Home প্রণয় ব্যাকুলতা প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ১১

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ১১

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ১১
ইনান হাওলাদার

” মে আই কাম ইন?”
নিজ চেম্বারে কাঁচের জানালার কাছে দাঁড়িয়ে ব্যস্ত শহরের ব্যস্ততা দেখছিল আর থেকে থেকে কফির মগে ঠোঁট ছোঁয়াচ্ছিল তূর্য।হঠাৎ মেয়েলি সুমধুর কণ্ঠে মনোযোগে বিঘ্ন ঘটে তার।সবার কাছে কন্ঠটা সুমধুর হলেও তার কাছে সেই মিষ্টি কন্ঠস্বর মধুতে থাকা মৌমাছির মতো।তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও একই কায়দায় বাইরের দিকে দৃষ্টি রেখে বলল,
” ইয়েস ”
যদিও মেয়েটা অনুমতি পাবার আগেই দরজা ঠেলে ঢুকে পড়েছে। তার হাতে দুই কাপ কফি । একটা তূর্যের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে মুচকি হেসে বলল,

” একটা আপনার ”
তূর্য ঘাড় ঘুরিয়ে নিজের হাতের মগ চোখের ইশারায় দেখালো। মানে সে খাচ্ছে আর মুখে বলল,
” এনি প্রবলেম?”
মেয়েটা মুখে হাসি লেপ্টেই বলল,
” প্রবলেম ছাড়া আসা যাবে না? আপনি কিন্তু বসতেও বললেন না !”
মেয়েটার নাম আয়রা।ছয় মাস হয়েছে এই হাসপাতালে ডাক্তার হিসেবে জয়েন করেছে।দেখতে – শুনতে মাশাআল্লাহ।যেকোনো পুরুষের নজর কাড়বে।তবে সে এসে থেকেই তূর্যের প্রতি একটু বেশিই খেয়াল রাখে।যেটা তূর্যের মোটেও পছন্দ না।
বি’রক্তি থাকা সত্ত্বেও নিজের জন্য বরাদ্দ চেয়ারের দিকে এগোতে এগোতে তূর্য বলল,

” প্লীজ, সিট! ”
মেয়েটা বসে হাতের মগ দুটো সামনে থাকা টেবিলে রেখে তূর্যের সাথে আলাপ চারিতা শুরু করলো।তবে পেশাগত বিষয়ের চেয়ে ব্যক্তিগত বিষয়ের প্রতি বেশি আগ্রহ তার।তূর্য কখনো কখনো কিছু প্রশ্ন স্কিপ করছে তো কখনো কখনো উত্তর দিচ্ছে।কথা – বার্তার এক পর্যায়ে আয়রা বলল,
” ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড,ক্যান আই আস্ক অ্যা কোশ্চেন?”
মাথা নাড়িয়ে সাঁই জানাল তূর্য।অনুমতি পেয়ে মেয়েটা বলল,
“আর ইউ ম্যারিড?”সে যেটা গেজ করেছিল সেটাই হলো।তাই আর অবাক হলো না।তবে মনে মনে ভবিষ্যৎ প্রশ্ন গুলো আন্দাজ করে ফেললো সে। আর সেই অনুযায়ী উত্তরও রেডি করে বলল,

” নো ”
” গার্লফ্রেন্ড আছে নিশ্চয়ই !”
” নো বাট আ’ম এংগেজড ”
মেয়েটা বোধহয় এমন উত্তর আশা করেছিল না।যেটা তার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে।তবুও নিজেকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বলল,
” বিয়েটা কবে সারছেন?”
” সময় হলেই !”

ড্রয়িং রুমের সোফায় উপর টানটান হয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে আহি।মাথাটা তাহির কোলের উপর।শান্ত আর প্রান্ত তার দুই হাত ম্যাসাজ করছে।তবে এতসব কেনো করছে? এর পিছনে নিশ্চই কারণ আছে।
এইতো মিনিট বিশেক আগে আহি বসে বসে টিভি দেখছিল।তখন তাহি ,শান্ত আর প্রান্ত এসে বলল,
” আহিপু ,তুমি নাকি ভাইয়ার সাথে যাচ্ছো? আমাদেরও নিয়ে যেতে বলো না!”
এ তো মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি ! সেও সুযোগের সৎ ব্যবহার করলো। মনে মনে কিছু একটা ভেবে বলল,
” আচ্ছা বলবো ! তার আগে আমার শরীরটা একটু ম্যাসাজ করে দে তো।কেমন যেনো ম্যাচম্যাচ করছে”
তারাও ঘুরতে যাওয়ার লোভে কাজ শুরু করে দিয়েছে।
এর পরে যা হয় দেখা যাবে।ভাগ্যিস কাল তূর্যের কাছে কট খাওয়ার সময় বিচ্ছু তিনটা বাড়িতে ছিল না।তাহলে কী আর এত আরাম করতে পারত?তূর্য ভাইয়ের রুম থেকে একটা উঁকি দিয়ে এসে না হয় বলবে,

