প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৫২
ইনান হাওলাদার
নিজ চেম্বারে গম্ভীর মুখ করে বসে আছেন ডাক্তার মফিজুল আলম, বর্তমান যার তত্ত্বাবধানে রয়েছে আহি। গোধূলি লগ্ন! একটু পরই মাগরিবের আযান পড়বে। তূর্য ওর চেম্বারে-ই ছিল। জরূরী কিছু মেডিসিনের প্রয়োজন হওয়ায় বাড়ি না ফিরে সোজা এখানে এসেছে। ডাক্তার মফিজুল আলমের এমন গোমড়া মুখ দেখে কিছু বলতে চায় সে তার আগেই ডাক্তার নিজেই বলেন,
” পেশেন্টকে ক্যাবিনে শিফট করা হয়েছে।”
একজন সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো দুঃখ বা খুশির সংবাদ পেলে অনুভূতির যেমন পরিবর্তন হয় তেমনই বাহ্যিক দিকটারও পরিবর্তন ঘটে। অর্থাৎ,মুখোশ্রীতে কিছু নির্দিষ্ট পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু তূর্যের ক্ষেত্রে তেমনটা দেখা যায় না।দুঃখ বা আনন্দ যেই খবরই কানে আসুক না কেন তার মুখের হাবভাবের কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় না। দুঃখের সংবাদে ক’ষ্ট পেল নাকি খুশির সংবাদে আনন্দ পেল বাইরে থেকে দেখে সেটা বোঝা সম্ভব নয়। কিন্তু এই মুহূর্তে সেটা বোঝা গেল।ডাক্তারের কথাটা শুনে মুখে হাসি না ফুটলেও চোখ মুখ জ্বলজ্বল করে উঠলো ওর। কয়েক সেকেন্ড চোখ বন্ধ করে উপরওয়ালাকে হাজার হাজার ধন্যবাদ দিলো।শুকরিয়া আদায় করল। তারপর ক্যাবিনের উদ্দেশ্যে ব্যস্ত পায়ে হাঁটা ধরলো।
সে ভাবতেই পারেনি হাসপাতালে এসে এমন একটা খুশির সংবাদ পাবে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত রুমের সামনে এসে পায়ের গতি ধীরে ধীরে কমতে থাকলো। কপালে কয়েকটা ভাঁজ পড়লো। কক্ষে প্রবেশ করে চারিদিকে নজর বুলালো। আসলাম চৌধুরী রুমের দেওয়াল ঘেঁসে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।যেন একজন নির্জীব মানুষ,দেহটা ঠিকই আছে কিন্তু সেটাতে প্রাণ নেই। লতা বেগম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চোখের জলে গাল ভাসাচ্ছেন । আর মারুফা বেগম রুমের এক পাশটায় হাত-পা ছড়িয়ে বসে আছেন। চোখ মুখ ফুলে আছে।কিন্তু সেখানে এক ফোঁটা জল নেই। কেমন ম’রা মানুষের মতো পড়ে আছেন। ওনার ঠিক ডান পাশটায় পারভিন বেগম।তিনিও নীরবে চোখের জল ফেলছেন।তারা কেউই তূর্যকে খেয়াল করেননি।সকলের দৃষ্টি শূন্যে। সবশেষে এবার তূর্য বেডের দিকে নজর বুলালো।নিজের অজান্তেই হাত থেকে ঔষুধের যাবতীয় ব্যাগ পড়ে গেল।সেগুলো মেঝেতে ঝনঝন শব্দ করে উঠলো। ও আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল বেডের কাছে।বিছানার পাশে থাকা চেয়ারটাতে বসলো।এমন ভাবে বসলো যেন শরীরে কোনো শক্তি নেই। বিছানায় শুয়ে থাকা মানবীর মুখের উপর থেকে ধীরে ধীরে কাপড় সরালো।
