প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ২৮
আরাফাত আদনান সামি
“কী সুইটহার্ট সুইটহার্ট করছেন? নিচে নামান আমায়! আপনার কষ্ট হচ্ছে তো! আমি হেঁটে যেতে পারব।”
মায়ার গলায় একরাশ সংকোচ থাকলেও কৌশিকের বলিষ্ঠ হাতের বাঁধন আলগা হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। সে সাবলীল ছন্দে মায়াকে পাঁজাকোলা করে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে উঠতে নির্লিপ্ত গলায় বলল,
“কই? আমার তো বিন্দুমাত্র কষ্ট হচ্ছে না! বরং তোকে এভাবে সবার সামনে কোলে তুলে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে আমার বেশ ভালোই লাগছে।”
মায়া এবার একটু অভিমানী সুরে ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
“আপনি না আমার একটা কথাও শোনেন না। সবসময় নিজের জেদ বজায় রাখেন।”
“কে বলল শুনি না? এই তো তোর সব কথা মন দিয়ে শুনছি।”
“কচু শোনেন!” মায়া মুখ ঘুরিয়ে বিড়বিড় করে উত্তর দিল।
কৌশিক এবার হালকা ভ্রু কুঁচকে মায়ার চোখের দিকে তাকিয়ে ধমকের সুরে বলল,
“এত কথা বলিস না তো! চুপচাপ থাক।”
কৌশিকের সেই শাসনভরা কথা শুনে মায়া আর কথা বাড়ানোর সাহস পেল না। সে নাক-মুখ কুঁচকে গাল ফুলিয়ে এক হাত দিয়ে কৌশিকের গলাটা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। কৌশিক এক বুক তৃপ্তি নিয়ে, নিজের মায়াবতীকে বুকের খুব কাছে আগলে রেখে আপন মনে ধীর লয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল। মিনিট খানেক পর তারা পঞ্চম তলায় পৌঁছাল। কৌশিক অত্যন্ত সতর্কতার সাথে মায়াকে কোল থেকে নামিয়ে দিল। মাটিতে পা রাখামাত্রই মায়া নিজের কুঁচকে যাওয়া জামাটা টেনেটুনে ঠিক করে নিল এবং ওড়নাটা মাথার চারপাশে ভালো করে পেঁচিয়ে নিল। মায়া যখন একটু ধাতস্থ হয়ে কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই কৌশিক গম্ভীর গলায় বলে উঠল,
“হয়েছে তোর গোছগাছ? এবার চল আমার সাথে।”
কৌশিকের এমন হুকুমের সুরে মায়া মনে মনে একটু বিরক্ত হলো। সে ভ্রু কুঁচকে অনুচ্চ স্বরে বিড়বিড় করল,
“আপনার সাথেই তো যাচ্ছি, কোথাও উড়ে তো আর যাচ্ছি না!”
কৌশিক হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পেছন ফিরে তাকাল,
“কিছু বললি?”
মায়া অপ্রস্তুত হয়ে তড়িঘড়ি করে উত্তর দিল,
“কই, না তো! কিছু না।”
কৌশিক আর কোনো কথা বাড়াল না। তারা দুজনে এসে দাঁড়াল বিশাল এক রাজকীয় কক্ষের সামনে। রুমের চারপাশ হরেক রকমের তাজা ফুলের সুবাস আর বর্ণিল সাজসজ্জায় আমোদিত। মায়া কিছুটা দ্বিধা নিয়ে রুমের দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজাটা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করতেই তার হৃদপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে বিস্ময়ে বিমূড় হয়ে একবার কৌশিকের দিকে তাকাল। আশ্চর্য! কৌশিকের কপালে কোনো চিন্তার ভাঁজ নেই, বরং সে বেশ নিশ্চিন্ত। মায়ার মনে হলো সে কোনো দিবাস্বপ্ন দেখছে না তো? ঘোর কাটাতে সে নিজের এক হাতে জোরে একটা চিমটি কাটল। ব্যথায় মৃদু আর্তনাদ করে উঠল সে। না, এটা কোনো স্বপ্ন নয়; বাস্তব। তার সামনে এই মুহূর্তে উপস্থিত পুরো পরিবার! তার বড় মামা-মামি আশরাফ চৌধুরী, মাহিমা চৌধুরী, ছোট মামা-মামি আসিফ চৌধুরী, সায়েরা চৌধুরী, রোহিত, তিয়াশা, নিধি এমনকি তার নিজের আব্বু-আম্মুও সেখানে সোফায় বসে আছেন।
মায়া আমতা আমতা করে অস্ফুট স্বরে বলল, “আ-আব্বু, আম্মু! তো-তোমরা এখানে? মানে কীভাবে?”
