প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ২৫
ইনান হাওলাদার
আরো কয়েক মাস কেটে গেছে। এই ক’মাসে অনেক কিছুই ঘটেছে, আবার কিছুই ঘটেনি বললেও ভুল হবে না। দিনগুলো একটার পর একটা গড়িয়ে গেছে। সকালের সূর্য উঠেছে প্রতিদিনের মতোই, বিকেলে হালকা আলো ছড়িয়ে রাতের অন্ধকারকে পথ ছেড়ে দিয়েছে। জীবনের গতি একই রয়েছে, কিন্তু দুটি মানুষের ভেতরটা একটু একটু করে বদলে গেছে।
আহি এখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। পাবলিকিয়ান সে,হাবভাবই আলাদা। মাস দুয়েক আগে তার ভার্সিটি লাইফের প্রথম দিন ছিল।
তূর্য – আহির সম্পর্কের টানাপোড়েনগুলো ধীরে ধীরে নরমাল হয়েছে, আহি নিজেকে বুঝে নিতে শিখেছে।আর তূর্য আহির করা সকল ভুল মেনে নিয়েছে।শুধু মেনে নিয়েছে এমন না।ব’কাঝকাও করেছে।
কথাবার্তা তো আগে থেকেই বহমান। বোঝাপড়াটা একটু একটু করে বেড়েছে।
এইযে আহি এখন বুঝতে পেরেছে সে উপন্যাসের সেই কাল্পনিক পুরুষ চরিত্রের সাথে তূর্যের না ,তূর্যের সাথে ঐ চরিত্রের তুলনা করেছিল।এখন তো আর সেই চরিত্রের প্রতি কোনো মোহ বা আবেগ কাজ করে না।কিন্তু তূর্যের প্রতি তার অনুভূতি দিনকে দিন বেড়েই যাচ্ছে। ভালোবাসা না থাকলে এটা কেনো শুধু শুধু এমনটা হতে যাবে? সব সময় বলতে থাকা খ’চ্চর,রা’গী,বদ’মে’জাজি,একরোখা ,গ’ম্ভীর লোকটাকে সে নিশ্চই ভালোবাসে।
ভালোবাসা কিনা এটা নিয়ে মাস দুয়েক আগেও দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগেছে সে।কিন্তু এখন কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব নেই। পৃথিবীতে বাকি সব কিছুর সত্যতা থাক বা না থাক তার ভালোবাসা সত্য। সেটা সে উপলব্ধি করতে পেরেছে।
তবে এটা যে দুই একদিনে জন্মানো অনুভূতি না সেটাও বেশ বুঝেছে।নিজের মনের অজান্তে ধীরে ধীরে,সময় নিয়ে একটু একটু করে জন্মেছে এই অনুভূতি। হয়তো বহু বছর আগে থেকেই নিজের মনের অজান্তে এই যাত্রার শুরু হয়েছে।নাহলে তূর্যের কাছে সারাক্ষণ ব’কা শোনা সত্ত্বেও তার আশে পাশে ঘুরঘুর করেছে? তখন ভাবতো বি’রক্ত করার জন্য সে এমনটা করছে।এখন বুঝছে সেটা ছিল তার মা’নসিক শান্তি। তাই বলে এখন কি সে তূর্যকে বি’রক্ত করে না ? রুম থেকে এটা ওটা নিয়ে আসে না? অবশ্যই করে! ছোট থেকে এ কাজ করে আসছে সে। অভ্যাস হয়ে গেছে।অভ্যাস ভয়ানক জিনিস।কোনো কিছু একবার অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেলে সেটা পাল্টানো মুশকিল। তবে অসম্ভব নয়!
