প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৩৩
আরাফাত আদনান সামি
ভোরের সেই তীব্র মেঘহীন আকাশটা বেলা বাড়ার সাথে সাথে কেমন যেন তামাটে রঙ ধারণ করেছে। ঢাকা শহরের বুকে মে মাসের এই গুমোট গরম আর চারদিকের ধুলোবালির ওপরে যেন এক অদৃশ্য চাদর বিছিয়ে দিয়েছে নিয়তি। চৌধুরী ভিলার বিশাল লাক্সারিয়াস মাস্টার বেডরুমের জানালার পর্দাগুলো এখন একপাশে সরানো। সকালের সেই তীব্র রোদের আলো এসে পড়েছে বিশাল রাজকীয় পালঙ্কের ওপর। মায়া বিছানায় উঠে বসেছে। তার গায়ের সেই তীব্র জ্বরটা এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে, কিন্তু শরীরের ভেতর এক অদ্ভুত দুর্বলতা আর অবসাদ রয়ে গেছে। গত রাতের সেই ঝড়ের মতো আসা অসুস্থতা আর তার চেয়েও তীব্র গতিতে আসা কৌশিকের সেই অবিশ্বাস্য কেয়ারের কথা মনে পড়তেই মায়ার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ম্লান ভালোবাসার হাসি ফুটে উঠল। সে নিজের দুই হাতের দিকে তাকাল। কৌশিক সারারাত এক ফোঁটা চোখের পাতা এক না করে তার মাথায় ঠান্ডা জলের পট্টি দিয়ে গেছে, তার প্রতিটি কষ্টের নিশ্বাসকে নিজের বুকের ভেতর টেনে নিয়েছে।
বিছানার পাশে রাখা ছোট টেবিলটার ওপর একটা কাঁচের গ্লাসে অর্ধেকটা পানি আর কিছু জরুরি ট্যাবলেটের পাতা রাখা। কৌশিক কিছুক্ষণ চোখ লাগিয়ে আবার সকাল সকাল ঘুশ থেকে উঠে কখন যে ফ্রেশ হয়ে নিচে চলে গেছে, মায়া টেরো পায়নি। সে আলতো করে বিছানা থেকে নিজের পা দুটো নিচে নামাল। বাসন্তী রঙের সুতির শাড়িটা কিছুটা কুঁচকে গেছে, কিন্তু মায়ার অবয়বে এখন আর সেই ভীরু, চিপকালি টাইপ মেয়েটার কোনো অস্তিত্ব নেই। গত বিকেলের তিয়াশার বন্ধুদের সেই অপমান আর তার বিপরীতে কৌশিকের সেই রুদ্রমূর্তি মায়াকে ভেতর থেকে এক ধাক্কায় অনেকখানি পরিপক্ব করে তুলেছে। সে বুঝতে পেরেছে, এই বিশাল চৌধুরী পরিবারের বড় বউ হওয়া মানে শুধু রান্নাঘরে গোল গোল রুটি বানানো নয়, বরং নিজের সম্মান আর পরিবারের প্রতিটি সদস্যের মর্যাদা রক্ষা করার এক অলিখিত দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা।
মায়া ওয়াশরুমে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে চুলগুলো একটা খোঁপা করে বেঁধে নিল। আয়নায় নিজের ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে সে মনে মনে এক দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করল,
“না, এবার থেকে আর কোনো দুর্বলতা না। এই চৌধুরী ভিলার প্রতিটি মানুষ আমাকে কত ভালোবাসে, আমার স্বামী আমার জন্য নিজের বোনের অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে গিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। এবার মায়াকে নিজের পায়ের তলার মাটি শক্ত করতেই হবে। কোনো ঝড় যেন এই পরিবারকে কখনো ছুঁতে না পারে।”
এই বলে যে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। মায়া যখন ধীর পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এল, তখন ডাইনিং রুমের পরিবেশটা অন্য দিনগুলোর মতো চঞ্চল বা হাসিখুশি ছিল না। টেবিলে আশরাফ চৌধুরী আর আসিফ চৌধুরী গম্ভীর মুখে বসে আছেন। তাদের সামনে খবরের কাগজটা খোলা, কারও মনোযোগ চায়ের কাপে নেই। মাহিমা চৌধুরী আর সায়েরা চৌধুরী এক কোণে দাঁড়িয়ে চিন্তিত মুখে দেওয়ালে ঝুলানো বিশাল এলইডি টিভির দিকে তাকিয়ে আছেন। সেখানে অত্যন্ত চড়া এবং রোমহর্ষক কণ্ঠে এক নারী নিউজ প্রেজেন্টার ব্রেকিং নিউজ পড়ছেন:
❝…ব্রেকিং নিউজ। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গত ৪৮ ঘণ্টায় আরও সাতজন তরুণী নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারণা, এর পেছনে আন্তর্জাতিক কোনো নারী ও শিশু পাচারকারী চক্রের এক বিশাল এবং হিংস্র টিম কাজ করছে। এই চক্রের সদস্যরা এতটাই নিখুঁত এবং পেশাদার যে, জনাকীর্ণ এলাকা থেকেও চোখের পলকে ভুক্তভোগীদের উধাও করে দিচ্ছে। পুলিশের বিশেষ শাখা থেকে প্রতিটি পরিবারকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে তরুণী এবং স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের একাকী ঘরের বাইরে বের হতে নিষেধ করা হচ্ছে…❞
নিউজটা শুনে মায়ার বুকের ভেতরটা এক অজানা আশঙ্কায় মোচড় দিয়ে উঠল। সে ডাইনিং রুমে ঢুকতেই মাহিমা চৌধুরী ব্যস্ত হয়ে এগিয়ে এলেন।
“মায়া মা! তুমি নিচে কেন নামলে কেনো? তোমার না প্রচণ্ড জ্বর ছিল রাতে? শরীর কেমন এখন তোমার?”