” তূর্য ভাই,তোদের নিতে রাজি হচ্ছেন না রে। সেই দুক্কে আমিও গেলুম না ”
শান্তরা বি’রক্ত হলেও কিচ্ছুটি বলছে না।তাদের একটি কথা তূর্য ভাইয়ের সাথে ঘুরতে না যাওয়ার কারণ হতে পারে সেই ভ’য়ে।এভাবে আরো কিছুক্ষন পার হলো।তূর্যকে বাড়ি ফিরতে দেখে শান্ত ফিসফিসিয়ে বললো,
” আহিপু তূর্য ভাই এসেছেন।কথাটা বল !”
তূর্য ড্রয়িং রুমের কাহিনী দেখে কিছুটা অবাক হলো ।কিন্তু কিচ্ছু বলল না।ভ্রু কুঁচকে একবার করে সবকটা দিকে চোখ বোলালো। ফোনে কথা বলছিল বলে কিছু বলল না বোধহয়।
আহি তড়িঘড়ি করে উঠে বলল,
” কোথায়? কোথায়?”
প্রান্ত বলল,

” ওই তো উপরে চলে যাচ্ছেন ।দ্রুত বলো”
আহি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো।একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
” রুমে গিয়ে পার্সোনালি বলবো।তোরা যা করছিলি আবার শুরু কর ” বলেই আবার শুয়ে পড়ল সে।
মারুফা বেগম ১০ মিনিট আগে আহি কে পড়তে বসিয়ে নিজ রুমে গিয়েছিলেন।মেয়েটা পড়ছে কিনা সেটা পরখ করে দেখতে আবার তার রুমে গিয়ে দেখলেন সে রুমে নেয়।পরপর পারভিন বেগম,লতা বেগমের রুমে খুঁজে এসে না পেয়ে ড্রয়িং রুমে আসলেন।এসেই মেয়েকে এভাবে হাত – পা ছড়িয়ে শুয়ে থাকতে দেখে বললেন,
” এই তোকে আমি পড়তে রেখে এসেছিলাম?”
আহি মায়ের দিকে তাঁকিয়ে বলল,
” আরে আম্মু! কোচিং এ ভর্তি হই তারপর থেকে পড়ব”
” এখন থেকে পড়লে যে পড়াটা একটু এগিয়ে থাকবে।যা বই নিয়ে বস।” শান্ত – প্রান্ত দের দিকে তাঁকিয়ে তিনি আবার বললেন,”আর তোরা এভাবে ওর সেবা করছিস? ঘটনা কী?”
” ঘটনা কিছুনা আম্মু ! আর আমি পড়া বুঝছিনা কিভাবে পড়ব বলো?”তড়িঘড়ি করে কথাটা বলল আহি। কেননা,একবার যদি মারুফা বেগম বলে ফেলেন “ওকে নেয় কে তার ঠিক নেয় । আর ও তোদের নেবে?”তাহলে আজকে আর তার রক্ষে থাকবে না।শান্ত – প্রান্ত মে’রে তার মেরুদণ্ড বেঁকিয়ে তবে ক্ষ্যা’ন্ত হবে

” তাহলে কি পরীক্ষা দিয়েছিস ? ”
” আরে আম্মু,রিপ্রোডাকশন বুঝছি না ।এটা আমাদের সিলেবাসে ছিল না ”
” তূর্য এসেছে ।যা ,বই নিয়ে ওর কাছে যা।বুঝিয়ে দেবে”
ছিঃ! শেষে কিনা এসব বুঝতে সে তূর্যের কাছে যাবে? ম’রে গেলেও না।আর এটা তো ডাহা মি’থ্যা কথা ।সে তো বই খুলেও দেখেনি।মায়ের কাছ থেকে বাঁচতে কথাটা বলেছে।
” আম্মু,দেখো না তূর্য ভাই আমাকে খালি ব’কা’ব’কি করে ।এখন গেলে আবার ব’কবে”
” চল,আমি বলে দিচ্ছি।তুই গিয়ে কোনো দু’ষ্টুমি করবি না বলে দিলাম ”
আহি নাকে কান্না করতে করতে বলল,
” আম্মু……” মারুফা বেগমের চোখের দিকে তাঁকিয়ে আর কথা বাড়াতে পারলো না। চুপ করে গেলো।এখন তার একটাই গান গাইতে মন চাইছে ” আমি ফাইসা,আমি ফাইসা গেছি মাইনকার চিপায় ”
মায়ের সাথে না পেরে গাজী আজমল স্যারের প্রাণীবিজ্ঞান বই হাতে তূর্যের রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।মারুফা বেগম দরজার বাইরে থেকে বললেন,