মানুষের দ্বারা কোনো কিছুই অসম্ভব নয়।
আহি এই মিষ্টি অভ্যাস ত্যাগ করতে চায়ও না।আর এখন তো প্রশ্নই আসে না। কেননা,তূর্যও এখন আর ব’কে না তাকে।একেবারে বকে না বললে ভুল হবে,আগের মতো ব’কে না। যার স্বভাবই সবসময় হ’ম্বিতম্বি করা, ত্যাঁ’ড়া আর খোঁ’চা মেরে কথা বলা ,সে কী আর এত সহজে বদলায়!
হয়তো তূর্য ভাইয়েরও তার করা দু’ষ্টুমি গুলো আস্তে আস্তে অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে। নাহলে সবটা মেনে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
আহি ইদানিং বেশ বুঝতে পারছে তূর্যের মনেও তার জন্য সামান্যতম অনুভূতি থাকলেও আছে।কিন্তু তিনি স্বীকার করেন না। আহি চায় তূর্য সবটা স্বীকার করুক ,তবে সেটা নিজে থেকে।
এইযে সে এখন কতটা চ’তুর হয়ে গেছে।তূর্যের মনে যে তার জন্য ফিলিংস আছে ,সে এই কথা বুঝতে পারে কিন্তু সেটা কখনো তূর্যের সামনে প্রকাশ করে না।সব কিছুতে তো ছেলে মানষি চলে না।সে এখন বড় হচ্ছে ।আর তূর্য ভাই যেমন সবসময় সিরিয়াস ভঙ্গিতে থাকেন তাকেও তো পুরোপুরি না হোক একটু একটু সিরিয়াসনেস মেইনটেইন করে চলতে হবে। নাহলে তো লোকে বলবে … না ,না! লোকে কি বলবে? তার শ্বশুরবাড়ির লোক আর বাপের বাড়ির লোক তো একই হবে।তূর্য ভাইয়ের মামা বাড়ির লোক বলবেন ,
” আমাদের বুঝদার ছেলের সাথে কি একটা ব’লদ, আধ ধা’মড়া মেয়ের বিয়ে হয়েছে ” কিন্তু সে তো চায় না কোনো কারণে তূর্য ভাইয়ের মনে হোক আহিকে বিয়ে করে সে জীবনে চরম ভুল করেছে।
এসকল কিছুর বাইরে তার একমাত্র ইচ্ছা,
তারা বাড়ির লোকের অগোচরে চুটিয়ে প্রেম করবে আর তারপর বিয়ে থা । কিন্তু সমস্যা হলো তূর্য ভাই যে কবে বুঝবেন শুধু আহি নয় তিনিও আহিকে ভালোবাসেন। তূর্য যখন তাকে প্রপোজ করবে তখন কী বলবে? নিশ্চই বলবে,
” আমাকে বিয়ে করবি ই’ডিয়েট ?” ভেবেই খিলখিল করে হাসতে আরম্ভ করলো আহি। তূর্যের কাছ থেকে এর চেয়ে বেশি কিছু আশা করাও এক প্রকার বে’য়াদবি।
বাড়ির সব চেয়ে কনিষ্ঠ চার সদস্য অর্থাৎ আহি,শান্ত,প্রান্ত আর তাহি আজ শান্ত – প্রান্তের রুমে আড্ডার আসর বসিয়েছে।কয়েকদিন পরই শান্তর উচ্চ মাধ্যমিকের প্রিটেস্ট ।সে অবশ্য পড়া লেখাই করছিল।ইংরেজি একটা টপিকে একটু প্রবলেম হচ্ছে তাই তূর্যের কাছে গিয়েছিল।কিন্তু তূর্য একটু বিজি আছে — বলেছে,’ রুমে থাকিস ফ্রী হলে ডেকে নিবো ‘ তাই সেই সুযোগে ভাইবোনেরা একসাথে মিলে হাসি,মজা,দু’ষ্টুমি করছে। গতকাল তাহি স্কুলে গিয়েছিল না।আর আজ স্কুলে যাবে বিধায় সকাল সকাল রেইডি হওয়ার পর শুনেছে আজ নাকি স্কুল বন্ধ ।সরকারি ছুটি! কিন্তু কিসের ছুটি সে জানে না। তাই ভাইবোনদের উদ্দেশ্যে বললো,
“আজকে স্কুল কিসের বন্ধ ?”
