Home প্রণয় ব্যাকুলতা প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ২৪

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ২৪

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ২৪
ইনান হাওলাদার

” বাহ,তূর্য! বাহ! অভিনয় তো ভালোই শিখেছিস ”
তূর্য ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন সূচক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বন্ধুদের দিকে। একে একে সবার দিকে একেকবার করে নজর বুলিয়ে নিয়ে তারপর বলল,
” ঝেড়ে কাশ ”
আলিয়া বললো,
” তূর্য ভাই, আহি আপনাকে প্রপোজও করেছে?” তূর্য দ্রুত পিছন ঘুরল।বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে গিয়ে দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে তারপর কাউচে এসে বসলো। পরনে ফরমাল পোশাক। হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফিরেই যে সোজা এখানেই এসেছে সেটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে।

” কোন লেভেলের পেট পাতলা,জাস্ট দেখ।আর তোরা বলিস আমাকে প্রপোজ করতে।এতদিনে আমি কিছু বললেই বাড়ি শুদ্ধু সবার কানে কথাটা চলে যেত।জনে জনে বলে বেড়াতো,’ জানো বড় আব্বু? জানো বড় আম্মু ? তূর্য ভাই আমাকে প্রপোজ করেছে ‘ ” শেষ কথাটা আহির মতো করে বলল তূর্য। তূর্যের এহেন কান্ডে সবাই খিলখিল করে হেসে উঠলো।তূর্য বি’রক্ত হলো বটে।হাসি থামিয়ে পিংকি সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল,
” আচ্ছা ওসব বাদ দে।তাহলে তুই এখনো চুপ করে আছিস কেন? অ্যাকসেপ্ট করে নে!”
” তোদের কি মনে হয়? ও সিরিয়াস? উপন্যাসের বইয়ের কথা বলেছিলাম নাহ? সেটা পড়ে ওই হিরোর সাথে আমার কিসব মিল খুঁজে পেয়েছে গড নোউজ। তাই এসব করে বেড়াচ্ছে।
আগামী উইক থেকেই ওর এডমিশন টেস্ট স্টার্ট হবে।আর সারাক্ষণ ফিকশনাল ম্যান ,ফিকশন ম্যান ! আই উইশ ওই ফিকশনাল ম্যানকে একবার হাতের নাগালে পেতাম!” শেষ কথাটা দাঁত কি’ড়মিড় করতে করতে বললো তূর্য। তাসিন তূর্যের দিকে একটু ঝুঁকে বললো,

” আমাদের তূর্য ভাই দেখি এইটুকুতেই জেলাস ”
” জেলাসি মাই ফুট! যে পৃথিবীতে এ’ক্সিস্টই করে না।তাকে নিয়ে এত বাড়াবাড়ির কি আছে ? বোঝা আমাকে !
আমাকে হাইড করে এসব রি’ডিকিউলাস পোস্ট করে বেড়াবে।ভাবে আমি কিচ্ছু দেখি না। ”
“অথচ তার আইডি পাসওয়ার্ড যে আমাদের তূর্য ভাইয়ের আয়ত্তে বেচারি জানেই না । মিনিটে মিনিটে ফেসবুক,ম্যাসেঞ্জার চেকিং হয় সেটাও জানে না । আহারে
বেচারি !” আ’ফসোসের সুরে কথাটা বলল তাসিন।
” ফরগেইট ইট!আমি চেইঞ্জ করে আসছি ” কথাটা বলে উঠতে আরম্ভ করছিল তূর্য তার আগেই আলিয়া বলে ওঠে,
” তোরা কি একটা জিনিস খেয়াল করেছিস ?” আলিয়ার কথায় তূর্যসহ সবাই তার দিকে জিজ্ঞাসা সূচক দৃষ্টি ফেললো।সেকেন্ডের ব্যবধানে আলিয়া ফের বললো,

