Home নূর ই মহব্বত নূর ই মহব্বত পর্ব ৩০

নূর ই মহব্বত পর্ব ৩০

নূর ই মহব্বত পর্ব ৩০
তাবাসসুম তাজ্বওয়ারী

বেশ কয়েকটা মাস কেটে গেছে এর মাঝে। প্রকৃতির নিয়মে ঋতু বদলেছে, আর সেই সাথে আহিল আর নওমির জীবনে জমে থাকা কালবৈশাখীর শেষ দাগটুকুও মুছে গেছে।
আজ শুক্রবার, সাপ্তাহিক ছুটির দিন। সকাল সাড়ে নয়টা বাজে, কিন্তু আহিল রুমে শান্তিতে ঘুমোচ্ছে কিন্তু সেই শান্তিতে বেগড়া দিতে হাজির হয়ে গেল ছোট্ট আদনান। এই ক’মাসে আদনানের মধ্যেও কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। এখন ও বেশ চটপটে আর চঞ্চল হয়ে উঠেছে। বাবার সাথে খুনসুটি করতে করতে ওর দিন কেটে যায়। ওর আধো আধো বুলিগুলো এখন অনেকটাই স্পষ্ট। ও বুঝতে শিখেছে যে এই বড় বাড়িটায় শুধু মা নয়, ওকে দুহাতে আগলে রাখার মতো একজন সুপারহিরো বাবাও আছে। এখন সারাক্ষণ মায়ের কাছে ঘ্যানঘ্যান করে না বা সবসময় মায়ের কোল খোঁজে না, বরং বাবাকে কীভাবে সারাক্ষণ জ্বালানো যায় সেই নতুন নতুন বুদ্ধি ওর ছোট্ট মাথায় ঘুরপাক খায়।
আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। বাবা ঘুম থাকায় নওমিকে রান্নাঘরের কাজের মাঝে জ্বলাচ্ছিল। নওমি ওকে বললো,

– যাও তো আব্বু, বাবাকে ডেকে দাও।
আদনান ঠোঁট উল্টে বললো,
– বাবা গু’ম।
– বাবা অলস হয়ে যাচ্ছে তুমি ডেকে দাও যাও।
আদনান মাথা নাড়িয়ে টুল থেকে নেমে এক দৌঁড়ে রুমে এলো। গুটিগুটি হাত পা দিয়ে বিছানায় উঠে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকা আহিলের পিঠের ওপর দুই পা ঝুলিয়ে একদম ঘোড়া চড়ার ভঙ্গিতে বসে পড়ল আদনান। ও নিজের ছোট্ট দুটো হাত দিয়ে আহিলের চুলগুলো মুঠো করে টেনে ধরে আধো আধো গলায় চিৎকার করতে লাগল,
– হাত হাত ঘোলা! আরু জোলে চলো!
আহিল ঘুমের ঘোরেই পাশ থেকেই একটা বালিশ টেনে মাথায় চাপা দিয়ে পিঠটা একটু দোলালো। ও চোখ না মেলেই বললো,

– আরেহ বাপধন, ফ্রাইডের সকালটা তো অন্তত এই বাপকে ক্ষান্ত দে! সারা সপ্তাহ হসপিটালের রাউন্ড দিয়ে আজ একটু ঘুমাতে দে রে বাপ!
আদনান দমবার পাত্র নয়। ও আহিলের পিঠের ওপর ছোট ছোট দুমদাম কিল মেরে বলল,
– না! মা বোলচে বাবা অলচ। বাবাকে দেকে দাউ
ছেলের মুখে মায়ের এমন উস্কানিমূলক কথা শুনে ঘুমের ঘোরেই ভ্রু কুঁচকে গেল তার। ও চট করে বালিশটা সরিয়ে পাশ ফিরতেই আদনান খিলখিল করে হেসে বিছানায় গড়িয়ে পড়ল। আহিল ওকে দুই হাতে ঝাপটে ধরে নিজের বুকের ওপর টেনে নিল, তারপর ওর নরম পেটে মুখ ডুবিয়ে ‘কুচুকুচু’ করে কামড় দেওয়ার ভান করতেই আদনান হাসতে হাসতে প্রায় শেষ!

