Home প্রণয় ব্যাকুলতা প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ১০

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ১০

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ১০
ইনান হাওলাদার

হাতে সময় খুব কম।নেয় বললেই চলে।মাঝখানে আর মাত্র দুইদিন আছে। আজই তূর্য ভাইকে পটাতে হবে। মানে ঘুরতে যাওয়ার জন্য।তূর্য ভাই সকালে চলে যাবেন সে যদি রাতে গিয়ে বলে ” তূর্য ভাই,আমাকে নিবেন?” দেখা গেল তূর্য আবেগের বশে ‘ না ‘ বলে দিলো। পরে সারা পথ ধরে আফ’সোস করতে করতে গেল ” ইশ… আহিকে কেন নিয়ে এলাম না!” তাই তাকেও তো ভাববার জন্য সময় দিতে হবে।মনেমনে কথা গুলো ভেবেই সে তূর্যের রুমের উদেশ্যে রওনা হলো। তূর্যকে পটানোর সকল ছক কষে দরজায় কয়েকটা টোকা দিয়ে বলল,

” তূর্য ভাই,আসবো?”
” না ”
মানে প্রথম ধাপেই ছ্যাকা।গম্ভীর কন্ঠস্বর শুনে আহি কিছুটা ভয় পেলেও সেটাকে পাত্তা না দিয়ে বুকে বল নিয়ে ফের বলল,
” একটু আসি?”
” কথা কানে যায় না তোর ?”
” আসছি,তূর্য ভাই “বলেই গরগর করে রুমে প্রবেশ করলো সে।
তূর্য শুয়ে ছিল। আহিকে দেখে উঠে বসতে বসতে বলল,
” কথা যখন শুনবি না তাহলে ঢং করে অনুমতি নেয়ার কী আছে?”
আহি খাটের সামনে রাখা ডিভানে বসতে বসতে বলল,
” আসলে তূর্য ভাই,একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার আছে ”
” আচ্ছা,বল তোর ইম্পর্ট্যান্ট কথা শুনি ”
” আমাকেও নিয়ে চলুন না,প্লীজ ”
” কোথায়?”
” ঘুরতে !”
” হ্যাঁ,তোকেই তো নিয়ে যাবো ”

” সত্যি ?” খুশিতে চোখ – মুখ জ্বলজ্বল করে উঠেছে আহির ।সেটা দেখে তূর্য বলল,
” এখনই এত খুশি হচ্ছিস কেন? তার আগে বল তোর বড় বা’পকে কী কী বলেছিস!”
সে তো সবসময়ই তূর্যের নামে না’লিশ করতে থাকে।কখন কোন না’লিশ করেছে আর তূর্য ভাই কোন না’লিশের কথা বলছেন সেটা বুঝবে কিভাবে? তাই বলল,
” কই,ভাইয়া?কিছু মনে পড়ছে না তো”
“মনে পড়ছে নাহ? আমি মনে করিয়ে দেই? শোন তাহলে,আমি একটা মেয়েকে প্রচণ্ড ভালবাসি।ইভেন,তুই তার সাথে আমার ঘ’নিষ্ঠ পিকচারও দেখেছিস। তা পিকচারটা কেমন ছিল রে? হা’গ করছিলাম তাকে? নাকি কি’স করছিলাম? নাকি এর থেকেও বেশি কিছু? বলতো একটু শুনি!”

” আমি যাব না তূর্য ভাই ” বলেই আহি দ্রুত ডিভান থেকে উঠে রুম থেকে যাওয়ার পাঁয়তারা চালালো।
” চলে যাচ্ছিস কেন? দাঁড়া!যাবি না কেন এটলিস্ট সেটা তো বলে যা!আহি?”
আহি পিছন ঘুরে একটা শ’য়তানি হাসি মুখে লেপ্টে দুই ভ্রু নাচাতে নাচাতে বলল,
” আচ্ছা তূর্য ভাই,বড় আব্বু আপনাকে কে’লানি দিয়েছে না?” বলেই দৌঁড়ে রুমের বাইরে চলে গেল।
তূর্য চোখ রাঙিয়ে দরজার দিকে তাঁকিয়ে আছে।এত বড় ব’দমাশ সে বা’পের জন্মে দেখেনি।আজ একে একটা উচিত শিক্ষা না দিয়ে ছাড়বে না।যেই ভাবা সেই কাজ।তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে রুম থেকে বেরোলো সে।বেরিয়েই দেখলো আহি হেলেদুলে হেঁটে যাচ্ছে । তূর্য পায়ের গতি আরেকটু বৃদ্ধি করে খপ করে আহির বাম হাতের কব্জি ধরে ফেললো।আহি তূর্যের উপস্থিতি টের পেয়ে চি’ৎকার করে বলল,

