প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ২৩
ইনান হাওলাদার
“এই কথা দিয়েছিলে?তোমার থেকে এটা আমি মোটেও আশা করিনি ”
” ডোর লক করারও কোনো প্রয়োজন ছিল না। লক না করলে আর এমন হতো না ” নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে কথাটা বলে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ালো তূর্য।
” এখন সব দোষের মূল দরজা লাগানো ? তুই কি তোর সীমা লঙ্ঘন করিস নি?”
” বিড়ালের কাছে মাছ রেখে যদি বলো খাস না , বিড়াল কি খাবে না? ”
” এসব বিষয় নিয়ে আমার কথা বলতেও ……”
” বলো না কথা ! আর কতকাল নিজের ফি’লিংস হা’ইড করে রাখবো? এসব অ’সহ্য লাগে আম্মু ” চাপা চি’ৎকারের আওয়াজ তুলে কথা গুলো বলল তূর্য।ছেলে রে’গে যাচ্ছে বুঝতে পেরে নিজের কন্ঠ নরম করলেন পারভিন বেগম।ছেলেকে বোঝানোর চেষ্টা করে বললেন,
” রেগে যাচ্ছিস কেন বাবা? আমি ভালোর জন্যই বলছি।মেয়েটা এখনো ছোট !”
এবার যেন তূর্য আরো বেশি রে’গে গেল।
” কিসের ছোট ও? বয়স কম হয়নি! তোমাদের আহ্লাদে এমন না’দান হয়ে আছে।কেমন যেন ভাজা মাছটা উল্টে খেতে জানে না! অথচ আমাকে,আমাকে…. ” কথা গুলো বলতে বলতে থেমে গেল তূর্য।প্রসঙ্গ পাল্টে পারভিন বেগম বললেন,
” ইদানীং দেখছি আমার কাছে এসে বিভিন্ন প্রশ্ন করে , আমার কেমন ছেলের বউ পছন্দ, তারপর তুই কি পছন্দ করিস না করিস এইগুলো ”
” তোমার আইডিয়া কাজ করছে !”
” কোনটা ?”
” নোভেল! বাই দ্যা ওয়ে,তুমি নাবিলদের ইনভাইট কেন করেছো?”
” ছেলেগুলো সবসময় আসতে চায়।তুই আনিস না কেন? আমাকে কল দিয়ে না’লিশ করছিল তাই দাওয়াত দিয়েছি ”
“এসে এমন সব কর্মকাণ্ড করবে ….. ডিজগাজটিং !”
” বড় মা তোমাকে বড় আব্বু ডাকছেন? শিগগিরি এসো ” নিচ থেকে শান্তর গলা ভেসে আসলো।ছেলেকে আরো কিছুক্ষণ বুঝিয়ে চলে গেলেন পারভিন বেগম।এসব ব্যাপারে কিছুই জানতেন না তিনি।বছর খানেক আগেই তিনি জানতে পেরেছেন।প্রথমে তূর্যের কিছু কিছু কার্যকলাপ দেখে স’ন্দেহ করেন । ছেলে তার, উপরে উপরে সবসময় আহির উপর হম্বিতম্বি করলেও ভিতরে ভিতরে মেয়েটার প্রতিটা ক্ষুদ্র বিষয়েও খেয়াল রাখে। আহির প্রতিটা বিষয়ে তূর্য ওভার পসেসিভ। সবার সামনে রূ’ঢ় ব্যবহার না করলে হয়তো তিনি কোনো স’ন্দেহ করতেন না।ভাই হিসাবে এটুকু খেয়াল রাখতেই পারে। এসব ছাড়াও আরো কিছু বিষয় লক্ষ্য করেন তিনি।তারপর সোজা ছেলের কাছে প্রশ্ন করেন,
” তুই কি আহিকে পছন্দ করিস?” তূর্যের সোজা সাপ্টা প্রতিউত্তর,
” আই ওয়ান্ট টু ম্যারি হার!”
