Home প্রণয়ের নব্য সূচনা প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ১২

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ১২

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ১২
insia isha chowdhury

কানাডার রাজধানী Ottawa শহরটি তার সৌন্দর্য, পরিচ্ছন্নতা ও কর্মব্যস্ত জীবনের জন্য পরিচিত। আধুনিক স্থাপত্য, প্রশস্ত সড়ক আর ছন্দময় নগরজীবনের ভিড়ে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের স্বপ্নের পথচলা গড়ে ওঠে এই শহরে।
সেই ব্যস্ত শহরেই একটি প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজার পদে কর্মরত রাফি। প্রায় দুই বছর ধরে সে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। কাজের চাপ, দায়িত্ব আর সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে দেশে ফেরা হয়ে ওঠেনি বললেই চলে। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছেটা বহুদিন ধরেই বুকের ভেতর জমে ছিল। তাই এবার সে অনেক ভেবেচিন্তে, সবকিছু গুছিয়ে, ছুটির আবেদন নিয়ে এসেছে।

বর্তমানে সে তার বসের কেবিনে দাঁড়িয়ে আছে।
কেবিনজুড়ে থমথমে এক নীরবতা। বড় কাচের জানালা দিয়ে বিকেলের আলো ভেতরে এসে পড়েছে। দেয়ালে টাঙানো ঘড়ির টিকটিক শব্দটাও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।
রাফি অজান্তেই নিজের দুই হাতের আঙুল নাড়াচাড়া করছিল। তার ভেতরের অস্থিরতাটা বারবার সেই ছোট্ট অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছিল। চোখের দৃষ্টি কখনো ডেস্কের ওপর ছড়িয়ে থাকা ফাইলগুলোর দিকে যাচ্ছে, কখনো আবার সামনে বসে থাকা মানুষটির দিকে। তার বস কাগজপত্রে চোখ বুলিয়ে যাচ্ছেন। মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। সেই নির্লিপ্ত চেহারা দেখে রাফির বুকের ভেতর ধুকপুকানিটা আরও বেড়ে গেল।
দুই বছর ধরে কাজ করতে করতে সে খুব ভালো করেই বুঝে গেছে এই মানুষটিকে দেখে তার মনের ভাব বোঝা প্রায় অসম্ভব। তিনি খুশি না বিরক্ত, সম্মতি দেবেন না প্রত্যাখ্যান করবেন। তা মুখ দেখে কিছুই আন্দাজ করা যায় না।
রাফি নিঃশব্দে একবার ঢোক গিলল। তারপর আবার বসের দিকে তাকাল। মনে মনে শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে,
“আজ কি সে ছুটি পাবে?”

স্টেজজুড়ে তখন আলো-ছায়ার মায়াবী খেলা। অতিথিদের গুঞ্জন ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে এল, কারণ সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো এক দিকে ব্রাইড এন্ট্রির পথে। প্রণয় ইতোমধ্যেই স্টেজে বসে আছে। গাঢ় আলোয় তার সুদর্শন অবয়ব আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে। অথচ বাহ্যিক শান্ত ভাবের আড়ালে তার বুকের ভেতরটা অদ্ভুত এক প্রতীক্ষায় কাঁপছে।
কিছুক্ষণ পর ধীর পায়ে সূচনাকে নিয়ে আসা হলো। মেরুন রঙের ভারী লেহেঙ্গায় তাকে যেন রূপকথার কোনো রাজকন্যার মতো লাগছিল। তবে সৌন্দর্যের এই আড়ম্বরের পেছনে লুকিয়ে ছিল তার ছোট্ট এক যুদ্ধ। প্রায় বারো কেজি ওজনের লেহেঙ্গা আর পায়ে হালকা হাই হিল। তবুও মুখের মৃদু হাসিটুকু একবারের জন্যও ম্লান হতে দিল না সূচনা। পাশে ছিল ঋতু।
ধীরে ধীরে স্টেজের কাছাকাছি পৌঁছাতেই চারপাশের আলো আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ঠিক সিঁড়ির সামনে এসে সূচনা সামান্য থমকে দাঁড়াল। আর সেই মুহূর্তেই প্রণয় নিজের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সমস্ত কোলাহল এক নিমিষে দূরে সরে গেল। সে কয়েক ধাপ এগিয়ে এসে নিঃশব্দে নিজের হাত বাড়িয়ে দিল সূচনার দিকে। তারপর কোনো কথা ছাড়াই সূচনা নিজের হাতটি রাখল প্রণয়ের হাতে। সঙ্গে সঙ্গেই চারদিক থেকে ঝরে পড়তে শুরু করল গোলাপের পাপড়ি। লাল, সাদা আর গোলাপি ফুলের বৃষ্টি তাদের চারপাশে এক স্বপ্নিল আবরণ তৈরি করল। বাতাসে ভেসে বেড়াতে লাগল গোলাপের মিষ্টি সুবাস। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ একের পর এক ঝলসে উঠতে লাগল।

