আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩৩
সুরভী আক্তার
রৌদ্রের এক বাক্যের সম্বোধন তীরের মতো ঠাস করে বিধলো সকলের কানে । ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে আসা ওটুকু ধ্বনিই যেনো চার দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসলো ধ্বনিত হয়ে ঝংকার তুলে । ঝটকা খেলো পুরো পরিবার । দুই কর্তা সহ রুবিনা কাবির বিষ্ময়ে চোখ বড় বড় করে চাইলেন । এক্ষুনি যেনো কোটর ফেটে চোখ বেরিয়ে আসবে ।
শুভ্র ভ্যাবাচ্যাকাময় দৃষ্টিতে তাকায় তোফায়েল কাবিরের দিকে । তড়িঘড়ি করে ফোনটা চেপে ধরে বিষম খেয়ে কেশে ওঠে । ফোনের এপাশে নীরবতা বুঝে রৌদ্র ওপাশে কপাল কুঁচকায় ।
সুইজারল্যান্ডে সবে ভোর তিনটে । আয়েশে ঘুমোচ্ছিলো বেপরোয়া ছেলে । আবহাওয়া বেশ শীতল । উদ্যম শরীরে কোমর অবধি চাদর টেনে রাখা । ঘুম ঘুম চোখেই ফোন ধরেছে । আগের কল গুলোও দেখেছে । প্রবল নিস্পৃহতায় রিসিভ করার ফুরসৎ জোগায় নি ইচ্ছে করেই । এবারে একবিংশীর নাম্বার দেখা মাত্রই এক ফালি হাসি ঠাঁই করেছিলো ঠোঁটের কোণে । শুয়ে থেকেই ফোন কানে ঠেকিয়েছে । চোখ বুজে নিয়েছে পরিতুষ্টিতে ।
ফোনের ওপাড় নীরব । তা বুঝে রৌদ্র ঘুম ঘুম সম্মোহনী কন্ঠে পূনরায় বলে….
” হেয়য়য় সানি , কথা বলছিস না কেনো ? অবশেষে মনে পড়েছে আমায় ? চলে আসবো ?
একটু থেমে…
” কি ? আসি ? আই মিস ইউ টেরিবলি, জানপাখি….
বিষ্ময়ে স্তব্ধ পুরো হল রুম । একেক জনের মুখ পুরোপুরি ফাঁক । রুবিনা কাবির হাঁ বনে গেছেন । মুখে রাঁ নেই । ফেলছেন ঘন পলক । একেই সবাইকে উপেক্ষা করে মেঘার ফোন রিসিভ করাতে রাগের সাথে সাথে অবাক হয়েছেন তিনি , তার উপর এখন ছেলের এসব এলোমেলো কথা ! পুরো হতভম্ব তিনি । জবান রুখে গেছে ।
সবার একত্রিত দৃষ্টি ফোনের দিকে । লাউড স্পিকার দেওয়া । সদরের বাইরে দাঁড়ালেও বোধহয় রৌদ্রের এহেন বেপরোয়া কথা শোনা যাবে ।
সবাই শুনলো গোল বৈঠকেই । তোফায়েল কাবিরের চেহারা খানা পুরো দেখার মতো হয়েছে । তব্দা মেরে ছেলে মেয়েদের সামনে বসে আছেন তিনি । আদ্র আড়চোখে তাকে ঝলক পরিমাণ পরখ করে মেঘার দিকে তাকালো । খুক খুক করে কেশে পরিস্থিতির স্তব্ধতা ভাঙ্গলো ।
অমনি সকলের একাধিক জোড়া দৃষ্টি ঝট করে তাক হলো মেঘার দিকে । মুখের খাবার টুকু মুখে নিয়েই থম মেরে বসে আছে মেঘা । সবার দৃষ্টির আকর্ষণ পেতেই অগত্যা ভ্যাবাচ্যাকা খেলো মেয়েটা । তীব্র লজ্জায় লাল হয়ে উঠলো পুরো মুখশ্রী । এ লজ্জা সে লজ্জা নয় । এ লজ্জা ঐ ঠোঁট কাটা বিগড়ে যাওয়া লোকটার লাগাম হীন কথা বার্তায় সদ্য জাগ্রত হওয়া লাজ । সবাই কি ভেবে নিলো কে জানে ? মেঘার মাথা চক্কর দেয় । মনে হয় এক্ষুনি ইতস্ততা থেকে বাঁচতে ছুটে পালিয়ে যাক অদূরে কোথাও । মাটি ফাঁক করে লুকিয়ে পড়ুক সকলের দৃষ্টিগোচর হয়ে ।
মেঘা মনে মনে চাইলো , ভুমিকম্প হোক একটা । সবাই ওর থেকে এই অবাক দৃষ্টি গুলো সরিয়ে মনযোগ দিক সেদিকে । এতে একটু রেহাই পাক সে ।
কিন্তু তেমন কিছুই হলো না । ভ্যাট ভ্যাট করে ওর দিকে তাকিয়েই রইলো সকলে । এদিকে যে লাগামহীন লোকটার মুখের লাগাম হারিয়েছে,,,
” ইভারা , স্পিক আপ । কি হয়েছে ? বলেছিলাম না তুই বললেই চলে আসবো ! একবার বল , সিরিয়াসলি চলে আসবো । শুধু , তোর কাছে,, তোর জন্য….
