Home প্রণয়ের নব্য সূচনা প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ২৪

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ২৪

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ২৪
insia isha chowdhury

ড্রয়িংরুমে এসে সূচনা প্রণয়ের হাত ছাড়িয়ে সোজা ঋতুর কাছে চলে গেল। ওর ভীষণ খারাপ লাগছে। বারবার মনে হচ্ছে, রাফির জন্যই ঋতুকে এমন অপ্রত্যাশিত ঝামেলার মুখোমুখি হতে হয়েছে। মনে মনে বিড়বিড় করে বলল,
“এই রাফি ভাইয়াটা সত্যিই একটা পাগল! এভাবে কেউ কোনো মেয়ের সঙ্গে আচরণ করে? যতই রাগ হোক, মানুষের ন্যূনতম কমন সেন্স তো থাকা উচিত!”

এদিকে বাড়িতে এতজন অতিথি এসেছে। সবকিছু সামলানোর মতো তেমন কেউ নেই ভেবে ঋতু রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। সূচনাকে একা এত কাজ করতে দেওয়া যায় না। সূচনাও ঋতুর পিছু পিছু রান্নাঘরে ঢুকল। ওদের দুজনকে যেতে দেখে সুপ্তিও আর দেরি করল না, সেও রান্নাঘরে চলে এল। রান্নাঘরে এসে ঋতু ফ্রিজ খুলে একটি সফট ড্রিংক বের করতেই সূচনা ওর এক বাহুতে আলতো করে হাত রেখে বলল,
“আমি সত্যিই খুব দুঃখিত, ঋতু। রাফি ভাইয়ার হয়ে আমি তোর কাছে ক্ষমা চাইছি।
এতক্ষণ তর্ক-বিতর্ক আর কথা বলার কারণে ঋতুর গলা একেবারে শুকিয়ে গিয়েছিল। সে চেয়ারে বসে ধীরে ধীরে সফট ড্রিংকটা খেয়ে সূচনার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আরে, তুই কেন আমাকে সরি বলছিস? পুরো দোষ তো ওই অসভ্য লোকটার… কী যেন নাম? হ্যাঁ, রাফি! সব দোষ ওই রাফির।”
সূচনা ঠোঁট উল্টে মৃদু স্বরে বলল,

“সেই জন্যই তো আমি ক্ষমা চাইছি।”
ঋতু উঠে দাঁড়িয়ে হেসে বলল,
“তুই আমার ভাবি হওয়ার আগেই আমার অনেক ভালো বন্ধু ছিলি। আর তুই তো জানিস, বন্ধুত্বে নো সরি, নো থ্যাঙ্ক ইউ।”
সূচনার মুখটা মুহূর্তেই এইটুকুন ছোট হয়ে আছে। ওর সেই অভিমানী চেহারা দেখে ঋতু হেসে ওকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“আরে পাগলি, তুই মন খারাপ করছিস কেন? আমার রাগ তো ওই শালা রাফির ওপর। তোকে তো আমি কিছুই বলিনি। তাহলে তুই কেন এত ভাবছিস?”
ঠিক তখনই রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে থাকা সুপ্তির দিকে চোখ পড়তেই ঋতু বলল,
“সরি, সুপ্তি। আমার জন্য তোকে ভাইয়ার কাছে বকা খেতে হলো।”
সুপ্তি দু’হাত বুকের ওপর ভাঁজ করে হালকা হাসি দিয়ে বলল,
“এই তো এতক্ষণ তুই সূচনাকে বলছিলি, বন্ধুত্বে নো সরি, নো থ্যাঙ্ক ইউ। আমাদের সম্পর্ক তো ঠিক বোনের মতো, আর বন্ধুত্বটাই বেশি। তাহলে তুই আমাকে সরি বলছিস কেন? আর প্রণয় আমাদের বড়। ও একটু বকা দিতেই পারে।”

ঋতু এগিয়ে গিয়ে সুপ্তিকে জড়িয়ে ধরে হেসে বলল,
“এই জন্যই তোকে আমার এত ভালো লাগে!”
ঋতুর কথা শুনে সুপ্তিও হেসে ফেলল। পাশে দাঁড়িয়ে সূচনা মুগ্ধ চোখে ওদের দুজনের খুনসুটি দেখছিল। ইতিমধ্যে রাতও বেশ হয়ে এসেছে। সবাই যেহেতু এসে গেছে, সূচনা দ্রুত খাবারগুলো সুন্দর করে সাজাতে শুরু করল। ও একাই সবকিছু সামলানোর চেষ্টা করছিল। ঠিক তখনই ঋতু আর সুপ্তি এগিয়ে এসে ওকে সাহায্য করতে শুরু করল। সূচনা হালকা আপত্তির সুরে বলল,
“আরে, আমি তো করছি। তোরা কষ্ট করছিস কেন?”
ঋতু সঙ্গে সঙ্গে বলল,