এই তো আহি ! মুখে কোনো অক্সিজেন মাস্ক নেই, হাতে স্যালাইন নেই।সুস্থ হয়ে গিয়েছে মেয়েটা। তাহলে আম্মু,মেজো মা,ছোট মা , চাচ্চু এমন করছেন কেন? তূর্য ডাকলো আহিকে।কিন্তু ওর গলা থেকে কোনো আওয়াজ বের হচ্ছে না। কয়েকবারের মাথায় আওয়াজ বের হলো । ফ্যাসফ্যাসে কন্ঠে মৃদু আওয়াজ শোনা গেল,
” আহি? ”
অসুস্থ মানুষ একবার ডাক দিলেই তো আর উঠবে না।কমপক্ষে ছয় – সাতটা ডাক তো দিতেই হবে । দিলো তূর্য !বহুবার ডাক দিলো, কত জোরে জোরে ডাকলো তবুও উঠছে না কেন মেয়েটা? ও ঘাড় ঘুরিয়ে পারভিন বেগমের দিকে তাঁকালো। ভীষন রকমে গলা কাঁপছে ছেলেটার।মুখ দিয়ে কেমন কথা বের হতে চাচ্ছে না। ও আস্তে করে বলল,
” আম্মু.. ডক্টর ঘুমের ওষুধ দিয়েছেন ওকে? আর মুখের উপর এভাবে কাপড় দিয়ে রেখেছো কেন তোমরা? কেবিনে রাখার পর তোমাদের সাথে কথা বলেছে ও?কখন জ্ঞান ফিরেছে? যখন জ্ঞান এসেছে আমাকে একবার জানাবে না? এখন ঘুম থেকে কখন উঠবে কে জানে ! ”
” মেয়েটা আর ঘুম থেকে উঠবে না ,বাবা।একেবারে ঘুমের দেশে পাড়ি জমিয়েছে ” খুব শান্ত স্বরে বললেন পারভিন বেগম। মারুফা বেগম কিছুক্ষণ চুপচাপ ছিলেন।এবারে আর থাকতে পারলেন না। আবারো কুঁক ছেড়ে কান্না আরম্ভ করলেন।তূর্যের বিশ্বাস হলো না মায়ের কথা। ও আবারো তাঁকালো আহির নিষ্প্রভ মুখের দিকে।ভেঙে ভেঙে বলল,
” আহি ? এ্যাঁই আহি? সাড়া দিচ্ছিস না কেন ই’ডিয়ট? রেসপন্স কর প্লিজ।আমিও তো মানুষ বল , আমার কষ্ট লাগে না ? খারাপ লাগে না আমার?ম’রার মতো পড়ে আসিস বলেই কি আমি মেনে নিবো তুই ম’রে গেছিস? আমি কি তোর মতো পাগল বল? কি ভেবেছিস তুই?তোর এই ড্রামা আমি বিশ্বাস করবো?ঢং না করে ওঠ। ”
এতগুলো কথার পরেও একবার সাঁড়া দিলো না মেয়েটা। অন্য সময় হলে ঠিকই হেসে ফেলত।খুব ভালো অভিনয় শিখে গিয়েছে। এবারে গম্ভীর হলো তূর্য। ধ’মকে বলল,
” একটা চ’ড় দিবো স্টু’পিড।চোখ খোল ! পুরোপুরি সুস্থ হ্ তারপর নাট্যকলা এ্যাকাডেমিতে ভর্তি করে আসবো।এখন তো ওঠ! ”
নাহ ! ধ’মকেও কাজ হলো না। ভ’য় – ডর সব কমে গিয়েছে স্টু’পিডটার। এবারে মারুফা বেগম কান্নারত কন্ঠে চেঁ’চিয়ে উঠলেন,
” আমার মেয়েটা আর উঠবে না বাবা। ও আমাদের ছেড়ে চিরদিনের মতো চলে গিয়েছে। আল্লাহ আপন করে নিয়েছেন ওকে। ও চলে গেল আমাকে ফেলে …আমাদের সবাইকে ফেলে চলে গেল।আমার মেয়েটা তো এত স্বা’র্থপর নয় তাহলে আমাদের সবাইকে ফেলে কেন চলে গেল? কেন …?”
