নূর ই মহব্বত পর্ব ৭
তাবাসসুম তাজ্বওয়ারী
[আহিলের অতীত]
আননোন নম্বরের ঘটনার পর আহিল মেনেই নিয়েছিল ওইটা একটা রং নম্বর, ভুল করে নওমির কাছে চলে এসেছে। এই নিয়ে আর মাথা ঘামায় নি সে। এর কিছুদিন পর থেকে আহিলের ফোন বিভিন্ন ছবি আসতে থাকে। প্রথম যেই ছবিটা এসেছিল সেটা ছিলো আবরারে সাথে নওমির একটা ছবি। নওমি আবরারের হাত পেঁচিয়ে দাড়িয়ে আছে এমন ছবি দেখে আহিল প্রথমে শ’ক খেয়েছে যেহেতু সে আবরারকে চিনতো না ইভেন নওমির আপন মায়ের কোনো আত্মীয়কেই চিনত না। সে গলা উঁচিয়ে নওমিকে ডাকলো। নওমি রুমে আসতেই সে সোজা নওমির সামনে গিয়ে ফোনটা বাড়িয়ে দিল। স্ক্রিনের ছবিটা দেখিয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় বলল,
– কে এই ছেলে, নওমি?
নওমি ভ্রু কুঁচকে তাকালো। আযলানের কণ্ঠের অবিশ্বাস আর জেরা করার ভঙ্গিটা তার আত্মসম্মানে গিয়ে লাগলো। সে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
– ও আমার মায়ের দিকের কাজিন, আবরার ভাইয়া! যাকে আমি নিজের আপন ভাইয়ের মতো দেখি।
আহিল কিছুটা দমে গেল। সে ছোট্ট করে জবাব দিল,
– ওহ! আমি তো চিনি না তাই…
আহিলের কথা শেষ করতে না দিয়ে নওমি বলে উঠল,
– চিনেন না তাই নাকি আমাকে বিশ্বাস করেন না তাই?
– কি বলছো এসব? বিশ্বাস করবো না কেন?
নওমি তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললো,
– বিশ্বাস করবেন কিভাবে? আপনার মাথায় তো সবসময় নোংরা সন্দেহ ঘোরে! আপনি একটা আস্ত সন্দেহবাতিকগ্রস্ত মানুষ! সবসময় মনে মনে শুধু খুঁত খুঁজছেন যে কীভাবে আমাকে দোষী প্রমাণ করা যায়। একটা সাধারণ বিষয় নিয়ে আপনি যেভাবে তিলকে তাল করছেন, তাতে আপনার সাথে থাকাটাই এখন আমার জন্য দমবন্ধকর হয়ে উঠছে!
– নওমি!
– রাগ দেখাবেন না! শুধু আপনার রাগ আছে? আমার নেই? যা খুশি আপনি বলতে পারেন আর আমি চুপচাপ মেনে নেব? কখনোই না! আপনার এই সন্দেহের জন্য আমার জীবনটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে জাস্ট! সেদিন কোন এক কলের কথা বললেন কই? আমি যখন আপনার সামনে কল ব্যাক দিলাম তখন তো নম্বর অফ দেখালো! তাহলে আপনাকেই কল দিয়ে এসব বলে বুঝি? এই যে এই ছবিটা আবরার ভাইয়ের সাথে আমার কখনকার ছবি আপনি ঘেটে খুঁজে বের করে এনেছেন! কেন এনেছেন? আমাকে দোষী বানানোর জন্য! কি পাচ্ছেন এসব করে? আমার না আর সহ্য হচ্ছে না বিশ্বাস করেন!
নওমিকে প্রথমবার এতো চিৎকার করতে শুনল আহিল। স্তব্দ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো সে। শান্ত হয়ে বলার চেষ্টা করলো,
– নওমি, আমি কেন এসব খুঁজে বের করতে যাব? আমার ফোনে একটা আননোন নম্বর থেকে এই ছবিটা পাঠানো হয়েছে। আমি জাস্ট জানতে চেয়েছিলাম লোকটা কে! এখানে দোষী বানানোর কী আছে?