প্রণয় আলতো করে সূচনার হাত শক্ত করে ধরে রাখল,তারপর অত্যন্ত যত্নে তাকে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠিয়ে স্টেজের মাঝখানে নিয়ে গেল। সূচনাকে সাবধানে বসিয়ে দিয়ে নিজেও তার পাশে বসে পড়ল। প্রণয় এক মুহূর্তের জন্য সূচনার দিকে তাকিয়ে রইল। চারপাশের সমস্ত কোলাহল, আলো আর মানুষের ভিড় মুহূর্তেই তার দৃষ্টি থেকে মুছে গেল। চোখের সামনে শুধু সূচনাই রয়ে গেল। আজ তাকে অপূর্ব লাগছে। সাজে-গোজে, অলংকারে, মৃদু হাসিতে। সব মিলিয়ে যেন রূপকথার কোনো পুতুল। তবে প্রণয়ের মনে হলো, এই মেয়েটির নাম পুতুল রাখলে ঠিক মন্দ হয় না।
একটু ঝুঁকে এসে নিচু স্বরে সে বলল,
“সূচনা, তোমাকে আজ ভীষণ সুন্দর লাগছে। একদম পুতুলের মতো। তবে একটা কথা বলি? আমার কাছে তোমাকে মেকআপ ছাড়াই আরও বেশি সুন্দর লাগে।”
এখন তাদের ফটোশুট চলছে। একের পর এক অতিথি এসে শুভেচ্ছা জানাচ্ছিল, উপহার তুলে দিচ্ছিল, আর নবদম্পতির সঙ্গে ছবি তুলে চলে যাচ্ছিল। সেই ব্যস্ততার মাঝেও সূচনা প্রণয়ের কথা শুনে মৃদু হেসে ফেলল। তবে তার চোখে খেলে গেল দুষ্টু এক ঝিলিক।
সেও নিচু স্বরে জবাব দিল,

“এইসব মিষ্টি কথা বলে লাভ নেই। আমি কিন্তু বুঝতে পারছি, নিজের টাকা বাঁচানোর জন্যই এসব বলছেন। যেন আমাকে মেকআপ কিনে দিতে না হয়! কিন্তু শুনে রাখুন, আমি এসব প্রশংসায় গলে যাওয়ার মেয়ে নই। মেকআপ কিন্তু কিনে দিতেই হবে।”
কথাগুলো বলে সে ঠোঁট চেপে হাসল। প্রণয় কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। সে তো শুধু মন থেকে প্রশংসা করেছিল, অথচ তার কথার মানে কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে! কী উত্তর দেওয়া উচিত, সেটাই যেন বুঝে উঠতে পারল না। ওর অসহায় মুখভঙ্গি দেখে সূচনার হাসি আরও একটু গভীর হলো। ঠিক তখনই তার দৃষ্টি গিয়ে থামল সামনের দিকে। মুহূর্তেই সূচনার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল আনন্দে। প্রীতি এসেছে। নিজের সবচেয়ে প্রিয় বান্ধবীকে দেখেই সূচনার চোখ-মুখে উচ্ছ্বাসের ঝলক ফুটে উঠল। বিয়ের সময় প্রীতি আসতে পারেনি বলে সে কম রাগ দেখায়নি। গতকাল প্রীতিকে মেসেজ দিয়েছিল,
“আমার বিয়েতে আসিসনি, ঠিক আছে। কিন্তু বউভাতের দিন যদি না আসিস, তাহলে তোর সঙ্গে আমি আর কোনোদিন কথা বলব না!”

সেই হুমকি যে কাজে দিয়েছে, তা প্রীতিকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে। হাতে সুন্দর করে মোড়ানো একটি উপহার আর একগুচ্ছ ফুল নিয়ে সে ধীরে ধীরে স্টেজের দিকে এগিয়ে এল। চারপাশের ভিড় ঠেলে যখন সে একেবারে কাছে পৌঁছাল, সূচনা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। আনন্দে ছুটে গিয়ে প্রীতিকে জড়িয়ে ধরল। এদিকে প্রণয়ও ভদ্রতা রক্ষা করে উঠে দাঁড়িয়েছে। সূচনার গাল হালকা লাল হয়ে উঠল। লাজুক চোখে একবার প্রণয়ের দিকে তাকিয়ে আবার প্রীতির দিকে ফিরে সে নরম কণ্ঠে বলল,
“প্রীতি… উনি…মানে… উনি আমার হাজবেন্ড। আর তোর জিজু।
কথাটা বলার সময় সূচনার কণ্ঠে লাজুকতার স্পর্শ ছিল স্পষ্ট। প্রীতি প্রনয়ের সাথে হালকা কথা বললো।
সূচনার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো তারপর প্রীতি না চাইলেও একটু হেসে ফেলল। তারপর কোনো রকমে হাসিটা চেপে রেখে বলল,