শুভ্র আর শুনতে পারলো না । বেশি বেফাঁস বলার আগেই ঠোঁট ভেজালো সে । শক্ত ভঙ্গিমায় গলা খাঁকারি দিলো ।
” রুডি , বি কোয়াইট ! এটা মেঘার ফোন । বাট , আমি কল করেছি তোকে ।
ওদিকে তাৎক্ষণিক বিব্রত হয় রৌদ্র । এক রাশ তিক্ত বিরক্তিতে ভাঁজ পড়ে কপালে । চোখ খুলে ফোনের দিকে তাকায় । ঝটকায় উঠে বসে আড়মোড়া ভেঙে । এতক্ষণের মন্ত্রমুগ্ধ কন্ঠ তুঙ্গে ওঠে অগত্যা….
” হোয়াট রাবিশ ব্রো ,, তুমি মানে ? ঐ ইডিয়টের ফোন তোমার কাছে কেনো ? কোন সাহসে ওর ফোন হাতে নিয়েছো তুমি ? ঐ ঘাড় ত্যারা ফোন করে নি তার মানে ? তুমিই ফোন করেছো ? তুমিই বা কি ? কমন সেন্স নেই তোমার ? ওর ফোন থেকে কেনো ফোন করেছো তুমি ?
” আমার ফোন থেকে কতবার করে ফোন করেছি , দেখেছিস ? ধরছিলি না কেনো ?
” কেনো ধরবো , কোনো দরকার আছে তোমার সাথে আমার ?
” মেঘার সাথে কি দরকার পড়লো ? যে একবারেই ওর ফোন রিসিভ করলি ?
” সি ইজ মাই লেডি ,, ওর সাথে আমার দরকার পার্সোনাল । তোমায় বলবো কেনো ? আর এমনিতেও , ঐ ইডিয়ট আসলেই একটা ইডিয়ট । আমি ওকে ভেবে কত কি বলতে যাচ্ছিলাম । যদি বেফাঁস কিছু বলে ফেলতাম ? শুনে সামলাতে পারতে ? লজ্জা শরম নেই তোমার । অন্যের পার্সোনাল স্পেসে উইদাউট পারমিশন ঢুকে পড়ো !
শুভ্র কপালের ধার চুলকে বিড়বিড় করে ঠোঁট চেপে….
” আর কি বেফাঁস বলা বাকি আছে ভাই ? যা বলেছিস , এইই ঢের । অথচ তুই নাকি ওকে বউ মানিস না । এই বউকে না মেনে বিদেশ গিয়ে পড়ে আছিস । উফফফ , কি ডেঞ্জারাস !!
বিড়বিড় শেষে মুখ খোলে…..
” ফোন স্পিকারে আছে । বাড়ির সবাই শুনছে ! আর এতক্ষণ যা যা বলেছিস , সেসব ও শুনেছে ।
” ওও তাই ? কে কে শুনছে ? ঐ ইডিয়ট ও ?
হেয়য় ইডিয়ট , থাপ্পর মেরে সোজা করবো তোকে । খালি যাই এবার । ছাড়বো না বলে রাখলাম । স্টুপিড , নিজের ফোন অন্য কাউকে দিয়েছিস কেনো বেয়াদব ? তোকে যা বলার ছিলো , যদি বলে ফেলতাম ?
রৌদ্র শুনিয়ে শুনিয়ে বেশি বেশি বলছে ।
ঠোঁট কামড়ে হাসছে ওপাশে । এদিকে মেঘার প্রাণ যাই যাই অবস্থা । মাথা কাটা যাচ্ছে লাগামহীন লোকটার এতো সব কথায় ।
আর বসে থাকতে পারলো না মেয়েটা । থরথর করে হাঁটু কাঁপছে । শিরশির করছে পায়ের তালু । সেসব অনুভুতি সুদ্ধ চিবুক একেবারে গলার সাথে মিশিয়ে নিলো । ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়ালো ,, খাওয়া দাওয়া সব ফেলে আর কোনো দিকে তাকালো না । তীব্র লজ্জায় এক ছুট লাগালো উপরের দিকে । মাড়ি খিচে বিড়বিড় করলো….
