প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ১৫
আরাফাত আদনান সামি
দুপুরের অবসান ঘটিয়ে ধীরে ধীরে বিকেলের রোদ ম্লান হয়ে এসেছিল। সেই বিকেলও এখন অতীব চারদিক জুড়ে নেমে এসেছে রাত্রির গম্ভীর আবহ। সময় তখন প্রায় রাত এগারোটা। দীর্ঘ দিনের ক্লান্তি বুকে নিয়ে কৌশিক অবশেষে ফিরে এল বাড়িতে। বিকেলের দিকে বাবার সঙ্গে যে উদ্দেশ্যে বেরিয়েছিল, তারই সমাপ্তি ঘটেছে এখন। তাদের সঙ্গে ছিল রোহিতও। তিনজনেরই মুখে অবসাদের স্পষ্ট ছাপ।
চোখদুটো লালচে, চুল এলোমেলো, শরীরে পরিশ্রমের ভার যেন চেপে বসেছে। বাড়ির প্রধান ফটক পেরিয়ে ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করতেই সবার আগে যে আওয়াজটি কানে এলো, তা আশরাফ চৌধুরীর। তিনি যেন দিনের ক্লান্তিকে উপেক্ষা করেই উৎসাহভরে চিৎকার করে উঠলেন,
“মাহিমা! মাহিমা, সবাই কোথায়? নিচে এসো, তাড়াতাড়ি!”
আশরাফ চৌধুরীর উচ্চস্বরে চেঁচামিচিতে সবাই রুম থেকে ছুটে এসে হলরুমে জড়ো হলো।
মাহিমা চৌধুরী একটু বিস্মিত কণ্ঠে বললেন,
“কী হয়েছে টা কী? আপনি এইভাবে চেঁচাচ্ছেন কেন?”
আশরাফ চৌধুরী উত্তেজিত স্বরে বললেন,
“সাধে কী আর চেঁচাচ্ছি?”
“তাহলে?”
তিনি গর্বভরে উত্তর দিলেন,
“আমাদের ছেলে আর অকর্মণ্য নেই! কাল থেকেই সে আমার পরিবর্তে আমাদের কোম্পানিতে যোগ দিতে চলেছে।”
কথাটা শুনে মুহূর্তের জন্য চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ঠিক তখন পাশ থেকে কৌশিক ভ্রু কুঁচকে হালকা স্বরে বলল,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“বাবা…”
সবার চোখ একসাথে তার দিকে ঘুরে গেল। মুহূর্তেই আনন্দ ও বিস্ময়ের মিশ্র প্রতিক্রিয়ায় ঘর ভরে উঠল।খুশির সংবাদটি শুনে মাহিমা চৌধুরী আর নিজেকে আর সামলাতে পারলেন না। চোখ বেয়ে দু’ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।তিনি দ্রুত কৌশিকের কাছে এসে জড়িয়ে ধরলেন। মমতায় ভরা হাতে কৌশিকের গাল ছুঁয়ে মুখটা নিচু করে তার কপালে চুমু খেলেন।
শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের পানি মুছে নরম স্বরে বললেন,
“আমাদের ছেলেটা আজ সত্যিই অনেক বড় হয়ে গেছে, তাই না কৌশিকের আব্বু?”