নওমি ব্যঙ্গাত্মক এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলল,
– পাঠানো হয়েছে? কে পাঠাবে? কোন ভূত এসে আপনার ফোনে আমার আর আবরার ভাইয়ার ছবি দিয়ে যাবে? এসব আপনার মনগড়া গল্প আহিল! আপনার মেল ইগো অনেক বেশি তাই আপনি এসব বানাচ্ছেন!
আহিল অনেকক্ষণ যাবত নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছিল কিন্তু নওমির একের পর এক চিৎকার আর অবাধ্য উত্তর ওর মেজাজ বিগড়ে দিতে লাগলো,
– নওমি! মুখ সামলে কথা বলো। আমি তোমাকে খুব ভদ্রভাবে জিজ্ঞেস করেছিলাম। আর যে ছবিটার কথা বলছ, সেখানে তুমি ওর হাত জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছো! যেকোনো স্বামী তার স্ত্রীর এমন ছবি অন্য কারো কাছ থেকে পেলে মাথা ঠিক রাখতে পারে না। আমি অন্তত তোমার মতো চিৎকার করে ঘর মাথায় তুলিনি।
তুলকালাম কাণ্ড বাঁধিয়ে বসেছে দুজন। দুজনের এই ঝগড়া আর জেদের টালবাহানায় আসল সত্যটা সেদিনও ঢাকা পড়ে রইল, আর তাদের সাজানো সংসারটার সুতো আরো একটু ছিঁ’ড়ে গেল!
এরপর থেকে বহুবার আহিলের কাছে ছবি এলেও সে সম্পূর্ণ ইগনোর করে যেতো। কয়েকবার সে চেয়েছে নওমির সাথে এই নিয়ে কথা বলতে কিন্তু মনে হতো নওমি বোধহয় আবার ভুল বুঝবে! হয়তো ভাববে আহিল ওকে সন্দেহ করছে ওকে বিশ্বাস করছে না। কিন্তু আহিল ওকে সন্দেহ করে নি সে বুঝতে পারছিল কোনো একটা ষড়যন্ত্র চলছে কিন্তু নওমির সাথে এই নিয়ে কিছুই বলতে পারছে না। নওমি ভুল বুঝবে এই ভয় থেকে সে চুপ করে গেল। এই চুপ করে যাওয়ায় তৃতীয় পক্ষকে এক ধাপ এগোনোর সুযোগ করে দিল!
সব কিছু স্বাভাবিক চলছিল কিন্তু এরপর আরেক কাণ্ড! হঠাৎ আহিলের হাতে আসলো একটা ডায়েরি। এই ডায়েরি আগে দেখেনি আহিল। কৌতুহলবশত ডায়রিটা খুলতেই কিছু লেখা চোখে পড়লো সাথে বিভিন্ন পাতা থেকে কিছু চিরকুট চিঠি ডায়েরি থেকে বেরিয়ে নিচে পড়ে গেল। একটা লেখায় চোখ আটকে গেল সাথে দমও যেন আটকে আসছিলো আহিলের। গোটা গোটা অক্ষরে লেখা,
– আমি আহিলকে কোনদিন মন থেকে মানতে পারিনি! ওর ব্যবহার আমার কাছে জাস্ট বিরক্ত লাগে! একটা মানুষ এতটা বিরক্তিকর কি করে হতে পারে? আমার ভালো ইচ্ছে অনিচ্ছে কিছুই দেখে না শুধু নিজের জোর খাটায় আমার উপর। আমার দম বন্ধ লাগে ওর সাথে! আমি অন্য একজনকে ভালোবাসি তাকেই চাই কিন্তু আহিলকে আমি এটা জানাতে পারবো না, ও বুঝবেও না। আমি ওকে সহ্য করতে পারছি না!
আহিল স্তব্ধ হয়ে রইলো। মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে! মনে হচ্ছে ও আকাশ থেকে ধপ করে মাটিতে পড়লো! আর বাকি সব চিঠির ভাষাগুলো ছিল অত্যন্ত আপত্তিকর যার প্রেরক এর নাম না থাকলেও প্রাপক ছিলো নওমি!
