নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৫৯
নাজনীন নেছা নাবিলা
এদিকে ওয়াশরুমে ঢুকেই মিহাল যখন নীলাকে শাওয়ারের নিচে নামিয়ে বসাল, তখন নীলা মিহালের চওড়া কাঁধে দুই হাত রাখল। মিহালের চোখের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় বলল,
“পুরো শরীরে কাদা-মাটি লেগে ভূত হয়ে আছেন। আগে ভালো করে গোসল করে পরিষ্কার হোন, খচ্চর লোক কোথাকার।”
ব্যস, এই একটা বাক্যেই মিহালের মনের কোণে জমে থাকা সবটুকু রোমান্স যেন কর্পূরের মতো এক তুড়িতে উড়ে গেল। সে মনের ভেতর কত কী রঙিন স্বপ্ন বুনেছিল, অথচ নীলা তার সেই গভীর ভাবনার বারোটা বাজিয়ে একদম ধুলোয় মিশিয়ে দিল। সে চরম বিরক্ত হয়ে মুখটা কুঁচকে বলল,
“ধ্যাত! আমি ভেবেছিলাম আজ দুজনে মিলে এই চমৎকার শাওয়ারের নিচে জমিয়ে রোমান্স করব। আর তুমি সব মাটি করে দিলে?”
নীলা মিহালের এমন কাঁচুমাচু মুখ দেখে খিলখিল করে হাসতে হাসতে বলল,
“আপনার রোমান্স করার এত শখ হলে একা একাই করেন।”
এই বলেই সে ঝটপট ঘুরে ওয়াশরুমের দরজার দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু দরজা খুলে বের হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে তার মনে যেন কী এক মায়ার উদয় হলো। সে আবার চট করে মিহালের কাছাকাছি ফিরে এলো, পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে উঁচিয়ে উঠে মিহালের গালে বেশ শব্দ করে একটা ভালোবাসার চুমু এঁকে দিল। তারপর আর এক সেকেন্ডও না দাঁড়িয়ে দ্রুত পায়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে চলে গেল। মিহাল তো নীলার এই আকস্মিক চুম্বনে এক্কেবারে সাত রাজার ধন পাওয়ার মতো খুশি হয়ে গেল। তার ভেতরের সব বিরক্তি মুহূর্তেই উধাও। সে পরম তৃপ্তিতে শাওয়ার অন করে দিল। পানির ঠাণ্ডা ফোঁটাগুলো গায়ের ওপর পড়তেই সে খুশিতে ওখানেই পানির নিচে একা একা নাচতে শুরু করল।
সময় যে কীভাবে ডানা মেলে উড়ে গেল, তা বাড়ির কেউ টেরও পেল না। এই যেমন আজ দুপুরে যখন মিহালদের বাড়িতে নীলা, ইকরা আর মুনভির পরিবার এসে পৌঁছাল, তখন চারদিকে কেবল হইচই। আর দেখতে দেখতে সবার সাথে গল্প আর নানামুখী আড্ডায় মেতে উঠতেই ঘড়ির কাঁটা রাত বারোটা ছুঁয়ে ফেলল। পুরোটা সময় এই আনন্দের আমেজে কেবল একজনই অনুপস্থিত ছিল ইরফান। সে নিজের ঘরের কোণেই মুখ লুকিয়ে রেখেছিল। এখন রাত গভীর হওয়ায় সবার ঘুমানোর পালা। মিহালদের পুরো বাড়িতে দোতলায় তিনটি এবং নিচতলায় তিনটি বড় শয়নকক্ষ রয়েছে, আর ছাদে আছে একটি ছোট রুম। সবার সুবিধার কথা চিন্তা করে ঘরগুলো ভাগ করে দেওয়া হলো। নিচতলার একটি রুমে একা থাকবে ইকরা। অন্য দুটি রুমের একটিতে মিনা মির্জা ও উনার স্বামী, আর বাকি রুমটিতে নীলার বাবা নিলয় মির্জা