প্রান্ত বললো,
” কালি পূজার ”
তাহি ফের প্রশ্ন করলো,
” আজ কালি পূজা? তাহলে কাল কি ? ”
এবার শান্ত বললো,
” কাল কিছু না। কাল স্কুল খোলা রে পাগলা ”
আহি একটু ভেবে উত্তর দিলো,
” তাহি শোন ,কাল হলো কালি পূজার পরের দিন ”
কথাটা বলে আহিসহ বাকিরাও হাসতে লাগলো।হাসতে হাসতে সবকটার দম ব’ন্ধ হওয়ার উপক্রম। তাদের হাসির ছেদ ঘটলো তূর্যের কথায়,
” শান্ত আয় ” দরজার মুখে দাঁড়িয়ে কথাটা বলে পুনরায় চলে যাচ্ছিল সে।তার আগে তাহি প্রশ্ন করে,
” ভাইয়া ,আজ তো পূজোর ছুটি তুমি তাও শান্ত ভাইয়াকে পড়াবে ?”
তূর্য কিছু বলার আগেই আহি মাঝখানে ফোড়ন কেটে বলে,
” আরে কখনো শুনেছিস পূজোর ছুটিতে মাদ্রাসা বন্ধ থাকে ? তূর্য ভাইয়ের তো মাদ্রাসা ” এহেন কথা শুনে বাকিদের হাসি পায়।কিন্তু তারা তূর্যের গোমড়া মুখ পানে চেয়ে চাইলেও হাসতে পারে না। মুখ খোলে তূর্য,
” চান্স পেয়েই আসমানে উঠে বসে আছিস।জাস্ট ফার্স্ট ইনকোর্সটা হতে দে। মাদ্রাসা খুলেছি নাকি মসজিদ? তখন দেখাবো ” বলেই শান্তকে আরেকবার তাড়া দিয়ে চলে যায়।ভেংচি কাটে আহি। একটু ইয়ার্কি – ফাজলামি ও বুঝেন না তূর্য ভাই। মানুষ এত পানসেটে কিভাবে হতে পারে সেটা তূর্যকে না দেখলে কেউ বুঝবে না।যত্তসব!
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আহি সময় মেপে উপস্থিত হয়েছে সেখানে।সে আর তারিন
সামনের সারিতে বসেছে ।তারিনের অবশ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ে সুযোগ হয়েছিল।কিন্তু আহির যেহেতু জাহাঙ্গীরনগরে হয়েছে তাই সেও আর সুযোগ পেলেও ঢাবিতে ভর্তি হয়নি। ঢাবির থেকে জাবিতে তার ভালো সাব্জেক্ট এসেছে তাই পরিবারও দ্বিমত করেননি। দুই বান্ধবীর এক ভার্সিটিতে পড়ার সুযোগ হলেও সাব্জেক্ট ভিন্ন এসেছে।এটা নিয়ে দুইজনে অনেক দুঃখ পেয়েছে।তারপর নিজেরাই নিজেদের সান্ত্বনা দিয়েছে।
অনুষ্ঠানে আসার সময় আসলাম চৌধুরী আহিকে ড্রপ করে গিয়েছেন।আর বলেছেন বাড়ি ফেরার আধ ঘন্টা আগে কল করে জানাতে যে ফ্রী থাকবে এসে নিয়ে যাবে। ঘন্টা তিনেক আগে অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে। দুই বান্ধবী মিলে গল্প করছে আর অনুষ্ঠান উপভোগ করছে।