” বাবা গো…! বাঁচাও ! ছাড়ুন তূর্য ভাই ”
তূর্য দাঁতে দাঁত পি’ষে বলতে আরম্ভ করলো,
” ছাড়বো!আজ তোর বদ’মাইশির সব শখ মিটিয়ে তবে ছাড়বো ।চল আমার সাথে।সবার সামনে সত্যিটা বলবি।”
আহি তূর্যের হাতের উপরিংশ নিজের দুই হাত দ্বারা আঁকড়ে ধরে বলল,
” এমন করবেন না,তূর্য ভাই । আমার মানসম্মান এভাবে ধুলোর সাথে মিশিয়ে দিবেন না।মনে আছে ,একদিন আপনার পানি হয়েছিল পরে আমি জ্বর পটি না… না… মানে জ্বর হয়েছিল পানিপটি দিয়েছিলাম।এর মানবতাটুকু দেখান ,তূর্য ভাই”
আহির হাত আঁকড়ে ধরা অবস্থায় তূর্য তাকে টানতে টানতে নিয়ে যেতে লাগলো আর বলল,
” সে তো আমিও কতদিন তোকে প্রেসার মেপে দিলাম ”

তাসিন,নাবিল,আলিয়া আর পিংকি তূর্যের অপেক্ষায় বসে আছে।সবাই শ’ক্ত দৃষ্টি মেলে আলিয়ার পানে তাঁকিয়ে আছে।কেনোনা,গতকাল গ্রুপে কথা বলার সময় যখন তূর্য কোনো রেসপন্স করছিল না দেখে আলিয়া বড় গলা করে বলেছিল ” তোরা টেনশন করিস না।তূর্যকে আমি কল করে মিট করার কথা জানাবো ”
এখন সে বারবার কল করেও তূর্যকে পাচ্ছে না।এটা কি তার দোষ? কল রিসিভ করলে সে অবশ্যই রাজি করাতে পারত।
বন্ধুদের রা’গী চেহারে দেখে সে বললো,
” দেখ ভাই।তূর্য তো কলই রিসিভ করলো না।এখন কিভাবে ওকে আসতে বলবো?”
“পারবিনা যখন তাহলে বড় কথা বলেছিলি কেন?”তাসিনের কথা শেষ হতেই নাবিল আলিয়ার উদ্দেশ্যে খ্যাঁ’ক খ্যাঁ’ক করে বলল,

” পারোস না বাল ছিঁড়তে উইঠা যাইস রাইত থাকতে ”
পিংকি নাবিলের পিঠে এক ঘু’ষি দিয়ে বলল,
” এই নাপিতের বা’চ্চা থাম তুই ”
তাসিন নাবিলের পক্ষ নিয়ে বলল,
” এই মাংকির বা’চ্চা তুই চুপ কর !তোকে বলেছে? তাহলে তোর গায়ে কেন লাগছে?”
আলিয়া দাঁত কি’ড়মি’ড় করতে করতে বলল,
” পিংকি তোরে বলছে? তোর গায়ে কেন লাগছে?”
” এই আলিয়া ভাট তুইও চুপ কর ! পারোস নাই তো
বা ‘ড়াডাও।এহন এত গলা করস ক্যান?”
” নাবিল বেশি বক’বক করবি না । ও তো যাবে বলেছেই…..” আলিয়াকে থামিয়ে তাসিন বলল,
” ওই শা’লার জন্যে আমরা কেন ঝ’গড়া করছি ভাই?”
“আসছে… শা’লা শা’লা করছে। তূর্যের বোন তোকে দেওয়ার জন্য হা করে আছে ।”বলেই একটা মুখ ভেংচি দিলো পিংকি।
” আরে ভাই আমি তো গা’লি হিসাবে ইউজ করেছি।”
এভাবে তারা আরো কিছুক্ষণ ঝ’গড়া , খুনসুঁটি করতে লাগলো।

