প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৫৬
ইনান হাওলাদার
অবশেষে আহিকে নিয়ে বেরিয়েছে তূর্য।কোলাহল ও যানজটে পূর্ণ পথ ধরে গাড়ি এগিয়ে চলছে। গাড়িতে উঠেছে ধরে তূর্য কারো সাথে কলে কথা বলে চলেছে। কিন্তু কার সাথে সেটা জানে না আহি। কথার ধরণ শুনেও বুঝতে ব্যর্থ।এতক্ষণ ধরে চুপচাপ থাকাটা বোরিং লাগছে ওর কাছে।মোবাইলে এমবিও নেই যে একটু রিলস দেখবে। তাই কি কি শপিং করবে সেগুলোই ভাবতে লাগলো। তার আবার ভুলে যাওয়ার স্বভাব আছে।বাড়ি থেকে সবটা বারবার মুখস্থ করে রাখলেও কেনাকাটি করতে গেলে কিছু না কিছু ভুলে যাবে-ই। বেশ খানিকক্ষণ পর কল কাটলো তূর্য। সাথে সাথে আহি কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন ছুড়লো,
” এতক্ষণ ধরে কার সাথে কথা বলছিলেন তূর্য ভাই? ”
” সন্দেহ করছিস? ” তূর্য ওর দিকে এক পলক তাঁকিয়ে ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো। আহি এমনটা ভেবে মোটেও প্রশ্ন করেনি।কৌতূহলবশত জিজ্ঞেস করেছে। একটু বাদে তূর্য নিজে থেকেই বলল,
” হসপিটাল থেকে একজন কল করেছিল। নাম বললে চিনবি? বলবো? ”
” না ! ”
সেকেন্ডের ব্যবধানে পুনরায় বলল,
“তূর্য ভাই জানেন? তারিনের বাবু হবে ” চোখে-মুখে আনন্দ উপচে পড়ছে ওর।
” পিংকিরও ” ড্রাইভ করতে করতে বলল তূর্য।
” আল্লাহ তাই ? ” খুশিতে বাকবাকুম হয়ে গেল মেয়েটা।এক সাথে দুই দুইটা খুশির খবর।
” হুম “ছোট করে জবাব দিলো তূর্য।
একটু সময়ের বিরতি শেষে আহি বলল,
” আমি তারিনকে বলেছি ওর যদি ছেলে হয় তাহলে আমার মেয়ের সাথে বিয়ে দিবো ” কথাটা বলতে বলতে ইতস্তত বোধ করলো ও। তারপর একটু চিন্তিত হয়ে পুনরায় বলল,
” আপনি আবার পিংকি আপুর বেইবির সাথে বিয়ে ঠিক করে রাখেননি তো ? ”
” আমার চিন্তা-ভাবনা এখনো অত দূর অগ্রসর হতে পারেনি।আপাতত বিয়ে পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ”
” তাহলে তারিনের ছেলের সাথে বিয়ে দিতে আপনার কোনো আপত্তি নেই ? ” নিশ্চিত হতে প্রশ্ন করলো আহি।
” যদি তোরও ছেলে হয়? “তূর্য এবার পাল্টা প্রশ্ন করলো।
” তারপর যখন মেয়ে হবে তখন ওর ছেলের সাথে বিয়ে দিবো ”
সমস্যার সমাধান করে ফেললো সে। তূর্য লুকিং মিরর দিয়ে আহির দিকে চাইলো। বত্রিশ পাটি বের করে আছে।সে একটু বন্ধ করার ব্যবস্থা করলো,
” তাই? কত গুলোর প্লানিং চলছে ? চলছে তো চলছে ,আবার আমাকে ছাড়া-ই? ”
আহি এতক্ষণ তূর্যের দিকে ঘুরে কথা বলছিলো। লোকটার এমন কথায় সোজা হয়ে বসলো ও।জড়তায় মিইয়ে গেল।চিবুক গিয়ে থুতনিতে ঠেকেছে। কোলের উপর থাকা ওড়নার কোণা ধরে মোড়ামুড়ি করতে শুরু করলো ও। এসব কাণ্ড পরখ করে ঠোঁট টিপে হাসলো তূর্য। বলল,
” একা একাই প্লানিং করুন ,প্রবলেম নেই। শুধু আমাকে একটু জানিয়ে রাখবেন। প্লানিংয়ে না হোক ,সেটার বাস্তবায়নে বিগেস্ট এফোর্ট তো আমার’ই দিতে হবে ”