কিছুক্ষণ ধরেই আহির ফোনে রিং হয়ে যাচ্ছে কিন্তু ভিতরের গান বাজনার শব্দে সে শুনতে পায়নি। কয়েকবার রিং হয়ে হয়ে কল কেটে যাওয়ার পর টের পেয়ে কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে পুরুষালি কন্ঠ ভেসে আসলো,
” কোথায় আছিস ? ”
” কি বলছেন কিচ্ছু বুঝি না,তূর্য ভাই।আমি অডিটরিয়ামের ভিতরে।জোরে জোরে গান হচ্ছে। ” মোবাইলের স্পিকারে হাত রেখে খানিকটা জোরে কথাগুলো বললো আহি।
তূর্য কল কেটে টেক্সট করলো ।যেখানে দুই শব্দের একটা লেখা ‘ কাম আউটসাইড ‘ আহি লেখাটা দেখে তারিনকে বলে বেরিয়ে গেল।ভিড় ঠেলে বাইরে বেরোতেই তূর্যের দেখা পেলো সে।তূর্যও তাকে দেখে এগিয়ে আসছিল।মুখোমুখি হতেই তূর্য আহির হাত ধরে একটা নিরিবিলি ছায়া জায়গা দেখে সেখানে দাঁড় করায়। তূর্যের উপস্থিতিতে আহি খুশি হলেও সেটা তাকে বুঝতে না দিয়ে বলে,
” ড্যান্সটা মিস করে ফেললাম তূর্য ভাই।আপনি ভিতরে যেতেন।” যদিও নাচটা মিস করায় তার সত্যি সত্যি আফসোস হচ্ছে।
” তোর শ্বশুরের ছেলে টোকেন রেখে গেছে আমার জন্য সেটা নিয়ে যেতাম ”
“এত তারাতারি কেনো আসলেন? অনুষ্ঠান সবে শুরু হয়েছে ”
আহি আজ থ্রি পিসের সাথে ম্যাচিং করে হিজাব বেঁধেছে। হিজাবের সাথে খুব ভালো অভ্যস্ত নয় সে।মাঝে মধ্যে বাধা হয়। যার দরুন হিজাব করা সত্ত্বেও মুখের একপাশ দিয়ে কিছু চুল বাইরে বেরিয়ে এসেছে।তূর্য সেগুলো নিজের হাতের আঙুলের সাহায্যে হিজাবের ভিতরে ঠেলে দিতে দিতে বললো,
” আর দেখতে হবে না। ”
তূর্যের কান্ডে আহি তার মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে আছে। এদিকে তূর্য নির্বিকার ভঙ্গিতে তার কাজ করে যাচ্ছে।যে কেউ দেখলে ভাববে যেন সবটুকু ধ্যান খেয়াল সব হিজাব ঠিক করার প্রতি।অথচ তার আহির সমস্ত মুখের হাবভাবে খেয়াল আছে।
” কী হয়েছে ? হা করে তাকিয়ে আছিস কেন? হেয়ার গুলো ডিস্টার্ব করছে না ? ”
কোনো প্রতিউত্তর করলো না আহি। ইদানীং তূর্য ভাই একটু কাছাকাছি এলে বা যত্ন নিলে তার কেমন যেন ফিল হয়।যেটা শব্দে বর্ণনা করার ক্ষমতা তার নেই।তূর্য যদি একবার জানতে পারে তার একটু আধটু কাছে আসার দরুন তার মেয়েলি মনের ভিতর ভূ’মিকম্প বয়ে যায়। তাহলে তিনি কি করবেন? নিশ্চই ঠাটিয়ে একটা চ’ড় মারবেন আর বলবেন, ‘ ক্যারেক্টার ঠিক কর আহি ‘ তূর্য ভাই তো আর জানেন না তার চরিত্র ফুলের মতো পবিত্র।না, ফুলের মতো না ফুলের চেয়েও পবিত্র!
