প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৪১
insia isha chowdhury
আমি আপনাকে কী বললাম, শুনতে পাচ্ছেন না? ঘরের লাইট বন্ধ করবেন না।”
ঋতুর কথায় রাফি বিরক্ত মুখে তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“এগুলো কী ধরনের ছোট বাচ্চাদের মতো ব্যবহার? লাইট বন্ধ না করলে আমার ঘুম হয় না। আর তোমার ক্ষেত্রে তো দেখছি ব্যাপারটা একেবারেই উল্টো লাইট জ্বালানো না থাকলে তোমার ঘুম হয় না!”
একটু থেমে ঠাট্টার সুরে আবার বলল,
“তুমি কি ছোট বাচ্চা নাকি, যে লাইট বন্ধ করলেই ভয় পেয়ে যাবে?”
রাফির কথায় ঋতু মুহূর্তেই চুপ হয়ে গেল। কারণ কথাটা যে একেবারেই মিথ্যে নয়। ঋতু অন্ধকারে ভীষণ ভয় পায়। ঋতু অন্ধকার ঘরে ঘুমাতে পারেনা। ঘুমানোর সময় ঘরটা সবসময় আলোকিত রাখার অভ্যাস তার। কিন্তু রাফির কাছে নিজের এই দুর্বলতা প্রকাশ করবে এমন মেয়ে তো সে নয়। তাই নিজের ভয়টাকে আড়াল করে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“দেখুন, আমি লাইট বন্ধ করলে ভয় পাব! এ কথা আপনাকে কে বলেছে? এটা শুধুই আমার অভ্যাস। বুঝতে পেরেছেন? তাই লাইট বন্ধ করবেন না।”
কথাটা বলেই ঋতু আর কোনো কথা না বাড়িয়ে ব্ল্যাঙ্কেটটা টেনে নিয়ে নিজের শরীরের চারপাশে ভালোভাবে জড়িয়ে নিল। তারপর সোফায় শুয়ে পড়ল। এদিকে রাফি পড়ল এক অদ্ভুত দ্বিধায়। না পারছে নিজের ঘুমের জন্য লাইট বন্ধ করতে, না পারছে ঋতুর জেদের কাছে হার মানতে। শেষ পর্যন্ত বিরক্তির সঙ্গে দীর্ঘশ্বাস ফেলে সেও শুয়ে পড়ল। তবে ঘরের লাইট আর বন্ধ করল না। ঋতুর জেদই জয়ী হলো।
প্রণয় হন্যে হয়ে সূচনাকে খুঁজে চলেছে। সকাল থেকে মেয়েটার কোনো পাত্তাই নেই! কোথায় গেছে কে জানে? গতরাতে রাফি আর ঋতুর বিষয় নিয়ে প্রণয় ও সূচনার মধ্যে বেশ খানিকটা ঝামেলা এবং কথা-কাটাকাটি হয়েছিল। তবে প্রণয়ের অভ্যাসগত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী সে প্রতিদিনের মতো আজও একেবারে ভোরে ঘুম থেকে উঠেছে। কিন্তু ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই সূচনার কোনো হদিস নেই। নামাজের সময় হয়ে আসায় প্রণয় অযথা দেরি না করে নামাজ পড়ে নিয়েছিল। তারপরও বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেল, অথচ সূচনা ঘরে ফিরল না।
প্রথমে ভেবেছিল, হয়তো বাড়ির কোথাও আছে। কিন্তু একসময় তার মনে অস্বস্তি দানা বাঁধল। প্রণয় পুরো বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজেও সূচনাকে কোথাও পেল না। তাকে না জানিয়ে সূচনা কোথায় চলে গেল। প্রণয়ের মনে হলো সে ঠিক মতো নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। ওর দমবন্ধ হয়ে আসছে।
প্রণয় মনে মনে রাফি কে গালি দিল,
“শালা রাফি এই সব তোর জন্য হচ্ছে। রাতে সূচনাকে এই বিষয়ে বলাটাই ভুল হয়েছে।”
সবশেষে প্রণয় ছাদে উঠে গেল। কিন্তু বালাইষাট! ছাদেও নেই! প্রণয় বিরক্তিতে চারপাশে তাকাতে তাকাতেই হঠাৎ তার চোখ নিচের বাগানের দিকে আটকে গেল। সকাল সকাল এই মহারানী কিনা বাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছে! এদিকে প্রণয়ের অবস্থা প্রায় খারাপ হওয়ার জোগাড়। তার বউটা মন খারাপ করে কোথায় চলে গেল, কোনো বিপদ হলো কি না এই চিন্তায় এতক্ষণ তার বুক ধড়ফড় করছিল। আর মেয়েটা কিনা দিব্যি বাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছে! প্রণয় আর এক মুহূর্তও দেরি না করে সোজা বাগানের দিকে চলে গেল।
আজ বোধহয় মালি আসেনি। সূচনা নিজেই গাছে পানি দিচ্ছে। সূচনার পরনে সাদা রঙের শার্ট, গোলাপি স্কার্ট আর গলায় স্কার্ফ। কেমন যেন অন্যরকম লাগছে আজ সূচনাকে। তার চুলগুলোও প্রতিদিনের মতো বেঁধে রাখা নেই। খোলা চুল বাতাসের দোলায় এদিক-ওদিক উড়ছে। প্রণয় দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে সূচনার কাছে পৌঁছাল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
“আমাকে এতক্ষণ টেনশনে ফেলে তুমি এখানে বাগানে কী করছ?”
