নীরব উন্মাদনা শেষ পর্ব
সুরাইয়া জিয়াসমিন
নুবা এক মূহুর্তের জন্য স্তব হয়ে গেলো। পরপর হাঁটু গেঁড়ে বসে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে গেলো সে।হাজেরা পিছন পিছন এসে নুবার মাথায় ওরনা টেনে দিলো কারণ আশে পাশে অনেক মানুষ।
আয়রা সবার এতো শব্দ শুনে মাঝে মাঝে কেঁদে উঠছে।আমিনা বেগম খাটিয়ার থেকে কিছুটা দূরে নিচে লুটিয়ে পড়ে কাঁদছেন ।আরশি কাঁদতেও পারছে না তার পেটে টান খাচ্ছে।রিহান কাজের ফাঁকে ফাঁকে বউ কে দেখে যাচ্ছে।আরশিকে রিহানের আম্মু ধরে রেখছে লাশের সামনে যাওয়া নাকি ঠিক হবে না তাই শেষ বারের মতো ভাইমের মুখটাও দেখতে দেওয়া হচ্ছে না তাকে।
নুবা দুই হাত দিয়ে খাটিয়া ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো তার হাত পা কাঁপছে।একটু পড়েই এই মানুষ টাকে নিয়ে যাওয়া হবে নুবার সহ্য হলো না খাটিয়ায় কপাল ঠেকিয়ে ভাঙ্গা কন্ঠে বললো
_”একটু কথা বলুন আমার সাথে।মরে যাচ্ছি আমি।আপনি এভাবে আমাকে ছেড়ে যেতে পারেন না।”
উত্তর এলো না,হালকা বাতাসে সাদা কাফনের কাপড় নড়তে শুরু করলো,নুবা খাটিয়ায় কপাল ঠুকে আহাজারি করে বললো
_” আমি কেনো যেতে দিলাম আপনাকে। কেনো? আমি,আমি সব ছেড়ে চলে যাবো বলছি।আমি আপনার মেয়েকে দেখতে পারবো না।ফিরে আসুন বলছি,আমি আর সহ্য করতে পারছি না আরহাম।একটা বার আমাকে আদুরে কন্ঠে ডাকুন না।”
বরাবরের মতোই ফলাফল শূন্য।নুবা উত্তর না পেয়ে নিরাশ হলো। ক্লান্ত কন্ঠে বললো
_”আমাদের একটা সংসার হলো না তো,আমি আপনাকে পেয়েও পেলাম না। যদি এতো তাড়াতাড়ি চলেই যাবেন তাহলে আমাকে কেনো নিজের সাথে জরিয়েছিলেন। আপনি কেনো আসলেন আমার জীবনে। আমার পুরো পৃথিবীটা ধংস করে রেখে গেলেন, আমার কখনোই আপনাকে মাফ করবো না।”
নুবা ওখানে বসেই বিরবির করতে লাগলো।, সন্ধার নামাজ শেষে হলো হারুন মির্জা বিধ্বস্ত সবার দিকে একবার তাকিয়ে নিলেন।পরপর নুবার কাছে এগিয়ে গেলেন। ঝুঁকে নুবার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে চাঁপা নিঃশ্বাস ফেলে হাজেরার দিকে তাকালেন পরপর ভাঙ্গা শব্দে বললেন
_”ওকে নিয়ে যাও,লাশ নিয়ে যাওয়ার সময় হয়েছে।”
কী অদ্ভুত, তাই না? মানুষটা যত প্রিয়ই হোক, মৃত্যুর পর আর কেউ তাকে ঘরে ধরে রাখতে চায় না। যে নামটি একদিন ভালোবাসা আর আপনজনের ডাকে মুখর ছিল, মুহূর্তেই তা “লাশ” শব্দে হারিয়ে যায়। তখন আর কেউ নাম ধরে ডাকে না। প্রিয় মানুষটিও যেন ঘরের এক নীরব বোঝা হয়ে ওঠে। সবাই শুধু চায়, যত দ্রুত সম্ভব তাকে মাটির বুকে চিরনিদ্রায় শুইয়ে দিতে,এটাই পৃথিবীর নির্মম অথচ অনিবার্য নিয়ম।আরাফ কান্ত শরীরে এগিয়ে আসলো,সাথে রিহান আর আরহামের কাজিন,