আহির কান দিয়ে যেন গরম ধোঁয়া বের হতে লাগলো। মন চাইলো এখনি যদি গাড়ি থেকে নেমে যেতে পারতো।নাহলে কোনো ভাবে কয়েক ঘন্টার জন্যে অদৃশ্য হতে পারলেও এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেত। এত পকর-পকর করার আগে ভাবা উচিত ছিল কার সামনে কি বলছে। এইজন্যেই মানুষ বলে ‘ ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না ।’ প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্যে যে কিছু বলবে গলা থেকে সে কথাও বের হতে চাইছে না।
এরপর কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে এলো গাড়িতে। আহি পুরো চুপচাপ হয়ে গেল। কিন্তু তূর্যের এই নীরবতা পছন্দ হচ্ছে না।এমনি সময় নিরিবিলি ড্রাইভ করে অভ্যস্ত হলেও আহি পাশে থাকলে সেটা কোনো দিনও সম্ভব হয়নি।বছর খানেক আগে আহির বকবক শুনে উপরে-উপরে বিরক্তি দেখাতো তারপর মেয়েটা চুপ হয়ে গেলে রিগ্রেইট করতো।কিন্তু এখন তো আর এক্সট্রা ড্রামা করার কোনো প্রয়োজন নেই।ওর আবোল-তাবোল বলার সাথে যতটা সম্ভব নিজেও সাঁয় দেয়। তার কথার জের ধরে মেয়েটা এখনো চুপচাপ বুঝছে সে।
” সেই কবে নাক ফোঁড়াবি বললি ! এখনো ফোঁড়াসনি কেন? ”
এই পর্যায়ে ও কথা বলতে নিজে সাহায্য করলো আহিকে, নাকি নিজের সাহায্য করলো কে জানে!
” এমনি ” মিনমিনিয়ে বলল ও।
” বেশি ইচ্ছা হলে ফোঁড়া,নাহলে দরকার নেই ”
” ইচ্ছা আছে তো ! নাক ফোঁড়ালে মেয়েদের সৌন্দর্য বাড়ে ”
” যেটুকু আছে ওইটুকুর ভারই সামলাতে পারি না” বিড়বিড় করে বলল ও। ভিতরে-ভিতরে ভয় হলো আহির।এই লোক যদি আবার নিজে নিয়ে যেতে না চায়। মারুফা বেগম তো শুধু একটা চড় মে’রেছিলেন ।আর একটু ‘ আ ‘ করলেই এই লোক পুরো গলা চে’পে ধরবে। তবে তূর্য এইসব বাড়তি ঝামেলায় জড়াবে না এইটুকু ভরসা আছে ওর।
আরো দুই একটা কথাবার্তা বলার পর স্বাভাবিক হলো আহি। এতক্ষণ ধরে আটকে রাখা নিঃশ্বাস ছাড়লো তূর্য। মিনিট কয়েকের মধ্যে ট্রাফিক জ্যামে আটকালো ওরা। তূর্য গাড়ির কাঁচ নামিয়ে দিল। পরপর দেখতে পেল এক জোড়া বৃদ্ধা দম্পতি স্কুটিতে বসে আছেন।বয়স সত্তরের ঊর্ধ্বে হবে হয়তো ,অনুমান করলো ও।পথশিশু হতে বৃদ্ধ লোকটি তার স্ত্রীকে একটা গোলাপ কিনে দিলেন। তূর্য মুগ্ধ নয়নে সে সকল কান্ড দেখলো। যেন নিজেদের ভবিষ্যৎ দেখতে পেল ও। একবার ঘাড় ঘুরিয়ে আহির দিকে চাইলো ,মেয়েটাও ঠোঁটে হাসি নিয়ে বৃদ্ধা দম্পতিকে দেখছে। তূর্যেরও ঠোঁটের কোণে হাসি দৃশ্যমান হলো–অল্প কয়েক সেকেন্ডের জন্যে, তারপর আবার মিইয়ে গেল। ওর এক্সপেক্টেশন ছিল ফুলওয়ালা মেয়েটি এবার তাদের কাছে আসবে।কিন্তু আসলো না। তূর্য নিজে ডাকলো মেয়েটিকে।সে জানালার কাছে এসে বলল,
” ফুল নিবেন ,দাদা? ”
দাদা বলায় আহি ফিক করে হেসে দিলো।তূর্য ভ্রু কুঁচকে একপলক চাইলো ওর দিকে। তারপর মেয়েটির উদ্দেশ্যে বলল,
” হ্যাঁ , কত করে ?”
