Home সিকান্দার শাহ্ সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৩০

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৩০

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৩০
Raiha Zubair Ripti

সিকান্দার আর মুনতাহা সুবহান ও ইলার বাড়ি থেকে যে চলে গিয়েছে,এই খবর ইতিমধ্যে পেয়ে গেছে নাদিম। আর পাওয়া মাত্রই সে সিকান্দারের সাথে কন্টাক্ট করার চেষ্টা করছে৷ দুনিয়া উল্টে পাল্টে গেলেও সে সিকান্দার কে তার বাড়িতেই নিয়ে আসবে। কিন্তু ফোন সুইচঅফ বলছে। রাগে তার মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে। ভাবছে সিকান্দার হয়তো তার সাথে যোগাযোগ করতে চায় না সেজন্য ফোন বন্ধ করে রেখেছে। কিন্তু আসল কাহিনি জানলে হয়তো অন্য ভাবে রিয়াক্ট করতো।
ময়না বেগম খাবার খাওয়ার জন্য ডাকলো নাদিম কে। নাদিম সেটা শুনে রাগে গিজগিজ করে করে উঠে এসে বলল,

“ আপনার ক্ষুধা লেগেছে না? আপনি খান। আশ্চর্য হই আপনাকে দেখে। কিভাবে শান্ত থাকতে পারছেন? খাবার খেতে পারছেন? গলায় আঁটকে যায় না সেই খাবার? না জানি ওরা কেমন আছে।কি দিয়ে কি করছে। কোথায় আছে। ফোনটাও সুইচ অফ বলছে। এমন কুলাঙ্গার আমরা যে দুটো মানুষকে সাহায্যই করতে পারছি না। ”
এত এত কথা বললো নাদিম কিন্তু ময়না বেগমের মুখ দেখে মনে হলো না তার ভেতর কোনো উদ্বেগ কাজ করছে মেয়ের জন্য। কেমন ভাবলেশহীন ভাব তার। শব্দ করে দরজা লাগিয়ে দিলো নাদিম৷ ইলাকেও ইচ্ছে মতো ঝেড়েছে। ইলাও কম না। সেও শুনিয়েছে ইচ্ছে মতো। দুজন এখন দুজনের ব্লক লিস্টে।
সেলিম মির্জার কি যেন হয়েছে। আজ সকাল থেকে দশ বারের বেশি হলো ওয়াশরুমে গেছেন। পেটটা মোচড় দিয়ে উঠছে বারবার। ক্লান্ত হয়ে শুয়ে আছে বিছানায়। খবর পেয়েছে সিকান্দার যায় নি মামার বাড়ি। সাইদা মির্জা মুনতাহাার হাত থেকে যে আংটি টা খুলে নিয়েছিল সেটা নিজের হাতে পড়েছে। কিন্তু সেই আংটি আর হাতের আঙুল থেকে বের হচ্ছে না। কত ভাবে চেষ্টা করলো৷ বেরই হয় নি।
রেণু কে ডেকে লেবুর শরবত দিতে বললো। রেণু এসে দিয়ে গেলে সেটা সেলিম মির্জা খেলেন। রেণু দরজার কাছে দাঁড়িয়ে মুখ বাঁকিয়ে বললো,
“ ভালো হইছে। আল্লাহ করছে বিচার। গু দিয়া মাখায় যাক শরীর। সারাদিন বসে থাক টয়লেটে।বজ্জাত বেডা। আমার ভাইজানের সব কাইড়া নিছস। এত সহজে হজম করা পারবি? হাত পা অবশ হয়ে বিছনায় পড়ে থাক প্যারালাইজড হয়ে। খবিশ, ইবলিশ, জাউড়া বুড়া বেডা কোনহানের। ”