” নির্লজ্জ , বেহায়া , অসভ্য , মিথ্যেবাদী , ইরেটেটিং রাইনো মুখো । ছাড়বো আমি আপনাকে ।
ও উঠে যেতেই তোফায়েল কাবির দৃষ্টি নামালেন । মুখ শক্ত , ভঙ্গিমা দূর্বোধ্য ।
তৌসিফ কাবির বেগতিক পরিস্থিতি সামলাতে শুভ্রর থেকে ফোনটা নিজের হাতে তুলে নিলেন….
” রৌদ্র , চলে গেছো , বলে যাবে না একবারও ? কতবার করে ফোন করা হয়েছে তোমায় ! দেখো নি ? চিন্তায় চিন্তায় অস্থির তোমার মা । তার দিকটাও ভাবার প্রয়োজন বোধ করো না ? এতোটা বেপরোয়া হয়ে গেছো ?
” ছিলামই বেপরোয়া ! হঠাৎ করে হয়ে যাই নি । বায়….
” খবরদার ফোন কাটবি না ।
রৌদ্র ফোন কাটতেই যাচ্ছিলো । তাৎক্ষণিক চেঁচিয়ে বাঁধা দিলেন রুবিনা কাবির । ধরা গলায় পরমুহুর্তে বললেন…..
” চলে গেছিস কেনো আবার ? সত্যিই চলে গেছিস ? ফিরবি না ?
” উমমম , তোমার বউমা কে আমার রুমে শিফট করালে তবেই ফিরবো । অতো বড় রুমে ভয় লাগে আমার । বউ ছাড়া ভালো লাগেনা , মম ।
বউকে আমার কাছে দিয়ে দিলে ভেবে দেখবো । ঐ ইডিয়টের ত্যারামো দূর করো । আমার বউকে এবার লাগবে । ফেরার পর ওকে চাই আমার ।
আর হ্যাঁ , নেক্সট টাইম খবরদার ওর ফোন থেকে বাড়তি কেউ ফোন করবে না আমায় । এবার কম বলে ফেলেছি , পরের বার বাড়াবাড়ি কিছু বলে ফেলবো । পরে লজ্জা করবে আমার । যতোই হোক , তোমরা আমার গুরুজন ।
ভ্যাবাচ্যাকা খেলেন রুবিনা কাবির ।
আদ্র, শুভ্র, শাফাহ্, মেহের,সিরাত, ওরা পিটপিট করে নিজেদের পথ বেছে নিয়েছে । এখানে থাকাটা বিপদজনক । গরম হয়ে আসছে কান । নির্লজ্জ ছেলে সলজ্জ হবে না এপর্যায়ে ।
রৌদ্র মুখের উপর ফোন কেটে দিয়েছে । ড্রইং রুমে দুই কর্তা আর কর্তী । ছেলে মেয়েরা চলে যেতেই আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না তৌসিফ কাবির । কি ভেবে হেসে উঠলেন শব্দ করে । ভাইয়ের দিকে দৃষ্টি তার । তোফায়েল কাবির বিরক্ত হয়ে তাকাতেই চোখাচোখি হলো ।
” হাসছো কেনো ?
” তোর আপডেট ভার্সন দেখতে পাচ্ছি , তাই । তোরই তো ছেলে ! বাই দ্যা ওয়ে ,, ভুলে যা সব । মেঘা এ বাড়ির বউ । রৌদ্র কে দেখে যতদূর বুঝলাম , ও মেঘা কে মেনে নিতে চায় ।
” চেয়ে লাভ নেই ।
” কথা শেষ করতে দে আমায় । রৌদ্র চাইছে , আর বাকিটা মেঘা চাইলেই লাভ আছে । নিজের ছেলেকে চিনিস না ? এবার একটা গতি করা উচিত ।
” ইভা কেও চেয়েছিলো ঐ ছেলে ?
