Home প্রণয় ব্যাকুলতা প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৪৮

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৪৮

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৪৮
ইনান হাওলাদার

কয়েকদিন ধরে তূর্যের সাথে কথা বলার বেশ চেষ্টায় আছে আহি।কিন্তু কিছুতেই বলে উঠতে পারছে না। তূর্য আগে যতটুকু সময় বাড়িতে থাকতো এখন ততটুকু সময়ও থাকে না। আর যা একটু থাকে তাও রুমের মধ্যে।আর দরজা লক করে রাখে।আহি ডাকতে ডাকতে ম’রে গেলেও খুলে না। শুধু বাড়িতে এসে মায়ের হাত থেকে এক কাপ কফি নিয়েই দরজা লক করে রাখবে।
আহি ডাইনিংয়ে খেতে যায় ধরে সে ডায়িংয়ে আসা বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু আহির তো তূর্য ভাইয়ের সাথে কথা বলা জরুরী। আজকে তাই ওত পেতে বসে আছে।তূর্য বাড়ি ফেরার সাথে সাথে ও কফি নিয়ে যাবে। তাই-ই হলো।তূর্য মাকে ডেকে কফি চাওয়ার সাথে সাথে কফির কাপ হাত আহি গেল।
তূর্য ডিভানে বসে ল্যাপটপটা টেবিলের উপর রেখে কাজ করছে।আহি খুব মনোযোগ দিয়ে দেখলো তূর্যকে।তারপর নিজেকেও দেখলো।তূর্য ভাই আগের মতো আছেন।কিন্তু সে ঠিকই শুকিয়ে গেছে। চোখ গর্তের মধ্যে চলে গেছে।সে আস্তে করে গিয়ে ল্যাপটপের পাশে মগটা রাখে দাঁড়িয়ে রইলো।তূর্য নিজের কাজ করতে করতে বলল,

” কিছু বলবে ? ”
কোনো উত্তর এলো না দেখে সে ল্যাপটপ থেকে চোখ সরালো। সম্মুখ প্রান্তে তাঁকিয়ে আহিকে দেখে চোয়াল শক্ত করলো।শব্দ করে ল্যাপটপের শাটার বন্ধ করে উঠে দাঁড়ালো। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের তাগিদে আহি বলল,
” তূর্য ভাই একটু শান্ত হোন।আমার কথাটা শুনুন , প্লিজ ”
তূর্য টেবিল থেকে কফির মগ উঠিয়ে সজোরে মেঝেতে ফেললো।মুহুর্তেই সেটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে।আহি ভয়ে দুই হাতে মুখ চেপে চাপা চি’ৎকার করে উঠলো।তূর্য এগিয়ে এসে শক্ত করে ওর হাতের কব্জি চেপে ধরলো। ধারালো চো’য়াল আর রক্তিম চোখে কয়েক মুহূর্ত আহির পানে চেয়ে থেকে হাত ধরে টানতে টানতে দরজা পর্যন্ত নিয়ে ধাক্কা দিকে রুমে ওপাশে ফেললো। এরকম শক্ত ধাক্কা পেয়ে উপুড় হয়ে মেঝেতে গিয়ে পড়লো আহি। মেয়েটা পুরো সময় জুড়ে শুধু কান্না করতে করতে একটা কথাই বলছে ,

” একবার আমার কথাটা শুনুন , প্লিজ ”
তবে তূর্যের কোনো মায়া হলো না।সে রুমের দরজা বন্ধ করবে
সেই মুহূর্তে পারভিন বেগমসহ বাড়ির বাকি দুই গিন্নি দৌঁড়ে এলেন।তিনি আহিকে মেঝে থেকে উঠাতে উঠাতে তূর্যের উপর ধ’মকালেন,
” এসব কেমন ব্যবহার ,তূর্য? মেয়েটাকে এত জোরে ধাক্কা দিলি কেনো ?”
তূর্য রা’গে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য আমি চি’ৎকার দিয়ে উঠলো।মায়ের উদ্দেশ্যে বলল,
” ওর সাহস কি করে হয় আমার রুমে পা রাখার ? ইন ফিউচার যদি দেখেছি ওর জা’ন নিয়ে নিবো আমি।কথাটা ভালো করে মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে দেও ”
বলে শব্দ করে দরজা লাগালো সে।মেঝেতে পড়ে থাকা কাচের টুকরায় একটা লা’থি মেরে বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসলো। রা’গের তোপে থরথর করে শরীর কাঁপছে ।
আহি সমানে হেঁ’চকি তুলে কান্না করে যাচ্ছে । পারভিন বেগম ওকে সামলে নিজের রুমে নিয়ে গেলেন। আহি কান্না করতে করতে বলল,