মায়া মাহিমা চৌধুরীর হাতটা ধরে একটা আশ্বস্ত করার মতো হাসে বলল,
“আমি এখন একদম ঠিক আছি, মা। জ্বরটা সকালের দিকেই ছেড়ে গেছে।”
আসিফ চৌধুরী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে টিভির দিকে ইশারা করে বললেন,
“দেশের পরিস্থিতি দিন দিন কোথায় যাচ্ছে দেখছ বড় ভাই? এই শহরটা এখন আর মেয়েদের জন্য নিরাপদ নয়। কোন হিংস্র জানোয়ারের দল যে মেতে উঠেছে আল্লাহ ভালো জানেন!”
ঠিক তখনই ড্রইংরুমের দিক থেকে ল্যাপটপ ব্যাগ হাতে কৌশিক আর তার পেছনে ফোন কানে দিয়ে রোহিত ডাইনিং রুমে ঢুকল। কৌশিকের পরনে আজ একটা নেভি ব্লু ফরমাল শার্ট আর গাঢ় ধূসর রঙের প্যান্ট। তার সেই চিরচেনা গম্ভীর আর ধারালো অবয়ব। কিন্তু তার চোখ দুটো ডাইনিং রুমে ঢোকার পরেই সরাসরি গিয়ে স্থির হলো মায়ার ওপর। মায়াকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কৌশিকের চোখের মণি দুটো সামান্য সংকুচিত হলো। সে ল্যাপটপ ব্যাগটা ডাইনিং টেবিলের ওপর রেখে কোনো ভূমিকা ছাড়াই মায়ার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার একটা বড় হাত মায়ার কপালে আর অন্য হাতটা মায়ার ঘাড়ের কাছে স্থাপন করল। তার স্পর্শে মায়ার পুরো শরীরটা আর একবার শিউরে উঠল, কিন্তু সে এবার চোখ সরাল না। সরাসরি তাকিয়ে রইল কৌশিকের সেই নেশাতুর, পজেসিভ চোখের দিকে। কৌশিকের নরম কণ্ঠস্বরে বলল,
“জ্বর তো কমেছে দেখছি, কিন্তু নিচে নামার পারমিশন কে দিল তোমাকে হ্যাঁ? আমি মাকে বলে গিয়েছিলাম তোমাকে যেন বিছানা থেকে উঠতে না দেওয়া হয়। তার-পরও?”
মায়া আলতো করে কৌশিকের হাতটা নিজের কপাল থেকে সরিয়ে দিয়ে মৃদু গলায় বলল,
“আমি এখন একদম সুস্থ আছি। আর কতক্ষণ ঘরে বন্দি হয়ে থাকব? তাছাড়া আমি তো কোন কাজ করছি না সব মা আর ছোট মামি একা হাতে সামলাচ্ছেন…”
কৌশিক মায়ার কথার মাঝখানেই তাকে থামিয়ে দিয়ে টেবিলের দিকে তাকাল। টিভির নিউজটা তখনো ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছিল। রোহিত ফোনটা কেটে দিয়ে কৌশিকের পাশে এসে বসল। তার মুখেও আজ সেই চেনা ফাজলামির কোনো চিহ্ন নেই। রোহিত অত্যন্ত সিরিয়াস মুখে বলল,
“ব্রো, আমাদের অফিসের যে ফিমেল এমপ্লয়িরা আছে, ওদের সিকিউরিটির জন্য এক্সট্রা বাসের ব্যবস্থা করতে হবে। যেভাবে মেয়ে পাচারকারী চক্রের খবর বের হচ্ছে, পুরো গুলশান আর বনানী এলাকা জুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।”
কৌশিক একটা চেয়ার টেনে বসল। সে মায়াকে ইশারা করল তার পাশের চেয়ারটায় বসার জন্য। মায়া চুপচাপ বসে পড়ল। কৌশিক রোহিতের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি অলরেডি আমাদের সিকিউরিটি হেডকে ইনফর্ম করেছি। চৌধুরী গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের কোনো স্টাফ যেন সন্ধ্যার পর একা ট্রাভেল না করে। আর হ্যাঁ, তিয়াশা কোথায়?”
