নীরব উন্মাদনা পর্ব ২০
সুরাইয়া জিয়াসমিন
_ মাথা ঠান্ডা কর,, হয়তোবা কারো কাছে আছে,,,বাসায় ছাড়া কোথায় যাবে
_ আমাকে ঠান্ডা থাকতে বলছো,, আমার মেয়েকে পাচ্ছি না আমি,, তাড়াতাড়ি ওকে খুজো,,ওর কিছু হলে সবকয়টাকে এখানেই দাফন করবো,,
আমিনা চিন্তিত হলো,,বাড়িতে এতো মানুষ,,কে কোন দিয়ে আয়রাকে নিলো এখন তো তারো ভয় লাগছে,, কিছু সময় ভাবার পর বলে উঠলো
_ নুবা কোথায়,,
_ আমি কি জানি,,,
আমিনা বেগম আর সময় নষ্ট না করে নুবার রুমের দিকে এগিয়ে গেলো,,আরহামো পিছন পিছন গেলো
নুবা আয়রাকে শুইয়ে তার দুই পা জোরা করে তাল গাল তাল গাছ খেলছে,, এদিকে আয়রা মুখ দিয়ে হুম আহ শব্দ করে হাসতে শুরু করেছে,,আয়রার সরু আর গোলাপী ঠোঁট গুলো বারবার প্রসারিত হলো
নুবা তা দেখে আরো মজা পেলো,,,আয়রার পুরো শরীরে সুরসুরি দিতে লাগলো,,,
নুবার ফেদা পেচাল শুনে কেউ না খুশি না হলেও আয়রা ঠিকি হলো,,,
তাদের এরকম সুন্দর মূহুর্তে হঠাৎ খট করে দরজা খুলে গেলো,,,নুবা ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকালো,, দেখলো আমিনা বেগম এগিয়ে আসছে তবে আমিনা বেগমকে পাশ কাটিয়ে আরহাম আসছে,,,নুবা চোখ টিপটপ করে উঠলো,,,
সে কিছু বুঝে উঠার আগেই আরহাম এসে আয়ারাকে কোলে তুলে নিলো,,, অনেক টা সময় পর মেয়েকে পেয়ে যেনো তার কলিজার পানি ফিরে এসেছে,,,
নুবা নিষ্পাপ চোখে আরহামের দিকে তাকালো আমিনা বেগম কিছু বলার আগেই আরহাম ঠাস করে নুবার নরম গালে হাত বসিয়ে দিলো,,,
নুবার গলুমলু গালটা চুপসে গেলো,,,নুবার দুনিয়া অন্ধকার হয়ে আসলো,, আস্তে করে এক হাত গালে দিয়ে আমিনা বেগমের দিকে তাকালো,,
আমিনা বেগম এভাবে হঠাৎ নুবাকে মারতে দেখে সাথে সাথে মুখে হাত দিলো,,,
আরহাম রাগে গর্জে বললো
_কোন সাহসে আমাকে না বলে ওকে রুম থেকে নিয়ে আসছো,, তোমার কোনো কমন সেন্স আছে,,কতটা টেনশন হচ্ছিলো আমার,,আর একটু হলে আমার heart attack হয়ে যেতো,,,বুঝতে পারো এই সব,,,কোনো বেসিক জ্ঞান নেই তোমার,,,
নুবার এতো কথা শুনে ঠোঁট দুটো তিরতির করে কেঁপে উঠলো,,ছলছল চোখে আমিনা বেগমের দিকে তাকালো নুবা,,যদি সে কিছু বলে,,আমিনা বেগম নুবার চাহনি দেখে নিজেকে এই পরিস্থিতি থেকে বেড় করে বলে উঠলো
_ তুই মারলি কেন ওকে,,
(এই কথা শুনে না মনে মনে একটু হলেও খুশি হোলো)
আরহাম মায়ের দিকে তাকিয়ে রাগি কন্ঠে বললো
_ ওকে জিগ্গেস করো আমার পারমিশন ব্যতিত আমার রুমে ডুকে কেন আমার মেয়েকে নিয়ে আসছে,,
_ কিরে কেন নিয়ে আসছিস (নুবার দিকে তাকিয়ে বললো সে)
নুবা গাল থেকে হাত সরিয়ে মিনমিন করে বললো
_ কান্না করছিলো,,রুমে কেউ ছিলো না যদি বিছানা থেকে পড়ে যায় তাই নিয়ে আসছিলাম,, কিন্তু বুঝতে পারিনি আজকাল ভালো কাজ করলেও মার খেতে হয়,,জানলে আনতাম না,,,
আমিনা বেগম ছেলের দিকে তাকিয়ে দুই হাত নাড়িয়ে বললো
