নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৩৭
রূপন্তী সরকার
ইউভানের হাত থেকে রক্ত পড়ছে অনাবরত, যন্ত্রণা হচ্ছে খুব
অথচ এই যন্ত্রণার মাঝেও ওর হুট করেই হাসি পেয়ে গেল। ও নিজের কাটা হাতটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল “কী সাংঘাতিক মেয়েরে বাবা! একটু খ্যাপানোর জন্য হাতে সত্যিই সত্যিই আস্ত একটা ছুরি গেঁথে দিল?! ভাগ্যিস ছুরিটা আরেকটু ডান দিকে এগিয়ে এসে সোজা বুকে গেঁথে দেয়নি, নাহলে তো আজকেই পটল তুলতে হতো!”
ইউভান আর ওই ঘরে এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। ও নিজের হাতটা চেপে ধরে নিচে চলে গেল। নিচে ড্রয়িংরুমে তখন রিদ আর মিহি একসাথে বসে ছিলো। তিথি আজকে বাড়িতে নেই, ও দুদিনের জন্য নিজের বাপের বাড়ি বেড়াতে গেছে।
ইউভান সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে সোজা রিদের পাশের খালি সোফাটায় বসতেই রিদের চোখ গেল ওর হাতের দিকে। কাটা হাত থেকে অনবরত রক্ত পড়তে দেখে রিদ উতলা হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“একী, রক্ত পড়ছে কেন তোমার হাত থেকে? কীভাবে এতটা কেটে গেল?”
মিহিও ইউভানের হাতের অবস্থা দেখে অস্থির হয়ে উঠল। ও বলল, “ইশশ! অনেকটা কেটে গেছে তো, তুমি একটু বসো বাবু, আমি এখনই আসছি।”
কথাটা বলেই মিহি ফার্স্ট এইড বক্সটা আনার জন্য দৌড়ে ভেতরে গেল। ইউভান রিদের এই ছটফটানি দেখে নিজের ঠোঁটের কোণে একটা মুচকি হাসি ফুটিয়ে তুলল। ও শান্ত গলায় বলল, “আঙ্কেল, এত উতলা হবেন না প্লিজ। এমনিই একটু অসাবধানতার কারণে হাতটা কেটে গেছে, তেমন কিছু না।”
রিদ কড়া গলায় একটু বকুনি দেওয়ার সুরে বলল, “একটু সচেতন থাকতে হয় না নিজের ওপর? এমন ছন্নছাড়ার মতো কেউ কাজ করে? দেখো তো কতো রক্ত বের হচ্ছে হাত দিয়ে!”
ইউভান রিদের ধমক শুনে মুচকি হাসল। এরমধ্যেই মিহি ফার্স্ট এইড বক্সটা নিয়ে ছুটে এলো। ও যত্ন নিয়ে তুলা আর ডেটল দিয়ে ইউভানের হাতটা পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিল। ইউভানের নিজের মা অনেক ছোটবেলায় মারা গেছেন, মায়ের আদর ও ওভাবে কোনোদিন পায়নি। কিন্তু ও যখনই মিহির কাছাকাছি আসে, মিহির এই যত্ন আর হাতের ছোঁয়ায় ওর সবসময় মনে হয় ও যেন নিজের মায়ের কোলের কাছেই বসে আছে। ও মিহিকে অনেক ভালোবাসে, নিজের মা নেই তো কি হয়েছে? মিহি মা তো আছে।
হাত বাঁধা শেষ হতেই ইউভান মিহির দিকে শান্ত গলায় বলল, “আন্টি, আমার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিবেন প্লিজ?”
মিহির বুকটা ফেটে গেলো। খুব কান্না পেলো ওর ঋশের কথা মনে পড়ছে। তাও মিহি মুখে মিষ্টি হাসিটা ফুটিয়ে ইউভানের আরেকটু কাছে এগিয়ে এলো। ও নিজের হাতটা ইউভানের মাথায় রেখে আস্তে আস্তে বিলি কেটে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। ইউভানের চোখ দুটো শান্তিতে বুজে এলো। ঠিক তখনই সোফায় হেলান দিয়ে রিদ ইউভানের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করল, “ওহিদুল কল করেছিল দুপুরে। তোমার নাকি বিয়ে করতে অনেক আপত্তি? মেয়ে পছন্দ করার কথা বললেই নাকি বাড়ি ছেড়ে পালানোর হুমকি দাও?”