পারভিন বেগম যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারেন না। ছেলেকে বোঝানোর চেষ্টা করেন।কিন্তু তত দিনে জল অনেকটা গড়িয়ে গিয়েছে।তিনি বুঝতে পারলেন ছেলেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।এমন কিছু বললে আরো হিতে বিপরীত হতো। রাগা – রাগী শুরু করে দিত।যার প্রভাব আহির উপরেও পড়েছে।
সব নিউজ চ্যানেল, অনলাইন পোর্টাল, এমনকি মোড়ের চায়ের দোকান পর্যন্ত ভরে গেছে একটাই খবরে,
“বর্তমান মেয়র আসিফ চৌধুরীর উপর হামলার চেষ্টা!সন্দেহের তীরে সাবেক মেয়র লায়েক শিকদারের নাম।”
লায়েক শিকদার চুপচাপ বসে আছেন অফিসের বড় টেবিলটার পেছনে থাকা ভারি কাঠের তৈরি চেয়ারে।কাচের গ্লাসে আধখাওয়া পানি, আর চারপাশে তার বিশ্বস্ত লোকজন দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু আজ পরিবেশে এখনো গরম একটা ভাব। বাতাসে অস্থিরতা!
“তোরা কি পাগল হয়ে গেছিস?” লায়েক শিকদারের গলা হঠাৎ কেঁপে উঠল। প্রতিটি শব্দে ছিটকে পড়ছে রা’গ আর হ’তাশা।তীব্র আ’ক্রোশে তিনি ফের বললেন,
“আমার অজান্তে তোরা গিয়ে ওদের উপর হামলা চালালি? ভেবেছিস, এতে আমি খুশি হবো?”
লোকগুলোর মধ্যে এক জন কাঁপা গলায় বলল,
“স্যার, আমরা তো ভাবছিলাম, এতে আপনিই লাভবান হবেন… মানুষ আবার আপনার নাম নেবে…”
পাশ থেকে লাতিন শিকদার গর্জন দিয়ে উঠলেন,
” হ্যাঁ! নাম নিচ্ছে তো !বি’দ্রুপের সহিত! কাল’প্রিট হিসাবে ”
লায়েক শিকদার নিজের বাম হাতটা টেবিলের উপর শব্দ করে রাখলেন।আর বললেন,
“রাজনীতি মানে কি শুধু প্র’তিশোধ? আমি এত বছর ধরে যে হারিয়ে যাওয়া ইমেজ গড়ার চেষ্টা করছি,তোরা একেকজন একেক কাজ করে সেটা আবার ন’ষ্ট করে দিচ্ছিস।তাও সবটা আমার অজান্তে। মানুষ এখন বলবে, সাবেক মেয়র ক্ষমতা না পেয়ে উ’ন্মাদ হয়ে গেছে!”
ঘরে কয়েক মুহূর্তের নীরবতা লক্ষ্য করা গেল। কেউ চোখ তুলতে পারল না।লায়েক শিকদারের মুখে এক মুহূর্তের জন্য কোনো অভিব্যক্তি ফুটল না। তারপর আস্তে করে চশমাটা খুলে টেবিলে রাখলেন।
একটা ধীর নিঃশ্বাস ফেললেন তিনি। চোখে কেমন যেন আ’গুন জ্ব’লছে ।
“আমি চাই না মানুষ আমাকে খারাপ বলুক, আবার ভালো বলুক সেটাও চাই না। শুধু চাই তারা ভাবুক,আমি এখনো এখানে,এই রা’জনীতির ময়দানে আছি।”
কয়েকজন একে অন্যের দিকে তাঁকাল। কারও মুখে সা’হস নেই কিছু বলার। অবশেষে এক জন এগিয়ে এলো।ভয়ার্ত দৃষ্টি তবু আত্মরক্ষার করা জরুরি।সে মন থেকে ভয় সরিয়ে বলল,
“আমরা ভাবছিলাম… এতে আপনার শক্তি আবার দেখানো যাবে। মানুষ দেখবে আপনি এখনো খেলায় আছেন।”
লায়েক শিকদারের ঠোঁটের কোণে একটা হালকা হাসি ফুটে উঠল।বি’দ্রূপে ভরা হাসি।
“খেলায় আছি…? তোরা কি মনে করিস রাজ’নীতি কু’স্তির মাঠ, যেখান থেকে শুধু ধুলো উড়িয়ে নাম কামাতে হয়?”