সূচনা অবাক দৃষ্টিতে প্রণয়ের দিকে তাকাল। তারপর যেন লোকটাকে চিনতেই পারেনি এমন ভঙ্গিতে হাত নেড়ে মাছি তাড়ানোর মতো করে আবার অন্যদিকে চলে যেতে লাগল। প্রণয় ভ্রু কুঁচকে অধৈর্য গলায় বলল,
“আশ্চর্য! তুমি আমাকে ইগনোর করছ কেন?”
সূচনা এবার থেমে ধীরে ধীরে প্রণয়ের দিকে ঘুরে দাঁড়াল। মুখে ফুটিয়ে তুলল একেবারে নির্লিপ্ত অভিব্যক্তি।
“দুঃখিত, আপনি কে?”
প্রণয় মুহূর্তেই হতভম্ব হয়ে গেল।
“কী? আমাকে চিনতে পারছ না?”
“না। আমি আপনাকে চিনতে পারছি না। আপনি কে?”
প্রণয় কয়েক সেকেন্ড সূচনার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বাগানের চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিল।
বাগানটা বেশ বড়। সারি সারি ফুলের গাছ, যত্নে ছাঁটা সবুজ পাতা আর এক পাশে হরেক রকমের গাছপালা। গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে প্রণয় গম্ভীর মুখে বলল,
“বাংলা সিনেমার মতো কোনো গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে স্মৃতি হারিয়ে ফেলেছ নাকি?”
সূচনা ভ্রু কুঁচকে বলল,
“যেহেতু আমি আপনাকে চিনি না, তাই আপনার এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার কোনো ইচ্ছেই আমার নেই।”
কথাটা বলেই সূচনা চলে যেতে উদ্যত হলো। কিন্তু প্রণয় এবার আর তাকে যেতে দিল না। মুহূর্তের মধ্যেই সূচনাকে কোলে তুলে নিল। সূচনা বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল,
“আপনার সাহস তো কম নয়! আমাকে কোলে তুলেছেন কেন? আমি একজন সিঙ্গেল মেয়ে! আমাকে নামিয়ে দিন!”
কথাটা শেষ করেই রাগে-দুঃখে প্রণয়ের কাঁধে দাঁত বসিয়ে দিল সে। আহ! প্রণয় ব্যথায় মুখ কুঁচকালেও সূচনাকে নামাল না। বরং মৃদু হেসে বলল,
“বউ, তোমার যদি এতই কামড়াকামড়ি করার ইচ্ছা থাকে, তাহলে চলো ঘরে যাই।”
সূচনা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“আমার আপনার সঙ্গে কোথাও যাওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই। আর আপনি-ই বা আমার সঙ্গে যাবেন কেন?”
প্রণয় এবার তাকে একটু শক্ত করে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে বলল,
“কারণ আমি তোমার সব।”
সূচনা ছটফট করতে করতে বলল,
“না! আপনি আমার কেউ হন না।”
প্রণয় এক মুহূর্তের জন্য গতকাল রাতের কথা ভাবল তারপর গম্ভীর হয়ে বলল,
“আমি তো কাল খারাপ কিছু বলিনি। ঠিকই তো বলেছি, আমি হান্ড্রেড অ্যান্ড টেন পার্সেন্ট সিওর, রাফি আমার বোনকে ব্ল্যাকমেইল করে বিয়ে করেছে। নিজের রাগ মেটানোর জন্যই সে আমার বোনকে বিয়ে করেছে। তাই আমি ওদের ডিভোর্সের কাগজপত্র তৈরি করতে দিয়েছি। আমি কখনোই আমার বোনকে রাফির হাতে অত্যাচারিত হতে দেব না। রাফি সবাইকে নিজের কথার জালে ফাঁসাতে পারলেও আমাকে কখনোই পারবে না।”
সূচনার মুখে এবার বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠল। এক নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,
“আমার এমন একজনের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে, যে বুঝতেই পারে না আমি কেন রেগে আছি! কেন মন খারাপ করেছি, সেটাও কি আমাকে মুখ ফুটে বলে দিতে হবে?”
প্রণয় এবার জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে সূচনার মুখের দিকে তাকাল।
“কী হয়েছে?”
