Home আসবো ফিরে আবারো আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩২

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩২

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩২
সুরভী আক্তার

মেঘার মুখে ভাই সম্বোধন টা শুনে সিরাত ভ্রু গুটালো । ওকে পুরো কথা শেষ করতে না দিয়েই মুখ খুললো নিজে…
” ভাই ? ভাই মানে ?
টেবিলে বসেছেন সকলে । মেঘার এমন বিচলিত হাবভাবে ওর দিকে দৃষ্টি পড়লো একাধিক । একবিংশী কারোর উপস্থিতির তোয়াক্কা করলো না । রৌদ্র চলে গেছে আবার । কেউ জানে না এটা । সবাইকে জানাতে হবে তো ।
মেঘা ফের গলা ভিজিয়ে বলে..
” আপু রৌদ্র বাড়িতে নেই ,, উনি ….
ওকে কথা টুকু শেষ করতে দিলো না । তার আগেই রৌদ্রের নাম শুনেই উঠে দাঁড়ালো আদ্র !
” মেঘ , কি হয়েছে ? তোকে এমন দেখাচ্ছে কেনো ? রৌদ্র , কি বলছিলি ওর কথা ?
মেঘা এগিয়ে যায়…..

” ভাইয়া , তোমার ভাই বাড়িতে নেই । ইনফ্যাক্ট উনি কোথাও নেই । ওনার খোঁজ নেই তোমাদের কারোর কাছে । তোমরা জানো উনি কোথায় ? রৌদ্র আমাকে ফোন…..
” মেঘা ,,, কি হচ্ছে এসব ? তুমি এতো কথা বলছো কেনো ? আর রৌদ্র , ও তোমার বড় , নাম সম্বোধনে ডাকছো কেনো ওকে তুমি ?
তোফায়েল কাবিরের কাঠ স্বরে সহসা বেগ পেলো রমনী । ধক্ করে চুপসে গেলো । তাকানো মাত্রই ভদ্রলোকের নিরেট দৃষ্টি দেখতে পেলো সে । অমনি চোখ নামিয়ে নিলো বিনয়ে । উত্তাল মনের উচাটন সামলে নিলো চোখ বুজে দীর্ঘ এক হাঁফ ছেড়ে ।
” খেতে বসো মেঘা । রৌদ্রের নাম দ্বিতীয় বার যেনো তোমার মুখে না শুনি । এটা কেনো বলছি , আশা করি তোমার অজানা নয় ।
” কিন্তু বাবা , আমি শুধু বলছিলাম রৌদ্র বাড়িতে নেই কারন..

” আবার ? খেতে বসতে বলেছি তোমায় ! রৌদ্র কেনো বাড়িতে নেই , কোথায় আছে না আছে , তা‌ তোমার না জানলেও চলবে । এ বাড়ির কেউ শত চেষ্টা করেও ওর খোঁজ পাবে না । যতক্ষণ না ও নিজে ফিরে আসছে , ততক্ষণ প্রতিক্ষায় থাকা ছাড়া এবাড়ির কারোর কোনো উপায় নেই । খেতে বসো সবাই ।
মেঘা চিবুক নামিয়ে গলায় ঠেকালো । দুহাত জড়ো করে মুড়িয়ে দাঁড়ালো গুটিসুটি হয়ে । ও তো কেবলই খবরটা দিতে চেয়েছিলো । রৌদ্র মেঘা কে খবর পাঠিয়েছে । উপর উপর শান্ত হলেও চিন্তিত সকলে ।
আদ্র পূনরায় চেয়ার টেনে বসে ডাকলো ধীরে….
” মেঘ ,, পরে শুনবো সব । খেতে বস আগে ।
ক্ষিণ স্বরে বুলি ফুটায় মেঘা….