তূর্য মারুফা বেগমের দিকে তাঁকিয়ে ওনার কথাগুলো শান্ত মস্তিষ্কে শুনলো।তারপর আবার আহির দিকে তাঁকালো।কিছুক্ষণ মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলতে আরম্ভ করলো,
” দিস ইজ নট ফেয়ার, জা’ন। তুই আমাকে রেখে এভাবে যেতে পারিস না। এ্যাঁই? ওঠ প্লিজ! কথা বল আহি। ড্রামা করছিস কেন এভাবে? এই স্টুপিড কাহিনী অফ কর জা’ন।এখন কি নাটক করার সময়,বল? তোর বুদ্ধি কবে হবে? যাহ ,আমার কথা বাদ-ই দিলাম মেজো মাকে দেখ কেমন পাথর হয়ে গিয়েছেন।ওঠ না প্লিজ । আর কত জ্বা’লাবি আমাকে?ওঠ জা’ন ”
আস্তে আস্তে উচ্চ হলো ওর কন্ঠ। বুকের মধ্যে অসহ্য য’ন্ত্রণা হচ্ছে এখন। এরকমটা হতে থাকলে সেও আর বেশিক্ষণ বেঁ’চে থাকতে পারবে না। তাছাড়া আহিকে ছাড়া ও কিভাবেই বা বাঁচবে।দম বন্ধ হয়ে আসছে।হাসফাস করতে করতে চিৎ’কার করে উঠলো ও ,
” আহি ……….”
চিৎ’কার রত অবস্থায় ধ’ড়ফড় করে বিছানা থেকে উঠে বসলো তূর্য। চারিদিক ঘুটঘুটে অ’ন্ধকার।কোথাও কেউ নেই। গায়ের টিশার্টটা ঘামে পুরো ভিজে গিয়েছে। কপালেও বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে আছে। আশেপাশে তাঁকিয়ে আহিকে খুঁজলো ও,কোথাও মেয়েটা নেই।তারপর হুশ আসলো,এটা তো ওর রুম ! তাহলে সে এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিল? স্বপ্ন না দুঃস্বপ্ন ! গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছে।হাত বাড়িয়ে বিছানার পাশে থাকা টি-টেবিলের উপর থাকা গ্লাস তুললো।ঢকঢক করে গ্লাসের পানিটুকু শেষ করে তড়িঘড়ি করে বিছানা ছাড়ল।গায়ের টি – শার্টটা চেইঞ্জ করে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা হলো।ড্রয়িং রুমে আকবর চৌধুরীর সাথে দেখা। ওনারও ঘুম আসছে না তাই করিডোরে পায়চারি করছিলেন।তারপর পানির পিপাসা পাওয়ায় ড্রয়িংরুমে নামেন। তূর্যকে এত রাতে এভাবে ছুটতে দেখে ছেলেটা কোথায় যাচ্ছে জানতে চাইলেন তিনি।তূর্য কোনরকমে তাড়াহুড়ায় বলতে বলতে গেল,
” হসপিটাল”
আকবর চৌধুরী ডাক ছাড়লেন,
” এলেই তো ঘন্টা দুয়েক আগে।একটু পর সকাল হবে তখন যেও। কোনো সমস্যা হয়নি তো আবার? ”
” নাহ ”
দূর থেকে শুধু এই উত্তরটুকুই ভেসে আসলো। আকবর চৌধুরী কয়েক মিনিট সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে জগ হাতে উপরে উঠে গেলেন। তূর্যকে এই সময়ে হাসপাতালে যেতে দেখে এতটাই দু’শ্চিন্তায় পড়লেন যে পানির জগটা রেখে যেতেও ভুলে গেলেন।
তূর্য হাসপাতালে পৌঁছানোর পূর্বে ডক্টর মফিজুল আলমকে কল করে এসেছে। তাই উনি ফোন কলের মাধ্যমে তূর্যের প্রবেশের যাবতীয় ব্যবস্থা করে দেন। সে হাসপাতালে আসার সাথে সাথে এখন নার্স পি.পি.ই. এগিয়ে নিয়ে আসেন। যাবতীয় নিয়মনীতি পরিষ্কার – পরিচ্ছন্নতা মেনে ভিতরে প্রবেশ করে ও। আহিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে প্রায় তিন দিন। এই তিনদিনে একটা বারের জন্যে মেয়েটাকে দেখেনি তূর্য।