তিয়াশার নাম শুনতেই টেবিলের পরিবেশটা আরও কিছুটা ভারী হয়ে গেল। গতকাল বিকালের সেই অপমান তিয়াশা এখনো হজম করতে পারেনি। সায়েরা চৌধুরী একটা শুকনো দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“ও ঘরের দরজা বন্ধ করে বসে আছে। সকাল থেকে কিছুই মুখে দেয়নি। আবার আজ নাকি ওর বান্ধবীর বাসায় যাবে কোচিংয়ের নোটস আনতে।”
কৌশিক চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা এবং বরফশীতল গলায় বলল,
“ওকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিও, আজ থেকে আগামী এক মাস এই চৌধুরী ভিলার সীমানার বাইরে ও একটা পা-ও রাখবে না। ওর যদি কোনো নোটস দরকার হয়, রোহিত বা আমি গিয়ে এনে দেব। আর দেশের যে পরিস্থিতি, ও যদি কোনো অবাধ্যতা করার চেষ্টা করে, তবে তিয়াশাকে ওর ঘরে তালাবন্ধ করে রাখা হবে।”
মায়া কৌশিকের এই অতিরিক্ত সুরক্ষামূলক আর পজেসিভ স্বভাবটা খুব ভালো করেই চেনে। কিন্তু আজ টিভির নিউজটা দেখার পর তার নিজের ভেতরেও কেমন যেন একটা কু ডাকছিল। সে কৌশিকের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “তিয়াশা ছোট মানুষ, ও হয়তো রাগ করে আছে। আমি ওর ঘরে গিয়ে খাবার দিয়ে আসব?”
কথাটা শুনে কৌশিক মায়ার দিকে এক গভীর দৃষ্টিতে তাকাল। মায়ার এই ম্যাচিউরিটি, এই পুরো পরিবারকে আগলে রাখার চেষ্টা কৌশিককে ভেতর থেকে এক অন্যরকম প্রশান্তি দেয়। সে মৃদু ফিসফিস করে বলল,
“যাবে?”
“হুম।”
কৌশিক ফিসফিস করে বলল,
“তবে যাও, কিন্তু নিজের শরীরের খেয়াল রাখবে, সুইটহার্ট। তিয়াশা যদি কোনো রকম বাজে ব্যবহার করার চেষ্টা করে, আমাকে জাস্ট একটা ডাক দেবে।”
মায়া একটু ভ্রু-কুচকাল মনে মনে বলল,
“এর আবার কী হলো? সেই কখন খেয়াল করছি আমাকে তুমি তুমি করে সম্মোধন করছে সবসময় তো তুই তুই করেই ডাকে। ওয়েট ওয়েট ওয়েট আবার পাগল টাগল হয়ে গেলো না তো? যাগ্গে আমার কী? আমারই ভালো, মনে হচ্ছে আমার আরও একটু সম্মান বেড়ে গেলো, হাহ্! নিজেকে এখন রাণী রাণী লাগছে।”
ঠিক এমন সময় কৌশিক মায়ার মুখের সামনে একটা তুরি মেরে বলল,
“ও হ্যাঁলো! এইভাবে কী ভাবছো শুনি?”
মায়া আমতা আমতা করে উঠল,
“ক-কই কিছু না তো! কিছু না।”
রোহিত এতক্ষণের গম্ভীর পরিবেশটা হালকা করার জন্য মায়ার দিকে তাকিয়ে একটু হাসল। “ভাবি, ব্রো-র এই কেয়ারিং সাইডটা দেখে আমি মাঝে মাঝে ভাবি, ও যদি বিজনেসম্যান না হয়ে কোনো জেলের জেলার হতো, তবে কয়েদিদের অবস্থা কী হতো! সারাক্ষণ শুধু নজরদারি আর লকআপ! লকআপ তো নজরদারি।”
কৌশিক রোহিতের দিকে তাকিয়ে একটা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এনে বলল,
“রোহিত,অফিসে আজ নতুন প্রজেক্টের মিটিং আছে, মনে আছে তোর? নাকি ফান্ডটা আজই পার্মানেন্টলি ক্যানসেল করব?”
ফান্ডের নাম শুনতেই রোহিত চট করে নিজের মুখে একটা অদৃশ্য চাবির লক লাগানোর ভঙ্গি করল।
“ওকে বস, আই এম সাইলেন্ট! আর কোনো কথা না!”
মায়া রান্নাঘর থেকে একটা ট্রে-তে কিছু রুটি, সুজি আর ডিমের ওমলেট নিয়ে দোতলার তিয়াশার ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ঘরের দরজাটা ভেতর থেকে লক করা ছিল। মায়া দরজায় আলতো করে টোকা দিল।
“তিয়াশা , দরজাটা খোল। আমি তোর জন্য ব্রেকফাস্ট নিয়ে এসেছি।”
ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। মায়া আবারও দরজায় নক করল।
“তিয়াশা, খাবারের সাথে রাগ করলে হয়? খাবারের সাথে রাগ করে থাকলে তো নিজেরই ক্ষতি হবে তাই না? ও তিয়াশা ম্যাডাম জি, আপনি কাল থেকে কিচ্ছুটি খাননি। প্লিজ ম্যাডাম জি, দয়া করে এবার অন্তত দরজাটা খুলুন, নয়তো আপনার ভাই জানতে পারলে পরে আবার সমস্যায় পড়বেন।”
কৌশিকের নাম শুনতেই ঘরের দরজাটা এক ঝটকায় খুলে গেল। তিয়াশা দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখ দুটো কান্নায় ফুলে লাল হয়ে আছে, চুলগুলো এলোমেলো। সে মায়ার হাতের ট্রের দিকে তাকিয়ে এক অবজ্ঞার হাসি হাসল। তিয়াশার কণ্ঠস্বরে এক তীব্র বিষাক্ততা এনে বলল,
“ওয়াও! চৌধুরী বাড়ির নতুন মালকিন কিনা আমার জন্য খাবার নিয়ে এসেছে! কেন এনেছো শুনি? নাকি সবার কাছে আরও ভালো সাজার জন্য? আরও ক্রেডিট চাই তোমার?”