আশরাফ চৌধুরী মুখে গর্বের হাসি এনে বললেন,
“হ্যাঁ কৌশিকের মা, আজ আমাদের ছেলে সত্যিই অনেক বড় হয়ে গেছে।”
কথাটা বলে কৌশিক কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। থেমে থাকা নিঃশব্দ মুহূর্তটাকে ভাঙতে পরমুহূর্তেই আশরাফ চৌধুরী হাসিমুখে বলে উঠলেন,
“এত খুশির একটা খবর, আর মিষ্টি মুখ হবে না? তা কী করে হয়! রোহিত, মিষ্টির বাক্স খুলে সবাইকে মিষ্টি মুখ করাও।”
রোহিত তৎক্ষণাৎ দু’হাতে দু’টো মিষ্টির বাক্স নিয়ে সবার সামনে এগিয়ে এল। মুখভরা হাসি নিয়ে বলল,
“হ্যাঁ বড় আব্বু, আপনি বলার আগেই আমি সব রেডি করে রেখেছি।”
বলেই একে একে সবার হাতে মিষ্টি তুলে দিতে লাগল রোহিত। মাহিমা চৌধুরী ও আশরাফ চৌধুরী আনন্দে দু’জনে মিলে কৌশিকের মুখে মিষ্টি তুলে দিলেন। কৌশিকও তাঁদের দু’জনকে মিষ্টি খাইয়ে দিল, যেন পারিবারিক ভালোবাসার বন্ধন আরও দৃঢ় হয়ে উঠল সেই মুহূর্তে। এরপর একে একে সবাই কৌশিককে মিষ্টি খাইয়ে নতুন পথচলার শুভেচ্ছা জানাতে লাগল। চৌধুরী বাড়ির চারদিকে এক উচ্ছ্বসিত আনন্দের আবহ ছড়িয়ে পড়ল।
অবশেষে কৌশিক হালকা হেসে বলল,
“তোমরা গল্প করো, আমি একটু উপরে যাচ্ছি।”
বলেই কৌশিক আর একবারও পেছনে তাকাল না। সোজা নিজের ঘরের দিকে হেঁটে গেল। ঘরে ঢুকেই দরজাটা ভেতর থেকে হালকা ধাক্কা দিয়ে দিল। তারপর টেবিলের ওপর রাখা ফোনটা হাতে তুলে নিলো। মুহূর্তেই মায়াকে কল করল।
একবার, দুইবার রিং বাজতেই ওপাশ থেকে কল রিসিভ হলো। সঙ্গে সঙ্গেই কৌশিক বলল,
“মায়া, শোন।”
ওপাশে তখন মায়া প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছিল। চোখে মুখে ঘুমের ছায়া, কণ্ঠে অলসতার ছোঁয়া। তবুও কণ্ঠে মৃদু ক্লান্তি নিয়ে জবাব দিল,
“হ্যাঁ, বলুন কী হয়েছে?”
কৌশিকের কণ্ঠে উত্তেজনা ভর করেছে। সে প্রায় চিৎকার করেই বলল,
“হয়ে গেছে!”
মায়া অর্ধেক ঘুমন্ত অবস্থায় অবাক হয়ে বলল,
“কী হয়েছে?বাচ্চা! কার বাচ্চা হয়েছে?”
কৌশিক বিরক্ত গলায় বলল,
“ধ্যাৎ!”
“বলেন না কার বাচ্চা হয়েছে কৌশিক ভাই?”
“হয়নি এখনো, তবে এবার হবে,সবই হবে! বাসর হবে, বাচ্চা হবে,আমাদের একটা সুখের সংসার হবে আর আমার সুইটহার্ট সেই সংসারের মহারানী হবে।”
কৌশিকের এমন উচ্ছ্বাসে মায়ার ঘুম মুহূর্তেই উড়ে গেল। চোখ কুঁচকে, ভ্রু কুঁচকে বলল,
“এইসব উল্টো-পাল্টা কথা বাদ দিন তো! কী বলতে চান, সোজাসুজি বলুন না। আমি ঘুমাবো তো…।”
“তোর ঘুমের গুষ্টি মারি! আজ থেকে তোর রাতের ঘুম উড় বলে, জান!”
“এখন ঘুমান, সকালে মাথাটা ঠান্ডা হলে কথা বলবেন। ফোন রাখছি।”
“এই, ফোন রাখবি না! রাখলে কানের নিচে কষিয়ে দেব একটা! আগে পুরো কথাটা তো শোন!”
মায়া বিরক্ত হলেও একটু হেসে বলল,
“তাহলে বলেন, কী এমন বড় কথা?যার জন্য সেই কখন থেকে আজেবাজে বকে যাচ্ছেন!”
কৌশিক গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
“কালকে আমি আমাদের কোম্পানিতে জয়েন হতে যাচ্ছি।”
কথাটা শুনে মায়া যেন এক মুহূর্তের জন্য নির্বাক হয়ে গেল। বিস্ময়ের সঙ্গে আনন্দে চোখ ভিজে উঠল তার। পরক্ষণেই মুখে হাসি ফুটে উঠল। উজ্জ্বল, দীপ্ত, পরিপূর্ণ সুখের হাসি।
“সত্যি বলছেন, কৌশিক ভাই?”