” এমনি সময় আমাদের তূর্য মেপে ছাড়া কথা বলে না।আর আহির কথা উঠতেই কতগুলো কথা বলে ফেললো ”
” স্টপ দিস ন’নসেন্স ! ইম্পর্ট্যান্ট টপিকে আমি অলওয়েজ জয়েন করি ”
” আহির কথা আসতেই ইম্পর্ট্যান্ট ! আর আমারা কিছু বললেই আনইম্পর্ট্যান্ট ? ”
” ভালোই তো!আর সেই তহন থেকে যে আমি মুখ বুজে বইসা আছি তার বেলায় তো কিছু কইলি না ” এতক্ষণে মুখ খুললো নাবিল।তার কথার প্রেক্ষিতে তূর্য বলল,
” এক্সাক্টলি! কথা বলছিস না কেন?”
” কী কমু বা’ড়া! মুখ খুললেই বা’ড়া ছাড়া কিচ্ছু বাইর হয় না। এই লাইগা বা’ড়ার মুখে তালা মা’ইরা রাইহা দিছি ”
” এখন বল ,নো প্রবলেম।বাড়ির কেউ আসলে তখন একটু কেয়ারফুলি কথা বলিস তাহলেই হবে ” তূর্যের অনুমতি পেয়ে বেজায় খুশি নাবিল।ছোট বোনকে ঈদের দিনে ভূগোল পড়িয়ে তার টাকা মে’রে দিয়েও এমন খুশি হয়েছে কিনা স’ন্দেহ।
খুশির তোপে কিছু একটা বলার জন্য মাত্র হা করেছে সে।এরইমধ্যে দরজায় কেউ ঠকঠক আওয়াজ করায় থেমে যায় সে।নাবিল বি’রক্ত ভঙ্গিতে বলল,

” জবানডা খুলতে পারলাম না তার আগেই ক্যাডা আইলোরে বা’ড়া!”
” আহি !” নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল তূর্য।সবাই অবাক হয়ে তার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেললো।তাসিন বলল,
” দরজা নক করার শব্দেই বুঝে গেলি আহি? ”
কোনো প্রতিউত্তর করলো না তূর্য! এটা কী এমন কঠিন কাজ ! সেই পিচ্চিকাল থেকে আহির চাল চলন ,কাজের হাবভাব লক্ষ্য করছে সে,না বোঝার কী আছে ?বরং না বোঝাটাই অস্বাভাবিক। তাছাড়া সুযোগ পেলেই তার দরজায় গিয়ে ঠকঠক করে।বলতে গেলে এই শব্দ তার মুখস্ত !
পিংকি বলল,

” আহি এসো ” অনুমতি পেতেই আহি গড়গড় করে রুমে প্রবেশ করতে করতে বলল,
” একটা কথা ছিল । চলো…” তূর্যকে কাউচে বসে থাকতে দেখে বাকি কথাটুকু আর শেষ করলো না আহি। কথা ঘুরিয়ে বলল,
” পরে বলব ! তূর্য ভাই আপনি কখন এলেন ? ”
” এখানে কী তোর?”
” এটা কেমন ব্যবহার তূর্য?এসেছে তো কি হয়েছে ? আহি এসো, বসো এখানে।” বলে নিজের পাশে থাকা খালি জায়গা দেখালো পিংকি।

” না ,আপু থাক! এসব উ’চ্ছিষ্ট লোক জন গেলে আসবো ” বলে গজগজ করতে করতে আবার বেরিয়ে গেল আহি।
” ফ্রেন্ড আমার অথচ ,উ’চ্ছিষ্ট আমি! আর তিনি মহা মূল্যবান।স্টু’পিড !”
সবাই ঠোঁট টিপে হাসি সংবরণ করার চেষ্টা চালাচ্ছে। শেষে কিনা উ’চ্ছিষ্ট বলল তূর্যকে?আর তূর্য মুখ বুজে সহ্যও করে নিলো?আবার আপনি আজ্ঞে সম্বোধনও করছে।
তবে নাবিল তার হাসি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।শব্দ করে হেসে ফেলে । বি’রক্ত তূর্য আরো বি’রক্ত হয়। পিংকি সিরিয়াস হয়ে বলল,
” তূর্য,তুই একটু বেশিই খি’টখিট করিস মেয়েটার সাথে। আরেকটু নরমালি বিহেভ করবি।”
” নট পসিবল বাট আ’ম ট্রাইং” কথাটা বলে বেরিয়ে গেল তূর্য।