হারুন মির্জার কথা শুনে আর সবাইকে এগিয়ে আসতে দেখে,নুবা কিছুটা চেঁচিয়ে উঠলো আর বললো
_”না,এখন নিয়ে যেতে দিবো না, আমার অনেক কথা বাকি।
ছেলেকে নিয়ে যাওয়া হবে শুনে আমিনা বেগম এগিয়ে এসে শেষ বারের মতো ছেলেকে দেখে নিলো,আমিনা বেগম পাগলের মতো কাঁদতে লাগলো।আরশিকে এখানে আসতে না করা হলেও শেষ সময় ছুটে আসলো সে।রিহান আরশিকে দেখে মৃদু চমকে উঠলো। এগিয়ে যেতে নিলেই হারুন মির্জা বলে উঠলো
_”থাক।”
কিছু সময় অতিবাহিত হলো কান্নাকাটি আরো বাড়লো এবার হারুন মির্জা চোখের ইশারায় খাটিয়া তুলতে বললো।
হাজেরা মেয়ের বাহুতে ধরে টেনে বললো
_” যত লাশ রাখা হবে তত কষ্ট হবে ওর।যেতে দে
”
নুবা বাচ্চাদের মতো হাত পা ছুড়ে আহাজারি করে বললো
_” আমাকে একটা বার উনাকে একটু জরিয়ে ধরতে দেও মা। শেষ বারের মতো।”
সব মুরব্বিরা নিষেধাজ্ঞা দিলো।এখন এরকম করা ঠিক হবে না। হারুন মির্জার চোখের কোনায় পানি জমলো। চাঁপা কন্ঠে বললো
_” সময় হয়ে যাচ্ছে।চলো।”
আমিনা বেগম আর আরশিকে কে টেনে সরানো হলো ওখান থেকে।হাজেরা নুবাকে আঁটকে রাখতে পারছিলো না তাই ভিরের ভিতর থেকে দুই জন এগিয়ে এসে শান্ত কন্ঠে বললো
_”যত সময় যাবে ততই লাশের ক্ষতি হবে। নিজেকে শান্ত করো।”
নুবা মানতেই পারলো না আরহাম আর নেই।নুবাকে একটু সরিয়ে নিতেই চার জন এসে খাটিয়া কাঁধে তুলে নিলো। হারুন মির্জার কাঁধ ভেঙ্গে আসলো।যেখানে তার খাটিয়া দুই ছেলের ধরার কথা ছিলো যেখানে আজ তার বড় ছেলের খাটিয়া তাকে বহন করতে হচ্ছে।
হারুন মির্জা না চাইতেও কেমন বাচ্চাদের মতো ফুঁপিয়ে উঠলেন, শক্তি কুলাচ্ছিলো না ছেলের লাশ বহন করতে। শরীর ভেঙ্গে আসলো তার।আরাফ বাবার অবস্থা বুঝে পেরে মৃদু কন্ঠে বললো
_” নিজেকে সামলাও বাবা,মা ভেঙ্গে পড়বে।”
ছেলের কথায় হারুন মির্জা নিজেকে একটু শক্ত করে নিলেন।আরাফের না চাইতেও কষ্ট হচ্ছে, হয়তোবা নিজ রক্ত দেখে। যতোই হোক তাদের শরীরে তো একি রক্ত বইছে।
নুবা ছটফট করে উঠলো, চিৎকার করে বললো
_”আমাকে একটিবার উনার মুখটা দেখতে দেও।আমি ভালো মতো উনাকে দেখতে পারিনি, আমাকে দেখতে দেও,একটু জরিয়ে ধরতে দেও।”
নুবাকে ধরে রাখা একজন বলে উঠলো
_” পাগল হয়ে গেছো, এমন হয় না নিজেকে সামলাও।”
সবাই বুক চেপে নিঃশ্বাস ফেললো। এরপর আস্তে আস্তে গন্তব্যে এগিয়ে যেতে লাগলো।আরহামকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে দেখেই নুবা চেঁচিয়ে উঠলো।এক ঝাড়া মেরে সবাইকে সরিয়ে দিয়ে নাকে মুখে উঠতে লাগলো।সে একবার শুধু তার স্বামীকে একটু জরিয়ে ধরবে।একটু তাকে দেখবে,কেনো কেউ তাকে একটু সময় দিচ্ছে না।