ও উনার স্ত্রী থাকার জন্য চলে গেলেন। দোতলার আগের মতোন নীলা আর মিহাল তাদের রুমে থাকবে। অন্য দুটি রুমের একটিতে ইমরান মির্জা ও উনার স্ত্রী এবং শেষ রুমটিতে জায়গা হলো ইরফান আর আরশির। আর ছাদের সেই ছোট্ট, চমৎকার রুমটি ছেড়ে দেওয়া হলো বাড়ির আবির আর ইবাদের জন্য। বাকি রইলেন আকাশ মির্জা ও উনার স্ত্রী এবং ইকরার মা-বাবা। তাঁরা রাতের বেলা মুনভিদের সাথে তাদের বড় বাড়িতে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। পরিকল্পনা হলো, রাতটা সেখানে কাটিয়ে আগামীকাল সাতসকালে তাঁরা আবার এখানে ফিরে আসবেন। কারণ, আগামীকাল সবাই মিলে একসাথে পুরো প্যারিস শহর ঘুরে বেড়াবে।
পরিকল্পনা মাফিক সবাই যার যার জন্য বরাদ্দ করা রুমের দিকে পা বাড়াল। নীলা আর মিহাল দায়িত্ব নিয়ে আবির আর ইবাদকে সাথে করে ছাদে নিয়ে গেল এবং তাদের রুমটা গুছিয়ে দেখিয়ে দিল। দুই ভাইকে শুভরাত্রি জানিয়ে তারা যেই না ছাদ থেকে নিচে নেমে আসার জন্য ঘুরবে, ঠিক তখনই সিঁড়ি বেয়ে আরশি ছাদে এসে হাজির হলো। মাঝরাতে চাঁদের আলোয় আচমকা আরশিকে এভাবে সামনে এসে দাঁড়াতে দেখে নীলা এবং মিহাল দুজনেই নিজেদের গুটিয়ে নিল এবং তাদের হাঁটার গতি থামিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
আরশি অত্যন্ত অপরাধী চোখে নীলার দিকে তাকাল। তার কণ্ঠস্বরে তখন এক বুক আকুলতা আর অনুরোধের সুর,
“নীলা, তোর সাথে কিছু কথা ছিল।”
আরশির মুখ থেকে এই আকস্মিক অনুরোধ শুনে মিহাল সাথে সাথে তীক্ষ্ণ নজরে নীলার দিকে তাকাল। মিহাল খুব ভালো করেই জানে, অতীতে এই আরশির ধোঁকা আর বিশ্বাসঘাতকতার কারণে নীলার সরল মনটা ঠিক কতটা ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল। সে কোনোভাবেই চায় না অতীতের কোনো কালো ছায়া এসে তার নীলাঞ্জনাকে আবার নতুন করে আঘাত করুক। মিহাল আগ বাড়িয়ে আরশিকে কড়া কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই নীলা তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“ঠিক আছে, বলো।”
তারপর নীলা যখন মিহালের চোখের দিকে তাকাল, মিহাল তার চোখের সেই শান্ত ভাব দেখে আর দ্বিমত করল না। সে মৃদু মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। নীলা ধীরপায়ে ছাদের এক কোণে থাকা বসার জায়গাটার দিকে এগিয়ে গেল। আরশিও বাধ্য মেয়ের মতো তার পেছন পেছন হেঁটে এলো। অন্যদিকে, মিহাল পুরো পরিস্থিতির ওপর নজর রাখতে ছাদের দরজার সাথে শরীর ঠেকিয়ে হাত ভাজ করে দাঁড়িয়ে রইল। আরশি কিছুটা সময় চুপ করে রইল, যেন কথাগুলো গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তারপর নীলার চোখের দিকে তাকিয়ে একদম নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কেমন আছিস নীলা?”
