প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ২৯
আরাফাত আদনান সামি
অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। রজনীগন্ধার তীব্র সুবাস আর দামি পারফিউমের ঘ্রাণে চারপাশটা যেন এক মায়াবী কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়েছে। বাসর ঘরের সেই বিশাল পালঙ্কটি আজ সাদা-লাল গোলাপ আর লাল পাপড়ির চাদরে সাজানো। মায়া সেই খাটের ঠিক মাঝখানে নিজের বেনারসি ওড়নার ঘোমটা টেনে আড়ষ্ট হয়ে বসে আছে। হাতে পরা লাল কাঁচের চুড়িগুলো তার দ্রুত হৃৎস্পন্দনের সাথে তাল মিলিয়ে মৃদু আওয়াজ করছে রিনঝিন, রিনঝিন।
দরজা লাগানোর শব্দটা যখন মায়ার কানে পৌঁছাল, তার শরীরের প্রতিটি লোমকূপ যেন একসাথে কেঁপে উঠল। কৌশিক ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে। কৌশিকের প্রতিটা পদক্ষেপ মায়ার বুকের ভেতরের ঢিপঢিপানিটা আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছিল। কৌশিক মায়ার একদম পাশে এসে বসল। খাটটা মায়ার ওজনের সাথে কৌশিকের বলিষ্ঠ শরীরের চাপে একটু দেবে গেল। কৌশিক কোনো কথা বলছে না; কেবল তার তপ্ত নিশ্বাসের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে মায়ার কানের খুব কাছে। নীরবতা সহ্য করতে না পেরে মায়া আমতা আমতা করে বলল,
“স-সবাই কি চলে গেছে?”
কৌশিক মায়ার কানের কাছে মুখ নামিয়ে অত্যন্ত গাঢ় স্বরে ফিসফিস করে বলল,
“হুম, সবাই চলে গেছে। এখন শুধু আমি আর আমার এই চিরচেনা মায়াবতী।”
“অসভ্য!”
“আমি এখনো অসভ্য লোকটাই আছি তোর চোখে?”
“হ্যাঁ।”
“আমাকে যেহেতু অসভ্যের চোখেই দেখিস, তাহলে আজ আমাকে সব অসভ্যের সীমা পার করতে দে।”
মায়া কৌশিকের কথায় মৃদু কেঁপে উঠল। আমতা আমতা করে বলল,
“ক-কী বলছেন আপনি এইসব?”
কৌশিক যেই কিছু বলতে যাবে, অমনি মায়া এবার মাথা তুলে কৌশিকের চোখের দিকে তাকাল। মায়া বলল,
“আব্বু-আম্মুকে রাজি করালেন কীভাবে?”
কৌশিক মায়ার দুই হাত নিজের বলিষ্ঠ হাতের কব্জিতে বন্দি করে নিল। তার স্পর্শে এক অবর্ণনীয় উত্তাপ ছিল। কৌশিক বলল, “ভালোবাসার জোর থাকলে পাহাড়কেও টলানো যায় মায়া। আমি তো শুধু তোর আব্বুকে এটা বুঝিয়েছি যে, তোকে ছাড়া এই কৌশিক একটা জ্যান্ত লাশ। আর কোনো বাবা-মা চায় না তার মেয়ের সুখের অন্তরায় হতে।”
“আপনি আমাকে পাওয়ার জন্য এতটা বেপরোয়া কেন ছিলেন?”