– কার এত বড় সাহস যে আমার ছেলেকে আমার বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে দেয়, হ্যাঁ?
আদনান হাসতে হাসতে আহিলের গলা জড়িয়ে ধরলো। তখনই রুমে আসলো নওমি। ওদের বিছানায় গড়াগড়ি খেতে দেখে বললো,
– কী ব্যাপার? আদনান তোমাকে কি বলেছি?
আদনান না বুঝে ঠোঁট উল্টে জবাব দিলো,
– বাবা অলচ
নওমি মনে মনে কপাল চাপড়ে বললো,
– তোমাকে কি কাজ দিয়েছি? কিজন্য পাঠিয়েছি?
আদনান মায়ের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ ভাবলো। তারপর বললো,
– বাবাকে দাকতে।
এবার নওমি কণ্ঠে গাম্ভীর্য ঢেলে বললো,
– তুমি কি করছো?
মায়ের কণ্ঠ শুনে ভরকে গেল আদনান। মা রেগে গেল? সে তো কিছু করে নি বাবাকে ডাকতেই এসেছিল কিন্তু বাবা ওকে চেপে ধরেছে। সে হাতপা ছুঁড়তে লাগলো আহিলের বাহু থেকে ছুটার জন্য। আহিল বিরক্ত হয়ে বলল,

– আমার ঘুম নষ্ট করে এখন ব্যাঙের মতো লাফাচ্ছিস কেন? শান্ত হয়ে থাক!
আদনান হাত দেখিয়ে ফিসফিস করে বললো,
– মা পিট্টু দিবে।
আদনানের মুখে এমন কথা শুনে হো হো করে হেসে উঠলো আহিল। নওমি কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে চোখ দুটো ছোট ছোট করে ওদের কান্ড দেখছিল। আহিল আদনানের কান ঘেঁষে একটু ফিসফিস করে, কিন্তু নওমিকে শুনিয়েই বলল,
– ভয় পাস না বাপধন! তোর মা তো শুধু মুখেই ফায়ার, কাজের বেলায় একদম ফুস! আর আমি থাকতে তোকে পিট্টু দেওয়ার সাহস কার শুনি?
নওমি এগিয়ে এসে বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে হাতের দুধের মগ আর চায়ের কাপটা শব্দ করে সাইড টেবিলে রাখল। তারপর ভ্রু কুঁচকে বলল,
– বাহ ডক্টর সাহেব! ছেলেকে সকাল সকাল বেশ ভালোই কুশিক্ষা দেওয়া হচ্ছে দেখছি? এমনিতেই ও দিন দিন আপনার লাই পেয়ে মাথায় চড়ে বসছে, তার ওপর আবার মায়ের নামে উস্কানি?
আহিল ওর দিকে পিঠ দিয়ে শুয়ে হাই তুলে চোখ বন্ধ করতে করতে বললো,

– কে আগে উস্কানি দিয়েছে শুনি? আমার শখের ঘুম নষ্ট করার তাল কে দিয়েছিল?
– আমি তো ভালো উদ্দেশ্যে পাঠিয়েছিলাম যে আপনি উঠলে ফ্রেশ হয়ে নাস্তাটা করবেন একসাথে। তা না, এখানে এসে দেখি দুই জনা মিলে চক্রান্ত শুরু করে দিয়েছে! আদনান, নামো বিছানা থেকে। ব্রাশ করবে চলো। কোথায় বাবাকে বলবে ব্রাশ করে দাও সেই আমারই তোমার পেছনে পরে থাকা লাগে উঠো!
আদনান এবার আহিলের টি-শার্ট খামচে ধরে আরও ভালো করে ওনার বুকের সাথে লেপ্টে গেল। মুখ লুকিয়ে ওখান থেকেই আধো আধো গলায় বলল,
– না! যাব না। মা ফুচ
ছেলের মুখে নিজের একটু আগের ডায়ালগ হুবহু শুনে আহিল বালিশে মুখ গুঁজে হাসতে লাগল। চেষ্টা করছিল নওমির কাছ থেকে লুকিয়ে হাসতে কিন্তু হাসতে হাসতে তার গা দুলে উঠছে ফলস্বরূপ নওমি রেগে গেল। পাশ থেকে কোলবালিশ নিয়ে আহিলকে মা’রলো। নওমির হাতের কোলবালিশের মৃদু আঘাতেই আহিল এবার আর হাসি চেপে রাখতে পারল না। ও সোজা হয়ে ধড়ফড় করে আধশোয়া হয়ে বিছানায় উঠে বসল। হাসতে হাসতে জোরে শ্বাস নিতে নিতে বললো,

