নেশাক্ত প্রহর পর্ব ১৪
রূপন্তী সরকার
ঋষভ কোনো কথা বললো না। রিদ মুচকি মুচকি হেসে চলে গেলো। ইয়াশফা আইসক্রিম খেতে খেতে ঋষভকে এসে বললো
“সত্যিই আপনি এনেছেন?”
ঋষভ আড়চোখে ইয়াশফার দিকে তাকিয়ে বললো “নো”
ইয়াশফা বেশি কিছু না বলে খাবার খেতে লাগলো। ঋষভের কল আসাতে ও না খেয়েই উপরে চলে গেলো।
মিহি রান্নাঘর থেকে চেচিয়ে ঋষভকে বললো
“রীশ খাবার না খেয়ে কেনো যাচ্ছো?”
ঋষভ মিহির দিকে তাকিয়ে বললো
“খাবার রুমে দিয়ে যাও”
মিহি ঋষভের খাবার ওর রুমে পাঠিয়ে দিলো।
আরাধ্যা মেয়েটা অনেকদিন আগেই চলে গেছে। চোখের সামনে ঋষভকে অন্য একটা মেয়ের সাথে মেনে নিতে পারছিলো না। মিহি যেতে বারন করেছিলো কিন্তু আরাধ্যা শোনে নি।
এইদিকে রিদ ইয়াশফাকে স্কুলে রাখতে গেছে।
মিহি কাপড় পরিস্কার করতে গিয়ে ওর চোখ গেলো ওয়াশিং মেশিনের নিচে একটা সাদা রঙের কাপরের দিকে। মিহি কৌতূহল বসত কাপর টা ওয়াশিং মেশিনের নিচ থেকে বের করে আনলো। বের করার পর ও যেটা দেখলো তাতে রীতিমতো ওর হাত পা কাঁপছে। শার্টটা ঋষভের। আর পুরো শার্টটা রক্তে ভেজা। মিহির চোখ অন্ধকার হয়ে আসছে। কাল রাতে এমনিতেই ঋষভ বাহিরে ছিলো না। তার উপর কালকে ও এই শার্টই পড়ে গেছিলো। তাহলে কি ঋষভের কোথাও কেটে গেলো? এসব অনেক রকম ভাবনা আসছে ওর মাথায়। নিজেকে কিছুতেই শান্ত করতে পারছে না। গলা শুখিয়ে আসছে ওর। ঋষভকে নিয়ে ওর অনেক ভয়। মিহি দৌড়ে গেলো ঋষভের ঘরে। গিয়ে দেখলো ঋষভ নেই। মিহি অবাক হলো সকালে যেভাবে খাবার গুলো দেওয়া হয়েছিলো সেভাবেই পড়ে আছে। মিহির রাগে দুঃখে কান্না পাচ্ছে। মিহি ঋষভকে কল দিলো। কলটা রিসিভ হলো না। পরপর কয়েকবার কল দেওয়ার ঋষভ কল রিসিভ করলো। মিহি ধারালো কন্ঠে বললো
“কই আছো তুমি?”
ঋষভ ঠান্ডা গলায় বললো “কাজে”
মিহি গম্ভীর ভাবে প্রশ্ন করলো “কি কাজে? এতো কিসের কাজ তোমার? সারারাত বাসায় থাকো না। সকালে না খেয়েই কাজে বেরিয়ে যাও। ভার্সিটিতেও তো ঠিকঠাক যাও না। তাহলে কি এমন কাজ করো তুমি?”
কথাগুলো ঝাঁঝালোভাবেই বললো। ঋষভ কোনো উত্তর দিলো না ও সব সনয় গা ছাড়া ভাব নিয়েই থাকে। এই জিনিসটা মিহির খুব বিরক্ত লাগে। মিহি আবারো প্রশ্ন করলো “কাল রাতে কই ছিলে? তুমি কি কোথাও আঘাত পেয়েছো?”