সবগুলো চুল ভালো করে ভিতরে প্রবেশ করিয়ে তূর্য ফের বললো,
” চল”
” তূর্য ভাই,তারিনকে তো বলে আসিনি ”
” কল করে বাইরে আসতে বল।ওকে গাড়িতে উঠিয়ে দ্যান আমরা বের হবো ”
” আমাদের সাথে গেলেই তো হয়।ওকে নামিয়ে আমার বাড়িতে চলে যাব। ”
” না ”
“কেন? আপনি গাড়ি আনেননি ?”
” উহু ”
” কেমন মেঘ করেছে দেখেছেন? বাইকে গেলে তো ভিজে যাবো ”
” বাইকও আনিনি। ইদানিং বেশি ম্যাচিউরিটি দেখাচ্ছিস!”
” কেনো ? ইমম্যাচিউর আমিকে আপনার ভালো লাগে ?”
” গোটা তোকেই তো ভালো লাগে না।সেখানে তুই ম্যাচিউর হ অর ইমম্যাচিউর কি আসে যায় !বল ”
” আপনি ভাঙবেন তবু মচকাবেন না ”
” অথচ কবেই ভেঙে-মচকে কমপ্লিটলি ক্র্যাস্ড হয়ে পড়ে আছি”বিড়বিড় করে কথাটা উচ্চারণ করলো তূর্য।
তূর্য কি বলেছে আহি স্পষ্ট না শুনলেও কিছু যে বলেছে সেটা ভালো করে বুঝেছে। নিশ্চই ত্যাঁ’ড়া কিছুই বলেছে।এটা ভেবে সে আর কথা বাড়ায়নি।সে পুনরায় বলল,
” তাহলে থাক তারিনের ভাইয়াও এই ভার্সিটিতে পড়ে।আমি কল করে জানিয়ে দিচ্ছি , ও ভাইয়ার সাথে চলে যাবে ”
” হুম ”
আকাশটা যেন আজ কোনো গোপন অভিমান বুকে চেপে আছে। চারপাশে নেমে এসেছে এক অদ্ভুত ধূসর আবেশ। রোদ মেঘে ঢেকে গেছে।দূরের গাছগুলোর পাতা হালকা বাতাসে নড়ছে। যেন তারাও অপেক্ষা করছে বৃষ্টির প্রথম ফোঁটার স্পর্শের জন্য।হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যেই আকাশ ফেটে বৃষ্টি পড়বে ধরণীতে।
দূরে লেকের ধারে দু’একটা রিকশা থেমে আছে। পাখিরা মাঝে মাঝে উড়ে এসে জলের ওপর ছোঁয়া দিয়ে চলে যাচ্ছে। সবকিছুতেই এক স্থিরতা।
তূর্য আহির হাত ধরে হেঁটে চলেছে।কোনো কথাবার্তা নেই, শুধু পায়ের নিচে শুকনো পাতার মচমচ শব্দ। তূর্যের পুরুষালি পায়ের কদমের সাথে পা মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে আহি।তবুও হেঁটে চলেছে।
ক্যাম্পাস পেরিয়ে যখন তারা রাস্তার কাছে এসেই তূর্য দ্রুত একটা রিক্সা ডেকে নিজে উঠে আহিকে ওঠার জন্য তাড়া দেয়। এদিকে আহম্বকের মতো তাকিয়ে আছে আহি। এইটুকু জায়গা সে বসবে কিভাবে? যেটুকু জায়গা তার চার ভাগের তিন ভাগ জুড়েই তূর্য বসেছে।তাহলে সে বসবেটা কোথায়?
আহি উঠছে না দেখে তূর্য ফের তাড়া দিতেই আহি বলল,
” আমি কোথায় বসবো?”
” কেন? আমার কোলে !” তূর্য বিরক্ত ভঙ্গিতে কথাটা বলে দুই হাত এগিয়ে দিলো আহির দিকে।ঠিক যেভাবে মানুষ হাত বাড়িয়ে বাচ্চাদের কোলে তোলে ।আহি চোখ বড় বড় করে মুখে আওয়াজ করলো,
” এ্যাঁহ?”