আহি একপ্রকার তূর্যের হাত ধরে ঝুলে আছে তূর্য তাকে উঁচু করেই দিব্যি হেঁটে যাচ্ছে।দেখে মনে হচ্ছে যেন একটা পিঁপড়াকে সে উঁচু করে নিয়ে যাচ্ছে ।আহি সেভাবে ঝুঁলে থেকেই কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল,
” তূর্য ভাই, শেষ বারের মতো মা’ফ করে দিন।আমি বাড়ির লোকের সামনে মুখ দেখাতে পারবো না। ম’রে গেলেও আর কোনোদিন আপনার নামে মি’থ্যা না’লিশ করবো না। আপনার ক’সম !”
” খবর’দার আহি ,আমার ক’সম দিবি না !”

আহি আরো কিছুক্ষণ নানান কায়দায় তূর্যের কাছে মা’ফ চাইলো।ইমোশনাল ব্ল্যাক’মেইল করলো।কিন্তু কোনো কাজ হলো না।ইতোমধ্যেই তূর্য তাকে নিয়ে ড্রয়িং রুমের কাছে চলে এসেছে।আর দুটো সিঁড়ি নিচে নামলেই ড্রয়িং রুম।সেখানে বাড়ির সবাই উপস্থিত।এত মানুষের মধ্যে তূর্য ভাই তার সন্মানহা’নি করবে?সে তূর্যের হাত ছেড়ে দিয়ে মেঝেতে পা রাখলো।তূর্য ঘাড় ঘুরিয়ে একবার আহির দিকে তাঁকিয়ে দেখলো।এতক্ষণ যে মেয়েটা অ’সহায় মুখ করে নানান কথা বলছিল সেটা এখন তার মুখ দেখে বোঝার উপায় নেয়।মুহুর্তেই মুখের হাবভাব বদলে ফেলেছে।দেখে মনে হচ্ছে তূর্য তাকে নয় সে তূর্যকে সবার সামনে এক্স’পোজ করবে।তূর্য কিছুটা অবাক হলো তবে পাত্তা দিলো না ।সে আহির হাত ধরে সকলের সামনে এনে শ’ক্ত কন্ঠে বললো,

” সত্যিটা বল সবার সামনে ?”
আসিফ চৌধুরী আর আকবর চৌধুরী কথা বলছিলেন । তূর্য – আহির এভাবে আগমন দেখে দুই ভাই একসাথে বললেন,
” আবার কী গণ্ড’গোল পাকিয়েছিস মা?”
” কী হলো বল?” ধ’মকে উঠে বলল তূর্য ।
” আসলে…ওই…আসলে …”
” আসলে নকলে না করে দ্রুত বল !”
আজব! কী শুরু করলো এই তূর্য ভাই!হুটহাট করে কী আর মি’থ্যা বলা যায়? একটা মি’থ্যা কথা বানাতে মিনিমাম যে টাইমটুকু দরকার সেটুকুও দিচ্ছেন না এই লোক। আরো কিছু মুহূর্ত সময় নিয়ে আহি চোখ বন্ধ করে বলতে শুরু করলো,
” ওই যে বড় আব্বুকে বলেছিলাম তূর্য ভাই একটা মেয়েকে প্রচণ্ড ভালোবাসেন।তিনি তাকে বিয়ে করতেও চান।সেটা তো সত্যই। আরও আজকে কী শুনেছি জানেন বড় আব্বু? ওই মেয়েটা ফোনে কা’ন্না করছিল তূর্য ভাইকে বিয়ে করার জন্য।কিন্তু তূর্য ভাই, বলেছেন তিনি বাড়ি বলতে ভ’য় পাচ্ছেন।যদি আপনি মেনে না নেন এজন্য! ভয়ের কী আছে তূর্য ভাই? বলে ফেলুন ! বড় আব্বু মেনে নিবেন । তাই না বড়….”