নুবা কোনো মতে উঠে দাঁড়িয়ে খাটিয়ার পিছনে ছুটে যেতে নিলো, আর্তনাদ করে বললো
_” নিয়ে যেও না,আর একটু রাখো, আমার যে এখনো অনেক কথা বলা বাকি।”
নুবা বেশি দূর এগিয়ে যেতে পারলো না,তার আগেই পিছন থেকে ৩/৪ টা হাত এসে তাকে চেপে ধরলো নুবার মনে হলো তার পুরো শরীর কেউ ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছে,রুহ টাকে কেউ টেনে হিচরে বেড় করে ছুটে চলেছে।নুবা গলা কাটা মুরগীর মতো ছটফট করে উঠলো চিৎকার করে বললো
_”আমাকে একটা বার উনার কাছে যেতে দেও।”
কিছু সেকেন্ডের ভিতরেই আরহামের খাটিয়া চার কাঁধে চলে গেলো। চোখের সামনে থেকে সরতেই নুবার শরীর তিরতির করে কেঁপে উঠলো।যখনি মনে হলো আরহাম আর নেই তখনি নুবার মাথা ঘুরে উঠলো।আর ছটফট করলো না সে ওখানেই জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়ে রইলো।
দাফন করা শেষ করে বাড়ি ফিরলেন হারুন মির্জা সহ সকল পুরুষ। মেহমান কিছু কমে এসেছে, শুধু কয় একজন রয়ে গেছে। হারুন মির্জা কাঁপতে কাঁপতে রুমে গেলেন।তখন আমিনা বেগমের সাথে রুমে সবাই উপস্থিত। হারুন মির্জা ভিতরে প্রবেশ করে কম্পিত কন্ঠে বললেন।
_”আপনারা একটু বাইরে জান।”
হারুন মির্জার একটি বাক্যে ,সবাই আমিনা বেগমের শান্তনা দিয়ে চলে গেলেন। হারুন মির্জা দরজা চাপিয়ে স্ত্রীর সামনে যেএ যেনো ভেঙ্গে পড়লেন।ফ্লোরে ধপ করে বসে পড়লেন তিনি,আমিনা বেগম বিছানার এক কোনায় পা মেলে মরার মতো বসে ছিলো। হারুন মির্জা স্ত্রীর হাঁটুর উপর মাথা রেখে হু হু করে কেঁদে উঠলেন।এতো সময় নিজেকে শান্ত রাখলেও এবার আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না তিনি। বাচ্চাদের মতো কেঁদে উঠলেন শক্ত মনের মানুষটা। আঁটকে যাওয়া শাঁসে বললেন
_”আমার ছেলে আমিনা, আমার বড় সন্তান।যাকে দিয়ে আমি বাবা হওয়ার অনুভূতি পেয়েছি।যাকে আমি এই দুই হাত দিয়ে মানুষ করেছি। আঘাত করেছি দূরে ঠেলে দিয়েছি। আজকের পর থেকে অভিযোগ করার কোনো সুযোগ দিবে না।কেনো এখানে ফিরলো ও, অন্ততপক্ষে দূরে থাকলেও বলতে তো পারতাম ও বেঁচে আছে।”
আমিনা বেগমের চোখের কার্নিশ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো।মুখ দিয়ে শব্দ বেড় হলো না। হারুন মির্জা ফুঁপিয়ে উঠে বললেন।
_” যেখানে আমার খাটিয়া ওর কাঁধে উঠার কথা ছিলো যেখানে ওর খাটিয়া বহন করলাম।আমি কি বাবা হিসাবে ব্যর্থ। বলো আমিনা?”