মায়া কোনো কথা না বলে ঘরের ভেতরে ঢুকে খাবারটা টেবিলের ওপর রাখল। তারপর তিয়াশার দিকে ফিরে অত্যন্ত শান্ত এবং স্থির গলায় বলল,
“ক্রেডিট নেওয়ার কোনো ইচ্ছে আমার নেই তিয়াশা। আমি এই বাড়ির বড় বউ, আর আপনি আমার দশটা না পাঁচ টা না একটা মাত্র প্রিয় ননদিনী। আপনার প্রতি আমার একটা দায়িত্ব আছে না? আর হ্যাঁ, কাল আপনার বন্ধুদের সাথে যা হয়েছে, তার জন্য আমি দুঃখিত। কিন্তু আপনার বান্ধবী আমার সাথে যে ব্যবহারটা করেছিল, সেটা কোনো ভদ্র পরিবারের মেয়ের আচরণ ছিল না, বুঝলেন আমার প্রিয় ননদিনী?”
তিয়াশা মায়ার দিকে দুই পা এগিয়ে এসে তর্জনী উঁচিয়ে বলল,
“তুমি অন্তত আমাকে জ্ঞান দিতে এসো না! সম্পর্কে যতই তুমি আমাদের ফুফাতো বোন বা এখন ভাবি হও না কেনো। তোমার ওই মিডল ক্লাস ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে তুমি যেইভাবে এই চৌধুরী ভিলার রাজকীয় বউ সেজেছ, এটাই তো আমাদের জন্য লজ্জার! ভাইয়া আগে আমাকে কতটা ভালোবাসতো জানো? আমি যা বলতাম, ভাইয়া তাই করতো। আর তুমি এই বাড়িতে আসার পর থেকে ভাইয়া আমাকে কত বার অপমান করেছে, আমার বন্ধুদের তাড়িয়ে দিচ্ছে! আই জাস্ট হেইট ইউ!”
মায়া তিয়াশার দিকে তাকিয়ে এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে তিয়াশার সেই উঁচিয়ে থাকা আঙুলটা আলতো করে নিজের হাত দিয়ে নামিয়ে দিল। মায়ার এই আকস্মিক শান্ত অথচ দৃঢ় আচরণে তিয়াশা কিছুটা থমকে গেল।
“তিয়াশা, কৌশিক যা করেছে তোর ভালোর জন্যই করেছে। কারণ উনি চান না ওনার ছোট বোন কোনো আজেবাজে ফ্রেন্ড সার্কেলে মিশে নিজের চরিত্র আর স্বভাব নষ্ট করুক। আর আমার দুষ্টু মিষ্টি প্রিয় ননদিনী আপনি যে বললেন কৌশিক আপনাকে ভালোবাসে না? আজ সকালে ডাইনিং টেবিলে যখন টিভির নিউজে মেয়ে পাচারকারী চক্রের কথা বলছিল, কৌশিক সবচেয়ে বেশি চিন্তিত আপনার সিকিউরিটি নিয়ে ছিলেন। উনি স্পষ্ট বলে গেছেন আপনি যেন আগামী এক মাস এই বাড়ির বাইরে পা না রাখেন। ওনার এই কড়া শাসনটাই উনার বোনের প্রতি উনার ভালোবাসা, তিয়াশা। ওটা বুঝতে শিখো। আর হ্যাঁ কৌশিক কে নিয়ে মাথা থেকে উল্টো পাল্টা চিন্তা মুছে ফেলো কারণ কৌশিকের জীবনে অলরেডি এই মায়া চলে এসেছে, বুঝলে আমার প্রিয় ননদিনী!”
মায়ার কথাগুলো তিয়াশাকে একটু চুপ করিয়ে দিল। তিয়াশা মুখটা অন্য দিকে ঘুরিয়ে কথা ঘুরানোর জন্য বলল,
“আমি না আমার রোহিত ভাইয়ার শাসন মানি আর না কৌশিক ভাইয়ার কোনো শাসন মানি না। আর হ্যাঁ আমার আজ বিকেলে নিধির সাথে দেখা করতেই হবে। আমাদের কোচিংয়ের টেস্ট পেপারের ইমপর্ট্যান্ট নোটস ওর কাছে আছে। ওটা না পেলে আমি পরীক্ষায় ফেল করব।”
মায়া তিয়াশার টেবিলের ওপর রাখা খাবারের দিকে তাকিয়ে বলল,
“নোটস যদি এতই জরুরি হয়, তবে নিধিকে এই বাড়িতে আসতে বলো। কৌশিককে বলে আমি নিধির জন্য গাড়ি পাঠানো ব্যবস্থা করছি এ বাড়ির দরজা নিধির জন্য সবসময় খোলা কিন্তু ননদিনী আপনি এই পরিস্থিতিতে একা বাইরে যেতে পারবেন না। এখন চুপচাপ খাবারটা খেয়ে নিন।”
কথাটা বলে মায়া আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। সে ঘর থেকে বের হয়ে দরজাটা টেনে দিল। তিয়াশা টেবিলের খাবারের দিকে তাকিয়ে রাগে ফুঁসতে লাগল, কিন্তু মায়ার ধারালো কথার উত্তর দেওয়ার মতো কোনো যুক্তি তার কাছে ছিল না।