তারপর ভারি কণ্ঠস্বরে পুনরায় বলল,
“তোরা জানিস না, আমি ২৫ বছর ধরে মানুষকে বুঝিয়েছি আমি শান্তির রাজ’নীতি করি।রা’গের মাথায় একটা ভুল করে ফেলেছিলাম।কিন্তু এখন মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেছে আমি হিং’স্র না, আমি ভদ্র।আর আজ… আজ তোরা সব উল্টে দিলি!”
একটু থেমে ফের বললেন,
“আমার নাম এখন খবরের কাগজে আসবে! কিন্তু সম্মানের সঙ্গে নয়,অভিযুক্ত হিসেবে!”
কেউ কোনো উত্তর দিল না। ঘরটায় শুধু ফ্যানের ঘূর্ণির আওয়াজ আর এসির শো শো শব্দ।লায়েক শিকদার জানালার দিকে তাঁকিয়ে নিঃশব্দে বলে উঠলেন,
“রাজ’নীতি মানে আজকাল ভালো-মন্দ কিছুই না, কেবল টিকে থাকা। কিন্তু তোরা যদি এসব করে বেড়াস তবে সেই টিকেও থাকা শেষ।”
একজন জড়ানো কণ্ঠে বলল,
“স্যার, আমাদের উদ্দেশ্য খারাপ ছিল না… আমরা শুধু চেয়েছিলাম আপনাকে ফিরিয়ে আনতে।”
“ফিরিয়ে আনতে?” প্রশ্নটা করেই চেয়ারে হেলান দিলেন
লায়েক শিকদার ।চেয়ারে হেলান দিয়ে ধীর গতিতে বললেন ,
“যে মানুষ নিজের ছায়া দিয়ে ভ’য় দেখায়, সে আর ফিরে আসে না। আমি ফিরে আসতে চাই না, আমি শুধু মর্যাদার সঙ্গে থাকতে চাই । ”
তারপর তিনি উঠে দাঁড়ালেন। কেউ কিছু বলার সাহস পেল না।কারও মুখে আর কোনো কথা নেই। তবে কেউ বুঝতে পারছে না এই মানুষটা ভালো, না খারাপ? ইনি কি আদেও আসিফ চৌধুরীর শ’ত্রু, নাকি মিত্র?
অফিস রুম ছাড়ার আগে লায়েক শিকদার একবার জানালার পাশে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখলেন,যেখানে রাজ’নীতির রং মুছে গিয়েছে আরো আগেই। পড়ে আছে শুধু ক্লান্ত এক মানুষ।আর একটু ভুল বোঝাবুঝি!