” তূর্য?”
তৎক্ষণাৎ উত্তর ভেসে এলো,” জ্বি,মেজো মা।ভিতরে আসুন”
এই ডাকটা যদি মারুফা বেগম না দিয়ে আহি দিতো তাহলে প্রথম ডাকেই জীবনেও সাড়া দিতো না তূর্য।কয়েকবার ডাকার পর তবে সাড়া দিতো ।তাও খি’টখিটে মে’জাজে বলতো ,” কি সমস্যা?” কখনো কখনো তো মুখের উপর ‘না’ ও বলে দেয়।
তূর্য মাত্র শাওয়ার নিয়ে বেরিয়েছে ।ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে মাথায় তোয়ালে চালাচ্ছে। মারুফা বেগম আহিকে নিয়ে ভেতরে গিয়ে বললেন,
” দেখতো আহি কোন পড়া বুঝছে না। একটু বুঝিয়ে দে তো বাবা ”
তূর্য আয়নার ভিতর দিয়ে আহির দিকে তাঁকিয়ে বলল,
” কী বুঝসিস না?”
আহি একটু ভেবে বলল,

” হাইড্রা!” মারুফা বেগম আহির দিকে তাঁকিয়ে চোখ রা’ঙিয়ে বললেন,
” মা’রবো এক থাবা ! নিচে যে বলে এলি কিপোডাকশন যেন বুঝছিস না?”
” আম্মু,যাও তো ! আমি বুঝে নিবো ”
“শোন তূর্য, বেশি দু’ষ্টুমি করলে দিবি দুই ঘা লাগিয়ে।মাংস তোর হাড্ডি আমার ”
মারুফা বেগম তূর্যের দিকে তাঁকিয়ে কথাটা বলে বেরিয়ে গেলেন।তিনি যেতেই তূর্য হাতের তোয়ালেটা আহির দিকে ছুঁড়ে মে’রে বলল,

” যা টাওয়াল টা মেলে দিয়ে আয় ”
আহি মুখ থেকে তোয়ালে সরাতে সরাতে বলল,
” তূর্য ভাই,আমি পড়তে এসেছি ।আপনার চাকরগিরি করতে আসিনি।”
” তোর মা কী বলে গিয়েছেন মনে নেয়? হাড্ডি তার মাংস আমার।বেশি কথা বললে সব মাংস কেটে রেখে হাড্ডি প্যাকিং করে দিয়ে আসবো ”
“আপনার কাজ আমি কেনো করবো? মাস গেলে বেতন দেন? একটা কানের দুল চাইলেও তো কিনে দেন না”
” তোকে আমি কেনো পড়াবো?তুই মাস গেলে বেতন দেস আমাকে?”
” আমি ইনকাম করি নাকি?”
” আমি তোকে জুয়েলারি কিনে দিতে ইনকাম করি ?”
আহি আর কথা না বলে মুখ ভেং’চি কেটে তোয়ালেটা বেলকনিতে মেলে টেবিলে এসে বসলো।যত যা ই বলুক না কেন এই কিপ্টা লোক জীবনেও কিছু কিনে দিবেন না।শুধু শুধু চেয়ে চেয়ে অপ’মানিত হতে হয় বারবার।
তূর্য আরেকটা চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলল,