ব্যস্ত স্টেশনে একমাত্র আদরের মেয়েকে হঠাৎ রাস্তার মাঝখানে ছুটে যেতে দেখে অসুস্থ শরীর নিয়েও প্রাণপণে দৌড়ে এলেন শফিক সাহেব। বুকটা ধড়ফড় করছে, শ্বাস ভারী হয়ে এসেছে। কাছে পৌঁছেই মেয়ের বাহু শক্ত করে ধরে কাঁপা গলায় বললেন,
“এভাবে কেউ রাস্তার মাঝে দৌড়ে যায়, মা? যদি গাড়িটা তোর ওপর দিয়েই চলে যেত? তখন কী হতো?”
বকতে বকতেই মেয়ের মুখের দিকে তাকালেন। কিন্তু শিফা যেন কিছুই শুনছে না। সে একদৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে।
শফিক সাহেবও মেয়ের দৃষ্টির অনুসরণ করলেন।পরক্ষণেই বিস্ময়ে তার চোখ বড় হয়ে গেল। এ যে সিকান্দার! যে কি না কয়েকদিন আগেই আল্লাহর রহমত হয়ে তাদের জীবনে এসেছিল।
এদিকে সিকান্দার এখনও তাদের উপস্থিতি খেয়াল করেনি। সে ব্যস্ত মুনতাহার শরীরের কোথাও আঘাত লেগেছে কি না তা দেখার জন্য। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,
“ বলুন না। কোথাও লেগেছে? ব্যথা পেয়েছেন?”
মুনতাহা তার এমন পাগলামি দেখে বলল,

“ আমার ব্যথা লাগে নি কোথাও। ঐ আপুটার লেগেছে বোধহয়। ”
কথাটা শুনে সিকান্দারের উৎকণ্ঠা কিছুটা কমলো। বুকের ভেতরের অস্থিরতা কিছুটা প্রশমিত হলো। সে দ্রুত একবার মাথা থেকে পা পর্যন্ত স্ত্রীকে দেখে নিল। কোথাও বড় কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই বুঝতে পেরে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল।
“আলহামদুলিল্লাহ।”
তারপর সে ঘুরে তাকাতেই সামনে শফিক সাহেবকে দেখে চমকে উঠলো। মুনতাহার হাত ধরে এগোনোর প্রস্তুতি নেওয়ার আগেই শফিক সাহেব এগিয়ে আসলেন৷ সিকান্দার সালাম দিলো। শফিক সাহেব সালামের জবাব দিয়ে শফিক সাহেব স্নেহভরা হাতে সিকান্দারের কাঁধে হাত রাখলেন।
“শেষ পর্যন্ত আল্লাহ যাত্রাপথেই তোমার সঙ্গে আবার দেখা করিয়ে দিলেন বাবা। অন্তত কৃতজ্ঞতা জানানোর সুযোগটা পেলাম।”
সিকান্দার মাথা নত করল।

“চাচা, কৃতজ্ঞতা তো আল্লাহর প্রতি হওয়া উচিত। আমি শুধু একটা মাধ্যম ছিলাম। তিনি চাইলে যেকোনো মানুষকে অন্যের উপকারের জন্য বেছে নেন।”
“না বাবা। সবাই পারে না। মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর মতো হৃদয় সবার হয় না।”
ঠিক তখনই মুনতাহা শিফার হাতের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল।
” আপু… আপনার হাত থেকে তো রক্ত বের হচ্ছে!”

সবাই একসঙ্গে তাকাল। শিফা অবাক হয়ে নিজের ডান হাতের দিকে তাকাল।
সত্যিই তালুর পাশটা কংক্রিটে ঘষা লেগে ছিঁড়ে গেছে। লাল রক্ত ধীরে ধীরে কবজি বেয়ে নিচে গড়িয়ে পড়ছে। এতক্ষণ ভয় আর ধাক্কায় ব্যথা টের পায়নি। এখন হালকা জ্বালাপোড়া অনুভব করতেই মুখটা কুঁচকে গেল।
সিকান্দার আর এক মুহূর্ত দেরি করল না।
“চলুন। সামনে একটা ফার্মেসি আছে চাচা। আগে ক্ষতটা পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ করে নেওয়া দরকার।”
কেউ আপত্তি করার সুযোগ পেল না। কয়েক মিনিট পর পাশের একটি ফার্মেসিতে বসে শিফার হাত পরিষ্কার করে ওষুধ লাগিয়ে সুন্দরভাবে ব্যান্ডেজ করে দিলেন দোকানের লোক। সব খরচ সিকান্দারই পরিশোধ করল। ফার্মেসি থেকে বেরিয়ে রাস্তার পাশের বেঞ্চে চারজন বসল।মুনতাহার কোলে এখনো সেই বিড়াল টা বুকের সাথে লেপ্টে আছে কোলে। স্টলের দোকান থেকে বিস্কুট কিনে খেতে দিয়েছে। চুপচাপ মুনতাহার কোলে শুয়ে শুয়ে বাবু হয়ে খাচ্ছে।
কিছুক্ষণ নীরবতা। সিকান্দার জিজ্ঞেস করলো,