” এ্যাকটা নিলে তিরিশ আর দুইডা নিলে পনচাইস ট্যাহা। ”
( একটা নিলে ত্রিশ আর দুইটা নিলে পঞ্চাশ টাকা )
” আর সবগুলো ? ”
” সবগুলো নিবেন দাদা? ” খুশিতে মেয়েটার মুখ চকচক করে উঠলো। তূর্য মুচকি হেসে মাথা দোলালো। আহিও অবাক হলো । মেয়েটা ওর দিকে তাঁকিয়ে বলল,
” দিদি আপনে অনেক লাকি ”
আহি এই মুহূর্তে তূর্যকে দাদা ডাকার কারণ বুঝলো। মেয়েটার কথার বিপরীতে তূর্যের দিকে তাঁকালো । চোখাচোখি হলো দুজনের। তূর্য মেয়েটার থেকে সবগুলো গোলাপ নিয়ে ডেস্কের উপর রাখতে রাখতে বলল,
” খোপা তো আর করিসনি যে গুজে দিবো ”
একটু আগে যেমন ওরা বৃদ্ধা দম্পতিদের লক্ষ্য করেছিল।এখন ওনারাও ওদের লক্ষ্য করলেন। তাদের স্কুটি আর ওদের গাড়ি এতটাই নিকোটে যে সামান্য কথা-বার্তাও স্পষ্ট শোনা যায়। বৃদ্ধ লোকটি একটু জোরে-শোরে বললেন,
” নতুন বিয়ে করেছো? ”
ওরা বুঝলো না ওনারা কথাটা কাদের বললেন।প্রশ্নবিদ্ধ নয়নে তাঁকালো ওনাদের দিকে। লোকটা হেসে বললেন,
” তোমাদেরই বলছি ”
এবার উত্তর দিলো তূর্য,
” এখনো বিয়ে হয়নি ”
এতদিন বাড়ির সবার মুখে ওদের বিয়ের কথা শুনে আহি নিজের মধ্যে কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করেনি।কিন্তু আজ হঠাৎ তূর্যের মুখে কথাটা শুনে অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করলো। বিয়ে শব্দটা হৃদয়ে এসে দোলা দিলো। লোকটা পুনরায় প্রশ্ন করলেন,
” নিজেদের পছন্দে বিয়ে?ভালোবাসার বিয়ে? ”
” জ্বি ”
” প্রথমে কে প্রেমে পড়লে ? ” লোকটা এবারে গভীরে গেল। আহি তূর্যের মুখের দিকে তাঁকালো। ওর উত্তর শোনার আশায়। তার এক্সপেক্টেশন কিছুটা ফিল্মি কায়দায় উত্তর দিবেন তূর্য ভাই।কিন্তু ততক্ষণে গ্রীন সিগন্যাল এসে গিয়েছে। বৃদ্ধ লোকটা বললেন,
” যদি আবার কোনোদিন দেখা হয় ,তখন প্রশ্নের উত্তর জানবো।এবারে উত্তর অনেক দেরি করে ফেললে ”
বলে চলে গেলেন ওনারা।
তূর্য আস্তে আস্তে গাড়ি এগিয়ে নিয়ে যেতে লাগলো।আহির অসন্তুষ্ট মুখ নজরে পড়লো তার।বলল,
” হোয়াট হ্যাপেন্ড ? ”
” আপনি উত্তর দিলেন না কেন তূর্য ভাই? ” অভিযোগ করলো ও।
” দেওয়ার আগে গ্রিন সিগন্যাল এলো আর ওনারা চলে গেলেন।কিভাবে দিবো? ”
” সামান্য একটা উত্তর দিতে এত সময় নিলে তো গ্রিন সিগন্যাল আসবেই।ফটাফট উত্তর দিলেই তো পারতেন ”
” মনে হচ্ছে ওনাদের থেকে তোর কিউরিসিটি বেশি । আর ফটাফট কি উত্তর দিতাম? বল তুই ”
” শি ফেল ফার্স্ট, বাট আই ফেল হার্ডার।” খুশি খুশি মনে বলল ও।ইন্সটাগ্রামে রিলসে দেখা একটা লাইন বলে দিয়েছে। তূর্য বলল,
” তাহলে মিথ্যা বলতাম আমি? ”
” মিথ্যা কোথায়? কি কষ্টে আপনাকে নিজের জালে ফাঁসালাম আমি,ভুলে গেলেন? ” বলে একটু মন খারাপ করলো ও।সেকেন্ডের ব্যবধানে পুনরায় বলল,
” নাকি আপনি গভীরভাবে আমার প্রেমে পড়েননি?”