অমিতাভ পাটোয়ারী গম্ভীর মুখে স্ত্রী রুবিনা পাটোয়ারীর দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন,
“দেখলে রুবিনা? যুগটা এখন কোথায় গিয়ে ঠেকেছে! আগে বাবা-মারা নিজের মেয়ের বিয়ে দিত ধুমধাম করে আর এখন নিজের মেয়ের বিয়েতে পর্যন্ত দাওয়াত পাওয়া যায় না। ধুমধাম আর বাবা-মায়ের সম্মতি নেওয়া তো দূরে থাক।”
রুবিনা পাটোয়ারীও সমানে কথা যোগ করলেন,
“হ্যাঁ, তা তো নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছি। কারো কাছে আমাদের অস্তিত্ব কি এতটাই মূল্যহীন হয়ে গেল?”
মা-বাবার এই শাণিত বাক্যবাণে মায়া পুরোপুরি দিশাহারা হয়ে পড়ল। তার মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। সে জানে আজ সে কোনো সাফাই গাওয়ার অবস্থায় নেই। অপরাধবোধে এক তীব্র জ্বালা তার বুক চিরে বেরিয়ে আসতে চাইল। মায়ার চোখের কোণে নোনা জল জমে উঠল, আর পরক্ষণেই তা গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল। সে আবারও এক বুক আশা নিয়ে কৌশিকের দিকে তাকাল, ভেবেছিল কৌশিক হয়তো পরিস্থিতি সামাল দেবে। কিন্তু সে মায়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে ধীরপায়ে সবার সামনে এগিয়ে গিয়ে বড়দের একে একে সালাম করতে লাগল। মায়া তখনো সেই দরজার চৌকাঠে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার দুচোখ বেয়ে ঝরছে অবাধ্য অশ্রু। মায়ার কান্নার নোনা স্বাদ যখন তার ঠোঁটের কোণে এসে ঠেকল, ঠিক তখনই নিস্তব্ধতা ভেঙে অমিতাভ পাটোয়ারী সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তিনি ধীর পায়ে মায়ার সামনে এসে দাঁড়ালেন। মায়া মাথা নিচু করে ফুঁপিয়ে কাঁদছে, বাবার চোখের দিকে তাকানোর সাহসটুকুও আজ তার নেই। অমিতাভ পাটোয়ারী মায়ার থুতনি ধরে মুখটা উঁচিয়ে ধরলেন। মায়া দেখল, তার বাবার চোখে রাগ নেই, হিংস্রতা নেই। তিনি পকেট থেকে রুমাল বের করে মেয়ের চোখের জল মুছে দিয়ে মৃদু হাসলেন। বললেন,
“কাঁদছিস কেন পাগলী? আমাদের কি এতটাই পর ভাবিস যে মনে করলি তোর জীবনের এত বড় একটা সিদ্ধান্ত আমরা মেনে নেব না?”
বাবার মুখে এমন কথা শুনে মায়ার কান্না যেন এক নিমেষে থমকে গেল। সে অবিশ্বাসে বড় বড় চোখ করে একবার বাবার দিকে, আর একবার সোফায় বসে থাকা আম্মুর আর বাকিদের দিকে তাকাল। রুবিনা পাটোয়ারীও এবার উঠে এসে মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন। তার চোখ বেয়ে তখনও জল পড়ছে।
“কাঁদছিস কেন পাগলী? কাঁদতে হবে না, না তোর কাছে আমরা কোনো কিছুর সাফাই চাই। কৌশিক আমাদের সব জানিয়েছে মায়া। ও তোকে কতটা আগলে রাখে, তোর সম্মানের জন্য ও কতটা মরিয়া, সেটা আজ আমরা নিজের চোখে দেখলাম। ও-ই আমাদের এখানে আসতে বলেছে।”
মায়া এবার পেছন ফিরে কৌশিকের দিকে তাকাল। কৌশিক তখন তার আব্বু-আম্মুর সাথে কথা বলছে। কথা বলা শেষ করে মায়ার দিকে তাকিয়ে সেই চিরাচরিত বাঁকা হাসিটা দিল। ইশারায় বুঝিয়ে দিল,
“বলেছিলাম না সুইটহার্ট, সব সামলে নেব?”