তিনি আস্তে করে বললেন,
“রাজনীতি একদিন আমাকে বানিয়েছিল ‘মানুষের নেতা’। আজ আমি শুধু এক মুখোশের নিচে ব’ন্দি নাম।”
আজ দুপুরে রান্না হওয়া বিভিন্ন খাবারের মধ্যে একটা স্পেশাল খাবার রয়েছে।আহির রান্না করা সর্ষে ইলিশ। তূর্য ইলিশ মাছ পছন্দ করে সেটা আহি জানে।আরো বড় মা বলেছেন সর্ষে ইলিশ তূর্যের বেশি পছন্দের।সেটা আহিও খেয়াল করেছে।বাড়ির সবার জন্যে রান্না করতে চেয়েছিল সে।কিন্তু মারুফা বেগম মাত্র পাঁচ পিচ মাছ দিয়েছেন তাকে।যে মেয়ে জীবনেও রান্না ঘরের দিকে পা ফেলেনি সেই মেয়েকে বিশ্বাস করে একগাদা মাছ কোনো ভাবেই দেওয়া উচিত নয়।তিনি তো চেয়েছিলেন দুই পিচ দিতে।কিন্তু মারুফা বেগম আর লতা বেগম এত গুলো মাছ দিয়ে দিয়েছেন।যদিও আহি মারুফা বেগমের ধারণা সত্যি করে দিয়েছে।শান্ত মশলা দিয়ে শুধু এক গাল ভাত মুখে দিয়েছে ,সাথে সাথে মুখের ভাত ফেলে দিয়ে রিভিউ দিয়েছে ,
” কু’খ্যাত লেভেলের বাজে হয়েছে “প্রান্ত ভেবেছে শান্ত হয়তো মজা করছে তাই সে শান্তর মাখিয়ে রাখা ভাতের কিছু পরিমাণ গালে দিয়ে তারও এক অবস্থা।প্রান্তের রিভিউ,
” বি’ষ খেয়েও যদি কেউ না ম’রে। তোমার রান্না খেয়ে তার মৃত্যু নিশ্চিত আহিপু ” তাদের রিভিউ শুনে খ্যা’ক করে ওঠে আহি। খি’ট’খি’টে মে’জাজে বলে,
” রিভিউ দেওয়ার আগে তুই ম’রতে পারলি না ? ” এমন কথা শুনে মেয়েকে বকে উঠেন মারুফা বেগম। এমন সময় আসলাম চৌধুরী খাবার টেবিলে আসেন । আহি আগেই তাকে খবর দিয়েছে যে, সে আজ রান্না করেছে।তিনি মেয়ের রান্না কোনটা জিজ্ঞেস করতেই সবাই খাবারের কোয়ালিটি বলে খেতে মানা করে।কিন্তু তিনি ভাবেন মশলা খারাপ হয়েছে হয়তো ।মাছ নিশ্চই খাওয়া যাবে।তাছাড়া মেয়ের হাতের প্রথম রান্না কত শখ করে রেধেছে।রান্না করেই জনে জনে বলে এসেছে তার রান্না খেয়ে আগে রিভিউ দিতে হবে তারপর অন্য রান্না খাবে।তিনি একটা মাছ হতে এক টুকরো গালে দিয়েই চোখ বড় বড় করে,সেটা মুখ থেকে ফেলে দেন।আরো বেশি মন খারাপ হয় আহির।
আসলাম চৌধুরী বলেন,
” প্রথমবার তো তাই এমন হয়েছে। আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে , মা! “বাবার কথা শুনে মুখ কালো করে উপরে চলে যায় সে। সবাই খারাপ বলেছে এইজন্যে নয়। তার মূল উদ্দেশ্য তো তূর্যের মন জয় করা।তূর্য যদি জানতে পারে সে এত বাজে রান্না করছে।তাহলে তো মন জয়ের জায়গা ক্ষ’য় হয়ে যাবে।এমনিতেই তূর্য ভাই যেনতেন খাবার খেতে পারেন না।
আহি যেতেই আসলাম চৌধুরী মারুফা বেগমের দিকে তাকিয়ে বললেন,
” মাছটা সরিয়ে রাখো।আহি যখন রান্না করেছে ভাইজান মুখে দিবেই। পরে আরেক বি’পদ।”
পারভিন বেগম বললেন,
” রয়েছে থাকুক! খাওয়া হলে সব খাবারের সাথে উঠিয়ে রাখা যাবে ”
কিছুক্ষণ পর তূর্য খেতে এলো। হাসপাতাল থেকে ফিরেছে কিছুক্ষণ আছে। গোসল সেরে খাবার টেবিলে এসেছে। আহি আজ সর্ষে ইলিশ করেছে সে কানাঘুষা শুনতে পেয়েছে।তাই প্লেটে ভাত তুলেই আগে ইলিশের বাটির দিকে হাত বাড়ায়। তাহি সাবধান করে বললো,
” আরে ভাইয়া ওটা নিয়ো না ”
প্রশ্ন বিদ্ধ নয়নে তাহির দিকে তাকালো তূর্য।
তারপর বললো,
” হোয়াই?”