“চুপ কর! তুই একা একা সব কাজ করবি কেন? আমরাও তো আছি। আমরা সবাই মিলে করব।”
সুপ্তিও সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়ল। এরপর তিনজন একসঙ্গে সুন্দরভাবে সব কাজ করতে লাগল। অন্যদিকে রাফি কাউচে বসে শুধু এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে, কিন্তু সূচনাকে কোথাও দেখতে পেল না। রাফির ঠিক সামনের সোফায় বসে আছে শুভ, সোহেল, রনি, রাজা আর প্রণয়।
শুভ সোহেলকে জিজ্ঞেস করল, “এই হালায় আবার কে?”
সোহেল একবার প্রণয়ের দিকে তাকাল, তারপর আবার রাফির দিকে তাকিয়ে বলল,
“আরে, তোদের ট্রেইলার বলে কী লাভ? তোরা তো পুরো সিনেমাটাই মিস করেছিস!”
রাজা কৌতূহলী হয়ে বলল,
“মানে? কী হয়েছিল?”
সোহেল আস্তে ধীরে বলল,

“আর বলিস না! একেই তো আমাদের বন্ধু প্রণয়ের অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ হয়েছে, তার ওপর আবার এই শালা আমাদের ভাবীকেই পটাতে চাইছে। বাড়িতে এসেই “সুজি, সুজি” শুরু করে দিয়েছে।”
প্রণয় কড়া চোখে সোহেলের দিকে তাকাল।
এই মুহূর্তগুলো প্রণয়ের কাছে ভীষণ বিরক্তিকর লাগছে। একটুও ভালো লাগছে না তার। এই রাফিকে প্রণয়ের একদমই সহ্য হচ্ছে না। ইচ্ছে করছে এক লাথি মেরে বাড়ি থেকে বের করে দিতে। কিন্তু পারছে না। কারণ এখন তারা এমন এক সম্পর্কে জড়িয়ে আছে, যেখানে চাইলেও সে এসব করতে পারে না। যতবার রাফি সূচনাকে “সুজি” বলে ডেকেছে, ততবারই প্রণয়ের মনে হয়েছে রাফিটাকে ইচ্ছেমতো ক্যালাতে। পুরো রাফির অস্তিত্বটাই এই মুহূর্তে প্রণয়ের কাছে চরম বিরক্তিকর লাগছে।
শুভ আর রনি বিস্মিত হয়ে বলল,
“কী বলিস! এর সাহস কত বড়! শেষমেশ কিনা আমাদের ভাবীকেই পটাতে চাইছে?”
কথাটা বলেই দুজন উঠে দাঁড়াল। তারপর রাফির দুই পাশে গিয়ে বসে পড়ল। এতে রাফি বেশ বিব্রত বোধ করল। শুভ হেসে বলল,

“কেমন আছেন, মিস্টার রাফি? আপনার মুখ থেকে ‘আপনি কেমন আছেন’ শোনার আগে একটা কথা বলে নিই, অন্যের ক্ষতি করতে গেলে, শেষ পর্যন্ত নিজেরই ক্ষতি বেশি হয়।”
শুভর কথা শেষ না হতেই রনি বলে উঠল,
“ভালো হয়ে যান। ভালো হতে কিন্তু কোনো পয়সা লাগে না!”
রাফি অতিরিক্ত ক্রোধ নিয়ে বলল,
“আপনাদের মাথায় কী সমস্যা আছে?”
পরমুহূর্তেই প্রণয় খেয়াল করল, ড্রয়িং রুমে এখন শুধু সে আর তার বন্ধুরাই আছে। সুযোগটা হাতছাড়া না করে মুহূর্তের মধ্যেই সে এগিয়ে গিয়ে রাফির কলার চেপে ধরল। দাঁতে দাঁত চেপে চাপা স্বরে বলল,
“শালা, তোকে এখনই বোঝাচ্ছি আমাদের মাথায় সমস্যা আছে, নাকি তোর!”