” আমি বুঝতে পারিনি আমার ঐ একটা কথার জন্যে পরিস্থিতি এমন হয়ে যাবে বড় মা । আর তূর্য ভাই এভাবে বদলে যাবেন।সব সময় তো শুধু ধ’মকা ধ’মকি করতেন।সেদিন আমাকে একটা চ’ড় লাগিয়ে দিতে পারতেন। কেন বদলে গেল আপনার ছেলে, বড় মা?”
একটা দীর্ঘ’শ্বাস ফেললেন পারভিন বেগম।বললেন,
” হ্যাঁ !ঠিক বলেছিস,মা। আমার ছেলে বদলে গেছে।অনেক পাল্টে গেছে আমার ছেলে। ”
তারপর আপন মনে বলতে লাগলেন,
” আমার পরিপাটি ছেলেটা অগোছালো হয়েছে,গম্ভীর ছেলেটা আরো গম্ভীর হয়েছে ,কোনোদিন ছেলে মানুষী না করা ছেলে এখন ছেলে মানুষী শিখেছে, নির্ঘুম রাত কাটাতে শিখেছে,সারাক্ষণ ঠোঁ’টে সি’গারেট গুজতে শিখেছে । কান্না করতেও শিখেছে ,মা।”
পরিস্থিতি এতটাই বিগড়ে গেছে সেটা ঠিক করার ক্ষমতা ওনাদের কারোর হাতে নেই। দুই দিকের দুই মানুষটাই সমানে কষ্ট পেয়ে যাচ্ছে।অথচ পারভিন বেগম মা হিসেবে কারো কষ্ট দূর করতে পারছেন না। এজন্যেই বলে ,’ ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না ‘ যার মর্মার্থ এখন আহি বুঝছে।

ক্লাস শেষে ক্যাম্পাসে বসে গল্প করছে আহি আর তারিন।প্রায় দেড় মাস খানেক পর ভার্সিটি এসেছে আহি।এতদিন দুই বান্ধবীর মোবাইলে কথা হয়েছে ,সেটাও খুব কম। কল দিলেও ঠিকমতো কথা বলতো না আহি।আজ তাই কথার ঝুড়ি নিয়ে বসেছে তারিন।তবুও নিশ্চুপ আহি।অন্যমনস্ক হয়ে বসে আছে।তারিন সবটাও বুঝলেও কারণ জিজ্ঞেস করছে না।শুধু বকবক করেই যাচ্ছে । কিভাবে আহিকে স্বাভাবিক করা যায় সেই চেষ্টায়। তারিনের কথার মাঝে হঠাৎ আহি হাত বাড়িয়ে ওর কণ্ঠনালীর এক পাশে আঙুল বোলালো। শান্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

” কি হয়েছে এখানে? ”
লাজুক হাসলো তারিন।আহি কিছু একটা চিন্তা করে হালকা হাসলো।তারপর মুখে হাসি নিয়েই বলল,
” তোর আর মেহেদী ভাইয়ার মধ্যে সবটা ঠিক হয়ে গেছে ,না ? বললি না তো ! ”
তারিন লাজুক মুখে ‘ হ্যাঁ ‘ সূচক মাথা নাড়িয়ে বলল,
” হুঁ ”
তারপর কপট মে’জাজ দেখিয়ে বলল,
” তোমাকে কল করলে তো রিসিভই করো না।আর রিসিভ করলেও ঠিকঠাক কথা বলিস না।কিভাবে বলবো ? ”
আহি ব্যাগ ঘাড়ে বাঁধাতে বাঁধাতে বলল,
” আমি আজ আর ক্লাস করবো না। তোকে তো ভাইয়া নিতে আসবে তাইনা? আমি আসছি !”
বলে উঠতে যায় আহি।তারিন ওর হাত ধরে আটকালো। আহির দুই হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে ছলছল নয়নে তাঁকিয়ে বলল,