পারভিন বেগম বললেন,
” আহি রান্না করেছে। খেতে পারবি না ”
তবুও তূর্যকে মাছের পাত্রটা এগিয়ে নিতে দেখে প্রান্ত বললো,
” জ’ঘন্য রকমের বাজে হয়েছে ভাইয়া ”
মারুফা বেগম বললেন,
” মাছ সিদ্ধ হয়নি ভালো করে।খেতে পারবি না ”
কারো কথায় কান দিলো তূর্য।পরপর দুটি মাছ প্লেটে তুলে খেতে আরম্ভ করলো। সর্ষে ইলিশ তার এমনিতেই পছন্দ ।আর রান্নাটা যখন আহি করেছে সেখানে তো আর কথাই নেয়।
বাকিরা খাওয়া ছেড়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিমায় প্রতিদিনের ন্যায় খাবার চিবোচ্ছে তূর্য।তবে একটু তফাৎ আছে বটে,প্রতিদিন খাবার টেবিলে থাকা কম – বেশি করে সকল আইটেম ট্রাই করে দেখলেও আজ শুধু সরষে ইলিশ দিয়েই পেট পুজো করছে সে।সবাই যে তার দিকে তাকিয়ে আছে সেটা অনুভব করতে পারলো তূর্য। প্লেটের দিকে দৃষ্টি রেখেই সবার উদ্দেশ্যে বলল,
” এভাবে তাকিয়ে থাকার তো কিছু দেখছি না।খেতে প্রবলেম হলে বলো,প্লেট নিয়ে চলে যাই ”
” খালি ইলিশই খাবি আব্বা? বাকি পদ একটু খা ”
” এখন আর রুচি নেই ! রেখে দেও রাতে খাবো ”
বলে তড়িঘড়ি করে উঠে পড়লো তূর্য।সিঁড়ি বেয়ে যাওয়ার পথে মাঝ রাস্তায় দেখা হলো আহির সাথে। এমনি দিন হলে দুই একটা ধ’মক খেতো। তবে আজ কিছু বলেনি তূর্য।চোখ মুখও কেমন দেখাচ্ছে । পাত্তা দিলো না আহি। প্রচণ্ড ক্ষি’ধে পেয়েছে তার।তাই খেতে দৌড়ালো। তবে নিচে এসে একবার জিজ্ঞেস করলো,
” তূর্য ভাইয়ের কী হয়েছে ? ”
মারুফা বেগম বললেন,
” কী আর হবে! তোর সুস্বাদু রান্না খেয়েছে।কেউ খেতে পারলো না তোর রান্না। আর সেই রান্না দিয়ে ছেলেটা এক প্লেট ভাত আরো দেড় পিচ মাছ খেয়ে গেল । তারপরেও সব সময় তার পিছনে লাগবি,বি’রক্ত করবি ”
মায়ের কথা শুনে সে আর খাবার টেবিলে না বসে এক দৌঁড়ে তূর্যের রুমে গেল।এবার আর অনুমতি নেয়নি।দরজা খোলা পেয়েই ঢুকে পড়েছে। যেয়েই দেখতে পেলো তূর্য ওয়াশরুম থেকে বের হচ্ছে। চোখে মুখে পানির ফোঁটা।মাথায় আর মুখে পানি দিয়েছে মনে হয়। কেমন অসুস্থ অসুস্থ দেখাচ্ছে। ব’মি করেননি তো? মনে থাকা প্রশ্নটা করেই ফেললো আহি
” আপনি কি ব’মি করেছেন তূর্য ভাই?”