– কি শুরু করেছো নওমি?
নওমি অতিষ্ঠ ভঙ্গিতে বলল,
– উঠুন আহিল! আম্মা খালামনির বাসায় গিয়েছে দুইদিন হলো, আপনি হেলাফেলা শুরু করে দিয়েছেন! বাসায় বাজার নেই! এখন কি আমি বাজার করতে যাবো? তাই যাই আপনাকে বলে কিছু হবে না।
হাতের বালিশ ছুঁড়ে ফেলে আহিলের বুকের উপর থেকে আদনানকে জোর করে টেনে নিয়ে যেতে নিলেই আহিল এক ঝটকায় আদনানসহ নওমির হাতটা ধরে নিজের দিকে টান দিল।
হুট করে এই টানে নওমি ভারসাম্য রাখতে না পেরে বিছানার ওপর আধশোয়া হয়ে থাকা আহিলের বুকের ওপর এসে পড়ল। নওমি অপ্রস্তুত হয়ে ধড়ফড় করে উঠতে যেতেই আহিল ওর কোমর জড়িয়ে ধরে আটকে দিল। মিটিমিটি হেসে বললো,

– কোথায় যাওয়া হচ্ছে ম্যাডাম? বাজারের চিন্তা নাহয় আমি করবো। এবার তুমি বলো সকাল সকাল তোমার ছানা দিয়ে আমার ঘুম ভাঙানোর শাস্তি কী হওয়া উচিত?
নওমি দুই হাত আহিলের শক্ত বুকে ঠেকিয়ে নিজেকে কিছুটা উঁচুতে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করল। ওর শরীরের চেনা পুরুষালি ঘ্রাণ আর একদম কাছাকাছি থাকা চোখের গভীর চাউনিতে ওর ফর্সা গাল দুটো মুহূর্তেই টকটকে লাল হয়ে উঠল। ও বড় বড় চোখ করে ছটফট করে বলল,
– আহিল, ছাড়ুন! কী শুরু করলেন এসব বাচ্চাটার সামনে? আদনান সামনে আছে তো!
আহিল ঠোঁট চেপে হেসে আদনানের দিকে তাকিয়ে বললো,
– এই আদনান? মাকে এভাবে বেঁধে রাখি? কি বল?
বাবার বুকের ওপর মাকে এভাবে আটকে থাকতে দেখে আদনান এক সেকেন্ডের জন্য বোকা বনে গেল। ও নিজের গোলগোল চোখ দুটো আরও বড় বড় করে কিছুক্ষণ ওদের দেখল, তারপর হঠাৎ করেই খিলখিল করে হেসে উঠল।

– মা বুন্দি হয়ে গেচে! বেদে রাকব
নওমির ফর্সা মুখটা মুহূর্তে লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। ও কৃত্রিম রাগ দেখাতে চেয়ে রাগী চোখে তাকিয়েও আহিলের চোখের ওই গভীর, মাতাল করা চাউনি দেখে নিজের ভেতরের সবটুকু রাগ হারিয়ে ফেলল। আহিলের বুকে কপাল ঠেকিয়ে বললো,
– হয়েছে শাস্তির কথা পরে হবে। ছাড়েন! আজকে আমি ভুনা খিচুড়ি আর ইলিশ মাছ ভাজা করেছি। ঠান্ডা হয়ে গেলে কিন্তু একদম ভালো লাগবে না।
ইলিশ খিচুড়ির নাম শুনে আহিল আর আদনান দুজনেরই চোখ একসাথে চকচক করে উঠল। আদনান এক লাফে আহিলের ওপর থেকে নেমে বলল,
– আমি ইলিস মাচ কাব! মা, চলো।
আহিল মিটিমিটি হেসে নওমির দিকে তাকিয়ে বললো,
– আমার পাওনাটা বুঝিয়ে তারপর যাও।
– কিসের পাওনা?
আহিলের চোখের দিকে তাকাতেই তার দুষ্টুমি ধরতে পারলো নওমি। ছটফট করা বাড়িয়ে দিলো সে। আহিল আরো নিবিড়ভাবে চেপে ধরে ওর মুখে ফু দিয়ে বললো,