আইসিইউতে প্রবেশ করেই ও সর্বপ্রথম কার্ডিয়াক মনিটর ( যেখানে রোগীর হৃ’দস্পন্দনসহ র’ক্ত চাপ,অক্সিজেন মাত্রা একসাথে দেখা যায় ) এর দিকে নজর বুলালো।সবকিছু মোটামুটি ঠিকঠাক দেখে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো। সাধারণত আইসিইউ এর ভিতর বেশি সময় নিয়ে থাকা এবং বসার কোনো রকম ব্যবস্থা থাকে না ।কিন্তু তূর্য নিজেও একজন ডক্টর হওয়ার সেই বিশেষ সুবিধা নিতে পেরেছে।ওর বসার জন্য ছোট্ট একটা টুলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেই টুলটা টেনে আহির শিঁয়রে বসলো ও। তারপর শান্ত ভাবে শুয়ে থাকা চঞ্চলা পাখিটাকে কিছুক্ষণ দেখে নিলো। কয়েক সেকেন্ডের জন্যে মুখ থেকে মাস্কটা সরিয়ে মেয়েটার কপালে একটা গভীর চু’মু খেল। পুরোপুরি অনুভব করার তাগিদে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ রইলো।
তারপর মুখ সরিয়ে আহির উদ্দেশ্যে নরম কন্ঠে বলল,
” বাড়ির সবাইকে এভাবে টে’নশনে ফেলে খুব ভালো লাগছে না তোর? সুস্থ হবি না,হুম? বাড়ি ফিরতে হবে তো নাকি? আমার কান্না দেখার তো খুব শখ ছিল তোর এইজন্যে এমনটা করছিস? কিন্তু ছেলেরা তো কাঁদে না ! আমিও কাঁন্না করি না।”
কথাগুলো বলতে বলতে বেহায়া নয়ন থেকে কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো। বাকিটা আর গড়াতে দিলো না তূর্য।দ্রুত আটকালো সেগুলোকে।হাতের উল্টো পিঠে মুছে ফেলল।তারপর একটা ঢোক গিলে বলল,
” বুঝেছিস তুই? এখন দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠ। বউ হবি না আমার? আর কতকাল ওয়েট করাবি,হুম ? কত অপেক্ষা করব বল।বয়স হচ্ছে তো ! ”
তূর্যের ইচ্ছা হলো আহির সারা মুখ আদরে ভরিয়ে দিতে । কিন্তু সব সময় সবকিছু পসিবল নয়। তাই সে পারলো না নিজের ইচ্ছা পূরণ করতে। নার্স এসে তাড়া দিলেন।তূর্য প্রেয়সীর কপালে আরেকটা গভীর চু’মু খেয়ে উঠে পড়লো। বেরিয়ে এসে কাঁচের দরজার বাইরে থেকে খানিকক্ষণ ধরে তাঁকিয়ে রইলো। নার্সটা তূর্যের উতলা অবস্থা দেখে বললেন,
” পেশেন্টকে কাল সকালে হয়তো কেবিনে শিফট করা হবে।ডাক্তার এমনটাই বলছিলেন ”
নার্সের কথায় তূর্যের মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। ও নীরবে তাঁকিয়ে রইলো দরজার ওপারে থাকা মানবীর দিকে প্রাণভোমরাটাকে দুচোখ ভরে দেখতে থাকলো। কোনভাবে এই দুঃস্বপ্নটা যদি সত্যি হয়ে যেত কি করতো ও?
আহির অসুস্থতার পর থেকে চৌধুরী বাড়ির সকলের আর একসাথে খাবার খাওয়া হয়নি।সবসময় দুই-একজন হাসপাতালে থাকে। আর বাকিদের মধ্যে একেক জনের একেক কাজ থাকে ।ফলস্বরূপ একসাথে খাওয়া হয়ে ওঠে না। খানিকক্ষণ আগে পারভিন বেগম আর মারুফা বেগম হাসপাতালে গিয়েছেন। লতা বেগম এখন দুই ভাসুরকে ভাত বেড়ে খাওয়াচ্ছেন।
আকবর চৌধুরী আর আসলাম চৌধুরী একসাথে খেতে বসলে সবসময় ব্যবসায়িক আলাপ-আলোচনা বা দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। আর এসব আলোচনা শুরু করেন আসলাম চৌধুরী ।কিন্তু এখন উনি পুরোপুরি নিশ্চুপ। চুপচাপ খাবার খাচ্ছেন। আকবর চৌধুরী নীরবতা ভাঙলেন।ভাইয়ের উদ্দেশ্যে বললেন,
” যা হওয়ার হয়েই তো গিয়েছে। আহি মা’র অবস্থাও আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তাহলে এত মন খারাপ কোথা থেকে আসছে? তাছাড়া নিজের ভুল বুঝে অনুতপ্ত হয়েছিস এটাই অনেক।এখন আর নিজেকে একঘরে করে রাখার কোনো কারণ নেই। ”
