প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৬০
ইনান হাওলাদার
খোলা ছাদের নিচে একাকী দাঁড়িয়ে আছে আলিয়া।দৃষ্টি অদূরের আম গাছটার দিকে। ছোট ছোট আমের গুটি এসেছে,অন্যমনস্ক হয়ে সেদিকে চেয়ে আছে সে।আকাশ থেকে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে।হঠাৎ মৃদু হাসলো ও।আল্লাহ খুশি হলে নাকি বৃষ্টি দেন।তাহলে আজ নিশ্চয়ই তিনি অনেক খুশি হয়েছেন।হওয়ারই কথা !দুজন পাগলা প্রেমিক-প্রেমিকার শুভ পরিণয় ঘটলো।সে কি খুশি হয়নি? সে নিজেও খুশি হয়েছে।তার ভালোবাসার মানুষ নিজের ভালোবাসা পেয়েছে।
অতীতে পাড়ি জমালো সে —
বুঝদার হওয়ার পর থেকে নিজের বাবাকে না পেলেও চাচাকে বাবা ডেকে আসছে।বাবার অভাব তিনি বুঝতে দেননি।তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ঠিকই মন খারাপ হতো। স্কুল শেষে সবার বাবা নিতে আসলেও তাকে নিতে আসতো বাবা রুপি চাচা। কয়েক বছরের মাথায় সেটাও বন্ধ হয়ে গেল। চাচার সংসার হলো। তার মা আর সে আলাদা থাকতে শুরু করলো।তবে আর্থিক দিক দিয়ে কখনো সমসায় পড়তে হয়নি।যখন সে ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী তখন পিংকির সাথে বন্ধুত্ব হয়।পিংকির মাধ্যমে নাবিল-তাসিনের সাথে আর ওদের মাধ্যমে তূর্যের সাথে।তূর্য ছেলেটা ছিল ইন্ট্রোভার্ট । খুব বেশি কথাবার্তা বলতো না আর হাসি দেখা তো অমাবস্যায় চাঁদ।এই জিনিসটাই ওর খুব ইন্টারেস্টিং লাগতো।তখন এসব ভালোবাসা সম্পর্কে ধারণা না থাকলেও বড় হওয়ার সাথে সাথে রিয়ালাইজ করতে পারে।কিন্তু সে কখনই চায়নি কথাটা তূর্য বা বাকিদের কান অবধি যাক। যদিও এর পিছনে ছোট্ট একটা কারণ আছে।সেদিনের পর থেকে ওকে পাওয়ার আশা কখনো
করেনি——
এডমিশনের পর তাদের পাঁচ জনের লাইফ পাঁচ দিকে চলে যায়।ও আর পিংকি সেইম ভার্সিটি হলেও আলাদা ডিপার্টমেন্ট।নাবিল আলাদা ভার্সিটি।স্কলারশিপে তাসিন দেশের বাইরে চলে যায়।আর তূর্য ঢাকা মেডিকেলে চান্স পায়। পাঁচ জনের পথ ভিন্ন হলেও সম্পর্কের এতটুকুও পরিবর্তন ঘটেনি। বরংচ আরো গভীর হয়।দুই এক দিন পরপরই এখানে-ওখানে আড্ডা দেওয়া।একেকজনের বাড়িতে আসা যাওয়া। আড্ডার পুরোটা সময় তাসিন ওদের সাথে ভিডিও কলে থাকতো।
সেবার মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় তূর্য দ্বিতীয় হয়।সেই উপলক্ষে চৌধুরী বাড়িতে ছোট-খাটো গেট টু গেদারের আয়োজন করা হয়।সেখানে উপস্থিত হয় তূর্যের বন্ধুরাও।সেই অনুষ্ঠানে সবচেয়ে আনন্দিত ছিল একটা পঞ্চম বা ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়া বাচ্চা মেয়ে। সারা বাড়ি ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছিল।ওকে দেখে নাবিল মজা করে তূর্যকে বলে,
