Home প্রণয় ব্যাকুলতা প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৩০

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৩০

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৩০
ইনান হাওলাদার

তূর্যের হাসপাতাল থেকে ফিরতে ফিরতে বিকাল গড়িয়ে গিয়েছে।দুপুরের খাবার বাইরে থেকেই খেয়ে এসেছে। ফিরে এসে সামান্য রেস্ট নিয়ে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়েছে মিনিট দশেক আগে। বাড়ি ফিরে নিজ কক্ষে আসার সময় দেখেছে আহির দরজা ভেজানো।হয়তো রুমে নেই। ড্রয়িং রুমেও দেখেনি। বাগানে আছে হয়তো। বাড়ির বাকি ছোট সদস্যেরও আনাগোনা পাওয়া যাচ্ছে না। সে রুম হতে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাগানের দিকে গেল। সারা বাগানের এমাথা ওমাথা একবার ভালো করে দেখে নিলো।বাগানে আসেনি। বাগানে আসার সময় এবারও রুম ড্রয়িং রুম কোথাও দেখেনি। এই সময়ে আহি কখনো ছাদেও থাকে না। নানান হিসাব – নিকাশ ক’ষতে ক’ষতে পুনরায় অন্দর মহলে প্রবেশ করলো তূর্য। ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে মায়ের কাছে কফি চাইলো।নজর বারবার দোতলার দিকে।পারভিন বেগম তাকে কফির মগ দিয়ে দিতে হেঁয়ালি করে বললেন,

” একটু আগেও ছাদে দেখেছিলাম ”
অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে হকচকিয়ে উঠলো তূর্য। কফির মগে একটা চুমুক দিয়ে বলল,
” তো কী করব? আমি তোমাদের মেয়েকে খুঁজছি নাকি?”
পারভিন বেগম দুষ্টুমির সহিত বললেন,
” আমিও তো বলিনি ছাদে আমাদের মেয়ে । তোর কেন আমাদের মেয়ের কথাই মাথায় আসলো,আব্বা ?” বলে চলে যাচ্ছিলেন তার মধ্যেই তূর্য মাকে পিছু দেখে অপ্রস্তুত কন্ঠে বলল,
” তাহলে কে?”
” আমার ভবিষ্যৎ পুত্রবধূ ! ”

মায়ের কথায় ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো তূর্য।তারপর কফির মগ হাতে ছাদের উদ্দেশ্যে হাঁটা ধরলো।
এদিকে ছাদে বসে তূর্যের জন্যে অপেক্ষা করতে করতে আহি কাহিল। প্রতিদিন এই সময়ে তূর্য ভাই ছাদে আসেন। তাই তো সে আগে – ভাগে এসে বসে রয়েছে। কালকের ঘটনার পর যদি তিনি রে’গে গিয়ে আর তার রুমে না যান? তাই সে আগেই ছাদে এসে বসে আছে।চোখের সামনে পড়লে হয়তো স্য’রি বলতেও পারেন।
খানিক আগেই তো সে তূর্যের গাড়ির শব্দ শুনেছে।তারপর দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে ছাদে এসেছে।কিন্তু এখনো আসছেন না কেন?

তিনি কি কোনো ভাবে খবর পেয়েছেন সে ছাদে? তাই হয় তো আসছেন না।
আহি মনে মনে এসব ভাবতে ভাবতে ছাদ থেকে নামছিল।কয়েকটা সিঁড়ি ভা’ঙার পর তূর্যকে দেখতে পেল। সেও ছাদের দিকেই আসছে।আহির চোখ মুখ খুশিতে চিকচিক করে উঠেছে। দুজনার চোখা চোখি হলো।
কিন্তু এইমুহুর্তে সে যদি ছাদে ফেরত যায় বা এখানেই দাঁড়িয়ে যায় তাহলে তূর্য তার অভিমানকে ঠুনকো ভাবতে পারে। তাই সে অনিচ্ছা সত্ত্বেও সিঁড়ি বেঁয়ে নামতে থাকলো। মনে মনে একটাই প্রার্থনা তূর্য ভাই তাকে ডাক দিক ।একবার পিছু ডাকলেই দাঁড়িয়ে যাবে।কিন্তু , আফসোস ! তূর্য ডাকলো না।
কেন সে আগ বাড়িয়ে নামতে গেল? আর দুইটা মিনিট অপেক্ষা করলে কী হতো? এখন নিজের উপরই রা’গ উঠছে তার।এভাবে আর কতদিন কথা না বলে থাকবে? এসব ভাবনার মাঝে আহি হঠাৎ আবিষ্কার করলো তার পিছুপিছু কেউ আসছে। তূর্য ভাই নন তো ? হ্যাঁ,তূর্য ভাই ই ! তার পারফিউমের ঘ্রাণ নাকে আসছে।
সে বড়বড় পা ফেলে নিজের রুমে চলে গেল।আয়নার সামনে দাড়িয়ে চুলে চিরুনি চালাতে ব্যস্ত হলো। তূর্য ঠিক কিভাবে তাকে স্য’রি বলবে? তবে সে আজ অল্পতে ছাড়বে না। একেবারে ঘাম ছুটিয়ে ছাড়বে। আরো নানান চিন্তা ভাবনা করতে করতে থাকলো সে।
এতসব ভাবনার মাঝে পিছন থেকে নমনীয় কণ্ঠের ডাক ভেসে আসলো,