একজন স্বামী হিসেবে নিজের স্ত্রীর ডায়েরিতে এই হাতের লেখা দেখার পর আহিলের পক্ষে মাথা ঠিক রাখা অসম্ভব ছিল। তবুও এক এক করে সব চিঠি উল্টে পাল্টে পড়লো। কিছু কিছু চিঠি রিপ্লাই মনে হলো অর্থাৎ যাকে পাঠানো হয়েছে তার কাছ থেকে যাবে এমন। সে ডায়রিটা আবার খুলে লেখা মিলিয়েছে, বার বার মিলিয়েছে এই আশায় যে হয়তো লেখাটা নওমির নয় কিন্তু তার আশার উপর পানি ঢেলে বারবার একই উত্তরই আসছে! লেখাটা নওমিরই! যন্ত্রের মতো অনেকক্ষণ বসে শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে ছিলো সে। তারপর উঠে এইসব লুকিয়ে রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। আর এই নিয়ে কোনো কথা বলবে না নওমিকে। তার রুচি হচ্ছে না কিছু বলতে তাই বাসা থেকে বেরিয়ে খুব রাতে বাড়ি ফিরলো। সেদিন থেকে শুরু হলো ওদের সম্পর্ক পুরোপুরি শেষ করার শেষ করার এক নীরব, শীতল অধ্যায়! কোনো চিৎকার চেঁচামেচি ঝগড়া ছাড়া শুধু এক বুক অবজ্ঞা আর এক তরফা ঘৃণার নিঃশব্দ দহনের মাধ্যমে দূরে সরে যাওয়া!
এরপর হুট করে নওমির হারিয়ে যাওয়া। নওমি যাওয়ার পর আহিল নিজের ইগো ভুলে একবার গিয়েছিল তার বাড়িতে কিন্তু সেখানে গিয়ে পেল আরও এক ধাক্কা! নওমি সেখানে নেই। নওমির বাবার মতে,
নওমি যেদিন তাদের বাড়ি এসেছিল সেদিন তারা ওকে ফিরে যেতে বলেছিল কিন্তু নওমি যাবে না বলে অনেক কাহিনি করে শেষমেশ ওনারা জানিয়ে দেয় নওমির জায়গা হবে না এই বাড়িতে! যেই মেয়ে জামাইয়ের সংসার ফেলে চলে আসে তার মতো মেয়ের দরকার নেই তাদের।
নওমির বাবর কথা শুনে আহিল একটু চিন্তায় পড়লেও বি’ষ ঢালতে এগিয়ে আসে ওর সৎ মা!
– আমার ছুটু বোন দেখছে ওই মাইয়া তার মায়ের বইনের পোলার সাথে গেছে। এই রাইত বিরাইতে একটা ছেলের হাত ধইরা চইলা যে গেল মান সম্মান নাই তার?
আহিল অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
– ওর মার বোনের ছেলে কে? আর যেহেতু ওর সাথে গেছে নিশ্চয়ই ওর খালার বাড়ি যাবে?
নওমির মা মুখ বাকিয়ে বললো,
– ওর মায়ের পোলাডার নাম আবরার। তারা মাইয়ার খালার ঐহানে যায় নাই। কই গেছে আমরা বলবার পারি না! নিশ্চিত ওই পোলার লগে গেছে গা! এমনিও আগের থেকে ওই পোলার লগে নূরের ভাব বেশি। ঘেঁষাঘেঁষি কম ছিলো না বাবাগো! কিছু কইলেই তো আমি খারাপ!
আরো অনেক কিছু বলে আহিলকে উষ্কে দিল সে। আহিল কিছু না বলে বেরিয়ে আসলো। নওমিকে খুঁজার চেষ্টা করে নি আর। যে যেখানে গিয়ে ভালো থাকবে থাকুক! সেদিনের পর থেকে জীবন থেকে নওমি নামক অধ্যায় মুছে ফেলার সবরকম চেষ্টায় রত ছিলো আযলান। এক প্রকার সফলও ছিলো কিন্তু একাকিত্বের সময় কিংবা ঘুম না আসলে খুব মনে পড়তো। কম তো যত্ন করেনি মেয়েটাকে! কম ভালোবেসেছিল বুঝি? তবুও তার সাথে এমন হলো কেন? ওর জন্য একটু মায়া হলো না বুঝি? বিয়ের আগে কি বলতে পারতো না তার যদি পছন্দ থেকে থাকে? নাকি ওই নরকের জীবন থেকে বেরোনোর জন্য তাকে ব্যবহার করেছে মেয়েটা? তার আগের জীবনটাও তো সুখের ছিলো না এটা তো জানে আহিল!