রাতের শহরটা এখন নিস্তব্ধ। কিন্তু সেই নিস্তব্ধতার ভেতরেও যেন হালকা এক উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে আছে। দূরে কোথাও গাড়ির হর্ন, আবার কোথাও কুকুরের ডাক। সব মিলিয়ে শহরের রাতটাও যেন নিজের গতিতে চলছে। চৌধুরী ভবনের ছাদে আলো-আঁধারিতে সাজানো ছোট্ট এক আড্ডার আসর। চারপাশে কিছু রঙিন চেয়ার, মাঝখানে একটা গোলাকার টি-টেবিল। টেবিলের উপর রাখা আছে নানা রকম নাস্তা —-চিপস, স্যান্ডউইচ,নাচোস,পপকর্ন,পেঁয়াজু, মুড়ি মাখাসহ নানান প্রকার ভাজাপোড়া।আর পাশে ধোঁয়া ওঠা কফির কাপ। হালকা বাতাসে খাবারের গন্ধ মিশে সুন্দর ঘ্রাণ তৈরি হয়েছে।

চেয়ারগুলোতে গোল হয়ে বসে আছে আহি,শান্ত,প্রান্ত আর তূর্যের বন্ধুমহল।তবে তূর্য নেই। ঘন্টা খানেক আগে তাকে কল করে জানানো হয় আর্জেন্ট একটা ভিডিও কনফারেন্সিংয়ে অ্যাটেন্ড করতে হবে।বিদেশি ডাক্তারদের সাথে ইংরেজিতে কিসব বলাবলি করছে।মিটিং মিনিট পাঁচেক আগেই শেষ হয়েছে।তূর্য একটা কফির মগ হাতে ছাদে আসলো। বন্ধুদের সাথে শান্ত,প্রান্ত আর আহিকে দেখে তাদের উদ্দেশ্যে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
” পড়ালেখা নেই তোদের? “কথাটা বলার সাথে সাথে শান্ত আর প্রান্ত চলে গিয়েছে।এক প্রকার দৌঁড়ে পালিয়েছে।আহি এখনো বসে আছে দেখে তূর্য এগিয়ে আসতে আসতে ফের বললো,

” তোর পড়া নেই ?”
” একটু পর যাই তূর্য ভাই।”
” এখনি যাবি ”
আহি ইশারায় বাকিদের কিছু বললো।যার অর্থ, ‘ তোমরা তূর্য ভাইকে একটু বুঝিয়ে বলো ‘
আলিয়া বললো,
” একটু পরই চলে যাবে। বস তুই!”

বাকিরাও আলিয়ার কথায় সাঁয় দিল।তূর্য মনে মনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আহির পাশে থাকা ফাঁকা চেয়ারটা টেনে বসলো। আহি থাকলে তার কি প্র’বলেম? কোনো প্রবলেম নেই! প্রবলেম থাকার কথাও না। কিন্তু এই অ’সভ্য বন্ধু বান্ধবদের দিয়ে কোনো বিশ্বাস নেই তার।কি না কি বলে বসে তার ঠিক নেই। তূর্য বসেই হাতে থাকা কফির মগটা
টি – টেবিলের উপর রাখলো।তারপর ফোন হাতে দ্রুত গতিতে কিছু টাইপ করলো।সাথে সাথে আহি ব্যতীত বাকি সদস্যদের মোবাইল ফোনে একসাথে নোটিফিকেশন গেল।তাদের ফ্রেন্ড গ্রুপে ম্যাসেজ এসেছে।সেখানে নতুন বার্তা,
‘ নাবিল অ্যান্ড তাসিন, একটা ,জাস্ট একটা বাড়তি কথা বলবি..দুইটাকেই ছাদ থেকে লা’থি মে’রে ফেলে দিবো। আই স্যয়ার !”