” আহি ”
পিছনে ঘুরে তাকালো না সে,তাকাবেও না। হঠাৎ কী হলো তার? এইমাত্র কত শত শ’য়তানি ভাবনায় বিভোর ছিল। এখন তূর্যের একটা ডাকেই যেন সকল রা’গ – অ’ভিমান গলায় এসে আটকেছে।শুধু শুধু কান্না পাচ্ছে। কেন? সে যে একটু বেশিই অভিমানী,ন্যাকা সেটা সে নিজেও জানে।কিন্তু এরকম চিছকাঁদুনে তো নয়।তবে যত কষ্টই হোক মোটেও কান্না করা যাবে না। একটুও না।
তূর্য আস্তে আস্তে এগিয়ে এসে আহির পিছনে এসে দাঁড়ালো। আয়নার মধ্যে দিয়ে চোখাচোখি হলো দুজনের। আহি চোখ নামিয়ে নিলেও তূর্য সেদিকে তাকিয়ে থেকেই বললো,
” এদিকে ঘোর ” ঘুরলো না আহি। এক মুহুর্ত অপেক্ষা করলো তূর্য।তারপর আহির দুই কাঁধ আলতো হাতে ধরে নিজের দিকে ঘোরালো। আহি ফোলাফোল গালে মুখ গোমড়া করে দাঁড়িয়ে আছে। নজর মেঝেতে নিবদ্ধ। তূর্য তার আঙুলের সাহায্যে আহির থুতনি ধরে মুখ উঁচু করে কোমল কণ্ঠে ফের বললো,

” তাকাবি না আমার দিকে ?”
“_______”
” স্য’রি বলতেই হবে?”
“_______”
” না বললে হয় না ?”
“_______”
” আচ্ছা বললাম। এইবার হয়েছে ?”
এবার মাথা তুলে তূর্যের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাঁকালো আহি।গম্ভীর ভাবে বলল,
” আশ্চর্য! কোথায় বললেন ?”
ঠোঁট প্রসারিত হলো তূর্যের। সে দুই ভ্রু আশ্চর্য কায়দায় কপালে উঠিয়ে বলল,
” এইতো কথা বললি। তাহলে তো আর স্য’রি বলতে হচ্ছে না ! ”
” চি’টিং করেছেন আপনি ” বলে কাঁদ ঝাঁকি দিয়ে তূর্যের হাত সরানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু তূর্য তার হাতের বাধন আরেকটু শক্ত করে নিজের মুখ বরাবর করার চেষ্টায় উচুঁ করে ধরলো তাকে।
যার ফলস্বরূপ ,তূর্যের মুখোমুখি হতে আহির পা খানিকটা উচুঁ হয়ে গিয়েছে। পুরোপুরি মুখোমুখি না হলেও তূর্যের থুতনি বরাবর আহির কপাল পড়েছে।
তূর্যের শরীরের স্মেল এবার পুরোপুরি আহির নাকে এসে ঠেকেছে। তার ইচ্ছে করছে জোরে জোরে শ্বাস টেনে সবটা নাকের মধ্যে ঢুকিয়ে নিতে ।কিন্তু,এখন তো সেটা করা যাবে না ।
তূর্য আচমকা আহির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো,