” একদম ভুল ভাল পড়া বের করবি না ! মেজো মাকে যেটা বলে এসেছিস সেটাই বের করবি ”
এটা কি বললেন তূর্য ভাই ! আহির হাত – পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে।কিভাবে সে তূর্যের সামনে ওই পড়া বের করবে?যতই হোক বড় ভাই তো!সে একবার অ’সহায় দৃষ্টি মেলে তূর্যের দিকে তাঁকালো।
তূর্য সদ্য গোসল করে আসার দরুন টি শার্টের বুকের কাছের কিছু অংশ ভিজে আছে । ঘাড় বেয়ে পানি পড়ছে দেখে আহি নিজের ওড়নার একপ্রান্ত হাতে নিয়ে চেয়ার থেকে উঠে তার আরো একটু নিকটে গিয়ে ঘাড় বেয়ে গড়িয়ে পড়া পানি মুছতে মুছতে বলল,
” আপনার গায়ের পানিতে আমার বই ভিজে যাবে তো ”
তূর্য তৎক্ষণাৎ আহিকে জো’রে ধা’ক্কা মেরে সরিয়ে ধ’মকে বলল,
” দূরে সর,আহি ”
ঘটনার আকস্মিকতায় তূর্য চেয়ারসহ কিছুটা হেলে পড়েছে আর আহি ছিঁ’টকে অপর চেয়ারে গিয়ে পড়েছে।
এজন্যই মানুষের উপকার করতে নেই।ভালো বলে পানি মুছে দিচ্ছিলো। কী জোরেই না ধা’ক্কাটা দিলো!যদি ফ্লোরে পড়ে যেত সে ? নির্ঘাত মাথাটা ফেঁ’টে যেতে।
ভালোই হতো ! সুস্থ হয়ে তূর্যের নামে “এটেম্পট টু মা’র্ডার”এর একটা মামলা ঠুকে দিতো।তখন বুঝতো ঠেলা।

সমস্ত ঘর অ’ন্ধকার করে রকিং চেয়ারে বসে একবার সামনে তো আরেকবার পিছনে ঝুলছেন লায়েক শিকদার।চেহারায় বি’ষন্নতার ছাপ।হয় তো অতীত নিয়ে ভাবছেন।আজকের দিনেই তিনি তার জীবনের মূল্যবান সবকিছু হারিয়েছিলেন। সবকিছু!
লায়েক শিকদার যখন অতীত নিয়ে ব্যস্ত তখনই দরজা ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করলেন এক নারী।তিনি ভালো করেই জানেন নারীটি কে ।তাই আর চোখ খুললেন না।মহিলাটি নরম কণ্ঠে বললেন,
” মা তোমার সাথে কথা বলতে চান ”
” আচ্ছা! বলবো ” একই কায়দায় থেকে উত্তর দিলেন তিনি।
এবার আর নরম কণ্ঠে নয়,কন্ঠে তে’জ আর অধিকার নিয়ে মহিলাটি বললেন,
” ‘ আচ্ছা,বলবো!’ গত পনেরো দিন ধরে একই কথা বলে যাচ্ছ।একবারও গিয়েছ বৃদ্ধা মহিলাটির কাছে?মানুষের হায়াৎ – মউতের কথা কিছু বলা যায়!”

গর্জে উঠলেন লায়েক শিকদার ” গত সাতাশ বছর ধরে তিনিও একই কথা বলে যাচ্ছেন।এক কথা বারবার শুনতে ভালো লাগে না আমার,শাহানা।যেটা কোনোদিন সম্ভবই না সে কথা বলার জন্য তিনি ডাকেন কেন আমাকে?”
” কেনো সম্ভব নয়? আর সম্ভবই যখন নয় তাহলে ঘটা করে আজকের দিনেই কেন এতো শো’ক পালন করো? কেনো নিজেকে ঘর ব’ন্ধি করে রাখো? পরিকল্পনা তো কম করো না দুই ভাইয়ে মিলে তাহলে সফল কেনো হতে পারো না? নাকি তোমার কূট’নৈতিক চালগুলো সফল হোক তুমি নিজেই চাও না ? ”
স্বামীর মতোই তে’জি কন্ঠে বলতে শুরু করলেন শাহানা শিকদার।
তার প্রতিটা কথা যতটা না ব’দ্ধ ঘরের দেয়ালে দেয়ালে বাড়ি খাচ্ছে তার থেকে অধিক বাড়ি খাচ্ছে লায়েক শিকদারের হৃদয়ে।

” দয়া করে আমাকে একা থাকতে দেও, শাহানা ।”
” সারাজীবন একাই থাকো। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত! এই কামনাই করি ”
লায়েক শিকদার মুখে এক তা’চ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে বললেন,
“এটাই আমার সঙ্গী। তোমার কামনা না করলেও চলতো! ”

