নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৫৮
জান্নাতুল ফেরদৌ
বেশ ক’দিন ধরেই এই পোটলা টা দেখে আবিদ চন্দ্রার কাছে। প্রথমে গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু খুলে দেখতেই চোখ ছানাবড়া। পোটলার ভিতরে কাগজে আঁকা বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রের নকশা।
তলোয়ারের ফলার মাপ, অদ্ভুত আকৃতির বর্শা আর কতগুলো ধাতব যন্ত্রের বিস্তারিত পরিমাপ।
আরেকটা কাগজে কিছু হিসাব লেখা। ধাতু কতটা লাগবে সাথে ওজন এর তারতম্য।
আবিদের মস্তিষ্কে ধাক্কা লাগলো জিনিসগুলি তে।
মনোযোগের সহিত কাগজগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলো। প্রভা তখনও জানালার বাইরে তাকিয়ে।
“শাহজাদি…”
প্রভা ঘুরে তাকালো।
“হুম?”
আবিদ কাগজগুলো সামনে ধরলো।
“এগুলো কী?”
চন্দ্রা চমকে উঠলো। বিরক্তিতে গজগজ করতে করতে এগিয়ে এসে কাগজগুলো হাতে নিল। এর জ্বালায় কোথাও কিছু রেখেও শান্তি নেই। সব খুঁচিয়ে বের করে। কথা কাটাতে আমতা আৃতা করতে লাগলো
“ওগুলো?”
“হ্যাঁ, ওগুলো।”
আবিদের গলায় অস্বস্তি। প্রশ্ন করতেও কেমন লাগছে। তবুও জানা টা তার দরকার
“এসব অস্ত্রের নকশা তোমার কাছে কেন?”
প্রভা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর শান্ত স্বরে বলল
“আমি শখ করে এঁকেছি। অস্ত্রের নমুনা নিয়ে কাজ করা আমার শখ।”
“আপনি?”
“হ্যাঁ।”
আবিদ ভ্রু কুঁচকালো।
“কেন?”
রত্নপ্রভা এবার বিছানার পাশে এসে বসল।
“সাহাবাদের সৈন্যদের জন্য নিখুঁত একজন অস্ত্র শৈল্পি বড় দরকার। আমি হতে চাই সেটা।”
কেন জানি না কথা গুলো বিশ্বাস করতে মনে চায় না আবিদের। যদিও তার কথায় যুক্তি আছে, কিন্তু মন সায় দেয় না। প্রভা বুঝলো আবিদের অভিব্যক্তি।
“আমি অভিনব কোনো অস্ত্র তৈয়র করতে চাই। যা সম্পর্কে শত্রুপক্ষ অবগত থাকবে না। আমাদরে বিজয় নিশ্চিত করতে আমি এই পদক্ষেপ নিছি।”
সে একটা কাগজ মেলে আবিদের সামনে ধরলো।
“এ…এই যে এটা দেখুন। এটা বর্শাকৃতি হলেও এটার অগ্রভাগে লুকায়িত থাকবে সরু তলোয়ার। ওজন কম। কিন্তু আঘাতের ক্ষমতা বেশি।”
“আর একটা দেখুন”
আরেকটা নকশা দেখালো সে।
“এটা পাহাড়ি অঞ্চলে যুদ্ধের জন্য সুবিধাজনক। সরু অস্ত্র গুলো ভীষণ কাজে দেয়…. “
প্রভার কথা শেষ হওয়ার আগে আবিদ অবাক হয়ে বলল
“এত কিছু আপনি কি করে জানেন?”