বাবার এই নালিশের কথা শুনে ইউভান চোখ খুলে আবার একটু মুচকি হাসল। ও কোনো জবাব দেওয়ার আগেই রিদ হুট করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের চেয়ারে সোজা হয়ে বসল। ও মিহির দিকে এক পলক তাকিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলল, “আমিও ঠিক করেছি, আমার ইয়াশফা মায়ের এবার একটা বিয়ে দিবো।”
রিদ মুখ থেকে বের হওয়া এই একটা লাইন শোনা মাত্রই ইউভানের মুখের হাসিটা এক পলকে বাতাসে মিলিয়ে গেল! ওর পুরো শরীরটা যেন এক সেকেন্ডে বরফের মতো জমে শক্ত হয়ে গেল। বিয়ে দেবে মানে?! ইয়াশফাকে কার সাথে বিয়ে দেবে আর কেনোই বা হুট করে ওর আবার নতুন করে বিয়ে দেওয়ার কথা উঠছে?! ও নিজের ভেতরের এই তীব্র ছটফটানি আর বুকের ভেতরের ধাক্কাটা কোনোমতে চেপে রাখার চেষ্টা করল। ইউভান নিজের গলার স্বর যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রেখে একটু আমতা আমতা করে রিদকে জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু কেন আঙ্কেল? সুইটহার্ট… আই মিন, ইয়াশফা তো এই বাড়িতেই আপনাদের কাছে ভালো আছে। ওকে আবার নতুন করে বিয়ে দেওয়ার কী প্রয়োজন?”
রিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“ওর বয়সটা অনেক কম। এখনো সারাটা জীবন পড়ে আছে ওর। ঋশ হয়তো আর ফিরবে না, আর আমি আমার চোখের সামনে আমার মেয়ের কষ্ট দেখতে পারব না। ওকে আমি বিয়ে দিবো।”
ঠিক তখনই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো ইয়াশফা, ওর কোলে ইয়ান। ইয়াশফা ইউভানের দিকে আর এক পলকও না তাকিয়ে ও সোফায় বসা রিদ আর মিহির দিকে এগোলো। ও কোল থেকে নামতে চাইছিল। ইয়ান নিজের ছোট হাত দুটো নেড়ে আধো আধো গলায় রিদকে দেখে আবদার করে বলল,
“গাই য়ি যা”
রিদ নিজের চেয়ার ছেড়ে জলদি উঠে গিয়ে ইয়ানকে নিজের কোলে তুলে নিল। ওনার মুখের সব গাম্ভীর্য এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল ইয়ানকে দেখে। রিদ ওর গোলুমোলু গালে নিজের মুখটা ঠেকিয়ে আদর করে বলল, “উমম… কিসের গাড়ি হু? কী বলছো তুমি শুনি, বস?”
ইয়ান নিজের দাঁতহীন মুখে খিলখিল করে হেসে উঠল। মিহি ওদের এই মিষ্টি আদর দেখে আর থাকতে পারল না। ও এগিয়ে এসে রিদের কোল থেকে ইয়ানকে নিজের কোলে নিয়ে নিল। রিদ এবার সোফার একপাশটা দেখিয়ে ইয়াশফাকে বলল, “বসো বসো, এইখানে এসে বসো”
ইয়াশফা কোনো কথা না বাড়িয়ে সোফায় রিদের ঠিক পাশেই গিয়ে বসল। ওর মুখটা তখনো বেশ থমথমে আর গম্ভীর। রিদ ওর বসার ভঙ্গি দেখে একটু গলা ঝেড়ে বলল, “আসলে একটা বিশেষ বিষয় নিয়ে কথা হচ্ছিলো আমাদের।”
ইয়াশফা গম্ভীর গলাশ বললো বলল,
“ও আচ্ছা।”
রিদ ওর এই উদাসীনতা দেখে ফের বলল, “জিজ্ঞেস করবে না কী নিয়ে কথা হচ্ছিলো?”
ইয়াশফা এবারও চুপ করেই রইল, রিদ আর কোনো ভূমিকা না করে সরাসরি মূল কথায় চলে এলো। ও ইয়াশফার চোখের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল, “আমি তোমার বিয়ে দিতে চাই, এটাম বোম।”
বিয়ে শব্দটা কান পর্যন্ত পৌঁছানো মাত্রই ইয়াশফা এক সেকেন্ডে রিদের দিকে ঘুরে তাকাল। ওর চোখ দুটো রাগে আর অপমানে জ্বলে উঠল। ও কাটকাট গলায় সোজা মুখের ওপর জবাব দিল, “কোনোদিন সম্ভব নয়!”