দুপুর বারোটা। চৌধুরী গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের বিশাল রাজকীয় এমডি কেবিনে বসে রোহিত কিছু ফাইলের ওপর সাইন করছিল। তার পরনে একটা অফ-হোয়াইট শার্ট, টাইটা কিছুটা আলগা করা। কৌশিক তখন পাশের কনফারেন্স রুমে ক্লায়েন্টদের সাথে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ে ব্যস্ত। ঠিক তখনই রোহিতের কেবিনের দরজায় ধপধপ করে শব্দ হলো। কোনো পারমিশন ছাড়াই দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল এক তরুণী। পরনে একটা সালোয়ার কামিজ, কাঁধে একটা বড় সাইডের ব্যাগ, আর মুখটা রাগে টকটকে লাল হয়ে আছে। মেয়েটি আর কেউ নয়, তিয়াশার বেস্ট ফ্রেন্ড ‘নিধি’। তার ব্যবহার ভেতর থেকে অত্যন্ত পরিষ্কার এবং পবিত্র হলেও, মুখে সে এক ইঞ্চিও কাউকে ছাড়ে না এটা রোহিত হাড়ে হাড়ে জানে। নিধি কেবিনে ঢুকেই রোহিতের টেবিলের ওপর নিজের ব্যাগটা ধপাস করে আছাড় দিয়ে রাখল।
“এই যে মিস্টার হিটলারের অ্যাসিস্ট্যান্ট! আমাকে জ্বালালিয়ে সেইদিন রাতে আমার নাম্বার নিলেন কিন্তু এখনো কোন ফোন করলেন না কেন? এটা না হয় মানলাম বাট আমি ফোন দিলে ফোন ধরেন না কেন? আপনার ফোন কি সবসময় বিজি থাকে? নাকি অন্য কোনো ফালতু কাজে ব্যস্ত থাকেন?”
রোহিত পেনটা টেবিলের ওপর রেখে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল। নিধিকে দেখামাত্রই তার মুখের সেই দুপুরের ক্লান্তিটা এক নিমেষেই গায়েব হয়ে গেল। সে নিজের ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলল,
“আরেহ্! মিরচি পকোড়া যে! আর আমার জন্য এত চিন্তা যে? কী ব্যাপার হ্যাঁ হ্যাঁ?”
নিধি ভেংচি কেটে বলল,
“কচু।”
“তা ম্যাডাম,আমার এই শান্ত-শিষ্ট কেবিনে এসে এভাবে চিললাচ্ছেন কেনে? আর আমি কার অ্যাসিস্ট্যান্ট, আর আপনি ব্রো’কে কী বললেন? কৌশিক ব্রো যদি একবার শুনতে পায় না,তবে আপনাকে এই কোম্পানির সিকিউরিটি আনিয়ে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবে।”
নিধি দুই হাত কোমরে দিয়ে রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
“কৌশিক ভাইয়া অনেক ভালো, ওনাকে মাঝখানে টানবেন না। তিয়াশা আমাকে সকাল থেকে দশবার ফোন করে কাঁদছে। আপনারা নাকি ওকে ঘরে বন্দি করে রেখেছেন? একেই কালকে ওকে আপনারা আমাদের সামনে সবাই মিলে অপমান করলেন তার উপর এখন আবার ঘর বন্দী। জানেনই তো ও একটু ত্যাড়া তাই বলে ওর সাথে আপনারা এমন করবেন? আর এইবার আমরা এসএসসি পরীক্ষা দিব, সেটা জানেন তো? ওর কোচিংয়ের নোটসগুলো আমি দিতে যাচ্ছিলাম, আর আপনার ওই বিশাল চৌধুরী ভিলার দারোয়ানরা আমাকে গেটেই আটকে দিল! বলল কৌশিক স্যার আর রোহিত স্যারের পারমিশন ছাড়া কাউকে ঢুকতে দেওয়া হবে না! আগে উনাদের পারমিশন নিয়ে আসুন। আপনি কি নিজেকে এই দেশের প্রেসিডেন্ট ভাবেন, হ্যাঁ?”
রোহিত চেয়ার থেকে উঠে নিধির খুব কাছে গিয়ে দাঁড়াল। নিধির ছোটখাটো উচ্চতার কারণে তাকে রোহিতের মুখের দিকে তাকাতে বেশ মাথা উঁচিয়ে তাকাতে হচ্ছিল। রোহিত নিধির সেই রেগে থাকা চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত শান্ত কিন্তু গভীর গলায় বলল,
প্রেসিডেন্ট ভাবি না নিধি, কিন্তু নিজের বোন আর নিজের পরিবারের সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্বটা আমাদের আছে। তুমি কি আজ দুপুরের বা সকালের নিউজ দেখেননি? ঢাকা শহরের প্রতিটা কোণ থেকে মেয়ে কিডন্যাপ হচ্ছে। এই পাচারকারী চক্রের টিমটা কতটা হিংস্র, তোমার কোনো ধারণা আছে? আর একা একা বাড়ি থেকে বের হওয়া তোমারও উচিত হয়নি। উফ্স সরি সরি তুমি করে বলে ফেললাম।”
“ইট’স ওকে এমনেতেও আমি আপনার অনেক ছোট তুই করে বললেও সমস্যা নাই।”
“তবে একটা কথা মানতেই হবে,তোমার সাহস আছে অনেক। যাগ্গে! তা মিরচি পকোড়া সকালের নিউজ কী দেখো নাই?”