“তুই তো দেখছি প্রণয় স্যারকে “উনি, উনি” বলে ডাকতে শুরু করে দিয়েছিস!”
প্রীতির চোখেমুখে তখন দুষ্টু হাসি খেলা করছে।
সূচনা ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকাল। দেখল, মেয়েটা এখনও হাসছে। অবাক হয়ে সে আস্তে বলল,
“আস্তে কথা বল। আর এত হাসছিস কেন?”
এবার প্রীতি আর নিজেকে সামলাতে পারল না। হালকা হেসে বলল,
“কিছু না রে। আমি শুধু ভাবছি, এই সেই সূচনা, যে কিছুদিন আগেও আমাকে বলেছিল, ‘আমি প্রণয় স্যারের ক্লাস কোনোদিন করব না!’ আর এখন সেই তুই প্রণয় স্যারকে ‘উনি’ বলে ডাকছিস, আবার আমাকে বলছিস উনি আমার জিজু!”
কথাটা শুনে সূচনা একটু রাগ দেখিয়ে বলল,
“ধুর! আজেবাজে কথা বলবি না।”
প্রীতি সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করল,
“আজেবাজে কথা কোথায় বললাম? আমি তো সত্যিই বলছি। তোর মুখে এই “উনি” ডাকটা শুনে আমার খুব অদ্ভুত লাগছে।”

কথাটা বলেই সে আবার হেসে উঠল। প্রীতির অবিরাম হাসি দেখে সূচনা বিরক্ত গলায় বলল,
“এত হাসার কী আছে?”
প্রীতি এবার আরও একটু কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
“হাসছি কারণ তুই সব সময় প্রণয় স্যারকে “প্রণয়ের বাচ্চা, প্রণয়ের বাচ্চা” বলে ডাকিস। অথচ আর কিছুদিন পর তুই নিজেই প্রণয়ের বাচ্চার মা হয়ে যাবি। ভাবতেই আমার হাসি পাচ্ছে!”
কথাটা শুনে সূচনার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
সে আতঙ্কিত দৃষ্টিতে একবার প্রণয়ের দিকে তাকাল। সৌভাগ্যবশত, প্রণয় তখন একটু দূরে দাঁড়িয়ে একজন অতিথির সঙ্গে কথাবার্তায় ব্যস্ত।
সূচনা মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
“ইশ! এই প্রীতিটাও না! মুখে যা আসে তাই বলে দেয়। কথাটা যদি প্রণয় স্যার শুনে ফেলতেন, তাহলে তো ওর লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে হতো!”
ভাবনাটা মাথায় আসতেই সে প্রীতির দিকে কটমট করে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল,

“আরে ছেমরী! ধীরে ধীরে কথা বল। আমার বউভাতের দিনই ডিভোর্স করাবি নাকি?
কথাটা বলেই সে চারপাশে একবার তাকাল, কেউ শুনেছে কি না নিশ্চিত হওয়ার জন্য। ঠিক তখনই প্রণয়ের বন্ধুদের একটি দল এসে উপস্থিত হলো। তাদের মধ্যে প্রণয়ের সবচেয়ে কাছের তিন বন্ধুও ছিল। বিয়ের দিন সূচনা জ্ঞান হারিয়ে ফেলার জন্য কারো সাথে সূচনা তেমনভাবে পরিচয় হওয়ার সুযোগ হয়নি। তাই ওদের এগিয়ে আসতে দেখেই প্রীতি হালকা সরে গিয়ে সূচনার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল।
প্রণয়ও সেই মুহূর্তে অদৃশ্য কোনো অধিকারে সূচনার এক হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিল।
তিন বন্ধুর মধ্যে রাজাই প্রথম এগিয়ে এসে হাসিমুখে বলল,
“আরে ভাবি, কেমন আছেন? আপনার সঙ্গে তো এখনও ঠিকমতো আলাপই হয়ে উঠল না!”
কিছুক্ষণ আগেও সূচনা প্রীতির সঙ্গে গল্প করছিল। কিন্তু কথোপকথনের মাঝেও তার মন যেন কোথাও হারিয়ে ছিল। হঠাৎ নিজের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুটে আসতেই সে বাস্তবে ফিরে এল। কিছু বলার আগেই প্রণয়ের আরেক বন্ধু সোহেল মুচকি হেসে বলে উঠল,

