প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ২৭
insia isha chowdhury
হাসপাতালের করিডোরের এক পাশে চুপচাপ বসে আছে রাফি। এক দৃষ্টিতে নিজের ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলেও তার মন যেন ফোনের মধ্যে নেই। কিছুক্ষণ পরপরই বিরক্ত চোখে সামনে তাকাচ্ছে, আবার চোখ চলে যাচ্ছে সেই রুমটির দিকে, যেই রুমে ঋতুকে রাখা হয়েছে। রাফির ভীষণ বিরক্ত লাগছে।
লিফটের ভেতরে ঋতুকে সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল সে। কিন্তু আতঙ্কে ঋতু যখন জ্ঞান হারিয়ে ফেলল, তখন আর এক মুহূর্তও দেরি করার সুযোগ ছিল না। কোনো রকমে তাকে নিয়ে ইমার্জেন্সিতে ছুটে আসতে হয়েছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, ঋতুর পরিবারের কারও নম্বরই তার কাছে নেই। সূচনার নম্বরে কয়েকবার ফোন দেওয়ার চেষ্টা করেছে, কিন্তু প্রতিবারই বোঝা যাচ্ছে রাফিকে ব্লক করা হয়েছে। তার ওপর এত কিছুর মধ্যে ঋতুর ফোনটাও সেই লিফটের ভেতর ফেলে এসেছে সে।
তখন ফোনের কথা মাথায় আসার মতো পরিস্থিতিই ছিল না। মেয়েটাকে সামলানোই ছিল সবচেয়ে জরুরি।
ডাক্তার ইতিমধ্যে জানিয়েছেন, অতিরিক্ত ভয় আর প্যানিকের কারণে ঋতু জ্ঞান হারিয়েছিল। জ্ঞান পুরোপুরি ফিরে এলে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণে রেখে তাকে ডিসচার্জও দিয়ে দেওয়া যাবে। রাফি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই মেয়েটা বাড়িতে তাকে এমনভাবে হেনস্তা করেছে, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অপরাধী সে। অথচ লিফটে সামান্য অন্ধকার হতেই এমন ভয় পেয়ে গেল যে শেষ পর্যন্ত জ্ঞানই হারিয়ে ফেলল! মেয়েটার এমন অন্ধকারভীতি কেন, সেটাই বুঝতে পারছে না রাফি। ঠিক তখনই একজন হাসপাতালের কর্মী এসে বলল,
“স্যার, আপনি যেই মেয়েটাকে নিয়ে এসেছিলেন, তার জ্ঞান ফিরেছে।”
খবরটা শুনে রাফি কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর আর দেরি না করে উঠে দাঁড়িয়ে ঋতুকে রাখা রুমটির দিকে এগিয়ে গেল। রুমে ঢুকতেই দেখল, একজন পুরুষ ডাক্তার ইতিমধ্যেই সেখানে উপস্থিত। ঋতু বিছানায় বসে আছে আর তার মুখভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে, পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর কোনো জিনিস এখন তার সামনে।
রাফিকে দেখেই ডাক্তার বললেন,
“মিস্টার খান, আপনার ওয়াইফ কিছুতেই ইনজেকশন নিতে চাইছেন না। আপনি ওনাকে একটু বোঝান যে ইনজেকশনটা নেওয়া জরুরি।”
ডাক্তারের কথা শুনে রাফি আর ঋতু দুজনেই একসঙ্গে অবাক হয়ে গেল। ডাক্তারকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ঋতু বিরক্ত বোধ করে বলল,
“উনার ওয়াইফ হওয়ার আগে আমি ম’রে যাওয়াই পছন্দ করব!”
ঋতুর কথা শুনে রাফির ভেতরটা মুহূর্তেই বিরক্তিতে ভরে উঠল। কোথায় মেয়েটাকে বাঁচিয়ে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে, একটা ধন্যবাদ দেবে তা না বরং তাকেই কথা শোনাচ্ছে! রাফিও ছাড়ার পাত্র নয়। সেও সঙ্গে সঙ্গেই বলল,
“ঠিকই তো। আমিও মরে যাব, তবুও কোনোদিন একে আমার ওয়াইফ বানাব না। আর ডাক্তার, কোন অ্যাঙ্গেল থেকে আপনার মনে হলো যে এ আমার ওয়াইফ?”