নীলা এতটুকুও বিচলিত হলো না। সে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তৃপ্তির মায়াবী হাসি ফুটিয়ে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে জবাব দিল,
“আলহামদুলিল্লাহ, আগে যে অবস্থায় ছিলাম,তার থেকে এখন শত গুণে ভালো আছি।”
আরশি নিজের ভেতরের হাহাকারটুকু চেপে একটি আলতো, মলিন হাসি হাসল। তারপর বলল,
“যাক, শুনে সত্যিই খুব খুশি হলাম। তা, আমাকে একবারও জিজ্ঞেস করবি না যে আমি কেমন আছি?”
নীলা একদম নির্লিপ্ত ও উদাসীন ভঙ্গিতে জবাব দিল,
“তুই তো তোর নিজের পছন্দের, নিজের ভালোবাসার মানুষকেই বিয়ে করেছিস। তার মানে স্বাভাবিকভাবেই তুইও বড্ড সুখে আছিস।”
নীলার এই চাঁছাছোলা কথাটি শুনে আরশির ঠোঁটের কোণে এক তীব্র তাচ্ছিল্য আর আত্মগ্লানির হাসি ফুটে উঠল। সে আকাশের চাঁদের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত ভারী গলায় বলল,
“অন্যের সুখ এভাবে কেড়ে নিয়ে, কাউকে ধোঁকা দিয়ে আসলে নিজে কখনো সুখী হওয়া যায় না রে নীলা। আমি সুখে নেই।”
আরশির মুখ থেকে এমন অকপট স্বীকারোক্তি শুনে নীলা মনে মনে কিছুটা চমকে গেল। ক্ষণিকের জন্য সে স্তব্ধ হয়ে থমকে দাঁড়াল। অতীতের সব ভাঙা স্বপ্নের কথা মনে পড়তে তার বুক চিরে একটি তপ্ত দীর্ঘনিশ্বাস বেরিয়ে এলো। সে বুঝতে পারছে না আরশি আদৌও কি শুধরে গিয়েছে, নিজের কৃতকর্মের জন্য কি আফসোস করছে নাকি এগুলো নাটক। সে নিজেকে সামলে নিয়ে অত্যন্ত শান্ত গলায় বলল,
“একটা কথা মনে রাখিস আরশি, পাপ কখনো বাপকেও ছাড়ে না। প্রকৃতির নিয়ম এটাই, যে যেমন বীজ বুনেছে সে তেমনই ফল কাটবে। কিন্তু এই পুরো পরিধির মাঝে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো নিজের ভুলটাকে সময় থাকতে বুঝতে পারা। কিছু কিছু ভুল জীবনে এমন থাকে, যেগুলো হাজার চেষ্টা করলেও আর কখনো সংশোধন করা যায় না, বা অতীতে ফিরে গিয়ে মুছে ফেলা যায় না। কিন্তু সেই ভুলগুলো অন্তত নিজের বিবেকের কাছে অনুধাবন করতে পেরে, নিজেকে ভেতর থেকে শুধরে নেওয়াটাই আসল ব্যাপার।”
নিজের ভেতরের সবটুকু পরিপক্বতা দিয়ে এই গভীর কথাগুলো বলে নীলা আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। সে ধীরপায়ে মিহালের দিকে এগিয়ে চলে এলো। তার এই প্রতিটি শব্দ ছিল আরশির জীবনের চরম ভুলের জন্য এক নীরব, অমূল্য উপদেশ। আরশি সেই চাঁদের আলোয় ছাদের এক কোণে একা দাঁড়িয়ে রইল, আর তার চোখ বেয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। এবং মনে মনে সে কিছু ভাবতে লাগলো।
নীলা মিহালের কাছাকাছি আসতেই মিহাল অত্যন্ত যত্ন নিয়ে তার মুখের দিকে তাকাল। এবং মৃদু কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“ঠিক আছো তো, নীলাঞ্জনা?”