কৌশিক এগিয়ে এসে মায়ার পাশে দাঁড়াল। অমিতাভ পাটোয়ারীর দিকে তাকিয়ে বিনয়ের সাথে বলল,
“আমি জানি আমি অনেক বড় ধৃষ্টতা দেখিয়েছি। আপনাদের না জানিয়ে মায়াকে এভাবে নিয়ে আসা হয়তো ঠিক হয়নি। কিন্তু পরিস্থিতি এমন ছিল, আমি ওকে হারানোর ভয় পাই। আমি চাই না আমি জীবিত থাকতে মায়ার গায়ে কোনো আঁচ লাগুক।”
অমিতাভ পাটোয়ারী কৌশিকের কাঁধে হাত রাখলেন। বললেন,
“আমি জানি কৌশিক। তুমি যা করেছ, তা এই বংশের কোনো ছেলে আগে কখনো করার সাহস দেখায়নি। তুমি শুধু ওকে ভালোই বাসো না, ওকে সম্মান দিতেও জানো। আর একজন বাবার কাছে এর চেয়ে বড় পাওনা আর কিছু হতে পারে না।”
অন্যদিকে তিয়াশা এক কোণে সবার আড়ালে চোখে জল ফেলছে। এবার যে আর তার কিছুই করার নেই? তার কৌশিক এখন অন্য কারো হতে চলেছে। রোহিত তখন পেছন থেকে মায়াকে টিপ্পনি কাটল,
“কীরে মায়া? এবার কি কান্না থামাবি? নাকি বাসর ঘরেও এমন গঙ্গা-যমুনা বইয়ে দিবি?”
কান্নার মাঝেই রোহিতের কথায় মায়া বেশ লজ্জা পেল। রোহিতের দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বলল, “ভাইয়া তুমিও না!”
পুরো রুম জুড়ে হাসির রোল পড়ে গেল। মায়া সবার সামনেই লজ্জায় এবার কৌশিকের বাহুর আড়ালে মুখ লুকাল। কৌশিক নিচু স্বরে মায়ার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
“কী মায়াবতী? এখনো কি আমি সেই ‘অসভ্য’ আর ‘নির্লজ্জ’ লোকটাই আছি? নাকি প্রমোশন হয়েছে?”
মায়া কৌশিকের পেটে আলতো করে একটা চিমটি কেটে ধরা গলায় বলল,
“কোনো প্রমোশন-টমোশন নয়, অসভ্য ছিলেন, আছেন আর সারাজীবন থাকবেন। তা এত কিছু কীভাবে সামলালেন শুনি?”
“সেটা নাহয় বাসর রাতেই বলব।”
আশরাফ চৌধুরী এবার গম্ভীর গলায় বললেন,
“অনেক হয়েছে ইয়ার্কি-ফাজলামো। কাজি সাহেব চলে এসেছেন। শুভ কাজে আর দেরি করে লাভ নেই। কৌশিক আর মায়া, তোরা গিয়ে রেডি হয়ে আয়।”
আশরাফ চৌধুরীর কথা মতো দুজনেই রেডি হতে চলে গেল। প্রায় ৩৫ মিনিট পর মায়া রেডি হয়ে নিধির সাথে বের হয়ে আসল। কৌশিক রুমে গিয়ে খালি কোনো রকম সাদা পাঞ্জাবিটা পরে সেই অনেক আগেই চলে এসেছিল। মায়াকে লাল বেনারসি শাড়িতে দেখে কৌশিক থমকে দাঁড়াল। আস্তে আস্তে মায়ার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। ছলছল চোখে মায়ার দিকে তাকিয়ে বলল
“মাশাআল্লাহ্! কারো নজর যেন না লাগে,কিন্তু আমা…”
কৌশিকের পুরো কথাটা শেষ হবার আগেই মায়া আস্তে করে কৌশিকের পায়ে চাপা দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“কী করছেনটা কী? সবাই সামনে বসে আছে।”
“হ্যাঁ তো কী হয়েছে?”