ডাক্তার দুজনের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর মাস্কটা একটু ঠিক করে নিয়ে শান্ত গলায় বললেন,
“একে তো আপনারা যেভাবে ঝগড়া করছেন, তাতে মনে হচ্ছে হাজবেন্ড-ওয়াইফের থেকেও আপনাদের মধ্যে বেশি কিছু আছে। তার ওপর সবচেয়ে বড় ব্যাপার দুজনেই তো কাপলদের মতো একই রঙের পোশাক পরে আছেন!”
ডাক্তারের কথা কানে যেতেই রাফি আর ঋতু দুজনেই একসঙ্গে একে অপরের দিকে তাকাল।
রাফির গায়ে হালকা আকাশি রঙের শার্ট। আর ঋতুর গায়েও একই রঙের কুর্তি।
দুজনের চোখাচোখি হতেই রাফি কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ে গেল। গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
“দেখুন ডাক্তার, ও আমার ওয়াইফ না। আর ঋতু, ডাক্তার যেটা বলছে তাড়াতাড়ি ইনজেকশনটা নিয়ে নাও। আমার একটা জরুরি কাজ আছে।”
ঋতু ইনজেকশনের দিকে তাকিয়ে আবার রাফির দিকে তাকাল। মুহূর্তেই তার মুখটা শুকিয়ে গেল।
“ইনজেকশন নেওয়াটা কি খুবই জরুরি?”
রাফি কিছু বলার আগেই ডাক্তার উত্তর দিলেন,
“অবশ্যই জরুরি। দেখুন মিস, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আপনি রিল্যাক্স থাকুন। ইনজেকশন দেওয়ার সময় আপনি কিছুই টের পাবেন না।”
কিছুক্ষণ ইনজেকশনের দিকে তাকিয়ে থেকে ঋতু অবশেষে মাথা নাড়ল।
“ঠিক আছে, ইনজেকশন নেব। কিন্তু তার আগে আমি আমার আম্মুর সঙ্গে কথা বলব।”
কথাটা বলেই ঋতু নিজের ফোনটা খুঁজতে লাগল। কিন্তু খুঁজে না পেয়ে রাফির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“আমার ফোন কোথায়?”
রাফি একদম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উত্তর দিল,
“তোমার ফোনটা ওই লিফটেই পড়ে আছে।”
কথাটা শুনে ঋতুর চোখ বড় বড় হয়ে গেল।
“কী?!”
তারপর রাগে রাফির দিকে তাকিয়ে ঝাড়ি দিয়ে বলল,
“আপনার কি কোনো কমনসেন্স নেই? আমার ফোনটা ফেলে রেখে চলে আসলেন?”
রাফিও এবার আর চুপ করে থাকল না।
“ও হ্যালো! তখন তুমি অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিলে। তুমি জানো তখন তোমার কী অবস্থা হয়েছিল? কোথায় ফোন পড়ে আছে সেটা খুঁজতে আমি যাব, নাকি তোমাকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটব? কী পরিমাণ ইমার্জেন্সির মধ্যে তোমাকে আমি হাসপাতালে নিয়ে এসেছি, সেটা কি তোমার কোনো ধারণা আছে? অ্যান্ড ইউ শুড বি থ্যাঙ্কফুল টু মি!”
ঋতু সঙ্গে সঙ্গে মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“সে থ্যাংক ইউ পরে বলা যেত। কিন্তু আপনি আমার ফোনটা ফেলে রেখে চলে আসলেন কেন?”
রাফি চোখ কপালে তুলে তাকিয়ে রইল। এই মেয়ের সঙ্গে কথা বলে সত্যিই পারা যায় না!
এবার ডাক্তারই কিছুটা বিরক্ত হয়ে দুজনকে থামিয়ে দিলেন।
“দেখুন, আপনারা পরিবেশটা নষ্ট করছেন। এটা হাসপাতাল। আর মিস ঋতু, আপনাকে এখন ইনজেকশনটা নিতে হবে। কিছুক্ষণ পর আপনাকে ডিসচার্জ দিয়ে দেওয়া হবে। তাই ইনজেকশনটা নিয়ে নিন।”
কথাটা বলেই ডাক্তার ঋতুর হাতে ইনজেকশনটি দিলেন। ইনজেকশন দেখামাত্রই ঋতু চোখ শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল। দুই হাতের আঙুল শক্ত করে চেপে ধরে বসে রইল। ঋতুর এমন অবস্থা দেখে রাফির ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।
মনে মনে বলল,
“এমনিতে তো সব সময় ঝাঁসির রানী সাজে! আর একটা সামান্য ইনজেকশন দেখেই এই অবস্থা!”