সূচনার এতক্ষণকার অভিমান যেন এবার বাঁধ ভাঙল।
“আপনি আমাকে বলেছিলেন, আপনি আমাকে ঘুরতে নিয়ে যাবেন। কিন্তু সেটা আপনি বেমালুম ভুলেই গেছেন! তারপর সারাদিন নিজে কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। আর আমাকে সারাক্ষণ পড়াশোনার মধ্যে ডুবিয়ে রাখেন। আমি বিয়ে করেছিলাম এই আশায় যে, বিয়ের পর ঘুরতে যেতে পারব। অথচ আমার কপালে এমন একজন মানুষ এসে জুটেছে, যে সারাক্ষণ কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকে আর চায় আমি সারাক্ষণ পড়াশোনা করি!”
প্রণয় ধৈর্য ধরে বউয়ের একের পর এক অভিযোগ শুনে যাচ্ছে। সূচনাও এবার প্রণয়ের বুক থেকে মাথা তুলে তার দিকে তাকাল।
“আপনি একটা কাজ করুন।”
“কী কাজ করব?”
“আপনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে আপনার কাজকেই বিয়ে করে নিন। মানে, অফিসেই সারাদিন থাকুন। অফিসকেই বিয়ে করে ফেলুন!”
সূচনার কথা শুনে প্রণয় আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না। হেসে ফেলল। প্রণয়ের হাসিটাই সূচনার সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেল।
“অসভ্য লোক! হাসছেন কেন? আমাকে ছাড়ুন এই মুহূর্তে! না হলে কিন্তু আমি…”
প্রণয় এবার তাকে আরও শক্ত করে বুকের কাছে তুলে নিয়ে মজা করে বলল,
“না হলে তুমি কী করবে?”
সূচনার চোখমুখ রাগে লাল হয়ে উঠল।
“এক্ষুনি আমি বাড়ির সবাইকে ডাকব। তারপর বলব, এই বাড়ির ছেলে আমার সঙ্গে অসভ্যতামি করছে!”
“আচ্ছা, এই বাড়ির ছেলে তোমার কী হয়, ওয়াইফি?”
সূচনা এক মুহূর্তও দেরি না করে বলল,
“আমার কেউ হয় না!”
“তোমার সব হয়।”
সূচনার মুখে অভিমানের ছাপ। প্রণয় এবার একটু নরম স্বরে বলল,
“আই লাভ ইউ সো মাচ, ওয়াইফি।”
সূচনা ঠোঁট বাঁকিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে উত্তর দিল,
“থ্যাংক ইউ সো মাচ, স্যার।”
প্রণয় চোখ কপালে তুলে বলল,
“আই লাভ ইউ বলেছি! এর উত্তরে কেউ থ্যাংক ইউ বলে?”
“এটাই বলা উচিত। আপনি তো আমার স্যার হন।”
প্রণয় মুচকি হেসে মাথা নাড়ল।
“ঠিক আছে, ঠিক আছে। যেহেতু আমি তোমার স্যার, সেহেতু তোমাকে বেডরুমে প্র্যাকটিক্যাল কিছু ক্লাস শেখাতে চাই। যে বিষয়গুলোতে তুমি ভীষণ দুর্বল। এই ক্লাসে তোমাকে টপার হিসেবে দেখতে চাই।”
কথাটা বলেই প্রণয় সূচনাকে নিয়ে হাঁটা ধরল।
“এই! এই কী করছেন? আমাকে নামান!”
সূচনার ছটফটানি দেখে প্রণয়ের মুখে আবার হাসি ফুটে উঠল। কিছুক্ষণ আগে মেয়েটা রাগে তার সঙ্গে কথাই বলতে চাইছিল না, আর এখন তার বাহুর মধ্যে থেকে ছটফট করতে করতে একসময় নিজেও হেসে ফেলল সূচনা। সূচনার অভিমান ধীরে ধীরে গলে গেল প্রণয়ের ভালোবাসা আর দুষ্টুমির কাছে।
তবে এই দৃশ্য একজন এর চোখে সুখের ছিল না।
উপরের করিডোর থেকে কেউ একজন নীরবে নিচের দৃশ্যটা দেখছিল। প্রণয়ের বাহুতে সূচনাকে দেখে তার একেবারেই সহ্য হলো না। ধীরে ধীরে জমতে লাগল তীব্র ঈর্ষা। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই সোহেলের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। সে সুপ্তি কে ডাকছে। সুপ্তি চমকে পেছনে ফিরে তাকাল।
সোহেল সুপ্তিকে করিডোরে এভাবে পাথরের মতো নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে খানিকটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“সুপ্তি, তুমি এখানে এভাবে দাঁড়িয়ে কী করছ?”
সুপ্তির ইচ্ছে হলো, ঠাস করে সোহেলের গালে একটা চড় বসিয়ে দিতে। কিন্তু বাস্তবতা তাকে এই অধিকারটুকু দিচ্ছে না। বুকের ভেতর জমে থাকা বিরক্তি আর অস্বস্তিকে কোনোরকমে গিলে নিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“এমনিই। তেমন কিছু না।”
সুপ্তি ঘরে ঢুকে বিছানার একপাশে গিয়ে বসতেই সোহেল তার সামনে একটি সুন্দর গিফট বক্স এনে রাখল। সুপ্তি ভ্রু কুঁচকে বক্সটির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী এটা?”