” তা ওই মেয়েটা যে এতগুলো কথা বলল তুই কিভাবে শুনতে পেলি?ফোনটা বোধ হয় স্পিকারে রেখেছিলাম নারে?” আহি কে কথা বলতে না দিয়েই শীতল কন্ঠে বলে উঠলো তূর্য।
আহি চোখ বন্ধ রেখেই উপর – নিচ মাথা নাড়ল।তূর্য আহির দিকে ধে’য়ে যেতে যেতে বলল,
“এক চ’ড়ে কান ছিঁ’ড়ে ফেলব বে’য়াদব । ”
আকবর চৌধুরী একটু জোর গলায় বললেন,
” আহ্,তূর্য! এই নিয়ে আমি তোমাকে কিছু বলেছি?আর এই কথা তোমাকে কে বলল?আমি বলেছি বলে তো মনে পড়ছে না । আর তুমিও কি ওর মতো ছেলে মানুষ হয়ে গেলে? ”
বাবার কথায় থেমে গেল তূর্য।তবে আহির হিসাব মিলছে না।তারমানে এতদিন ধরে সে তূর্যের নামে যে মি’থ্যা না’লিশ গুলো করেছে বড় আব্বু কিছু সিরিয়াসলি নেননি? তাহলে যে তাকে বলতো ” আজ শা’স্তি হিসাবে তূর্যকে কানে ধরিয়েছি !”সেগুলো সব সব মি’থ্যা? শুধু শুধু এতদিন মি’থ্যা না’লিশ করে পা’পের ভাড়াটা ভারী করেছে।
এতসব ভাবনার মাঝে পিঠে মারুফা বেগমের খুন্তির বাড়ি খেয়ে হুস ফিরল তার। ” ওরে মা গো…” বলে চি’ৎকার করে তূর্যের পিছনে গিয়ে লুকালো।আবারো মারুফা বেগমকে খুন্তি হাতে ধেয়ে আসতে দেখে কান্না মিশ্রিত কন্ঠে বলল,

” তূর্য ভাই,বাঁচান প্লীজ।জীবনেও আপনার নামে কিচ্ছু বলব না ।”
” উপর থেকেও ঠিক এই কথাটাই বলে এসেছিলি।”
” তূর্য, সর সামনে থেকে।ওকে আজ বড় ভাইয়ের পিছনে লাগার সাধ মিটিয়ে ছাড়বো ”
” আরেকটা বাড়ি খেলে ম’রে যাবো,তূর্য ভাই।আপনার ক’সম! সরি সরি আমার চৌদ্দ গু’ষ্টির ক’সম! আর না’লিশ করবো না আমি।বড় আব্বু এতদিন তূর্য ভাইয়ের নামে যা যা বলেছি সব মি’থ্যা ।
সত্যিটা বল দিয়েছি ,ভাইয়া। এবার তো বাঁচান !”দুই হাতে তূর্যের পিঠের শার্ট খাঁমচে ধরে বলল আহি।কথাগুলো শুনে তূর্য বি’রক্ত হলেও মনও নরম হলো বোধহয়।সে বলল,

” মেজো মা ,থাক, ছেড়ে দিন আজকে ! ”
” ওর পিঠের ছাল তুলে তবে ছাড়বো ! এত শয়’তানি কোথা থেকে পায় ও আমিও দেখবো।তুই সর বাবা ” বলে আরেক দফা তেঁ’ড়ে আসলেন মারুফা বেগম।
” আর করবে না ! কি? করবি আর?”
আহি ঘনঘন দুইপাশে মাথা নাড়লো। তূর্য আহিকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে হাত ধরে উপরে নিয়ে গেল।নিজে রুমে প্রবেশ করতে করতে বলল,

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৯

” আবহাওয়া ঠান্ডা হলে দ্যান নিচে নামিস ”
” একটা কথা বলি ,তূর্য ভাই? তখন যে আপনি বললেন চ’ড়িয়ে কান ছিঁ’ড়ে ফেলবেন। কান আবার চ’ড়িয়ে ছেঁ’ড়া যায় নাকি? ”
” একটা লাগায় ?পরে দেখিস ছেঁ’ড়া যায় কিনা ?”
আহি আর কথার উত্তর না দিয়ে দৌঁড়ে রুমে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দিলো।
কোথায় মা’রের হাত থেকে বাঁচালো তাই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে । সেটা না করে এই মেয়ে আসছে কথার ভুল ধরতে।কত বড় ব’দমাশ একটা।

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ১১