নিধি একটু থমকে গেল, কিন্তু তার ভেতরের সেই জেদি স্বভাবটা একটুও কমল না। সে মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“নিউজ আমি দেখেছি। তার মানে এই নয় যে আপনারা একটা মেয়েকে ঘরের ভেতর এইভাবে বন্দি করে রাখবেন! আমি তো নোটসগুলো দিতেই যাচ্ছিলাম। তিয়াশা যদি পরীক্ষায় খারাপ করে, তার দায় কে নেবে?”
রোহিত নিধির খুব কাছে ঝুঁকে এল। তাদের মধ্যকার দূরত্বটা এখন মাত্র কয়েক ইঞ্চির। রোহিত নিধির চোখের মনিতে চোখ রেখে বলল, “দায় আমি নেব। আর তিয়াশার নোটস যদি এতই দরকার হয়, তবে সেটা দিতে তোমাকে চৌধুরী ভিলয় যেতে হবে না। নোটসগুলো আমার কাছে দাও। আমি অফিস শেষ করে বাড়ি যাওয়ার সময় তিয়াশাকে দিয়ে দেব। আর হ্যাঁ, তুমি যে এই দুপুর রোদে একা একা রিকশা দিয়ে এতদূর এসেছো, তোমার কি নিজের জীবনের কোনো ভয় নেই, মিরচি পকোড়া?”
রোহিতের এই হঠাৎ করে বলা কথাটার পেছনের লুকিয়ে থাকা গভীর ভালোবাসাটা নিধি পলকেই ধরতে পারল। তার ভেতরের সেই চিললানো রাগটা যেন এক সেকেন্ডে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে একটু অপ্রস্তুত হয়ে এক পা পিছিয়ে গেল। তার ফর্সা গালে এক হালকা লাজুক আভা ফুটে উঠল, যা সে আড়াল করার জন্য চোখ নামিয়ে নিল। নিধি এইবার একটু আমতা আমতা করে বলল।
“আ-আমি একা আসলাম কোথায়? রিকশা ওয়ালাও তো ছিল সাথে। আর আমি নিজের খেয়াল নিজে রাখতে জানি।”
রোহিত নিধির এই রূপটা দেখে মনে মনে এক অদ্ভুত টান অনুভব করল। এই মেয়েটা যতবার তার সামনে এসে ঝগড়া করে, ততবার রোহিতের মনে হয় এর চেয়ে পবিত্র আর সুন্দর মেয়ে এই পৃথিবীতে আর একটাও নেই। সে নিধির ব্যাগ থেকে নোটসের খাতাটা নিজের হাতে নিয়ে বলল, “খাতাটা আমি নিলাম। এবার তুমি চুপচাপ আমার এই কেবিনে বসো। আমি ড্রাইভারকে বলছি তোমাকে গাড়িতে করে সেফলি তোমার বাসায় ড্রপ করে দিতে। কোনো রকম অবাধ্যতা আমি শুনব না।”
নিধি আর কোনো ঝগড়া করার সুযোগ পেল না। সে চুপচাপ সোফায় গিয়ে বসল, কিন্তু মনে মনে সে এক অদ্ভুত ভালোলাগার সাগরে ভাসতে লাগল।
বিকেল চারটা। চৌধুরী ভিলার চারদিকের বিশাল সবুজ বাগানটা এখন অলস রোদে ঝিমোচ্ছে। মাহিমা চৌধুরী আর সায়েরা চৌধুরী রান্নাঘরে রাতের রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। মায়া বাগানের একটা বেঞ্চে বসে বঙ্কিমচন্দ্রের সেই লাইব্রেরি থেকে আনা উপন্যাসটা পড়ছিল। তার শরীরটা এখন অনেকটাই ঝরঝরে লাগছে। ঠিক তখনই চৌধুরী ভিলার বিশাল মেইন গেটের বাইরে একটা কালো রঙের মাইক্রোবাস এসে থামল। গাড়িটার কাঁচগুলো সম্পূর্ণ কালো চাদরে ঢাকা, যার ভেতর থেকে বাইরের কোনো কিছু দেখা অসম্ভব। গাড়ির ভেতরে বসে আছিল তিনজন অত্যন্ত হিংস্র আর কুৎসিত চেহারার লোক। তাদের প্রত্যেকের চোখে কালো চশমা আর শরীরে এক অদ্ভুত পেশাদার অপরাধীর গন্ধ। গাড়ির ফ্রন্ট সিটে বসা লোকটা, সে একটা দূরবীণ দিয়ে চৌধুরী ভিলার বাগানের দিকে তাকাল। তার দূরবীণের লেন্সে ধরা পড়ল মায়ার সেই স্নিগ্ধ আর শান্ত অবয়ব। পেছনের সিট থেকে একজন খসখসে গলায় জিজ্ঞেস করল,
“বস, আজকে এই মেয়েটাই কি আমাদের টার্গেট?”