নীলা ক্ষণিকের জন্য মিহালের সেই অতন্দ্র প্রহরীর মতো চাউনি দেখল। তারপর মনের সমস্ত মেঘ সরিয়ে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মায়াবী মুচকি হাসি ফুটিয়ে তুলল। সে আলতো করে মিহালের শক্ত হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় পুরে নিয়ে পরম নির্ভরতায় বলল,
“আপনি আছেন না আমার সাথে? তাহলে আমার খারাপ থাকার তো কোনো সুযোগই নেই।”
নীলার মুখে এমন অকপট আর ভালোবাসায় জড়ানো স্বীকারোক্তি শুনে মিহালের মনের সব শঙ্কা কেটে গেল। সে মায়াময় একটা হাসি দিল। তারপর নিজের এক হাত নীলার কাঁধে জড়িয়ে, তাকে একদম নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে ধীরপায়ে ছাদ থেকে নিচে নিজেদের ঘরের দিকে নেমে এলো। আজকের রাতটাও নীলার কাটল মিহালের চওড়া বুকের চেনা উষ্ণতায়। কিন্তু অতীতের রাতগুলোর সাথে এই রাতের তফাত ছিল আকাশ-পাতাল। আগে নীলা ঘুমিয়ে পড়ার পর মিহাল তাকে টেনে নিজের বুকের কাছে নিয়ে আসত। আর আজ সব বাধা পেরিয়ে, সমস্ত অধিকার নিয়ে নীলা নিজ ইচ্ছায় মিহালের বুকে এসে মাথা গুঁজে দিল।
রাতের সব ক্লান্তি আর গুমোট ভাব কাটিয়ে পুরো পরিবার সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে একদম তৈরি হয়ে নিল। এরপর শুরু হলো তাদের বহুল প্রতীক্ষিত প্যারিস দর্শন। আইফেল টাওয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে পুরো পরিবার একসাথে ফ্রেমবন্দি হচ্ছিল, সবার মুখে ছিল অনাবিল তৃপ্তির হাসি। আইফেল টাওয়ারের চত্বর থেকে শুরু করে প্যারিসের নান্দনিক রাস্তাঘাট, ঐতিহাসিক স্থাপত্য আর লুভর মিউজিয়ামের আশেপাশের কয়েকটি মনোরম এলাকা তারা সারাদিন ধরে মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াল। আবির আর ইবাদের খুনসুটি, ইকরা আর মুনভির অবিরাম ছবি তোলার ধুম, আর বড়দের মধ্যকার পুরনো দিনের গল্প সব মিলিয়ে চারপাশটা এক উৎসবমুখর আমেজে মেতে রইল। এর মাঝেও মিহাল আর নীলা বারবার একে অপরের চোখের ভাষায় হারিয়ে যাচ্ছিল। দুপুরে এবং রাতে সবাই মিলে প্যারিসের বিখ্যাত সব রেস্তোরাঁয় বসে খাওয়া-দাওয়া সারল। সারাদিনের এই আনন্দঘন ও ক্লান্তিকর ঘোরাঘুরি শেষে যখন তারা রাতে বাড়ি ফিরল, তখন সবার শরীর অবসাদে ভেঙে পড়ছিল। কোনো রকম বাড়তি ঝামেলা ছাড়াই, এক বুক সুখের স্মৃতি নিয়ে যে যার মতো নিজের ঘরে চলে গেল এবং দ্রুতই গভীর ঘুমে তলিয়ে পড়ল।
পরের দিন সকালে ঘুম ভাঙতেই ইকরা অলসতা কাটিয়ে ঝটপট ফ্রেশ হয়ে নিল। ঘরের ভেতরের কাজ সেরে সে যেই না নিজের রুমের দরজাটা খুলে বাইরে বের হতে গেল, অমনি তার পা দুটো থমকে দাঁড়াল। দরজার ঠিক সামনে মেঝেতে একটা সুন্দর শপিং ব্যাগ রাখা। ইকরা কিছুটা অবাক হয়ে ব্যাগটা হাতে তুলে নিল এবং কৌতূহল সামলাতে না পেরে ভেতরে উঁকি দিল। ব্যাগের ভেতর একটা সুদৃশ্য গিফট বক্স আর তার সাথে ছোট্ট একটা চিরকুট ভাঁজ করে রাখা আছে। ব্যাগটা নিয়ে সে দ্রুত নিজের রুমের ভেতর চলে এলো। বিছানায় বসে ধকধক করতে থাকা বুকে চিরকুটটা মেলল এবং পড়তে শুরু করল,