” উঁহু , চাইলে ঠিক হাসিল করে নিতো ।
” এবার চাইলেও হাসিল করতে পারবে না । মেঘার গার্ডিয়ান নই আমরা । কেবলই মাথার উপর একটা ছাদ দিয়েছি ওকে । ওর জীবনের কোন কিছুতে নাক গলাতে পারি না আমরা । ওর গার্ডিয়ান আছে ।
” মেঘার গার্ডিয়ান কেউ থেকে থাকলে , সেটা কেবলই রৌদ্র । বিয়ে করা স্বামী ওর । বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ ওরা । আমরা বা অন্য কেউ বাঁধা দেওয়ার কে ? তোর ছেলের মতিগতি বোঝা হয়ে গেছে আমার । আমি চাই না খারাপ কিছু হোক ।
” আমিও চাই না খারাপ কিছু হোক , সেটা মেঘার ক্ষেত্রেও !
” কি বলতে চাইছিস , রৌদ্রের সাথে এই সম্পর্কে জড়িয়ে থাকলে মেঘার খারাপ হবে ?
” সম্পর্ক নষ্ট হবে । ও মানবে না !
” ও মানা না মানার কেউ নয় । মেঘাই আসল ।
” মেঘার একমাত্র আপনজন ও ! মেঘা নিশ্চয়ই ওর কথাই শুনবে । আমি চাই না রৌদ্র বা মেঘা একে অপরের উপর দূর্বল হয়ে পড়ুক । ভবিতব্য ভিন্ন ভাইয়া । মেঘা কে রাখবে না এখানে । ওর কোর্স শেষ । কথা হয়েছে , আগামী দু তিন মাসের মধ্যেই দেশে আসবে ও । সাথে নিয়ে যাবে মেঘাকে । দূর্বলতা বাড়িয়ে লাভ কি তাহলে ? রৌদ্র চলে গিয়ে ভালোই করেছে , এখানে থাকাটা ঠিক হতো না ওর জন্য !
তোফায়েল কাবিরের কন্ঠ নিচু হয়ে আসে ।
শেষের কথাটাকে আঁকড়ে ধরে রুবিনা কাবির ঝট করে বলেন….
” আমি জানতাম তো , আমার ছেলের চলে যাওয়া টাই ভালো হয়েছে আপনার কাছে । তাই এতো অবহেলা ।
” রুবিনা , বুঝেও না বোঝার ভান করবে না । এতক্ষণ তোমার লাগামহীন ছেলের কথা শুনেছো , তারপরও কিছু বোঝার বাকি নেই নিশ্চয়ই ।
রুবিনা কাবির চুপটি মেরে শুনলেন । চোয়াল খিচলেন । দুই ভাই কে নিচে ফেলে দপাদপ পা ফেলে প্রস্থান করলেন তিনি । তার মাথাতেও ঘোরপাক খাচ্ছে ছেলের বলা কথা গুলো । তিনি বুঝেও বোঝার চেষ্টা করছেন না ।
রাগ হচ্ছে । আবার ভালোও লাগছে । তার ছেলে ফিরবে বলেছে । কিন্তু শর্ত ও তো দিয়েছে । এবার কি হবে ? মেঘা তো চলে যাবে ! তাহলে তার ছেলে কি করবে ?
পরীক্ষা শেষ হতে হতেই একটা বেজেছে । হলরুম থেকে বেরিয়ে ক্যাম্পাসে বসেছে তিন শালিক । শিশির বাদাম কিনেছে । খোসা ছাড়িয়ে খাচ্ছে শাফাহ্ সহ ।
মেঘা খাবে না । মুখ ভোঁতা তার । কোয়েচশন পেপার সোজা হলেও পরীক্ষা খুব একটা ভালো হয় নি । পাশ করার নিশ্চয়তা আছে , ভালো রেসাল্ট করার নেই । এইতো মনে হচ্ছে । সবে একটা কোর্সের পরীক্ষা শেষ । এখনো চারটে বাকি । বাকি গুলোতে কি হবে ?
পড়তে গিয়ে , মাথায় ধারন করতে গিয়ে , মনযোগ দিয়ে লিখতে গিয়ে বারবার বেগ পাচ্ছে রমনী । ভার লাগছে মন মস্তিষ্ক । প্রথম সেমিস্টারে এমন হলে পরে কি করবে ? ভাবতে গিয়ে মনে পড়লো , এই সেমিস্টারই হয়তো ওর লাস্ট সেমিস্টার এই ভার্সিটিতে । আগামী বছর আসতে আসতে একবিংশী পগারপার । শেষ অবধি থাকতে পারবে না । পরের সেমিস্টার অনেক দূর । এইতো আর কদিন বাদ নতুন বছর আসছে ।
মেঘা আনমনে হাতের ফাইল টা চেপে ধরে এসব ভাবলো । ভারাক্রান্ত মনের ওজন বেড়েই যাচ্ছে । শ্বাস হয়ে আসছে রুদ্ধ । শাফাহ্ ওকে আনমনা দেখে কনুই দিয়ে খোঁচালো , মেকি স্বরে বললো সেই এককথা….