– কিসের পাওনা মানে? এই যে সকাল সকাল আমার সখের ঘুমটা ভাঙালে, তার কোনো গুড মর্নিং কিস জুটবে না এই ডক্টরের কপালে?
আহিলের মুখের সরাসরি এবং দুষ্টুমিভরা দাবিতে নওমি একেবারে থতমত খেয়ে গেল। ও লজ্জায় চোখ-মুখ লাল করে ফেলল। ছটফটানি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়ে আড়চোখে বিছানায় দাঁড়িয়ে থাকা আদনানের দিকে তাকিয়ে নিচু অথচ কড়া গলায় বলল,
– অ’সভ্য একটা! আদনান আছে সামনে, কীসব বলছেন এসব? ছাড়ুন বলছি!
আহিল অবশ্য দমবার পাত্র নয়। ও নওমির এমন ছটফটানি আর লাল হয়ে যাওয়া মুখ দেখে দারুণ মজা পাচ্ছে। ও এক হাত নওমির কোমরে শক্ত করে রেখেই অন্যহাতে আদনানের দিকে ইশারা করে একদম স্বাভাবিক গলায় বলল,

– অ্যাই আদনান? এইদিকে তাকা তো বাপধন।
আদনান তাকাতেই আহিল বাঁকা হেসে বললো,
– একটু চট করে হাত দিয়ে দুই চোখ বন্ধ করো তো সোনা। বাবা একটা ম্যাজিক দেখাবে। আমি এক থেকে তিন গোনার আগে কিন্তু চোখ একদম খুলবে না, কেমন?
বাবার মুখে ম্যাজিকের কথা শুনে আদনান ভারী উৎসাহ পেয়ে গেল। ও খিলখিল করে হেসে ওখানেই ধপ করে বসে পড়ল এবং নিজের পুচকে দুটো হাত দিয়ে শক্ত করে নিজের চোখ দুটো চেপে ধরল। ওখান থেকেই আধো আধো গলায় বলল,
– চোক বন্দ বাবা মেজিক দেকাও
ছেলের এমন অবুঝ আর মিষ্টি কাণ্ড দেখে নওমি লজ্জায় যেন একদম মাটির সাথে মিশে যেতে চাইল। ও আহিলের বুকে ছোট করে এক কিল বসিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল,

– বাচ্চাটাকে কীসব শেখাচ্ছেন আপনি!
আহিল আর কোনো জবাব দিলো না। ও নওমিকে নিজের আরেকটু কাছে টেনে নিয়ে ওর নরম গালে নিজের ঠোঁটের এক গভীর, উষ্ণ আর ভালোবাসাময় ছোঁয়া এঁকে দিল। হুট করে এই পরশে নওমি শিউরে উঠে চোখ দুটো বুজে ফেলল। আহিল ওর অবস্থা দেখে মুচকি হাসলো। পরক্ষণেই ওর কোমরের বাঁধন আলগা করে দিয়ে হো হো করে হেসে উঠল। আদনানের দিকে তাকিয়ে বলল,
– ওকে আব্বু, ওয়ান, টু, থ্রি! ম্যাজিক শেষ। চোখ খোলো।
আদনান চট করে চোখ থেকে হাত সরিয়ে দেখল মা ততক্ষণে বিছানা থেকে নেমে রুম থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। ও কিছু না বুঝে বলল,
– মেজিক কই?
আহিল বিছানা থেকে নামতে নামতে আদনানকে কোলে তুলে নিয়ে বলল,
– ম্যাজিক তো মায়ের কাছে চলে গেছে সোনা! চল, এবার আমরা জলদি ব্রাশ করে নিই নাহয় আজকে ইলিশ ভাগে পাবি না!
কথাটা নওমির দিকে তাকিয়ে বলল। নওমি আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। লজ্জায় কান-মাথা গরম করে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার সময় দরজার আড়াল থেকে শুধু বলে গেল,
– দশ মিনিটের মধ্যে ডাইনিং টেবিলে না দেখলে আজকে ইলিশ মাছের কাঁটাটাও কপালে জুটবে না।
আহিল ওয়াশরুমে যেতে যেতে গলা উঁচিয়ে বললো,
– পাওনা কিন্তু বাকি রইল ম্যাডাম। রাতে উসুল করে নেব।