” খিদে নেই ভাইয়া । আমি খাবো না এখন ।
” খিদে নেই কেনো ?
” খেতে ইচ্ছে করছে না । ঘুমিয়ে ছিলাম তো , মাথাটা ভার হয়ে আছে । আমি ঘুমাবো এখন ! খিদে পেলে খেয়ে নেবো পরে ।
এটুকুনি বলেই আর দাঁড়ালো না । যেভাবে নেমেছিলো উন্মাতাল ছন্দে , সেভাবেই উঠে গেলো উপরে ।
ঘরে ঢুকে পায়চারি করতে লাগলো এপাশ ওপাশ । মাথায় হাজার চিন্তা ঘোরপাক খাচ্ছে ।
ঐ লোক মুখের উপর ফোন কেটেছে । হঠাৎ করে সুইজারল্যান্ড ফিরলো কেনো ? এক রাতের ব্যবধানে উবে গেলো এভাবে ? এতো সহজে ? কেনো গেলেন উনি ? কাউকে কিছু না বলে , এই তিন পর নিজের খবর দেওয়ার সময় হলো তার ? কিন্তু গেলেনই বা কেনো ? বারবার এই এক চিন্তা মাথা টাকে খুবলে খাচ্ছে । মনে উঠছে নানান কুচিন্তা । কার জন্য আবার ফিরলো রৌদ্র ? কে আছে ওখানে ? গত পাঁচ বছরই বা কার টানে , কার সাথে কাটিয়েছে ওখানে ? বাচ্চা ? ঐ ছোট বাচ্চাটাই বা কে ?
বাচ্চার চিন্তা উঠতেই মেঘা বেশি ভাবতে পারে না । চোখ ঘোলাটে হয়ে আসে একাকিত্বে । নানান আজগুবি ধারনায় কার্নিশে ভেজা কিছু অনুভব করে একবিংশী । তাৎক্ষণিক নাক টেনে দুদিকে মাথা ঝাঁকায় । মুখ গোল করে বুকে হাত রেখে বড় বড় শ্বাস ফেলে ।
ঠোঁট ভিজিয়ে হাতে নেয় ফোনটা ।

কললিস্টে সবার আগে লোকটার নাম্বার ভেসে আছে । মেঘার হাত কাঁপছে ঠক ঠক করে । একবার চাইলো ফোন করতে । দ্বিতীয় বার চাওয়া টাকে মাটি চাপা দিলো । ফোনটাকে ফেললো অনেক দূরে ।
ঐ লোককে ছাড়বে না ও । একবার আসুক শুধু, জেনেই ছাড়বে কেনো ফিরেছিলো আবার । কে আছে ওখানে তার ? কি কাজ ওখানে ? যার জন্য এভাবে আচমকাই চলে গেলেন রাতের ব্যবধানে । সব জানবে মেঘা । শুধু ওনার ফিরে আসার অপেক্ষা । কিন্তু, ফিরবে কি আদৌও ?
আসবে কি আবারো ফিরে ?

আজ ঘুম থেকে উঠতে উঠতে নয়টা বেজেছে মেঘার । পেটে খিদে নিয়েই ঘুম ভেঙ্গেছে তার । রাতে খাওয়া হয় নি । পেট পুরো ফাঁকা । ফ্রেশ হয়ে একহাতে পেট চেপে ধরে নিচে নামলো সে ।
তোফায়েল কাবির নিচেই বসে আছেন । মেঘা তাকে দেখে চিবুক নামালো । কিচেনে ঢুকে নিজ হাতে ব্রেকফাস্ট রেডি করে নিয়ে আসলো নিজের জন্য । বাকিদের খাওয়া হয়ে গেছে । টুকটুকি এখনো ওঠে নি ।
মেঘা চেয়ার টেনে একপাশে খেতে বসে । রুবিনা কাবির কিছুটা সুস্থ হয়েছেন । এখনো অবধি নিচে নামেন নি । তিনিও নামছেন এতক্ষণে । মাথা পুরো ভার । রেলিং ঘেঁষে ঘেঁষে ধীরে ধীরে নিচে নামলেন তিনি । শেষের দুটো সিঁড়ি নামার আগেই চক্কর দিয়ে উঠলো মাথাটা । অমনি টাল হারিয়ে পড়তে পড়তে বেঁচে গেলেন কোনো রকমে । পা গুঁড়িয়ে আসলো তার । রোলার চেপে ধরে ধাতস্থ করলেন নিজেকে ।
তার মৃদু আর্তনাদ অস্ফুটে বেরিয়েছে গলা চিরে । তোফায়েল কাবির তড়াৎ করে তাকান । তিনি ওঠার আগেই খাওয়া ফেলে উঠে যায় মেঘা ।