সামনে বই আর খাতা রাখা।তূর্য কখনো বইয়ে দেখাচ্ছে তো কখনো খাতায় ডায়াগ্রাম করে করে আবার চিত্র এঁকেও বোঝাচ্ছে। টপিক ‘ হিউম্যান রিপ্রডাকশন ‘
তূর্য খুব স্বাভাবিক ভাবে বিষয়গুলো বোঝালেও আহি সেটা স্বাভাবিক ভাবে বুঝতে পারছে না।মনের ভুলেও স্বেচ্ছায় বই বা খাতার দিকে তাঁকাচ্ছে না সে। তূর্যের ধ’মক খেয়ে খেয়ে মাঝে মাঝে একটু আধটু দেখছে এই যা। তূর্য ভাই এত স্বাভাবিক ভাবে কি করে বোঝাচ্ছে সেটাই ভেবে পাচ্ছে না সে।
পড়ার টেবিল থেকে ওঠার জন্য হাসফাস করছে আহি।প্রথমবার যখন তূর্য টপিকটা বুঝিয়ে তাকে বুঝেছে কিনা সেটা জিজ্ঞেস করেছিল ,সে বলেছিল বুঝেছে।কিন্তু তূর্য কিভাবে যেন বুঝে ফেলেছিল সে ঘোড়ার ডিমটাও বোঝেনি ।তাই পরখ করতে বলেছিল,

” কী বুঝেসিস,বোঝা আমাকে ”
তখনই সে তোতলাতে শুরু করে দিয়েছিলো।তাই এখন আর মি’থ্যা কথাও বলতে পারছে না।আবার যদি বলে ,
“বুঝিয়ে দে” তখন কী বোঝাবে সে?
এদিকে তূর্য দেড় ঘণ্টা ধরে এই এক টপিক বোঝাচ্ছে।বারবার বোঝাতে বোঝাতে বি’রক্ত সে।এমনিতেই তার ধৈর্য খুব কম।তারপর এক পড়া এই নিয়ে পাঁচবার বুঝিয়েছে ।তবুও ব্যর্থ!
একে তো বাড়ি ফিরে রেস্ট নিতে পারেনি।তারউপর এক পড়া বারবার বোঝাতে কার ভালো লাগে?
রা’গে মাথা ব্যথা করতে শুরু করেছে তার।
সচরাচর তূর্য কাউকে পড়াতে চায় না।তবে আহি দুষ্টু হলেও একটা জিনিস একবার সেখানে সর্বোচ্চ দুইবার বোঝালেই বুঝে যায় ।তাহলে এখন কী হয়েছে এই মেয়ের?সে নিজের রা’গ চেপে পড়াটা আরো একবার বুঝিয়ে শ’ক্ত কন্ঠে বলল,

” এবার বুঝেসিস ?”
আহি বরাবরের মতো দুইপাশে মাথা নাড়লো ।যার অর্থ সে বোঝেনি।বুঝবে কিভাবে? সে তো পড়ায় মনোযোগী হতেই পারছে না।তূর্য এবারে আর নিজের রা’গকে কন্ট্রোল করতে পারল না।হাতের কলম টেবিলের উপর শব্দ করে রেখে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
” তাহলে আয় প্রাক্টিক্যালি বুঝিয়ে দেই! দিবো?”
আহি হুজোকে মাথা কাত করে সাঁই জানালো। মুহুর্তেই কি বলে ফেললো বুঝতে পেরে সেকেন্ডের ব্যবধানে আবার দুই পাশে ঘনঘন মাথা নাড়ল।যার অর্থ ‘না’।আর মুখে বলল,
” থাক! আমি আর বুঝবো না ”
তূর্য হাতের ইশারায় দরজা দেখিয়ে বলল,” এক সেকেন্ডের মধ্যে রুম থেকে বের হবি,ফাস্ট ”
আহি দ্রুত বই – খাতা গুছিয়ে এক দৌঁড়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো।যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল বেচারি।শেষে কিনা প্রাক্টিক্যালি বুঝিয়ে দেওয়ার কথা বলল তূর্য ভাই ! ছিঃ!
সে তো এসব স্বপ্নে সরি দুঃস্বপ্নেও ভাবে না। ভাবার প্রশ্নই উঠে না!