অতীতের স্মৃতি থেকে বেরিয়ে এলো আহিল। চোখের কোণে পানির অস্তিত্ব দেখা গেল। বুড়ো আঙুল দিয়ে চোখের পানি মুছে উঠে দাঁড়াল সে। এখন ভেবে লাভ নেই। এখন ওর কাজ নওমিকে খুঁজে বের করা। কিভাবে বের করবে এইটা ভেবেই মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে তার।
অস্থিরভাবে পায়চারি করতে লাগল আযলান। তার মস্তিষ্কের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এখন শুধু তৌহিদের সেই কথাটা ঘুরপাক খাচ্ছে, “তুহিকে ফলো করলেই তোর অর্ধেক সমস্যার সমাধান!” কিন্তু তুহিকে সে চিনে। এতো কাঁচা সে নয় সে যখন বলেছে তখন আযলানের নওমির কাছে যাওয়ার মাঝে বাঁধা হয়ে দাঁড়াবেই! হঠাৎ সে দৌঁড়ে গিয়ে কাবার্ড খুললো। অনেকক্ষণ খুঁজে একটা শার্ট বের করে সেতার পকেট চেক করলো। ইশ কাগজটার করুন দশা হয়েছে! এই অবস্থা দেখে আযলান নিজেই নিজের কপাল চাপড়ালো।
– শিট! এই স্লিপটা এভাবে রেখে দিয়েছি!
এটা আদনানের হাসপাতালের স্লিপটা। কিন্তু পকেটে রাখায় ওইটা ধোয়ার সময় ভিজে কাগজটার দশা খুব খারাপ। আযলান সেটা খুব সাবধানে টেবিলে রেখে একটু চেপে ঠিক করার চেষ্টা করলো তারপর লেখাগুলো পড়ার চেষ্টা করলো। নাম আর একটা নম্বর ছাড়া কিছুই নেই। কি করবে ভেবে পাচ্ছে না সে। এখন মনে হচ্ছে তুহিকে ফলো করা ছাড়া আসলেই কোনো উপায় নেই!
– আম…মা!
নওমি আদনানকে নিয়ে বাসায় ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিল স্কুল শেষে। খাতা গুছিয়ে একটু পরই বের হবে। নওমি স্কুলে আদনানকে নিয়ে আসে সবসময়। আদনানও মাশাআল্লাহ ভালো বাচ্চা একটুও ডিসটার্ব করে না।
ছেলের আদুরে ডাক শুনে নওমির ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ক্লান্ত হরণকারী হাসি ফুটে উঠল। ডায়েরি আর কলমটা ব্যাগে রেখে আদনানকে কোলে তুলে নিল। আদনান মায়ের গলার সাথে নিজের কচি দুহাত পেঁচিয়ে ধরে কাঁধে মাথা রাখল। নওমি আদনানের দিকে তাকিয়ে বললো,
– বলো আব্বু?
আদনান দুই হাত একসাথে করে মুখের কাছে নিয়ে বললো,
– চুতি বাচা!(ছুটি বাসা)
নওমি হেসে বললো,
– হ্যাঁ এখন আমরা বাসায় যাব।
– তারপর আম্মু তোমাকে মজাদার সুজি রান্না করে খাওয়াবে। কেমন?
আদনান বুঝলো কি না কে জানে! ফিচফিচ করে হেসে উঠলো। নওমিও হেসে ওকে নিয়ে টিচার্স রুম থেকে বেরিয়ে গেল। অর্ধেক যেতেই আদনান আবার মায়ের কোল থেকে মাথা তুলে গোল গোল চোখ করে তাকাল। তার ছোট্ট কপালে কৌতূহলের ভাঁজ। সে আধো-আধো বোলে বলল,
– টুয়ি?
আদনানের মুখে এই নামটা শুনলে নওমির খুব হাসি পায়। অদ্ভুত হলেও খুব কিউট লাগে। সে হেসে আদনানের গালে ঠোঁট দাবিয়ে বললো,
– ওরে আমার বাচ্চা! তুমি খালামণিকে কি ডাকো এটা হু?