উত্তর এলো না, হারুন মির্জা আহাজারি করে বললেন
_”আসলেই আমি ব্যর্থ,ওকে ভালো মতো লালন পালন করতে পারলাম না।আগলে রাখতে পারলাম না। অবহেলায় অবহেলায় আমার ছেলেটা চলে গেলো। আমি কি করে মেনে নিবো আমার কলিজার টুকরাটা আর নেই?”
আবারো ফলাফল শূন্য, উত্তর এলো না শুধু কান্নার শব্দ। হারুন মির্জা স্ত্রীর সাথে নিজের মনের কষ্ট প্রকাশ করতে লাগলো।আমিনা বেগম শুধু শুনলেন।তবে কেউ কাউকে শান্তনা দিলেন না কারণ সেই শব্দ টুকু বা ভাষা অবশিষ্ট নেই তাদের কাছে।
আরশি রিহানের বুকে পড়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। তার ভাই এতো তাড়াতাড়ি কেন চলে গেলো।রিহান আরশির মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে শান্ত করতে লাগলো।
নুবা হাজেরার রুমে, আপাতত রুমে ইশিতা, হাজেরা আর রিহানের মা আয়শা আছে।
নুবা কান্ত হয়ে বিছানায় পড়ে আছে যেনো তার পুরো দুনিয়াটা ধংস হয়ে গেছে,তার স্বপ্ন তার আকাঙ্ক্ষা সব কিছু শেষ হয়ে গেছে। এদিক দিয়ে আয়রা ক্ষুধার্ত হয়ে কাঁদতেই আছে।সেই সকালে একটু খেয়েছে এখন রাত ৯ টা।নুবার চোঁখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো।হাজেরা আয়রাকে নিয়ে এগিয়ে এসে কাতর কন্ঠে বললো
_”একটু যদ খাওইয়ে দিতি,দেখ ক্ষুধায় কিভাবে দুই হাত মুখে পুরে টানছে।”
নুবা ডুকরে কেঁদে উঠলো, বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্টগুলো যেন অশ্রু হয়ে বেরিয়ে এলো। নিজেকে কিছুটা শক্ত করে,বিছানার পাশে হেলান দিয়ে বসলো। কম্পিত হাতে আয়রাকে নিজের বুকে জড়িয়ে নিলো, যেন এই ছোট্ট বুকের উষ্ণতাতেই সে আরহামের অস্তিত্ব খুঁজে পাচ্ছে।
আরহামের রেখে যাওয়া শেষ স্মৃতি। ছোট্ট মুখটার দিকে তাকিয়ে নুবার চোখ আবারও ভিজে উঠলো। মনে হলো, মানুষটা চলে গেলেও তার ভালোবাসার এক টুকরো এখনো তার কাছে রয়ে গেছে। হয়তোবা তার গর্ভের না তবু এটা তার সন্তান,আরহামের রেখে যাওয়া আমানত যা নুবাকেই আগলে রাখতে হবে।
নুবা আয়রাকে শক্ত করে জড়িয়ে নুবা নীরবে কাঁদে উঠলো,বিরবির করে বললো
_”বরাবরই আমার ভাগ্য এতো নিষ্ঠুর কেনো হয় আরু।কি এমন পাপ করেছি যে এতো তাড়াতাড়ি বিধবার তামাকা লেগে গেলো। তুই তো বাপ হারা হয়ে গেলি আরু।আমি কি করে তোর ভরসা হবো যেখানে আমার নিজেরি কোনো ভরসা নেই?”