তূর্য কোনো কথা না বলে বেলকনি থেকে তোয়ালে এনে হাত মুখ মুছতে আরম্ভ করলো। আহি মন ম’রা হয়ে ফের বললো,
“সবাই মানা করার পরও খেতে কেনো গেলেন?”
” ভালোই ব্যবসা পেয়েছিস দুইজনে সামনে স্পেশাল স্পেশাল আইটেম রেখে দিয়ে, তাতে ‘ ডোন্ট টাচ ‘ সিল মেরে দিবি ”
কথাটার গভীরতা বুঝতে পারলো না আহি।সে ভোলাভালা মুখ করে বলল,
” দুইজন কে কে ? আমি একাই রান্না করেছি ”
এ প্রসঙ্গে আর কথা বাড়ালো না তূর্য।কথা ঘুরাতে উল্টে আহি কে প্রশ্ন করলো,
” কি বলেছিলাম তোকে ?”
আহি চিন্তিত কন্ঠে বললো,
” কী ?”
” জায়গাটা ঢেকে রাখতে বলেছিলাম ?”আলমারি থেকে শার্ট বের করতে করতে বলল তূর্য।
” ঢেকেই তো রেখেছি ! এই দেখেন এখনো ঢেকে রেখেছি ”
” তাহলে আম্মু দেখলো কীভাবে ,ই’ডিয়েট? ”
” সকালে আপনার কাছে আসার সময় দেখে নিয়েছে ”
” ডে বাই ডে মান – সম্মান শেষ করে ছাড়ছিস আমার”
” আমি আবার কি করলাম ! খালি খালি ব’কবেন না তূর্য ভাই ”
” কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান না করে দূর হ ”
এই পর্যন্ত জীবনে যে কয়দিন আহি তূর্যের রুমে এসেছে তাদের মধ্যে কথোপকথনের শেষ কথা তূর্যই বলে আর সেটা হলো — হয়,’ দূর হ ‘ নাহয়, ‘ বিদায় হ ‘ । সে কি চিরকাল থাকার জন্য এসেছে নাকি? তাড়িয়ে না দিলেও তো যাবেই ! আই লাভ ইউ বলেছে তাতে কী হয়েছে? ডিমান্ড বেড়ে গেছে?তাকে ছ্যাঁ’চড়া মেয়ে ভাবছে ?তার আই লাভ ইউ সে উইথড্র করে নিল। এবার থেকে না হয় বলবে,’ আই উইল ম্যারি ইউ ” ডিসিশন চেঞ্জড অ্যান্ড ফাইনাল !
প্রায় ঘন্টা খানেক পূর্বে তাসিনসহ তূর্যের বাকি সকল ফ্রেন্ড অর্থাৎ নাবিল,পিংকি আর আলিয়া হাজির হয়েছে চৌধুরী নিবাসে। চৌধুরী গিন্নিদের আতিথেয়তা শেষে তারা এখন গেস্ট রুমে রেস্ট করছে।তাদের সাথে শান্ত,প্রান্ত, আহি, তাহিও রয়েছে।পুরো মজলিশ জমিয়ে রেখেছে শান্ত আর তাসিন। নাবিল আজ মুখে কুলুপ এঁটেছে। কোনো কথা না বলে পারলে বলছে না।যখই মনে হচ্ছে এইবার কথা বলতে না পারলে পেট ফেটে ম’রে যাবে তখনই খুব সাবধানতার সহিত মেপে মেপে কথা বলছে।কারণ,এখানে আসার আগে তাকে কড়াল করিয়ে আনা হয়েছে ,একটা গা’লিও যেন মুখ থেকে বের না হয়।অথচ, গা’লি ছাড়া তো তার কথাই সম্পন্ন হয় না।যদিও এখন বা’ড়া বলা অনেকটাই কমিয়ে দিচ্ছে। কেননা,ভবিষ্যতে যখন বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে পিংকির বাবার কাছে যাবে তখন প্রথমেই তার হবু শ্বশুর মশায় যে রাজি হবেন না এটা সে চোখ বন্ধ করে বলতে পারে।তারপর যদি রে’গে মেগে বলে ওঠে ” বা’ড়ার শ্বশুর আব্বা আমার। বা’ড়া বা’ড়া কইরেন না তো। মেয়ে দিবেন না,এটা আবার কোন বা’ড়া মার্কা কথা বার্তা ? ‘ তখন কি একটা কে’লেংকারী কান্ড ঘটবে।ভাবা যায়?