” হ্যাঁ,খুব কষ্টে ফাঁসিয়েছিস আমাকে। তোর শ্রমের মর্যাদা দেওয়া উচিত । পারিশ্রমিক হিসেবে কি চাস বল ”
” নাটক করবেন না তূর্য ভাই।মিথ্যা কোনটা আগে সেটা বলুন ”
” দুটোই মিথ্যা ”
” তাহলে সত্যি কি ? ”
তূর্য ড্রাইভ করে গাড়িটাকে একটা সেইফ পজিশনে আনলো।তারপর আহির দিকে ঝুঁকে গাঢ় কন্ঠে ফিসফিস করে বললো,
” আই ফেল ফার্স্ট, এ্যান্ড আই ফেল হার্ডার। ”
আহি আশ্চর্য হলো। এটা কখনোই হতে পারে না। কত রং-ঢং করে লোকটার মাথা খেল, ভালোবাসা বোঝালো আর এখন বলছে সে আগে প্রেমে পড়েছে? সে জানতো তূর্য কখনোই মিথ্যা কথা বলে না।কিন্তু , আজ বুঝলো সে লোকটার ব্যাপারে সব ভুল জেনেছে এতদিন।তিনি যেমন ভদ্র সেজে থাকেন ততটা ভদ্র তিনি নন।আর মিথ্যাও বললেন আজ। ওর বলতে ইচ্ছা করলো ,” আপনি মিথ্যাও বলেন ,তূর্য ভাই?” তবে সরাসরি এভাবে বলার সাহস পেল না। বলল,
” তাহলে আমি যখন ‘ ভালোবাসি ‘ ‘ ভালোবাসি ‘ করে আপনার কানের মাথা খাচ্ছিলাম তখন ব’কতেন কেন আমাকে? তখন মিথ্যা নাটক করতেন ? নাকি এখন মিথ্যা বলছেন?”
” তখন তোকে একবারও বলেছি আমি ‘ ভালোবাসি না ‘ ?”
আহি অতীতের সকল ঘটনা একবার ভেবে দেখলো। হ্যাঁ,তিনি একথা সত্যিই কখনো বলেননি। ও বলল,
” ভালোবাসিও তো বলেননি।কেন? ”
” মন চায়নি ”
” কেন মন চায়নি?”
” এত তাড়া কেন তোর?সময় হলে বলবো ”
হাজার বার জানতে চাওয়া সত্ত্বেও আর উত্তর পাওয়া হলো না আহির। শপিং করার মাঝে মাঝেও একই প্রশ্নের উত্তর বারবার জানতে চেয়েছে সে। বলেনি তূর্য। সারাটাদিন এই প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খেয়েছে ওর।তূর্য ভাই তাকে ওর আগে থেকেই ভালোবাসতেন! কিন্তু লুকিয়ে কেন যেতেন? কেনই বা ওসব নাটকগুলো করতেন? কোনো উত্তর খুঁজে পেল না ও।
ইদানিং বাড়ির যেকোনো দুই সদস্য এক জায়গা হলেই বিয়ের আলাপ-আলোচনা শুরু করেন।একই কথাবার্তা আগে হাজারবার আলোচনা করা সত্ত্বেও আবার করবেন। এতে যে বলেন আর যিনি বা যারা শোনেন তাদের কেউই বিরক্ত হন না।এঘেয়েমিও আসে না। এখনও তার ব্যতিক্রম ঘটছে না।রাতের খাবার টেবিলেও সবাই এসব নিয়েই আলোচনা করতে ব্যস্ত। আকবর চৌধুরী লক্ষ্য করলেন আহি বা তূর্য কেউই টেবিলে নেই।ভাবলেন ,হয়তো ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়েছে তাই রাতের খাবার খেয়ে এসেছে ওরা।
সাধারণত আহি কোনকিছু কেনাকাটি করলে বাড়ির প্রতিটি সদস্যদের একজায়গায় জড়ো করে তাদেরকে প্রত্যেককে দেখায়।সবাই একেকটা করে সুন্দর-সুন্দর কমপ্লিমেন্ট দেয় আর ও খুশি হয়ে যায়। আজকে তেমনটা হয়নি দেখে খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলেন আকবর চৌধুরী,
” আহি কোথায়? শপিং দেখাবে না আমাদের?”