ম্যাসেজটা পড়ার সাথে সাথেই তাসিন আর নাবিল অসহায় মুখ করে তূর্যের দিকে তাকালো।তাদের এহেন অবস্থা দেখে আলিয়া আর পিংকি ঠোঁট টিপে হাসছে।আহি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে প্রশ্ন ছুড়লো,
” কী হয়েছে ? তোমরা এমন মুখ করে রেখেছ কেন?”
পিংকি বলল,
” কিছু না আপি। তোমার ডেয়ার কমপ্লিট করবে নাহ?”
তূর্য বি’রক্ত ভঙ্গিতে বলল,
” হোয়াট নন’সেন্স! সবাই এক জায়গা হলেই তোদের এই সো কল্ড খেলা খেলতে হবে ?”
” তুই থামতো বাআআআ…… ইয়ে মানে বাড়তি কথা কইস না “কি এক বেকায়দায় পড়েছে নাবিল।একটু খোলামেলা ভাবে কথাও বলতে পারছে না। যত জ্বা’লা তার হয়েছে । এত রুলস ,রেগুলেশন মেনে কথা বলা যায় নাকি? ল’জ্জা থাকলে জীবনেও আর এত নিয়মনীতিওয়ালা বন্ধুর বাড়িতে আসবে না।

” তূর্য তুই উঠে দাঁড়া আর আহি ওই বেলুনটা দেও ”
তাসিনের কথা মতো আহি বেলুনটা তার দিকে এগিয়ে দিলো।সে সেটা ফুলিয়ে আহির কাছে দিয়ে ফের বলল,
” তূর্য দাঁড়িয়ে থাকবে আর তুমি একটু দূরে থেকে দৌঁড়ে এসে বেলুনটা তোমাদের দুইজনের মাঝে রেখে চাপ দিয়ে ফাটাবে । বুঝেছো তো? তূর্য যা ওঠ ”
তাসিনের কথায় কপালে তিন ভাজ পড়লো তূর্যের,

” এটা কোন ধরনের ফা’জলামো তাসিন ? ডেয়ার ওকে দিলি নাকি আমাকে? ”
” রাত বাড়ছে ভাই । তাড়াতাড়ি কর ”
” আই ক্যা’ন্ট ”
” এটা অনেক মজার খেলা তূর্য ভাই।আসুন না প্লিজ!”তূর্যের গরম চাহুনি দেখে আহি দৃষ্টি ঘুরিয়ে ফের বলল,
” তাসিন ভাইয়া,তাহলে আপনি নাহলে নাবিল ভাইয়া আসুন !”
” মা’র খেতে না চাইলে যেভাবে বসে আছিস চুপচাপ সেভাবে বসে থাক!”
নাবিল তাসীনকে ইশারায় কিছু বলে শয়’তানি হাসি দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
” আসো আহি ”
তূর্য নাবিল আর তাসিনের দিকে তাকিয়ে থেকে আহির উদ্দেশ্যে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
” আয় ” বলে উঠে গিয়ে দাঁড়ালো তূর্য।
অনুমতি পেয়েই ছুটে গিয়ে তাদের দুজনের মাঝে বেলুনটা রেখে চেপে ধরেছে আহি।পিংকি সেটা ক্যামেরা বন্দি করছে।
ফাটছে না দেখে বারবার একই কায়দায় চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এইবার সে দুই হাতে শক্ত করে তূর্যকে জড়িয়ে ধরেছে।
তূর্য শুধু কাকতাড়ুয়ার মতো দুই পাশে হাত মেলে দাঁড়িয়ে আছে।

