নেশাক্ত প্রহর পর্ব ১৩
রূপন্তী সরকার
রিদ প্রতিদিন ইয়াশফাকে স্কুলে রাখতে যায়। যাওয়ার পথে রুহিকেও ভার্সিটি নামিয়ে দেয়। কি কপাল ওর এক সময় বউকে স্কুলে রাখতে যেতো এখন আবার বউমাকেও রাখতে যেতে হয়। রিদের মাঝেমাঝে ঋষভের উপর রাগ হয়। বিয়ে করেছে ও বউটাও ওর কিন্তু বউকে স্কুলে রেখে আসতে হয় তার বাপকে। কেনো ভাই এটা আবার কেমন নিয়ম? রিদ কি ঋষভকে শিখিয়ে দিয়েছিলো কট খেতে? ঋষভ তো নিজেই কট খেয়েছে। আর জ্বালা হয়েছে রিদের। ইয়াশফাকে স্কুলে নিয়ে গিয়ে ক্লাসে বসিয়ে দিলো রিদ। ইয়াশফার বান্ধবী তানহা বার বার রিদকে দেখছে। রিদ ইয়াশফার হাতে স্কুল ব্যাগ দিয়ে বললো
“ভালো করে ক্লাস করো ছুটির পর আমি বা ঋশ নিতে আসবো। একা একা কোথাও যাবে না। ঠিক আছে এটাম বোম?”
ইয়াশফা মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বললো।
রিদ চলে যাওয়ার পর তানহা ইয়াশফাকে বললো
“এই বাবু শোন আমাকে তোর শাশুড়ী বানাবি প্লিজ?”
ইয়াশফা অবাক চোখে তানহার দিকে তাকালো। এই মেয়ের মাথা ঠিক আছে? কি বলছে এসব? ইয়াশফা তানহাকে বললো
“সকাল সকাল বাংলা টাংলা খেয়ে এসেছিস নাকি? আমার শাশুড়ী থাকতে তোকে কেনো শাশুড়ী বানাবো?”
তানহা মুখ কালো করে বললো
“ভাই তোর শশুরটা কি হ্যান্ডসাম রে যেমন ফর্সা তেমন লম্বা পুরাই ক্রাশ খাইছি। এমন ছেলে আমি হারিকেন হাতে নিয়ে খুঁজলেও পাবো না। প্লিজ বইন পটিয়ে দে তোর শশুরকে। কথা দিচ্ছি দুই শাশুড়ী বউমা মিলে সারাদিন অনেক মজা করবো”
ইয়াশফা তানহার দিকে বড়ো বড়ো চোখ করে বললো
“মারবো টেনে এক চড়। ছকিনা মহিলা। ঘরে নেই ইয়ে শালি করবে নাকি আমার শশুর কে বিয়ে। শখ কতো”
তানহা ইয়াশফার দিকে বোকার মতো চেয়ে রইলো “ইয়ে” মানে কি?