আয়রা উত্তর দিলো না তবে মায়ের বুকে হাত বুলিয়ে ক্ষুধা নিবারণের চেষ্টা করলো।নুবা কাঁপতে কাঁপতে আয়রাকে দুধ দিলো,বুক ভেঙ্গে আসলো তার।ভাবতে পারলো না তার স্বামী আর নেই।
আয়শা বেগম এগিয়ে এসে বললেন
_”নিজেকে সামলাও।এভাবে ভেঙ্গে পড়লে বাচ্চাটার কি হবে।”
নুবা ঠোঁট হেলিয়ে হেসে বললো
_”আপনারা তো আছেন দেখার জন্য।আমি যদি মরে যাই দেখবেন না ওকে।”
হাজেরা চম্কে উঠলো, মৃদু কন্ঠে বললো
_”এই সব কি বলছিস, আল্লাহ তোকে লম্বা আয়ু দান করুক। বেঁচে থাক অন্ততপক্ষে আয়রার জন্য।”
নুবা ঠোঁট চেপে ফুঁপিয়ে উঠলো সে মানতেই পারছে না আরহাম আর নেই।
রাত একটু বারতেই সবাই সবার খেলায় রাখা শুরু করলো।রিহান আরশিকে জোর করে দুটো খাওয়ালো।আয়শা এখনো বোনকে খাওয়াতে চেষ্টা করছে। হারুন মির্জারো একি অবস্থা,আরাফের গলা দিয়েও খাবার নামছে না, ইশিতার তাও তার পিছনে খাবার নিয়ে ঘুরছে।হাজেরা নুবাকে দুটো খাওয়ানোর চেষ্টা করছে যাতে আয়ার একটু বুকের দুধ পায় তবে নুবা খাবে না মানে খাবে না।
_”কাল রাত থেকে কিছু মুখে তুলিসনি,একটু তো খেএ নে।”
নুবা মাথা ঝুঁকিয়ে বললো
_”আমি ঘুমাবো মা, আমাকে একটু ঘুমাতে দেও”
_”আগে খেএ নে,তার পর ঘুমাস।”
নুবা ফুঁপিয়ে উঠলো,আবারো কেঁদে উঠলো সে।মনে পড়ে গেলো আরহামকে সে বেশির ভাগ সময়ে খাওইয়ে দিতো।এখন থেকে কেউ আর এই বাহানা করবে না,খাওইয়ে না দিলে কেউ বিরক্ত করবে না।নুবার বুক ভেঙ্গে আসলো।মাথা ঘুরে পরে যেতে নিলো সে তবে নিজেকে সামলে নিলো।হাজেরা চোখের পানি ফেলে বললেন
_”তুই যদি না খেএ তার মেয়েটাকে ক্ষুধার্ত রাখিস তাহলে কি ভাববে সে। একটু খেএ নে।”
নুবা না করতে যেয়েও করলো না।গুনে গুনে ছোট্ট ছোট্ট দুই লোকমা ভাত মুখে নিলো, প্রচন্ড কষ্টে গিললো সে,মনে হলো গলা দিয়ে বিষ ঢুকছে।নুবা তাও পানি দিয়ে গিলে নিলো অতঃপর আর খেলো না হাজেরাও জোর করলো না।
রাত প্রায় ২ টা, মির্জা বাড়ির কারো চোখেই ঘুম নেই, নুবা মায়ের কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে,এখনো সে একটু পরপর কেঁদে উঠছে,প্রতিটা রুমে একি অবস্থা।
নুবা ফুঁপিয়ে উঠে আবারো থেমে গেলো।হাজেরা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে চোখের পানি ফেললেন।নুবা মায়ের কান্নার শব্দ শুনে ভাঙ্গা কন্ঠে বললো
_”নিজের মেয়ের জন্য কাঁদছো নাকি,এটা খুশির কান্না যে তুমি যা চাইলে তাই হলো।”
মেয়ের অভিযোগে হাজেরা বেগম হতভম্ব হয়ে গেলেন, কম্পিত কন্ঠে বললেন
_”খুশি কেনো হবো,এই সব কি বলছিস?”
