Home প্রণয় ব্যাকুলতা প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ২৬

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ২৬

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ২৬
ইনান হাওলাদার

” কি মেয়ে মাস্টার ঠিক করে দিয়েছিস বাবা।মেয়েরা কি আর ভালো করে পড়াতে পারে !”
কথাটা বলতে বলতে তূর্যের রুমে প্রবেশ করলেন মারুফা বেগম।
মেয়েরা নাকি ভালো পড়াতে পারে না। ভালো – মন্দ পড়াতে জে’ন্ডারে কি আসে যায়? যারা ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট যারা তারা খুব বেশি ভালো পড়ায় আর যারা মোটামুটি ধাঁচের সুটুডেন্ট তারা খারাপ পড়ায় ব্যাপারটা এমনও নয়। আসলে অভিজ্ঞতাই মেইন। যার যত বেশি অভিজ্ঞতা সে ততো বেশি
ভালো পড়ায়।তাতে সে যেমন শিক্ষার্থীই হোক না কেনো।
অন্যকেউ এহেন কথা শুনলে হয়তো অট্ট হাসিতে ফেটে পড়তো।তবে তূর্য মুচকি হেসে বললো,

” কেন? আহির বুঝতে প্রবলেম হচ্ছে?”
” না ,সেরকম কিছু না। তুই একটা ভালো ব্যাচ ঠিক করে দিস ।বাড়িতেও পড়লো আর সেখানেও পড়লো।”
” আচ্ছা “ছোট্ট করে উত্তর দিলো তূর্য।
মারুফ বেগম ঘর ছাড়ার আগে তূর্যকে একটু পরখ করলেন।ছেলেটার চোখ মুখ কেমন যেন ফ্যাকাশে লাগছে।গ’ম্ভীর চেহারাটা আজ কেমন নরম হয়ে আছে।মুখের রংটা ম্লান লাগছে।তিনি চি’ন্তিত গলায় বললেন,
” শরীরটা কি খারাপ লাগছে, বাবা?চোখ মুখ কেমন ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে ”
” তেমন কিছু না।এক কাপ ব্ল্যাক কফি পাঠিয়ে দিতে পারবেন মেজো মা?”
” সেটা না হয় দিচ্ছি “কথাটা বলে এগিয়ে গেলেন মারুফা বেগম।তূর্যের কপালে হাত ছোঁয়াতেই দেখলেন গা গরম।মোটামুটি ভালোই গরম। তারপর একে একে গালে গলায় হাতের উল্টো পিঠ সদর পিঠ ছুঁইয়ে দেখে বললেন,
” জ্বর এসেছে ! আমি খাবার পাঠিয়ে দিচ্ছি।খেয়ে ওষুধ খেয়ে নিস ”
তূর্য ছোট বেলা থেকেই বৃষ্টির পানি লাগে লাগাতে পারে না। যদিও ভুল ক্রমে একটু ভিজেছে তো জ্বর আসতে দিতেই হবে। লাস্ট ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে ভিজেছিল আর আজ ভিজলো।সেদিনও বৃষ্টি ভেজার কারণ আহি ছিল।আজও আহি।

রাত বারোটা নাগাদ পিঙ্কিদের বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে আছে নাবিল। পরনে একটা কালো টিশার্ট আর সাদা হাফ প্যান্ট।
ছাদের রেলিং বেয়ে উঠে ঘেমে – নেয়ে একাকার অবস্থা। হাত পায়ের কিছু কিছু জায়গা থেকে চামড়াও উঠে গিয়েছে। হাতে একটা বাটন ফোন,তার মায়ের।সেই মোবাইল দ্বারাই পিংকিকে কল করে ছাদে আসতে বলেছে । না আসলে সোজা মেইন গেইট দিয়ে ঢুকবে বলে হু’মকি দিয়েছে। সেই ভ’য়েই মূলত পিংকি আসছে। রাত দুপুরে একটা ছেলে বাড়িতে ঢুকবে পাশের ফ্ল্যাটের মানুষ জানলে কে’লেংকারী কান্ড ঘটবে। এমনিতেই তারা সবসময় ওৎ পেতে থাকে।
প্রায় মিনিট সাতেক পর চুপি চুপি ছাদের দরজা খুলে প্রবেশ করলো পিংকি। দরজা খুলতেই আলো – আঁধারিতে নাবিলের মুখ ভেসে উঠলো। চাহুনি কঠিন,চোয়াল শ’ক্ত করে রেখেছে। খুবই মুডি মুডি ভাব। অথচ,সে যে আস্ত একটা জো’কার এখন সেটা, দেখে বোঝার উপায় নেই।পিংকি ছাদের মেঝেতে পা রেখেই বললো,