ঋষভ গম্ভীর গলায় বললো “নাহ”
মিহি আর কিছু বললো না টুস করে কল কেটে দিলো। ওর মাথা কাজ করছে না। এই ছেলেটার আবভাব ওর ভালো ঠেকছে না। মিহি অনেকদিন আগে থেকেই ঋষভের এই গা ছাড়া ভাব লক্ষ করছে। মানুষের এতো কাজ কিভাবে থাকে? ঋষভ রিদের কোম্পানিও ঠিকঠাক মত দেখেনা তাহলে কি কাজ করে? কই শুভ্র অদ্রীত মুগ্ধ এরা তো রাতে বাসায় চলে আসে। তাহলে ও কেনো বাহিরে থাকে? ঋষভকি কোনো মেয়ের চক্করে পড়েছে? কথাগুলো ভেবে মিহি নিজেই নিজেকে বকলো কিসব ভাবছে ও? মা হয়ে কখনো ছেলের বিষয়ে এসব ভাবতে আছে?
মিহি শার্টটা সুন্দর করে ধুয়ে দিলো।
এইদিকে….
জ্যোতিকে কালকে ছেলের বাড়ি থেকে দেখতে এসেছিলো৷ ওদের জ্যোতিকে অনেক পছন্দ হয়েছে। জ্যোতির বাবা মেয়েকে খুব তাড়াতাড়ি বিয়ে দিতে চায়। কারণ ওরা গরিব মানুষ তার উপর মেয়ে বড়ো হয়েছে। এখন বিয়ে না দিলে পরে বিয়ে দিতে সমস্যা হয়ে যাবে। জ্যোতির যেই ছেলের সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছে সেই ছেলে ইঞ্জিনিয়ার দেখতে কালো তবে চেহারা সুন্দর। জ্যোতি বিয়েতে রাজি না। ওর বাবা ওকে ১০০ বার জিগ্যেস করেছে ওর কোনো ছেলে পছন্দ কিনা। জ্যোতি প্রতিবারই “না” বলেছে। ও কি করে বলতো শুভ্রর কথা? শুভ্র তো ওকে বিয়েই করবে না। শুভ্রর আরো দুটো গার্লফ্রেন্ড আছে৷ শুভ্র তো ওকে নিয়ে সিরিয়াসও না যে বাবাকে জোড় গলায় বলবে ওর কথা। এসব দিক চিন্তা করে জ্যোতি চুপ করে আছে৷ সব কিছু আল্লাহর নামে ছেড়ে দিয়েছে। আল্লাহ যা করবে ভালোর জন্যই করবে। জ্যোতি শুভ্রকেও কোনো কথা জানায় নি। ও কোনো অশান্তি চায় না।
এইদিকে ইয়াশফা স্কুলে গিয়ে তানহাকে অনেক ঝাড়ি দিয়েছে। ওই বেয়াদবটার জন্য কালকে ওর শশুর শাশুড়ীর কাছে ঝাটার দৌড়ানি খাইছে। ইয়াশফা তানহাকে কড়া গলায় বলে দিয়েছে “শোন আমার শাশুড়ি আমাকে বলেছে আমার শশুরের দিকে কেউ নজর দিলে আমি যেনো তার চুলের ঝুটি ছিড়ে দেয়”
কথাটা শুনে তানহা একটা ঢক গিললো। কি সাংঘাতিক ব্যাপার। এমনিতেই ওর মাথায় চুল নেই একটা হ্যান্ডসাম বুড়োকে ভালোবেসে শেষমেশ কিনা চুল হারাবে? দরকার নেই বাবা ও সিঙ্গেলই ঠিক আছে। সিঙ্গেল লাইফ বেস্ট। তানহা ইয়াশফাকে বললো সে আর কোনোদিন তার শশুরের দিকে নজর দিবে না। কথাটা বলেই ইয়াশফার গালে টুপ কে একটা চুমু দিলো।
ক্লাস শেষে ওরা গিয়ে ক্যানটিনে বসলো এর মধ্যেই জায়ান এসে ইয়াশফার গা ঘেঁষে বসলো। ইয়াশফার রাগ লাগলো খুব। ওর বলতে ইচ্ছে করলো “ধুর জাওড়া আমার কাছে আসিস না আমার জামাই আছে”