সোহেলের মুখে আনন্দের ছাপ। বেশ খুশি গলায় বলল,
“এটা তোমার জন্য। গতকাল রাতেই তোমাকে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ঘরে এসে দেখি তুমি ঘুমিয়ে পড়েছ। তাই তখন আর তোমাকে ডাকিনি। এইজন্য এখন দিচ্ছি।”
কাল রাতে মোটেই সুপ্তি ঘুমিয়ে ছিল না বরং ঘুমের ভান করে ঘাপটি মেরে শুয়েছিল। সারারাত ওর ঘুম হয়নি। বিছানায় তার পাশে অন্য একজন এসে শুয়েছে তাহলে সে কিভাবে ঘুমাবে? তবে রাতের থেকেও সুপ্তির কাছে এই মুহূর্তটা আরও বিরক্তিকর হয়ে উঠল। তার একদমই ভালো লাগছিল না এসব। তবুও নিজের অনুভূতিগুলোকে আড়াল করে যথাসম্ভব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল।
“এসবের কোনো প্রয়োজন নেই। আর আমি আপনার জন্য কিছুই আনিনি। তাই আপনার এই গিফটটাও নিতে পারছি না।”
সোহেল মৃদু হেসে বলল,
“আমার জন্য তোমাকে কিছু আনতে হবে না। তুমি শুধু এটা নাও। বিশ্বাস করো, তুমি গিফটটা নিলেই আমি অনেক খুশি হয়ে যাব।”
কথাটা বলেই সোহেল বক্সটি খুলে ভেতর থেকে একটি সুন্দর ব্রেসলেট বের করল। তারপর সেটি সুপ্তির হাতে পরিয়ে দিতে উদ্যত হতেই সুপ্তি দ্রুত নিজের হাত সরিয়ে নিল। অস্বস্তি নিয়ে কঠোরভাবে সুপ্তি বললো,
“সোহেল, এগুলো আমার মোটেও ভালো লাগছে না। আর আমাকে স্পর্শ করার আগে আপনার অবশ্যই আমার অনুমতি নেওয়া উচিত।”
সুপ্তির কথায় সোহেল থেমে গেল। এক মুহূর্তের জন্য তার মুখের হাসিটা একটু ম্লান হলো। তারপরও পরিস্থিতিটাকে হালকা করার চেষ্টা করে মৃদু হেসে বলল,
“ঠিক আছে। চিন্তা করো না। তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তোমাকে আমি কখনোই স্পর্শ করব না। তবে… তুমি যদি এটা পরো, তাহলে আমার সত্যিই খুব ভালো লাগবে।”
কথাটা বলে সোহেল ব্রেসলেটটি আর জোর করে সুপ্তির হাতে পরিয়ে দিল না। বরং সেটি নিজের হাতের তালুতে রেখে একরকম নিরীহ, কোমল দৃষ্টিতে সুপ্তির দিকে তাকিয়ে রইল। সুপ্তি কিছুক্ষণ চুপ করে সোহেলের দিকে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ করেই তার বুকের ভেতরটা কেমন ভারী হয়ে উঠল।
ছেলেটা তো খারাপ নয়। বরং কোন দিক থেকেই খারাপ নয়। উজ্জ্বল শ্যামলা মুখ, সরু নাক, আর ঠোঁটের কোণে লেগে আছে মৃদু হাসি সব মিলিয়ে সোহেলের মধ্যে এমন এক সরলতা আছে, যা চাইলেও অস্বীকার করা যায় না।
এই মুহূর্তেও সুপ্তির কথাটা মেনে নিয়ে সে ব্রেসলেটটি শুধু তার দিকে এগিয়ে রেখেছে। সুপ্তির বুকের ভেতরটা আরও কেঁপে উঠল। সোহেল তো কোনো দোষ করেনি। দোষটা বরং তার নিজের মনের। কারণ তার হৃদয়ের এক কোণে যে মানুষটি এখনও গভীরভাবে জায়গা করে আছে, সেই জায়গাটা কি এত সহজে অন্য কাউকে দেওয়া যায়? একজনকে মনে রেখে অন্য একজনকে ভালোবাসা কি আদৌ সম্ভব? নিজের অজান্তেই সুপ্তি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। শেষ পর্যন্ত নিরুপায় হয়ে সোহেলের হাত থেকে ব্রেসলেটটি নিয়ে নিল। ধীরে ধীরে নিজের হাতে সেটি পরল। তারপর সোহেলের দিকে তাকাতেই থমকে গেল সুপ্তি। সোহেল তার দিকে এক মনমুগ্ধকর হাসি নিয়ে তাকিয়ে আছে।