” এতো রাতে কী তোর?”
” এই মাংকির বা’চ্চা,একদম কথা কইবি না। সব জায়গায় থেকে ব্লক মা’রাইস ক্যান ?কি বা’ড়া বা’ড়া শুরু করছস? ”
” চলে যা,নাবিল। কেউ দেখে ফেললে স’র্বনাশ হয়ে যাবে ” বলে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায় পিংকি। নাবিল পিছন থেকে শ’ক্ত করে ওর হাত ধরে নিজের দিকে ফিরিয়ে তিরতিরে মে’জাজে বললো,
” বা’ড়ার এক্স’কিউজ দেহাইবি না। দেহুক! লাভ ম্যারেজ তো করবি না এহন ক’ট ম্যারেজ ছাড়া উপায় দেখতাছি না ”
” হাত ছাড় আমার। ” নিজেকে নাবিলের মুঠোবন্ধি হতে ছাড়ানোর বৃথা চেষ্টা করতে করতে বলল পিংকি।সাথে কয়েকবার হাত ঝাঁকিও দিলো।কিন্তু সফল হলো না।
” ব্ল’ক মা’রাইছস ক্যান আগে ক ,ছাইড়া দিতাছি ”
” দিনকে দিন তো ভাষার উন্নতি হচ্ছে।মন চেয়েছে তাই ব্লক করেছি । শুনেছিস? যা এবার ”
” তোর বা’ড়ার মনরে আমি ওরি! তুই শুনেছিস? ব্লক খোল কইতাছি । নাইলে তোরে আমি…. তোরে আমি …”
” কী করবি আমাকে? প্রতিটা কথার সাথে এক কুড়ি বা’ড়া লাগিয়ে খালি বড় কথাই বলে যা। আর এদিকে আমার বিয়ে হয়ে যাক।

আমি মেয়ে মানুষ নাবিল। ত্রিশ পার হতে চললো। মানুষ নানান কথা বলে। বাবা – মা বারবার করে বলছেন পছন্দের কেউ থাকলে জানাতে। আমি কী বলবো? তোর কথা বলবো? একবারও ভালোবাসি বলেছিস ? ”
বেশ খানিকটা জোরে কথাগুলো বললো পিংকি।
কথাগুলো বলার সময় তার চোখে অশ্রু ঝলমল করছিল, বুক ভারী, হৃদয় দুলছিল ব্য’থায়। প্রতিটি শব্দের সঙ্গে তার অ’ভিমান, হ’তাশা এবং অপ্রকাশিত ভালোবাসা ফেটে পড়েছে।
নাবিল বুঝলো তার অপ্রকাশিত ভালোবাসা।আসলেই!সে তো কখনো ভালোবাসি বলেনি।কিন্তু ভালোবাসি না বলে কী ভালোবাসা যায় না? শুধু ভালোবাসি বললেই ভালোবাসা হয়? নাহলে হয় না? কই তূর্য তো একবারও আহিকে ভালোবাসি বলেনি! তাহলে তূর্য কি আহিকে ভালোবাসে না? পা’গলের মতো ভালোবাসে। সেটা তো পিংকি নিজেই বলে।তাহলে তার বেলায় এমন কেন করছে? বুঝেও না বোঝার ভান কেন ধরছে?
একেক জনের ভালোবাসা একেক রকমের আর প্রকাশের ভঙ্গিও একেক রকমের। মুখেই যা ভালোবাসি বলা হয়নি।কিন্তু কাজে – কর্মে তো দেখিয়েছে।তাহলে মুখে বলাটা কি জরুরী কিছু? সারাদিন ভালোবাসি,ভালোবাসি বলে মুখে ফ্যা’না তুলে ফেললেই ভালোবাসা হয়?
পিংকি এবার শান্ত কন্ঠে ফের বললো,

