Home প্রণয় ব্যাকুলতা প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৩৭

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৩৭

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৩৭
ইনান হাওলাদার

আহি হাজারবার গলা উঁচিয়ে ডাকার পরেও তূর্য না গাড়ি থামিয়েছে ,আর না স্পিড কমিয়েছে। গাড়ির পিছু ছুটতে গিয়ে হোঁ’চট খেয়ে পড়ে যায় আহি।ফলস্বরূপ দুই হাঁটু আর বাম হাতের কনুইতে হালকা আ’ঘাত পেয়েছে।চামড়া উঠে উঠে গিয়েছে।এমনি সময় হলে ঐটুকু আঘাতেই মেয়েটা কান্না – কাটি করে একাকার করে ফেলত।কিন্তু আজ সেরকম কিছুই করেনি।শুধু দুই চোখে ক্ষতটা একটু দেখেছে ,এই যা।
তার পিছু পিছু যে আরেকজোড়া পা সমান তালে ছুটে চলেছে,বারবার উচ্চ কন্ঠে ডেকে থামতে বলছে সেটা তার মস্তিষ্ক ক্যাচ করতে পারেনি। শুধু তূর্যের শ’ক্ত চোয়াল,র’ক্তিম অক্ষিপট আর রা’গে ফুলে ওঠা কপালের কালচে নীলাভ রঙের রগ মিশ্রিত ক্রো’ধান্বিত মুখশ্রী ভেসে উঠছিল।মেহেদী এগিয়ে দিবে বলে জোর করলেও সে ‘ হ্যাঁ ‘ বা ‘ না ‘ কিছু বলেনি।

তারপর কিভাবে বাড়িতে ফিরেছে সে নিজেও জানেনা।
পার্সটাও বোধহয় রাস্তায় ফেলে দিয়েছিল।রিক্সা থেকে নামার পর টাকা দিতে গিয়ে দেখে পার্স নেই। ফোনের ব্যাকপার্টের নিচে দশ টাকা ছিল সেটাই দিয়েছে। কম ভাড়া দেওয়ায় রিক্সাওয়ালা নানান কথা বলেছে ,সে কিছুই কানে তোলেনি।তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরেছে যেন তূর্যের সাথে একটু কথা বলতে পারে,কিন্তু সেটাও পারেনি।সে নাকি এসেই রুমে দরজা দিয়েছে।যে তাহির সাথে আজপর্যন্ত ধ’মক তো দূরে থাক একটু উচ্চ কন্ঠে কথা বলেনি।সেই তাহিকে বিনা কারণেই বকেছে।
তূর্য বাড়ি ফিরে রুমে যাওয়ার সময় তাহি শুধু জিজ্ঞেস করেছিল ,” রে’গে আছো কেন ভাইয়া ?”
তাকে এসব কথা শবনম জানিয়েছে।

আহি বাড়িতে ফিরে কয়েক বার করে তূর্যের রুমের বদ্ধ দরজার কাছ থেকে ফিরে এসেছে। তাহিকে ব’কেছে বলে পারভিন বেগমও রেগে আর ডাকতে যাননি।
সেসব এখন বাদ যাক।সে এখন আবার এসেছে। কখন থেকে রুমের দরজা ধাক্কাচ্ছে আর ডাকছে ,তবুও তূর্য দরজা খুলছে না। অন্য সময় হলে দুই বারের বেশি সে এভাবে ধাক্কা ধাক্কি করতো না। গত পাঁচ ঘন্টা যাবৎ দরজা খুলছে না তূর্য।সে ঘুমালেও এক থেকে দেড় ঘন্টা ! তাহলে পাঁচ ঘন্টা ধরে কি করছে।
আবারো ব্যর্থ হলো আহি।এবারেও কোনো প্রকার সাড়া দিলো না তূর্য। সে টলোমলো চোখে পুনরায় নিজের রুমে গিয়ে বসলো।কিছুক্ষণের মধ্যে শবনম এলো।চোখ – মুখ ফুলিয়ে রাখা আহিকে দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল,