“ অপারেশন সাকসেসফুলি হয়েছে তো চাচা? আর কোনো সমস্যা হয় নি তো? ব্যস্ততায় খোঁজ খবর নিতে পারি নি। ”
শফিক সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“ অপারেশনের সময় কোনো সমস্যা হয় নি বাবা। তবে…”
“ তবে কি চাচা? ”
শফিক সাহেব মলিন মুখে বললেন,
“তুমি যেদিন হাসপাতালের বিলটা দিয়ে দিলে, সেদিন মনে হয়েছিল আল্লাহ আমাদের জন্য অচেনা একজন ফেরেশতা পাঠিয়েছেন। বাড়িঘর, জমিজমা বিক্রি করে যে টাকাটা এনেছিলাম চিকিৎসার জন্য, সেই টাকা আর না লাগায় সেটুকু আলাদা করে রেখে দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম সুস্থ হয়ে গ্রামে ফিরে অন্তত ভিটেমাটিটা ছাড়িয়ে নেব। কিন্তু…”
তিনি থেমে গেলেন। গলা ভারী হয়ে এসেছে। কম টাকা ছিলো না সেখানে। বলতে পারলেন না পুরো কথা। শিফা নিচু স্বরে বলল,

“আজ সন্ধ্যায় স্টেশনের ভিড়ে পুরো টাকাটাই চুরি হয়ে গেছে আমাদের।”
সিকান্দার কথাটা শোনা মাত্রই ঠোঁটের কোনে উচ্চারণ করলো,
” ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন…”
শফিক সাহেবরাও তাহলে সিকান্দারের মতো এখন নিঃস্ব! সিকান্দারের থেকেও তাদের অবস্থা খারাপ!
“ পুলিশের কাছে যান নি চাচা? ”
“ গেলে কি আর সেই টাকা ফিরে পাবো বাবা? পুলিশদের উপর এখন আর তেমন ভরসা পাই না৷ ”
“ হ্যাঁ, কথাটা খুব একটা ভুল বলেন নি। আমার ফোনটাও আজ হারিয়ে গেছে। ”
মুনতাহা চমকালো সে কথা শুনে।

“ সেকি! কখন হলো? ”
“ পানি কিনতে গিয়ে৷
শফিক সাহেব দু’হাত মাথায় দিয়ে বসে পড়লেন।
“সুবহানাল্লাহ! আমাদের টাকা গেল, তোমার ফোন গেল…।”
সিকান্দার ধীরে বলল,
“রিজিক, সম্পদ সবই তো আল্লাহর আমানত। তিনি যতদিন রাখেন, ততদিনই আমাদের থাকে। তিনি ফিরিয়ে নিলে অভিযোগ করার অধিকারও আমাদের নেই। এখন কোথায় যাবেন আপনারা?”
মুনতাহা স্বামীর দিকে তাকিয়ে রইল। এই মানুষটার ঈমান তাকে প্রতিবারই নতুন করে বিস্মিত করে। এত ক্ষতির পরও তার মুখে অভিযোগ নেই।