” এখন কিছু করার নেই!
আমি আরেক লোকের সাথে বিয়ে করে নেই। তারপর…”
” তারপর তোর সংসার হোক ,বছর না যাইতেই বাচ্চা হোক।আর সে আমারে মামা কইয়া ডাকুক।তাইতো? ”
পিংকিকে কথা শেষ করতে না দিয়েই তার কথার সাথে নিজের কথাগুলো যোগ করলো নাবিল। পিংকির
প্রথম কথাগুলো শুনে সে যতটা ক’ষ্ট পেয়েছিল।এখন ঠিক ততটাই রা’গ হচ্ছে।বিয়ে করার স্বপ্নও দেখে ফেলেছে।কত বড় সা’হস!
পিংকি নাবিলের কথায় সাঁয় দিয়ে বললো,
” হ্যাঁ!”
কথাটা কর্ণগোচর হতেই নাবিল নিজের ডান হাতের আঙ্গুল দ্বারা পিংকির গাল চেপে ধরে হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে রা’গে ফুঁ’সতে ফুঁ’সতে বলল,

” কী কইলি?এই কী কইলি তুই ?”
” উফ ,লাগছে আমার । ছাড় , নাবিল !” নাবিলের হাত থেকে নিজের গাল ছড়ানোর চেষ্টা করতে করতে কোনো রকমে কথাটা বললো পিংকি । কথাগুলো পুরোপুরি স্পষ্ট ভাবে বের না হলেও বোঝা গিয়েছে। নাবিল ছেড়ে দিলো পিংকির গাল।এইবার দুই হাত দ্বারা ওর মুখ আজলা করে ধরে ঠোঁ’টে ঠোঁ’ট ডুবিয়ে দিলো। নাবিলের হঠাৎ আক্রমণে পিংকি কিংকর্তব্যবিমূঢ় ।
ধীরে ধীরে গভীর হলো চু’ম্বন!যেন সমস্ত রা’গ উগড়ে দিচ্ছে। পিংকি প্রথমে স্ত’ম্ভিত হলো। চোখে বিস্ময়, মন অচেতনভাবে থমকে গিয়েছে।এদিকে নাবিলের ঠোঁ’টের স্পর্শ আরো গভীর হচ্ছে। একপর্যায়ে চোখ বন্ধ করে নিলো সে।ধীরে ধীরে অনুভব করতে লাগলো। প্রতিটি স্পর্শে অপর দিকের লোকটার হৃদয়ের আ’গুন আর রা’গ মিলিত হয়ে তার নিজের ভেতরের আবেগকেও জাগিয়ে তুলছে। সমস্ত অ’শান্তি, রাগ-অ’ভিমান সবকিছু একসাথে প্রকাশ করছে। এভাবে বেশ কিছুক্ষন পার হলো।পিংকি শত চেষ্টা করেও নিজেকে নাবিলের থেকে মুক্ত করতে না পেরে একপর্যায়ে সবটা মেনে নিয়েছে। ও’ষ্ঠভাজ হতে মুক্ত পেতেই সেকেন্ডের ব্যবধানে সে নাবিলের গলার কাছের টিশার্ট দুই হাতের মুঠোয় খা’মচে ধরে দাঁত কি’ড়মিড় করতে করতে বললো,

” তুই এটা কি করলি নাপিতের বা’চ্চা ”
নাবিল বুঝতে পারলো সে ভুল করেছে। রা’গের মাথায় করে ফেলেছে।এখন চাইলেও শুধরাতে পারবে না।সে পিংকির গাল আজলা করে ধরা অবস্থাতেই নিজের বৃদ্ধা আঙ্গুল দ্বারা পিংকির ঠোঁ’ট মুছে দিতে দিতে বললো,
” স্য’রি জা’ন! রা’গ করিস না পাখি।এই যে মুছে দিছি! আর কিচ্ছু নেই। ” তারপর আবার নিজের ঠোঁট মুছতে মুছতে বলল,
” আমারডাও মুইছালাইছি ।
আমি কালই মা – বাবারে নিয়ে আসবো।তুই শুধু হ্যাঁ কইয়া দিস, প্লিজ জা’ন।আর হ্যাঁ, আমি শুদ্ধ ভাষায় কথা কইবো।”
হাতের মুঠোয় ধরে রাখা নাবিলের টিশার্ট ছেড়ে দিলো পিংকি।
নাবিলের মুখে এত এত আদুরে ডাক শুনে সে বোধ হয় ল’জ্জা পেল। মাথা নিচু করে ফেললো। কপট রা’গ দেখিয়ে বলল,
” নি’র্লজ্জ! তুই কি বলবি? আংকেল – আন্টি বলবেন ” দুই গালে লাল আভা ছেয়ে গিয়েছে তার। নাবিল সেটা পরখ করলো।আর মুখে বললো,
” বলবো না? আচ্ছা কইবো না। তুই যা কইবি তাই হইবো ”