” তোর পিচ্চি কাজিনডা সেই কিউট ”
” তো? ” বিরক্তি ফুটে ওঠে তূর্যের মুখে।
” আরেকটু বড় হইলে তোরে সুমুন্ধি বানানোর কাজে লাইগা পড়তাম বা’ড়া ”
এটাও দুষ্টুমি ছিল ওর।কেননা সেই শুরু থেকেই পিংকির প্রতি দূর্বল ছিল নাবিল।আর এই কাহিনী সম্পর্কে তারা সবাই অবগত।কিন্তু তবুও আলিয়া তূর্যের মধ্যে কিছুটা বিরক্তি লক্ষ্য করে।যেটা সবার দৃষ্টি ছাপিয়ে ওর নজরে পড়ে। নাবিলের ওই কমপ্লিমেন্টর পর আহিকে আর ড্রয়িং রুমে দেখা যায়নি।শুধু একবার তূর্যকে ওর কাছে যেতে দেখেছিল।
এরপর থেকে হুট করেই চৌধুরী বাড়িতে ওদের আনাগোনা বন্ধ হয়ে যায়।কারণ,তূর্য চাইতো না। কেন চাইতো না সেটা আরও সাড়ে চার বা পাঁচ বছর পর পরিষ্কার হয় সবার কাছে।
তূর্য একটা দুর্দান্ত রেজাল্ট নিয়ে এমবিবিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়।নামি-দামি বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অফার আসে। ফ্যামিলিও চায় সে বিদেশি ডিগ্রি অর্জন করুক।কিন্তু তূর্য নিজে চায় না।এটা নিয়ে আকবর চৌধুরীর সাথে ওর কথা কাটাকাটি হয়।
এদিকে ওরাও চাইতো তূর্য সেই সুযোগ কাজে লাগাক। কিন্তু ছেলেটা তার কথায় স্থির।তারপর কারণ জানতে চাইলে সবটা খুলে বলে তূর্য।প্রথম বারের জন্যে স্বীকার করে।গম্ভীর গলায় বলে,
” আই থিঙ্ক আই উইল মিস আহি ”
এতটা হাসি খুশি ,চঞ্চল একটা মেয়েকে মিস করা স্বাভাবিক।সবাই এটা স্বাভাবিক ভাবে নিলেও আলিয়া প্রশ্ন করে,
” তুই আহিকে পছন্দ করিস?”
” আই ডো’ন্ট নো ”
“ তাহলে কেন মিস করবি? ”
” এটাও জানি না ”
আলিয়া তখন জোর দিয়ে বলে,
” তুই ওকে ভালোবাসিস তূর্য ”
” কি জানি ! ” কেন জানি অস্বীকার যেতে পারে না তূর্য।
পিংকি প্রশ্ন করে ,
” এসব কবে থেকে রে? ”
তূর্যের এবারের উত্তরটা একটু বড় হয়।সাবলীল গলায় বলে,
” জানি না।তবে আব্বু বাইরে যাওয়ার জন্যে প্রেশার দেওয়ার পর রিয়ালাইজ করতে পারলাম।এর আগে ওকে স্রেফ বিরক্ত লাগতো।ইভেন এখনো লাগে। ”
” কি রিয়ালাইজ করলি? ওকে ভালোবাসিস সেটা?”
” না ”
” তাহলে?”
” মিস করবো সেটা। অলওয়েজ ডিস্টার্ব করে তাই হয়তো মিস করব ”
” তাহলে সবাইকে ছেড়ে শুধু ওকেই মিস করবি?তোর তো আরো দুইটা কাজিন আছে”
” বাকিদেরও করবো ।কিন্তু সেটা মানিয়ে নিতে পারবো ”
” বাপরে..! বোনের প্রতি এত ভালোবাসা?বড় হচ্ছে কিছুদিন পর মাধ্যমিক দিবে।তার কিছু দিন পর বিয়ে ওকে দিবে।পরের বাড়ি চলে যাবে।তখন কি করবি?” সবটা বুঝেও আহিকে তূর্যের বোন বলে সম্বোধন করলো পিংকি।
” ওটাই ভয় ”
” কোনটা?”
” ডিগ্রি নিয়ে ফিরতে ফিরতে ওকে বিয়ে দিয়ে দিলে আমার করার কিছুই থাকবে না ”
” কেন?কি করতে চাস তুই ?”