” আগে উঠে বস ই’ডিয়েট ,জায়গা এমনিই হয়ে যাবে ”
তূর্যের কথা মতো উঠে বসলো আহি।ওঠার সময় অবশ্য তূর্য হাত ধরে উঠিয়েছে।উঠে বসেছে ঠিকই ।কিন্তু একেবারে আঁটসাঁট হয়ে গিয়েছে।যার দরুন রিক্সা একটু বাক নিলেই আহি বারবার তূর্যের উরু খামচে ধরছে।
কয়েকবার এমন করার পর তূর্য খি’টখিটে মে’জাজে বললো,
” জায়গাটা থেকে একেবারে মাংসটুকুই তুলে আন ”
আহি দ্রুত হাত সরিয়ে স্যরি বললো। এভাবে আরো কিছুক্ষন পার হলো। রিক্সা এগিয়ে চলেছে শান্ত, নিরিবিলি পরিবেশে।অথচ তাতে বসে থাকা পুরুষ ও রমণী দুজনের মনই অশান্ত।দুজনেই নিজেদের মনের পরিস্থিতি সামালে মরিয়া। তূর্যের কাছে এসব অনুভূতি নতুন নয়। তাই সামাল দেওয়া কষ্টসাধ্য হলেও সে পারদর্শী।কিন্তু আহি ? তার কাছে এসব অনুভূতি তো সদ্য জন্ম নেওয়া। তাই ওর কাছে এসব পরিস্থিতি সামলে নেওয়ার বিষয়ে পুরোপুরি অজ্ঞ। তাই তো রিক্সায় উঠেছে ধরেই ছটফট করছে। তূর্য শুরু থেকে বিষয়টা লক্ষ্য করছে। কারণও বেশ বুঝতে পারছে।তার তো উচিত আহিকে স্বাভাবিক ফিল করানোর চে’ষ্টা করা।কিন্তু মন বলছে তাকে আরেকটু বেকায়দায় ফেলতে। এটা তো অনুচিত! ইদানিং এই অনুচিত কাজকর্ম করতেই মনটা বেশি সাঁই দিচ্ছে। এখন কি তার আহির মতো বলা উচিত?
‘ সব বয়সের দো’ষ ‘
কিন্তু সে এই দো’ষী বয়স তো আরো অনেক আগেই পার করে এসেছে।তার সব ভাবনা একদিকে আর আহির নড়াচড়া এক দিকে।যেটা খুব বি’রক্ত করছে তূর্যকে।
” কী প্রবলেম তোর? মি’র্গে রোগ আছে ? মোচড়ামুচড়ি করছিস কেন?”
হালকা ধ’মকে কথাটা বলল তূর্য।
” এ্যাঁহ?”
” কিছু বললেই অ্যাঁ অ্যাঁ করছিস কেন? ”
” এ্যাঁহ ?”
” আবার ? কী ? বসতে প্রবলেম হচ্ছে ?”
” হুঁ ” কথাটা মুখে উচ্চারণ করে উপর নিচ মাথা নাড়লো।
” তো বলবি না? কিছু না বলেই জ্বা’লিয়ে মা’রছিস।ই’ডিয়েট!”