” কি হয়েছে আহি? তুমি কি কান্না করছো?”
এপাশ ওপাশ মাথা নাড়লো আহি।আর মুখে বললো,
” নাহ ”
” কি হয়েছে বলো আমাকে।আমি কাউকে বলবো না প্রমিজ”
” আমার কিছু হয়নি শবনম।”
” ও আচ্ছা,বলতে চাও না। ওকেই,থাক”
” তোমরা সবাই কেনো এমন করছ বলোত ! ”
” সবাই মানে? আর কে ?”
” শবনম ?তুমি একটু তূর্য ভাইকে দরজা খুলতে বলবে ? উনি তোমার কথা শুনবেন ”
” তোমাকে বললাম না ভাইয়া রে’গে আছেন।তাহিকেও ব’কেছে।এখন আমি গেলে যদি কিছু বলেন? ”
” বলবেন না। প্লিজ দরজায় একটু নক করো না। ব’কলে বলবো
আমি তোমাকে জোর করেছি ”

আহির ছোট হয়ে যাওয়ায় মুখের দিকে তাকিয়ে আর না করতে পারলো না শবনম।দুজনে মিলে ফের দরজার কাছে গেল।প্রথমে শবনম অনেক বার নক করলো তবে কোনো সাড়া শব্দ এলো না। তারপর সে আহির মুখের দিকে একবার তাকিয়ে একটু ভীতু কন্ঠে বললো,
” ভাইয়া আমি শবনম ,একটু দরজা খুলবেন ?”
এবারে কোনো সাড়া না আসলেও মিনিট দুয়েক পর দরজা খোলার শব্দ হলো।
” বলো ”
দরজাটা সামান্য ফাঁকা করে কথাটা বলতে গিয়ে আর সম্পূর্ণ করলো না তূর্য। আহিকে দেখে থেমে গেল। দরজার গোড়া থেকে সরে ভিতরের দিকে এগিয়ে গেল।আহিও পিছু তার পিছু ভেতরে প্রবেশ করলো।ভাঙা গলায় বলল,
” তূর্য ভাই আপনি ওভাবে চলে এলেন কেন? কি হয়েছে ? আমি কিছু করেছি? ”
কোনো কথা বললো না তূর্য।আহি ফের বললো,

“কথা কেন বলছেন না ? তূর্য ভাই ? কান্না পাচ্ছে আমার ,বলুন না কি হয়েছে ! কি করেছি আমি ? ”
” কিছু হয়নি ! তোকে জাস্ট ট’লারেট করতে পারছি আহি।চোখের সামনে থেকে যা, প্লিজ ” একটু থেমে উত্তর এলো।
” কী করেছি আমি? “ভেজা গলায় বলল আহি।
” একদম ন্যাকা কাঁন্না কাঁদবি না।” দাঁত পি’ষে কথাটা বলতে বলতে আহির দিকে দুই ধাপ এগিয়ে গেল তূর্য।তারপর আবার নিজেকে সামলে নিলো। দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁড়িয়ে রইলো।
” আগে বলুন কি করেছি ? এভাবে কথা বলছেন কেন?”
” এক কথা বারবার রিপিট করতে পারব না আমি । ই’রিটেইট না করে যা।”
” বলুন না কি করেছি !” আহির মুখে ফের একই কথা।
আর নিজেকে শান্ত রাখতে পারলো না তূর্য। শ’ক্ত করে দেয়ালের সাথে চেপে ধরলো মেয়েটাকে।হুং’কার দিয়ে বলল,
” কিচ্ছু করিসনি তুই।তোকে আর আমি কিছু বলব না।কিচ্ছু না! তোর যা খুশি করবি, যার সাথে খুশি তার সাথে ঘুরে বেড়াবি । কিচ্ছু যায় আসে না আমার।কিচ্ছু না!”
তূর্যের এমন রূপে ভয়ে জড়সড় হয়ে গেল আহি। কাঁপতে কাঁপতে বলল,