আমার বড় ভাই অনিরুদ্ধ অস্ত্র নির্মাণ আর ধাতুবিদ্যায় পারদর্শী ছিল। তার কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছিলাম। পরে সুযোগ পেলে নিজেও নকশা আঁকতাম। সাহাবাদের কর্মশালায় কয়েকটা পরীক্ষামূলকভাবে বানানোও হয়েছে।”
কথাগুলো শুনে আবিদ চুপ হয়ে গেল। বুকের ভেতর কেমন করে মোচড় দিল। স্বীকার করুক আর না-ই করুক, প্রথম মুহূর্তে তার মনে সন্দেহ জেগেছিল। এই নকশাগুলো ভুল ব্যাবহার এর জন্যও হতে পারে। সেই ভাবনাটাই এখন তাকে কষ্ট দিচ্ছে। প্রভা কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। বোঝার চেষ্টা করছে আবিদের মতিগতি। আস্তে করে বলল
“আপনি কি ভেবেছিলেন আমি এগুলো মারজান বা অঙ্কুরকে দেওয়ার জন্য রেখেছি?”
আবিদ চমকে তাকালো। কথাটা সে মুখ ফুটে বলেনি। তবুও প্রভা বুঝে ফেলেছে। কিছুক্ষণ নীরব থেকে আবিদ মাথা নিচু করলো।
“আমি… আমি আসলে…”
কথা খুঁজে পেল না। প্রভা দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
“আপনার দোষ নেই। আমার অতীত এমন যে মানুষ সন্দেহ করবেই।”
আবিদের বুকটা আরও ভারী হয়ে গেল।
সে ধীরে ধীরে কাগজগুলো গুছিয়ে রত্নপ্রভার হাতে দিল।
“ক্ষমা করবেন।”
প্রভা কাগজগুলো আবার থলির ভেতর রেখে দিল। আবিদের দিকে তাকিয়ে বলল
“স্ত্রী হই আপনার। এত অবিশ্বাস করলে চলে না নায়েব মশাই।”
রাত গভীর হলে দুজনই শুয়ে পড়লো। শাখা মাঝখানে ঘুমিয়ে।
সকাল গড়াতেই কালো চাদর মুড়িয়ে বেরিয়ে পড়লো মেহেরুন্নেসা। গতরাতে মিরান হঠাৎ উধাও। কোথাও তাকে খুঁজে পাওয়া গেল না। কিন্তু তার অপেক্ষায় মেহেরুন্নেসা বসে থাকতে পারবে না। একাই চলে গেলো বন্দিশালার উদ্দেশ্যে। পথ টা সে ও চেনে। রাত বিরেতে চন্দ্রা কে পিছু করতে গিয়ে অনেক গোপন পথের সাথে পরিচিত হয়েছে সে। কাউকে সাথে নিল না। এমনকি সুনেহেরা কেও না। সুনেহেরা যেতে চেয়েছিল। কিন্তু মেহের রাজি হয়নি। একজন ধরা পড়লে আরেকজন তো বাঁচবে। আর দুজন ধরা পড়লে দুজনই মরবে। নিজের তো মরার ভয় নেই।
সাহাবাদ প্রাসাদের পেছনের জঙ্গল ঘুরে বহুদিনের পুরোনো একটা শুকনো কূপের কাছে এসে দাঁড়ালো মেহেরুন্নেসা। সাধারণ চোখে দেখলে জায়গাটা পরিত্যক্ত। কিন্তু কূপের ভেতরের ভাঙা ইট সরাতেই দেখা দিল নিচে নামার সরু পথ। গভীর অন্ধকার সরু পথ। স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। মশাল জ্বালিয়ে নিচে নামলো মেহের। অনেকক্ষণ হাঁটার পর দেখা দিল সেই পুরোনো সুরঙ্গ। বহু বছর আগে রাজপরিবার বিপদের সময় পালানোর জন্য তৈরি করেছিল। পরে অঙ্কুরও এর ব্যবহার শুরু করে। সুরঙ্গটা সরাসরি প্রাসাদের নিচের বন্দিশালার কাছে গিয়ে উঠেছে। মেহের এর ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি ফুটলো। অন্তত এতটুকু যেন জানা যায় বাকের শাহ্ কোথায়। মরণের ভয় কে পায়ে মাড়িয়ে এগোতে লাগলো সে। দূর থেকে পানির টুপটাপ শব্দ ভেসে আসছে। পাথরের দেয়ালে মশালের আলোয় আবছা দেখা যা পথ।
হঠাৎ টক করে একটা শব্দ হলো। সুড়ঙ্গের সরু লোহার ছিটকিনিটা খুলল মনেনহয় কেউ। মেহের এর পা থেমে গেল। সামনে আরেকটা শব্দ।
কেউ আছে মনে হচ্ছে। কোমর থেকে ছুরি বের করলো সে। সামনে এগিয়ে যেতেই মশালের আলোয় একটা বিশাল অবয়ব ফুটে উঠলো। চোখ সরু হয়ে এলো মেহেরুন্নেসার। লোকটার মুখ দেখেই সে থমকে গেল।
“আপনি?”