টিম লিডার দূরবীণটা নামিয়ে একটা কুৎসিত আর চতুর হাসি দিল।
“না, এই এলাকার ৯০% মেয়ের ফটো আমার কাছে আছে আর কে কার কী হয় সব তথ্যও আমার জানা আছে এই মেয়েটা এই বাড়ির বড় বউ। আমাদের টার্গেট হলো এই বাড়ির ছোট মেয়েটা… কী জানি নাম ওর? হ্যাঁ মনে পড়েছে তিয়াশা। আমি এই এলাকার প্রায় সব মেয়েদের ফটো আমার একটা স্পেশাল ক্লায়েন্টকে দেখিয়েছি সে এই বাড়ির মেয়েটাকে পছন্দ করছে আমাদের ক্লায়েন্ট ওকেই চেয়েছে। ওর বয়স আর প্রোফাইল আমাদের পাচারকারী মার্কেটের জন্য একদম পারফেক্ট। কিন্তু এই বাড়ির সিকিউরিটি তো দেখছি জেলের মতো টাইট। বিশেষ করে ওই কৌশিক নীর চৌধুরী। শুনেছি সে নাকি এখানকার সবচেয়ে বড় বিজনেস ম্যান। আর মেয়েটার ভাই রোহিত সেও কোন অংশে কম নয় এই দুই ভাইকে টেক্কা দেওয়া এতটাও সহজ হবে না।”
“বস আপনি এত কিছু জানলেন কী করে?”
“একটা ফুলকে তুলতে যাচ্ছি, সেটা কী ফুল, কেমন ফুল, তার গাছটা কেমন, কোন মাটিতে হয়েছে এগুলো দেখবো না তা কী করে হয়?”
পেছনের আরেকটা লোক নিজের কোমরে গুঁজে রাখা একটা ধারালো ছুরি বের করে ওটার ধার পরীক্ষা করতে করতে বলল,
“সিকিউরিটি যতই টাইট হোক বস, মেয়েটা যখনই স্কুল, প্রাইভেট, কোচিং,বান্ধবীর বাসায় বা অন্য কোথাও যাওয়ার জন্য যে এই গেটের বাইরে এক পা রাখবে,আমরা চোখের পলকে ওকে ভ্যানিশ করে দেব। আমাদের আটকানোর ক্ষমতা এই তুচ্ছ ভাইদের নেই।”
টিম লিডার গাড়িটা স্টার্ট দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলল,
“আজ রাত থেকেই এই বাড়ির ওপর কড়া নজর রাখ। মেয়েটা যখনই একা থাকবে, তখনই আমাদের স্ট্রাইক করতে হবে। দিস ইজ আওয়ার বিগেস্ট প্রজেক্ট।”
কালো মাইক্রোবাসটা এক ঝটকায় স্টার্ট নিয়ে হাইওয়ের ধুলো উড়িয়ে উধাও হয়ে গেল। বাগানে বসে থাকা মায়া হঠাৎ করেই একটা অদ্ভুত ঠান্ডা স্রোত নিজের পিঠের ওপর দিয়ে বয়ে যেতে অনুভব করল। সে বইটা বন্ধ করে গেটের দিকে তাকাল। সেখানে শুধু ধুলোর মাঝে একটা বিশাল কালো রঙের গাড়িকে দেখতে পেলো। মায়ার ভেতরে কেমন এক মোচড় দিয়ে উঠল।
“এই রাস্তা দিয়ে এত বড় গাড়ি কবে থেকে চলা শুরু করল? আগে কখনো তো দেখি নি।”
একটু থেকে মনকে শান্তনা দেওয়ার জন্য আবার বলল,
“এটা আর এমন কী ব্যাপার ঢাকা শহর বলে কথা বড় বড় গাড়ি চলতেই পারে স্বাভাবিক।”
সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা। চৌধুরী ভিলার বিশাল ছাদটা এখন উপচে পড়া জোছনার আলোয় ভেসে যাচ্ছে। হালকা ঠাণ্ডা বাতাস বইছে, যা মায়ার বাসন্তী শাড়ির আঁচলটাকে বাতাসে বারবার উড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। মায়া ছাদের রেলিং ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছিল। তার মনে সকালের টিভির নিউজ আর বিকেলের সেই কালো গাড়ির একটা অদ্ভুত আতঙ্ক ঘুরপাক খাচ্ছিল। যে যতই নিজেকে গাড়িটা নিয়ে শান্ততা দিতে চাচ্ছে ততই তার মন আরো খিটখিটিয়ে উঠছে। গাড়ির কথাটা ভাবলেই কেনো জানি তার শরীরের লোম কাটা হয়ে দাড়াচ্ছে। ঠিক তখনই পেছন থেকে দুটো বলিষ্ঠ আর চওড়া হাত এসে মায়ার কোমরটা একদম পাথর চাপা দেওয়ার মতো করে জড়িয়ে ধরল। মায়া চমকে উঠতে গিয়েও পারল না, কারণ কৌশিকের সেই চেনা কড়া পারফিউমের সুবাস অলরেডি তার নাসিকারন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। কৌশিক নিজের চিবুকটা মায়ার কাঁধের ওপর রাখল। তার তপ্ত নিশ্বাস মায়ার কানের লতিতে আছড়ে পড়তেই মায়ার শরীরের প্রতিটি লোমকূপ শিউরে উঠল।
কৌশিকের নেশাতুক কণ্ঠস্বরে বলল,
“এখনো শরীরটা হালকা গরম আছে দেখছি, সুইটহার্ট। সন্ধ্যার এই ঠান্ডা বাতাসে ছাদে আসার কী দরকার ছিল, হ্যাঁ?”