এদিকে যার সূত্র ধরে চৌধুরী নিবাসে আসা সেই ব্যক্তিই অনুপস্থিত।তারা একের পর এক কল করে যাচ্ছে ফোন বন্ধ । তাহলে কি তখন তূর্য সত্যিই বলেছিল? তারা যেদিন আসবে সেদিন সে বাড়িতে থাকবে না? নাবিল একটু ফাঁকায় গিয়ে তূর্যকে আবার কল করলো।এইবার রিং হতে না হতেই কল রিসিভ হলো।নাবিল বললো,
” বা’ড়া কই তুই? কখন থেকে ওয়েট করতাছি ”
” ওটি তে ছিলাম।আসছি ! ” বলে কল কাটলো তূর্য।
নাবিল এসে পুনরায় তার আসন গ্রহণ করলো।নাবিলকে একপাশে গিয়ে কথা বলতে লক্ষ্য করেছ পিংকি । তাই সে বলল,
” চি’পায় গিয়ে কার সাথে কথা সেরে আসলি ?”
” ভ’য় পাস না।কোনো মাইয়ার লগে কথা কই নাই ”
” ক ! আমি তোকে মানা করেছি?” রে’গে কথাটা বলল পিংকি। নাবিলের মাথায় দু’ষ্টুমিরা চাড়া দিলো । পিংকিকে আরো রা’গাতে বলল,
” সত্যিই বলবো? আশা কিন্তু এখনো টেক্সট দেয়।কথা কইয়া দেহি ।কি কস?”
সত্যিই রেগে গেল পিংকি।নাবিলের কথার প্রেক্ষিতে আর কোনো কথা বললো না।নাবিল হাসতে হাসতে বলল,
” আরে তূর্য ছিল !”
প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ২২
পিংকিও যে মনে মনে নাবিলকে পছন্দ করে এটা ঢের বুঝতে পারে নাবিল।কিন্তু স্বীকার করে না কেন এটাই মাথায় আসে না।মেয়ে জাতি তো তাই হয়তো ভাব বেশি।হয়তো তাকে ম্যাডামের পিছনে নাকে দড়ি বেঁধে ঘুরাতে চায়।সমস্যা নেই তো। সেও ঘুরতে রাজি আছে।একেবারে কুত্তা ঘুরা ঘুরবে। কতো কাল নিজের অনুভূতি চেপে রাখবেন ম্যাডাম? সেও দেখে নিবে।কথা গুলো ভেবেই একটা হায় ছাড়ল নাবিল। পরে আবার তূর্যের মতো কাহিনী না হয়ে যায়। দেড় যুগ ধরে কিভাবে নিজের অনুভূতি চেপে বসে আছে বন্ধু তার!সে তো মাত্র কয়েক বছর ধরে পিংকিকে পছন্দ করে।তাতেই এই হাল।আর যদি তূর্যের মতো পছন্দের মানুষের সাথে এক বাড়িতে,এক ছাদের নিচে থাকতো তাহলে এত দিন বিয়ে হোক বা না হোক বা’সর হয়ে যেত কনফার্ম।এতে কোনো স’ন্দেহ নেই তার।