বেশ খানিক আগেই সকাল হয়েছে। চারপাশ দিনের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছে। কিন্তু আগের রাতে বেশ দেরি করে ঘুমানোর কারণে রাফি আর ঋতুর ঘুম ভাঙেনি। তবে সময় কি কখনো কারও জন্য অপেক্ষা করে? কখনোই না। সে নিজের গতিতেই এগিয়ে চলে। ঘড়ির কাঁটা জানান দিচ্ছে সকাল গড়িয়ে এখন দশটা বাজে।
ঠিক তখনই প্রচণ্ড শব্দে কেউ রাফির ঘরের দরজায় আঘাত করতে শুরু করল। দরজায় এমন জোরে ধাক্কাধাক্কির শব্দে রাফির ঘুম ভেঙে গেল। আগের রাতে লাইট জ্বালিয়েই ঘুমিয়েছিল সে, কিন্তু শরীরের ক্লান্তি এতটাই বেশি ছিল যে ঘুম ভাঙার পরও কিছুক্ষণ চোখ মেলে তাকিয়ে থাকতে হলো।
ঝাপসা চোখে সামনে তাকাতেই তার দৃষ্টি গিয়ে পড়ল ঋতুর দিকে। পরক্ষণেই কিছু দেখে অস্বস্তিতে দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিল। ঋতু ঘুমের মধ্যে নিজের গায়ের ব্ল্যাঙ্কেটটা কখন যে নিচে ফেলে দিয়েছে, সে নিজেই জানে না। তার পরনে রাফির দেওয়া ঢিলেঢালা পোশাক। ঘুমের অগোছালো ভঙ্গিতে পোশাকও অনেকটা এলোমেলো হয়ে গিয়েছে। রাফি কোনো কথা না বলে দৃষ্টি মেঝেতে বিদ্যমান রেখে দ্রুত মেঝে থেকে ব্ল্যাঙ্কেটটা তুলে নিল। তারপর চোখ বন্ধ করে সাবধানে সেটি ঋতুর গায়ে জড়িয়ে দিল।
ব্ল্যাঙ্কেটের উষ্ণতা পেতেই ঋতু আরও আরাম করে কুঁকড়ে শুয়ে পড়ল। রাফি ধীরে ধীরে চোখ খুলে তার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
“না জানি সামনে আর কী কী দেখতে হবে!”
এরপর ঋতুকে জাগানোর জন্য হাঁটু গেড়ে তার পাশে বসতেই হঠাৎ রাফির চোখ আটকে গেল ঋতুর মুখে। তার ফর্সা গালে ছোট্ট একটা আঁচড়ের দাগ। সম্ভবত জঙ্গলের কোনো ডালপালার আঁচড়ে দাগটা হয়েছে। মেয়েটা কী নিশ্চিন্তেই না ঘুমাচ্ছে!
ঘুমানোর জন্য ঋতুকে কতটা নিষ্পাপ দেখাচ্ছে মনে হচ্ছে এই মেয়ের মুখে কতই মায়া। ঋতুর গালের দাগটা দেখে অজান্তেই রাফির মনে একটুখানি মায়া জন্ম নিল। নিজের বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে দাগটার আশপাশে আলতো করে ছুঁয়ে দেখল সে।
ঠিক তখনই দরজার ওপাশ থেকে আবার প্রচণ্ড শব্দ হলো। মনে হচ্ছে টিনা বুঝি দরজা ভেঙেই ফেলবে!
রাফি দ্রুত হাত সরিয়ে নিয়ে ঋতুর কাঁধে আলতো করে হাত রেখে ধীরস্বরে ডাকল,
“ঋতু… ঋতু, ওঠো। তাড়াতাড়ি ওঠো।”
ঋতু আধো ঘুমে চোখ মেলতেই সামনে রাফির মুখ দেখতে পেল। মুহূর্তেই আতঙ্কে তাকে এক ধাক্কা দিয়ে দিল। প্রস্তুত না থাকায় রাফি ভারসাম্য হারিয়ে মেঝেতে পড়ে গেল। মেঝে থেকে উঠে বসতে বসতেই বিরক্ত গলায় বলল,
“তুমি মেয়েটা সবসময় শুধু আমাকে আঘাত করার কথাই ভাবো!”
ঋতু তাড়াতাড়ি ব্ল্যাঙ্কেটটা নিজের শরীরে আরও ভালোভাবে জড়িয়ে নিয়ে অবাক হয়ে বলল,
“আপনি… আপনি আমার মুখের এত কাছে কী করছিলেন? আশ্চর্য! আপনি কি আমাকে হার্ট অ্যাটাক করিয়ে মারতে চান নাকি?”
রাফি কিছু বলার আগেই দরজায় আবার জোরে জোরে নক করার শব্দ হলো। ওপাশ থেকে টিনার কণ্ঠ ভেসে এল,
“রাফি! তুমি দরজা খোলো। আমাকে ধোঁকা দিয়ে তুমি ওই মেয়েটার সঙ্গে বাসর রাত কাটাতে পারো না?”