“গোলাপি শাড়িতে আমি আমার কটন ক্যান্ডিকে দেখতে চাই।
ইতি— তোমার জেন্টলম্যান।”
চিরকুটের লেখাটা চোখের সামনে ভাসতেই ইকরার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে লাজুক হাসি ফুটে উঠল। মনের ভেতর এক অন্যরকম ভালোলাগার দোলা লাগতেই সে আর এক মুহূর্তও দেরি না করে দ্রুত শাওয়ার নিতে চলে গেল।
অন্যদিকে, আজ নীলার ঘুম ভাঙতে অন্যান্য দিনের চেয়ে একটু বেশিই দেরি হয়ে গেল। চোখ মেলতেই জানালার ফাঁক গলে আসা সোনালী রোদের আলো তার চোখেমুখে এসে পড়ল। সে হাত বাড়িয়ে নিজের পাশে মিহালকে খুঁজতে গেল, কিন্তু বিছানার অংশটা তখন খালি। তবে মিহালের জায়গায় সেখানে রাখা ছিল একটা আকর্ষণীয় শপিং ব্যাগ। নীলা ঘুমু ঘুমু চোখে ভালো করে চোখ দুটো ডলে ব্যাগটা হাতে তুলে নিল। ব্যাগের ভেতর থেকে একটা চমৎকার গিফট বক্স আর তার সাথে যত্নে গোঁজা একটা চিরকুট বের করল। চিরকুটটা খুলতেই মিহালের চেনা হাতের অক্ষরে লেখা দেখতে পেল
“আমার নীলাঞ্জনাকে আমি আজ নীল শাড়িতে দেখতে চাই। আশা করি নীলাঞ্জনা তার প্যারেলালের এই ছোট্ট আর্জি কবুল করবে।”
মিহালের এমন কাব্যিক আর ভালোবাসামাখা আবদার পড়ে নীলা মুচকি হাসল। সে পরম আগ্রহে গিফট বক্সটা খুলতেই তার চোখ জুড়িয়ে গেল ভেতরে ভাঁজ করা রয়েছে অপূর্ব এক নীল রঙের শাড়ি। আর অলস বসে থাকার কোনো মানে হয় না ভেবে নীলা ঝটপট বিছানা ছেড়ে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াল। ওয়াশরুমে গিয়ে শাওয়ারের ঠাণ্ডা পানিতে নিজেকে সিক্ত করে, ভেজা শরীরটা মুছে সে ব্লাউজ আর সায়া পরে বাইরে বের হয়ে এলো। শাড়িটা সে ঘরের ভেতর আয়নার সামনে দাঁড়িয়েই নিপুণ হাতে পরবে। ঠিক তখনই খট করে ঘরের দরজাটা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল মিহাল। সকাল সকাল নিজের ঘরের ভেতর নীলাকে এমন অর্ধনগ্ন, মায়াবী ও মোহনীয় রূপে দেখে মিহালের চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে গেল। তার মাথার সমস্ত হুঁশ যেন এক পলকে উড়ে গেল। মিহাল আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে ধীর অথচ দৃঢ় পায়ে পেছন থেকে এগিয়ে এসে নীলার সেই উন্মুক্ত, মসৃণ পেটের ওপর নিজের তপ্ত হাতের আঙুলগুলো স্লাইড করে আলতো করে বসাল। এক টানে নীলাকে একদম নিজের শক্ত বুকের সাথে লেপ্টে নিল। নীলাও আজ কোনো রকম লুকোচুরি বা নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করল না। পরম নির্ভরতায় স্বামীর বুকে পিঠ ঠেকিয়ে চোখ দুটো বুজে ফেলল। মিহাল নীলার কাঁধের ওপর চিবুক রাখল। নীলার পিঠ বেয়ে নেমে যাওয়া ভেজা চুলের তীব্র চেনা ঘ্রাণ বুকভরে টেনে নিয়ে এক মাতাল ও ফিসফিসানি কণ্ঠে বলল,
“আজ আমার বড্ড ইচ্ছে করছে তোমাকে এই নীল শাড়িটা নিজের হাতে পরিয়ে দিতে, নীলাঞ্জনা।”
নীলা চোখের কোণে এক চিলতে দুষ্টুমি মেখে, ঠোঁট কামড়ে মজার ছলে বলল,
“তা জনাব, আপনি কি আদৌ মেয়েদের শাড়ি পরাতে পারেন?”