বেলা প্রায় এগারোটা পেরিয়েছে, প্রায় দুপুর হয়ে আসছে।বাইরে থেকে সূর্যের আলো জানালার কাচে প্রতিফলিত হয়ে ঘরের এক কোণে উজ্জ্বলতা ছড়িয়ে দিয়েছে। শহরের কোলাহল এখনো পুরোপুরি চূড়ায় ওঠেনি, কিন্তু অফিসের ভেতরটা ইতিমধ্যেই ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। এসি – ফ্যান দুইটাই চলছে। ফ্যানটা ঘুরছে একটানা।অফিসের ভেতর লোকজনের হালকা কথাবার্তা, প্রিন্টারের শব্দ, আর ঘড়ির টিকটিক মিলে একটা ছন্দ তৈরি করেছে।
জানালার পাশে টেবিলের ওপর ছড়িয়ে আছে কিছু ফাইল।
আসলাম চৌধুরী চুপচাপ বসে আছেন চেয়ারে হেলান দিয়ে, চোখ নিচু করে ফাইলের পাতাগুলো উল্টে যাচ্ছেন। চেহারায় কোনো ক্লান্তি নেই, মনোযোগের গভীর রেখা স্পষ্ট।চোখদুটোতে কাজের একাগ্রতা। তিনি মনোযোগ সহকারে একের পর এক ফাইল দেখে যাচ্ছেন।এরইমধ্যে তার মুঠোফোন বেজে উঠলো। এক পুরোনো বন্ধুর কল। বন্ধুত্ব পুরোনো হলেও সম্পর্কটা ততো বেশি গভীর নয়। তবে বেশ ভালো। লোকটা একটু রসিক স্বভাবের।
কল রিসিভ করে কানে ধরলেন তিনি। সাথে সাথে লোকটা রসিকতার সাথে বললেন,

” কী গো বেয়াই মশায়।কি খবর? দিনকাল কেমন যায়? কোনো খোঁজ খবর তো দেউও না আর নেউও না।বাধ্য হয়ে আমাকেই নিতে হয় ”
একনাগাড়ে কথাগুলো করে থামলেন তিনি।মজার বিষয় হলো, এই যে তিনি আসলাম চৌধুরীকে বেয়াই বললেন ,অথচ তার কোনো ছেলেই নেই। চারটা মেয়ে আর চারজনেই বিয়ে – সাদির কার্য সম্পন্ন।আকবর চৌধুরী ,আসলাম চৌধুরী ভেবেছিলেন লোকটার ছোট মেয়েটাকে নিজেদের বাড়ির বড় বউ বানাবেন। খুব মিষ্টি দেখতে মেয়েটা।কিন্তু তূর্যের সাথে পেরে ওঠেননি তারা।কিছু মাস আগেই সেই মেয়েটারও বিয়ে হয়ে গিয়েছে।অবশ্য তূর্য আর আসিফ চৌধুরী ব্যতীত চৌধুরী বাড়ির সবাই সেই বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন । মেয়েটাকে নিজেদের বাড়ির বউ বানাতে না পেরে দুই ভাইয়ে মিলে বারবার আফসোসও করছিলেন।
কথা বলার এক পর্যায়ে লোকটা বললেন,