ঋতু অবাক চোখে রাফির দিকে তাকাল। রাফি বিরক্ত মুখে বলল,
“ওই টিনা আবার জ্বালানোর জন্য এসেছে।”
“হ্যাঁ তো, আমি কী করব?”
“কী করবে মানে? তোমার হাজব্যান্ডকে অন্য একটা মেয়ে এসে এভাবে জ্বালাবে, আর তুমি কিছু করবে না?”
ঋতু ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আমার হাজব্যান্ড হলে ওর ঠ্যাং ভেঙে দিতাম। কিন্তু আমি তো আপনাকে হাজব্যান্ড হিসেবেই মানি না।”
রাফি এবার গম্ভীরভাবে বলল,
“হ্যাঁ, কিন্তু আমরা এখন অভিনয় করছি। ঋতু, ঘুমের ঘর থেকে ফিরে বাস্তবে আসো। তুমি মানো আর না মানো, এই মুহূর্তে আমি তোমার হাজব্যান্ড। আর অন্য একটা মেয়ে এসে তোমার হাজব্যান্ডকে
ফাঁসাতে চাইছে তাহলে তোমার কী করা উচিত?”
এতক্ষণে রাফির কথায় ঋতুর টনক নড়ল। সে বিরক্ত চোখে দরজার দিকে তাকিয়ে বলল,
“ঠিক আছে। এই টিনার একটা ব্যবস্থা করছি।”
ঋতু সোফা থেকে উঠে দাঁড়াতেই রাফি দ্রুত ব্ল্যাঙ্কেটটা ঠিক করে দিয়ে আবার বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। চোখ বন্ধ করে এমন ভান করল, যেন এতক্ষণ সে গভীর ঘুমেই ছিল। অবশেষে ঋতু দরজা খুলল। দরজা খুলতেই ঋতু টিনাকে দেখল মেয়েটা ডার্ক রেড ওয়েস্টার্ন ড্রেস পড়ে আছে। আর টিনাকে দেখে ঋতুর মনে হল টিনা অনেক ড্রিঙ্ক করেছে। আর এটা অবশ্য সত্য কাল সারা রাত
টিনা ক্লাবে ছিল ড্রিঙ্ক করেছে আর এখন কেমন মাতালের মত দাঁড়িয়ে আছে। টিনার চোখ আটকে গেল ঋতুর পরনের রাফির জামাকাপড়ে।
টিনা বিস্ফোরিত কণ্ঠে বলে উঠল,
“তোর সাহস কী করে হয় তুই রাফির জামাকাপড় পরিস?”
ঋতু বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,
“হ্যাঁ তো! কোয়ালিটি টাইম স্পেন্ড করার পর আমি আমার হাজব্যান্ডের জামাকাপড়ই পরব। নাকি তোর জামাকাপড় পরব?”
কোয়ালিটি টাইম? কথাটা শুনেই টিনা রাগে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ল। তার চোখ এবার গিয়ে পড়ল বিছানায় শুয়ে থাকা রাফির দিকে। রাফি কিছুক্ষণ আগেই পরনের টি-শার্ট খুলে ব্ল্যাঙ্কেটের মধ্যে লুকিয়ে উপর হয়ে খালি গায়ে ঘুমিয়ে আছে। বলতে গেলে রাফি ঘুমের ভান করে পড়ে আছে। ঋতুর কথায় সত্যিই বিশ্বাস করে ফেলল টিনা। রাগে-ক্ষোভে তার মাথা গরম হয়ে উঠল। সে ঘুরে গিয়ে ঋতুকে চড় মারার জন্য হাত তুলতেই ঋতু সঙ্গে সঙ্গে তার কবজি ধরে ফেলল। টিনা রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
“তোর এত সাহস তুই আমার রাফিকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে চাস? তুই জানিস আমার বাবা কে?”
ঋতু এবার টিনার হাত শক্ত করে চেপে ধরে বলল,
“প্রথমত, ‘আমার রাফি’ বলা বন্ধ কর। ও আমার হাজব্যান্ড। আর দ্বিতীয়ত, আমার গায়ে হাত তোলার সাহস দেখাচ্ছিস? হাতটা ভেঙে তোর বাপের কাছে প্যাকেট করে পাঠিয়ে দেব। পরেরবার আমার গায়ে হাত তোলার আগে দ্বিতীয়বার ভেবে নেবি।”
কথাটা বলেই ঋতু তার হাত ছেড়ে দিল। এদিকে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে থাকা রাফির অবস্থা তখন করুণ। ঋতু যেভাবে টিনাকে শায়েস্তা করছে, তাতে তার দমফাটা হাসি পাচ্ছে। কিন্তু কোনোভাবেই হাসা যাবে না। একটু হাসলেই সব ফাঁস হয়ে যাবে! তাই কোনোমতে নিজের মুখের হাসি চেপে রেখে কয়েক মুহূর্ত পর এমন ভান করল, যেন এইমাত্র ঘুম থেকে উঠেছে। ধীরে ধীরে বিছানা থেকে উঠে অবাক হওয়ার অভিনয় করল যেন সে এখন টিনাকে দেখে অবাক হয়ে গেছে। এরপর সোজা ঋতুর কাছে গিয়ে দাঁড়াল রাফি। মুখে ফুটিয়ে তুলল ভীষণ চিন্তিত অভিব্যক্তি। তারপর মায়াভরা কণ্ঠে ঋতুর দু’গালে হাত রেখে বলল, “বেবি, আর ইউ ওকে?”