মিহাল নীলার সেই ভেজা চুলের আড়াল থেকে উন্মুক্ত হয়ে থাকা ফর্সা ঘাড়ে নিজের ঠোঁট জোড়া ডুবিয়ে দিল। গভীর এক উষ্ণ চুমু এঁকে দিয়ে অত্যন্ত গাঢ় ও চতুর কণ্ঠে বলল,
“আমি শাড়ি সুন্দর করে পরিয়ে দিতে পারি না ঠিকই, কিন্তু খুব নিখুঁতভাবে তা শরীর থেকে খুলতে তো পারব।”
নীলা লজ্জায় রাঙা হয়ে মিহালের বুকের ওপর আলতো ধাক্কা দিয়ে নিজেকে ছাড়াতে ছাড়াতে বলল,
“না ভাই, আপনার এমন বিপজ্জনক সাহায্যের কোনো প্রয়োজন আমার নেই। শাড়ি পরার জন্যও না, আর শাড়ি খোলার জন্যও না। এখন দয়া করে একটু দূরত্ব বজায় রাখুন তো। আর আজ হঠাৎ শাড়ি পরার এই রাজকীয় হুকুম কেন, শুনি?”
মিহাল ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে তুলল। বলল,
“সেটা একটা বড় সারপ্রাইজ, নীলাঞ্জনা। সময় হলেই দেখতে পাবে।”।
নীলা কৃত্রিম রাগে ভ্রু কুঁচকে মিহালের দিকে তাকাল, তারপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের শাড়ি কুচি ঠিক করতে লাগল। মিহাল নীলার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে তার শাড়ির কুচি ঠিক করে দিল এবং আর তাকে বিরক্ত না করে নীলার নরম গালে চট করে একটা বিদায়ী চুমু খেল। তারপর বলল,
“তুমি সুন্দর করে তৈরি হয়ে নিচে যাও। আমি ঝটপট একটা শাওয়ার নিয়ে আসছি।”
এই বলেই মিহাল গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। নীলা পরম যত্নে নীল রঙের শাড়িটি পরল। শাড়ির সাথে ম্যাচিং করে মাথায় একটি সুন্দর হিজাব বাঁধল। আয়নায় নিজেকে একবার দেখে নিয়ে চোখে হালকা করে কালো কাজল টানল, আর ঠোঁটে ছুঁইয়ে নিল সামান্য লিপগ্লস। ব্যস, তাতেই যেন রূপের এক নতুন দ্যুতি ছড়াল। সাজগোজ শেষ করে সে ঘর থেকে বের হয়ে ধীরপায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো। ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই নীলা দেখল পুরো পরিবারের সবাই সেখানে জমকালোভাবে উপস্থিত। সবচেয়ে বড় চমক ছিল ইকরা। সেও একটা মিষ্টি গোলাপি রঙের শাড়ি পরে এক কোণে লাজুক মুখে দাঁড়িয়ে আছে। নীলাকে নিচে নামতে দেখেই বাড়ির বড়রা একযোগে তার রূপের প্রশংসা শুরু করে দিলেন। মায়াবী নীল শাড়িতে তাকে যেন নীলপরীর মতো লাগছিল। নীলা খেয়াল করল, ইকরার গোলাপি শাড়ির সাথে মিলিয়ে মুনভিও একই রঙের কাপড় পরে দাঁড়িয়ে আছে। দুই বন্ধুর এই যুগলবন্দি দেখে নীলার মনে মনে একটা ধারণা হলো তার স্বামীও নিশ্চয়ই তার সাথে রঙ মিলিয়ে কিছু একটা পরে আসবে।