“ পটিয়ায় তো আর কিছুই অবশিষ্ট নেই আমাদের। সেজন্য নেত্রকোনা যাব। শিফার মামা বাড়িতে। ওখানে কিছুদিন থেকে ওখানেই কিছু একটা করা শুরু করবো ভাবছি নতুন করে। কিন্তু তোমরা এখানে কেন? তোমাদের তো এভাবে স্টেশনে থাকার কথা নয়। কোথাও যাচ্ছ? ”
প্রশ্নটা শুনে সিকান্দার এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। সে নিজের কষ্ট মানুষের সামনে তুলে ধরতে পছন্দ করে না। মানুষের সহানুভূতির চেয়ে সে আল্লাহর সাহায্যকেই বেশি কামনা করে। তাছাড়া নিজের পারিবারিক অপমান অন্যের কাছে প্রকাশ করাও তার আত্মসম্মানে বাধে।
“এমনিই… একটু কাজে এসেছি।”
কিন্তু কথাটা শেষ হওয়ার আগেই শিফা ধীর কণ্ঠে বলল,
“আপনি সত্যিটা লুকাচ্ছেন।”
সিকান্দার তাকালো না। শফিক সাহেব বললেন,

“ সত্যি লুকাচ্ছে মানে? ”
শিফা বলল,
” সুনেহরার সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল বাবা। ও-ই বলেছে…উনাকে আর মুনতাহা কে মির্জা বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।”
কথাগুলো শুনে শফিক সাহেব যেন স্তব্ধ হয়ে গেলেন।অবিশ্বাসে তাকিয়ে রইলেন সিকান্দারের দিকে।
“এসব… সত্যি?”
সিকান্দার তখনও চুপ। তার নীরবতাই উত্তর হয়ে রইল। শিফা সুনেহরার মাধ্যমে জানা সবটাই শফিক সাহেব কে খুলে বললেন। শফিক সাহেব চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার কণ্ঠে ক্ষোভ, ঘৃণা আর অপার কষ্ট একসঙ্গে মিশে গেল।
“সেলিম… তুই এতটা নিচে নেমে গেছিস? ছোটবেলার বন্ধু বলে কত সম্মান করেছি! অথচ নিজের ছেলের সঙ্গেই এমন আচরণ! সম্পদ মানুষকে অন্ধ করে দেয়। আজ নিজের চোখে দেখলাম।”
কিছুক্ষণ নীরব থেকে তিনি সিকান্দারের দিকে তাকালেন।

“ এখন কোথায় যাবে তাহলে? ”
“ এখন কোথায় যাব, সেটাই ভাবছি। আল্লাহ নিশ্চয়ই একটা ব্যবস্থা করে দেবেন।”
শফিক সাহেব ফের চুপ হয়ে গেলেন। মনে মনে একটার পর একটা ঘটনা মিলিয়ে দেখতে লাগলেন। হাসপাতালে যখন তিনি চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতে না পেরে দিশেহারা, তখন আল্লাহ এই ছেলেটাকেই পাঠিয়েছিলেন। আজ আবার, যখন তার নিজের সবটুকু সম্বল চুরি হয়ে গেল, ঠিক সেই সময়ও আল্লাহ এই ছেলেটার সঙ্গেই দেখা করিয়ে দিলেন। কোনো ঘটনাই কি এমনি এমনি ঘটে? না। একজন মুমিন জানে, আল্লাহর ফয়সালা কখনো উদ্দেশ্যহীন হয় না। মৃদু হেসে বললেন,

“সুবহানাল্লাহ… আল্লাহর ফয়সালা কত অদ্ভুত, তাই না বাবা?”
সিকান্দার নীরবে তাকিয়ে রইল। শফিক সাহেব দূরে ব্যস্ত মানুষের ভিড়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“হাজার হাজার মানুষ এই স্টেশনে চলাফেরা করছে। অথচ আবারও দেখা হলো ঠিক তোমার সঙ্গেই। যেদিন আমি চিকিৎসার খরচ জোগাড়ের জন্য অসহায়ের মতো এদিক ওদিক ছুটছিলাম, সেদিনও আল্লাহ তোমাকেই আমার কাছে পাঠিয়েছিলেন। আর আজ, যখন তুমি নিজেই বিপদে পড়ে দিশেহারা, তখন আবার আল্লাহ তোমাকে আমার সামনেই এনে দাঁড় করালেন। একজন মুমিন হিসেবে আমি এটাকে কাকতালীয় বলতে পারি না বাবা। আর রব কোনো কিছুই অকারণে ঘটান না। নিশ্চয়ই এর মধ্যেও তাঁর কোনো হিকমত আছে।”
সিকান্দার নিচু স্বরে বলল,
“সবই আল্লাহর ইচ্ছা, চাচা।”
“হ্যাঁ। আর সেই ইচ্ছার ওপর ভরসা করেই তোমাকে একটা কথা বলছি। রাখবে? ”
“ জ্বি চাচা বলুন। ”
“ আমার সবচেয়ে অসহায় সময়ে মানুষজন যখন মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। তখন একমাত্র তুমিই আমার পাশে দাঁড়িয়েছিলে। হাসপাতালের বিল পরিশোধ করে শুধু টাকা দাওনি বাবা, আমার জীবন পূনরায় ফিরিয়ে দিয়েছিলে। আজ আল্লাহ আমাকে সুযোগ দিয়েছেন। আমাকে কিছু করতে দাও তোমার জন্য।”
সিকান্দার দ্রুত বলল,