ঋতুও এক মুহূর্ত দেরি না করে অভিনয়ে তাল মিলিয়ে মিষ্টি গলায় লজ্জা পেয়ে বলল,
“হ্যাঁ, বেবি আমি ঠিক আছি।”
রাফি এবার টিনার দিকে তাকাল। টিনা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার সময় জোরে দরজা বন্ধ করে দিল।
দরজা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঋতু নিজের গাল থেকে রাফির হাত সরিয়ে দিল। মুহূর্তেই ঋতুর ফোনটা বেজে উঠল। ঋতু গিয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে রিসিভ করতেই রাফি আর কিছু না বলে আবার বিছানায় গিয়ে বসল। অন্যমনস্কভাবে নিজের ফোনটা হাতে নিতেই তার চোখ আটকে গেল স্ক্রিনে।
প্রায় দুই ঘণ্টা আগে একটা মেসেজ এসেছে।
নাম দেখেই রাফির বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠল। সূচনা তাকে মেসেজ দিয়েছে।
মেসেজে লেখা–
“ভাইয়া, আমি জানি না তুমি কী কারণে ঋতুকে বিয়ে করেছ। আর ঋতুই বা কী কারণে তোমার সঙ্গে এসব করতে রাজি হয়েছে, সেটাও আমি জানি না। শুধু এতটুকুই বলতে চাই, প্রণয় তোমাদের দুজনের জন্য ডিভোর্স পেপার তৈরি করতে দিয়েছে। ভাইয়া, সত্যি যদি আমার ওপর তোমার রাগ হয়ে থাকে, তাহলে প্লিজ ঋতুর কোনো ক্ষতি কোরো না। যেটা বাস্তব, যেটা সত্যি, সেটা মেনে নাও। আর ঋতুর যদি কিছু হয়ে যায়, তাহলে আমি কোনোদিন নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না। তোমাকেও আর কখনো ভাইয়ের নজরে দেখতে পারব না। আমি আমার আগের রাফি ভাইয়াকে অনেক মিস করি। যে রাফি কখনো কারও ক্ষতি করেনি। তুমি প্লিজ ঋতুর ওপর কোনো অত্যাচার কোরো না। আশা করি, তুমি বুঝতে পেরেছ আমি আসলে কী বোঝাতে চাইছি।”
মেসেজটা পড়া শেষ করেই রাফি পাথরের মতো স্থির হয়ে গেল। চারপাশে কী হচ্ছে কোনো কিছুই আর তার কানে ঢুকছে না। তার মাথার ভেতর শুধু সূচনার কথাগুলোই ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রণয় তো তাকে ভুল বুঝেছেই, এখন সূজিও তাকে ভুল বুঝছে! মানে, সূচনার ধারণা হয়েছে সে নাকি ঋতুকে অত্যাচার করছে!
আর প্রণয়ের সঙ্গে তার রাগের কারণে সে ঋতুকে টার্গেট করে বিয়ে করেছে। রাফি হতাশ চোখে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
“সবাই আমাকে এতটা খারাপ ভাবছে!”
কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলে সূচনাকে একটা মেসেজ পাঠাল।
“এতটা খারাপ আমাকে ভাবিস না, সুজি। আমি এতটাও খারাপ নই।”
মেসেজটা পাঠিয়েই রাফি আবার নিজের চিন্তায় ডুবে গেল। এতটাই ডুবে গেল যে ঋতু কখন থেকে তাকে ইশারা করে ডাকছে, সেটাও তার খেয়াল হলো না। কয়েকবার ডাকার পরও কোনো সাড়া না পেয়ে ঋতু বিরক্ত হয়ে ফোনটা মিউট করে দিল। তারপর এক মুহূর্ত দেরি না করে রাফির পিঠে ঠাস করে একটা বাড়ি বসিয়ে দিল।
ঋতু ক্যারাটে জানে, সেটা রাফি জানত। কিন্তু মারটা যে এত জোরে পড়বে, সেটা বোধহয় সে কল্পনাও করেনি। রাফি তখন বিছানায় হাঁটু গেড়ে বসে ছিল। আঘাতটা লাগতেই ভারসাম্য হারিয়ে উপুড় হয়ে বিছানায় পড়ে গেল। ব্যথায় মুখ কুঁচকে বিড়বিড় করে বলল,
“প্রণয় ভাবছে আমি ওর বোনের ওপর অত্যাচার করি! অথচ ওর বোন যে আমার ওপর অত্যাচার করে, সেটা তো কেউ জানে না!