এমনিতেই মেঘ ঘন হয়ে ঝিরঝির বৃষ্টি পড়তেও আরম্ভ করেছে। তাই তূর্য রিক্সার হুড তুলে দিলো। হুড তুলে দেওয়াতে যেন রিক্সার জায়গা আরো সংকুলান হয়ে গেল। তূর্য নির্বিকার ভঙ্গিতে নিজের বাম হাতটা আহির পিছন দিয়ে গলিয়ে দিয়ে তাকে আঁকড়ে ধরে নিজের দিকে টেনে নিলো। এমনিতেই শরীরের সাথে শরীর লাগিয়ে বসে ছিল।আর এখন আহি পুরোপুরি তূর্যের বাহুডোরে লেপ্টে পড়ে আছে। এহেন ঘটনায় আহি কিংকর্তব্যবিমূঢ় । হাত-পা অবস হয়ে যাচ্ছে। হার্ট যেন ফুল স্পিডে বিট করছে। তূর্য বুঝলো আহির নার্ভাসনেস। কিছুক্ষণ ঠোঁট টিপে হাসলো।তারপর একটু ঝুঁকে আহির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে আউড়ালো,
” এখনি যদি এমন করিস তখন কি করবি ? ”
আহি তড়িৎ বেগে মাথা তুলে তূর্যের মুখের পানে চাইলো। ততক্ষণে তূর্য মুখের ভঙ্গিমা স্বাভাবিক করে মাথা সোজা করে ফেলেছে । যেন সে কিছুই বলেনি।আহি প্রশ্ন ছুড়লো,
” তখন ,কখন ? ”
তূর্য নির্বেগ।যেন আহির করা প্রশ্ন তার কান অবধি পৌঁছায়নি। আহি ফের প্রশ্ন ছুড়লো,
” আপনি কী বোঝালেন তূর্য ভাই?”
এইবার সাথে সাথে উত্তর এলো,
” তুই যেটা বুঝলি সেটা !”
” আমি কী বুঝলাম ?”
” সেটা তুই জানিস ”
” আমি বৃষ্টিতে ভিজবো তূর্য ভাই ”
” ভেজাটা খুব জরুরি?”
” হুঁ ”
বড় করে একটা নিঃশ্বাস ছাড়লো তূর্য। ইদানীং কেনো যেন আহির কোনো কাজেই বাধা দিতে মন চায় না আর। প্রতিটা সম্পর্ক শুরু হওয়ার আগে সেটাকে একটু স্বাভাবিক করে নেওয়া জরুরি ,মনে হয়। নাহলে অপর দিকের ব্যক্তিটা নিজের সুবিধা – অসুবিধা কিভাবে শেয়ার করবে? তবে অপর দিকের ব্যক্তিটা যদি হয় আহি সেক্ষেত্রে তাকে লায় দেওয়া মোটেও উচিত না। নাহলে মাথায় উঠে নাচবে। কিন্তু মাঝে মধ্যে একটু আস্কারা দিলে মন্দ হয় না।
মুখে বলল,
” ওকেই ”
কিন্তু মন বলছে ভিন্ন কিছু। প্রেয়সীর বৃষ্টিস্নাত রূপ দেখে নিজের অবাধ্য হৃদয়নুভূতি সামাল দিতে পারবে তো? নাকি ফের কোনো অঘটন ঘটিয়ে ফেলবে? তখন নাহয় ঘুম ছিল।ভুলভাল একটা কথা বুঝিয়ে দিয়েছে।কিন্তু এখন কিছু ঘটে গেলে কি করবে? এখন তো আহি পুরোপুরি সুস্থ মস্তিষ্কে আছে। আর ইদানিং স্টু’পিডটা খুব বেশি চা’লাকি করছে।ইচ্ছা করেই বারবার বেকায়দায় ফেলছে তাকে। বারবার আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে লাগলো সে,যেন অ’স্বাভাবিক কিছুই না ঘটে।
তূর্যের অনুমতি পেয়ে বেজায় খুশি আহি। একটু নির্জন রাস্তা দেখে রিক্সা থামাতে বলল তূর্য।রিক্সা থামতেই এক প্রকার লাফ দিয়ে নামলো সে।
বৃষ্টি এখন একটানা ঝরছে।ছোট ছোট ফোঁটা গুলো, কিন্তু ঘন। রাস্তা ফাঁকা, চারপাশে কেবল বৃষ্টির গন্ধ আর মাটির ভিজে সুর। সেই নির্জন পথের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে আহি। নিচে নেমেই হিজাব খুলে ফেলেছে।বৃষ্টিতে চুল ছেড়ে না ভিজলে মজা আছে নাকি?