” ওরা এখনো ফেরেনি ” উত্তর দিলেন পারভিন বেগম।স্ত্রীর কথায় আশ্চর্য না হয়ে থাকতে পারলেন না তিনি। ওনার জানা মতে সকাল দশটা বা এগারোটার দিকে বেরিয়েছে ওরা।এখন রাত দশটা। মানে টানা এগারো থেকে বারো ঘন্টা ধরে মার্কেটে ওরা। সেটাও তূর্যের সাথে!তিনি বললেন,
” কেনাকাটা শেষ হচ্ছে না? কল করেছিলে ওদের ? ”
” করেছিলাম।বলল ঘন্টা খানেকের মধ্যে চলে আসবে ”
” সবকিছু কিনেছে তো ? ”
এবারে মারুফা বেগম রা’গের সাথে বললেন,
” যে ভাইজি হয়েছে আপনাদের।তার নাকি বিয়ের ড্রেস-ই পছন্দ হচ্ছে না।ছেলেটার কি হাল করেছে আল্লাহ ভালো জানেন।”
পারভিন বেগম জা’কে থামালেন,
” মেজো থাম তুই।” তারপর বাকিটা শেষ করলেন,
” তেমন কিছু না!সব কেনা শেষ।শুধু বিয়ের ল্যাহেঙ্গাটা বাকি রয়েছে। আহির যেটা পছন্দ হয়েছে তূর্যের হচ্ছে না। আর তূর্য যেটা পছন্দ করেছে আহির ভালো লাগছে না।এই যা!”
” বাকিটুকু বলবে না বুবু?আমরা কলে থাকা অবস্থায় ঐ মেয়ে বলে কিনা তূর্য ছ্যাঁচড়ামি করে ওকে ঐ পোশাক দিচ্ছে না ”
টেবিল শুদ্ধ সবাই হোঁ হোঁ করে হেসে উঠলেন।আসিফ চৌধুরী হাসতে হাসতে জানতে চাইলেন,
” তারপর? তূর্য কিছু বলল না?”
লতা বেগম বললেন,
” সেটা জানি না।কল কেঁটে দিয়েছিল তারপর ”
” কিছু তো বলেছে নিশ্চয় !” আসিফ চৌধুরী মাথা দোলাতে দোলাতে অভিজ্ঞদের ন্যায় বললেন।
আকবর চৌধুরী রে’গে গেলেন,
” তাহলে মেয়েটা যেটা চাইছে কিনে দিলেই তো হয় । সবকিছুতে বাড়াবাড়ি ছেলেটার ”
” শুধু ছেলের দোষ দেখবেন না ভাইজান।ও যে জংলি পোশাক পছন্দ করেছে ওটা কিনলে আমিই ওকে বাড়ি উঠতে দিবো না ”
” কেন?বাড়ির প্রেসিডেন্ট হয়েছো তুমি?” প্লেটে হাত নাড়াতে নাড়াতে বললেন আসলাম চৌধুরী।
তর্কে জড়ালেন না মারুফা বেগম। বাপ-চাচাদের সামনে মেয়ে তুলে কোনো কথাই বলাই যেন পা’প।
শপিং শেষে রাত এগারোটা নাগাদ বাড়ি ফিরেছে ওরা।এসেই ক্লান্ত শরীরটাকে বিছানায় এলিয়ে দিয়েছে তূর্য। কয়েক মিনিটের জন্যে শুয়েছিল ও।কিন্তু চোখ খুলে দেখলো সাড়ে বারোটা বাজে। ভয়ংকর রকমের স্বপ্নটা না দেখলে হয়তো এখনো ঘুমটা ভাঙতো না। এসি চালানো অবস্থায়ও ঘেমে-নেয়ে একাকার। শরীর হতে শার্টটা খুলে ফেললো। স্বপ্নটা পুনরায় কল্পনা করার চেষ্টা করলো,
ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে আছে চারপাশ। মাথার ওপর বিস্তৃত খোলা আকাশ।সেখানে কোনো তাঁরাদের দেখা নেই,শুধু একফালি চাঁদ। দূরে থেকে ঝিঁঝিঁ পোকার ক্ষীণ ডাক ভেসে আসছে।সেই অন্ধকারের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে আহি। গায়ে হালকা রঙের শাড়ি, বাতাসে আঁচলটা আস্তে আস্তে দুলছে। চুলগুলো সুন্দর করে খোঁপা করা, তাতে ওর কিনে দেওয়া সেই গোলাপগুলো গাঁথা। হাতে একটি কাঁচের বয়ম ধরে দাঁড়িয়ে আছে, যার ভেতরে জোনাকি পোকাদের মেলা ।