” সুইটহার্ট , কি ভাবছো ?
মেঘা তড়াক করে মুখ কুঁচকে ফেলে । এই মেয়ে সেই তখন থেকে ওর পেছনে লেগে পড়েছে । কথায় কথায় এক বাক্য রিপিট করছে । ঝালাপালা করে দিচ্ছে কান ।
রাগ দেখালো মেঘা….
” কি শুরু করেছিস তখন থেকে ?
” কি আবার ? কিছুই না ? পরীক্ষা কেমন হলো বললি না তো ।
” ভালো হয়েছে ।
” আমি জানি তো , আমার সুইটহার্টের পরীক্ষা ভালোই হবে ।
শিশির ক্ষিণ ভাঁজ ফেলে কপালে । শুধায়….
” তখন থেকে কি সুইটহার্ট, সুইটহার্ট করছিস বলতো ?
” তুমি বুঝবে না বেইবি । মেঘা ইজ সুইটহার্ট । হিজ সানি অর জানপাখি । হায়য়য়য়য়…..ফিদা !
রেগে তাকায় মেঘা ।
শাফাহ্ পরোয়া করে না ।
আদ্র বেরোলেই চলে যাবে । মিনিট দশেকের মাথায় সে আসলো । তিন রমনী কে পেছন থেকে দেখেই মৃদু হাসলো । এগিয়ে ডাকলো….
” সুইট বার্ডস , লেটস গো !
চকিতে তাকায় মেঘা । কিছুটা সূচালো চোখে । আদ্র দৃষ্টি বুঝে ঘাড় নাড়িয়ে বলে সাফাই গেয়ে….
” সুইটহার্ট বলি নি , সুইট বার্ড বলেছি । বাই দ্যা ওয়ে , পরীক্ষা ভালো হয়েছে তো ?
শাফাহ্ উত্তরে বিলম্ব করলো না এক মুহুর্ত…..
” ইয়েস সুইটহার্ট । পুরো ঝাঁকানাকা হয়েছে পরীক্ষা ।
ফিক করে হাসে আদ্র । কটমট করে মেঘা । আদ্র বলে…
” আই নো সুইটহার্ট ।
এবেলায় ফোঁস করে শ্বাস ফেললো মেঘা । ওষ্ঠ উল্টালো । আদ্র ও লেগে পড়েছে টুকটুকির সাথে ।
গজগজ করলো একবিংশী….
” ভাইয়া তুমিও জ্বালাচ্ছো আমায় ?
আদ্র চোখ টিপে ইয়ার্কি স্বরে বলে…..
” ইয়েস সুইটহার্ট ।
অমনি সশব্দে হেসে ওঠে শাফাহ্ । হাইফাই করে আদ্রের সাথে । দুজনাই হাসে । আদ্র কেবল নিঃশব্দে ঠোঁট কামড়ে । এই প্রথম গুরুগম্ভীর প্রফেসর কে এভাবে হাসতে দেখলো শিশির । কৌতুক স্বরে কথা বলতে শুনলো । মশকরা করতে দেখলো ।
কিছুটা ভিমড়ি খেয়েই তাকিয়ে দেখলো কয়েক পলক । পরক্ষনে ঘন পলক ঝাপটে দৃষ্টি সরালো ।
এসবের কিছুই মাথায় ঢুকছে না তার ।
মেঘা ক্যাটক্যাটে স্বরে ঝাইঝাই করে উঠলো…..
” থাকো তোমরা , তোমাদের কারোর সাথেই কথা বলবো না । আর ঐ রাইনো মুখো কে তো ছাড়বো না কিছুতেই । লাগামহীন,ইরেটেটিং রাইনো মুখো । পেয়েছে টা কি আমায় ? যা খুশি তাই বলে সবার সামনে ইমেজ খারাপ করবে আমার ?
কিড়মিড় করতে করতেই সেখান থেকে বাইরের দিকে গটগট পায়ে হাঁটা ধরলো মেঘা ।
শাফাহ্ পিছু ডাকতে ডাকতে পা উদ্যত করলো….
” ওও সুইটহার্ট , শুনে যাও । রাগ করে না জান পাখি ।
শিশির হিসেব মেলাতে ব্যাস্ত । অবুঝের ন্যায় মাথা চুলকালো সে । আদ্র মেঘা আর শাফাহ্ কে যেতে দেখে ওষ্ঠপূটে দাঁত বসালো । তৃপ্ত শ্বাস ফেললো রৌদ্রের দিক থেকে একবিংশীর কথা ভেবে । চোখ সরিয়ে পা বাড়ানোর আগেই ডাক পড়লো….