” কিছু মনে করো না চৌধুরী। কাল তোমার মেয়েকে দেখলাম একটা ছেলের সাথে বৃষ্টিতে ভিজছে। ”
শরিফুল শেখের মুখে এমন কথা শুনে আসলাম চৌধুরী স্তব্ধ হয়ে রইলেন ।
আহি এমনটা করতে পারে না তার বিশ্বাস। তবুও মেয়ে বড় হয়েছে ,এখন ভার্সিটিতে পড়ে সে।হুযোগে কিছু করেও ফেলতে পারে।আসলে বয়সটাই তো এমন। তিনি কথাটা বিশ্বাস না করলেও ভিতরে ভিতরে ভ’য় পাচ্ছেন। প্রেম – ভালোবাসাকে তিনি খারাপ চোখে দেখেন না। কিন্তু পথে ঘাটে বৃষ্টিতে ভেজা! এগুলো তো খারাপ। সব সময় মেয়েকে সর্বোচ্চ স্বাধীনতা দিয়েছেন। প্রথমে কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ হয়ে থেকে তারপর বললেন,

” তুমি আহিকেই দেখেছো শেখ?”
” হ্যাঁ,বন্ধু। তোমার বাড়ির প্রত্যেক সদস্যকেই আমি ভালো করে চিনি । আমিও প্রথমে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।
তবে ছেলেটাকে আমি ভালো করে দেখতে পাইনি। পিছন দিক দিয়ে দেখে মনে হচ্ছিল ভদ্র পরিবারের সন্তানই হবে। বেশভূষা ভালো। মেয়ের সম্মতি থাকলে কথা বলে পাকা করে রাখাই ভালো।আজকালকার ছেলে মেয়ে তারা।”
” তোমার সাথে আমি পরে কথা বলছি ” বলে কল কেটে মারুফা বেগমের মোবাইলে কল করলেন আসলাম চৌধুরী।রিসিভ হতেই থমথমে গলায় প্রশ্ন ছুঁড়লেন,
” কাল ইউনিভার্সিটি থেকে কখন ফিরেছিল আহি?”
” তিনটা নাগাদ। কিছু হয়েছে কি? তোমার গলা এমন শোনাচ্ছে কেন?” চিন্তিত হয়ে পড়লেন মারুফা বেগম।
” ওকে কেউ আনতে যায়নি? একা ফিরেছে?”
” হ্যাঁ , গিয়েছিলো। তূর্য গিয়েছিল। তোমার মেয়ের পাল্লায় পড়ে ছেলেটাও বৃষ্টিতে ভিজছে । আর এখন জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। ”
স্ত্রীর কথা শুনে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন আসলাম চৌধুরী।তাহলে ছেলেটা তূর্য ছিল।
মাথা থেকে যেন একটা বড় দুশ্চিন্তা নেমে গেল।মনে মনে আল্লাহর দরবারে হাজারটা শুকরিয়া আদায় করলেন। আর কিছু না বলেই কল কাটলেন তিনি। মারুফা বেগম ও আর কল ব্যাক করলেন না। হয়তো ব্যস্ত আছেন, এই ভেবে।

এখন প্রায়ই আহিকে রান্নাঘরে দেখা যায়। দুই একদিন পরপরই মোবাইল দেখে এটা ওটা রান্না করার ট্রাই করে। পারফেক্ট না হলেও মন্দ হয় না। আজও এসেছে নুডুলস রান্না করতে।ভেবেছে সবজি নুডুলস রান্না করবে ।যদিও তার সবজি নুডুলস পছন্দ না তবে তূর্যের বেশ পছন্দ। বেশ পছন্দ বলতে ,তৈলাক্ত খাবার সে কম পছন্দ করে সবজি নুডুলস হলে দুই এক চামচ গালে দিয়ে দেখবে। তাছাড়া কাল বৃষ্টিতে ভেজার পর থেকে তার আর তূর্যের রুমে যাওয়া হয়নি। এই অজুহাতে যেতে পারবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে মন মতো কোনো সবজিই খুঁজে পাচ্ছে না। যেটাই দেখছে সেটা হয় তূর্য পছন্দ করে সে করে না ,আর নাহয় সে পছন্দ করে তূর্য করে না। এরইমধ্যে কিচেনে ঠুকঠুক আওয়াজ পেয়ে মারুফা বেগম ছুটে আসলেন। মাকে দেখে আহি বললো,