আর নিজেকে সামলাতে না পেরে রাফি মুখে হাত চাপা দিয়ে মিটমিট করে হাসতে শুরু করল।
অন্যদিকে সূচনার ক্লাস টেস্ট ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। সবাইকে প্রশ্নপত্র দেওয়া হয়েছে। শ্রেণিকক্ষজুড়ে এখন কেবল পিন পিন নিরবতা। প্রত্যেকেই মনোযোগ দিয়ে উত্তরপত্রে লিখে চলেছে।
সময়ের কাঁটা ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে।
পরীক্ষা প্রায় শেষের দিকে চলে এসেছে। সূচনা বেশ কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে ফেলেছে। কিন্তু কয়েকটি প্রশ্নে এসে আটকে গেছে। বিশেষ করে একটা অংকটা কিছুতেই মিলছে না। বারবার করে দেখছে, আবার মিলিয়ে দেখছে কোথাও না কোথাও ভুল হচ্ছে। বিরক্ত হয়ে উত্তরটা কেটে দিয়ে আবার নতুন করে শুরু করছে।
এভাবেই দেখতে দেখতে পরীক্ষার নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে গেল। প্রণয় সবার কাছ থেকে উত্তরপত্র সংগ্রহ করতে শুরু করল। সূচনার তখনও অংকটা অসম্পূর্ণ। প্রণয় খাতা নিতেই সূচনা মায়াভরা মুখে বলল,
“প্লিজ… আর একটু সময় দিন। এইটুকু বাকি আছে। এটা করেই দিয়ে দিচ্ছি।”
কিন্তু প্রণয়ের মুখে কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না। যেন কিছুই শুনতে পায়নি। পাষাণের মতো নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে সূচনার হাত থেকে খাতাটা নিয়ে নিল।
সূচনার মুখটা মুহূর্তেই মলিন হয়ে গেল। আর মাত্র দুই মিনিট সময় দিলেই তো অংকটা শেষ করতে পারতো! রুটিন অনুযায়ী আজ আর কোনো পরীক্ষা নেই। কিছুক্ষণ পরেই তাদের ছুটি হয়ে যাবে। তবে প্রণয়ের এখনও দুটো লেকচার নেওয়া বাকি। আপাতত কিছুক্ষণের বিরতি চলছে, তারপর আবার ক্লাস শুরু হবে।
খাতা নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় প্রণয় অবশ্যই খেয়াল করল, সূচনার মুখটা ভার হয়ে আছে।
কিছুক্ষণ পর সূচনা ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে কলেজ ভবনের সামনে এসে দাঁড়াল। সে জানে, প্রণয়ের আরও দুটো লেকচার বাকি। তাই তাকে এখন ড্রাইভারই বাড়িতে পৌঁছে দেবে। সূচনা গাড়ির দিকে এগিয়ে যেতেই পেছন থেকে প্রণয় এসে তার হাত চেপে ধরল। হঠাৎ থেমে গিয়ে সূচনা বিস্মিত দৃষ্টিতে প্রণয়ের দিকে তাকাল।
অভিমানী কণ্ঠে বলল,
“আর একটু সময় দিলে কী এমন হতো? ওই অংকটা পুরোটা করতে পারতাম। আপনি এত পাষাণ কেন?”
সূচনার কথা শুনে প্রণয়ের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল। প্রণয়ের হাসি দেখে সূচনার রাগ আরও বেড়ে গেল। প্রণয় শান্ত গলায় বলল,
“দেখো, সুইটহার্ট। তুমি যখন আমার ক্লাসরুমে একজন স্টুডেন্ট হিসেবে আছো, তখন আমার চোখে প্রতিটা স্টুডেন্টই সমান। সবার জন্য যখন সময় শেষ হয়েছে, তার মানে তোমার জন্যও সময় শেষ হয়েছে। এখানে রাগ করার কী আছে?”