_ ভালোই তো করেছে,,না বুঝে শুনে ওর গায়ে হাত তুললি কেন
_ আমাকে বলে নিয়ে আসবে না ও,,
নুবা সাথে সাথে বলে উঠলো
_ আমি কি জেনে বসে আছি নাকি উনি রুমের কোন চিপায় বসে আছে,,যে মেয়ের কান্না শুনে টের পায় না সে আমার ডাকে কি শুনবে নাকি,,,
আমিনা বেগম কাপাল চাপড়ে বললো
_ ওকে sorry বল,, শুধু শুধু মারলি,,আর তুই ও আছিস নুবা,,না বলে কেন আনবি,,
নুবা মাথা নিচু করে বললো
_ আর কখনো তোমার নাতনিকে ধরবো না,,(বেশ অভিমান নিয়ে কথাটা বললো নুবা)
তবে আরহাম sorry না বলেই চলে গেলো,,আমিনা বেড় দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললো
_ বেয়াদব একটা,,যেভাবে বলছিলো মেয়েকে পাচ্ছে না আমার কলিজার পানি শুকিয়ে ফেলেছিলো,,
নুবার আজ অনেক খারাপ লাগছে,,কেন জানি আরাফের সাথে কাটানো সময় গুলোর কথা মনে পড়ছে বেশ কান্নাও পাচ্ছে,,আরাফ কত আশা দিয়েছিলো তাকে তবে এক নিমিশেই সব শেষ করে দিলো,,
তখন প্রায় রাত ৮ টা,,,একটু আগেই আয়ারকে আমিনা বেগম খাওয়ানোর জন্য দিয়ে গেছে,,তবে আয়রার প্রতি একটু অভিমান জমে আছে নুবার কারন তার কারনেই তো আরহাম তাকে মারলো,,তাই নুবা মুখ ঘুমড়ো করে আছে
_ চুপ কর কান্না করবি না,, চুপচাপ খা,, আমার ভালো লাগে না কিন্তু আয়রা,, সবসময় দুষ্টুমি ভালো লাগে না,,,
আয়রা একটু খেয়েছে,,তবে না খাচ্ছে ফিডার না ফিড করছে,,নুবার কোলে বসে শুধু হাতপা নাড়ছে,,,যেনো সে কিছু বলতে চাইছে,,
নুবা হতাশ হলো আয়ারকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে বললো
_ কান্না করিস না,,ভালো লাগে না
তবে আয়রা শুনলো কই বিছানায় শুইয়ে দিতেই আআআ আআআ শুরু করে দিলো,,,
নুবা ভুরু কুঁচকে নিলো,,আয়রার দিকে আর চোখে তাকিয়ে বিরবির করে বললো
_ এতো ফেদা পেচাল পাড়তে ইচ্ছে করে না, সবসময় সবকিছু ভালো লাগে না
নুবা বুঝতে পারছে আয়রা তার সাথে খেলতে বলছে,,মেয়েটা কথা বললে অনেক খুশি হয়,, এদিকে আরহাম যা মনে হয় না মেয়ের সাথে দু দন্ড বকবক করে,,,
আয়রা নাক মুখ খিচে কান্না করলো,,নুবা বাধ্য হলো কোলে নিতে,,,আয়রা একটু ঠান্ডা হলো,,তবে নুবার মুখের দিকে তাকিয়ে ফুপাতে লাগলো,,নুবা মুখ ঘুরিয়ে বললো
_ কথা বলবো না আমি,,,যখন তোর বাপ বিনা কারনে আমাকে মারলো তখন তো টু শব্দও করিসনি তবে আন্টি কেন কথা বলবে,,বলবে না,, চুপচাপ ঘুমা,,না হলে চাচিকে ডেকে দিয়ে দিবো বাপের ডোলে উঠে বসে থাকিস,,,
বলেই নুবা আর চোখে আয়রার দিকে তাকালো,,নুবাকে কথা বলতে দেখে আয়রা ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইলো,,
নুবা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললো
_ তোরা সবাই স্বার্থপর ,, আমাকে শুধু ব্যবহার করিস,,
বলেই নুবা কুনুই এর সাহায্যে চোখের পানি মুছে কাতর কন্ঠে বললো