“আপনাকে বোঝানো যাবে না।”
এমন সময় আশরাফ চৌধুরী বললেন,
“কথা বলার জন্য সারাজীবন পড়ে আছে, এখন তোমরা গিয়ে ওই সাজানো আসনটায় বসো।”
এ কথা মায়ার কানে আসতেই মায়া থমকে গিয়ে তার আব্বু-আম্মুর দিকে তাকাল। তারাও তাকে ইশারায় সম্মতি দিল। যে পরিবারকে হারানোর ভয়ে সে এতক্ষণ তিলে তিলে মরছিল, সেই পরিবারই আজ তাকে আনন্দের নতুন এক জীবনের পথে এগিয়ে দিচ্ছে। সে কৌশিকের হাতটা শক্ত করে ধরল। আজ আর কোনো ভয় নেই। দুজন একে অপরের সামনে বসে পড়ল।
ঘরের আলো-আঁধারি পরিবেশে তখন এক রাজকীয় গাম্ভীর্য নেমে এসেছে। রজনীগন্ধার তীব্র সুবাস আর দামী পারফিউমের ঘ্রাণ মিলেমিশে একাকার। কাজি সাহেব তাঁর পুরোনো আমলের ভারী রেজিস্টার খাতাটি খুলে চশমাটা নাকের ডগায় ঠিকমতো বসিয়ে নিলেন। কলমটা হাতে নিয়ে তিনি একবার অমিতাভ পাটোয়ারীর দিকে তাকালেন, তারপর কৌশিকের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে অত্যন্ত দাপ্তরিক গলায় প্রশ্ন করলেন:
“বাবা কৌশিক, আপনাদের উভয় পক্ষের সম্মতিতে বিয়ের দেনমোহর কত সাব্যস্ত হয়েছে?”
কৌশিক সোজা হয়ে বসল। তার চোখেমুখে কোনো দ্বিধা নেই, সে অত্যন্ত ধীরস্থির এবং বলিষ্ঠ কণ্ঠে উত্তর দিল,
“আঠারো লক্ষ টাকা, কাজি সাহেব।”
আঠারো লক্ষ টাকার অংকটা শোনামাত্র ঘরে উপস্থিত আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে একটা চাপা গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। অমিতাভ পাটোয়ারীও কিছুটা থমকে গেলেন। কাজি সাহেব রেজিস্টারে অংকটা লিখতে যাবেন, ঠিক তখনই কৌশিক হাত বাড়িয়ে তাকে থামিয়ে দিল। সে পাশে রাখা একটি কালো লেদার ব্রিফকেস টেবিলের ওপর রাখল। তালা খোলার শব্দটা এই নিস্তব্ধ ঘরে বেশ জোরেই শোনাল। ব্রিফকেসটা মেলে ধরতেই দেখা গেল ভেতরে নতুন টাকার বান্ডিলগুলো সটান সাজানো। কৌশিক শান্ত স্বরে বলল,
“কাজি সাহেব, আমি আমার মায়াকে কোনো ঋণের জালে জড়িয়ে নিজের বাড়িতে নিতে চাই না। এই আঠারো লক্ষ টাকা আমি এখনই ‘নগদ উসুল’ হিসেবে পরিশোধ করছি। খাতার পাতায় কোনো ‘বাকি’ শব্দ যেন না থাকে। পুরোটা নগদ হিসেবেই তুলুন।”
কৌশিকের এই অভূতপূর্ব ঘোষণা সবাইকে স্তব্ধ করে দিল। মায়া ওড়নার আড়াল থেকে বিস্ময়ে বড় বড় চোখ করে কৌশিকের দিকে তাকাল। তার চোখের কোণে অজান্তেই জল জমে উঠল। এই সমাজে যেখানে দেনমোহর কেবল খাতার অংক হয়ে থাকে, সেখানে কৌশিক সবার সামনে তাকে যে রাজকীয় সম্মানটুকু দিল, তা মায়ার কল্পনারও বাইরে ছিল। কাজি সাহেব কিছুক্ষণ সময় নিলেন নোটগুলো গুনে নিতে। এরপর অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে রেজিস্টারের নির্ধারিত কলামে লিখলেন, ‘দেনমোহর আঠারো লক্ষ টাকা, যাহা অদ্যই নগদ এবং পূর্ণ পরিশোধিত’।
সব তথ্য লেখা শেষে কাজি সাহেব মায়ার খুব কাছে এসে বসলেন। অত্যন্ত স্নেহশীল কিন্তু গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“মা মায়া। আঠারো লক্ষ টাকা নগদ দেনমোহর আদায় সাপেক্ষে কৌশিক নীর চৌধুরী আপনাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে ইচ্ছুক। আপনি কি এই বিয়েতে রাজি আছেন? রাজি থাকলে বলুন মা- কবুল।”
মায়ার বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। যে সম্মানের জন্য সে তিলে তিলে মরছিল, কৌশিক তা আজ তাকে পূর্ণ রাজকীয়তায় ফিরিয়ে দিয়েছে। মায়া কান্নাসিক্ত কণ্ঠে অস্ফুট স্বরে বলল,