সামনে দাঁড়িয়ে আছে মাহাদি। সম্পূর্ণ বর্ম পরিহিত। হাতে তলোয়ার। মাহাদি শান্ত গলায় বলল,
“ফিরে যান।”
মেহের হেসে উঠলো।
“আপনি তাহলে সত্যিই ওদের পক্ষ নিয়েছেন?”
“আমি যা করছি, জেনে বুঝেই করছি।”
“বাহ।”
মেহের মাথা নেড়ে বলল,
“আপনার ব্যবহারে আমরা সত্যিই সন্তুষ্ট মাহাদি। শাহজাদার নাকি জহুরি চোখ। কিন্তু আজ তা ভুল প্রমাণ হলো। উনি বলতো আপনি সেনাপ্রধান কম তার বন্ধু বেশি।”
মাহাদির চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো। নিজেকে সামলে নিয়ে বলল
“ফিরে যান সম্রাজ্ঞী। আজ আপনাকে যেতে দিতে পারবো না।”
“আমিও খালি হাতে ফিরবো না।”
এরপর আর কোনো কথা হয়নি। ঝনঝন শব্দে একে অপরের সাথে ধাক্কা খেল দুই অস্ত্র। সুরঙ্গের ভেতর প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে পড়লো।
মেহেরুন্নেসা দ্রুত, ভীষণ দ্রুত। কিন্তু মাহাদি যেন পাথরের পাহাড়। প্রতিটা আঘাত ঠেকিয়ে দিচ্ছে। তলোয়ার এ কাজে দিচ্ছে না। ছুরি চালালো মেহের । মাহাদি শরীর ঘুরিয়ে এড়িয়ে গেল। আবার তলোয়ার চালালো। মেহের দেয়ালে ভর দিয়ে লাফিয়ে উঠলো।
দুজনেই সাহাবাদের সেরা যোদ্ধাদের একজন।
একসময় মেহের বুঝতে পারলো। মাহাদি তাকে মোটেও মারার চেষ্টা করছে না। শুধু পথ আটকে রাখছে। এই বিষয়টাই তাকে আরও বিরক্ত করে তুললো।
“মারছেন না কেন?৷ এই যে আমি অস্ত্র ফেললাম। মেরে দিন। ষোলোকলা পূর্ণ হোক”
দাঁতে দাঁত চেপে বলল সে। মাহাদি কোনো উত্তর দিল না। মেহেরুন্নেসা হঠাৎ তলোয়ারের বাঁট দিয়ে সজোরে আঘাত করলো মাহাদির কাঁধে। ব্যথায় ভারসাম্য হারালো সে। ঠিক সেই সুযোগে মাহাদির হাত থেকে তলোয়ার ফেলে দিল। সাথে সাথে তলোয়ারের ফলাটা এসে থামলো মাহাদির গলায়।
মাহাদির বর্মে আবৃত হাতের উল্টো ধাক্কায় ছিটকে পড়লো মেহেরুন্নেসার তলোয়ার।
ক্রোধে ফুঁসছে মেহের। মাহাদি ভগ্ন গলায় বলল
“ফিরে যান সম্রাজ্ঞী”
কিছুক্ষণ পর ক্লান্ত, আহত আর প্রচণ্ড বিরক্ত অবস্থায় উত্তরের প্রাসাদে ফিরলো মেহের। তার কাঁধে আঘাতের চিহ্ন। হাতের চামড়া ছড়ে গেছে।
সুনেহেরা দৌড়ে এলো তাকে দেখে।
“কি হয়েছে ভাবি?”