“চাচা, মানুষের উপকার করে বিনিময় আশা করলে তো সেটা ইখলাস থাকে না। আমি কিছুই চাই না।”
শফিক সাহেব মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন।
“আমি ঋণ শোধ করছি না বাবা… আমি আমার ছেলের পাশে দাঁড়াতে চাইছি।” তিনি সিকান্দারের মাথায় হাত রাখলেন। “দেখো বাবা, আমারও আজ কিছু নেই। তোমারও কিছু নেই। চলো আমাদের সঙ্গে। যতদিন আল্লাহ কোনো রাস্তা খুলে না দেন, ততদিন আমরা একসঙ্গেই থাকব। রিজিকের দায়িত্ব আমার না, তোমারও না। রিজিকের দায়িত্ব আসমানের মালিকের। তিনি যখন দুজনকে এক জায়গায় মিলিয়ে দিয়েছেন, তখন দুজনের রিজিকও ইনশাআল্লাহ তিনি একসঙ্গেই লিখে রেখেছেন।”
সিকান্দার তৎক্ষণাৎ মাথা নেড়ে বলল,
“না চাচা… এটা কী করে হয়? আপনাদের উপর বোঝা হতে চাই না। আপনাদের অবস্থাও তো..”
“ তুমি আমাকে কি ডাকো? ”
“ চাচা। ”

“ সেদিন হসপিটালে চিঠিতে কি উল্লেখ করেছিলে?ছেলে বলেছিলে। আমাকে বাবার মতো মনে করো। আমি যেন তোমায় ছেলে ভাবি। তাহলে বলো, নিজের ছেলের বিপদের দিনে কোনো বাবা কি তাকে একা ছেড়ে দেয়? আর একজন ছেলে কখনো তার পিতার জন্য বোঝা হয় না বাবা। বরং একজন আরেকজনের জন্য রহমত হয়। তুমি যেদিন হাসপাতালে আমার পাশে দাঁড়িয়েছিলে, সেদিন তো ভাবোনি আমি তোমার ওপর বোঝা। তাহলে আজ তুমি নিজেকে কেন বোঝা ভাবছ? অভাবের কথা আল্লাহ জানেন। কিন্তু আমি এটাও জানি, যে ঘরে একজন ক্ষুধার্ত মুমিনকে জায়গা দেওয়া হয়, সেই ঘরের বরকত কমে না। বরং আল্লাহ বাড়িয়ে দেন। এই বিশ্বাস নিয়েই তো এতদিন বেঁচে আছি।”
তিনি একটু ঝুঁকে সিকান্দারের হাত নিজের হাতে নিলেন।

