতে ভালো লাগে। ” বলে বড় বড় বাইটে সবগুলো সাসলিক খেয়ে লেমেন্ডা শেষ করলো।

তারপর আবার বলল”আপনার বাবা স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান । যদিও উনার রেপুটেশন খুব ভালো এলাকায়। জনদরদী নেতা। কিন্তু আমার রাজনৈতিক পাবলিকে এলার্জি।আমাদের আলমারিতে অনেকরকম পোশাক থাকে আর রাজনৈতিক ব্যক্তিদের থাকে অনেক রকম চরিত্র।মানুষ ভেদে কাপড়ের মত চরিত্র বদলায়। কথাটা কি ভুল বললাম?”
“না ভুল বলো নি। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এইটাই স্বাভাবিক তবে আমার বাবা অন্যরকম। উনি এই পর্যন্ত অনেক ত্যাগ তিতিক্ষার বিনিময়ে এসেছেন। তুমি হইতো জানো আমার পরিবারের প্রায় সবাই খুন হয়েছে সাথে আমার বাবার একটা হাতও গেছে। উনি মানুষের কষ্ট বুঝেন। ”
“আচ্ছা আমার সমস্যা সাইডে রাখলাম।ধরলাম আমাদের কিছু হলো আপনার ফ্যামিলি আমাকে দেখে বেহেড হয়ে যাবে নাতো?”

এই পর্যায়ে হোঁ হোঁ করে হেসে দিলো রাফিন”তোমার ফেইক আইডিটা কিন্তু আমি চিনে ফেলেছি জিয়ু। ওমন সাজে গেলেই কেউ আর বেহেড হবে না। ”
জিয়ানার মুখ চুপসে গেলো যাহ ধরা খেয়ে গেছে পুরা।
“তাহলে অফার এখনো আছে?”

জিয়ানার এই প্রথম নার্ভাস লাগছে। যাহ এমন সিচুয়েশনেও পড়তে হলো লাইফে। ফট করে চোখ কুচকে নিজেকে আড়ালের চেষ্টা করলো। রাফিনের হাসি এতে আরও বেড়ে গেলো।
“বাঘ যখন হরিণকে তাড়া করতে করতে একসময় দুইজনই ক্লান্ত হয়ে যায় ,তখন হরীণ চিকন একটা গাছের আড়ালে নিজের চোখ আড়াল করে রাখে। কারণটা হলো সে যেহেতু দেখছে না তাই ভাবে তাকেও কেউ দেখছে না। এখন আমার মনে হচ্ছে তোমার অবস্থাও একই। ” বলে জিয়ানার নাকটা টেনে দিলো।

নীতিহীন রাজ পর্ব ৪

অপোজিট টেবিল থেকে উঠে গেলো এক ছেলে। ফোনে বলল”ভাই রাফিন ভাই এই মাইয়ার পূর্ব পরিচিত আর তাদের মাঝে গভীর কিছু চলে। না মানে শুরু হয়তে যাইতাছে আর কি।”
নিবিড় ফোন টেবিলে রেখে চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে বলল”সো লেটস স্টার্ট দ্যা গেম।”

নীতিহীন রাজ পর্ব ৬