” আম্মু সবজি নুডুলস রান্না করবো।ঘরে কি কি সবজি আছে?”
” কচু, কচুর মুখি, করলা আর বেগুন আছে।আর কচুর লতিও আছে।”
” আর?”
মারুফা বেগম যে ইচ্ছা করে ভুলভাল সবজিগুলোর নাম বললেন সেটা না বুঝেই আহি কথাটা বললো।
” ছেলেটাকে বৃষ্টিতে ভিজিয়েছিস, এখন গিয়ে দেখ জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। আর লাট সাহেবের বা’চ্চা লুডুস রান্না করতে এসেছেন। অ্যাঁহ ,নুডুলস ! ”
মায়ের কথা শুনে বুকের ভিতরটা হুহু করে উঠলো আহির।সে মন ম’রা হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
” তূর্য ভাইয়ের জ্বর এসেছে আম্মু ?কখন থেকে?”
“তূর্য যে বৃষ্টির পানি গায়ে লাগাতে পারে না, তুই সেটা জানতিস না? তাহলে কেনো এভাবে ভিজতে গেলি ”
” তোমাদের ছেলে দেশি হয়েও যদি ব্রয়লার মুরগির মতো আচরণ করে তাতে আমার মেয়ের কী দো’ষ বলো মেজো বউ ”
ভাসুরের গলার আওয়াজ পেয়ে মারুফা বেগম মাথায় টেনে রাখা কাপড় আরেকটু ঠিকঠাক করে বললেন,
” কিছু দরকার ,ভাইজান?”
” তূর্যের মা কোথায়?” সোফায় বসতে বসতে বললেন আকবর চৌধুরী।
” তূর্যের কাছে! চা খাবেন ভাইজান? আমি করে দিচ্ছি ”
” আচ্ছা দেও তাহলে ”

চাচা আর মায়ের কথার মাঝখানে আহি জায়গা ত্যাগ করলো। তূর্য ভাইয়ের জ্বর এসেছে ,অথচ সে কিছুই জানে না। এতটা দায়িত্বজ্ঞানহীন হলে তো চলবে না। মনের ভিতরটাও খুব খারাপ লাগছে। এক অদ্ভুদ টান অনুভূত হচ্ছে। এটাকেই বোধ হয় ভালোবাসা বলে। সে কবে তূর্য ভাইকে এত ভালোবেশি ফেললো?
আহি এক দৌঁড়ে তূর্যের রুমে চলে গেল।পারভিন বেগমকে রুম থেকে বেরোতে দেখে জ্বরের কি অবস্থা একবার শুনে নিলো।
ভিতরে গিয়ে দেখলো তূর্য গায়ে পাতলা কম্বল জড়িয়ে কাত হয়ে শুয়ে আছে।তার মলিন মুখের দিকে তাকাতেই আহি র বুকের ভিতর খচ করে উঠলো। তার নাহয় খেয়াল ছিল না যে,তূর্য ভাই বৃষ্টিতে ভিজতে পারে না। কিন্তু ওনার তো খেয়াল ছিল।তিনি কেন ভিজতে গেলেন?
তূর্যের জ্বর আসলে মা’রাক্তক ভাবেই আসে। আহির ইচ্ছা করছে খুব জোরে কান্না করতে। ইতিমধ্যে চোখ পুড়তে আরম্ভ করেছে। সে গিয়ে আস্তে করে তূর্যের শিয়রে বসলো। চুলের মধ্যে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো।
কিছুক্ষণ ধরে তার স্পর্শ অনুভব করলো তূর্য তারপর জড়ানো গলায় প্রশ্ন করলো,