বলে একটু থামলেন তিনি।তারপর আবারো বললেন,
” এত কিছুর পরেও আমি আমার ছেলের জন্যে তোর মেয়েকে চাইবো না। মন থেকে দিলে দিবি আর না দিলে তোর ব্যাপার। ”
আসলাম চৌধুরী বি’মর্ষ দৃষ্টিতে ভাইয়ের দিকে চাইলেন।আ’হত গলায় বললেন,
” আমি যে কারণে ওদের সম্পর্কে বাঁধা দিয়েছিলাম সেটা নিশ্চয়ই তোমরা বুঝেছো ভাইজান। সেই বাঁধা যেহেতু আর নেই তাহলে আমি কেন ওদের বিয়ে আটকাবো। আমার আপত্তি থাকার আর কোনো কারণও নেই।”
দুই ভাইয়ে মিলে আরো কিছুক্ষণ ধরে এসব বিষয়ে কথা বললেন। খাওয়া শেষে আসলাম চৌধুরী বেরিয়ে গেলেন হাসপাতালের উদ্দেশ্যে।মেয়েটার জ্ঞান ফেরার পর এখনো উনি দেখা করতে যাননি। আর আকবর চৌধুরী ড্রয়িং রুমের সোফায় গিয়ে বসলেন । টিভি চালিয়ে দেশের বর্তমান অবস্থা দেখছেন।
কিছুক্ষণ আগে তূর্য বাড়ি ফিরেছে । সে লতা বেগমের কাছে কফি চেয়ে বাবার পাশের সোফায় গিয়ে বসলো। কিয়ৎক্ষণ পর লতা বেগম কফি নিয়ে আসলেন। কফি পেয়ে সে উঠতে যাবে তার আগে আকবর চৌধুরী টিভিতে মনোযোগ রেখেই বললেন,
” মেয়েটাকে নাকি একবারও দেখতে যাওনি শুনলাম ! ”
তূর্য স্বাভাবিক কন্ঠে উত্তর দিলো,
” হ্যাঁ ”
” কেন? তাহলে কখন যাবে ”
টিভি বন্ধ করতে করতে প্রশ্ন করলেন আকবর চৌধুরী।
” বাড়িতে তো আসবেই ! ” কফির কাপে চুমুক দিয়ে বললো তূর্য।
” ভাঙবে তবু মচকাবে না। এই কদিন যে কি করে বেড়িয়েছো দেখিনি ভেবেছো? আজ ভোর রাতেও তো হন্যে হয়ে ছুটলে।তাহলে এখন আবার কি হলো?চোখের দেখাও দেখতে যাচ্ছো না !”
চুপ করে রইলো তূর্য। কিছুক্ষণের নীরবতা ,তারপর আকবর চৌধুরী কৌতূহলী কন্ঠে বললেন,
” একটা প্রশ্ন করি ? ”
” জ্বি,করুন ”
আকবর চৌধুরী কয়েকবার গলা খাঁকারি দিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক রেখে কন্ঠে ক’পট গম্ভীরতা টেনে বললেন,
“তুমি কখন থেকে আহিকে পছন্দ করতে?”
বাবার এমন প্রশ্নে তূর্যের অপ্রস্তুত হওয়ার করা ছিল।কিন্তু তার মধ্যে তেমন কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। প্রশ্নের উত্তর কি দেওয়া যায় সেটা ভাবার দরকারও হলো না। সেকেন্ডের ব্যবধানে সে সাবলীল গলায় বলল,
” পছন্দ কখনোই করতাম না। তবে শুরু থেকেই মনে হতো ওকে নিজের করা দরকার ”
পুনরায় প্রশ্ন করলেন আকবর চৌধুরী,
” কেন মনে হতো? ” কৌতূহলে ভরা কন্ঠস্বর ওনার।
” কি জানি ! ” ঠোঁট উল্টে ভাবলেশহীন ভাবে বলল তূর্য।
আকবর চৌধুরী ভ্রু কুঁচকে ছেলের দিকে তাঁকালেন।
সবটা যখন ঠিকঠাক এবারে একটু সোজা-সাপ্টা,সত্যি উত্তর দিলেই তো পারে। তূর্য তাড়াহুড়ো করে বলল,
” আর কিছু বলবেন? ”
” নাহ । যেতে পারো ” বলে হাত দিয়ে ইশারা করে উপরের দিক দেখালেন আকবর চৌধুরী।
তূর্য বুঝলো তার উত্তর ভদ্রলোকের পছন্দ হয়নি।ও সোফা ছেড়ে উঠতে উঠতে বলল,
” আপনি কি শুনতে চাইছেন? আমি এখন বলবো ‘ ওর জন্মের পর থেকেই আমি ওকে ভালোবাসি ‘ এটা ? ”
আকবর চৌধুরী হয়তো এমনটাই ভেবেছিলেন ।তিনি চুপ করে রইলেন। সাধারণত পিতা-মাতা সন্তানের মন পড়তে পারেন।সন্তানেরা আবার কবে থেকে পিতা-মাতার মন পড়তে শুরু করলো !