কথাটা বলেই প্রণয় দুই হাতে রাফির গলা চেপে ধরল। ক্রমশ রাফির নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে লাগল। মুখের রং ফ্যাকাশে হয়ে গেল, চোখ দুটোও উল্টে যাওয়ার উপক্রম। কিন্তু প্রণয়ের মধ্যে বিন্দুমাত্র দয়া কাজ করছে না। বরং মনে হচ্ছে, আজ সে রাফিকে মেরেই ফেলবে।
ঠিক তখনই হঠাৎ সূচনার কণ্ঠস্বর কানে আসতেই প্রণয় নিজের ভাবনা থেকে বাস্তবে ফিরে এল।
এগুলো সবই ছিল তার কল্পনা। সত্যিই যদি এমনটা করতে পারত, তাহলে হয়তো মনটা কিছুটা শান্ত হতো। কিন্তু আফসোস, সে কিছুই করতে পারল না। এদিকে সূচনা সবার উদ্দেশে বলল,
“আপনারা সবাই ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বসুন। এখনই খাবার পরিবেশন করা হবে।”
সূচনাকে দেখেই রাফি তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল। ওর খুব ইচ্ছে করছিল সূচনার সঙ্গে একটু কথা বলতে। কিন্তু এতক্ষণ ধরে একের পর এক ঝামেলায় সে সেই সুযোগটাই পাচ্ছে না। যখনই মনে হচ্ছে এবার হয়তো কথা বলতে পারবে, তখনই কোথা থেকে নতুন কোনো ঝামেলা এসে হাজির হচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত সূচনার কথা শুনে বাধ্য হয়েই সবাই ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বসে পড়ল।

সবাই একসঙ্গে ডাইনিং টেবিলে বসে খাওয়া-দাওয়া করছিল। এদিকে সূচনা, ঋতু আর সুপ্তি তিনজন মিলে ব্যস্ত হাতে সবার প্লেটে খাবার পরিবেশন করছে। রাফি মনে মনে ঠিক করে রেখেছে, খাওয়া শেষ হলেই সে সূচনার সঙ্গে একান্তে কিছু কথা বলবে। আজকের পুরো রান্নাটাই করেছে সূচনা। মেনুতে ছিল সুগন্ধি বিরিয়ানি, নরম কাবাব আর সুস্বাদু ডিমের কোরমা। সময় খুব বেশি না পেলেও যতটুকু পেরেছে, মন দিয়ে সবকিছুই বানিয়েছে। অবশ্য পুরো সময়টাই প্রণয় ছায়ার মতো পাশে থেকে তাকে সাহায্য করেছে। বলতে গেলে, রান্নাটা দু’জনের যৌথ পরিশ্রমেরই ফল।
খাওয়া শুরু হতেই সূচনা একটু ইতস্তত করে সবার দিকে তাকিয়ে বলল,
“কেমন হয়েছে রান্না? আসলে আমি আগে কখনো একসঙ্গে এতগুলো আইটেম রান্না করিনি। সত্যি করে বলবেন সবাই খেতে কেমন হয়েছে?”
সূচনার প্রশ্নটা করতে একটু দেরি হলেও, উত্তর দিতে কারও একটুও দেরি হলো না।

“একদম ফার্স্ট ক্লাস, ভাবি! অসাধারণ হয়েছে।”
সবাই আনন্দ করে খাচ্ছে, কিন্তু রাফির প্লেট প্রায় যেমন ছিল, তেমনই রয়ে গেছে। সে চামচে করে অল্প একটু বিরিয়ানি মুখে দিতেই মুহূর্তের মধ্যে তার মুখের অভিব্যক্তি পাল্টে গেল। বিস্ময় আর অস্বস্তি একসঙ্গে ভর করল তার চোখেমুখে।
এত লবণ! মনে হলো যেন পুরো বিরিয়ানিটাই লবণে ডুবিয়ে রাখা হয়েছে। কোনোরকমে মুখের ভাতটা গিলে না ফেলে পাশের টিস্যু টেনে নিয়ে চুপিচুপি সেটার ভেতরেই ফেলে দিল।
রাফির এই অস্বস্তিটা অন্য কারও চোখে না পড়লেও, ঋতুর চোখ এড়াল না। ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি টেনে সে বলল,
“কী ব্যাপার, বেয়াই সাহেব? খাবারটা কি আপনার পছন্দ হয়নি?”
হঠাৎ এমন প্রশ্নে রাফি বিস্মিত চোখে ঋতুর দিকে তাকাল। টেবিলে বসা কয়েকজনও একবার ঋতুর দিকে তাকিয়ে আবার নিজেদের খাওয়ায় মন দিল।
ঋতু আবারও মুচকি হেসে বলল,
“বুঝলেন রাফি সাহেব, এই খাবার কিন্তু আপনার ‘সুজি’… মানে, সূচনাই নিজের হাতে রান্না করেছে। তাহলে কি আপনার খাবারটা একদমই ভালো লাগেনি?”
রাফি মনে মনে ভাবলো,