রিদ ওকে শান্ত করার জন্য ওর মাথায় একটা হাত রেখে বলল, “কেনো সম্ভব না, বলো? সারাটা জীবন এভাবে একা একা কাটানো যায় না মা। তোমাকে বোঝার মতো একজনকে দরকার আছে এখন।”
ইয়াশফার ভেতরের জেদটা এবার চাড়া দিয়ে উঠল। ও নিজের বসার জায়গা থেকে সামান্য সোজা হয়ে কড়া গলায় বলল, “কোনো দরকার নেই। ইয়াশফা নিজেই নিজেকে বোঝার জন্য এনাফ! আমার সাথে এরপর থেকে এমন ফালতু বিষয়ে কথা না বললেই খুশি হবো, বাবা।”
রিদ হাল ছাড়ল না। ও আবারও ইয়াশফাকে বোঝানোর সুরে বলল, “পরিস্থিতিটা বোঝার চেষ্টা করো মা।”
ইয়াশফার মাথায় এবার রক্ত চড়ে গেল। ও আর এক সেকেন্ডও ড্রয়িংরুমে বসে এই জ্ঞান দেওয়া কথা শুনতে চাইল না। ও সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে তেড়ে গিয়ে মিহির কোল থেকে এক ঝটকায় ইয়ানকে নিজের বুকে টেনে নিল। তারপর আর কারো কোনো কথার তোয়াক্কা না করে হনহন করে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।ইয়াশফার ওই ঝড়ের বেগে ওপরে চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রিদের ঠোঁটের কোণে একটা মুচকি হাসি ফুটে উঠল। ওদিকে সোফায় বসে থাকা ড. রোহান ইউভান তো এই পুরো কাণ্ড দেখে একদম থ মেরে বসে আছে! ওর মুখের হা-টা পর্যন্ত বন্ধ হচ্ছিল না। মিহিও পুরোটা সময় একদম চুপচাপ ছিল, ও একটা কথাও বলেনি। ঠিক তখনই ড্রয়িংরুমের থমথমে নীরবতা ভেঙে ইউভানের পকেটে থাকা ফোনটা হঠাৎ বেজে উঠল। স্ক্রিনে একটা চেনা নাম্বার ভেসে উঠতেই ও ঝটপট সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। কলটা রিসিভ করে ও কারো দিকে না তাকিয়ে সোজা হনহন করে বাড়ির বাইরে বাগানের দিকে চলে গেল। ইউভান ড্রয়িংরুম থেকে বের হতেই মিহি রিদের দিকে ঘুরে বসল। ও আমতা আমতা করে রিদকে বলল, “তুমি কি পাগল হয়ে গেছো?”
রিদ সোফায় হেলান দিয়ে বসল। ওর চোখের চাউনিটা আরও গভীর হয়ে উঠল। ও মিহির কোমরটা এক হাত দিয়ে আলতো জড়িয়ে ধরে ফিসফিসিয়ে বলল, “কান টানলে মাথা আসে, কথাটা কখনো শুনেছো তো পাখি?”
মিহি রিদের কথা শুনে নিজের কপালটা সামান্য কুঁচকে ফেলল। ও রিদের বুকের ওপর একটা হাত রেখে কাতর গলায় বলল, “কিন্তু এটা একটু বেশি রিক্স নেওয়া হয়ে যাচ্ছে না? যদি আমাদের প্ল্যানটা কাজ না করে? যদি ও না আসে?
রিদ মিহির কপালে একটা হালকা করে ভালোবাসার চুমু এঁকে দিল। ওর পাকা দাড়িগুলো মিহির গালে ঘষে দিয়ে ভারী গলায় বলল, “সে আসবে, তাকে আসতেই হবে, আর বাঘকে গুহা থেকে বের করতে হলে মাংসের লোভ দেখাতেই হবে”
এইদিকে ওপরের তলায়…
ইয়াশফা ঘরে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে ইয়ানকে নিয়ে বিছানার ওপর ধপ করে বসে পড়ল। ওর ভেতরের এতদিনের চেপে রাখা সবটুকু বাঁধ যেন এই এক মুহূর্তে এসে ভেঙে গেল। ও ইয়ানকে নিজের বুকের সাথে একদম শক্ত করে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। মায়ের এই আচমকা কান্না দেখে পুচকে ইয়ান ভয় পেয়ে গেল। ওর ছটফটানি এক সেকেন্ডে উধাও হয়ে গেল, ও একদম চুপ করে নিজের বড় বড় চোখ দুটো পিটপিট করে ইয়াশফার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ইয়াশফা ইয়ানের ওই নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে ওর গালে নিজের ভেজা মুখটা ঘষতে ঘষতে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলতে লাগল, “বাবা তুমি তোমার মাকে কখনো ছেড়ে যেও না। তোমার মায়ের এই পৃথিবীতে আপন বলতে কেউ নেই তুমি ছাড়া। তোমার মা জীবনে অনেক বেশি কষ্ট পেয়েছে, সে একজন জনম দুঃখী মানুষ। তোমার মায়ের কপাল ছোট থেকেই পোড়া। সে তার মাকে হারিয়েছে বাবাকে নিজের চোখের সামনে ছটপট করে মারা যেতে দেখেছে, আরেক মায়ের কাছে দিনরাত অত্যাচার সহ্য করেছে, বিয়ের পর স্বামীর কাছেও আঘাত পেয়েছে, আমি আর নিতে পারছি না বাবা, অনেক কষ্ট সহ্য করেছি আমি আর সহ্য করার ক্ষমতা নেই আমার!”