“বাহ প্রণয়! ভাবি তো খুব মিষ্টি। আমাদের বেশ পছন্দ হয়েছে। তা বল তো, বন্ধু বিবাহিত জীবন কেমন কাটছে? ছাত্রী এখন স্ত্রী হয়ে গেছে।অনুভূতিটা কেমন?
কথা শেষ করে সে দুষ্টুমি ভরা ভঙ্গিতে এক চোখ টিপে দিল। প্রণয় হালকা হাসল। তারপর সূচনার হাতটা আরও একটু শক্ত করে ধরে শান্ত দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“Not just my wife… She’s my home. Mrs. Pronoy Mirza.”
কথাগুলো বলার সময় প্রনয়ের চোখে এমন এক প্রশান্তি ছিল, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে আপন মানুষটাকে পাশে পেয়ে সে সম্পূর্ণ হয়ে গেছে।
প্রণয়ের কথায় মুহূর্তের জন্য সবাই চুপ হয়ে গেল। আর সূচনার বুকের ভেতরও যেন অদ্ভুত এক অনুভূতির ঢেউ খেলে গেল। এরপর সে নিজেকে স্বাভাবিক করে সবাইকে সালাম দিল এবং সৌজন্যমূলক কথাবার্তা বলল।
কিন্তু সোহেলের দুষ্টুমি থামার পাত্র নয়। সে এবার প্রীতির দিকে তাকিয়ে প্রণয়কে কনুই দিয়ে খোঁচা মেরে বলল,
“তা এটা কি ভাবির বোন নাকি? নিজে তো ঠিকই বিয়ে করে ফেলেছিস, বন্ধুদের কথাও একটু ভাব!”
প্রণয় এক মুহূর্তের জন্য বুঝতে পারল, সোহেল আসলে প্রীতির কথাই বলছে। তাই গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
“আরে গাধা! তোর ভাবি যেমন আমার স্ত্রী, তেমনি আমার স্টুডেন্টও। আর ওটা প্রীতি। তোর ভাবির বান্ধবী। সেও আমার স্টুডেন্ট।”

সোহেল নির্লজ্জের মতো কাঁধ ঝাঁকাল।
“হ্যাঁ তো, তোর স্টুডেন্ট হতেই পারে। তাতে কি আমার কি? নাম্বারটা ম্যানেজ করে দে!
এবার প্রণয় কড়া চোখে তার দিকে তাকাল।
“Shut up, Sohel.”
প্রণয়ের গম্ভীর মুখ দেখে সোহেল হো হো করে হেসে উঠল। আশেপাশের সবাইও মুচকি হাসল।
এরই মধ্যে সূচনার বাবার বাড়ির আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিত মানুষজন একে একে অনুষ্ঠানস্থলে এসে উপস্থিত হতে শুরু করেছে। নাফিম শিকদারকে দূর থেকে দেখামাত্রই সূচনার বুকের ভেতরটা হঠাৎ করে কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। এতদিন পর নিজের পরিবারের মানুষগুলোকে একসঙ্গে দেখে সে ভীষণ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ল। নাফিম শিকদার আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করলেন না। কাছে এসেই এক বাহু বাড়িয়ে নিজের মেয়েকে বুকে জড়িয়ে নিলেন। সেই পরিচিত আশ্রয়ে মুহূর্তেই সূচনার চোখ ভিজে উঠল। সেও নিঃশব্দে বাবাকে জড়িয়ে ধরল। বাবাকে ছাড়তেই রোহিত প্রায় দৌড়ে এসে সূচনার সামনে দাঁড়াল।

“ফুপি!”
উচ্ছ্বাসে ভরা কণ্ঠ শুনে সূচনার মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে আদর করে রোহিতের চুল এলোমেলো করে দিল। রোহিতো তার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রইল। এদিকে প্রণয় এগিয়ে গিয়ে নাফিম শিকদারের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল। ঠিক তখনই সূচনার ভাই হৃদয় এবং ভাবী তামান্না তার কাছে এসে দাঁড়াল। সূচনার চোখের কোণে জমে থাকা জল দেখে হৃদয় মুচকি হেসে নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে বোনের চোখের পানি মুছে দিল। তারপর আগের মতোই খুনসুটির ভঙ্গিতে বলল,
“আরে আমার বোন, তুই শ্বশুরবাড়ি এসেও কেঁদে যাচ্ছিস?”
সূচনা সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁট ফুলিয়ে অভিমানী গলায় বলল,
“উফ ভাইয়া! তুমি আমাকে এসব বলা বন্ধ করবে? কতদিন পর তোমাদের দেখলাম। তাই একটু ইমোশনাল হয়ে গিয়েছিলাম।”

