Home নোলকের নতুন শাড়ি নোলকের নতুন শাড়ি পর্ব ৯

নোলকের নতুন শাড়ি পর্ব ৯

নোলকের নতুন শাড়ি পর্ব ৯
ইলোরা ফারদিন

নোলক বারান্দায় বসে কাজ করছিল। হুট করেই দেখে কয়েকজন মিলে হাসানকে ধরে ধরে নিয়ে আসছে। হাসানের মাথায় ব্যান্ডেজ, হাতে প্লাস্টার। মুখে জায়গায় জায়গায় ছিলে গিয়েছে। পাও খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাটছে। পাটা মচকে গিয়েছে।
তখন নিয়ন্ত্রণহীন ট্রাকটা যেয়ে ধাক্কা মারে একটি সিএনজিকে আর সেই সিএনজিটার সাথে ধাক্কা লাগে হাসানের। সৃষ্টিকর্তা অবশ্য নিজের হাতেই হাসানকে বাচিয়েছেন। কারণ সিএনজির ভেতরে থাকা ওটার ড্রাইভার আর যাত্রীদের অবস্থা আশংকা জনক। হয়তোবা সৃষ্টিকর্তা হাসানকে দ্বিতীয় সুযোগ দিয়েছেন।
স্বামীকে এই অবস্থায় দেখে চমকে উঠলো নোলক। যতই রাগ অভিমান থাকুক। দিনশেষে এই লোকটার তার স্বামী,যার সাথে সাত বছরের সংসার তার, লোকটা তার সন্তানদের পিতা। কিভাবে মুখ ফিরিয়ে নিবে। সব ফেলে দৌড়ে গেল স্বামীর কাছে।

পাশাপাশি শুয়ে আছে নোলক আর হাসান। কারো মুখে কোনো রা নেই। দুজনেই চুপ। নিরবতা ভেঙে হাসানই বলে উঠলো,”নোলক আমাকে শেষ বারের মতো ক্ষমা করো।”
নোলক চোখ বন্ধ করেই বলল,” তুমি বড় বাজারের মালেক ভাইয়ের কাছেও লোন নিয়েছ না? শোধ করবে কি করে?
আমি আর ব্যবসা করব না ভেবেছি। এখন যেহেতু আমি ব্যবসা করব না, সংসার তোমাকেই চালাতে হবে। তো এখন তুমি ঋণের টাকা শোধ করবে নাকি সংসার চালাবে নাকি আমার টাকা ফেরত দিবে? বলো?”
হাসান একদম চুপ হয়ে গেল নোলকের কথায়। ভাষা নেই তার মুখে। হেরে যাওয়া লোক সে। একটা অপদার্থ।
“দুপুরে রতন ভাই ফোন দিয়েছিল। তুমি নাকি তাকে ফোন দিয়ে টাকা চেয়েছিলে। শুনলাম মানা করে দিয়েছে তোমার ভাই।

সে যাই হোক। তোমার ভাই ভালো বুদ্ধি দিয়েছে একটি। তোমাদের গ্রামের বাড়িতে নাকি এখনো বিশ শতকের মতো জমি আছে। ওগুলো যদি বিক্রি করো, তোমার ভাগে চার লাখের মতো আসবে। আবার তোমাদের গ্রামের বাড়ির ভিটে মাটিতেও তো ভাগ রয়েছে তোমাদের, যেহেতু ওটা তোমার বাবার নামে ছিল। তো রতন ভাই বলল সে জমি গুলো বিক্রি করে যে যার ভাগ বুঝে নিবে। তাহলেই সব সমাধান হবে। এখন তুমি জানো তুমি কি করবে।” বলে নোলক পাশ ফিরলো
হাসান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,” আমার ভাগ আমি দাবি করব নোলক। রতন আর ছোটকে কাল আসতে বলো। যদি মা রাজি না হয় তবে মামলা দিয়ে নিজের ভাগ আদায় করে নিব….