সূচনার ভ্রু কুঁচকে গেল।
“রাখুন আপনার সুইটহার্ট! আর কী বলছেন, রাগ করার কী আছে? আর দুই মিনিট দিলেই তো ওই অংকটা কমপ্লিট করতে পারতাম। কিন্তু আপনার জন্য সেটা করতে পারলাম না।”
কথাটা বলেই সূচনা হঠাৎ বাম দিকে তাকাল।
তার চোখ পড়ল কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা রাকিবের ওপর। রাকিব তার বাইক স্টার্ট দিচ্ছে। রাকিব সূচনার ক্লাসমেট। সূচনার চোখেমুখে মুহূর্তেই দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল। প্রণয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আচ্ছা, আপনি তো বললেন, প্রতিটা স্টুডেন্ট আপনার চোখে সমান। তাই তো?”
প্রণয় কোনো কিছু না ভেবেই বলল,
“হ্যাঁ। অবশ্যই। আমার চোখে প্রতিটা স্টুডেন্টই সমান।”
“ঠিক আছে।”
শুধু এটুকু বলেই সূচনা দৌড়ে রাকিবের বাইকের কাছে চলে গেল। প্রণয় কিছুটা অবাক হয়ে তার পেছনে তাকিয়ে রইল। তারপর ভ্রু কুঁচকে ধীর পায়ে সেদিকেই এগিয়ে গেল। এদিকে সূচনা রাকিবের সামনে গিয়ে হাসিমুখে বলল,
“হাই রাকিব! কেমন আছিস?”
রাকিব যেন মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সূচনা সাধারণত তার সঙ্গে এভাবে কথা বলে না। অথচ আজ তার ক্রাশ নিজে থেকে এসে কথা বলছে!
লজ্জা আর আনন্দে রাকিবের মুখে হাসি ফুটে উঠল।
“আরে, আমি তো ভালো আছি। তুই কেমন আছিস?”
“হ্যাঁ, আমিও ভালো আছি। তবে তোর থেকে একটা হেল্প চাইছিলাম। তুই কি আজকে আমাকে লিফট দিতে পারবি? আমাকে বাসায় পৌঁছে দিবি?”
রাকিবের তো মনে হলো, সে যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়ে গেছে! তার ক্রাশ নিজে থেকে তাকে বলছে তাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে! অর্থাৎ কিছুক্ষণ পর সে সূচনার সঙ্গে একই বাইকে বসবে!
খুশিতে তার মন যেন বাগবাকুম করে উঠল।
“হ্যাঁ, আ…”
রাকিবের কথাটা শেষ হওয়ার আগেই প্রণয় এসে সূচনার হাত ধরে তাকে নিজের পাশে নিয়ে এল।
তারপর রাকিবের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,
“জলদি বাইক স্টার্ট করো।”
রাকিব হতভম্ব হয়ে গেল। তাদের কলেজের ম্যাথ প্রফেসর তাকে এভাবে কেন বলছেন, কিছুই বুঝতে পারছে না।
“মানে, স্যার?”
প্রণয়ের গলায় এবার কঠোরতা স্পষ্ট।
“মানে এখনই নিজের বাইক স্টার্ট করো এবং এখান থেকে চলে যাও।”
রাকিব কিছুটা ইতস্তত করে বলল,
“বাট স্যার, ও আমার ফ্রেন্ড। ও আমার থেকে লিফট…”
এবার যেন প্রণয়ের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল।
কিছুটা জোরে বলল,
“শাট আপ! আমি তোমাকে যেতে বলেছি। এক্ষুনি যাও। তোমার ফ্রেন্ড তার হাজবেন্ডের সঙ্গে যাবে।
মানে আমার সাথে যাবে।”
কথাটা শুনেই রাকিবের মুখের আনন্দ মুহূর্তেই নিভে গেল। কিছুক্ষণ আগেও সে ভাবছিল, কতদিন পর তার ক্রাশ নিজে থেকে তার সঙ্গে কথা বলছে। আর এখন জানতে পারল মেয়েটার নাকি হাজবেন্ড আছে! তাও আবার সেই হাজবেন্ড তাদের কলেজেরই একজন প্রফেসর! রাকিব আর কোনো কথা বলল না। নীরবে মাথা নিচু করে বাইক স্টার্ট দিল এবং সেখান থেকে চলে গেল। এদিকে প্রণয় এখনও বেশ শক্ত করে সূচনার হাত ধরে আছে।
হাতে চাপ লাগায় সূচনার কিছুটা ব্যথা করছে। কিন্তু প্রণয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে সে কিছু বলার সাহস পাচ্ছে না। প্রণয়ের চোখেমুখে রাগ!