“তুমি সেদিন আমার বিপদে আল্লাহর পাঠানো রহমত ছিলে। আজ যদি আল্লাহ আমাকে তোমার জন্য সামান্য উসিলা বানাতে চান, তাহলে সেই নেয়ামত ফিরিয়ে দেওয়ার সাহস আমার নেই বাবা। হয়তো আল্লাহ আমাকে তোমার জন্য পাঠিয়েছেন, কিংবা তোমাকে আমার জন্য। কে কার উসিলা সেটা আমরা জানি না। তবে এটুকু বুঝি, রব যখন দুই অসহায় মানুষকে একই জায়গায় এনে দাঁড় করান, তখন তারা একে অপরের হাত ছেড়ে দেয় না। চলো বাবা। কোথাও আর একা একা ঘুরবে না। আমার সঙ্গে চলো। আমাদের ঘরে বিলাসিতা নেই, কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ, এক প্লেট ভাত চার ভাগ করে খাওয়ার মতো ঈমান এখনো আছে। রিজিকের মালিক আল্লাহ। আজ দুইজন খেলে, কাল চারজনও খেতে পারবো। যদি তিনি বরকত দেন।”
সিকান্দার মাথা নিচু করে ফেলল। কথাগুলো শুনে সিকান্দারের চোখ ভিজে উঠলো। পৃথিবীর সব বাবা সন্তান জন্ম দেয় না। কেউ কেউ আল্লাহর ইচ্ছায় সম্পর্কের বাইরেও বাবা হয়ে ওঠে। তার জন্মদাতা বাবা তার জীবনটা দূর্বিষহ করে তুলছে প্রতিনিয়ত। আর রক্তের কোনো সম্পর্ক নেই এমন একজন মানুষ তাকে বুকের ভেতর জায়গা দিতে চাইছেন। সে মাথা নিচু করে শুধু ফিসফিস করে বলল,

” হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি’মাল ওয়াকিল। আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন…”
শফিক সাহেব স্নেহভরে তার কাঁধে হাত রাখলেন।
“চলো বাবা তবে। ”
সিকান্দার আর আপত্তি করল না। নীরবে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
পাঁচ জন মানুষ ধীরে ধীরে স্টেশনের ভিড় পেরিয়ে এগিয়ে চলল। কারও হাতে ছিল না ধন-সম্পদ, ছিল না নিশ্চিন্ত ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। কিন্তু তাদের সবার হৃদয়ে ছিল একটি অটল বিশ্বাস। যে রব ঘর থেকে বের করেন, সেই রবই আবার আশ্রয়ের ব্যবস্থাও করে দেন।

সিকান্দার চলতি পথে এই শহরের আকাশের দিকে তাকালো শেষবার ৷ পরিচিত পরিবেশ, আপনজন, জন্মভূমি সবকিছুর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার এক কঠিন পরীক্ষা। তার খুবই কষ্ট হয় এই ঢাকা শহর কে ছেড়ে যেতে। ১২ বছর আগেও হয়েছে। আজও হচ্ছে। এই ঢাকাই যে ছিলো তার জন্মভূমি। খুব বেশি সময় থাকার সুযোগ হয় নি। তবে যতদিন থেকেছে সুখের চেয়ে বিতৃষ্ণা বেশি পেলেও অদ্ভুত এক মায়া ছিলো। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসের জন্য তাকে এই শহর অতিদ্রুত ত্যাগ করতে হবে। এই শহর যদি তাকে মাথা গোঁজার মতো সামান্য একটি আশ্রয় দিত, তবে হয়তো সে কখনোই ঢাকা ছেড়ে যেত না। কিন্তু আল্লাহর ফয়সালা ভিন্ন ছিল। তাই সর্বস্ব হারিয়েই তাকে বিদায় নিতে হলো নিজের প্রিয় জন্মশহর থেকে। সিকান্দারের তখন তার মনে পড়ে গেল রাসুলুল্লাহ ﷺ–এর হিজরতের কথা। এখানেই
তিনিও নিজের সবচেয়ে প্রিয় শহর মক্কা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন আল্লাহর হুকুমে। মক্কাতে তার সত্যের দাওয়াত মানুষের অহংকারে আঘাত করল, তখন কুরাইশরা তাঁর বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লাগল। তাঁকে অপমান করা হলো, উপহাস করা হলো, মিথ্যাবাদী, কবি, জাদুকর বলা হলো। তাঁর পথের উপর কাঁটা বিছানো হলো, গলায় উটের নাড়িভুঁড়ি চাপিয়ে দেওয়া হলো, সাহাবিদের উপর নেমে এলো অকথ্য নির্যাতন। এমনকি একসময় পরিস্থিতি এমন দাঁড়াল যে, তাঁকে হত্যা করার ষড়যন্ত্রও করা হলো।
অথচ তিনি তো কোনো অন্যায় করেননি। তিনি শুধু মানুষকে এক আল্লাহর দিকে ডাকছিলেন, অন্ধকার থেকে আলোয় আনতে চাইছিলেন। কিন্তু মক্কার জমিন, যে জমিনে তাঁর শেকড়, সেই জমিনই যেন তাঁর জন্য সংকীর্ণ করে দেওয়া হলো। শেষ পর্যন্ত আল্লাহর হুকুমে তাঁকে হিজরত করতে হলো, নিজের প্রিয় শহর, প্রিয় ঘর, পরিচিত জীবন সবকিছু পেছনে ফেলে।
হাদিসে এসেছে, মক্কা ত্যাগ করার সময় রাসুলুল্লাহ ﷺ মক্কার দিকে তাকিয়ে এমন মর্মস্পর্শী কথা বলেছিলেন যার অর্থ ছিলো,