” স্য’রি ম্যাডাম জি ! আ’ম এক্সট্রিমলি স্য’রি । ”
তূর্যের কন্ঠে কী ছিল আহি জানে না । তবু তার শরীরে অদ্ভুত শিহরণ খেলে গেল।
তূর্য কানের কাছ থেকে মুখ সরিয়ে আহির চোখে নিবদ্ধ করলো।তার ভাব গতি পরখ করে ঠোঁট বাঁকিয়ে কিছুক্ষণ হেসে। ফের বললো,
” স্য’রি অ্যাকসেপ্টেড ? হুম?”
আহি দুইপাশে মাথা নাড়লো,যার অর্থ ” না ” তূর্যের চেহারার আদল অটোমেটিক্যালি চেইঞ্জ হয়ে গিয়েছে। সে ভ্রু কুঁচকে চোখ ছোট ছোট করে আহির দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকলো। এতক্ষণ ধরে আদুরে কন্ঠে কথা বললেও এবার সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল,

” এখনো হয়নি? ওকেই, আম রি’য়েলি ভেরি স্য’রি ।সত্যিই স্য’রি, জা….! ” থেমে যায় তূর্য তারপর বলে,”নাউ?”
“______”
আহির নিশ্চুপতা দেখে তূর্য অসহায় কন্ঠে ফের বললো,
” তুই কি চাইছিস ? এখন কি কানে ধরে উঠবস করতে হবে আমায় ? ক্লিয়ারলি বল ! ”
” নিজের অ’পরাধ স্বী’কার করুন , খাটি বাংলা ভাষায় ” এতক্ষণ বাদে গমগমে কন্ঠে উত্তর আসলো অপর প্রান্তের মানবীর।
” অ’পরাধ? “খানিকটা অবাক হয়ে বলল তূর্য। আহিকে ছেড়ে একটু দূরে সরে দাঁড়ালো সে। তারপর বলল,
” ওকেই .. আই মিন ,আচ্ছা! ” বলে একটু থামলো তূর্য।
তারপর একটু ভেবে কয়েকটা গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
” আমার ভু’ল হয়েছে।আর কখনো এমন ভু’ল করবো না, যার মাশুল এভাবে গুনতে হয় । ” নিজের ঠাট বজায় রেখে রাশ’ভারি কন্ঠে বলল সে।
আহির পক্ষ থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে সে অসহায় মুখ করে তাকিয়ে রইল । আর কি বলবে ,কিছু মাথায় আসছে না। সে ফের বলল,

” দ্যান…” নিজেকে শুধরে নিয়ে বললো,
” মানে তারপর ? তারপর আর কী বলবো? ”
” স্য’রি একসেপ্টেড ”
তূর্য যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো।এখন মাথাটা খুব হালকা হালকা লাগছে।বুক ভারি হয়ে থাকা যন্ত্রণা এক লহমায় ভ্যানিশ হয়ে গিয়েছে।
” তুইও খাটি বাংলায় বল ” থমথমে গলায় বলল সে।
” ক্ষমা গ্রহণযোগ্য ”
বলেই দাঁত বের করে হাসতে আরম্ভ করলো আহি ।এতক্ষণ তূর্যের হাবভাব দেখে পেট ফেটে হাসি পাচ্ছিল আহির।তবুও নিজেকে খুব কষ্টে সামলে রেখেছিল। একটা হাসির কারণে তূর্য ভাই স্য’রি নাও বলতে পারতেন।
এদিকে আহির কান্ড দেখে তূর্য ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। একটু আগেই এমন ভাব করে ছিল এই বুঝি কান্না করে দেবে। আর এখনই হাসিতে ফেটে পড়েছে,স্টু’পিড। তাহলে তাকে দিয়ে ক্ষমা চাওয়ার জন্যেই এত সব কান্ড। অথচ,গোটা দুইটা দিন তার কিভাবে কেটেছে ওর কোনো ধারণা আছে? যদি বুঝতো তাহলে কি এমন করতে পারতো ? ই’ডিয়েটটাকে দিয়ে বিশ্বাস নেই।বুঝলে হয়তো এখনও গো ধরে বসে থাকতো আর, মনে মনে মজা লুটতো।
কি অভিনয়টাই জানে! আস্ত একটা ড্রামা কুইন !