” মামনি ,, ঠিক আছো তুমি ? একা একা নিচে নামছো কেনো ? যদি পড়ে যেতে এক্ষুনি ?
রুবিনা কাবির খানিক রাগ প্রকাশ করলেন….
” ছাড় আমায় , পড়বো না আমি ।
” আমি ধরছি , নিচে নেমে বসো তুমি ।
” বলেছি না আমি পারবো , ছাড় আমায় । খাচ্ছিলি তো , খা গিয়ে । গিলে যা যত পারিস । এ বাড়িতে থাকার সময় ফুরিয়ে এসেছে তোর । আর জুটবে না এ বাড়ির খাবার !
” রুবিনা ,,
ধমকে ডাকলেন তোফায়েল কাবির । মেঘা তাকে ছেড়ে চিবুক নুইয়ে ফেললো অপমান বোধে । রুবিনা কাবির দমলেন না…..

” জোর গলা আমার উপর দেখাচ্ছেন কেনো ? কেবল আমি আর আমার ছেলের উপরই এই রাগটা প্রকাশ করতে পারেন আপনি ‌। বাকিদের ক্ষেত্রে তো আপনি স্বয়ং দাতা । বাপ হয়ে এখনো এতোটা শান্ত কি করে থাকতে পারছেন আপনি ? একটুও চিন্তা হচ্ছে না ছেলেটাকে নিয়ে । এই মেয়েকে কি বললাম না বললাম , তাতেই গায়ে লাগলো । অথচ নিজের ছেলেটা , সে কোথায় থাকলো তা নিয়ে কোনো চিন্তা নেই আপনার ।
রুবিনা কাবিরের বড় গলা । বিপরীতে তোফায়েল কাবিরের ও তাই….
” বারবার এক কথা বলবে না । তোমার ছেলে কেমন ছন্নছাড়া , তা তুমি জানো না ?
” জানি তো , আর জানা আছে বলেই চিন্তা করি আরো ।
আদ্র পুরো তৈরি হয়ে নিচে নেমেছে । ভার্সিটি নেই । অফিসে বেরোবে এখন । চেঁচামেচি শুনে তড়িঘড়ি করে বেরোলো আরো । নামতে নামতে বললো…..

” কি হয়েছে আম্মু ? শরীর ঠিক হতে না হতেই কি নিয়ে চেঁচামেচি করছো আবার ?
” চেঁচামেচি করছি না , চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছি । তবু কেউ দেখতে চাও না ।
পেলি না আদ্র , আমার রৌদ্র টার খোঁজ পেলি না আর ?
সিরাত নামছে । মেঘা পিটপিট করে মাথা তুললো । রুবিনা কাবির খুব চিন্তা করছেন । আর চুপ করে থাকা যাচ্ছে না । মেঘা কাল বলতে চেয়েছিলো , কেউ বলার সুযোগ দেয় নি ওকে । বারবার আটকে দিয়েছে । রুবিনা কাবির কেঁদে ওঠার আগেই এবার ঝাড়া গলায় বললো মেঘা….
” মামনি , আমার কথাটা শোনো….