মেহের ধপ করে বসে পড়লো।
“বন্দিশালায় পৌঁছাতে পেরেছিলাম।”
সবাই একসাথে সামনে এগিয়ে এলো।
বাইজিদ, চন্দ্রা , আবিদসকলেই।
“তারপর?”
মেহের বিরক্ত মুখে বলল,
“তারপর আপনার সেনাপতি সাহেব দাঁড়িয়ে ছিলেন।”
সুনেহেরার বুক ধক করে উঠলো।
“মাহাদি?”
“হ্যাঁ।”
“আমার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালো। যেতে দিল না। এক পশলা যুদ্ধ ও হয়ে গেল। তবুও হার মানতে হলো আমায়।”
কক্ষের সবাই চিন্তিত মেহের এর কথা শুনে। এমনটা যদি হয় তাহলে তাদের যুদ্ধে জেতা অসম্ভব হয়ে যাবে। মাহাদি স্বয়ং তাদের পক্ষে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো বাইজিদের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠলো। সবাই অবাক হয়ে তার দিকে তাকালো। মেহেরুন্নেসা বলল,
“আপনি হাসছেন?”
বাইজিদ এবার পুরোপুরি হেসে ফেললো।
“হ্যাঁ। কারণ আমি যেটা ভাবছিলাম, সেটাই সত্যি হচ্ছে।”
সুনেহেরা বিভ্রান্ত হয়ে বলল
“মানে?”
বাইজিদ টেবিলে আঙুল ঠুকলো।
“যদি মাহাদি সত্যিই মারজানের লোক হতো… তাহলে আজ মেহের এখানে বসে কথা বলতে পারতো না।”
কথাটা শুনে কক্ষের সবাই থমকে গেল। বাইজিদ মেহের এর মাথায় হাত দিয়ে বলল,
“মাহাদি চাইলে অনায়াসেই তোমাকে হত্যা করতে পারতো। কিন্তু করেনি। বরং পথ আটকে ফিরিয়ে দিয়েছে। এটা ভেবে দেখেছো একবার?”
বাইজিদের চোখ চকচক করে উঠলো।
“ আব্বা সুরক্ষিত আছে এবং মাহাদির কাছেই আছে।”
সবাই নিজের নিজের মতো করে ঘটনাগুলো মিলানোর চেষ্টা করছে। বাইজিদ উঠে দাঁড়ালো।
মেহেরুন্নেসা ভ্রু কুঁচকে বলল
“কি ভাবছেন?”
বাইজিদ টেবিলের ওপর ছড়িয়ে থাকা মানচিত্র গুটিয়ে বলল
“কেউ চিন্তা করো না। আব্বা সম্পূর্ণ নিরাপদ আছেন। যদি মাহাদি সত্যিই মারজান এর গোলাম হতো। তাহলে কোনো ঝুঁকি না নিয়ে সরাসারি মেহেরকে হত্যা করতো যাতে আমরা কোনো তথ্যই না পাই।”
সবাই চুপ করে শুনল। বাইজিদ আবার বলল,
“মাহাদি যুদ্ধের মানুষ, বুদ্ধিমান। কথা না বলে ইঙ্গিত দিতে জানে। সে আমাদের বলেছে আক্রমণ করো।”
সুনেহেরার চোখ বড় হয়ে উঠলো। মেহেরুন্নেসার বুকের ভেতরও আশার সঞ্চার হলো। সেই রাতেই চূড়ান্ত পরিকল্পনা করা হলো। আগামীকাল
পরদিন থেকেই উত্তরের প্রাসাদে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়া শুরু।লোহার কারখানায় আগুন জ্বালিয়ে
তলোয়ারে ধার দেওয়া হচ্ছে। তীরভর্তি ঝুলি সাজানো হচ্ছে। পুরো প্রাসাদ যেন আবার যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। মেয়ে দুটোর মুখের দিকে তাকালে ভালো লাগে না মেহেরুন্নেসার। এমন জীবন সে মেয়েদের দিতে চায় নি। জান্নাত দুদিন ধরে কান্নাকাটি করছে তার বিড়াল টার জন্য। মহলে ফেলে এসেছে তাকে। বাবা মাকে বলার সাহস হয় না। আবিদের কাছে গিয়ে জানালো বয়াপারটা। আবিদ আর জান্নাত এর খুব মিষ্টি সম্পর্ক। আবিদের মেয়ে শাখা হলেও প্রথম মেয়ে ছিল জান্নাত। মেয়েকে কথা দিল তার বিড়াল তুশি কে সুন্দর মত তার কাছে এনে দিবে।