কিন্তু মনের কথা মনে রেখেই দ্রত সরে গেলো জায়ানের থেকে। জায়ান ইয়াশফার দিকে একটা চকলেট এগিয়ে দিয়ে বললো “নাও প্যারট এটা তোমার”
ইয়াশফা নিলো না। ও বললো “পেট ব্যাথা করছে ভাইয়া খাবো না আপনি খান”
জায়ান মুচকি হেসে বললো “আরে খাও প্যারট একটু খেলে কিচ্ছু হয় না” এটা বলেই জায়ান ওর হাতে চকলেট দিলো
ইয়াশফা জোর করে হাসার চেষ্টা করে চকলেট টা নিলো। ওর হাত জায়ানের হাতের সাথে স্পর্শ করে আছে। হঠাৎ ওর চোখ গেলো দূরে দাড়িয়ে থাকা ঋষভের দিকে।
একটা কালো রংয়ের হুডি পড়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইয়াশফার প্রথমে বিশ্বাস হলো না ওইটা ঋষভ। কারণ এই সময় তো ওর আসার কথা না। কিন্তু ও ভালো ভাবে চোখ ডলে দেখলো ঋষভের মতোই একটা খাম্বা দাড়িয়ে আছে। বিদেশি ধলা বিলাইয়ের মতো গায়ের রং নীল নীল চোখ যেটা রোধের আলোই ঝলমল করছে এটা ঋষভ ছাড়া কেউ হতেই পারে না৷ ইয়াশফা ঋষভের কাছে গিয়ে দাড়ালো। মেয়েটা ঋষভের অনেক খাটো। ঋষভ মাথা নিচু করে ইয়াশফার দিকে তাকালো। ইয়াশফাকে পুরো বাচ্চা লাগছে। লম্বা লম্বা চুল গুলো বেনুনি করে ছেড়ে দেওয়া। যদিও বেশি লম্বা না চুল। কোমড়ের নিচ অব্দি। চোখের মণি গুলো কুচকুচে কালো আর বড়ো বড়ো কিছুটা টেডি পুলুতের মতো লাগে। ঋষভ ইয়াশফার দিকে রাগি চোখে তাকালো। ইয়াশফা ঋষভকে বললো “আপনি এইখানে কেনো এসেছেন?”
পেছন থেকে জায়ান এসে বললো
“প্যারট এটা তোমার ভাইয়া না?”
ইয়াশফা কিছু না থতমত খেয়ে গেলো। কিন্তু তারপরেও মাথা নাড়িয়ে বললো “হ্যাঁ”
ঋষভ কোনো দিকে না তাকিয়ে জায়ানের মেইন পয়েন্টের মাঝ বরাবর একটা লাথি দিলো। কিন্তু একটু ওর মনে হলো ও আসলে এতোক্ষণ খেয়াল দেখলো ও লাথিটা মারে নি। ঋষভ চোখ বন্ধ করে জোড়ে জোড়ে শ্বাস টেনে নিলো। দুমিনিট চোখ বন্ধ করে শ্বাস নেওয়ার ওর ইয়াশফার হাত শক্ত করে চেপে ধরে গাড়ির দিকে নিয়ে গেলো৷ ইয়াশফা ঋষভের থেকে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বললো “এই শুনুন এমন চাপাচাপি ঠাসাঠাসি করবেন না তাছাড়া আমি এখন যাবো না আপনার সাথে আমার ক্লাস আছে।”
নেশাক্ত প্রহর পর্ব ১৩
ঋষভ ওর পকেট থেকে কয়েকটা চকলেট পরপর ইয়াশফার মুখে ডুকিয়ে দিলো রীতিমতো ঠেসে দিলো। রাস্তার মধ্যে তো আর মুখ চেপে ধরা যায় না তার উপর এই মেয়ের যা হেড়ে গলা। ইয়াশফা কথা বলতে না পেরে উু উু করতে থাকে। ঋষভ আরো দুটো গোলগোল চকলেট ইয়াশফার মুখে ডুকিয়ে ওকে গাড়িতে তুললো।