_ তোর চাচা আমাকে এভাবে না ঠকালেও পারতো,,সে তো বিয়ে করে দিব্বি থাকবে,,তবে আমার কি হবে আমি তার দহনে পুড়ে পুড়ে মরবো,,
নুবা অনেকটা আবেগি হয়ে ফুঁপিয়ে উঠলো,, কারণ আজ বাড়ির সাজ সজ্জা দেখে তার প্রচন্ড খারাপ লাগছে,আরাফ তো তাকে কথা দিয়েছিলো সারাজীবন তাকে আগলে রাখবে কিন্তু সে কথা রাখেনি,,
আগের কথা ভবলেই নুবার কান্না পায়,,সে যেই আরফকে ভালোবেসেছিলো তাকে আর কখনো নুবা পাবে না,,আরাফ বদলে গেছে,,নুবার কাছে সব থেকে কষ্ট দায়ক আরাফ কখনো নাকি তাকে ভালোই বাসেনি,,,
নুবা চোখের পানি গড়িয়ে আয়রার চোখের পাতায় পড়লো,,আয়রা চোখ বন্ধ করে কান্নার প্রস্তুতি নিলো,,,
রাত দেরটা,,নুবা ঘুমাতে পারছে না,,বুকে চিনচিন ব্যাথা হচ্ছে,, কেমন ফুলে আছে যেনো স্পর্শ করলেই ফেটে যাবে,,, ব্যথায় হালকা টনটন করছে,,,
নুবাকে এরকম অস্থির হতে দেখে হাজেরা ঘুমঘুম কন্ঠে বললো
_ কি হয়েছে রে,,
নুবা কাতর কন্ঠে সুধালো
_আজ সকাল থেকে হঠাৎ করে বুক টা কেমন ঝিম লেগে ব্যথা করছে,,বুঝছে পারছি না,, ওষুধ তো ঠিক মতো নিয়েছি,,,
হাজেরা উঠে রুমের লাইট জ্বালিয়ে দিলো,,, পরপরই নুবার বদনে তাকিয়ে বিষ্ময়কর ভাবে বললো
_ তোর জামা ভিজলো কি করে,,
নুবাও বেশ চম্কে উঠলো,,ফাল দিয়ে বিছানায় উঠে বসে এক পলক নিজ বক্ষ স্থলের দিকে তাকিয়ে হতবাক হয়ে বললো
_ এটা কখন হলো,,,
_ তুই টের পাসনি
নুবা মাথা ঝুঁকিয়ে বললো
_ না তো,,
নুবা ভালো মতো উঠে বসতেই বুকে চাপ পড়লো,,ফিটকিরির মতো বক্ষ স্থল থেকে দুধ নির্ঘাত হলো,,নুবা নিজেও বেশ চমৎকালো কারণ সে ভাবেনি এতো তাড়াতাড়ি এই সব হয়ে যাবে,,,
নুবা নিজ মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো
_ মা এতো পুরা ফিচকিরির মতো ছুটছে,,জামা ভিজে যাচ্ছে কি করবো,,
_ তুই বস আমি আসছি,,
হাজেরা বেগম যেএ আমিনা বেগমের দরজায় কড়া নাড়লো,,, সারাদিনের খাটাখানটি করার পর মাত্র একটু চোখ বন্ধ করেছিলো আমিনা বেগম হঠাৎ হাজেরার শব্দ শুনে চম্কে উঠলো,,
আমিনা বেগম বিছানা থেকে উঠতে গেলেই হারুন মির্জা ঘুম ঘুম কন্ঠে বললো
_ কোথায় যাচ্ছো,,
আমিনা বেগম কাঠকাঠ কন্ঠে বলল
_ মরতে যাচ্ছি,,শুনছে না দরজায় কেউ ডাকছে
_ সবসময় কেটকেট করো কেন,,
আমিনা বেগম উঠে চুল বাঁধতে বাঁধতে বললো
_ তা করবো না নাকি,,কালক থেকে আপনি যদি বাড়ির বাইরে পা রাখেন তবে এই বাড়ি ছেড়েই আমি চলে যাবো,,এতো ঝামেলা ভালো লাগে না,,,
বলেই আমিনা বেগম উঠে এসে দরজা খুলে হাজেরা দেখে মৃদু কন্ঠে শুধালো
নীরব উন্মাদনা পর্ব ১৯
_ এতো রাতে যে,, কিছু হয়েছে,,
হাজেরা বেগম বেশ বিচলিত কন্ঠে বলে উঠলো
_ নুবা___
পুরা কথা শেষ করার আগেই আমিনা শুধু নুবা নাম শুনে বিচলিত হয়ে বললো
_ ওর কিছু হয়েছে,,
(হাজেরা বেগম সব খুলে বললো,,,এই কথা শুনে আমিনা বেগমের মুখে হাসি ফুটে উঠলো,,সে ভাবেনি এতো তাড়াতাড়ি কষ্টের ফল পাবে)