” তূর্য ভাই ?একটু আগে যে আপনি জাআআ বলতে গিয়ে মাঝপথে থেমে গেলেন ,তখন কী বলতে নিয়েছিলেন ? হুমম?” ঠোঁটে হাসি নিয়ে দুই ভ্রু নাচাতে নাচাতে দুষ্টুমি মিশ্রিত কন্ঠে বললো আহি।
” কিছু না ” আহির প্রশ্নে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গ’ম্ভীর গলায় বলল তূর্য । আহি ফের একই কায়দায় বলল,
” জা’ন – টান বলতে গিয়েছিলেন না তো?”
কত বড় মিচকে শয়তান।একটু আগেও গুলি মেরে একটা কথা বের করা যাচ্ছিল না।আর এখন দেখ!
মুখ ফসকে একটা কথা নাহয় বের হয়েই যাচ্ছিল।বুঝে গেছিস ভালো কথা। মুখটা একটু বন্ধ করে রাখ।না,ওনাকে সেটা খুঁ’চিয়ে খুঁচিয়ে জিজ্ঞেস করতে হবে।
” জা’নোয়ার বলতে গিয়েছিলাম ” কথাটা বলতে বলতে রুম ত্যাগ করলো তূর্য। আহির মুখ চুপসে গেল। বিড়বিড় করে বলল,
” শয়’তান বে’ডা ”
পিছু ফিরলো তূর্য ।তবে আহির কথা শুনে নয়। সে কিছুক্ষণ আহিকে পরখ করে বলল,
” এরপর থেকে ব’কলে আমার সাথে ত’র্ক করিস,ঝ’গড়া করিস , হাত – পা ছড়িয়ে কা’ন্না করিস, তিলকে তাল বানিয়ে পুরো বাড়ির সবাইকে না’লিশ করিস,প্রয়োজনে আমার নামে কে’ইস করিস। সারাক্ষণ পি’ঞ্চ মে’রে কথা বলিস ,তবুও কথা বলিস , প্লিজ! ”

আজকের এক ঘন্টা সময় অনেকটা নিরস ভাবে কেটেছে তারিনের। কেন জানি আজকে আহি ব্যাচে আসেনি। কাল রাতেও বলেছে আসবে। কি হলো কে জানে! তাকে না বলে কামায় করার কারণে একটু অ’ভিমানও হলো বটে। সে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে অন্যমনস্ক ভাবে হেঁটে যাচ্ছিল।এরমধ্যে পিছন থেকে কেউ বলে ওঠে ,
” এই মেয়ে? ”
পিছু ফেরে তারিন। সে পিছু ফেরা মাত্রই মেহেদী বলে,
” এদিকে এসো ”
” জ্বি,বলুন ভাইয়া ” বলতে বলতে দরজার গোড়া থেকে আবার রুমে প্রবেশ করে তারিন।
” আহি আসেনি কেনো ? ”
” জানি না ”
” জানো না মানে? কেমন বান্ধবি তোমার ? কোনো খোঁজ খবর রাখো না? ” খানিকটা রূ’ঢ় শোনা গেল মেহেদীর কন্ঠ।
” রাতে বলেছিল আসবে।এখন আসেনি কেন ,জানি না ” স্পষ্ট উত্তর তারিনের।
” ওর নাম্বার আছে না ? দাও ”
তারিনের এখন বলতে ইচ্ছা করলো,” তাহলে আপনার কেমন আত্মীয় যে তার নম্বরটাও নেই” কিন্তু সে বলল না।বে’য়াদবি হয়ে যাবে ভেবে মোবাইল হতে আহির ফোন নম্বর বের করে বলে,
” এটা খোলা নাও থাকতে পারে ”
” তাহলে যেটা খোলা থাকে সেটা দেও ”
মেহেদীর ব্যবহারে অবাক হয় তারিন। আহির সাথে সবসময় কি সুন্দর করে কথা বলে। ঠোঁ’টের কোনা থেকে কখনো হাসি সরে না।অথচ,তার সাথে কেমন বিহেব করছে। অন্য কেউ হলে সেও ক’ড়া কথা শুনিয়ে দিত।নেহাত টিচার,সম্মানীয় ব্যক্তি। সে নমনীয় কন্ঠে বলল,