শহরের ব্যস্ত রাস্তার কোলাহল বাইরে আটকে আছে।ভেতরে অফিসের কক্ষে আড্ডা দিচ্ছেন আকবর চৌধুরী,আসলাম চৌধুরী ও তাদের বিজনেস পার্টনার তরিকুল আহমেদ।বিজনেস পার্টনার হলেও আকবর চৌধুরীর সাথে তার সম্পর্ক বন্ধুর মতো।
সামনেই তার ছোট ছেলের বিয়ে। সেই নেমন্তন্ন করতেই এসেছেন আজকে।কথায় কথায় তিনি তূর্যের কথা তুলে বললেন,
” তাশরীকের কী খবর? বিয়ে – সাদি দিয়েছ ?”
আকবর চৌধুরী ঠোঁটে হাসির রেখা টেনে বললেন,
” না!সে তার ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত ”
” আমার কাছে কিন্ত ভালো একটা মেয়ে আছে। তাশরীককে একবার বলে দেখতে পারো।”
” আমাদের বলায় কাজ হচ্ছে না ।তুমি বলে দেখতে পারো ”
বলেই তূর্যের নম্বরে কল দিলেন আকবর চৌধুরী।দুই বার রিং হতেই রিসিভ হলো।আকবর চৌধুরী ফোন কানে ধরেই বললেন,

” তোমার তরিকুল আংকেল কথা বলতে চান।নেও কথা বলো ”
তূর্য খানিকটা আন্দাজ করে ফেলেছে তার বা’প কেনো কথা বলতে বলছেন।কারণ,এটা নতুন কিছু নয়।কয়েকদিন পরপরই তিনি অমুক আংকেল ,তমুক আন্টিকে ফোনে ধরিয়ে দেন।আর তারা ঘুরিয়ে – ফিরিয়ে বিয়ের কথাই বলেন।তাই তূর্য একটা গভীর শ্বাস টেনে বললো,
” আসসালামু আলাইকুম,আংকেল।”
” ওয়ালাইকুম সালাম,বাবা।”
এভাবে কিছুক্ষন এটা – ওটা কথা বলার পর তরিকুল আহমেদ আসল কথায় আসলেন।একটা গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন,
“বলছিলাম একটা মেয়ে দেখেছি ।দেখতে ফার্স্ট ক্লাস।যেরকম পড়া – লেখায় ,সেরকম চেহারা – ছবি,উঁচু – লম্বা ।তোমার পছন্দ হতে বাধ্য।আমি তোমাকে মেয়ের ছবি পাঠাই তুমি দেখে বলো।”

” জ্বি,আংকেল! একটু আব্বুর কাছে দিন ”
আকবর চৌধুরী ফোন কানে ধরেই শুনতে পেলেন তার ছেলে বলতে আরম্ভ করেছে,
” আব্বু এসব কী শুরু করেছেন? আমি আগেও বলেছি সময় হলে আমি নিজে আপনাদের জানাবো। তাহলে এখন আবার এসব তুলছেন কেন? হুয়াই?”
ছেলে যে এসব কথা বলবে সেটা তিনি ভালো করেই জানেন তিনি।এটা তো আর নতুন কথা নয়।বিয়ের কথা বললেই এই কথাগুলো বলতে শুরু করে তূর্য।অনেক দিন একটা কথা বলবেন ধরেই ভেবেছেন কিন্তু বলেননি।তবে আজ বলেই ফেললেন,

” তোমার সময় হবে কবে?নাকি আহি সেদিন সত্যিই বলেছিল ! পছন্দের কেও থাকলে বলতে পারো ।নাকি সারাজীবন আইবুড়ো থাকার চিন্তা – ভাবনা করে রেখেছ। ”
” আর ছয় মাস ,এক বছর সময় দিন ,প্লীজ !”
” এভাবে আর কত সময় নিবে? আমরা তো দেখছি নাতি – পুতির মুখ দেখে ম’রতে পারবো না “পাশ থেকে একটু উচ্চকন্ঠে বলে উঠলেন আসলাম চৌধুরী।

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ১০

” যদি দাদা – নানা হওয়ার এতই শখ জাগে নিজের মেয়েকে বিয়ে দিন।আর আমি টেনশন ফ্রী হই। দ্যান,আমার বিয়ে নিয়ে এত টেনশন করার দরকার নেয় ।সেটা অটোমেটিক্যালি হয়ে যাবে।শুধু একবার বিয়ে করি, বছরে বছরে নাতি- পুতি পাবেন ইনশাআল্লাহ!” বিড়বিড় করে বলল তূর্য
” কিছু বললে নাকি? জোরে বলো! শুনতে পাইনি ”
” না না কিছুই বলিনি।একটু ব্যস্ত আছি।রাখছি।” বলেই ফোন কেটে দিলো তূর্য।

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ১২