তানহা ইয়াশফাকে বললো
“না ভাই এমন বলিস না। আমার তোর শশুরকে লাগবেই। আমি সিরিয়াস”
ইয়াশফা রাগি চোখে তানহার দিকে তাকালো। তানহা আর কিছু না বলে একটা লাভ লেটার লিখলো। সেখানে লিখা ছিলো
“প্রিয় ভবিষ্যৎ স্বামী
আশা করছি ভালো আছেন। আপনাকে ভালোবেসে আমিও আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। আমি বোঝাতে পারবো না আপনাকে কি পরিমাণ ভালোবেসে ফেলেছি। হয়তো আপনি বুড়ো হয়ে গেছেন তবে বিশ্বাস করুন আমার আপনাকেই লাগবে। আপনি প্লিজ আমাকে বিয়ে করতে রাজি হয়ে যান? আমি প্রমিজ করছি আপনাকে খুব ভালোবাসবো”
ইতি: তানহা ”
ছুটির পর রিদ ইয়াশফাকে নিতে আসে। ঋষভকে বলেছিলো তবে ঋষভ বাড়িতে নেই। তাই রিদকেই আসতে হলো। রিদ এসে ইয়াশফার হাত ধরলো। রিদ ইয়াশফাকে গাড়িতে বসিয়ে নিজে বসতে যাবে এমন সময় তানহা এসে রিাের হাতে লেটার ধরিয়ে দিয়ে একটা মুচকি হাসি দিয়ে চলে গেলো। রিদ লেটার হাতে নিয়ে অবাক হয়ে তানহার যাওয়ার পানে চেয়ে আছে। ইয়াশফা গাড়ির জানালা দিয়ে রিদকে বললো
“কালনাগিনী হইতে সাবধান। আমার শাশুড়ী মুরগি বলে সবাই যে মুরগি থাকবে এমনটা না।”
রিদ ইয়াশফার কথা কিছুই বুঝলো না। রিদ গাড়িতে গিয়ে বসলো। এরপর লেটার খুলে দেখলো। লেটারটা পড়ার সাথে সাথে রিদ কাশতে লাগলো। কাশতে কাশতে রিদের চোখ থেকে জল পড়ছে। ইয়াশফা ওর স্কুল ব্যাগ থেকে জল বের করে রিদকে দিলো। রিদ জল খেয়ে আবারো লেটারের দিকে তাকালো। রিদ এখন ইয়াশফার কথার মানে বুঝতে পারলো। রিদ ইয়াশফার দিকে তাকিয়ে শয়তানি হাসি দিলো। ইয়াশফাও একটা শয়তানি হাসি দিলো।
মিহি ঘরে কাপড় ভাজ করছে। এমন সময় ইয়াশফা ঘরে আসলো। মিহি ইয়াশফাকে দেখে বললো
“খিদে পেয়েছে? দূধ রুটি খাবে?”
ইয়াশফা অবাক হচ্ছে মিহির আচরণে ওর শাশুড়ী এতো খেয়াল রাখে ওর? ইয়াশফা বিছানায় বসে বললো
“না খিদে পায় না। আন্টি আমি দূধ খাই না গন্ধ লাগে। যাইহোক একটা খবর দেওয়ার ছিলো”
মিহি ইয়াশফার কাছে এসে বসলো। এরপর বললো
“কি খবর?”
ইয়াশফা রিদের পাওয়া লাভ লেটারটা মিহিকে দিয়ে বললো
” এটা পড়ে দেখো”
মিহি সম্পূর্ণটা পড়লো। ও বুঝলো না এটা কে কাকে দিয়েছে। ইয়াশফা মিহিকে সব খুলে বললো। সব শুনে মিহি তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো। তেড়ে গেলো রিদকে খোঁজার জন্য। কিন্তু রিদ বাড়িতে নেই। মিহি রাগে ফুঁসছে। ইয়াশফার ভালোই লাগছে আগুন লাগিয়ে দিয়ে। মাঝে মাঝে এমন কুটনামি করা দোষের কিছু না।