ঠিক তখনই দোতলার সিঁড়ি বেয়ে রাজকীয় ভঙ্গিতে নিচে নামতে লাগল মিহাল। তার পরনে ছিল একটি রুপালি রঙের ফরমাল প্যান্ট, সাধারণ শার্ট আর তার ওপর চাপানো একটি নিখুঁত নীল রঙের ব্লেজার। নীলার নীল শাড়ির সাথে মিহালের নীল ব্লেজার একদম পারফেক্ট ম্যাচিং হয়ে গেল। ঘরের চারজন তরুণ-তরুণীর অর্থাৎ ইকরা-মুনভি এবং নীলা-মিহালের এই চমৎকার ম্যাচিং করা পোশাক আর তাদের রূপের ছটা দেখে উপস্থিত সবাই প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠলেন। কিন্তু পুরো ড্রয়িংরুমের এই আনন্দঘন পরিবেশ আর সবার মুখে মিহাল-নীলার এমন জয়জয়কার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইরফানের পক্ষে আর সহ্য করা সম্ভব হলো না। ঈর্ষা আর অপমানের এক তীব্র আগুন তার ভেতরটা আবার পুড়িয়ে খাক করে দিতে লাগল। সে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে সবার এই সুখানুভূতি দেখতে চাইল না। নিজের মুখটা কুঁচকে, হাত দিয়ে পেট চেপে ধরে ‘হঠাৎ ভীষণ পেট ব্যথা করছে’ এমন এক কাঁচা বাহানা দাঁড় করাল। তারপর সবার সামনে থেকেই গজগজ করতে করতে হনহনিয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
মিনা মির্জা ডাইনিং টেবিল থেকে একটু এগিয়ে এসে সবার উদ্দেশ্যে বেশ ঘোষণা দেওয়ার মতো করে বললেন,
“আজ কিন্তু আমাদের সকালের খাবার এই বাড়িতে হচ্ছে না। আজ আমরা সবাই মিলে বাইরের একটা বিশেষ জায়গায় খেতে যাব।”
ফুফুর এমন আকস্মিক কথায় নীলা আর ইকরা একসাথে বেশ অবাক হয়ে গেল। তারা চোখ গোল গোল করে বলল,
“কী বলছ ফুফু। আমরা তো আগে থেকে এই ব্যাপারে কিচ্ছু জানতাম না।”
ঠিক তখনই ড্রয়িংরুমে উপস্থিত পরিবারের বড়-ছোট সবাই একসাথে সমস্বরে চিৎকার করে বলে উঠল,
“সারপ্রাইজ!”
সবার এমন সমবেত আর আনন্দঘন চিৎকার শুনে নীলা এবং ইকরা নিজেদের আর ধরে রাখতে পারল না। তারা দুজনেই খিলখিল করে হেসে উঠল। তবে সময় বেশি নেই দেখে মিহাল আর মুনভি সবাইকে তাড়া দিতে লাগল,
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৫৮
“আরে, সবাই এবার জলদি করো। ঠিক সময়ে পৌঁছাতে না পারলে কিন্তু পুরো প্ল্যানটাই ভেস্তে যাবে।”
মিহাল আর মুনভির তাড়া খেয়ে সবাই দ্রুত বাড়ি থেকে বের হয়ে পার্কিং লটের দিকে এগিয়ে গেল এবং যে যার মতো নির্ধারিত গাড়িগুলোতে উঠে বসল। তবে এই বিশাল আনন্দযাত্রায় ইরফান কিন্তু শেষ পর্যন্ত শামিল হলো না। সে নিজের সাজানো অসুস্থতার বাহানা ধরে অলসভাবে বাড়িতেই রয়ে গেল। আর স্বামীর এমন আকস্মিক অসুস্থতার কথা শুনে, নিজের ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও আরশিকে বাধ্য হয়ে মনের কষ্ট চেপে বাড়িতেই তার দেখাশোনার জন্য থেকে যেতে হলো।