” তূর্য ভাই ,হচ্ছে না ! আপনি একটু জড়িয়ে ধরুন ”
তূর্য জড়িয়ে ধরবে কি ? এইটুকুতেই তার নাজেহাল অবস্থা। আহির প্রতিবারের ছোঁয়ায় ভিতরটা কেঁ’পে উঠছে তার। এক মুহূর্তের জন্য সে চোখ বন্ধ করে অনুভব করলো,সময় যেন থেমে গেছে, চারপাশের সব শব্দ নিঃশেষ হয়ে শুধু আহির শরীরের মা’দকীয় গন্ধ,আর উ’ষ্ণ নিঃশ্বাস ভাসছে বাতাসে। বুকের ভেতর ধুকপুক করছে এক চেনা অথচ অচেনা স্পন্দন, যেন হৃদয়টা নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে।
আর বুকের ভেতরের এই অনিয়ন্ত্রিত হৃদস্পন্দনের শব্দ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে সে। হৃদয়ের গভীরে যে অনুভূতি এতদিন ঘুমিয়ে ছিল, তা আজ জেগে উঠেছে অবাধে।
ভেতরে এত কিছু ঘটে গেলেও বাইরের দিক থেকে সে পুরোপুরি নির্বিকার তূর্য।
অবশেষে কয়েকবারের প্রচেষ্টায় সফল হয়েছে আহি। হাসি মুখে তূর্যকে ছেড়ে দিয়ে পুনরায় নিজের চেয়ারে এসে বসলো। যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো তূর্য।আরেকটু সময় এরূপ কাজকর্ম ঘটলে সেদিন রাতের মতো কে’লেংকারী ঘটে যেত হয়তো।
সবার ঠোঁটে মিটিমিটি হাসি।
তূর্য এসে বসতেই তাসিন প্রশ্ন ছুড়লো,

” ভাই,শ’রীর ঠিক আছে তোর ?”
তূর্য এমন ভাবে তাকালো যেন চোখ দিয়ে গিলে খাবে তাকে।
তাসিন ভোলাভালা মুখ করে দ্রুত এদিক ওদিক মাথা নাড়লো।মানে সে কিছু বলেনি আর কিছু বলবেও না ।
” খেলা শেষ করবি তোরা? আর আহি ,একই কথা আমি রিপিট করবো না,তুই নিচে যাবি মানে যাবি।রাইট নাউ !”
নাবিল বললো,
” দাঁড়াও আহি! তোমারে একটা জিনিস দেহায়।” বলেই মোবাইল বের করলো সে।ফোন ঘেঁটে কাঙ্ক্ষিত জিনিস না পেয়ে আলিয়াকে বলল,

” তূর্য আর পিংকির ডুয়েট গানের ভিডিও তোর মোবাইলে না আলিয়া ? আহিকে দেখা ”
আহির চোখে মুখে আনন্দের উচ্ছ্বাস।এই প্রথম সে তূর্যের গলায় গান শুনবে।বিয়ের পর তূর্য ভাই নিশ্চই তাকে অনেক গান গেয়ে শোনাবেন? কিন্তু পিংকি আপুর সাথে ডুয়েট কেনো গেয়েছেন? আহির ভাবনার মাঝে
আলিয়া ফোন ঘেঁটে ভিডিওটা বের করতে করতে বলল,
” হ্যাঁ,দেখো আহি।তোমার তূর্য ভাই গান গায়তে পারে।জানতে তুমি? ”
” হ্যাঁ,বড় মা বলেছেন।কিন্তু আমি কখনো শুনিনি ”
আলিয়া ভিডিওটা অন করে আহির সামনে ধরলো।
মোবাইলের স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে একটা দৃশ্য যেখানে তূর্য আর পিংকি পাশাপাশি চেয়ারে বসে আছে , তুর্যের হাঁটুর উপর গিটার রাখা। আঙুলের ছোঁয়ায় তারের ভেতর থেকে জন্ম নিচ্ছে এক এক করে সুরের ঢেউ তারপর পুরুষালি ভারি কন্ঠটা সুমধুর কণ্ঠে গেয়ে উঠলো,