সেগুলো জ্বলছে-নিভছে। তাদের আলো ওর মুখে এসে পড়ছে।সেই সবুজাভ আলোয় মেয়েটার মিষ্টি হাসি দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।তূর্য অন্ধকারের অন্য প্রান্ত থেকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে ওর দিকে। ঠিক সেই মুহূর্তে ভেঙে গেল স্বপ্নটা।
কল্পনা শেষে তড়িঘড়ি করে উঠলো ও। গোসলটাও করেনি। গোসলে যাওয়ার আগে আহির মোবাইলে একটা টেক্সট লিখলো,
” ঐযে চুলে ফুল লাগিয়ে কিভাবে যেন খোঁপা করে ,সেটা তুই করতে পারিস? পারলে এখনই খোঁপা করে পিকচার সেন্ড কর আমাকে ”
সাথে সাথে সিন হলো। পরপর আরেকটা ম্যাসেজ দিলো ও ,
” ভুলেও রুমে আসবি না।ও’য়ার্ন করলাম! জাস্ট পিকচার সেন্ড করবি,,মাইন্ড ইট ”
সকল প্রকার বিধি-নিষেধ জারি করে শাওয়ার নিতে ঢুকলো সে।
আহি ম্যাসেজ দুটো দেখে কিছুক্ষণ ‘ থ ‘ হয়ে বসে রইলো।রাত বিরেতে কি ভুত চাপলো লোকটার মাথায় কে জানে। তাছাড়া শুধু খোঁপা করলেই হলো? কোনো রকমের সাজ-গোজ ছাড়া খোঁপা করলে কেমন দেখা যাবে? খাঁটি জোকার লাগবে। কয়েক মিনিট বসে থেকে শাড়ি পরবে বলে সিদ্ধান্ত নিলো ও। আজকে কিনে আনা কয়েকটা শাড়ির মধ্যে থেকে একটিকে পছন্দ করলো। শাড়ি পরতে জানে না সে।তবুও সাহস করে শাড়ি পরারই সিদ্ধান্ত নিলো । কেননা ,শাড়িবিহীন খোঁপা করলে ভালো লাগবে না।
সাজগোজের শুরুতেই খোঁপা করে নিলো।প্রথম যু’দ্ধ জয় শেষে দ্বিতীয় যু’দ্ধে নামলো।
নিজের সবটা দিয়ে শাড়ি পরার চেষ্টা করছে মেয়েটা ।সবকিছু মোটামুটি হলেও কুঁচিতে এসে ঝামেলায় পড়লো।অনেক্ষণের যু’দ্ধ শেষেও না পেরে যেমন-তেমন ভাবে সেগুলো সেট করলো।ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে নিজের পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখলো।একেবারে খারাপ হয়নি । যেটুকু হয়েছে চলে । নিজেকে বাহবা দিলো সে। এত রাত না হলে হয়তো বাড়ি শুদ্ধ সবাইকে দেখাতো। বিশেষ করে মারুফা বেগমকে। মায়ের কাছে প্রমাণ করে দিতো, সে অকর্মার ঢেঁকি নয়।
নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার পর আবিষ্কার করলো কিছু একটার কমতি রয়েছে। হ্যাঁ! একটু লিপস্টিক দেওয়া জরুরি।সে লিপস্টিক দিতে গিয়ে ছোট্ট করে একটা টিপও পরে নিলো। ডাগর-ডাগর চোখ জোড়াতে হালকা করে কাজল দিলো। পুরোপুরি রেইডি হয়ে নিজেই নিজের প্রতি মুগ্ধ হয়ে গেল।তার মনের মানুষ তূর্য ব্যতীত অন্যকেউ হলে নিশ্চিত টাসকি খেয়ে যেত।হয়তো জ্ঞানও হারাতো।কিন্তু ,তূর্য ভাই সামান্য একটু প্রশংসা করবেন কিনা সন্দেহ। একটু মন খারাপ করলো আহি।তারপর