” একটু নরমাল হ,পাখি। তোর এমন ব্যবহার আমি মানতে পারছি না। তুই তূর্য ভাইয়ের সাথে কথা বল। সবটা ঠিক হয়ে যাবে।ভাইয়া হয়তো অনেক কষ্ট পেয়েছেন।তুই কনভেন্স কর পাখি। এভাবে কষ্ট পাস না। একটু কথা বলার ট্রাই করে দেখ প্লিজ ”
চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়লো আহির। কন্ঠ স্বাভাবিক রেখেই বলল,
” কিভাবে কথা বলবো তার সাথে? আমার ছায়াও দেখতে পারে না।লাস্ট তিনদিন কুকুরের মতো পিছু পিছু ছুটেছি একটুখানি কথা বলার চেষ্টায়। কথা বলা তো দূরে থাক একটাবার আমার দিকে তাঁকিয়েও দেখেন না।তূর্য ভাই আর আগের মতো নেই তারিন। ”

” আগেও তো ভাইয়া তোকে ব’কতেন।তুই তো ঠিকই ওনাকে জ্বা’লাতন করতিস।রুম থেকে এটা ওটা নিয়ে এসে আমাদের দেখাতিস। এখনও সেভাবে চেষ্টা করে দেখ ”
” আসলে আগে তূর্য ভাই চাইতেন আমি ওনার রুমে যাই এইজন্যেই যেতে পারতাম।কিন্তু ,এখন বুঝছি উনি না চাইলে ওনার রুমের সীমানায় পা রাখার সাধ্য আমার নেই ”
তারিন ,আহির কথাটা গভীর ভাবে ভাবলো। প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে তাঁকিয়ে বলল,
” তাহলে কি তূর্য ভাইয়া তোকে আগে থেকেই পছন্দ করতো? নাহলে ঠিক এখনের মতোই তো তোকে ইগনোর করতে পারতো ”
বিরস হাসলো আহি।বলল,
” নাহ ”
” তাহলে যে ওই কথাটা বললি? হতেও পারে আহি । অতীতের সব ঘটনা ভেবে দেখ। ভাইয়া এখন যেভাবে তোকে ইগনোর করছে,আশপাশ ঘেঁষতে দিচ্ছেন না।তাহলে উনি চাইলে কিন্তু আগেও এমনটা করতে পারতেন । কিন্তু করেননি ! ”
চিন্তায় পড়লো আহি।তারপর একটু ভেবে বলল,

” আগে এমনটা করেননি কারণ ,তখন ভালো না বাসলেও ঘৃণা করতেন না । কিন্তু এখন ঘৃণা করেন । আমি আসছি তারিন ,বাই ”
বলে হাঁটা শুরু করলো আহি।তারিন ওর পিছন পিছন যেতে যেতে বলল,
” এভাবে হাল ছাড়িস না আহি।খুব পস্তাবি! তূর্য ভাইয়ার পাশে তুই অন্য কাউকে মানতে পারবি ? পারবি ওনাকে অন্য কারো সাথে দেখতে ? ”
বি’রক্ত চোখে তাঁকালো আহি। কিছুটা ঝাঁঝালো কন্ঠে
বলল,

” তুই কি শুরু করেছিস তারিন? আমি তো ট্রাই করছি। হ্যাঁ,আমি ভুল করেছি।আমাকে শোধরানোর কি একটা সুযোগ দেওয়া যায় না? মানুষ মাত্রই ভুল ! ”
” এইযে এখন যেমন ম্যাচিউরিটি দেখাচ্ছিস আগে যদি এমনটা দেখাতিস তাহলে আজ এই দিন দেখতে হতো না। ”
” মানুষ জীবন থেকেই শিক্ষা গ্রহণ করে। এক্সাক্ট সিচুয়েশনে না পড়লে সেই দিকটা বোঝে না তারিন। আমিও শেষ প্রান্তে এসে বুঝেছি ”
বলে তারপর তারিনের গলার কাছের ওড়নাটা ঠিক করে দিতে দিতে আহি মুচকি হেসে বলল,
” জায়গাটা ঢেকে রাখিস ”
বলার সাথে সাথে কথাটা খুব পরিচিত ঠেকলো আহির কাছে।শোনা শোনা মনে হচ্ছে।কেউ একজন বলেছিল তাকে।কিন্তু কে? কিয়ৎক্ষণ ভাবনার পরে সবকিছু মনে পড়লো তার।তড়িৎ গতিতে ওড়না সরিয়ে তারিনের ক্ষ’ত জায়গাটা পুনরায় দেখলো। একদম তার গলায় হওয়া ক্ষ’তের মতো। সেদিন রাতে তো সে তূর্যের সাথে ছিল।তাহলে তূর্য ভাই ….! বাকিটা আর ভাবে না আহি।মুখে হাসি ফুটে ওঠে।তবে কি তারিনের কথাই সত্যি? তূর্য ওকে আগে থেকেই পছন্দ করতো ? কিন্তু মুখে স্বীকার করতো না ?
সে তারিনের গালে একটু চু’মু খেয়ে উ’ত্তেজিত
গলায় বলল,