” চুপ , কথা বলবি না তুই । তোর জন্য এসব হয়েছে । সব তোর জন্য । তোর জন্যই রৌদ্র কে বেশি ঘৃণা করে সবাই । তোকে ভালো রাখতে গিয়ে আমার ছেলেকে তুচ্ছ করছে সবাই । কেবল তোর জন্যই দীর্ঘ পাঁচ বছর দূরে ছিলো আমার ছেলে । এখনো তোর জন্যই ছন্নছাড়া ও । বাড়িতে ফিরে যদি তোকে না দেখতো , তাহলে রৌদ্র এমন বেপরোয়া গিরি দেখাতো না । খারাপ হতো না সবার চোখের সামনে । তুই বিদায় হ আমার বাড়ি থেকে । আমি আমার ছেলেকে নিয়ে থাকতে চাই । চলে যাস না কেনো এ বাড়ি থেকে ? পাঁচ বছর করে করে আর কতদিন ? পেরিয়ে গেছে পাঁচ বছর ! সহ্য সীমার বাইরে চলে গেছিস তুই । এবার মুক্তি দে আমাদের ।
” আম্মু , মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোমার ? কিসব ভুলভাল বকছো তখন থেকে ?
কথার আঘাতে মেঘা চোখ বুজতেই টুপটাপ পানি গড়ালো গাল বেয়ে । তবুও হাসলো মেয়েটা । সিরাত এগিয়ে আসতেই পেছালো সে । এই একটু আগে খাবার নিয়ে বসেছিলো । যেটুকু খেয়েছে , মনে হয় গলায় দলা পাকিয়ে আটকালো সেই খাবার টুকু । উগলে বেরিয়ে আসতে চাইলো । দম আটকালো সেখানেই । ভেজা চোখ তুললো মেঘা । ঝাঁপসা চোখে তাকিয়ে ধরা গলায় হেসে হেসে বললো….

” চলে যাবো তো মামনি । থাকবো না আমি । ও বলেছে আর কটা দিন শুধু । এই কটা দিন আর একটু সহ্য করো আমায় । আমার যদি আম্মু আব্বু থাকতো , তাহলে বিশ্বাস করো , তোমাদের জ্বালাতাম না গত পাঁচ বছরে । আমাকে এভাবে সহ্য করতে হতো না । নেই তো আমার কেউ । ফাঁকি দিয়ে চলে গেছে ওরা । তাই পড়ে আছি এখানে । ওদের কাছে তো যেতে পারি নি । তবে আর কটা দিন শুধু , তার পর যে আছে, চলে যাবো তার কাছে । বিদায় হয়ে যাবো , মামনি ।
মেঘা থামলো । ফোঁপানোর ন্যায় শ্বাস উঠলো । ফোঁপানির শব্দ আড়াল করতে হাসলো শব্দ করে । তড়িঘড়ি করে হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছে নিলো । কেউ কিছু বলার আগেই সিঁড়ির দিকে এগোলো ঝটকায় । আদ্র কে পাশ কাটিয়ে দুই কদম সিঁড়ি উঠে থমকালো কিয়ৎ কাল । ঘাড় ঘুরিয়ে কান্নাবিজড়িত কন্ঠে বললো কোনো রকম…..

” আর বাকি রইলো তোমার ছেলে ? এটাই বলতে যাচ্ছিলাম । তোমার ছেলে দেশে নেই মামনি । সে ফিরে গেছে বিদেশে ।
বাজ পড়লো যেনো । বজ্রপাত করে আর কদম বাড়াতে পারলো না মেঘা । হেঁচকা মেরে সহসা টেনে ধরলেন রুবিনা কাবির ।
” ফিরে গেছে মানে ? কোথায় ফিরে গেছে ? কি বললি তুই ? রৌদ্র কোথায় ফিরে গেছে ?
” যেখানে ছিলো সেখানে !
বুঝতে গিয়ে বেগ পোহালো সকলে । শাফাহ্ চোখ ডলতে ডলতে নিচে নামছে । হাই তুলে সবাইকে একজোট দেখে থতমত খেলো । শাহিনা কাবির ও নিচে নামলেন ।
সিরাত না বুঝে টেনে নিজের দিকে ঘোরালো মেঘা কে । তীক্ষ্ণ স্বরে জানতে চাইলো….