ইয়াশফা বিছানায় বসে পাগলের মতো একনাগাড়ে কেঁদেই চলল। ওর মনে হতে লাগল ওর কপালে সুখ বলতে কিছু কোনো কালেই ছিল না, আর হয়তো কোনোদিন আসবেও না। মাকে ওভাবে কাঁদতে দেখে ছোট ইয়ানের চোখ দুটোও ছলছল করে উঠল, ও মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে ওখানেই কাঁদতে শুরু করে দিল। ইয়াশফা কিছুক্ষণ পর টের পেল ওর বুকের ভেতরটা কেমন যেন জট পাকিয়ে আসছে, নিশ্বাস নিতে বড্ড কষ্ট হচ্ছে। ও আর এক সেকেন্ডও দেরি না করে কোল থেকে ইয়ানকে বিছানায় নামাল। ধড়ফড় করে উঠে গিয়ে ড্রয়ারটা টেনে ওখান থেকে নিজের ইনহেলারটা বের করল। একটু বেশি কাঁদলেই বা মানসিক চাপ পড়লেই ওর এমন ভয়ানক শ্বাসকষ্ট উঠে যায়। ও পর পর দুবার ইনহেলারটা মুখে চেপে লম্বা করে টান দিল।ইনহেলার নেওয়ার পর নিশ্বাসের গতিটা একটু স্বাভাবিক হয়ে এলে ও বিছানায় এসে ইয়ানকে আবার নিজের বুকের কাছে টেনে নিল। তারপর ওকে দুধ খাইয়ে আস্তে আস্তে পিঠ চাপড়ে ঘুম পাড়িয়ে দিল। ওষুধ আর কান্নার ক্লান্তিতে ইয়ান কিছুক্ষণের মধ্যেই পরম শান্তিতে চোখ বুজল। ইয়ান ঘুমিয়ে যাওয়ার পর ইয়াশফা বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ওর মনটা তখন হাহাকারে ভারী হয়ে আছে। ও এগিয়ে গেল ঘরের দেয়ালের দিকে, যেখানে একটা ধুলোমাখা বড় গিটার ঝুলছে। এটা আর কারো নয় ঋষভের গিটার। ঋষভ চলে যাওয়ার পর থেকে যখনই ইয়াশফার মন খারাপ হয় তখনই ও এই গিটারটা পেড়ে এনে নিজের মতো করে বাজায়। অবশ্য এই গিটার বাজানো ওকে রিদ শিখিয়েছে।
ইয়াশফা গিটারটা দেয়াল থেকে নামিয়ে নিজের হাতে শক্ত করে ধরে বেলকুনির দিকে এগিয়ে গেল। ও বেলকুনির রেলিংয়ের পাশে দোলনায় এসে বসল। বাইরে তখনো হালকা ঠান্ডা বাতাস বইছে, চারপাশটা সন্ধ্যার অন্ধকারে ঢেকে গেছে। ও নিজের কাঁপতে থাকা আঙুলগুলো গিটারের তারের ওপর রাখল। তারপর আস্তে আস্তে টুং টুং করে গিটারে একটা সুর তুলে নিচু স্বরে গাইতে লাগল।
“নাগর আমার নিঠুর বড় মন ও বোঝে না
আমার ভাঙা খাঁচা পড়ে আছে সে তো আসে না
পোড়া মনে ভালোবাসা বাসা বাধে না।
পোড়া মনে ভালোবাসা বাসা বাধে না,
কালা আমার বোঝে না রে
আমি যে তার রাই
তারে বিনা বিরহতে জ্বলে পুড়ে ছাই
বাঁশি যে তার ডাকে না রে, কেমনে বাঁচি ছাড়া তারে
বাঁশি যে তার ডাকে না রে, কেমনে বাঁচি ছাড়া তারে
পরান কাঁদে তবু আমার দুচোখ কাঁদে না
পরান কাঁদে তবু আমার দুচোখ কাঁদে না
এইদিকে…