” আমি আসছিরে তারিন।বাড়ি ফিরে কথা হবে । থ্যাংক ইউ,থ্যাংক ইউ!তোকে না, মেহেদী ভাইয়াকে ।”
বলেই দৌঁড়াতে লাগলো। তারিন হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।একটু আগের আহি আর এখনের আহির মধ্যে কোনো মিল নেই। এ যেন পূর্বের আহি।হঠাৎ করে কি হলো ওর তারিন ভেবে পায় না। এই মেয়ের পক্ষে কোনোদিনও ম্যাচিউর হওয়া সম্ভব না। কিভাবে পাগলের মতো ছুটছে।তারিনও ওর পিছু ছুটলো।হঠাৎ কি এমন হলো তাকেও তো জানতে হবে ।

বাড়িতে ফিরে সুযোগের অপেক্ষায় আহি।কখন একটু তূর্যের রুমে যাওয়ার সুযোগ পায়।সুযোগ খুঁজতে খুঁজতে রাত প্রায় বারোটা বেজে গিয়েছে।বাড়ির সকলে ঘুমিয়ে পড়লেও ঘুম নেই তার চোখে।কিন্তু তূর্য ভাই দরজা লাগিয়ে দিয়েছেন।আজ আর কথা বলা হবে না দেখে সেও শুয়ে পড়বে ভেবে দরজা ভেজিয়ে রাখতে গেল।তখনই খট করে দরজা খোলার শব্দ হলো।সে ইঁদুরের মতো মাথা বাড়িয়ে চারিদিকটায় নজর বোলালো।তূর্য জগ হাতে বেরিয়ে আসছে । ঘটনাটা দেখে সে আবার দ্রুত গতিতে রুমের ভিতরে মাথা ঢুকালো।কিছুক্ষণ বাদে পুনরায় একই কায়দায় মাথা বের করলো।তূর্য ততক্ষণে ডাইনিংয়ে চলে গিয়েছে। পানি ভরার শব্দ হচ্ছে । ও চুপিচুপি তূর্যের রুমে গিয়ে ঘাপটি মা’রলো। মিনিট কয়েক পরে তূর্য রুমে এসে দরজা লক করে শুয়ে পড়লো। আহি চিন্তায় পড়লো,রুমে এসেছে ঠিকই কিন্তু কথা তো বলতে হবে।নিশ্চিত তূর্য ভাই আবারো চি’ৎকার চেঁ’চামেচি শুরু করবেন।ভয়ে অন্তর কাপছে তার।বের হবে ? নাকি এই খাটের নিচেই শুয়ে রাত কাটিয়ে সকালে উঠে কথা বলবে ! ভেবে পায় না আহি। এসব দ্বিধা-দ্ব’ন্দ্বের মধ্যে কেমন যেন শব্দ কানে এলো তার। আস্তে করে খাটের তলা থেকে মাথা বের করলো।একটু আগে ড্রিম লাইট জ্বালানো ছিল।এখন সেটা বন্ধ ,যার দরুন রুম ঘুটঘুটে অ’ন্ধকারে তলিয়ে আছে।এত অন্ধকারে তূর্য ভাইও তাকে দেখতে পাবেন না ভেবে শব্দ না করে বের হলো সে।বের হবার সময় মাথায় দুই-একটা আ’ঘাত পেলেও কোনো শব্দ করলো না।তবে বের হয়েই মাথায় যেন আসমান ভে’ঙে পড়লো। তূর্য বিছানায় নেই ,দরজাটা বন্ধই আছে।তাহলে কোথায় গেল ? ওয়াশরুমে? কথাটা ভেবে পাশ ফিরে তাঁকাতেই একটু খানি আলোর দেখা মিলল। কয়েক মুহুর্তেই ব্যবধানে বলিষ্ঠ একটা হাত তাকে হ্যাঁচকা টানে দেয়ালের সাথে চেপে ধরলো। শরীরের সাথে শরীর মিশিয়ে নিলো।সেকেন্ডের মধ্যেই আহি বুঝতে পারলো ওটা তূর্য ভাই দাঁড়িয়ে ছিলেন , আলোর উৎস হাতের সিগারেট।বুকের ভিতরটা ধক করে উঠলো। আজকে আর রক্ষে থাকবে না ভেবে চোখ বুজে নিলো। তূর্য দাঁত খিঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল,