” একটা ইম্পর্ট্যান্ট কাজ ছিল তাই মেহেদী ভাইয়া……”
” আর একটা কথা বলবি না তুই। তাহলে কি করবো আমি নিজেও জানি না।তোকে আমি ব্যাচে যেতে নিষেধ করেছি ? বল নিষেধ করিনি? তাহলে কেন গিয়েছিস? ”
” আ…মি ব্যাচে যাইনি। ”
” ব্যাচে যাসনি! তাহলে ডেটে গিয়েছিলি?” আহির কাঁধ ঝাঁকিয়ে গলার জোর দ্বিগুণ করে বললো তূর্য।
” আপনি ভু..ল ভাবছেন । আ..মার কথাটা তো শুনুন ”
” জাস্ট শাট ইউওর ফা…..! ” বাক্য অসম্পূর্ণ রেখেই তূর্য ফের ব’জ্রকন্ঠে বলল,
“সব কথা তোকে গিলে খাইয়ে দিতে হবে? বুঝিস না তুই? নাকি বুঝেও না বোঝার অ্যাকটিং করিস? যথেষ্ট বড় হয়েছিস। আর এতো ছেলে মানুষের নাটক করিস না।”
” আমি…..” কথা সম্পূর্ণ করতে পারলো না মেয়েটা।তূর্য সজোরে ওর দুই চোয়াল শক্ত করে চেপে ধরেছে। এতক্ষণে অক্ষি কোটরে আটকে রাখা অ’শ্রুকণা গাল বেয়ে পড়তে আরম্ভ করলো তার।মুখে যন্ত্রণার ছাপ ফুটে উঠলেও তূর্য চোয়াল ছাড়ার প্রয়োজন মনে করলো না। এক পর্যায়ে রা’গে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে আহির চোয়াল থেকে হাত সরালো সে।
হাতটা সরিয়েই তার মাথার থেকে কয়েক ইঞ্চি উঁচুতে ,দেয়ালে এলোপাতাড়ি ঘু’ষি দিতে আরম্ভ করলো।সম্পূর্ণটা নিজের ক্রো’ধ নিয়ন্ত্রনের তাগিদে।আহি দুই হাতে মুখ চেপে ধরে কান্না করতে করতে দেয়াল ঘেঁষে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল। এতেও তূর্যের মনের কোনো পরিবর্তন ঘটলো না।
সে পুনরায় গ’র্জে উঠলো,

” নাটক করিস আমার সাথে? ফা’কিং ক্রাইং অফ কর। ”
আহি এতক্ষণ ধরে নিজেকে এক্সপ্লেইন করার চেষ্টা করলেও এখন আর করতে মনে চাইলো না। কেন করবে সে? তূর্য কি জানে না সে তাকে ভালোবাসে?
তাহলে কেন এত স’ন্দেহ? নিজে তো কখনোই মুখে কিছু বলবে না। অথচ শা’সনের বেলায় আগে থাকবে ।কেন? যেদিন ভালোবাসি বলতে পারবে সেদিন সেও তূর্যের করা সব শা’সন মেনে নিবে।
মুখ থেকে হাত নামালো আহি। কান্না মিশ্রিত গলায় ফোঁপাতে ফোঁপাতে চেঁ’চিয়ে উঠে বলল,
” এখন থেকে প্রতিদিন মেহেদী ভাইয়ার সাথে আমি দেখা করবো।সকাল – বিকাল ডেটে যাব। আপনার যা করার করুন।ভালোবাসেন না তাহলে এত জে’লাসি কেন আপনার?”
আহির মুখে এমন কথা মোটেও সহ্য হলো না তূর্যের ।সে
হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো ক্র’ন্দনরত মেয়েটির সামনে।দুই আঙ্গুলে থুতনি চেপে ধরে নিজের মুখ বরাবর করলো,দাঁত পি’ষে হিসহিসিয়ে বলল,