“আল্লাহর কসম, তুমি আল্লাহর জমিনের মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়। যদি তোমার অধিবাসীরা আমাকে বের করে না দিত, তবে আমি কখনো তোমাকে ছেড়ে যেতাম না।
কিন্তু রাসুল ﷺ এর এই ঘটনার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য কি জানেন? আল্লাহ কখনো তাঁর প্রিয় বান্দার ত্যাগকে বৃথা যেতে দেন না। মক্কায় তিনি অপমানিত হয়েছেন, কিন্তু মদিনায় গিয়ে তিনি এমন এক মর্যাদা পেলেন যা দুনিয়ার ইতিহাসে বিরল। যে মানুষটিকে মক্কাবাসী তাড়িয়ে দিয়েছিল, মদিনাবাসী সেই মানুষটির আগমনের জন্য দিন গুনেছে, অধীর আগ্রহে পথ চেয়ে থেকেছে। তিনি মদিনায় পৌঁছালে মানুষ আনন্দে, ভালোবাসায়, সম্মানে তাঁকে বরণ করে নেয়। শিশুরা, নারী-পুরুষ, আনসার। সকলের হৃদয় যেন তাঁর আগমনে উন্মুক্ত হয়ে যায়।

মক্কায় তাঁকে বলা হয়েছিল, তুমি একা । আর মদিনায় আল্লাহ তাঁর জন্য গড়ে দিলেন একটি উম্মাহ।
মক্কায় তাঁর অনুসারীদের উপর অত্যাচার হয়েছিল। আর মদিনায় আল্লাহ তাঁদের দিলেন নিরাপদ আশ্রয়।
মক্কায় তাঁর কণ্ঠ রুদ্ধ করতে চেয়েছিল কুরাইশ। আর মদিনায় সেই কণ্ঠ থেকেই প্রতিষ্ঠিত হলো আযান, মসজিদ, রাষ্ট্র, আইন, ভ্রাতৃত্ব, সমাজব্যবস্থা।
মক্কায় তাঁকে অপমান করা হয়েছিল। আর মদিনায় তিনি হলেন সম্মানিত নেতা, বিচারক, শিক্ষক, সেনানায়ক, রাষ্ট্রপ্রধান এবং সর্বোপরি হৃদয়ের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ।
আল্লাহ যেন দুনিয়াকে দেখিয়ে দিলেন। যাকে মানুষ অপমান করে আল্লাহর জন্য, আল্লাহ চাইলে তাকেই মানুষের হৃদয়ের মুকুট বানিয়ে দেন।
যে আল্লাহর জন্য হারায়, সে আসলে কিছুই হারায় না,বরং আল্লাহ তার জন্য এমন দরজা খুলে দেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।