তূর্য পুনরায় বলল,
” ওর যখন জন্ম হয়েছে তখন কি দেখে ওকে পছন্দ করবো? মোরওভার ,তখন আমিই বা এসবের কি বুঝতাম ! ”
আকবর চৌধুরী শত চেয়েও নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলেন না। কৌতূহল প্রকাশ করেই ফেললেন।বললেন,
” তাহলে কখন থেকে পছন্দ করলে ? ”
ভদ্রলোক জানেন কোনো উত্তর আসবে না ।আর যদিও আসে ত্যাঁড়া-ব্যাঁকা উত্তরই আসবে।ওনার ধারণাই ঠিক হলো। তূর্য বলল,
” ছেলে – বৌমার ব্যাপারে শ্বশুরমশাই’য়ের এত ইন্টারেস্ট থাকা ভালো না। ”
আকবর চৌধুরী গম্ভীর গলায় বললেন,
” আমার ভাই এখনো বলেনি তোমাকে মেয়ে দিবে।তার আগেই
‘বৌমা’ ‘ বৌমা ‘ শুরু করেছো?”
” বলেনি ,বলবে! ”
গা ছাড়া ভঙ্গিতে কথাটা বলে চলে গেল তূর্য।কয়েকটা সিঁড়ি ভেঙে পিছু ঘুরে বাবার দিকে তাঁকিয়ে পুনরায় বলল,
” যখন দাদু বলেছিলেন ‘ আহিকে তোর সাথেই বিয়ে দিবো দাদুভাই ‘ তখন থেকেই কেমন কেমন মনে হতো ”
বলে বাবার অগচরে মুচকি হেসে চলে যায় সে।
আকবর চৌধুরী কিছুক্ষণ মূর্তির মতো বসে রইলেন।তারপর নিজ মনে ভাবলেন,কত বড় ফাজিল ছেলের জন্ম দিয়েছেন তিনি। এই বলল ‘ তখন আমি-ই বা এসবের কি বুঝতাম।’ আর এখন দেখ! তখন বুঝেনি ,আবার বারো – তেরো বছর বয়স থেকে কেমন কেমন মনে হতো।ইচড়ে পাকা ছেলে কোথাকার ! আকবর চৌধুরী গলা উচুঁ করে বললেন,
” ওইটুকু বয়স থেকেই মেয়েটার দিকে শকুনের নজর দিয়ে রেখেছিলে তাহলে …অকালপক্ক ছেলে ! ” শেষ কথা বিড়বিড় করে বললেন তিনি।
তূর্য যেতে যেতে বলল,
” তখন জাস্ট কেমন কেমন মনে হতো আর এখন ….” এইটুকু বলে থামে সে। আকবর চৌধুরী ইচ্ছা করছে বাকি কথাটুকু শুনতে ছেলে তার কি বলে! কিন্তু প্রশ্ন করতে ইচ্ছা করছে না।মুখের উপর কিনা কি বলে ফেলে তার ঠিক নেই। কিন্তু তিনি প্রশ্ন না করলেও লতা বেগম করলেন।রান্নাঘর থেকে চেঁ’চিয়ে উঠলেন,
প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৫১
” আর এখন কি বাবা? ” তারপর ভাসুরের চোখে চোখ পড়ার লজ্জা পেলেন। একদিক থেকে আকবর চৌধুরীর উপকারই করেছেন তিনি। মনে মনে খুশি হলেন আকবর চৌধুরী।
” এখন অনেক কিছু মনে হয় ” রুমে ঢুকতে ঢুকতে জবাব দিলো তূর্য।

Er porer part kobe diben onek din dhore wait korchi