” ভালোবাসি আর না বাসি,ইউ আর মাইন। অনলি মাইন! গট ইট? মাথায় ঢুকেছে তোর?”
সামান্য সময়ের নিরবতা।তূর্য জ্ব’লন্ত চোখে এখনো আহির পানে তাঁকিয়ে। তারপর ফের বলল,
” বললি না ‘ আপনার যা করার করুন ‘ ? ওকেই !” বলে আর এক মুহুর্ত দেরি করলো না সে।আহির চুলের মাঝে একহাত গলিয়ে দিয়ে আচমকা ঠোঁ’ট আঁ’কড়ে ধরলো।যেখানে কোনো নরম স্পর্শ ছিল না। শুধু গোটা কয়েক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাঁ’মড়।
আহি সবটা বুঝে উঠতে উঠতেই কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে ঠোঁ’ট ছেড়ে ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো।বাম হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে ঠোঁ’ট মুছতে মুছতে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
আর,আহি পাথর হয়ে সেখানেই বসে আছে। পুরো শরীর জমে গিয়েছে। তূর্য এটা কি করলো? সত্যিই করলো? মস্তিষ্ক সাড়া দিতেই একবুক অভিমান নিয়ে দৌঁড়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।

নাবিল কিচেনে ঠুকুর ঠুকুর করছে।বাড়িতে আজ কেউ নেই। তার মা নিজের বোন বাড়ি গিয়েছেন। যাওয়ার আগে যদিও নানান প্রকারের ভুনা আর দুই প্রকারের মাংস রান্না করে রেখে গিয়েছেন। কিন্তু তার এসব ভারি খাবার খাওয়ার কোনো রুচি নেই।সাদা সিধে কিছু খেতে মন চাইছে। তাই কিচেনে ঢুকেছে।অথচ সে রান্নার ‘ র ‘ ও জানে না।কিছুক্ষণ ইউটিউব ঘাটলো ,কিন্তু এতে অতি সাধারণ তরকারিও অসাধারণ করে রান্না করা।যত্তসব বাটা বাটির কারবার।অগত্যা পিংকির নম্বরে কল দিলো।অসময়ে নাবিলের কল দেখে অবাক হলো পিংকি।রিসিভ করতেই রান্নার অ্যাপ্রোন পরিহিত নাবিলকে দেখে দৃষ্টি কুঞ্চিত করলো সে।নাবিল বললো,

” লাউ দিয়ে শৈল মাছ ক্যামনে রান্না করতাম বা’ড়া ”
” কেন ?তুই রান্না করবি কেনো?”
” গোস খাইতে মন চায় না ”
” গোস খাইতে মন চায় না,তো কি খাইতে মন চায় ?” নাবিলকে ব্যাঙ্গ করে বলল পিংকি।
” তোরে খাইতে মন চায় ”
” নি’র্লজ্জ! রেসিপি শোন এখন ”
” ক ”
পিংকির ডিরেকশন অনুযায়ী নাবিল রান্না করতে আরম্ভ করলো। এক রান্না করতে গিয়ে নাহলেও একশ বার শুধু ঝোল টেস্ট করে দেখেছে।রান্না শেষ করে কিচেন থেকে বেরোতেই কলিং বেল বেজে উঠলো। দরজা খুলে তূর্যকে দেখে অবাক হলো নাবিল।এভাবে হঠাৎ করে, না জানিয়ে তূর্য কখনো আসে না।কোনো রকমে বলা কওয়া ছাড়া কেন আসলো? কোনো বি’পদ হয়নি তো। নাবিল উ’দ্বিগ্ন গলায় বলল,