ফরিদা বানুর তিন ছেলে তার সামনে এসে দাড়িয়েছে জমির দলিল নিতে। যেহেতু জমিগুলো তার বাবার, সেখানে তাদের তিন ভাইয়েরই ভাগ বেশি। তাই তারা তাদের ভাগ বুঝে নিতে চায়। কিন্তু ফরিদা বানু তো জমির দলিল দিতে নারাজ।
এদিকে জমি ভাগাভাগির কথা শুনে বিনু আর বিনুর স্বামীও চলে এসেছে।
আর মিতু? সে বরাবরের মতোই নিরব দর্শক। মিতুর আজকাল তার মেঝভাবিকে একদমি সহ্য হয় না। রতন ভাইয়ার বিয়ের আগে সবাই একসাথে মিলেমিশে থাকতো। কত সুখী ছিল। এটাই বার বার মিতুর মনে হয়। স্বার্থপর মিতু কি আর নিজেকে ছাড়া অন্য কাউকে নিয়ে ভাবতে পারে?
” আম্মা দেখো, জমির দলিল দেও। আমরা যে যার ভাগ আমিন ডেকে বুঝিয়ে নিব এই সপ্তাহেই। তুমি যদি বারাবাড়ি করো, তাহলে কিন্তু পুলিশ ডাকব। অবশ্য পুলিশ ডাকার দরকার নেই। আমার পুলিশ শ্বশুর তো আছেই।” হাসতে হাসতে বলল রতন
ছেলের এরূপ হুমকিতে চমকে উঠলেন ফরিদা বানু। তার গর্ভের সন্তান তাকে পুলিশের হুমকি দিচ্ছে! অসহায় কন্ঠে বললেন,” আমি তোকে জন্ম দিয়েছি রতন। আর তুই আমাকে পুলিশের হুমকি দিস! আরে জাহান্নামেও তোর জায়গা হবে না। তুই ধ্বংস হবি। অভিশাপ দিচ্ছি তোকে।”

রতন তাচ্ছিল্য হেসে বলল,” আরে রাখো তো মা তোমার অভিসাপ। আর আমার জাহান্নামের কথা না ভেবে তোমার জাহান্নামে যাওয়ার কথা চিন্তা করো। যেই মা নিজের সব সন্তানকে এক চোখে দেখে না, সন্তানের হক মারে সে জান্নাতে যাবে বলে আমার মনে হয়।
মানলাম আমি কুলাঙ্গার সন্তান। কিন্তু হাসান ভাই? সে তো বাবার মৃত্যুর পর একা হাতে পুরো সংসারের দায়িত্ব নিয়েছিল। নিজের পড়াশুনা, নিজের স্বপ্ন সব ত্যাগ করে আমাদের জন্য ইনকাম করত যাতে আমরা সবাই রাতে পেট ভরে খেতে পারি। নিজের ভালোবাসার মানুষটাকেও তোমার কথায় ছেড়ে দিয়েছিল হাসান ভাই।
কি মনে করেছো, আমরা জানি না কিছু? পাশের গলির শাহিনা আপার সাথে বড় ভাইয়ের প্রেমের সম্পর্ক ছিল সেই ক্লাস এইট থেকে। তুমি সবি জানতে। কিন্তু তবু ভাই আর শাহিনা আপার বিয়ে হতে দাও নি। কারণ? কারণ শাহিনা আপা পড়াশুনা জানা মেয়ে। সে কখনোই নোলক ভাবির মতো তোমার এই অত্যাচার সহ্য করতো না। বা নোলক ভাবি যেভাবে আমাদের দাসীপনা করতো, শাহিনা আপা জীবনো করতো না। তোমার আরও ভয় ছিল যদি শাহিনা আপা হাসান ভাইয়ের সাথে আলাদা সংসার করে, তখন তোমার আর তোমার বাকি সন্তানদের খরচ কে দিবে। তাই তো ইচ্ছা করে তাদের আলাদা করেছিলে।

এরপর জমি বিক্রির টাকাতেও তুমি হাসান ভাইয়ের ভাগ মেরে দিয়েছিলে। তাহলে তুমিই বলল, তোমার মতো মা একজন সন্তানের জীবনে অভিসাপ কি না। তাই বেশি বড় বড় কথা বলিও না মা।”
রতনের কথা শেষ হতেই ফারিদা বানুর ছোট ছেলে বলে উঠলো, ” মা পরের মাস থেকে দোকান ভাড়া আমি তুলব। যেহেতু দোকানটা আমার।
” তোর মানে? ” অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল ফরিদা।
” আমার মানে আমার। দলিল আমার নামে করিয়েছি। কিভাবে ভাবলে আমার ভাগের টাকা আমি এতো সহজে ছেড়ে দিব। তোমার কাছে চাইলে দিতে না। তাই রতন ভাইয়ের সাথে বুদ্ধি করে দোকানটা আমার নামে নিয়েছি।”
সব শুনে ফরিদা বানু অবাক হলেন। বুঝলেন তার হাতে আর কিছুই নেই।