” মেঘা , কি বলছিস তুই ?
” হ্যাঁ আপু । ফিরে গেছেন উনি ।
” এই মেয়ে , তুই জানলি কি করে ?
আবারো মেঘাকে নিজের দিকে ফিরিয়ে নেন রুবিনা কাবির । মেঘা থেমে বলে…
” ফো…ফোন করেছিলেন ।
” কে ফোন করেছিলো তোকে ?
মেঘার উত্তর নেই । পিটপিট করে চোখ তুললো তোফায়েল কাবিরের দিকে । যিনি এখন পেছনে হাত গুটিয়ে সটান ওকেই পরখ করছেন । কেঁপে উঠে চোখ নামিয়ে নেয় মেঘা । নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলে…
” কাল রাতে উনি ফোন করেছিলেন বিদেশি নাম্বার থেকে । চলে গেছেন । এটাই জানানোর ছিলো শুধু । আমাকে বলে দিয়েছে যেনো সবাইকে জানিয়ে দেই । তাই জানিয়ে দিলাম । এর বেশি আমার আর কিছু জানা নেই ।
রুদ্ধ স্বরে কোনো রকমে কথা গুলো উগড়ে দিয়ে তড়তড়িয়ে সিঁড়ি ডিঙ্গিয়ে উঠে গেলো মেঘা । রেখে গেলো মূর্ত বনে যাওয়া কিছু মানবকে ।
দূর্বল পদ যুগল পেছন দিকে টলে পড়লো রুবিনা কাবিরের । পিছিয়ে গেলেন তিনি । নিঃশব্দে ঝড়ঝড়িয়ে পানি গড়ালো গাল ঝাঁপিয়ে ।

আদ্র স্থবির থেকে এক মুহুর্ত পর নিজেও উঠলো সিঁড়ি বেয়ে । মেঘা ঘরে গিয়ে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়েছে । রুবিনা কাবিরের বলা কড়া কড়া কথা গুলো মনে ভাসতেই দগ্ধা ব্যাথা গুলো জেঁকে উঠলো মেয়েটার হৃদয়ে ।
হুঁ হুঁ করে উঠলো অন্তঃস্থল । সে যে নরম । বড্ড নরম । কড়া কথা সহ্য হয় না । পরের বাড়িতে থেকে , এভাবে কথা শুনতে যে আরো বেশি আঘাত লাগে ।
আম্মু আব্বুর ছবিটা নিয়েই এসেছে । সেটাকে শক্ত করে চেপে ধরলো বুকের সাথে । ঠোঁট উল্টে বাঁধ ভেঙে কেঁদে উঠলো শব্দ করে । ফুঁপিয়ে নালিশ করলো বিড়বিড় করে…..
” তোমাদের মতো কেউ হয় না আম্মু-আব্বু । কেনো হয় না বলতে পারো ? কেনো চলে গেলে আমাকে রেখে ? জানোই তো , কেউ হবে না তোমাদের মতো ! কেউ আমাকে তোমাদের মতো করে ভালোবাসবে না । তাহলে কেনো রেখে গেলে আমায় ? আমার খুব কষ্ট হয় কেউ এভাবে কথা বললে । তোমরা তো জানো , পাঁচ বছর আগেও আমি এখানে থাকতে চাই নি । যেখানে আমার কেউ নেই , সেখানে থাকতে চাই নি আমি । বাধ্য হয়েছি থাকতে । ওরাই তো আটকেছে আমায় । আমি আর থাকবো না এখানে । দম বন্ধ লাগে আমার । আমি ফোন করবো এক্ষুনি , নিয়ে যাক আমায় এখান থেকে । অন্যের ঘাড়ে আমাকে গছিয়ে দিয়ে নিজে সুখে আছে ও ? আমি ছাড়বো না ওকে….
মেঘা রুমে ঢুকে টেবিলের উপর থেকে ফোন হাতে নিলো । চোখ মুছে একটা নাম্বার খুঁজে বের করলো কললিস্ট ঘেঁটে । সেটাতে কল লাগানোর আগেই মেঘার হাত খানা চেপে ধরলো কেউ ।