” কি হইছে ? ”
কোনো উত্তর করলো না তূর্য।নাবিলকে ঠেলে সামনে থেকে সরিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ল।তারপর সোজা নাবিলের রুমে গেল। বাইকের চাবিটা বিছানার উপর ছুঁড়ে ফেললো।
নাবিলও ব্যস্ত পায়ে তূর্যের পিছু ধরলো। ফের উ’দ্বিগ্ন গলায় বললো,
” কী হইছে কস না ক্যান বা’ড়া ”
” আন্টি কোথায়?”
” বাড়িতে নেই। তোর এই ব্যাশ ক্যান ? টিশার্ট – ট্রাউজার পইরা চইলা আইছস?”
” উইথআউট ড্রেসআপে তো আসিনি। ”
তূর্যের বাঁ’কা কথায় কান না দিয়ে নাবিল বললো,
” দুপুরে খাইছোস কিছু? দেইখা তো মনে হয় না ”
” সিগারেট আছে না ? দে ”
” নাই! ”
” সবাই নাটক মা’রাস আমার সাথে? তোর কাছে সিগারেট নেই?” চেঁ’চিয়ে উঠলো তূর্য। নাবিল দুই হাত মাথায় রেখে ভীতু গলায় বলল,

” আল্লার ক’সম ,নাই। আমি সিগারেট খাওয়া ছাইড়া দিছি বা’ড়া। পিংকি পছন্দ করে না”
” কিনে আন “চোখ বন্ধ করে শান্ত কন্ঠে বলল তূর্য।
” তুই কিন্না আনোস নাই ক্যান ? ”
” নাবিল? তোদের ইচ্ছা পূর্ণ হয়েছে।আমি আজ ক’ন্ট্রোল হারিয়েছি। ” কিছুক্ষণ পর উদাসীন হয়ে বলল তূর্য।
তূর্যের অসহায় কন্ঠ শুনে তার পাশে বসলো নাবিল। আবারো উ’দ্বিগ্ন গলায় বলল,
” সবটা খুইলা ক ,ভাই।কি হইছে তোর? ”
” কত বার করে বলেছি ওই রা’স্কেলটার সাথে কোনো যোগাযোগ রাখবি না,ব্যাচে যাবি না।বিশ্বাস কর ওকে মেহেদীর সাথে দেখলে আমার কি হয়ে যায় বুঝি না। মনে হয়, মনে হয়, মস্তিষ্কে র’ক্তক্ষরণ হচ্ছে। আহিকে ওই ছেলের সাথে দেখলে আমি নিজের রা’গকে সামলাতে পারি না।
বাট ও আমার দিকটা বোঝে না। ও জানে ওই ছেলেটা ওকে লাইক করে তাহলেও কেন ? কেন এত মেলামেশা? ” বলতে বলতে মাথার চুল দুই হাতে টেনে ধরলো তূর্য।
” বুঝলাম , তা তুই কি করছস? মানে কী ক’ন্ট্রোল হারাইছস ? ওই পোলারে কিছু কইছস? নাকি মা’রধর করছস?”
” আগে কয়েকবার ও’য়ার্ন করেছি ওকে। এইবার লাস্ট ও’য়ার্নিং দিবো।এরপরেও যদি আবার এরকম দেখি। আই স্যয়ার ,আই উইল কিল হিম।”