বিরক্তিতে কোনোরকমে রাফি উঠে দাঁড়িয়ে রাগে ঋতুর দিকে তেড়ে আসলো আর ঋতুর কোন কথা না শুনেই ওকে এক ধাক্কা দিয়ে দিল। ঋতু মুহূর্তের জন্য অবাক হয়ে গেছে। ঋতু বিছানা থেকে উঠতেই রাফি ওর উপর উঠে এসে ওর দুহাত শক্ত করে ধরে ফেলল ওর এক হাত দিয়ে। বিস্ময়ের ঋতুর চোখ বড় বড় হয়ে গেছে। তাৎক্ষণিক রাফি বলল,
“তোমার সমস্যা কী? আমাকে এত জ্বালাও কেন?”
ঋতু ভ্রু কুঁচকে পাল্টা বলল,
“আমার সমস্যা কী? কতক্ষণ ধরে ডাকছি! আমার বাবা ফোন দিয়েছে। আপনার সঙ্গে কথা বলবে। আর আপনি এত ভারী উঠুন আমার উপর থেকে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।”
রাফি কিছু বলবে তার আগেই নিলুফা খাতুন হনহন করে ঘরের ভিতরে ঢুকে পড়লেন। হঠাৎ নিলুফা কে দেখে রাফি আর ঋতুর নজর সেদিকে ঘুরে গেল। কিন্তু বিছানার দিকে তাকাতেই নিজের ছেলে আর ঋতুর এই অবস্থা দেখে তিনি সঙ্গে সঙ্গে পেছন ফিরে বললেনন,
“দরজা খুলেই ছিঃ ছিঃ লজ্জা শরম কিছুই নেই দেখছি!”
কথাটা বলেই নিলুফা ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
নিলুফা খাতুন মূলত টিনার কথা শুনে এই ঘরে এসেছেন কিন্তু এমন দৃশ্য দেখবেন তিনি কখনো কল্পনা করতে পারেনি।
রাফি তাৎক্ষণিক ঋতুর ওপর থেকে উঠে দাঁড়ালো।
দুজনের মুখে কোন কথা নেই। কিন্তু ঋতু একদম সময় নষ্ট করল না ও উঠে গিয়ে ফোনটা নিয়ে আনমিউট করে রাফির হাতে ধরিয়ে দিল। রাফি আর কিছু না বলে ফোনটা হাতে নিল। শ্বশুরমশাইয়ের সঙ্গে কুশল বিনিময় করে কিছুক্ষণ কথা বলল। কথোপকথন শেষে ফোনটা ঋতুর হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বলল,
“তোমাকে আর আমাকে লাঞ্চের সময় যেতে বলেছে।”
ঋতু মাথা নেড়ে বলল,
“হ্যাঁ, ঠিক আছে। আমরা যাব।”
রাফি হঠাৎ গম্ভীর মুখে বলল,
“কিন্তু এদিকে একটা সমস্যা হয়ে গেছে। তোমার জঙ্গল-মার্কা ভাই জানো কী করেছে?”
ঋতু সঙ্গে সঙ্গে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলল,
“আপনার সাহস কত বড়, আমার ভাইকে জঙ্গল বলছেন? আপনি নিজেই তো একটা আস্ত জঙ্গল! তার সঙ্গে হাতিও আমার কোমর ভেঙে গেছে।”
রাফি বিরক্ত হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“আচ্ছা, ঠিক আছে। বাদ দাও। তোমার সঙ্গে তো আমি কোনোদিনই জিততে পারব না। আসল কথা হলো, তোমার ভাই ভাবছে আমি তোমাকে বিয়ে করেছি তোমার ওপর অত্যাচার করার জন্য। আর সেই কারণেই সে আমাদের দুজনের জন্য ডিভোর্স পেপার তৈরি করতে দিয়েছে।
“ভাইয়া এসব করেছে?”
“হ্যাঁ।”
রাফি কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে আবার দরজার কাছে গিয়ে দেখল যে কেউ আছে কিনা! না কেউ নেই। রাফি দরজা বন্ধ করে দিয়ে বলল,
“আর সমস্যা হলো, আমিও কিন্তু আমাদের জন্য ডিভোর্স পেপার তৈরি করতে দিয়ে রেখেছি। তবে সেটা ওদের কোনোভাবেই বুঝতে দেওয়া যাবে না যে আমরা সবকিছু অভিনয় করছি।”
প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৪০
ঋতু কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। রাফি এবার নিচু গলায় বলল,
“তাই মির্জা বাড়িতে আমাদের আরও সাবধানে থাকতে হবে। এমনভাবে অভিনয় করতে হবে, যেন কেউ কোনোভাবেই আমাদের আসল ব্যাপারটা বুঝতে না পারে। একটা ভুলও করা যাবে না।”