“হ্যাঁ, একদম সত্যি। এবার তুইও রেডি হয়ে যা, মিস মায়া পাটোয়ারী থেকে মিসেস মায়া নীর চৌধুরী হওয়ার জন্য।”
মায়ার মুখে হালকা লজ্জার আভা ফুটে উঠল। সে মাথা নিচু করে মুচকি হেসে ফেলল।কৌশিক মায়ার নীরবতা টের পেয়ে নরম গলায় বলল,
“কী হলো, কিছু বলছিস না যে?”
মায়া লজ্জায় কোনো কথা বলতে পারছিল না। কী বলবে, তাও যেন বুঝে উঠতে পারছিল না। এক অদ্ভুত আবেশে কলটা কেটে দিয়ে চোখ বন্ধ করে ফোনটা নিজের বুকের সঙ্গে শক্ত করে চেপে ধরল। ওদিকে কৌশিকও মায়ার কল কেটে দেওয়াটা কারণটা টের পেয়েছিল। ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি ফুটে উঠল তার। তাই দ্বিতীয়বার আর ফোন দিল না।
ঠিক তখনই হালকা গলায় কেশে রুমে দরজা ঠেলে প্রবেশ করলেন মাহিমা চৌধুরী। কৌশিকের সামনে এসে দাঁড়ালেন তিনি। কৌশিক কিছু বলার আগেই, মুহূর্তে তাঁর মা কৌশিকের কান মুলে ধরে বললেন,
“পানিতে নামার সঙ্গে সঙ্গেই মাছ ধরার ধান্দা, তাই না?”
“আ’আ’আ’… আম্মু, কী করছো! লাগছে তো!”
মাহিমা চৌধুরী কান ছেড়ে দিলেন। কৌশিক হাত বুলিয়ে কানের ব্যথা কমানোর চেষ্টা করল।
“মেয়েটা কে রে, কৌশিক?”
“কোন মেয়ে, আম্মু? এখানে তো কোনো মেয়ে-টেয়ে নেই!”
মাহিমা ভ্রু কুঁচকে তাকালেন ছেলের দিকে।
“এখনই মায়ের কাছ থেকে কথা আড়াল করছিস? একদম ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা বলবি না! যার সঙ্গে এতক্ষণ কথা বলছিলি, সেই মেয়েটা কে?”
“ক-কী বলছো এসব! আমি কেন মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে যাবো? হয়তো তুমি ভুল কিছু শনেছো। আমি তো আমার আম্মুে ভদ্র একটা ছেলে আমি কী এমন করতে পারি।”
“হইছে, হইছে! আর অভিনয় করতে হবে না। আমি সব শুনেছি। তাই যা বলছি, সব খুলে বল।”
“না মানে… আম্মু…”
“মায়াকে ভালোবাসিস! অথচ নিজের মায়ের কাছেই এটা স্বীকার করতে পারছিস না? না না, এটা তো মানা যায় না! আমি তো জানতাম আমার ছেলে লাখে একটা, যার মনে কোন ভয় নেই, শুধু বুকভরা সাহস। অথচ তুই আজ আমার সেই ধারণাটাই ভুল প্রমাণ করলি!”
মায়ের মুখে এমন কথা শুনে কৌশিক হাঁ হয়ে গেল। কিছু বলার আগেই আবার মাহিমা চৌধুরী বললেন,
“কী হলো, চুপ করে আছিস কেন?”
এই বলেই মাহিমা চৌধুরী একটু থামল।যেই আবার কিছু বলতে যাবে এমনি তার আগেই কৌশিক হঠাৎ তার মাকে জড়িয়ে ধরল। জরিয়ে ধরে কৌশিক বলল,
“ওহ্ মা! তুমি তো একদম আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে!”
“হইছে হইছে, আর এত আদিখ্যেতা দেখাতে হবে না।”
“আম্মু, তুমিও না…”
মাহিমা চৌধুরী মুচকি হেসে বললেন,
“তা বল দেখি, কবে আমরা যাব মায়ার বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে?”