” কি নিতে এসেছিস? নিয়ে টিয়ে যা ”
কষ্ট পেলো আহি।সে কি সবসময় কিছু না কিছু নিতে আসে নাকি? সে তো কিছু নেওয়ার অ’জুহাতে তূর্যের রুমে আসে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো,তূর্য ভাই তো ওদিক ফিরে শুয়ে আছেন তাহলে এটা যে সে, তিনি কিভাবে বুঝলেন? আচ্ছা,তূর্যও যদি কখনো তাকে পিছন থেকে স্পর্শ করে সে কি বুঝতে পারবে?
ভাবনা চিন্তা করতে করতে আহি তূর্যের চুলের ভাঁজ হতে হাত সরিয়ে নিতেই তূর্য আহির হাত ধরে পুনরায় তার চুলের ভাঁজে দিয়ে দিলো। তূর্যের উষ্ণ খসখসে হাতের স্পর্শে কেনো জানি আহির ভিতরটা ধুক করে উঠলো। এই বললেন,” কি নিতে এসেছিস,নিয়ে টিয়ে যা ” আর এখন নিজেই আটকাচ্ছেন। এতো বড় চাপা স্বভাবের পুরুষ মানুষ সে জীবনে দুইটা দেখেনি। ভালোবাসেন বললে কি হয়? সে আবার চুলে বিলি কাটতে আরম্ভ করলো। ইচ্ছে করছে কপালে গাঢ় একটা চু’মু খেতে। কিন্তু এসব করলে যদি তূর্য ভাই খেপে যান?
কিছুক্ষণ পার হতেই তার মাথায় দুষ্টুমি চাপলো।তার জ্বর হলে তূর্য বলেছিল,” এমন ভাব করছিস যেন ম’রে যাচ্ছিস”
কথাটার শোধ তোলার এখনই মোক্ষম সময়।
সেও শোধ তুলতে ব্যঙ্গ করে বললো,

” এইটুকু জ্বরে এভাবে ভেঙে পড়লেন তূর্য ভাই?”
” রি’ভেঞ্জ নিচ্ছিস?” একটু দেরিতে উত্তরটা আসলো।
” সত্যিটাই বললাম।রিভেঞ্জ নেওয়ার কী আছে!”
এবার তূর্য ঘুরে আহির দিকে কাত হয়ে শুয়ে বললো,
” সময় আমারও আসবে। এক মাঘে শীত যায় না ,কথাটা মাথায় রাখিস ”
” শরীরের জোর পড়েছে। তবুও মুখের জোর পড়ে না আপনার ” কথাটা বলতে বলতে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো আহি। তূর্যকে দিয়ে তার বিশ্বাস নেই।দেখা গেল ধা’ক্কা দিয়ে বিছানা থেকে ফেলো দিলো।তারপর কোমর ভে’ঙে সেও তূর্য ভাইয়ের সাথে বিছানায় পড়ে থাকলো। তাই আগে থেকেই সাব’ধানতা অবলম্বন করা ভালো। মানুষ বলে না,
‘ হুস থাকতে ম’উত নেই।’
” শরীরেরটাও পড়েনি।ইফ ইউ ওয়ান্ট, আই ক্যান প্রুভ ইট।”
” আচ্ছা করুন প্রুভ ! দেখি ”
” সময় হলে দেখাবো ”

” তারমানে জ্বর সেরে গেলে ? হা হা,এটাই বাস্তব “বলে হাসতে আরম্ভ করলো আহি।এতক্ষণে একবারের জন্যও চোখ খুলেছিল না তূর্য। মাথার যন্ত্রণায় চোখ খুলতে পারছে না।চোখ বন্ধ অবস্থাতেই আহির সাথে তর্কাতর্কি করেছে।তবে এইবার হৃদরহরিণীর মিষ্টি হাসির আওয়াজে আর চোখ বন্ধ করে রাখতে পারলো না। এই অপরূপ দৃশ্য দেখার লোভ সামলাতে না পেরে ক’ষ্ট শর্তেও নিভুনিভু চোখে তাকালো। তার ঠোঁটের কোণায়ও হাসির ঝিলিক খেলে গেল ।আহি দেখলো কিনা কে জানে ।
তূর্য একদৃষ্টে চেয়ে থাকতে থাকতে অন্যমনস্কতায় বলে ফেললো,

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ২৫

” চিকি লেইডি !”
আহি হাসি থামিয়ে দিয়ে চোখ ছোট ছোট করে তূর্যের দিকে চাইলো।তারপর একটু নিচু হয়ে আ’র্তনাদ করে বললো,
” হায় , হায়! জ্বরের ঠেলায় তো আপনি উল্টোপাল্টা বকেতে শুরু করলেন তূর্য ভাই । ই’ডিয়ট এর জায়গা দু’ষ্টু বলে ফেললেন যে !”
” এভাবে স্টু’পিডের মতো হাসবি না। ই’রিটেইট হই ”

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ২৭