নুবা ফুঁপিয়ে উঠে বললো
_”তুমিই তো চাইতে না আমি যাতে তার সাথে সংসার না করি।এখন দেখো তোমার ইচ্ছে পূর্ন হয়েছে মা।এখন আর সে নেই,আর না আমি তার সাথে সংসার করতে পারবো।দোষের ভিতরেই একটাই অভিযোগ”বিধবা” হয়ে গেলাম মা।বিধবা,,,,আসলে সবাই ঠিকি বলে কার চাওয়া কখন পূর্ন হয়ে যায় কে জানে, বিশেষ করে মায়েদের চাওয়া,!”
হাজেরা চম্কে উঠে বললেন
_”আমি প্রথম প্রথম রাজি না থাকলেও পরে কখনো আমি তোদের অমঙ্গল চাইনি।আমি চেয়েছি তোরা সুখে থাক। তুমি এরকমটা কি করে বলতে পারলি।”
বলতে বলতে ফুঁপিয়ে উঠলেন হাজেরা,আবারো বললেন
_” আমি কখনোই চাইনি তোর স্বামী তোর থেকে দূরে সরে যাক,মরে যাক,তুই তোর মাকে এতোটা দোষি করে দিলি।”
নুবা ফুঁপিয়ে উঠলো,তার তো মাথা কাজ করছে না,যেই মানুষ টা গত মাসেও ছিলো আজ সে নেই। আরহাম আর কখনোই ফিরে আসবে না,আর না কখনো তাকে কাছে পাওয়ার আবদার করবে। সেদিন কেনো নুবা আটকালো না তাকে এই আফসোস নুবাকে গিলে খাচ্ছে।
অতঃপর সকাল হলো।পুরো মির্জা বাড়ি মানুষে ভরা থাকলেও কেমন শূন্য শূন্য,নুবা সকাল হতেই পাগলের মতো ছুটলো আরহাম আর তার রুমে।হুস ফিরতেই যেনো সব মনে পড়েছে তার শান্ত হওয়ার বদলে অশান্ত হয়েছে সে।আমিনা বেগম নিরবে কাঁদলেন ।সবাই শান্তনা দিলো,আয়রার কান্না শোনা গেলো।সিরি দিয়ে এপার থেকে ওপার নুবা ছুটতে লাগলো।
এই সেই বাড়ি,এই সেই সদর দরজা যেখানে তার আর আরহামের প্রথম দেখা হয়েছিলো।সব কিছু আরহামের স্মৃতি দিয়ে ভরপুর।সেই ছাদ,সেই রুম সেই করিডোর,সেই ডাইনিংরুপ, লিভিং রুম। সবকিছু আছে তবে আরহাম নেই।
সেই আয়ারা যাকে সে দুই হাতে করে নিয়ে এসেছিলো আজ সে আছে তবে আরহাম নেই।আয়রা এতিম হয়ে গেলো নুবা বিধবা হলো।আমিনা ছেলে ছাড়া হলো।আরশি আর আরফ ভাই ছাড়া।সবার মনে হাহাকার।
নুবা ছন্নছাড়ার মতো ছুটতে লাগলো, সবকিছু ধোঁয়াশা,অগুলাছো, এলোমেলো,সে শুধু এক দিক থেকে অন্য দিক ছুটতে লাগলো তবে নিজের গন্তব্যে পৌঁছাতে পারলো না। খুঁজে পেলো না সেই মানুষ টাকে।সবাই শুধু নুবার পাগলামো আহাজারি দেখলো কেউ আটকালো না।ভাবলো কিছু সময় পড়েই শান্ত হয়ে যাবে সে।
নুবা অর্ধ পাগলের মতো সবার হাত পা ধরে চেঁচিয়ে উঠে বলতে লাগলো
_”আমার স্বামীকে দেখছেন,উনি কখন আসবে?”