মায়ের হাসি শুনে আদনানও খিলখিল করে হেসে উঠল। মার কোল ঘেঁষে মুখটা লুকিয়ে নিয়ে নিলো আবারও। নওমি ওর পিঠে হাত বুলিয়ে হাসলো। আদনান তুহিকে ‘টুয়ি’ বলে ডাকে সেটা খুব আদুরে ডাক! ছোট বাচ্চা, অবুঝ মন তার কাছে যে ভালোবাসা দেয়, সেই তো আপন। ছোট থেকেই তুহির কাছে বেশি ভালোবাসা পেয়েছে! যতই কষ্ট হোক তুহি কিংবা নওমি কেউই ওকে ভালোবাসার কমতি রাখে নি আর না অন্য কিছুতে। আদনানকে খুব আদর যত্নে বড় করেছে। তুহি যখন প্রমোশন পেল, সে প্রথমে আদনানের জন্য অনেক জিনিস আর খাবার এনেছিল নওমির মনে আছে। এই মেয়েটা র’ক্তের না হয়েও ওদের যেই যত্ন করেছে কেউ করেনি তাই বোধহয় আদনান ওকে বেশি ভালোবাসে। মাঝে মাঝে তো তুহিকে পেলে নওমিকেও পাত্তা দেয় মা। তবে এইটা নওমির খারাপ লাগে না বরং ভালো লাগে। তার মনে আসে,
– যাক এই দুনিয়ায় কেউ তো আছে যে আদনানকে নিঃস্বার্থ ভালোবাসে।
ওর ভাবনার মাঝে আদনান আবার ডাকলো। মুখ ভার করে ছলছল চোখে তাকিয়ে বললো,
– মা টুয়ি…
– তুহি আসবে তো আব্বু! আমরা বাসায় গেলেই দেখবে এসে যাবে। কান্না করে না!
তুহি প্রতিদিন একবার হলেও এসে দেখে যায়। ব্যস্ততা বাড়লে সেদিন আসতে পারে না। কিন্তু সর্বক্ষণ খবর নেয়। আর আদনান হচ্ছে তুহিকে তার লাগবেই! দিনে হাজারবার জিজ্ঞেস করে ফেলে তুহির কথা।
নওমি আলতো করে আদনানের ওলট-পালট হয়ে যাওয়া নরম চুলগুলো হাত দিয়ে ঠিক করে দিল। মায়ের আশ্বাসে আদনানের মেঘ করা মুখটা আবার একটু শান্ত হলো। সে নিজের ছোট্ট চিবুকটা নওমির কাঁধে ঠেস দিয়ে বড় বড় চোখ করে করিডোরের দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে রইল। নওমি ব্যাগটা কাঁধে ভালো করে সামলে নিয়ে ধীরপায়ে স্কুলের মেইন গেটের দিকে এগিয়ে গেল। ছুটির পর স্কুল প্রাঙ্গণটা এখন অনেকটাই শান্ত, দু-একজন স্টাফ ছাড়া তেমন কেউ নেই। সে আদনানের মাথায় ছায়া দেওয়ার চেষ্টা করে ওড়নার আঁচল একটু টেনে নিলো।
নূর ই মহব্বত পর্ব ৬
এই সময় রিকশা পাওয়া খুব বেশি কষ্টের। রাস্তার একপাশে এসে দাঁড়িয়ে নওমি একটা রিকশার জন্য এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিল ঠিক তখনই দূরে মনে হলো একটা পরিচিত মুখ দেখলো সে। আবার দেখার জন্য ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই ঝটকা খেলো সে। মেরুদণ্ড বেয়ে শীতল স্রোত নেমে গেল, পুরো শরীর কেঁপে উঠলো। আদনানকে বুকে চেপে দৃষ্টি সরিয়ে দ্রুত রিকশা খুঁজতে লাগলো। ততক্ষণে ওপাশ থেকে বড় বড় পা ফেলে রাস্তা পার করে এগিয়ে এলো আযলান আজওয়াদ! ঠিক নওমির সামনে এসে দাঁড়াল। নওমি দুই কদম পিছিয়ে গেল। তখনই শোনা গেল আকুল কণ্ঠের পরিচিত কণ্ঠস্বর,
– নওমি! আর কত পালাবে নওমি? আর কত লুকোচুরি চলবে? এবার তো ধরা দিতেই হলো!