তখন তূর্যের রুম থেকে ফিরে শুয়ে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পড়েছিল আহি। যার ফলস্বরূপ দুপুরে আর খাওয়া হয়নি।উঠতে উঠতে মাগরিবের জের ওয়াক্ত হয়ে গেছে। ক্ষুধা লাগলেও তখন আর খেতে যায়নি।একবারে দুপুর আর রাতের খাবার এক সঙ্গে খাবে ভেবে।
এশার নামাজ সেরে বাড়ির গিন্নিরাও রাতের খাবার তৈরিতে লেগে পড়েছেন।দুপুরের অনেক খাবারই আছে ,সাথে হালকা পাতলা করে কিছু রান্না করলেই হবে ।এইজন্যে দেরি দেরি করে কিচেনে আসা। তাছাড়া আজ দুপুরে আসিফ চৌধুরী,তূর্য আর আহি কেউই খায়নি ,যে কারণে আরো বেশি খাবার থেকে গিয়েছে। এমনকি তূর্য সেই দুপুরে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে আর ফেরেনি।কল করলে জানিয়েছে রাতে ফিরবে।
আহি ডাইনিংয়ে বসে খাবার খাচ্ছে আর গিন্নিররা রান্না করছেন।তার আবার একা একা খেতে ভালো লাগে না। তাই প্লেট নিয়ে উঠে সেও মা চাচিদের কাছে চলে গেল।একটা মোড়া পেতে বসে খেতে লাগলো। চুপচাপ খেতে খেতে হঠাৎ মুখে বি’রক্তি সূচক শব্দ করে বলল,

” কত মরিচ দিয়েছেন বড় মা। গাল জ্ব’লছে ”
মারুফা বেগম বললেন,
” তাহির ঝাল লাগলো না আর তোর লাগছে।”
” এখন লাগলে আমি কি করবো আম্মু? ”
পারভিন বেগম বললেন,
” আরে দাঁড়া দাঁড়া। ঠোঁ’ট কেঁ’টেছিস কিভাবে মা?”
” তূ….” বলতে গিয়ে নিজেকে শুধরে নিলো আহি।কথা ঘুরিয়ে বলল,
” ঠুল লেগে কেঁ’টে গেছে। ”
ঠোঁ’ট ফে’টে যাওয়ার কারণেই তাহলে জ্ব’লছে।মারুফা বেগম বললেন,
” ঠুল লেগেছে কপাল ফাটাবি ,ঠোঁ’ট ফাটালি কিভাবে ?”
লতা বেগম বললেন,
” কিভাবে লেগে কেঁ’টে গেছে। অতো জেরা করো না তো বুবু।আহি তুই খা”

রাত নয়টা নাগাদ বাড়ি ফিরেছে তূর্য। এসেই আগে সাওয়ার নিয়েছে। তারপর কিছুক্ষণ ছাদে হাটাহাটি করে রুমে ফিরেছে। রাতে খাবার টেবিলে আহিকে দেখতে পায়নি।
বাড়িতে ফিরে গলার কোনো আওয়াজও পায়নি। রোজ রাত নয়টায় মা – চাচিদের সাথে মিলে সিরিয়াল দেখবে ,কিন্তু আজ ড্রয়িং রুমে ছিল না।
ওর সাথে না হয় পরে কথা বলে নিবে কিন্তু দুপুরে তাহিকে ব’কেছে মাথায় আসতেই চোখ বন্ধ করলো।নিজের উপর বি’রক্ত হলো। বোনের রুমে গিয়ে দেখলো ঘুমিয়ে আছে সে।কপালে শব্দ করে একটা চু’মু খেল।তারপর সারা মুখে হাত বুলিয়ে বলল,

” স্য’রি আপি ”
” ঘুমিয়ে গেছে ,ডাকিস না।তুই আমার সাথে আয়” পেছন থেকে বলে উঠলেন পারভিন বেগম।
মায়ের কথার বিপরীতে তূর্য বলল,
” আসছি। তাহি কখন ঘুমিয়েছে?”
” সন্ধ্যায়!
” না খেয়ে ? ”
” খেয়েছে ”
” আহি কোথাও গিয়েছে ?”
” না।কেন ? কোথাও যাবে কেনো ?”
” তাহলে ডিনার করলো না কেনো?”
” এশার সময় খেয়েছে ”
” এখন ঘুমিয়ে গিয়েছে ?”
” আসার সময় তো রুমে লাইট জ্বালানো দেখলাম। কেন? আবার কি হয়েছে?”