” মেঘ,, কি করছিস ?
ফুঁপিয়ে ওঠে মেয়েটা ।
” ছাড়ো ভাইয়া , আমি ফোন করবো !
” কাকে ফোন করবি ?
” আমার যে আছে , তাকেই ফোন করবো ! হাত ছাড়ো…
” মেঘ , পাগলামো করবি না । কি বলবি ফোন করে ?
” বলবো আমাকে নিয়ে যেতে । আমি আর থাকবো না ভাইয়া । তোমাদের খুব জ্বালিয়েছি আমি । আর জ্বালাবো না । সময় পার হয়ে গেছে অনেক । মামনি অসহ্য হয়ে পড়েছে আমার উপর । তোমাদের বাড়িতে থেকে তোমাদের অসহ্য করতে চাই না আর ।
” মেঘ , তুই জানিস তো আম্মু রেগে গেলে সেন্স থাকে না । উল্টো পাল্টা বলে ফেলে রাগের মাথায় ।
” না ভাইয়া , মানুষ রাগের মাথায় উল্টো পাল্টা বলে না মোটেও । যা বলে সেটাই ঠিক বলে,, জানো ? রেগে গেলেই মানুষের আসল রুপ দেখা যায় ।
আদ্র মেঘার হাত ছাড়লো । ফুঁপিয়ে কাঁদছে মেয়েটা । আদ্র থামালো না ওকে । শীতল কন্ঠে বলল…
” সরি মেঘ বুড়ি ,,, আম্মু একটু রুড । তুই তো চিনিস ভালো করে । তাই বলে যে , তোকে ভালোবাসে না , তা তো নয় । এ বাড়ির সবাই তোকে কত ভালোবাসে । আর তুই সবাইকে রেখে চলে যাওয়ার কথা ভাবছিস ?
” চলে তো যেতেই হবে ! আজ হোক বা কাল…
” কে যেতে দেবে তোকে ?
” কে আটকাবে আমায় ?
মেঘার তাৎক্ষণিক পাল্টা প্রশ্ন । ছলছল চাহনি মেয়েটার । আদ্র ধীরে সুস্থে তাকালো ।
প্রসঙ্গ ঘেঁটে জানতে চাইলো একটু থেমে….

” রুডি ফোন করেছিলো তোকে ?
মেঘা সেটার উত্তর করলো না । মাড়ি খিচে শক্ত করলো । চিবুক নামিয়ে কন্ঠ চিপে উচ্চারণ করলো….
” আমি তোমার ঐ বেপরোয়া ভাইকে কোনো দিন ক্ষমা করবো না ভাইয়া । কোনো দিন না । উনি যদি আমাকে এ বাড়িতে এনে না ফেলতেন , তাহলে হয়তো আমার জীবনটা আজ এমন হতো না । দাদু মনিকে হারিয়েও বাঁচতে পারতাম আমি । তোমাদের কে নির্ভরতা বানাতে হতো না অসময়ে । আমি ওনাকে কোনো দিন ক্ষমা করবো না । আই হেইট হিম…আই হেইট রুডভিক কাবির রৌদ্র ।

পরদিন পরীক্ষা । সকালে মেঘার ঘুম ভাঙলো শাফাহ্’র ডাকে । অনেক রাত অবধি জেগে ছিলো । জেগে থেকে পড়েছে কিনা সন্দেহ । কেবলই এক মনে বসে ছিলো বই খুলে রেখে । মন বসছে না পড়ায় । কেবলই হাহাকার লাগছে । কাল কেঁদেছে খুব । সারাটা সকাল নিজেকে ঘরবন্দি করে রেখেছিলো । নিচে নামে নি কাল আর ।‌ রুবিনা কাবিররের সামনে যাওয়া তো অনেক দূর ।
পরীক্ষার জন্য ওকে ডিস্টার্ব ও করে নি কেউ । রাতে শাহিনা কাবির দুই মেয়ের খাবার ঘরে দিয়ে এসেছিলেন । ঘরেই খেয়েছে ওরা ।
শাফাহ্ পড়া রেখে এগারোটার দিকে ঘুমিয়ে গেলেও মেঘা ঘুমায় নি । সে ঘুমোতে ঘুমোতে রাত্রি দুটো । এই এতোটা সময় নিবিড় রাত্রিতে হাঁটু জড়িয়ে বসে বসে নিঃশব্দে কেঁদেছে মেয়েটা । মাঝে মাঝে এমন কষ্ট হয় , না চাইতেও চোখ জোড়া অশ্রু ঝরায় অঝোরে । নিয়ন্ত্রণ থাকে না নিজের প্রতি । মেঘা কাল কেনো এতোটা কেঁদেছে , তা ও নিজেও জানে না ।