” দিল কা জো হাল হ্যায়
ও তুঝে ক্যাসে বায়া কারে
কেহ দে তুঝে ইয়া দিল মেঁ রাখে
বলো না কেয়া কারে ”
তারপরের অংশটা পিংকি গাইলো,
” দিল জো তুমহারা হ্যায়
ক্যাসা বেচারা হ্যায়
মানে না বেহশারাম
বিলকুল খাতারা হ্যায় ”
পুনরায় তূর্য গাইয়ে শুরু করেছে,
” তু কারে দিল বেকারার………
কিউ কারু ম্যায় তুঝসে পেয়ার…..”

আহির দু চোখ অশ্রু সিক্ত হয়ে গেছে। তাহলে কি তূর্য ভাই পিংকি আপুকে ভালবাসেন? নাহলে এমন ডুয়েট কেন গাইবেন?শেষ পর্যন্ত আর শোনার ধৈর্য হয়নি তার। তার আগেই জায়গা ত্যাগ করেছে । যাওয়ার আগে রাগে,দুঃখে একটা চেয়ার ধাক্কা দিয়ে ফেলে এসেছে। সবাই অবাক।পিংকি বিচলিত কন্ঠে বললো,
” কী হলো মেয়েটার ? এভাবে চলে গেল কেন?”
” কী জানি!তূর্য কিছু করছিস? ” নাবিলের এহেন প্রশ্নে মেজাজ বিগড়ে গেল তূর্যের ,
” কী করবো আমি? কিছু করলে দেখতে পেতিস নাহ? লাইফটাকে হেল করে ছাড়ছে ডে বাই ডে ”
” তূর্য তুই গিয়ে দেখ !”

আলিয়া কথা সম্পূর্ণ করার আগেই তূর্য ডাকতে ডাকতে আহির পিছন পিছন যাওয়া আরম্ভ করেছে। । খুব বেশি হার্ট না হলে আহি কখনো এমন বিহেভ করে না। তাই আর দেরি করেনি সে।কিন্তু এমন কিছুই তো হয়নি!
” আহি? এই? হোয়াট হ্যাপেন্ড? আহি?” তূর্য ধমকে ধমকে কথা কথা গুলো বললেও।আহি কানে না তুলে ধপাধপ পা ফেলে সিঁড়ি বেঁয়ে নামতে থাকে।তবে তূর্যের পুরুষালি পায়ের কদমের সাথে পেরে ওঠে না।পিছন থেকে হাত ধরে হ্যাঁচকা টানে নিজের দিকে ফেরালো।করিডোর খুব বেশি আলোকিত না হলেও অনেকটাই পরিষ্কার। সেই আলোয় আহির পানিতে ভরা ছলছল নয়ন স্পষ্ট।তূর্য সেভাবে শক্ত করে হাত ধরে রেখে বললো,
” এভাবে সি’নক্রিয়েট করে চলে এলি কেন?” আহি চুপচাপ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।এবার চোখ থেকে দুই ফোঁটা নোনাজল গড়িয়ে পড়েছে। তূর্য ফের বললো,

” কী হয়েছে? গাধার মতো কান্না করছিস কেনো ?”
” আপনার কাছে আমি তো গাধাই! আবার ‘ মতো ‘ বলছেন কেনো ? কী ভেবেছেন আপনি? আমি হিন্দি বুঝি না? আপনি পিংকি আপুকে গানের মাধ্যমে কত কিছু বললেন ।আমি সব বুঝেছি তূর্য ভাই ”
আহির ছেড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো তূর্য। অসহায় কন্ঠে বললো,
” তোর কবে বুদ্ধি হবে,হুম ? আমি পিংকির সাথে গান গেয়েছি মানে ওকে ডেডিকেট করে গেয়েছি ? ”
নিশ্চুপ আহি। দু চোখ বেয়ে অনর্গল অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।
” কি হলো চুপ কেনো?”
এবারেও কোনো উত্তর আসলো না। তূর্য নরম গলায় আবারো বললো,
” প্লিজ কান্না থামা !”
” আমি কাঁদলেও বা আপনার কী!”
” যখন জানিসই কিছু না,তাহলে কান্না করছিসই বা কেনো?বোঝা আমাকে !”
সে তো অভিমান থেকে কথা বলল।কোথায় তূর্য ভাই বলবেন ,