“এ লবণাক্ত খাবার কিভাবে ভালো লাগতে পারে?
আর সব থেকে বড় কথা সবাই এই লবণাক্ত খাবার খাচ্ছে কিভাবে?”
ঋতুর কথা শুনে সূচনাও উদ্বিগ্ন হয়ে রাফির দিকে তাকাল। আর বলল,
“কেন ভাইয়া? কোনো সমস্যা হয়েছে? খাবারটা কি তোমার পছন্দ হয়নি?”
রাফি মুহূর্তেই দারুণ অস্বস্তিতে পড়ে গেল। চারপাশে তাকিয়ে দেখল সবাই বেশ তৃপ্তি করে খাচ্ছে। অথচ তার প্লেটের বিরিয়ানিতে এত লবণ যে সেটা মুখে দেওয়াই কঠিন। ব্যাপারটা কিছুতেই তার মাথায় ঢুকছে না। সে সাহস করে কাবাবের এক টুকরো মুখে দিল। এটা একদম স্বাভাবিক।
রাফি ধীরে ধীরে কাঁটা-চামচটা শক্ত করে চেপে ধরল। তারপর চোখ তুলে ঋতুর দিকে তাকাতেই সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেল। এটা ঋতুরই কাজ।
ওর প্লেটের খাবারে আলাদা করে লবণ মিশিয়ে দিয়েছে ঋতু। এদিকে রাফিকে এভাবে জব্দ করতে পেরে ঋতুর ভেতরটা আনন্দে নেচে উঠল।
মনে মনে সে বলল,

“দেখ অসভ্য, এবার কেমন লাগে! তোর জন্যই আমার ভাই আমাকে বকা দিয়েছে। এবার বসে বসে এই লবণাক্ত খাবার খা।”
সুপ্তি সোহেলের পাশে বসে থাকা রনির প্লেটে একটি কাবাব তুলে দিতেই রনি সেটি মুখে দেওয়ার জন্য হাত বাড়াল। কিন্তু তার আগেই সোহেল এক ঝটকায় কাবাবটা রনির প্লেট থেকে তুলে নিয়ে নিজের মুখে পুরে ফেলল।
চিবোতে চিবোতেই দুষ্টু হাসি হেসে বলল,
“এটা যেহেতু সুপ্তি দিয়েছে, তাহলে এটা আমিই খাব।”
সোহেলের এমন নির্লজ্জ কাণ্ড দেখে রনি কয়েক মুহূর্ত অসহায় দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ঠোঁট বাঁকিয়ে কিছু না বলেই সোহেলের প্লেট থেকে আরেকটি কাবাব তুলে নিয়ে দিব্যি খেয়ে ফেলল। খাওয়া শেষ করে শান্ত গলায় বলল,
“ঠিক আছে, কোনো সমস্যা নেই। তোরটা আমিই খেয়ে নিলাম।”

নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে রাফি। ও কোনভাবেই চাইছে না এই কথা বলতে যে তার খাবারে লবণাক্ত। এটা শুনলে সূচনার নিশ্চয়ই মন খারাপ হবে। রাফি সূচনার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
“খাবার খুবই সুন্দর হয়েছে। কিন্তু আসলে আমার পেট আগেই ভরা ছিল। তাই আর খেতে পারছি না।”
সূচনা বিস্মিত হয়ে বলল,
“আরে ভাইয়া, এসব কী বলছ! তুমি এমন কী খেয়েছ যে এখনো তোমার পেট ভরা?”
ঠিক তখনই প্রণয় চামচটা নামিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“কেউ খেতে না চাইলে তাকে জোর করার দরকার নেই, সূচনা।”
প্রণয়ের কথা শুনে আর কিছু বলল না সূচনা।
তবে জেদের বশে রাফি আরও কয়েক চামচ বিরিয়ানি মুখে তুলল। কিন্তু খাবার আর গলা দিয়ে নামল না। মনে হচ্ছিল, প্রতিটা লোকমার সঙ্গে একমুঠো লবণ গিলছে। অবশেষে সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