বহু বছর পর সাহাবাদের নারী সৈন্যরা যুদ্ধের পোশাক পরলো। শেষ দুর্গের সেই দুর্ধর্ষ নারীরা।
যারা একসময় অঙ্কুরের বাহিনীর বুক কাঁপিয়ে দিয়েছিল। অধিকাংশই মিশরীয়। বিকেলের দিকে মেহেরুন্নেসাও প্রস্তুত হয়ে বের হলো। বাইজিদ পথ আটকালো।
“শোনো না মেহের। বলছি তোমার যাওয়া প্রয়োজন নেই।”
মেহেরুন্নেসা অবাক হয়ে ভ্রু উঁচিয়ে বলল
“এটা আপনি বলছেন শাহজাদা?
“হ্যা”
“কিন্তু কেন?”
“কারণ আমি বলছি।”
“খুব সুন্দর কারণ।”
বাইজিদ বিরক্ত হলো।
“মেহের, এটা যুদ্ধ আর তোমার দুইটা মেয়ে আছে।”
মেহেরুন্নেসার সিল্কের কালো কাপড়ে আবৃত মুখ। শুধু কাজল কালো চোখ দুইটা দৃশ্যমান। বড় বড় করে তাকিয়ে বলল
“আপনিও তো যাচ্ছেন। জান্নাত আর সাহারা কি কেবল আমার মেয়ে? আপনার নয় কি? এই রাজ্যের দায়িত্ব আমারও আছে।”
বাইজিদ বুঝলো তর্ক করে লাভ নেই। শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দিল। আবিদও একই কথা বলেছিল চন্দ্রপ্রভাকে। কিন্ত লাভ হলো না। তারা যুদ্ধে প্রাণ ত্যাগ করলে তাদের সন্তান রা জানবে তাদের মা শহীদ হয়েছে।
অবশেষে সিদ্ধান্ত হলো সব শিশুদের উত্তরের প্রাসাদেই রাখা হবে। জান্নাত সাহারা আর শাখা কে দেখাশোনার জন্য রাখা হলো পাঁচজন দক্ষ নারী সৈনিক। তারা যুদ্ধ করবে না। শুধু শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। জান্নাত অবশ্য ব্যাপারটা মোটেও পছন্দ করলো না। সে মুখ ফুলিয়ে বলল,
“আমিও যাবো।”
সুনেহেরা হাঁটু গেড়ে বসে বোঝালো।
“আমরা খুব তারাতাড়ি ফিরে আসবো মা। তারপর তোমাদের মহলে নিয়ে যাব”
জান্নাত উৎসুক হয়ে বলল
“আমি তলোয়ার চালাতে পারি। দাড়াও আমার ছোট তলোয়ার টা নিয়ে আসি”
আবিদ কাঠের তলোয়ার বানিয়ে দিয়েছিল জান্নাত কে। সেটা নিয়ে যেতে চাইছে মেয়েটা। বহু কষ্টে তাদের বুঝিয়ে রেখে যাওয়া হলো মহলে। মেহের তিন মেয়েকে চুমু খেল আদর করে।
সূর্য ডুবতে শুরু করলো। পশ্চিম আকাশ লাল হয়ে উঠেছে। মনে হচ্ছে পুরো আকাশ রক্তে রাঙা।
সেই আলোয় একে একে বের হলো সৈন্যদল।
সামনে বাইজিদ তার ডান পাশে মেহেরুন্নেসা। বাম পাশে সুনেহেরা। আরেক পাশে আবিদ। পেছনে সারি সারি অশ্বারোহী। প্রত্যেকে বহন করছে তলোয়ার বর্শা ধনুক সাথে ব্যক্তিগত ছুরি।
সবকিছু প্রস্তুত, তাদের পরিকল্পনা সন্ধ্যা সময় আচমকা আক্রমণ করার। শেষ দুর্গের নারী সৈন্যরা কালো বর্ম পরে দাঁড়িয়ে আছে। দূরে সাহাবাদ প্রাসাদের মিনারগুলো দেখা যাচ্ছে।