ফটাফট কয়েকটা ছবি নিলো।তূর্যকে সেন্ড করে কমপ্লিমেন্ট পাওয়ার আশায় বসে রইলো। কিছুক্ষণ পার হয়ে গেলেও সিন হলো না দেখে নিজেই চুপিচুপি তার রুমে গেল।
লম্বা সময় নিয়ে গোসল সারলো তূর্য। বের হয়েই মুখ হা হয়ে গেল ওর।মিষ্টি হেসে দাঁড়িয়ে আছে আহি। হতভম্ব চেহারা নিয়ে তূর্য প্রেয়সীর পা থেকে মাথা পর্যন্ত পরখ করলো।হালকা গোলাপি রঙের শাড়ি,সাথে হালকা সাজ, খোঁপার একপাশে সেই গোলাপ গুলো লাগিয়েছে। অদক্ষ হাতে শাড়ি পরা, খোঁপা করা হলেও সামনের নাদান পুরুষটার হৃদয় থমকে দেওয়ার মতো। স্বপ্নের চেয়েও অপ্সরী লাগছে আহিকে।তূর্য আবিষ্কার করলো ওর হৃৎপিণ্ডের অস্বাভাবিক গতি ।জানতো এমন একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। বারণ করা সত্ত্বেও মেয়েটা চলে এলো।
ও এদিক-ওদিক কয়েকবার এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে পুনরায় সামনে তাঁকালো। না, ভ্রম নয় ! চুল মুছতে থাকা তোয়ালেটা হাতে নিয়ে এতক্ষণ থমকে দাঁড়িয়ে থাকলেও এখন সেটা হাত ফোসকে ফ্লোরে গিয়ে পড়লো। ধীরে ধীরে আহির দিকে এগিয়ে এলো ও।সামান্য দূরত্ব রেখে ঘোরের মধ্যেই মৃদু স্বরে আউড়ালো,
” আসতে না করেছিলাম না? তবুও কেন এলি? ”
খুব অদ্ভুত তূর্যের চাহুনি। আহি দৃষ্টি মেলাতে ব্যর্থ হলো।তূর্য ঘোরে থেকেই পুনরায় বিড়বিড় করলো,
” যদি অঘটন ঘটে যায়?” একটু থামলো সে তারপর পরম আবেশিত গলায় ডাকলো,
” জা’ন? ”
ছোট্ট একটা শব্দ।কিন্তু সেটা আহির তনু মনে ঝড় তুলতে সক্ষম।তূর্য পুনরায় ডাকলো,
” জা’ন ..এত সুন্দর করে কে সাজতে বলেছে তোকে? খুব সুন্দর লাগছে।একদম আমার হৃদয়টাকে খু’ন করে দেওয়ার মতো।মা’রতে চাস আমাকে? হুউ? ”
এত এত প্রশংসা সহ্য হলো না আহির। এই অনুভূতির জোয়ার থেকে পালাতে চায় ও। রুড তূর্য ভাই-ই ঠিক আছে ওর জন্যে। সে নতজানু হয়ে বলল,
” আপনি চেইঞ্জ করুন ।আমি আসছি ”
তূর্য ওর কথা শুনল না । বরং অনুরোধ করলো,
” উহু! একটু দেখতে দে, প্লিজ ”
” ছবি পাঠিয়েছি তো..! সিন করেননি তাই দেখতে এসেছিলাম ঘুমিয়ে গিয়েছেন কিনা। এখন আসি তূর্য ভাই “জমিনে দৃষ্টি রেখে নিভু কন্ঠে কথাগুলো বলে যাওয়ার পাঁয়তারা করলো মেয়েটা। বাঁধা দিলো তূর্য।প্রেয়সীর মুখ আঁজলা করে ধরে উঁচু করলো।চোখে চোখ রাখার চেষ্টা করে বলল,
” না চাইতেও দুই দুইবার একই ভুল করে ফেলেছি। তৃতীয়বার আর কিছু করতে চাইছিলাম না। বাট …. ”
কথা সম্পন্ন করতে পারলো না ও।প্রেয়সীর অধরের আভায় দৃষ্টি আটকে গেল।মুহূর্তে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়লো সে।একটা ঢোক গিলে কয়েক সেকেন্ডের বিরতি নিলো। গভীরভাবে শ্বাস টেনে ধীর কন্ঠে বললো,