” কি বলেছিলাম মনে নেই ? ”
ঝাপসা ঝাপসা আলোয় দুজনার মুখ স্পষ্ট।একজনের মুখে ক্রো’ধের আগুন।আর অন্য জনের ভয়ের ছাপ। ভয় সরিয়ে আহি শান্ত কন্ঠে বলল,
” একটু আমার কথা শুনুন তূর্য ভাই । চিৎ’কার করবেন না প্লিজ ”
তূর্য এক হাতে গাল চেপে ধরলো আহির। দাঁত পি’ষে বলল,
” কি হবে চিৎ’কার করলে? তোর বাপ জেনে যাবে যে তার সো কল্ড ইনোসেন্ট মেয়ে রাত – বিরাতে আমার রুমে এসেছে। তো …”
বাকিটা শেষ করার আগে তূর্যের বুকে হামলে পড়লো আহি। কান্না ভেজা কন্ঠে বলল,
” আমি ভুল করেছি । প্লিজ একটা সুযোগ দিন তূর্য ভাই।আমি আব্বুর …পুরো পরিবারের সামনে আপনাকে চাইবো। আব্বুকে বুঝিয়ে বলবো ”
তূর্য জোরপূর্বক নিজের হতে ছাড়ালো আহিকে। জোরে ধাক্কা দেওয়ার জন্য খানিকটা দূরে ছিটকে পড়লো মেয়েটা।তূর্য কিছু একটা ভেবে বাঁকা হাসলো।কাছে গিয়ে ওর কোমর জড়িয়ে ধরলো।নিজের সন্নিকটে এনে বলল,

” কি বোঝাবি তোর বাপকে ? ”
” বলবো ….” বাকিটা আর শেষ করতে পারে না আহি।আ’র্তনাদ করে ওঠে ,
” আহ…তূর্য ভাই ….” ততক্ষণে সিগারেটের আগুন মেয়েটার কামিজ – সালোয়ার ভেদ করে কোমরের ঠিক মাঝ বরাবর ক্ষ’ত সৃষ্টি করেছে।আহি যন্ত্রণায় ছটফট করে উঠলো।তাচ্ছিল্য হেসে ওকে ছেড়ে দিলো তূর্য।আহি অশ্রুসিক্ত নয়নে কিছুক্ষন তাঁকিয়ে রইলো তূর্যের চোখে।কোনো ভালোবাসার ছিটে ফোঁটাও নেই ওই চোখে। সে আবারো হাত মুচড়ে ধরলো মেয়েটার।দাঁত পি’ষে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
” না পারবি নিজে দেখতে আর না পারবি অন্যকে দেখাতে।শুধু যন্ত্রনাটাই উপলব্ধি করবি।যেমনটা আমি করছি! ”
আহির কন্ঠরোধ হয়ে আসলো।ভেজা কন্ঠে বলল,
“আপনি তূর্য ভাই নন।আপনি বদলে গেছেন তূর্য ভাই। অনেকটা বদলে গেছেন! আপনি আমার তূর্য ভাই হতেই পারেন না”
আহির করুণ সুরে বলা কোনো কথাই হৃদয় অবধি পৌঁছালো না তূর্যের। শক্ত মুখে মেয়েটার হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে দরজার ওপারে ধাক্কা দিয়ে ফেললো।তারপর মুখের উপর শব্দ করে দরজা লাগিয়ে দিল। আহি কান্না করতে করতে মেঝেতে বসে পড়লো। মেঝেতে ভুট হয়ে চি’ৎকার করে কান্না করে উঠলো,

” একটু দয়া করুন তূর্য ভাই।একটু করুণা করুন আমার উপর। একটু আমায় বুঝুন প্লিজ ।নাহলে…নাহলে এতো যন্ত্রণা না দিয়ে একেবারে মে’রে ফেলুন ”
কথাটা বলে দুই হাতের পিঠে চোখের জল মুছলো।বিড়বিড় করে উ’ন্মাদের মতো বারবার আউড়ালো,
” কথা বলতে হবে।আব্বুর সাথে কথা বলতে হবে আমায়।আব্বু…আব্বুর সাথে কথা বলতে হবে ”
তূর্য দরজা লাগিয়ে বুকের ভিতরে আটকে রাখা তপ্ত নিঃশ্বাসটা ছাড়লো। পানি দিয়ে গলা ভিজিয়ে শূন্যে দৃষ্টি স্থির করে বলল,