প্রশ্নের উত্তর এলো না,নুবা দুই হাত দিয়ে মাথার চুল খামচে ধরে কেঁদে উঠলো,সবাইকে জিজ্ঞেস করলো সে কেউ উত্তর দিলো না বরং শান্তনা দিলো।
নুবা বুঝতে চাইলো না আরহাম আর নেই। নুবা শুধু আরহামকে খুঁজতে লাগলো।এক পর্যায়ে সে বিরক্ত হয়ে বাড়ির সদর দরজা খুলে বাইরে যেতে লাগলো,সাথে সাথে বাড়ির মানুষ এসে তাকে চেপে ধরলো ছন্নছাড়া নুবা হাত পা ছুরে বলতে লাগলো
_”আমাকে যেতে দেন,আমি এখানে থাকবো না, আমাকে আমার আরহামের কাছে দিয়ে আসেন।”
সে পাগল হয়ে যাচ্ছিলো আরহামের শূন্যতায়।নুবা জানে আরহাম মারা গেছে তাও সে আহাজারি করতে লাগলো এই খোঁজে যে কেউ যদি আরহামকে ফিরিয়ে নিয়ে আসে!”
নুবার কাছে এই বাড়িটা জেল খানা মনে হলো।সব জায়গায় আরহামের রেখে যাওয়া স্মৃতি,এক পর্যায়ে নুবা গলা কাটা মুরগীর মতো ছটফট করতে করতে জ্ঞান হারালো।
সবাই নুবার আচরণ দেখে অবাক হলো।নুবা কেনৌ এমন করছে সে তো জানে আরহাম নেই।নুবার অবস্থা দেখে আরাফ হতভম্ব হয়ে গেলো।নুবা কি এতোটাই ভালোবাসে তার ভাইকে যে তার মৃত্যুতে পাগল হয়ে যাচ্ছে ।এই ভালোবাসা কি সে পাওয়ার যোগ্য ছিলো না,আসলেই না,সে ছিলো প্রতারোক।
হারুন মির্জা এগিয়ে যেতে যেতে বললেন
নীরব উন্মাদনা পর্ব ১০২
_”ওকে হসপিটালে নিতে হবে, মানসিক চাপে এমন করছেন। কয়দিন গেলে ঠিক হয়ে যাবে।”
নুবার বুক ফেটে কেমন নিঃশ্বাস বেড় হয়ে আসলো যেনো জ্ঞান হারিয়েও সে সব শুনছে,বুঝেছে,টের পাচ্ছে আর ভিতরে ভিতরে হাহাকার করছে।সবার থেকে যেনো নুবাই বেশি ভেঙ্গে পড়েছে!
“কিছু মানুষ চলে যায়, কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া স্মৃতি কখনো যায় না। আরহাম নুবার জীবন থেকে হারিয়ে গেলেও, তার ভালোবাসা আর আয়রার মাঝে সে বেঁচে থাকবে। নুবার আফসোস হয়তো কোনোদিন শেষ হবে না, কারণ তার একটা সংসার হলো না।আরহামের ইচ্ছা পূর্ন করতে পারলো না সে,এই আফসোসেই সে হয়তোবা পাগল হয়ে যাচ্ছে,
পাগল হয়ে যাচ্ছে ঠিকি তবুও জীবন থেমে থাকবে না… কিছু শূন্যতা নিয়েই মানুষকে বেঁচে থাকতে হয়,নুবার ক্ষেত্রেও তা হবে, আফসোস নিয়ে বেঁচে থাকবে।”
প্রথমে খন্ডের শেষ পর্ব এটা,এই গল্পের বাকি পর্ব গুলো দ্বিতীয় খন্ডে আসবে।