অন্ধকার নেমে আসছে চারিদিকে। ঘোড়ার খুরের শব্দে মাটি কাঁপছে। সাহাবাদের বাহিনী নিঃশব্দে এগিয়ে চলেছে প্রাসাদের দিকে।
বাইজিদ আগেই পরিকল্পনা সাজিয়ে রেখেছে।
সামনের বাহিনীর নেতৃত্বে সে নিজে। ডানদিকের প্রাচীর ঘিরে আক্রমণ করবে আবিদ এবং তার অশ্বারোহী দল। বামদিক দিয়ে প্রবেশ করবে সুনেহেরা ও শেষ দুর্গের নারী সৈন্যরা।
আর সবচেয়ে পেছনে ছদ্মবেশী বাহিনী যারা সম্পূর্ণ মারজান এর বাহিনী দের মত সাজ পোষাকে সেজেছে। এই কঠিন চাল টা চেলেছে বাইজিদ। যদিও যুদ্ধে ছলনার আশ্রয় নেওয়াটা তার ব্যাক্তিত্বের সাথে যায় না। কিন্তু যে যেমন তাকে সেভাবেই জবাব দিতে হয়।
মেহেরুন্নেসা ধনুক এবং তলোয়ার উভয়ই বহন করছে। পিছনে তারই নেতৃত্ব দেওয়া নারী সৈন্য দল। প্রাসাদের কাছাকাছি পৌঁছাতেই পাহারাদাররা বিপদ বুঝে শিঙ্গা বাজিয়ে উঠলো।
কিন্তু তখন দেরি হয়ে গেছে।
“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ!”
বাইজিদের বজ্রকণ্ঠে চারদিক কেঁপে উঠলো।
পরক্ষণেই শুরু হলো আক্রমণ। গর্জন করে খুলে গেল প্রধান ফটক। বিশাল গাছের গুঁড়ি দিয়ে একের পর এক আঘাত করছিল সৈন্যরা। তৃতীয় আঘাতেই ভেঙে পড়লো দরজা। ভেতর থেকে ছুটে এলো মারজানের সৈন্যরা। তাদের সংখ্যাও কম নয়। কিন্তু যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় তারা সাহাবাদের সেনাদের ধারেকাছেও না। প্রথম সারির সৈন্যরা বর্শা তাক করতেই বাইজিদ হাত উঠালো। সঙ্গে সঙ্গে সামনে থাকা ঢালবাহিনী হাঁটু গেড়ে বসে গেল। টং! টং! টং!
বর্শাগুলো এসে ঢালে আঘাত করতে লাগলো।
সাথে সাথে পেছন থেকে ধনুর্বিদরা তীর ছুড়লো।
একের পর এক সৈন্য মাটিতে লুটিয়ে পড়তে লাগলো। ডানদিকের প্রাচীর বেয়ে উঠে গেছে আবিদের দল। উপরে দাঁড়িয়ে থাকা তীরন্দাজদের কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সরিয়ে দিল তারা। প্রাচীর দখল হতেই নিচে নেমে এলো অশ্বারোহীরা। দুই দিক থেকে চেপে ধরলো শত্রুদের। অন্যদিকে সুনেহেরা যেন ঝড়। তার তলোয়ারের আঘাতে একের পর এক সৈন্য মাটিতে পড়ছে। শেষ দুর্গের নারী যোদ্ধারাও পিছিয়ে নেই। তাদের সমন্বিত আক্রমণে প্রাসাদের বামদিকের প্রতিরক্ষা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়লো।
দরবারের সামনে এসে দাঁড়ালো বাইজিদ।
তার বর্মে রক্ত, তলোয়ারে রক্ত।
মারজানের বাহিনী তখন প্রায় ছত্রভঙ্গ। কেউ পালাচ্ছে, অনেকেই আত্মসমর্পণ করেছে। আবার শেষ চেষ্টা করছে বাঁচার। একসময় বিজয়ের ধ্বনি উঠলো চারদিকে।
“সাহাবাদ জিন্দাবাদ”
“সাহাবাদ জিন্দাবাদ!”