” আদ্র স্যার….
” ইয়েস সুইটহার্ট !
উত্তরে সহসা মুখ ফসকে বলে ফেলেছে আদ্র ।
যা শুনে ভিড়মি খেলো শ্যামলিনী কন্যা । গোল গোল চোখ করে তাকালো । নিজের বেফাঁস কথা সজাগ মস্তিষ্কে বোধগম্য হওয়া মাত্রই চট করে ঘাড় ঘোরালো আদ্র । শিশিরের হা করে থাকা আশ্চর্য ভঙ্গিমা দেখে আলগোছে জিভে কামড় বসালো ।
সেই বাড়ি থেকেই এই ‘ইয়েস সুইটহার্ট’ বলে বলে মেঘা কে খোঁচাচ্ছে । রৌদ্র কে অনুকরন করছে । শুধু সে একা নয় । বাকিরাও আছে ।
বলতে বলতে জিভের ডগায় বারবার এক বাক্য উঁকি দিচ্ছে । আকস্মিক বেফাঁস বলে ফেলেছে আদ্র । অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো সে , সাথে শিশির তো আছেই ।
আদ্র ভুলে বলে ফেলেছে । একটু হলেও আন্দাজ করতে পারলো মেয়েটা । চোখ নামিয়ে নিলো খানিক জড়তায় ।
আঁখি নিচু করে আনুচ্চ মেয়েটার দিকে হা বনে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আদ্র ।
কালো রঙের একটা সুতির থ্রি পিস পড়নে । সফেদ হিজাব
পেঁচানো মাথায় । কালো রংটা খুব একটা মানায় নি শ্যামলা শরীরে । তবে বেশ ভালোই লাগলো দেখতে । মেয়েটার মুখে অপ্রস্তুত নাজুক আভা ফুটেছে একটু আধটু , হয়তো ইতস্ততায় । বর্ননা করতে গেলে , বলা চলে বাগিচার শুকনো ফুলের ন্যায় তার সৌন্দর্য । আদ্র বেশ কিছু সময় মূর্ত চোখে পরখ করলো । কাঁধের একপাশে ব্যাগ ঝুলছে মেয়েটার । দুহাতের মুঠিতে একটা কাগজের ঠোঙা চেপে রাখা ।
কেনো যেনো হঠাৎই দৃষ্টি জোড়া থমকে ছিলো আদ্রের ।
চাহনি সংবরন করলো সে । চোখ সরিয়ে তর্জনী দিয়ে ডান ভ্রুর কাছে স্লাইড করলো । কিছু বলতে গিয়ে জড়তা কাজ করলো আজ এই প্রথম….
” আ… তোমায় বলিনি । একচুয়েলি ….
” আই নো, স্যার । বুঝতে পেরেছি আমি ।
” তুমি … তোমার নামটা যেনো কি ?
কথা ঢাকতে আচমকাই বেগতিক প্রশ্ন করে বসলো আদ্র । যে প্রশ্ন আগেও করেছে একাধিকবার ।
শিশির অগত্যা চট করে চোখ তোলে । বেখেয়ালে চোখাচোখি হয় স্বাভাবিক ভাবেই । মেয়েটা কিছুটা বিরক্ত হয়েছে । কতবার বলতে হয় নিজের নাম ? শীতল থাকতে পারলো না মেয়েটা….
” আমার নাম আর কতবার বলবো ? মনে রাখতে পারেন না । প্রফেসর সাহেবের স্মৃতি শক্তি এতোটা কম ?
” এইই বেয়াদব ! স্মৃতি কম নয় আমার , তোমার নাম টা কঠিন ।
” মোটেও না । শি-শি-র , বুঝলেন ? শিশির আমার নাম । কোন দিক থেকে এই নামটা কঠিন মনে হচ্ছে আপনার কাছে ?