একটা পরিত্যক্ত আর বন্ধ গোডাউন। চারদিকের দেয়াল বেয়ে স্যাঁতসেঁতে একটা অন্ধকার জমে আছে। ঘরের এক কোণায় ছাদ থেকে একটা টিমটিমে হলুদ বাল্ব ঝুলছে, যা চারপাশের নিস্তব্ধতাকে আরও বেশি ভয়ংকর করে তুলেছে। গোডাউনের ঠিক মাঝখানে একটা লোহার চেয়ারে দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা রয়েছে মাঝবয়সী একটা লোক। কয়েকজন বডিগার্ড মিলে ওকে পশুর মতো মারছে, যাকে বলে একদম রাম ধোলাই দিচ্ছে। লোকটা যন্ত্রণায় আর বাঁচার জন্য অনবরত ছটফট করতে থাকে। হুট করে একজন বডিগার্ড লোকটার চুল মুঠো করে ধরে মুখটা ওপরের দিকে তুলল। আরেকজন ওর মুখটা শক্ত করে চেপে ধরে দাঁত কিড়মিড় করে বলল, “বল! কেন কালকে সন্ধ্যা ঠিক ৭টার দিকে তুই ম্যামের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিলি? উনার বারান্দায় একটা পাথরও ছুঁড়েছিস তুই! কিন্তু কেন? কে পাঠিয়েছে তোকে? কার হয়ে কাজ করছিস সত্যি করে বল!”
মুখের ওপর থেকে হাত সরাতেই লোকটা এক দলা রক্ত মেঝের ওপর থুতু দিয়ে ফেলে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “আমি… আমি কারো লোক না। আমি কিচ্ছু জানি না!”
বডিগার্ডদের একজন ওর দিকে এগিয়ে এসে কড়া গলায় বলল, “ভাই, বাঁচতে চাইলে সত্যি কথা বল। এখনো সময় আছে, সত্যি বলে দিলে তোকে ছেড়ে দেবো।”
কিন্তু লোকটা তবুও মুখ খুলল না। ওর এই নীরবতা দেখে বডিগার্ডদের মেজাজ আরও চড়ে গেল। ওরা লোকটাকে মারতে মারতে প্রায় অজ্ঞান করে ফেলেছে। অবস্থা বেগতিক দেখে বডিগার্ডদের একজন একটু সাইডে গিয়ে পকেট থেকে নিজের ফোনটা বের করল। স্ক্রিনে থাকা একটা নাম্বারে ঝটপট একটা কল দিয়ে ও বিনম্র আর নিচু স্বরে বলল, “বস, লোকটা কিছুতেই মুখ খুলছে না। ও কেন ম্যামের বাড়ির নিচে দাঁড়িয়ে ছিল, ও কার লোক কিছুই বলছে না।”
ফোনের ওপাশ থেকে তখন এক অদ্ভুত নীরবতা। দুই সেকেন্ড পর ওপাশ থেকে এক গম্ভীর, বরফশীতল আর ভয়ঙ্কর ভারী কণ্ঠস্বর ভেসে এলো
“আমার সিংহটা অনেক দিন হলো তাজা মাংস খায় না Feed him.”
বসের মুখ থেকে বের হওয়া এই একটা লাইনের হাড়হিম করা আদেশ শুনতেই বডিগার্ডের শিরদাঁড়া বেয়ে যেন একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। ও এক সেকেন্ডে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সমীহ করে বলল, “ওকে বস। আর আপনি কোনো চিন্তা করবেন না, ম্যামের ওপর আমাদের সবসময় কড়া নজর থাকে।”
ওপাশ থেকে সেই মানুষটা আবারও গম্ভীর গলায় বলল, “গুড। আজকে বিকেলে ও একজনের সাথে মিট করতে যাবে। আশা করছি বাকিটা তুমি জানো।”
নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৩৬ (২)
বডিগার্ডের লোকটা একটু অবাক হয়ে কৌতূহল মাখা গলায় জিজ্ঞেস করল, “কার সাথে দেখা করতে যাবে বস? আর আপনি কেমনে জানলেন এটা?”
ফোনের ওপাশের মানুষটি কোনো উত্তর দিল না। ও শুধু নিজের মনের গভীরে এক চিলতে হালকা রহস্যের হাসি হেসে ওপাশ থেকে খট করে কলটা কেটে দিল। গোডাউনের পুরো ঘরটায় তখন এক থমথমে আর নিঝুম নীরবতা নেমে এসেছে।