সূচনার মনে হলো, হয়তো সে সত্যিই একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে। আবার ভাবলো,
“কিন্তু উনিই তো বললেন, তাঁর চোখে সব স্টুডেন্ট সমান! তাহলে আমি যদি একজন স্টুডেন্টের কাছ থেকে লিফট চাই, তাতে এমন কী হলো?”
কিন্তু পরক্ষণেই নিজের কাজটা ভেবে সূচনার মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল। হয়তো কাজটা সত্যিই ঠিক হয়নি। সে আর কিছু ভাবার আগেই প্রণয় তাকে টানতে টানতে গাড়ির কাছে নিয়ে গেল। তারপর দরজা খুলে তাকে ভেতরে বসিয়ে দিল। ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে বলল,
“চাচা, আমি ওকে নিয়ে যাচ্ছি। আপনি এখানে অপেক্ষা করুন। আমি কিছুক্ষণ পর গাড়ি নিয়ে আবার চলে আসব।”
কথাটা বলে প্রণয় ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসল।
সূচনার রাগ তখনও কমেনি। নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আশ্চর্য! এগুলো কী ধরনের আচরণ? আমি ব্যথা পেয়েছি!”
প্রণয় কোনো উত্তর দিল না। রাগে চোখের চশমাটা খুলে পেছনের সিটে ছুড়ে ফেলল। তারপর কলারের কাছের দুটো বোতাম খুলে টাইটা একটু ঢিলা করে নিল। প্রণয়ে্য মেজাজ ভীষণ খারাপ, সেটা তার প্রতিটি আচরণেই স্পষ্ট। কপালের চুলগুলো একবার মুঠো করে ধরে জোরে নিঃশ্বাস ছাড়ল। সূচনাও এবার আর চুপ থাকল না।
“আমি আপনাকে কিছু বলছি। আপনি শুনতে পাচ্ছেন না? আমি কতটা ব্যথা পেয়েছি জানেন? এত জোরে কেউ কাউকে ধাক্কা দেয়?”
প্রণয় এবার ধীরে ধীরে সূচনার দিকে তাকাল। তারপর হ্যাঁচকা টানে সূচনাকে নিজের কাছে নিয়ে নিল। সূচনার দু’হাত গিয়ে প্রণয়ের বুকের কাছে গিয়ে থেমে গেল। প্রণয় নিচু গলায় বলল,
“আর আমি যে এখানে ব্যথা পেলাম, তার বেলায় কে দেখবে? শুধু নিজেরটাই চোখে পড়ে, আমারটা চোখে পড়ে না। নিজের বেলায় ষোলো আনা, আর আমার বেলায় চার আনাও নয়। তাই না?
সূচনার মুখটা কেমন যেন ফ্যাকাসে হয়ে গেল।
তোতলাতে তোতলাতে বলল,
“মা… মানে?”
প্রণয় কিছুক্ষণ চুপ করে সূচনার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর আস্তেধীরে সূচনার হিজাব টা খুলে দিল। মুখের সামনে নেমে আসা চুলগুলো আলতো করে সরিয়ে দিল। সূচনা আচমকাই কেঁপে উঠল।
“এ… এগুলো কী করছেন?”
প্রণয়ের গলায় তখনও অভিমানের সঙ্গে রাগ মিশে আছে।
প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ২৬
“বোঝাচ্ছি। কেন অন্য একটা ছেলেকে বললে তোমাকে ড্রপ করে দিতে? তোমার সাহস এত বেড়ে গেছে?”
কথাটা বলেই প্রণয় সূচনার ঘাড়ে এক হাত রেখে অন্য হাত সূচনার গালে রেখে কোন সতর্কবার্তা ছাড়াই নিজের অধর ডুবিয়ে দিল সূচনার ওষ্টে। মুহূর্তেই সূচনা চোখ বড় বড় হয়ে গেল। কিছুক্ষণ দুজনের মধ্যে নীরবতা নেমে রইল। শেষ পর্যন্ত প্রণয় নিজেকে সামলে সূচনাকে বুকে নিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“এখন একদম চুপচাপ করে বসে থাকো। তোমাকে বাসায় ড্রপ করে আবার আমাকে কলেজে ফিরতে হবে।”