আদ্র চোখ তীক্ষ্ণ করে । মেয়েটার নামের সাথে চেহারার কিছুটা মিল আছে । ভেজা ভেজা নরম চেহারা । দেখে বড়ই শান্তশিষ্ট মনে হয় ।
খুব শিথিল চেহারা খানা । মাধুর্যময় দিপ্তী । একটু আলাদা সবার থেকে । ফর্সা চেহারা না হলেও বেশ শুভ্র একখানা চামড়ার রং পেয়েছে মেয়েটা ।
মাঝে মাঝে কন্ঠ চড়াও করে । আদ্র এই চড়াও কন্ঠের তোপের মুখে দাঁড়িয়েছে বেশ কয়েকবার । যেটা ওর পছন্দ হয় নি । আর এ কারনেই এই মেয়েটাকে শায়েস্তা করতে চেয়েছিলো সে , যে কার্য এখনো অসম্পূর্ণ ।
” শিশির , হুম । ভেজা বেড়াল , নামের সাথে মিল রাখলাম , বেয়াদব মেয়ে ।
বিড়বিড় করে আদ্র ।
ব্যাগে ফোন বাজে শিশিরের । ফোন বের করে হাতে নিতেই তাজ্জব বনে যায় আদ্র । একটা সাধারণ বাটন ফোন ।
এই জেনারেশনের ভার্সিটি পড়ুয়া একটা মেয়ের কাছে কেবলই এই বাটন ফোন ? এই ফোন ব্যাবহার করে এই মেয়ে ? সিরিয়াসলি ? বিশ্বাস হয় না সহজে ! হয়তো ব্যাকআপ হিসেবে ব্যাবহার করে ।
আবার নাও হতে পারে । মেয়েটাকে দেখে খুব একটা বিলাসী মনে হয় না । মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে , দেখেই আন্দাজ করা যায় ।
শিশিরের মা ফোন করেছে । যেতে বললো এক্ষুনি । যত তাড়াতাড়ি সম্ভব যাওয়া যায় ততই ভালো । প্রথমে ভয় পেয়েছিলো মেয়েটা । ভাইয়ের কিছু হলো কি না এই নিয়ে ! পরক্ষনে ভয় দূর হলো । অন্য কারনে ডাক পড়েছে বাড়িতে । কথা শেষে ফোন ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখতে গিয়ে মুঠোর ভাঁজের বাদাম পেঁচানো ঠোঙা টা পড়লো মাটিতে ।
সহসা মেয়েটা তুলে নিলো সেটা । আদ্র নাক সিঁটকায় । পরখ করে ভরাট কন্ঠে বলে….
” ওটা তুলছো কেনো ? পড়ে গেছে তো ।
” তো কি হয়েছে ? ভেতরে বাদাম আছে আরো । পুরো কুড়ি টাকা দিয়ে কিনেছিলাম । অর্ধেক আছে । পড়ে গেছে বলে ফেলে দেবো ? লস করবো দশ টাকা ? টাকা কি গাছে ধরে ?
আদ্র চোখ সরু করে ।
পাশ কাটিয়ে চলে গেছে শিশির ।
গাড়িতে অলরেডি উঠে বসেছে শাফাহ্ মেঘা । আদ্র এতক্ষণে গিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসলো । বাড়ি ফিরে ফ্রেশ হয়ে অফিসে যেতে হবে ।
সিট বেল্ট বেঁধে ফ্রন্ট মিররের দিকে তাকালো সে । মেঘার থমথমে মুখখানা দেখে ঠোঁট কামড়ে বললো….
” সুইটহার্ট , বাড়ি যাই এবার ?
” আআআআআআ , ভাইয়া…..
ভালো হচ্ছে না কিন্তু ।
হেসে গাড়ি স্টার্ট দিয়েছে আদ্র । ভার্সিটির গেইট পেরিয়ে বাইরে বেরোলো । এদিক থেকে দুটো আলাদা পথ । মোড়ের মাথায় শিশির দাঁড়িয়ে । হাত উঁচিয়ে রিকশা ইশারা করলো । পথ ভিন্ন ওর । এক হলে শাফাহ্ মেঘা ছাড়তো না ওকে । যাওয়া আসা এক সাথেই করতো ।
জানালা ভেদে এক পলক ওর দিকে তাকালো আদ্র । পরের পলকে স্বাভাবিকের ন্যায় সরিয়ে নিলো দৃষ্টি ।
সন্ধ্যার দিকে পড়তে বসেছে মেঘা । পরশু আবার একটা পরীক্ষা । আজকের টা একটুও ভালো হয় নি । পরের টার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে এখন থেকেই । তবে হচ্ছে আর কই ? সেই টেবিলের সামনে বসেই আছে । সামনে বই উল্টে রাখা । পৃষ্ঠার যে ভাঁজ খুলে রেখেছিলো , সে ভাঁজেই পড়ে আছে এখনো । সর্বোপরি দুই তিন বাক্য পড়েছে বোধহয় ।
মাথা এলোমেলো লাগছে । সেই দুই তিন বাক্য ও বেরিয়ে গেছে এতক্ষণে ।
চুলে ঝট বেঁধেছে । এলোমেলো হয়ে মাথা চেপে ধরে মুখ কালো করে বসে আছে একবিংশী । কি হচ্ছে টা কি ওর সাথে ? এতো কি ভাবছে ও ? সকালে লোকটার নির্লজ্জতার জন্য এখনো অবধি কারোর সামনে চোখ তুলে তাকাতে পারে নি । ঐ লোকটার কথাই ঘুরছে অবাধ্য মস্তিষ্কের প্রতিটা কোণে । ঘৃণা করে রাগ তুলতে চাইলেও পারছে না মেঘা । রাগ উঠছে না , আজব !