” ওটা আমার কাছে নেই। বাসায় ফিরে ওর থেকে চেয়ে দিব,ভাইয়া”
” আচ্ছা,তাহলে তোমারটাও দেও! ”
” জ্বি?”
” কিছু মনে করো না,যদি ভুলে যাও কল করে মনে করিয়ে দিব এইজন্যে ….” তারিনের জিজ্ঞাসাসূচক চাহুনি দেখে স্বাভাবিক কন্ঠে বললো মেহেদী।
” আচ্ছা ,স’মস্যা নেই ”
বলে মোবাইল ঘেঁটে মেহেদীর নম্বরে কল করলো তারিন। কল করলেই তো নম্বর চলে যাবে।
তারিনের ফোনে মেহেদীর নম্বর MC লিখে সেইভ করা । সেটা দেখে কপালে ভাঁজ পড়লো মেহেদীর। গ’ম্ভীর গলায় বলল,

” আমার নাম্বার MC দিয়ে সেইভ করেছ?”
” জ্বি ! ” মোবাইল ব্যাগে রাখতে রাখতে বলল তারিন।
” কেন ? ”
” সংক্ষেপে ”
” MC মানে বুঝো ?”
” জ্বি ”
” কি ‘ জ্বি ‘ ‘ জ্বি ‘ করছো? M C মানে কী বলো !”
” মেহেদী ক্যামিস্ট্রি ! আপনার নামের M আর কেমিস্ট্রি এর C”
” আচ্ছা,যাও।বাড়ি ফিরে পুরো নামে সেইভ করবে ”
” কেন ,ভাইয়া? ”
” আমার প্র’বলেম আছে তাই ”
” আচ্ছা ”

বলে সামনে অগ্রসর হয় তারিন।MC দিয়ে সেইভ করেছে তো কি হয়েছে? আর উনি বললেন আর সে নাম চেইঞ্জ করে দিবে! মুখ ভেং’চি কে’টে তাচ্ছিল্য হাসলো সে।
পরমুহুর্তেই আন্দাজ করলো মেহেদী তাকে কেন নাম চেইঞ্জ
করতে বলেছে।কিছুটা ল’জ্জায় পড়লো সে।সে তো আর গা’লি হিসাবে দেয়নি। একবার পিছু ফিরে তাকালো ।মেহেদী তার যাওয়ার দিকে চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে আছে। সে দ্রুত আবার সামনে ফিরল।আগামী দুইদিন আর ব্যাচে আসবে না।লোকটা এই MC এর কাহিনী ভুলুক তারপর না হয় আবার আসবে। তবে নাম যেটা একবার দিয়েছে তো দিয়েছে।সেটা পাল্টানোর মধ্যে সে নেই। ‘ Mehedi Vaiya Chemistry ‘ অত বড় লেখা কে লিখে? তবে মাঝে একটা ভাইয়ার V দেওয়া উচিত ছিল। শুরুতে যখন দেয়নি,আর দেখেই ফেলেছে।এখন আর পাল্টে কি লাভ !
এরপরে আর মনের ভু’লেও ওনার সামনে নম্বর বের না করলেই হলো।

ইদানীং একটা বিষয় নিয়ে খুব অ’শান্তিতে ভুগছেন মারুফা বেগম। না পারছেন কাউকে বলতে আর না পারছেন নিজের মধ্যে চেপে রাখতে। বিষয়টা বেশিদূর গড়ানোর আগেই তার সমাধান করতে হবে। ড্রয়িং রুমে আপাতত তিনি আর পারভিন বেগম আছেন।টুকিটাকি কাজ করছেন।
মারুফা বেগম একবার চারিপাশে ভালো করে নজর বুলিয়ে নিলেন।তারপর বড় বোন সমতুল্য জাকে বললেন,
” বুবু তোমাকে একটা কথা বলার আছে ”
মারুফা বেগমের ম’লিন কন্ঠস্বর শুনে পারভিন বেগমের কপালে ভাঁজ পড়লো। যখন নিজে কোনো স’মস্যার সমাধান খুঁজে না পান তখনই তিনি কেবল এভাবে কথা বলেন। তিনি মারুফা বেগমের হাত ধরে নিশ্চিন্ত করে সোফায় গিয়ে বসলেন।তারপর আশ্বস্থ করার কায়দায় বললেন,
” কী হয়েছে? বল খুলে আমাকে ”
মারুফা বেগম একটু সময় নিলেন।তারপর ধীর কন্ঠে বললেন,