এখানে রাসুলুল্লাহ ﷺ পেলেন আনসারদের অকৃত্রিম ভালোবাসা, মুহাজিরদের ভ্রাতৃত্ব, ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার সুযোগ, মসজিদে নববীর ভিত্তি, এবং এমন এক মর্যাদা। যেখানে মানুষ শুধু তাঁকে নেতা হিসেবে নয়, নিজের প্রাণের চেয়েও প্রিয়জন হিসেবে ভালোবেসেছে। আল্লাহ তাঁর জন্য এমন মানুষ রেখেছিলেন, যারা নিজেদের ঘর, সম্পদ, স্বাচ্ছন্দ্য ভাগ করে নিতে প্রস্তুত ছিল। কুরআন আনসারদের এই গুণের প্রশংসা করেছে। তারা নিজেরা অভাবী হলেও মুহাজির ভাইদেরকে নিজেদের ওপর প্রাধান্য দিয়েছে।
স্থানান্তর মানে পতন নয়, বরং উত্তরণ। সিকান্দারের জীবনের সঙ্গে রাসুলুল্লাহ ﷺ–এর জীবনের একটি শিক্ষণীয় সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। অবশ্যই রাসুলুল্লাহ ﷺ–এর মর্যাদা, নবুওয়াত ও অবস্থান অতুলনীয়। পৃথিবীর কোনো মানুষের সঙ্গে তাঁর তুলনা হয় না। তবে আল্লাহ তাঁর নবীদের জীবনের ঘটনাগুলোকে আমাদের জন্য শিক্ষা হিসেবে রেখেছেন, যাতে মুমিনরা নিজেদের পরীক্ষার সময় সেখান থেকে ধৈর্য ও আশা গ্রহণ করতে পারে।
আমাদের রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজের জন্মভূমি মক্কা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। আর আজ সিকান্দারও নিজের প্রিয় শহর, পরিচিত পরিবেশ আর আপনজনের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অজানার পথে পা বাড়াচ্ছে। রাসুলুল্লাহ ﷺ–কে আল্লাহ মদিনায় উত্তম আশ্রয়, উত্তম মানুষ এবং ইসলামের বিজয়ের পথ দান করেছিলেন। সিকান্দারের জন্যও সেই একই আল্লাহ আছেন। যিনি তাঁর বান্দাকে কখনো নিরাশ করেন না।
কারণ ইসলাম আমাদের শেখায়, আল্লাহর জন্য যে হারায়, সে প্রকৃত অর্থে হারায় না। ধৈর্যের পরে যেমন স্বস্তি আসে, তেমনি প্রতিটি কঠিন পরীক্ষার পর আল্লাহ তাঁর বান্দার জন্য এমন কল্যাণ নির্ধারণ করেন, যা সে আগে কল্পনাও করতে পারে না।

সিকান্দার জানে না সামনে তার জন্য কী অপেক্ষা করছে। কিন্তু আজকের পর থেকে সিকান্দারের জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। আর সেটাও নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ থেকেই। সেখানে আল্লাহ তার জন্য এমন কিছু লিখে রেখেছেন, যা আজ তার কল্পনারও বাইরে। হয়তো সেখানেই আল্লাহ এমন কিছু মানুষের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ করিয়ে দেবেন, যাদের মাধ্যমে সে দ্বীনের, মানবতার ও কল্যাণের আরও বড় কাজ করার সুযোগ পাবে। আজ যে মানুষটি আশ্রয়হীন, কাল হয়তো সেই মানুষটিই বহু আশ্রয়হীনের আশ্রয়ের কারণ হবে। যদি আল্লাহ চান।

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ২৯

আমরা সিকান্দারের জীবনেও সেই শিক্ষারই একটি ক্ষুদ্র প্রতিফলন দেখতে চলেছি। আজ যে শহর তাকে আপন করে রাখতে পারল না, কাল হয়তো অন্য কোনো জনপদ তাকে বুকভরা ভালোবাসায় গ্রহণ করবে। কারণ মানুষের পরিকল্পনার চেয়ে আল্লাহর পরিকল্পনাই সর্বোত্তম। আল্লাহ যখন কাউকে একটি জায়গা থেকে সরিয়ে দেন, তখন শুধু একটি স্থান থেকে নয়,অনেক সময় একটি নিয়তি থেকে আরেকটি, আরও কল্যাণময় নিয়তির দিকে নিয়ে যান। আর সেই ফয়সালার সৌন্দর্য মানুষ বুঝতে পারে অনেক পরে। ইনশাআল্লাহ, সিকান্দারের জীবনেও সেই সৌন্দর্যের সূচনা হতে চলেছে।

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৩১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here