পরেরদিন বিকেলে, একটু আগেই বাড়ি ফিরলো আহিল। এদিকে সকাল থেকে রান্নাঘর আর ঘরের বাকি কাজ সারতে সারতে নওমি রীতিমতো ক্লান্ত। শরীরটাও কেমন যেন ম্যাচম্যাচ করছে। এর মধ্যেই শুরু হয়েছে আদনানের নতুন উপদ্রব। ও ড্রয়িংরুমের কাঁচের টেবিলটার ওপর রাখা একটা শোপিস নেওয়ার জন্য জেদ ধরেছে। নওমি ওটাকে উঁচুতে তুলে রাখতেই আদনান মেঝেতে বসে পা ছুড়ে কান্নাকাটি শুরু করে দিল।
নওমি আদনানের সামনে বসে ওকে শান্ত করার চেষ্টা করে বলল,
– আব্বু, ওটা কাঁচের জিনিস। হাত থেকে পড়ে ভেঙে গেলে হাত কে টে র’ক্ত বের হবে তো সোনা! অন্য খেলনা নিয়ে খেলো।
আদনান মায়ের কোনো কথাই শুনল না। ও কান্নার বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়ে পাশেই থাকা প্লাস্টিকের একটা বাটি ছুড়ে মারল। নওমি তাও রাগ সামলে ওকে কোলে নিতে গেল, কিন্তু আদনান মায়ের হাত ঠেলে সরিয়ে দিয়ে চিৎকার করে বলল,

– না! আমি ওটাই নিবো। বাবা দিবে
বলতে বলতে পাশের একটা কাঁচের গ্লাস হাতের ধাক্কায় পড়ে ভে ঙ্গে গেল।
এমনিতেই ক্লান্ত শরীর, তার ওপর সকাল থেকে আদনানের এই অনবরত ঘ্যানঘ্যানানি নওমির ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিল। সকালেও একবার দৌড়াদৌড়ি করে আছাড় খেয়ে পায়ের চামড়া ছি’লে ফেলেছে। লেখিকার পেজ তার নামে বাকিসব ফেক। নওমি আর নিজেকে সামলাতে পারল না। আদনানের হাতটা শক্ত করে ধরে ওর পিঠে ঠাস ঠাস করে দু দুটো চ’ড় বসিয়ে দিল। রাগী গলায় বলল,
– এই একদম চুপ! দিন দিন আদর পেয়ে খুব বেশি বাঁদর হয়েছ না তুমি? একটা কথাও শুনতে চাও না! আবার কান্না করলে আবার মা’রব একদম!
পিঠে মায়ের হাতের চ’ড় খেয়ে আদনান মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল, তারপর পুরো ঘর কাঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ঠিক তখনই গোসল শেষ করে টাওয়েল দিয়ে চুল মুছতে মুছতে বাথরুম থেকে বের হলে ছেলের এমন আকাশ ফাটানো কান্নার আওয়াজ আর নওমিকে মা’রতে দেখে ও অবাক হয়ে গেল। পরক্ষণেই রাগ লাগলো তার।
আহিল দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে আদনানকে নিজের কোলে তুলে নিয়ে বুকে চেপে ধরল। তারপর নওমির দিকে তাকিয়ে প্রচণ্ড কড়া গলায় বলল,
– কী হচ্ছেটা কী নওমি? ও ছোট একটা বাচ্চা মা’রছো কেন?
নওমি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে চোখ ছোট ছোট করে বলল,