কৌশিক মায়ার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে কণ্ঠস্বর আরও গাঢ় করে বলল,
“বেপরোয়া? আমি তোকে নিয়ে একপ্রকার উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলাম মায়া। তোর প্রতিটা পলক, তোর ওই অভিমানী চাহনি আমাকে পাগল করে দিয়েছিল।”
মায়া আবেগপ্রবণ হয়ে কৌশিকের চওড়া বুকে নিজের মাথাটা রাখল। কৌশিক তার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে শান্ত গলায় বলল,
“অতীতে আমাদের মাঝে অনেক ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে মায়া। আমি হয়তো তোকে চিনতে দেরি করেছি। কিন্তু এখন থেকে আমাদের প্রতিটা মুহূর্ত হবে ভালোবাসার। তোর চোখের এক ফোঁটা জলও যেন বৃথা না যায়, সেই দায়িত্ব এখন আমার।”
মায়া কিছু বলল না। কৌশিক এবার নেশাময় কণ্ঠস্বরে বলল,
“এটা শুধু ট্রেলার সুইটহার্ট। এখন তো পুরো সিনেমা বাকি! কী জানি বলেছিলি? বিয়ে ছাড়া বাসরের প্রসেসিং চলবে না? এখন তো আর কোনো বাধা নেই তাই না। সো, ক্যান উই স্টার্ট দ্য প্রসেসিং নাউ, হানি?”
কৌশিকের কথায় মায়া লজ্জায় রাঙা হয়ে তার বুকে একটা কিল মেরে বলল,
“আপনি আর আপনার এই অসভ্যতামি কোনোদিন যাবে না।”
“যা বলেছি তার উত্তর দে।”
মায়া একটু ভান ধরে বলল,
“কী বলেছেন কৌশিক ভাই? আমি তো শুনতে পাইনি। সত্যি বলছি।”
কৌশিক ভ্রু কুঁচকাল।
“মায়া…”
“হ্যাঁ, শুনছি তো, বলেন।”
“ক্যান উই স্টার্ট দ্য প্রসেসিং নাউ, হানি?”
মায়া দুষ্টু হেসে উত্তরে বলল,
“এহ্যাঁ।”
কৌশিক উজ্জ্বল মুখে বলল,
“তার মানে হ্যাঁ?”
মায়া এবারও একটু ভাবের সুরে বলল,
“এর মানে তো না-ও হতে পারে, তাই না?”
মায়ার কথা শুনে কৌশিক এবার রেগে গেল। সাথে সাথে মায়ার মুখটা দুই হাতে তুলে ধরল। তার চোখের মনিতে মায়ার লাজুক প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট। কৌশিক শান্ত অথচ তীব্র গলায় বলল,
“এই অসভ্য লোকটা শুধু তোর জন্যই পাগল মায়া। সারাজীবনের জন্য তুই কি এই অসভ্য লোকটার সঙ্গ দিবি তো?”
কৌশিক এমনভাবে স্পর্শ করায় মায়ার পুরো শরীর কেঁপে উঠল। আমতা আমতা করে বলল, “হ্যাঁ।”
কৌশিক মায়ার নেশায় পুরোপুরি ডুবে গেল। ক্রমশ মায়ার দিকে ঝুঁকতে লাগল। মায়ার পুরো শরীর কেঁপে উঠল। সে আমতা আমতা করে বলার চেষ্টা করল,
“দু… দু… দু…”
কৌশিক নেশাময় কণ্ঠে বলল,
“হ্যাঁ খাব তো।”
মায়া নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল। আবারো আমতা আমতা করে বলল,
“কি-কিন্তু দু-দুধ তো টে-টে-টেবিলে। এইভাবে আ-আপনি আ-আমার কাছে আসছেন কেনো?”
“এখানেও তো আছে!”
মায়া শুকনো ঢোক গিলে বলল,
“ক-কোথায়?”
“এই তো আমার চোখের সামনে।”
কৌশিকের স্থির চোখ মায়ার বুকের দিকে দেখে মায়া নিজেকে গুটিয়ে নিল। আমতা আমতা করে বলল,
“অসভ্যের মতো কী বলছেন এইসব! আপনি এখানেই দাঁড়ান, আমি দুধ নিয়ে আসছি।”
বলেই মায়া এক দৌড়ে টেবিলের কাছে চলে গেল। সেখানে গিয়ে বুকে হাত রেখে জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগল। তারপর টেবিল থেকে দুধের গ্লাসটা হাতে নিয়ে কৌশিকের মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়াল। মায়া নিচের দিকে তাকিয়ে গ্লাসটা কৌশিকের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ২৮
“এই যে নিন।”
“উহু।”
“কী উহু? প্লিজ খেয়ে নিন এটা।”
“এটা না ওটা খা…”