“ওয়াশরুমটা কোন দিকে?”
ঋতু সঙ্গে সঙ্গে হাত তুলে পথটা দেখিয়ে দিল।
রাফি দ্রুত ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল। দরজা বন্ধ করতেই আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
পরমুহূর্তেই ঝুঁকে পড়ে বমি করে দিল। রাফি চোখে-মুখে পানির ছিটা দিল। তারপর মুখে পানি নিয়ে গড়গড় করে কুলি করল। বেশ খানিকটা সময় পর সে বাথরুম থেকে বের হয়ে ড্রয়িংরুমে এসে দেখল, মোটামুটি সবারই খাওয়া-দাওয়া শেষ।
রাফিকে দেখে সূচনা বলল,
“ভাইয়া, তুমি তো তেমন কিছুই খেলে না!”
রাফি বলল,
“না, কিছু না। আসলে আমি তোর সঙ্গে…”
রাফি আরও কিছু বলবে, তার আগেই প্রণয় বলে উঠল,
“হ্যাঁ, আমরা বুঝেছি তুমি আসলে কী বলতে চাচ্ছ। এখন অনেক রাত হয়ে গেছে, আর তোমার হয়তো শরীরও খারাপ লাগছে। তাই তুমি বাসায় যেতে চাচ্ছ।”

সূচনা বুঝল সত্যিই অনেক রাত হয়ে গেছে। তাই সে প্রণয়ের কথা শুনে রাফিকে বলল,
“আচ্ছা ভাইয়া, সমস্যা নেই। তোমার যেহেতু শরীর খারাপ, তুমি এখন বাসায় চলে যেতে পারো। না হলে মামি আবার চিন্তা করতে পারে।”
সূচনা কথাটা শেষ করতেই ঋতু সূচনার হাত ধরে বলল,
“চল, আমরা সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে তিনজন বসে একসঙ্গে খেয়ে নিই।”
ব্যাস, সূচনা ঋতুর সঙ্গে চলে গেল। রাফি পেছন থেকে সূচনাকে ডাকবে, তার আগেই প্রণয় রাফির এক বাহুতে হাত রেখে তাকে থামিয়ে দিল।
তারপর বলল,
“চলো রাফি, আমি তোমাকে এগিয়ে দিচ্ছি।”
রাফি নিজের বাহু থেকে প্রণয়ের হাত সরিয়ে দিয়ে রাগী গলায় বলল,
“আমি সুজির সঙ্গে কথা বলতে চাই।”
রাফির মুখে এমন কথা শুনে প্রণয়ের বাকি বন্ধুরা বলল,
“প্রণয়, আপাতত এই গাধাটাকে তুই সামলা। আমরা একটু হেঁটে আসছি।”
প্রণয় নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণ করে বলল,
“ওর নাম সূচনা, সুজি না। আর ও তোমার সম্পর্কে বোন হয়, আর তুমি ওর সম্পর্কে ভাই। এই কারণেই তুমি আমার হাত থেকে বেঁচে যাচ্ছ।”
রাফি ঠান্ডা গলায় বলল,

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ২৩

“আমাদের মধ্যে কী সম্পর্ক, সেটা ঠিক করার তুমি কে?”
প্রণয় তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল,
“আমি কে? আমি ওর হাজব্যান্ড। আর কিছুদিন পর যখন তুই মামা হবি, তখন তুই নিজেই বুঝতে পারবি আমি কে।”
রাফি কিছু বলল না। সে নিজের ওয়ালেট থেকে একটি পুরোনো ছবি বের করে প্রণয়ের দিকে বাড়িয়ে দিল। ছবিটিতে রাফি আর সূচনা। তখন সূচনার বয়স আনুমানিক তিন বছর, আর রাফির বয়স হবে বারো-তেরোর মতো। তারা দুজন সোফায় বসে আছে। সূচনার এক পা রাফির পায়ের ওপর রাখা। ছবিটার দিকে প্রণয় ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। এই ছবি দেখিয়ে রাফি তাকে ঠিক কী বোঝাতে চাইছে? রাফি শান্ত, কোমল কণ্ঠে বলল,
“সুজি সব সময় আমার সঙ্গেই থাকত। ওকে আমি সারাক্ষণ কোলে করে রাখতাম, ঠিক পুতুলের মতো।”
রাফির কথায় প্রণয় বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে ঠোঁটের কোণে তার হালকা হাসি ফুটল। দু’হাত পকেটে রেখে সে বলল,
“তাই নাকি? তবে আমার আর সূচনার বিয়ের পর আমিও সারাক্ষণ ওকে আমার কোলে রাখি। ও নিজেও নামতে চায় না, আর না আমি ওকে নিচে নামাই।”

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ২৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here