” নাথিং! ” বলে বেরিয়ে গেল তূর্য। তারপর সোজা আহির রুমে গেল ।কোনো রকম নক না করেই রুমে প্রবেশ করলো। সে চুলে বিনুনি করছে। তূর্যকে দেখে দুপুরে করা তার কর্মকাণ্ডের কথা মাথায় এলো। আ’ড়ষ্ঠতার জমে গেল মেয়েটা । তাছাড়া তূর্যের উপর তার কিছুটা অভিমানও রয়েছে। সে পুরো বিনুনি শেষ করে কি করবে বুঝতে না পেরে বিছানা ঝাড়তে আরম্ভ করলো।তূর্য হুডির পকেটে হাত গুজে আহির কর্ম কান্ড দেখে গ’ম্ভীর কন্ঠে বললো,
” কাজ-কর্ম শেষ হলে স্থির হয়ে বোস ”
পরিষ্কার বিছানা আরো পাঁচ মিনিট ধরে ঝাড়া ঝাড়ি করে খাটে পা ঝুলিয়ে বসলো আহি। তূর্য স্টাডি চেয়ার টেনে এনে ওর মুখোমুখি বসলো।পকেট থেকে হাত বের করে দুই হাত একত্রিত করে মু’ষ্ঠিবদ্ধ করলো ।তারপর দুই পায়ের মাঝখানে থাকা ফাঁকা জায়গা রাখলো।
শ’ক্ত গলায় বলল,

” লাস্ট বারের মতো সাবধান করছি , ওই বা’স্টার্ডের সাথে আর কখনো যেন তোকে না দেখি।একবার, জাস্ট একবার দেখলে তোর কি হাল করবো ভাবতেও পারছিস না। ”
চুপ চাপ মাথা নিচু করে বসে থাকলো আহি। তূর্যও নিশ্চুপ ! কিছুক্ষণ পর গলার স্বর পরিবর্তন করলো সে।
বলল,
” মুখ ফুলিয়ে থাকার মতো কোনো রিজন দেখছি না ”
আহি তো রে’গে নেই।তূর্য দুপুরে ওভাবে বলায় একটু অভিমান হয়েছে বটে।কিন্তু এখন তো লজ্জায় মুখ তুলে তাকাতে পারছে না। তূর্য ওকে ভালো করে পরখ করলো।দুই গাল আর নাকের ডগা র’ক্তিম হয়ে আছে।সে ফের বললো,
” তোকে ওয়ার্ন করছি আমি, ব্লাশ করার মতো কিছু বলি বা করিনি ”
” আর দেখা করবো না আমি।আপনি যান ”
এতক্ষণে মুখ থেকে কথা বের হলো আহির। মেয়েটার এমন বিহেভ করার কারণ বুঝে বাঁকা হাসলো তূর্য ।
বলল,

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৩৬ (২)

” দুপুরের এমন কিছু ঘটেনি যার জন্যে মুখ তুলে আমার দিকে তাকানো যাবে না। জাস্ট প্রুভ দিয়েছি। আই থিংক ভালোবাসি কিনা সবটা ক্লিয়ার । ”
বলে উঠে গেল তূর্য। সে দরজার কাছে যেতেই আহি বিড়বিড় করে উঠলো,
” কাঁমড়া-কাঁমড়ি করে ভালোবাসার প্রমাণ দিতে এসেছে। ওরে আমার ভালোবাসা ওয়ালা ”
কথাটা স্পষ্ট শুনতে পেল তূর্য। ঘাড় ঘুরিয়ে পিছু ফিরল।তূর্যকে থেমে যেতে দেখে চোখ বড়বড় করে ফেললো আহি।তূর্য সেদিকে ধ্যান না দিয়ে সে ভ্রু কুঁচকে বলল,
” তুই কি চাইছিস ? কাঁমড়া-কাঁমড়ি ছাড়া প্রুভ দেই? চাইলে এখনই নিতে পারিস ! চাস ?”

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৩৮