” এত ধৈর্যের পরীক্ষা আমি আর দিয়ে পারছি না আহি। দিলি না নিজেকে সামলে রাখতে ”
আহির যা বোঝার বুঝে গেছে। ও হাসফাস করে উঠলো। বুকের ভিতর ধক ধক করে বাড়ি খাচ্ছে।মেয়েটার অস্বস্তির পরোয়া করলো না তূর্য। ডান হাতের বৃদ্ধা আঙুল দ্বারা মৃদু স্পর্শে অধরের রেখা ছুঁলো প্রেয়সীর। আহির পুরো শরীর ধরে কেঁপে উঠেছে।শিরদাঁড়া বেঁয়ে উষ্ণ স্রোত নেমে গেল।তূর্যের উন্মুক্ত বুকে হাত রেখে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরানোর চেষ্টা করলো ও।এতে লোকটার অবস্থানের সামান্যতম পরিবর্তন ঘটলো না।আর ন্যানোসেকেন্ড সময় নষ্ট করলো না মানবটা। একহাতে প্রেয়সীর বাঁকানো কোমর ছুঁলো। আরেক হাত ওর মাথার পিছনে স্থির করে নিজের সান্নিধ্যে টেনে নিলো। তবে স্থায়ী করতে পারলো না। দুই সেকেন্ডের ব্যবধানে আবার ছেড়ে দিলো।চোখ মুখ কুঁচকে বিরক্তি নিয়ে বলল,
” পারলে রেসপন্স কর, না পারলে চুপচাপ থাক। একদম ডিস্টার্ব করবি না ” বলে অধৈর্য হয়ে ফের অধরে অধর ডুবালো।
এবার আর আহির কোনো বাঁধা মানলো না সে। মুহূর্তটি গভীর থেকে গভীরতর হলো। আহি দুই হাতে তূর্যের বুকের কাছের অংশটুকু আঁকড়ে ধরলো।সাথে সাথে সেখানে নখের আঁচড় কে’টে গিয়েছে। সেদিকে খেয়াল নেই তূর্যের।সে নিজ কাজে মত্ত।
আহি বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তূর্য মাথার নিচের হাত সরিয়ে ওর দুই হাত নিজের মুঠ বন্ধি করে দেয়ালে চেপে ধরলো।
বেশ অনেক্ষণ সময় নিয়ে নিজের কার্য সম্পন্ন করলো ও।
অবশেষে দীর্ঘ এক যাত্রা শেষে মেয়েটা অবকাশ পেল। হাঁপাতে লাগলো সে।যেন ধড়ে প্রাণ ফিরে পেয়েছে।
তূর্য কার্যের ইতি টানলেও নিজের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন করলো না। আহি কিছুক্ষণ ঘনঘন শ্বাস টেনে চোখ বন্ধ করে পড়ে রইলো। তূর্য চোখ মেলানোর মতো অবস্থায় রাখেনি ওকে। আগামী কয়দিন ওই চোখে চোখ রাখতে পারবে না জানে না সে। তূর্য অপেক্ষা করলো ওর চোখ খোলার।কিন্তু খুললো না।অগত্যা সে-ই সরে দাঁড়ালো। দূরে সরে যেতে যেতে বলল,
প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৫৫
” ম’রিসনি ! চোখ খুলে দুনিয়াটা একটু দেখ ”
বলে কাবার্ড খুলে টিশার্ট – ট্রাউজার বের করতে লাগলো।এই ফাঁকে চো’রের মতো পালালো আহি। কিভাবে এই রুমটা ত্যাগ করেছে শুধু ও জানে। এসব কান্ড দেখে তূর্য ,আহির উপর যতটা না বিরক্তি হলো তার চেয়ে বেশি নিজের উপর রা’গ হলো। আবারো লিমিট ক্রস করে ফেললো।এবারে অতিরিক্ত করে ফেলেছে। নিজেই নিজেকে ব’কলো ও,
” আর মাত্র কয়েকটা দিন নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারলি না? ড্যাম ( Damn)!”