– আপনি তো সারাদিন হাসপাতালে ছিলেন ছেলের কাণ্ড আর কি দেখবেন আপনি? সকালেই একবার প’ড়ে গিয়ে চামড়া ছি’লে ফেলেছে! এখন আবার কাঁচের জিনিস নিয়ে খেলার বায়না জুড়ে বসেছে! এই করে এখন একটা গ্লাস ভেঙেছে! ছেলের এই চব্বিশ ঘণ্টার বাঁদরামি তো আর আপনাকে সামলাতে হয় না! একটুও কথা শোনে না ও। যেটা বারণ করব, সেটাই করবে!
আহিল তখন আদনানের কান্না দেখে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে। ও জেদের বশে রাগ সামলাতে না পেরে বলে ফেলল,
– আমি কী করি না করি তা তোমাকে দেখতে হবে না। কিন্তু আমার ছেলেকে তুমি আর একটাও মা’রবে না বলে দিচ্ছি! ও কাঁদলে আমার বুকে এসে লাগে, আমার সহ্য হয় না একদম! ও একটা নষ্ট করলে আমি আরও দশটা এনে দিবো তবুও কিছু বলবে না তুমি।
নওমির অভিমান হলো কেন যেন তবুও শক্ত কণ্ঠে বললো,
– বাহ ডক্টর সাহেব! আজ ও শুধু আপনার ছেলে হয়ে গেল? আর এতগুলো বছর যে মেয়েটা সমাজ আর মানুষের হাজারটা লাঞ্ছনা সহ্য করে এই ছেলেকে একা বুকে আগলে বড় করল, সে আজ কেউ না? ওর ওপর আমার কোনো অধিকারই নেই, তাই তো?
– আমি ওই অর্থে বলিনি নওমি। তুমি কথা না বাড়িয়ে এখন এখান থেকে যাও।
– বেশ! আপনার ছেলে আপনিই সামলান। আজ থেকে আদনানের কোনো দায়িত্বেই আমি নেই। ওর খাওয়া, ঘুম, গোসল সব ডক্টর আযলান নিজেই করবেন!
আহিলও রাগের মাথায় বলে বসলো,

– যাও তো! লাগবে না আমাদের বাপ-ব্যাটার তোমাকে! আমরা নিজেরাই নিজেদের দেখে নিতে পারব।
নওমি আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না। এক বুক অভিমান নিয়ে ও দ্রুত পায়ে নিজের রুমের দিকে চলে গেল। যাওয়ার সময় দরজার কপাট সশব্দে বন্ধ হওয়ার আওয়াজ ডাইনিং স্পেসের নিস্তব্ধ বাতাসে এক ভারী প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করল।
আহিল একবার সেদিকে তাকিয়ে আবার কোলে কাঁদতে থাকা আদনানের পিঠ চাপড়ে ওকে শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগল।
– হুশশশ! আব্বু, কেঁদো না।
আদনান বাবার গলা জড়িয়ে ধরে হেঁচকি তুলে কাঁদতে কাঁদতে একসময় শান্ত হলো। আহিল সোফায় বসে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হুটহাট মাথা গরম করে কি ভুল করলো এখন বুঝতে পারছে সে! ও নিজের কপাল চাপড়ে মনে মনে বলল, “কী দরকার ছিল রাগের মাথায় নওমিকে ওমন কথা বলার? আহিল, তুই সত্যিই একটা আস্ত গা ধা!”
কিছুক্ষণ পর নওমি রুম থেকে বের হয়ে রান্নাঘরে গেল কিন্তু ওদের বাপ ব্যাটার দিকে তাকালই না। আদনান কিছুক্ষণ খেলাধুলা করে এখন খিদে আর ক্লান্তিতে আবার ঘ্যানঘ্যান শুরু করেছে। ও বাবার কোল ঘেঁষে বসে বলল,

নূর ই মহব্বত পর্ব ২৯

– বাবা, খুদা লাগচে । মা-র কাছে যাব।
আহিল রান্নাঘরের দিকে একবার উঁকি দিলো। একটা ঢোক গিলে ভাবলো, বলার সময় বলে তো দিলো এখন তো ঘুরেফিরে নওমির কাছেই যেতে হবে! নওমি তো রেগে আছে বোঝায় যাচ্ছে ওর আচরণে। নিজেকে নিজে শাসালো, আহারে আহিল! এমনি এমনি ডক্টর হলি? ঘটে কি বুদ্ধিশুদ্ধি নেই? কি জন্যে যে মহিলা মানুষকে রাগতে যাস! এখন দুই বাপ ব্যাটা সব করে খা!

নূর ই মহব্বত পর্ব ৩১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here