ঘুম হয় নি । শাফাহ্’র ডাকে উঠতে উঠতে সাতটা বেজে গেছে । অতিরিক্ত কান্না আর ঘুমের খামতিতে চোখ জোড়া ফুলে লালচে হয়ে উঠেছে একবিংশীর । মুখখানা মলিন ভেজা ভেজা । পরীক্ষা দশটার দিকে । সকালে পড়লে একটু ভালো হতো । কিছু টপিক বাকি ছিলো । চোখ বুলিয়ে নেওয়াও হলো না আর ।
একেবারে তৈরি হয়ে বেরোনোর আগেই দরজায় টোকা পড়লো । চকিতে দরজা খুলে দিলো মেঘা । বেরোচ্ছিলোই সবে । তোফায়েল কাবির কে দেখে অপ্রস্তুত হলো কিছুটা । এলোমেলো পলক ফেলে বললো….
” গুড মর্নিং , বাবা !
মোলায়েম হাসলেন ভদ্রলোক । ঠান্ডা স্বরে বললেন…..
” মর্নিং ,, পরীক্ষা আছে আজ ?
” জি !
” নিচে চলো , ব্রেকফাস্টের সময় হয়ে গেছে ।
তার সাথেই নিচে নামলো শাফাহ্ আর মেঘা । কাল রুবিনা কাবিরের এলোমেলো বকাবকির পর মেঘা কে আর দেখেন নি তোফায়েল কাবির । তাই হয়তো সকাল সকাল খোঁজ নিতে এসেছেন । মেঘার বুঝতে বাকি রইলো না ।

খাবার টেবিলে মেঘা কে নিজের পাশে বসিয়েছেন তিনি । মেঘা চোখ তুলে তাকায় নি । খাওয়ার মাঝে রুবিনা কাবির মেঘার পাতে অমলেট তুলে দিলেন । অমনি তড়াক করে চোখ তুললো মেয়েটা । মুহুর্তেই চোখাচোখি হলো ভদ্রমহিলার সাথে । মেঘা চোখ নামিয়ে নেয় । তাকায় অমলেট টার দিকে । আশ্চর্য , এটা দেখে ঐ লোকটার কথা আচমকাই মনে উঠলো কেনো ? চোখের সামনে তার মুখাবয়ব টুকু ভাসলো কেনো হঠাৎ ? এই কদিনে মেঘার পাত থেকে অমলেট তুলে তুলে খেতো রৌদ্র । মেঘা বিরক্ত হলেও বাঁধা দেয় নি কভু । লোকটা নাকি ডিম খায় না । অথচ ঠিক খেতো । দুদিকে মাথা ঝাঁকালো মেঘা । সে ঐ লোকের কথা আর ভাববে না ।
শুভ্র নিচে নামতেই তৌসিফ কাবির মুখ খুললেন…..
” কথা হয়েছে রৌদ্রের সাথে ?
” কন্টাক্ট করতে পারি নি । রিসিভ করছে না ফোন । কম করে হলেও দু’শো বার ফোন দিয়েছি কাল থেকে ।
বসতে বসতে জবাব দিলো শুভ্র ।
সুইজারল্যান্ডে থাকা কালীন আগে রৌদ্রের কাছে যে নাম্বার থাকতো , সেটাই চালু হয়েছে আবার । কাল মেঘার বলার পর বাড়ির সবাই একাধারে চেষ্টা করছে ওর সাথে কথা বলার । ফোন করেই যাচ্ছে , কিন্তু ঐ বেপরোয়া ছেলে রিসিভ করছে না ।