আমিন এসেছে। জমি জমার ভাগাভাগি চলছে। তবে হাসানের জায়গায় নোলক হাসানের হয়ে তদারকি করছে। কারণ জানে এরা হাসানকে ঠকাতে দুই বারো ভাববে না। প্রায় ছয় ঘন্টা মাপামাপির পর যে যার জায়গা বুঝে পেল। বিনু মিনুও নিজ নিজ জায়গা বুঝে নিল।
হাসানের ভাগের জমি বিক্রির আজ প্রায় দুই মাস হয়ে গেল। প্রায় সাত লাখের মতো টাকা পেয়েছে সে। ওগুলো দিয়ে নিজের ঋণ প্রথমে শোধ করেছে। আর বাকি টাকা ব্যংকে রেখেছে। এদিকে নোলক তার ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
পরের মাসেই হাসান বদলি নিয়ে অন্য জেলায় চলে যাবে। এই এক মাসে তার আর তার মা বা মিনু বিনুর সাথে যোগাযোগ হয় নি। তারা ফোন দিলেও হাসান ধরে নি। রতন আর তার ছোট ভাইও আর যোগাযোগ করার চেষ্টা করে নি। যে যার মতোই আছে।

ফরিদা বানু নিজের তেজ নিয়েই আছেন, যেন সে জানেন হাসান আবার ফিরে আসবে। কিন্তু সে মোটেও হাসানকে আর এই বাসায় থাকতে দিবে না।
আর মিতু? তার হাত খালি। কিভাবে থাকবে? হাসান নামক এটিএম মেশিনটা তো আর নেই যে কিনা চাওয়া মাত্রই মিতুর হাতে টাকা দিয়ে দিত।
মিতু এখন অনার্স তৃতীয় বর্ষে আছে। কিন্তু তার হাত খরচের জন্য বা বই কিনার জন্য এক টাকাও দেয় না তার মা।বাধ্য হয়ে আজ পনেরো দিন হলো মিতু একটি জুতার দোকানে সেলস গার্ল হিসেবে চাকরি নিয়েছে। ধীরে ধীরে সেও বাস্তবতা বুঝতে শিখছে। হাসান যে তাদের উপর একটি বটগাছের মতো ছিল, নোলক যে তার মায়ের মতো ছিল মিতু এই চাকরিতে আসার পর টের পাচ্ছে। চাকরি জিনিসটা কত কঠিন।

দোকানে মিতু কাস্টমারকে জুতা দেখাচ্ছিলই, হুট করে তার চোখ গেল দোকানের কাচের দরজাটার দিকে। দুজন ছেলে মেয়ে হাসি মুখে ঢুকছে। ছেলেটা মেয়েটার হাত শক্ত করে ধরে আছে। বোঝাই যাচ্ছে স্বামী স্ত্রী তারা। মেয়েটার গায়ে হালকা নীল রঙের শাড়ি। মিনু জানে এই হালকা নীল রঙ ছেলেটির কত্ত প্রিয়। জানবেই বা না কেনো! এই ছেলের সাথেই তো সেই কত বছরের সম্পর্ক ছিল তার। বিয়ে হওয়ার কথা ছিল তাদের। আজ এই মেয়ের জায়গায় তো তার হওয়ার কথা ছিল। ছেলেটির হাতে তার হাত থাকার কথা ছিল। কিন্তু হলো না তো।

নোলকের নতুন শাড়ি পর্ব ৮

মিনু নিজের চোখের পানি আটকে কোনো মতে মুখ লুকিয়ে লেডিস ওয়াশরূমে চলে গেল। প্রাক্তনের মুখোমুখি হওয়ার ইচ্ছে যে তার নেই। ওয়াশরূমে যেয়েই কান্নায় ভেঙে পরলো মিনু। মিনু যতই খারাপ বা স্বার্থপর হোক না কেনো, তার ভালোবাসাটা তো মিথ্যে ছিল না। কই মিনু তো এখনো তাকে ভুলতে পারলো না। কিন্তু সে দিব্যি নিজের জীবনে এগিয়ে গেল। বিয়েটাও করে ফেলল।

নোলকের নতুন শাড়ি পর্ব ১০