” বুবু,আমরা সকলেই জানি আহির বোধবুদ্ধি একটু কম। বেশি ছেলে মানুষী করে। সম্ভব- অ’সম্ভব,বাস্তব – অবাস্তব এসব কিছু নিয়ে ওর কোনো চিন্তা ধারা নেই। ” বলে একটু থামলেন তিনি।তারপর ফের বলা শুরু করলেন,
” শেষ কয়েক মাস আহির হাবভাব তুমি খেয়াল করেছ বুবু? ”
এতক্ষণে পারভিন বেগম জা এর মনোভাব বুঝলেন।কিন্তু প্রকাশ করলেন না। মারুফা বেগমের মুখ থেকেই তিনি সবটা শুনতে চাইছেন।মারুফা বেগম আবার বলতে শুরু করলেন,
” আমার মনে হচ্ছে ও তূর্যকে ভাই হিসাবে দেখে না। ওর চালচলন আমার সুবিধার ঠেকছে না,বুবু।এখন ,তোমার এটা মনে নাও হতে পারে।কিন্তু ,আমি তো মা,ও আমার সন্তান , ওর মুখ দেখে মনে কি চলছে বুঝতে পারি। দেখ, আমরা না হয় সবটা বুঝে নিলাম ।কিন্তু তূর্য? তূর্য যদি কোনো ভাবে এসব আ’ন্দাজ করতে পারে তাহলে আর র’ক্ষে নেই। তুল’কালাম কান্ড ঘটাবে। ”
এবার মুখ খুললেন পারভিন বেগম,

” সেসব তূর্য বুঝে নেবে। তোর অত চি’ন্তা করতে হবে না ”
তার এত গুলো কথার পিঠে জা এর এমন উদাসীন উত্তর শুনে চমকালেন মারুফা বেগম।তিনি আর কি বলবেন খুঁজে পেলেন না। তার এতগুলো কথা শুনে পারভিন বেগমের তো একটু চি’ন্তায় পরার কথা ছিল । কিন্তু তিনি নির্বিকার! এই বাড়িতে এসেছে ধরে তিনি কোনো সমস্যায় পড়লে বড় জাকে জানান এবং সাথে সাথে সমাধানও পান।এই প্রথমবারের মতো পারভিন বেগমের এতটা উ’দাসীনতা লক্ষ্য করলেন তিনি।
মারুফা বেগম কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেছেন দেখে পারভিন বেগম প্রথমে একটু চিন্তায় পড়লেও এখন আর করছেন না।হুট করে সবাই সবটা জানার আগে আস্তে আস্তে ,একটু একটু করে জানাটাই ভালো।এতে তাদের মস্তিষ্কেও চাপ কম পড়বে। সবটা মেনে নিতেও সহজ হবে। ছেলের অনুমতি থাকলে তিনি তূর্যের দিকটাও মারুফা বেগমকে জানিয়ে দিতেন। কিছুক্ষণের নীরবতা শেষে পারভিন বেগম বললেন,

” মেজো যদি শুনিস, আমার বা তূর্যের দিক থেকে কোনো আপত্তি নেই ,তাহলে তোর কোনো আপত্তি থাকবে ? ”
” আমি সিদ্ধান্ত নেওয়ার কে বলো ,বুবু? তার বাপ আছে ,চাচারা আছে । কিন্তু আমি চোখ ব’ন্ধ করে বলতে পারি, পুরো পৃথিবীর মানুষ রাজি থাকলেও এই সম্পর্কে তূর্য কখনো রাজি হবে না। ”
” ভু’ল জানিস,মেজো! পুরো পৃথিবীর মানুষ বি’পক্ষে থাকলেও আমার ছেলে এই সম্পর্কের পূর্ণতা দেবে। যেভাবেই হোক। ”

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ২৯ (২)

মনে মনে ভাবলেন পারভিন বেগম। তবে জা এর সামনে প্রকাশ করলেন না। সঠিক সময় হলে সবাই সবটা জানতে পারবে,বুঝতে পারবে।
” হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন করলে বুবু?”
” এমনিতেই! তোর মতামত কি দেখছিলাম। ”

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৩১