“জি, কবুল।”
কাজি সাহেব আবারও তাগিদ দিলেন,
“মা, উচ্চস্বরে তিনবার বলুন।”
মায়া এবার নিজেকে শক্ত করে নিয়ে একটু স্পষ্ট স্বরে উচ্চারণ করল,
“কবুল, কবুল, কবুল।”
মায়া ‘কবুল’ বলার সাথে সাথে সবাই ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলল। কাজি সাহেব এবার মায়ার সামনে খাতাটা এগিয়ে দিয়ে বললেন,
“মা, এখানে আপনার স্বাক্ষর দিন।”
মায়া কাঁপাকাঁপা হাতে কলমটা ধরল। জীবনের সবচেয়ে বড় চুক্তিনামায় সে সই করল। মায়ার সই শেষ হতেই কাজি সাহেব রেজিস্টার খাতাটি কৌশিকের দিকে এগিয়ে দিলেন। কৌশিক সগর্বে নিজের নাম স্বাক্ষর করে জীবনের শ্রেষ্ঠ দায়িত্বটি নিজের কাঁধে তুলে নিল। এরপর কাজি সাহেব বিয়ের দোয়া ও খুতবা পাঠ করলেন। খুতবা শেষে তিনি কৌশিকের হাতটি নিয়ে মায়ার বাবার হাতের ওপর রাখলেন। এক ভাবগম্ভীর পরিবেশে কাজি সাহেব কৌশিককে লক্ষ্য করে বললেন,
“বাবা কৌশিক, আপনি আমার সাথে সাথে বলুন, ‘আমি মায়া পাটোয়ারীকে আঠারো লক্ষ টাকা নগদ দেনমোহর পরিশোধ সাপেক্ষে নিজের বিবাহিতা স্ত্রী হিসেবে কবুল ও গ্রহণ করে নিলাম’।”
কৌশিক মায়ার কাঁপতে থাকা নরম হাতটি নিজের বলিষ্ঠ হাতের মুঠোয় অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে চেপে ধরল। তার স্পর্শে মায়া একটু স্থির হলো। সে সবার সামনে স্পষ্ট স্বরে তিনবার উচ্চারণ করল,
“আলহামদুলিল্লাহ, আমি মায়া পাটোয়ারীকে আঠারো লক্ষ টাকা নগদ দেনমোহর পরিশোধ সাপেক্ষে নিজের বিবাহিতা স্ত্রী হিসেবে কবুল করে নিলাম।”
সাথে সাথে পুরো ঘর জুড়ে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠল। সবাই আনন্দের হিল্লোলে ভাসছে। মিষ্টি মুখ আর অভিনন্দনের জোয়ারে মায়া যেন ভাসছে। কিন্তু তার মন পড়ে ছিল সেই মানুষটার দিকে, যে গত কয়েক ঘণ্টায় তার জীবনের পুরো মোড়টাই বদলে দিয়েছে। কৌশিক সবার অলক্ষ্যে মায়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“এই আঠারো লক্ষ টাকা দিয়ে তোকে কিনিনি, এই আঠারো লক্ষ টাকা দিয়ে তোকে আমার বাড়ির রানি হিসেবে গ্রহণ করে নিলাম। এই সম্মানটুকু তোর অনেক আগে থেকেই পাওনা ছিল।”
বলেই কৌশিক উঠে দাঁড়াল। কৌশিক উঠতেই সাথে সাথে রুবিনা পাটোয়ারী মায়াকে জড়িয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। মায়াও নিজেকে আর সামলাতে পারল না। সেও তার মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতে হতে রাত তখন অনেকটা গড়িয়েছে। তারা সবাই এখন চৌধুরী বাড়িতে অবস্থান করছে। বাড়ির নতুন বউকে দেখার জন্য যত মেহমানরা এসেছিল তারা একে একে বিদায় নিচ্ছেন। মায়ার আব্বু অমিতাভ পাটোয়ারী কৌশিককে আলাদা করে ডেকে বললেন,
“কৌশিক, আমার আমানত আজ তোমার হাতে সঁপে দিলাম। আগলে রেখো বাবা।”
কৌশিক মাথা নিচু করে শুধু বলল,
“নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি যত্নে রাখব ফুফা, কথা দিলাম।”
অমিতাভ পাটোয়ারী ভ্রু নাচিয়ে বললেন,
প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ২৭
“ফুফা?”
কৌশিক মুচকি হেসে বলল,
“সরি আব্বু।”
বলেই যেই কৌশিক সালাম করতে যাবে ওমনি অমিতাভ পাটোয়ারী কৌশিককে আনন্দের সহিত জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত রেখে বললেন,
“সুখী হও বাবা।”
“জি আব্বু, আমাদের জন্য দোয়া করবেন।”