মায়া পেছনে ঘোরার চেষ্টা করল, কিন্তু কৌশিক হাতের বাঁধন আরও কিছুটা শক্ত করে মায়াকে নিজের পিঠের সাথে লেপ্টে ধরল। মায়া নিরুপায় হয়ে বলল,
“কী করছেন, ছাড়ুন না।”
“আচ্ছা ছাড়বো না।”
“কানে কম শুনেন নাকি? আমি বলছি ছাড়তে।”
“কী বলছো মায়া আমি শুনতে পারছি না আর একটু জোরে বলো।”
“ঢং বা দিয়ে বলেন এখানে কী করতে এসেছেন?”
“আমার বউকে খুজতে।”
কৌশিক মায়ার কানের লতিতে নিজের ঠোঁট দুটো আলতো করে ছোঁয়াল। তার এই কেয়ার মায়াকে এক নিমেষে অবশ করে দিচ্ছিল। মায়া এবার একটু দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“আমি আজ তিয়াশার ঘরে গিয়েছিলাম। ওর মনটা বড্ড খারাপ। আপনি কাল ওকে সবার সামনে ওভাবে অপমান না করলেও পারতেন। ও ছোট মানুষ, ভুল তো করতেই পারে স্বাভাবিক।”
কৌশিক মায়ার কথা শুনে ওনার মুখটা নিজের দিকে ঘুরাল। দুই হাত এখন মায়ার নরম গালে। কৌশিকের চোখ দুটো জোছনার আলোয় আরও বেশি তীক্ষ্ণ দেখাচ্ছিল।
“মায়া, তিয়াশাকে আমি কেন শাসন করেছি, তা আজ সকালের নিউজ দেখার পর নিশ্চয়ই বুঝতে পেরছ। এই শহরে এখন পরিস্থিতি ভালো না। তিয়াশা অবুঝ, বাইরের বাস্তবতা ঠিকভাবে বুঝতে পারে না। ও যেমনই হোক, ও আমাদের একমাত্র বোন। ও অনেক ভুল করছে, মানছি। কিন্তু ওর ভুলের জন্য ওকে আমরা হারাতে তো পারি না, তাই না? তাই ওকে একটু কঠোরভাবে সামলাতে হয়। কেননা বাকিদের ভালোবাসা পেয়ে ও যে হাড়ে বিগড়ে গেছে। আর সবচেয়ে বড় কথা…”
কৌশিক একটু থামল। কৌশিকের কথা শুনে মায়া কাল ফুলিয়ে আছে।
“সব বুঝে গেছি আপনি আমাকে একটুও ভালোবাসেন না হু।”
সে মায়ার কথা শুনে ঠোঁট টিপে মুচকি হাসল। মায়ার চোখের মনিতে নিজের চোখ দুটো ডুবিয়ে দিয়ে কৌশক অত্যন্ত গভীর গলায় বলল,
“আমি তোমাকে আমার জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসি।তোমার ক্ষেত্রে হারাতে শব্দটাও আমি উচ্চারণ করতে চাই না। আমার সবটা পাগলামি শুধু আমার এই মায়াবিনী পরীর জন্য। তিয়াশা আমার বোন, ওর সুরক্ষা আমার দায়িত্ব। কিন্তু তুমি আমার জীবন, মায়া। তোমার গায়ে যদি একটা আঁচও লাগে, তবে এই কৌশিক চৌধুরী পুরো শহর জ্বালিয়ে ছারখার করে দেবে। এই বেপরোয়া, ছন্নছাড়া আমিটা শুধু তোমাকেই ভালোবাসে। তোমার কাছে তোমাকে ছাড়া আমার আর কিছু চাওয়ার নেই। তোমার ‘আমিটা’ শুধু তোমাতেই বরাদ্দ।”
কৌশিকের এই তীব্র ভালোবাসার গভীরতা দেখে মায়ার চোখের কোণটা সামান্য ভিজে উঠল। ভেতরে ভেতরে তার মন চেনে উঠল। এই মানুষটা তাকে কতটা পাগলের মতো ভালোবাসে। সে কৌশিকের শার্টের কলারটা নিজের আঙুলের মাঝে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে বুকের ভাজে নিজের মুখটা লুকিয়ে ফেলল।
মায়া গাল ফুলিয়ে বলল,
প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৩২
“আর আমিও আপনাকে ছেড়ে কক্ষণো কোথাও যাব না। আমি আপনার এই ভালোবাসার কয়েদখানাতেই সারাজীবন বন্দি থাকতে চাই। এখান থেকে এক চুল পরিমাণও নড়বো না আমি বলে দিলাম হু।”
কৌশিক আলতো করে হাসল। সে মায়ার থুতনিটা ধরে মুখটা ওপরে তুলল। জোছনার আলোয় মায়ার সেই লেপ্টে যাওয়া কাজলের চোখ কৌশিকের ভেতরের সেই আদিম পুরুষালি কামনার আগুনকে আর একবার জ্বালিয়ে দিল। সে ধীরে ধীরে নিজের মুখটা মায়ার ঠোঁটের খুব কাছে নিয়ে এল। মায়া চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলল। সে জানত, এই অসভ্য পুরুষের ভালোবাসার ঘোর থেকে পালানোর কোনো ফন্দি বা বাহানা কোন কিছুই কাজ করবে না। কৌশিক মায়ার কপালে আলতো করে একটা চুমু খেলো।