“সাহাবাদ জিন্দাবাদ!”
সুনেহেরা হাঁপাতে হাঁপাতে চারপাশ দেখলো। তার চোখ মাহাদি কে খুজছে। কিন্তু গোটা যুদ্ধে মাহাদির লেশমাত্র দেখা গেল না। মেহেরুন্নেসাও স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো। শেষ পর্যন্ত তারা পেরেছে। বিজয় আজ তাদের।
কিন্তু তখনই দূর থেকে ভেসে এলো ধুপধাপ শব্দ। মনে হচ্ছে শত শত ঘোড়া একসাথে ছুটে আসছে।
বাইজিদের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। সে মাথা তুলে তাকালো। দূরের ধুলোয় আকাশ ঢেকে যাচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যেই দেখা দিল নতুন বাহিনী। কিন্তু এরা মারজানের সৈন্য নয়। এদের পোশাক সম্পূর্ণ ভিন্ন। কালো আর গাঢ় নীল রঙের লম্বা বর্ম। মুখের অর্ধেক ঢাকা ধাতব মুখোশে। তাদের পতাকাও অচেনা। কালো পটভূমিতে রূপালি সাপের প্রতীক আঁকা। এমন প্রতীক সাহাবাদের কেউ আগে দেখেনি।
“প্রতিরক্ষা নাও!”
বাইজিদ গর্জে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে সৈন্যরা পুনরায় অবস্থান নিল। কিন্তু ততক্ষণে নতুন বাহিনী ঝড়ের বেগে এসে পৌঁছে গেছে। সংখ্যায় তারা কয়েক হাজার। সবার হাতে মশাল। তাদের শৃঙ্খলা দেখে বোঝা যাচ্ছে এরা সাধারণ ভাড়াটে সৈন্য নয়।
মাঝখানে এগিয়ে আসছে বিশাল এক চতুর্দোলা।
চারপাশে অভিজাত রক্ষী। লোহার বর্মে ঢাকা। তাদের হাতের অস্ত্রও অদ্ভুত। লম্বা বাঁকানো ফলার বর্শা। সবাই তাকিয়ে আছে সেই চতুর্দোলার দিকে। (আমি যতদূর জানি সৈন্য দলের মাথে তাদের নেতা যে উচু গাড়ি আর পালকির মত মিক্সড জিনিস টাতে আসে সেটাকে চতুর্দোলা বলে। ভুল হলে সঠিক টা কেউ জানলে জানাবেন)
বাইজিদ চোখ সরু করলো। মেহেরুন্নেসার বুক ধুকপুক করছে। সুনেহেরা শক্ত করে তলোয়ারের হাতল চেপে ধরলো। পর্দা সরে গেল। ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো একজন মানুষ। কালো পোশাক। কাঁধ পর্যন্ত নেমে আসা চুল। ঠোঁটে ভয়ংকর হাসি।
চোখ দুটো আগের মতোই অস্বাভাবিক উজ্জ্বল।
বয়স যেন থেমে আছে। এক মুহূর্তে চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সুনেহেরা ফিসফিস করে বলে উঠল।
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৫৭
“না…”
মেহেরুন্নেসার মুখ সাদা হয়ে গেল। বাইজিদের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো। চতুর্দোলার ভেতর দাঁড়িয়ে আছে অঙ্কুর।
পাঁচ বছর ধরে যে অদৃশ্য ছিল। পাঁচ বছর ধরে যার কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। সে আজ ফিরে এসেছে। সাথে এসেছে এক অজানা শক্তি। অজানা সেনাবাহিনী। এমন ভয়ংকর ভাবে ফিরে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো পাঁচটা বছর ধরে।