বরং নিজের উপরই রাগ উঠছে । ঐ লোকের উপর রাগ উঠছে না , এটাই নিজের উপর রাগ ওঠার অদ্ভুত হেতু ।
মেঘা নিজেকে শান্ত করতে চাইলো । মাথা থেকে সব ঝেড়ে ফেলতে হবে । মুখ গোল করলো সে । সোজা হয়ে বসে চোখ বন্ধ করলো । ঘন ঘন লম্বা কয়েকটা শ্বাস ফেললো বুক চিরে ।
শ্বাস টেনে নেওয়া মাত্রই বন্ধ চোখের কার্নিশে ভেসে উঠলো বেপরোয়া লোকটার ধূর্ত মুখশ্রী ।
অমনি ঝট করে চোখ খুললো মেয়েটা । এবার চরম বিরক্তিতে নিজেই নিজের চুল খামচে ধরলো । গুমড়ে চিৎকার করলো…..
” ইউ রাইনো মুখো ,,, আপনার জন্য মাথা চিরে যাচ্ছে আমার । কেনো চলে গেলেন আপনি ? যাবেনই যখন , তখন এভাবে হঠাৎ এসে এলোমেলো করে দিয়ে গেলেন কেনো আমায় ? আমি ছাড়বো না আপনাকে….
বলতে বলতে ফোনটা টেনে হাতে নিলো । কোন দিক ভাবলো না , আচানক মনকে সায় দিয়ে ও পাড়ের এক নাম্বারে ডায়াল করলো …..
প্রথম বার রিসিভ হলো না । গজগজ করলো মেঘা । ফের ফোন করলো । এবার রিসিভ হতেই ঝাইঝাই করে উঠলো….
” রাইনো মুখো , কি রাজ কার্য করছিলেন হ্যাঁ ? ফোন রিসিভ করছিলেন না কেনো আমার ?
রৌদ্র বেশ সিরিয়াস । ল্যাপটপের দিকে চোখ রেখে ব্যস্ত স্বরে বললো….
” বিজি আছি !
” কার সাথে বিজি আছেন ? কি করছেন ওখানে ?
রৌদ্র চড়াও কন্ঠ শোনা যায়….
” বললাম তো বিজি আছি ! কেনো ফোন করেছিস ?
তপ্ত কন্ঠে নুইয়ে আসে মেঘা । কিড়মিড় রাগ দমে যায় । পিটপিট করে ওঠে আঁখি যুগল । চুপ হয়ে যায় সে । শ্বাসের শব্দ এপাড় থেকেই পৌঁছে যায় ফোনের ওপারে রৌদ্রের কানে । মেঘার নীরবতা বুঝে চোখ বন্ধ করে এক মুহুর্ত । ল্যাপটপ বন্ধ করে ঠোঁট ভেজায় । উঠে দাঁড়িয়ে পিকচার উইন্ডোর ধার ঘেঁষে দাঁড়ায় । ভেতর হতে বাইরের বিকেলের মিঠে রোদের পানে তাকায় । পকেটে গুঁজে নেয় এক হাত । গলা মোলায়েম করে বলে আবেশিত হয়ে….
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩২
” ইভারা , আ’ম অল ইয়ার্স ! বলো কি বলবে ?
সহসা ভেসে আসে রমনীর তড়তড়ে তেজি কন্ঠ…..
” ইউ রাইনো মুখো , যদি আপনার জন্য আমার রেসাল্ট খারাপ হয় না , তাহলে বিদেশ যাওয়া ছোটাবো আমি আপনার ! খুব ভালো আছেন ওখানে গিয়ে ? ব্যাস্ততা দেখাচ্ছেন আমায় ? খুব ব্যাস্ত আপনি ? কি করছেন ওখানে ? একবার শুধু এসেই দেখুন , আমার মাথায় এভাবে গেঁড়ে বসার জন্য জানে মেরে ফেলবো আপনাকে ।