“আচ্ছা আচ্ছা, ঠিক আছে। আমরাও তোকে অনেক মিস করেছি।”
ভাইয়ের কথায় সূচনার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। হঠাৎ কিছু মনে পড়তেই সে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল,
“ভাইয়া জানো? আমি আমার শ্বশুরবাড়িতে সবাইকে আলুর পরোটা বানিয়ে খাইয়েছি!”
হৃদয় এক সেকেন্ডও সময় নিল না। সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল,
“ওটা সবাই খেতে পেরেছিল তো?”
কয়েক সেকেন্ডের নীরবতার পর সূচনার চোখ বড় বড় হয়ে গেল।
“ভাইয়ায়ায়ায়া!”
দাঁত চেপে রাগ দেখানোর চেষ্টা করলেও তার মুখের অভিমানী ভাব দেখে হৃদয়ে হেসে ফেলল।
তামান্না মাথা নেড়ে বলল,
“আরে, কী শুরু করেছো? তোমার এই স্বভাবটা আর গেল না! ওকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে আমাদের দেখে ও কতটা খুশি হয়েছে, আর তুমি এসেই ওকে জ্বালানো শুরু করে দিয়েছো।”
হৃদয় এবার হেসে সূচনার এক হাত নিজের হাতে নিয়ে বলল,

“আচ্ছা বাবা, আর বলব না। আমি তো আমার বোনটার সঙ্গে একটু মজা করছিলাম। জানো, কতটা মিস করেছি আমি আমার ছোট বোনটাকে?
সূচনা আর কিছু বলল না। শুধু নিঃশব্দে তার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। অনুষ্ঠান বেশ ভালো মতোই শুরু হয়ে গেছে। সকল অতিথিদের খাওয়া-দাওয়া চলছে, চলছে হাসি-আড্ডা আর গল্পগুজব। ধীরে ধীরে সময়ের সঙ্গে অনুষ্ঠানও প্রায় শেষ পর্যায়ের দিকে এগিয়ে এলো।
ঠিক এমন সময় মির্জা বাড়ির সামনে এসে থামল একটি গাড়ি। গাড়ির দরজা খুলে ধীরে ধীরে নিচে নামল সুপ্তি। তার চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। আসলে এখানে আসার কোনো ইচ্ছাই তার ছিল না। বিভিন্ন অজুহাতে সে বারবার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা ধরে একের পর এক ফোন-কল আর চাপের কাছে শেষ পর্যন্ত তাকে হার মানতেই হয়েছে। একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিল সে। তারপর ধীর পায়ে মির্জা বাড়ির ভেতরের দিকে এগিয়ে গেল।

নিলুফা খাতুন নিজের ঘরে চুপচাপ বসে ছিলেন। সামনে ছড়িয়ে রাখা ছিল ড্রয়ার থেকে বের করা তার প্রিয় নেকলেসগুলোর সংগ্রহ। একেকটা নেকলেস হাতে তুলে নিয়ে তিনি মনোযোগ দিয়ে দেখছিলেন।
ঠিক তখনই হঠাৎ তার ফোনটা বেজে উঠল।
স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নামটা দেখতেই নিলুফার মুখে উজ্জ্বল হাসি ফুটে উঠল। চোখেমুখে আনন্দের ছাপ নিয়ে তাড়াতাড়ি ফোন রিসিভ করে তিনি স্নেহভরা কণ্ঠে বললেন,
“আমার বাবা এখন কী করছে?”
ওপাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গেই ভেসে এলো রাফির উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ,
“মম, আমি আজ অনেক বেশি খুশি!”

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ১১

গত কয়েকদিন ধরে পরিবারের চারপাশে ঘটে যাওয়া সুখের ঘটনাগুলো নিলুফার মনকেও আনন্দে ভরিয়ে রেখেছিল। তাই ছেলের কণ্ঠে এতটা উচ্ছ্বাস শুনে তিনি মৃদু হেসে বললেন,
“তাই নাকি? আচ্ছা, আমার বাবা কী কারণে এত খুশি হয়েছে, সেটা কি তার মাকেও কি একটু বলবে?”
রাফির কণ্ঠে উত্তেজনা যেন আরও বেড়ে গেল।
“মা, আমি কালই বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা দেব। ফাইনালি… আমি দেশে ফিরছি!”

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ১৩