রাতের বেলা মিহি সবাইকে খেতে দিলো। রিদ আর ঋশ এখনো বাড়িতে ফিরে নি। মিহির মাথা সন্ধ্যা থেকেই গরম। রিদ ফিরলে ওকে মজা বুঝাবে। রুহি ইয়াশফা রাহা মুগ্ধ শুভ্র এক সাথে খেতে বসেছে। শুভ্র ফোনে জ্যোতির সাথে কথা বলছে আর খাবার খাচ্ছে। মুগ্ধ খেয়ে ঘরে চলে গেলো। রাহা তিথিকে খাবার দিতে সাহায্য করছে। মিহি চুপচাপ দাড়িয়ে আছে। রুহি খেয়ে উঠে গেলো। এইদিকে ইয়াশফা আর খেতে পারছে না। ও উঠে যেতে নিলে তিথি বলে
“এই একদম উঠবে না খাবার শেষ করে তবেই উঠবে”
ইয়াশফা অসহায় কন্ঠে বললো
“আমি আর খেতে পারছি না মামনি।”
তিথি ইয়াশফাকে বললো
“আমি মাখিয়ে খাইয়ে দিচ্ছি থামো”
তিথি ইয়াশফাকে খাওয়াতে যাবে এমন সময় কলিং বেল বেজে উঠলো। তিথি দরজা খুলে দিতে গেলো। এইদিকে মিহি ভাত মাখিয়ে ইয়াশফার মুখের কাছে ধরলো। ইয়াশফা মিহির হাতে খেয়ে নিলো। ও কখনো মায়ের হাতে খায় নি। মিহির কাছে খুব মা মা ফিল হচ্ছে। ওর মা কখনো ওকে খাইয়ে দেয় নি। ইয়াশফা মনে মনে ইমাজিন করলো। ওর মা যদি ওকে এভাবে খাইয়ে দিতো তাহলে কতো ভালো হতো। কিন্তু ওর মা ওকে ঠিক মতো ৩ বেলা খেতেই দিতো না। ইয়াশফা কান্না পেলো কিন্তু কাঁদলো না। সব সময় কাঁদা ঠিক না।
তিথি এসে দেখে মিহি ইয়াশফাকে খাওয়াচ্ছে। তিথি কিছু বললো না। রিদ এসেছে।
উপরে ফ্রেশ হতে চলে গেলো। ইচ্ছে ছিলো আগে মিহির গালে চুমু দিবে তারপর যাবে কিন্তু ছোট বড়ো সবাই আছে। এই বুড়ো বয়সে বউকে চুমু দিতে গিয়ে যদি কেউ দেখে নেই তাহলে মান সম্মান খাতাম। এই ভেবে রিদ আর চুমুটুমু খেলো না সোজা উপরে চলে গেলো মিহি রাতে ঘরে আসলে যতো চুমু খাওয়ার খাবে।
এইদিকে মিহি ইয়াশফাকে খাইয়ে মুখ মুছিয়ে দিলো শাড়ির আঁচল দিয়ে। এরপর বললো।
“ঋশ আজকে আসবে কিনা জানিনা যদি তোমার ভয় করে তাহলে আমার ঘরে চলে এসো কেমন?”
ইয়াশফা মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বললো।
মিহি ঘরে ডুকার সাথে সাথে রিদ মিহিকে চুমু দিলো। মিহি কটমট করে রিদের দিকে তাকিয়ে আছে। মিহি দৌড়ে গিয়ে বিছানা ঝাড়ু দেওয়ার ঝাটা নিয়ে রিদের দিকে তেড়ে এলো। রিদ বুঝলো না মিহির কি হয়েছে। মিহি ঝাটা দিয়ে রিদের পেছনে মেরে বললো বললো
“মেয়ের বয়সি বেডির থেকে লাভ লেটার নিতে লজ্জা লাগে না তোমার? ”
রিদ তো মহা মুশকিলে পড়লো। ওর কি দোষ? ও কি জানতো ওটা লাভ লেটার? এই কথাটা কে কুটনামি করেছে? নিশ্চয়ই ওর এটাম বোম। রিদ মনে মনে বললো
“কি জিনিস ফেলেছো আমার ছেলের কপালে আল্লাহ”
মিহি রেগে রিদের দিকে তাকিয়ে আছে রিদ ছুটে এসে মিহিকে জড়িয়ে ধরে এটা ওটা বুঝাতে লাগলো।
এইদিকে।