মেঘার অবাধ্য মন হাঁসফাঁস করেছে সারাটা সকাল থেকে রাত । যখন শুনেছে ঐ লোক ফিরে গেছেন , তখন থেকেই উচাটন বেড়েছে রমনীর । বাধ্য মনের অবাধ্যতায় হাজার বার ফোন তুলে নিয়েছিলো হাতে । ভেবেছিলো ফোন করবে সেই দূর দেশে , কিন্তু শেষ পথে গিয়ে সামলে নিয়েছে নিজেকে । ঐ লোক তো আর ফোন দিচ্ছে না । তাহলে মেঘা নিজে থেকে কেনো দেবে ?
বাড়ির কারোর ফোন রিসিভ করছে না সে । রুবিনা কাবির চুপ হয়ে গেছেন ‌। কথা বলছেন না আর । যেনো বাচ্চাদের ন্যায় অভিমান করেছেন গাল ফুলিয়ে ।
তোফায়েল কাবির স্ত্রী কে আড় চোখে পরখ করে বললেন…
” শুভ্র , তোমার ভাইকে ফোন করো এখন । এই মুহূর্তে আমাদের সবার সামনে ।
দ্বিমত করলো না শুভ্র । বাধ্যের ন্যায় সহসা ফোন লাগালো । গুনে গুনে দুবার । রিং হতে হতেই কেটে গেলো । তোফায়েল কাবির নিজের পকেট থেকে ফোন বের করে দিলেন…..

” আমার টা দিয়ে ফোন দাও ।
তাই করলো শুভ্র । এবারো দুবার কল লাগালো । রিসিভ হলো না । তপ্ত শ্বাস ফেললেন তোফায়েল কাবির । মেয়েকে উদ্দেশ্য করে বললেন….
” সিরাত , তোমার ফোন থেকে কল করো ।
সিরাত ও বাদ পড়লো না । একে একে তিনটে ফোন থেকে মোটে সাত বার কল গেলো বেপরোয়া ছেলের ফোনে । বরাবর ব্যার্থ । একটা বার ও রিসিভ হলো না ।
” আব্বু , রিসিভ করছে না ফোন !
” তোমার মাকে বোঝাও এটা । এ বাড়ির কেউ নাকি তার ছেলেকে নিয়ে ভাবে না । সে কি জানে , তার ছেলেই এ বাড়ির কাউকে নিয়ে ভাবে না । ভাবলে অন্তত একটা বার কারোর ফোন রিসিভ করতো ।
রুবিনা কাবির চুপ । আদ্র মুখের খাবার গিলে এক গ্লাস পানি খেলো । সবার মধ্য থেকে মুখ খুললো…..

” মেঘ , ফোন কোথায় তোর ?
মেঘার জবানে বুলি ফুটলো এই এতক্ষনে….
উত্তর সূচকে পিছনে ঘাড় ঘুরিয়ে টি-টেবিলের দিকে তাকালো । ইশারা অনুযায়ী সেখান থেকে ফোনটা তুলে আনলো আদ্র । পাসওয়ার্ড তার জানা । লক খুলে শুভ্রর দিকে বাড়িয়ে দিলো । গুরুভার ভঙ্গিতে বললো…..
” ভাইয়া , এটা থেকে ফোন দাও । আর হ্যাঁ , স্পিকার দেবে ।
বিস্মিত হলেও না করলো না শুভ্র । কিছু একটা আন্দাজ করে দ্রুত কললিস্টে ঢুকলো । লিস্টের দ্বিতীয় নাম্বার টাই রৌদ্রের । গত পরশু রাতে ফোন এসেছিলো । শুভ্র তাকালো মেঘার দিকে । মেঘা পিটপিট করে তাকিয়ে আছে শুকনো মুখে ।

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩১

কল লাগিয়ে স্পিকার দিয়ে ফোনটা সামনে ধরলো শুভ্র ।
তোফায়েল কাবির ছেলেদের মতিগতি বুঝে চোখ সরু করলেন । একবার রিং হলো , অতঃপর দ্বিতীয় বার । তৃতীয় বার রিং হওয়ার আগেই চট করে রিসিভ হলো কল । ওপাড় হতে ভেসে আসলো বেপরোয়া যুবকের মৃদুমন্দ আবেশিত কন্ঠ….
” ইয়েস সুইটহার্ট …..

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here