“তুই কান্না করলে আমার খারাপ লাগে। কষ্ট হয়” সেটা না বলে কিভাবে সত্যিটা মুখের উপর বলে দিলেন। সব সত্যি সব সময় বলতে নেয়।উনি কি সেটা বুঝেন না ?কিন্তু সে ই বা এইটুকুতেই কান্না করছে কেনো?তাহলে সে সত্যি সত্যি তূর্য ভাইকে ভালোবাসে? নাহলে কেনই বা চাইছে তূর্য ঠান্ডা কণ্ঠে বুঝিয়ে তার রাগ ভাঙাক। কয়েকটা সুন্দর সুন্দর কথা বলুক।
” গিয়ে ঘুমিয়ে পড় যা ! ” বলে তূর্য আবার ছাদের দিকে হাঁটা ধরলো। আহি পিছন থেকে বলে উঠলো,
” ভালো টালো বাসতে হবে না। আমাকে শুধু বিয়ে করুন তূর্য ভাই। যাতে আমার অনাগত সন্তানদের বলতে পারি এই সুদর্শন পুরুষ তোদের বাবা ”
আহির কথা শুনে কিছুক্ষণ ঠোঁট চেপে হাসলো তূর্য। তারপর চেহারায় গাম্ভীর্য ভাব টেনে পিছনে ঘুরল।ভ্রু কুঁচকে আহির দিকে একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
” ভালো টালো না বাসলে সন্তান কোথা থেকে আসবে ?”
বোকা আহি তুর্যের কথার গভীরতা না বুঝেই ভাবুক হয়ে
বলল,

” সেটা ঠিক! আমরা না হয় দত্তক নিলাম! কিন্তু দত্তক নেওয়ার টাকা গুলো আপনি দিয়েন।আমি তো আর চাকরি বাকরি করি না ”
” কিন্তু আমার তো ইচ্ছা আমার বউকে খুব বেশি ভালো টালো বাসা ”
” চাপ নিয়েন না।আপনি এমনিতেও ভালো টালো বাসতে পারবেন না তূর্য ভাই।দেখলেই বোঝা যায় “লাজুক ভঙ্গিতে হাসতে হাসতে বলল আহি।
” তাই? পরে সহ্য করতে পারবি তো ?”

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ২৩

কথাটা বলেই সটান হয়ে দাঁড়িয়ে পুনরায় ছাদের দিকে হাঁটা আরম্ভ করলো তূর্য।আহি ভ্যাবলার মতো দাঁড়িয়ে থেকে তূর্যের কথার গভীরতা মাপার চেষ্টা চালাচ্ছে। পুরোপুরি ভাবে না বুঝলেও তূর্য যে তাকে আস্কারা দিচ্ছে এটা সে ঢের বুঝতে পেরেছে।নাহলে তূর্য ভাই এত নরমালি কথা কেনো বললেন? তাহলে কি ওনার উপরে এক আর মনে মনে অন্য কিছু চলছে? না ,না! অসম্ভব! এগুলো হতেই পারে না।এরকম কিছু হলে তো তার দেওয়া প্রপোজাল একসেপ্ট করতেন তূর্য ভাই। তবে পরিবেশ ,পরিস্থিতি অনুকূলে আছে।
শেষ পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। তার মন বলছে খুব শীঘ্রই কিছু হতে চলেছে। এসব চিন্তা ভাবনা করতে করতে বারবার লাজুক হাসিতে ফেঁটে পড়ছে আহি।

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ২৫