মায়ের মুখ থেকে এমন কথা শুনে কৌশিকের মুখ লজ্জায় লাল হয়ে গেল। মাথা নিচু করে আস্তে বলল,
“ওর তো কয়েক মাস পর ফাইনাল পরীক্ষা, আম্মু। পরীক্ষার পরেই না নায়….”
“কেন? মায়া বিয়ের পর পরীক্ষা দিতে পারবে না নাকি?”
“না মানে… আম্মু…”
“না না, কয়েক মাস টয়েকমান বাদ! কালকে বাদে পরশু শুক্রবারেই। আমি তোমার ফুপা-ফুপিকে বলছি কালকে যেন আমাদের বাড়িতে চলে আসে। তারপর সবাই একসাথে বসে সব কথা সেরে ফেলব।”
কৌশিকের মুখে এখন একরাশ লজ্জা। মাথা নিচু করে কাঁপা গলায় বলল,
“ঠিক আছে, আম্মু। তোমার যা ইচ্ছা। কিন্তু আব্বু?”
মাহিমা চৌধুরী হেসে বললেন,
“ও নিয়ে চিন্তা করতে হবে না তোমাকো। আমি তেমার আব্বুর সঙ্গে কথা বলে নিচ্ছি। আচ্ছা আমি যাচ্ছি।”
এই বলে কৌশিকের কাঁধে হাত রেখে দরজার দিকে এগোলেন তিনি। ঠিক তখনই কৌশিক মাকে আবার জড়িয়ে ধরে বলল,
“ইউ আর দা বেস্ট মাদার ইন দা ওয়ার্ল্ড।”
“হইছে, হইছে….!”
বলেই বেরিয়ে গেলেন মাহিমা চৌধুরী।বেরোতেই কৌশিক দরজাটা হালকা করে বন্ধ করে দিল। কী থেকে কী হয়ে গেল কিছুই বুঝতে পারছে না কৌশিক। এগুলো কথা ভাবতে ভাবতে বিয়ের কথা মাথায় আসতে না আসতেই খুশিতে আত্মহারা হয়ে নাচতে শুরু করে দিল! একবার দু’বার নয় পুরো মন দিয়ে নাচছে সে!
ঠিক তখনই দরজা ঠেলে ঢুকে পড়ল রোহিত। ভাইয়ের নাচ দেখে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“বাহ্ বাহ্ ভাইয়া! দেখছি ভালোই ডান্সার!”
পেছন থেকে কৌশিকের কানে কথা যেতেই থেমে ঘুরে তাকাল। রোহিতকে দেখে মুখ চুপসে গেল।
“দিলি তো আমার মুডের পুরো বারোটা বাজিয়ে!”
রোহিত মুচকি হেসে বলল,
“না না, ভাইয়া! নাচো তুমি, আমি দেখছি। দাড়াও, বক্সে লুঙ্গি ডান্স গানটা চালাই, তারপর নাচো!”
“আমাকে নিয়ে মজা করছিস?তোকেতো….”
“এই না না! এত সাহস আছে নাকি আমার!”
“তাহলে বল, এত রাতে এখানে কেন এসেছিস?”
“না, পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। দরজার ফাঁক দিয়ে তোমার নাচটা চোখে পড়ল তাই আরকি…।”
“এই মুহূর্তেই তোর আমার রুমের পাশ দিয়ে যাওয়া লাগল?”
“তা ভাইয়া, কোন খুশিতে এমন নাচা নাচি করছো শুনি?”
“সিক্রেট। বলা যাবে না।”
“আরে ভাইয়া, বলো না!”
রোহিতকে দরজার দিকে ঠেলতে ঠেলতে কৌশিক বলল,
প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ১৪
“কাল বলব বুঝবি। এখন যা।”
বলেই দরজা বন্ধ করে দিল কৌশিক। রোহিত হতভম্ব হয়ে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে রইল, আর ভেতরে কৌশিক আবার নিজের ছন্দে ফিরল।
আরও কিছুক্ষণ প্রাণ ভরে নাচার পর ক্লান্ত শরীরটা এক ধাপে বিছানায় ছুড়ে দিয়ে দু’হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল চোখে মুখে তৃপ্তির হাসি।