ইয়াশফা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে অনেক কিছু ভাবছে। ইয়াশফা গ্রামের মেয়ে ওর বাবা ওকে সব থেকে বেশি ভালোবাসতো। ওর মা ওকে কেনো জানি দেখতে পারতো না। সব সময় জ্বালাতো। মারতো খেতে দিতো না। মেয়েটা ওর বাবাকে কিছু বলতেও পারতো না। বললে মা আরো মারতো। ওর দাদি ছিলো তিনিও কিছু মাস আগে মারা গেছেন। ইয়াশফার গ্রামে তেমন কোনো বন্ধু বান্ধবী ছিলো না। দু একজন বাদে। ওর বেশির ভাগ বন্ধুই ছিলো পশু পাখি। অলৌকিকভাবে ইয়াশফার পশু পাখির সাথে খুব মিল। যেমন: সাপ, হরিণ, খরগোশ, বিড়াল ককুর, টিয়া, চড়ুই ময়না, কবুতর। ও সবাইকে পালতো। ওরাই ইয়াশফার বন্ধু ছিলো। ওরা রোজ ইয়াশফার সাথে দেখা করতে আসতো। ওরা এখনো হয়তো ইয়াশফার সাথে দেখা করতে যায়। এসব ভেবেই ইয়াশফার মন খারাপ হচ্ছে। কতোদিন হয়ে গেলো ওদের সাথে দেখা নেই। ইয়াশফা ঘুমিয়ে গেলো।
সকাল বেলা…
তিথি মিহি রাহা খাবার বানাচ্ছে মিহি তিথিকে বললো
“কালকে ঋশ কখন এসেছে আপু?”
তিথি বললো
“ও তো সকালে এসেছে”
মিহি এই ছেলেকে নিয়ে পারে না। প্রায়ই ঋশ বাড়িতে আসে না। কই থাকে ও? মিহির সব কেমন যেনো লাগে। তিথি মিহিকে বললো
“ফ্রিজে মিষ্টি আছে টুইংকেল একটু নিয়ে আসো তো”
মিহি গিয়ে ফ্রিজ খুলে দেখলো অনেক গুলো চকলেট আইসক্রিম। কিন্তু এগুলো কে এনেছে? এই বাড়িতে তো এসব কেউ খায় না। মিহি তিথিকে বললো “আপু এই আইসক্রিম চকলেট এসব কে এনেছে?”
তিথি বললো ও জানে না। তিথি সবাইকে জিজ্ঞেস করলো কিন্তু কেউ আনে নি। মিহি রিদকে বললো ও এনেছে কিনা। রিদ বললো ও আনে নি।
রিদের কেমন যেনো সন্দেহ হলো। এই বাড়িতে একজনই এসব খায় সে হলো ইয়াশফা। কিন্তু ওর কাছে তো টাকা নেই কে আনবে? আচ্ছা এটা কি ঋশ এনেছে? রিদের চোখ কপালে উঠে গেলো। কিভাবে সম্ভব? দুনিয়া উল্টে গেলেও এটা ঋশ আনতে পারে না। ও এসব খাবার দুচোখে দেখতে পারেনা। আর কাউকে খেতেও দেয় না।
ঋষভ নিচে নামতেই রিদ ঋষভের উপর আক্রমণ করে বললো
“কিরে ফ্রিজে আইসক্রিম চকলেট দেখছি। এসব কে এনেছে?”
ঋষভ কিছু বললো না চুপচাপ খেতে বসলো। এইদিকে ইয়াশফা একটা আইসক্রিম নিয়ে আরামে খাচ্ছে। ঋষভ একবার সেদিকে তাকিয়ে খাবারে মনোযোগ দিলো। ঋষভ কোনো উত্তর দিলো না তার মানে ওই এনেছে?
রিদ হাততালি দিয়ে বললো
“বাহ বাহ বাহ মিস্টার ঋষভ বাহ। আপনি বউকে মানেন না আবার বউয়ের জন্য লুকিয়ে লুকিয়ে চকলেট আইসক্রিম নিয়ে আসেন? আপনি তো সেই চালাক”
নেশাক্ত প্রহর পর্ব ১২
ঋষভ বিষম খেলো। ও বললো
“আমি জানিনা কে এনেছে”
রিদ বললো
“বাট আমি জানি তুমিই এনেছো”