কিছুক্ষণ পার হতেই চুল ভিজে গিয়ে কাঁধে লেগে গেল তার।চোখে মুখে একরকম ছেলেমানুষি উচ্ছ্বাস। সে দু’হাত ছড়িয়ে বৃষ্টির ফোঁটা ধরছে। মুখে সবসময়ের মতো মিষ্টি হাসি, যেন পৃথিবীর সব সুখ এই মুহূর্তে তার আঙুলের ডগায়।
রিক্সাওয়ালাকে চা খেতে পাঠিয়ে রিক্সার হুডের নিচে বসে আছে তূর্য।চুপচাপ, মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে প্রেয়সীর বৃষ্টিস্নাত রূপ অবলোকন করছে।তার ভেতরে অদ্ভুত এক আলোড়ন বয়ে যাচ্ছে সুহাসিনীর হাসিটা বুকের গভীরে তোলপাড় চালাচ্ছে। সময়ের সাথে সাথে সঙ্গে তার মনে জমে থাকা অনুভূতিগুলোও আরো প্রগাঢ় হচ্ছে।কিন্তু সে না কিছু করছে আর না কিছু বলছে । শুধু অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, গভীর, মুগ্ধ, আকুল নয়নে। কী হতো যদি তাদের মধ্যেকার কোনো বাঁধা না থাকতো? আহি একটু বুঝদার হলে হয়তো তাকে এত কষ্ট করতে হতো না। বছরের পর বছর মনের সুপ্ত ভালোবাসা গোপন রাখতে হতো না।
আহি মাঝে মাঝে ঘুরে তূর্যের দিকে তাকিয়ে হাসছে,এতক্ষণে হয়তো শ’খানেক ধন্যবাদ জানিয়েছে তাকে। চোখে একরকম চপল দীপ্তি। সেই দৃষ্টিতে তূর্যের হৃদয়টা বারবার কেঁপে ওঠছে।বৃষ্টির ঠান্ডা বাতাসে লুকিয়ে থাকা উষ্ণ কোনো আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠছে। সে চায়, এই মুহূর্তটা থেমে যাক।বৃষ্টি ঝরুক, তার চঞ্চলা পাখি ভিজুক, আর তার চোখের সামনে এই দৃশ্যটা যেন চিরকাল থেকে যাক।
আহি একপর্যায়ে বৃষ্টির আওয়াজের সাথে পাল্লা দিয়ে চেঁ’চিয়ে বলল,
” তূর্য ভাই আপনিও আসুন ।ভালো লাগবে ”
ঘোর কাটলো তূর্যের।সে আর দ্বিতীয়বার ভাবলো না।রিক্সা থেকে নেমে সম্মোহনী দৃষ্টিতে এগিয়ে গেল। নেমেও সেই একই অবস্থা।
সেই কখন থেকে আহি ভিজছে আর সে নিঁখুদ দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। চেয়ে থাকতে থাকতে আনমনে বিড়বিড় করলো,
“বৃষ্টি ছুঁলো তোকে ,আর তুই ছুঁলি আমার মনস্তরঙ্গকে !আমাকে এভাবে এলোমেলো দেওয়া কি খুব বেশি জরুরী ছিল? ”
প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ২৪
” তূর্য ভাই দেখুন কত বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে। এখানটার মাটি গর্ত হয়ে গিয়েছে ” বলে তূর্যের হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে তাকে খুঁচে যাওয়া জায়গাটার কাছে দাঁড় করলো আহি। তূর্য ফের বিড়বিড় করলো,
” বৃষ্টি ফোঁটা খোঁ’চে মাটি ,আর তুই আমার অন্তর। ”