” তোর ফ্যামিলিকে চাওয়ার স্বাদ আমি হাঁড়ে হাঁড়ে মেটাবো ”
বলে হাতে থাকা কাঁচের গ্লাসটা সজোরে চেপে ধরলো।মুহুর্তেই গ্লাসটা ভেঙে গুড়িয়ে গেল।কয়েক টুকরো কাঁচ হাতের তালুতে বিধে রইলো।সেখান থেকে গলগল করে র’ক্ত ঝরছে।সেদিকে কোনো হুশ নেই ওর।
রাত আস্তে আস্তে গভীর হলো অথচ দুটো মানুষের মধ্যে কারো চোখে ঘুম নেই । তূর্যের নিজের উপরই প্রচন্ড রকমে রা’গ উঠছে।সে চায় আহি ভালোবাসার অর্থ বুঝুক। মানসিক য’ন্ত্রণা দিয়ে ভালোবাসার মর্ম বোঝাতে চায়।কিন্তু কখনোই শা’রিরীক য’ন্ত্রণা দিয়ে চায়নি। এটা কি করলো ও ..!

সে দ্রুত ছাদ হতে নিচে নামলো । নিজের রুম হতে ফার্স্ট এইড বক্স নিয়ে আহির রুমের কাছে গেল।কয়েক সেকেন্ড কিছু একটা চিন্তা করে দরজা ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করলো।সাথে সাথে চমকে উঠলো আহি। বিছানা থেকে উঠে বসলো। রুমের লাইট অন করে ওর পাশে গিয়ে বসলো তূর্য। মেয়েটা কান্না করতে করতে চোখ মুখ ফুলিয়ে ফেলেছে।চোখ জোড়া এখনো ভেজা । মানে এখনো কান্না করছে।সেদিকে খেয়াল দিলো না তূর্য। গম্ভীর মুখে ঘুরিয়ে বসালো আহিকে । ড্যাবড্যাব চোখে ঘাড় ঘুরিয়ে তূর্যের মুখের দিকে তাঁকালো মেয়েটা। তূর্য হাঁটু গেড়ে মেঝেতে বসলো। জামা উঁচু করতে গেলেই আহি বাঁধা দিলো। দূরে সরে করুণ সুরে বলল,

” থাক ..! আমি লাগিয়ে নিবো।আপনি একটু আমার কথা শুনুন প্লিজ ”
তূর্য শক্ত হাতে আবার পিছু ঘোরালো আহিকে। জামাটা সামান্য পরিমাণে উপরে ওঠালো।বড় করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে এক টুকরো তুলা নিয়ে তাতে স্যাভলন মিশিয়ে জায়গাটা ড্রেসিং করে ক্রিম লাগিয়ে দিল। জামাটা পুনরায় ঠিক করে দিয়ে ফার্স্ট এইড বক্স গুছিয়ে হাঁটা ধরবে তার মধ্যেই আহির চোখ গেল তূর্যের বাম হাতের দিকে।জমাট বেঁধে থাকা অতগুলো র’ক্ত দেখে আ’র্তনাদ করে উঠলো সে।হাতটা ধরে বলল,
” এতগুলো র’ক্ত ..! কিভাবে কাটলো তূর্য ভাই?”

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৪৭ (২)

তূর্য ওর দিকে তাঁকিয়েও দেখলো না।ঝাড়ি মে’রে হাত ছাড়িয়ে বড়বড় পা ফেলে চলে গেল।যাওয়ার আগে লাইট অফ করে দরজা লাগিয়ে দিতেও ভুললো না।আহি সেদিকে তাঁকিয়ে থেকে আস্তে আস্তে শুয়ে পড়লো। পোড়া জায়গা ব্যথা অনুভব হতেই মুখ দিয়ে মৃদু আ’র্তনাদ বেরিয়ে আসলো।তারপর কাত হয়ে শুয়ে চোখ বন্ধ করলো।একটু আগে করা তূর্যের কোমল স্পর্শ অনুভব করতেই শিরদাঁড়া বেয়ে উষ্ণ স্রোত নেমে গেল।সে বিড়বিড় করলো,
” নিজে ক্ষ’ত সৃষ্টি করছেন আবার নিজেই মলম লাগিয়ে দিচ্ছেন..!কেন? ”

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৪৯