“এ্যাডাল্ট হলে আমিই ওকে বিয়ে করে নিবো।”
” পছন্দ করস কিনা জানস না,ভালোবাসিস কিনা জানস না।আবার বিয়ে করতে চাস? আমার বা’ড়া ”
নাবিলের কথার বিপরীতে ছোট্ট করে উত্তর দেয় তূর্য,
” হ্যাঁ ”
তারপর থেকে সবার কাছে সবটা পরিষ্কার হয়ে যায়।ধীরে ধীরে বুঝতে পারে আহির জন্যে ছেলেটা ঠিক কত ডে’সপারেট। প্রথম দিকে ভেঙে পড়লেও আস্তে আস্তে আলিয়াও নিজেকে সামলে নেয়।এখন ব্যাপারটা একটা সহনীয় পর্যায়ে আছে। শুরুর মতো অত খারাপ লাগে না।আর ইদানিং লাগে না বললেই চলে।
” এত রাতে ছাদে কি করিস ?”
হুট করে পুরুষালি গলার আওয়াজে চট করে পিছনে ফিরে তাকালো আলিয়া।লোকটাকে চিহ্নিত করে আবার পূর্বের অবস্থায় ফেরে।যদিও গলা শুনেই বুঝেছিল কে এটা। বলল,
” রিফ্রেশমেন্টের জন্যে আসলাম। তোর কি কাজ? ”
” আমিও ”
বলে ওর পাশে গিয়ে দাঁড়ালো তাসিন।
” আচ্ছা ”
তারপর দুজনেই চুপ হয়ে গেল। তাসিন আসল কথায় ফিরলো,
” ভাই তুই তখন রা’গ করেছিলি?”
” কখন?” ভ্রু গুটিয়ে জানতে চায় আলিয়া।
” তখন যে বুড়ি বললাম ”
এবারে সবটা মনে পড়লো মেয়েটার ।শব্দ করে হেসে উঠলো ও।হাসতে হাসতেই জবাব দিলো,
” পাগল তুই? রাগ করবো কেন? বোকা আমি?” তারপর একটা হায় ছেড়ে বলল,
” বুড়ি তো হচ্ছিই রে ”
আলিয়ার ওমন হাসিস তালে তালে তাসিনও হাসলো।যদিও সে শব্দ করেনি মোটেও।তাসিন পুরোনো কাসুন্দি ঘাটলো,
” কয়েক মাস আগে যে তুই বললি তোকে বিয়ে করার কথা, তারপর তুই দুইদিন আমাদের সাথে …মানে নাবিল-পিংকি-তূর্য আমি কারো সাথে কোনো যোগাযোগ রাখিসনি।দ্যান আমরা তোকে কারণ জিজ্ঞেস করলে এড়িয়ে গেলি। সেদিন কি আমার উত্তরে তুই কোনো ভাবে হার্ট হয়েছিলি? ”
” কেন হবো শুনি? তোর সাথে কি আমার প্রেম ছিল? নাকি আমি তোকে ওয়ান সাইডেড লাভ করতাম ? ”
” তবুও ভাই।খারাপ লাগেনি? ”
” তোর ভাবগতি কিছু বুঝছি না আমি। এক যুগ পর একথা তুলছিস কেন?” এবারে সিরিয়াস হলো আলিয়া।
” এমনি ভাই ”
কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল তাসিন।আলিয়া চুপ করে রইলো ।তাসিন কিছুক্ষণ পর বলল,
” আচ্ছা আলিয়া আমি যদি এখন রাজি হই তুই কি করবি?”
” ঘোড়ার ডিম করবো। এখন বিয়ে টিয়ে করার মুডে নেই আমি ”
” ভাব বাড়াচ্ছো না? আমিও মুডে নেই ভাই।হুদাই জিগাইলাম ” বলে ঠোঁট বাঁকালো তাসিন। আলিয়া সে প্রসঙ্গ পাল্টে ফেললো।অন্য কথা তুললো।বেশ খানিকক্ষণ পার হলো এভাবে।বৃষ্টির ফোঁটা বড় হয়ে এসেছে।দুজনে দৌঁড়ে ছাদ হতে নামলো। যাওয়ার পথে একবার পা পিছলে গেল আলিয়ার । হুমড়ি খেয়ে পড়ার আগে তাসিন সামলে নিলো ওকে। ভুল ক্রমে একটা গা’লিও বের হয়ে গেল মুখ থেকে।আলিয়া চোখ পাঁকালো ওকে।তাসিন ওকে ঠেলে সরিয়ে থমথমে গলায় বলল,
” পড়েছিস তো আমার গায়ের উপর।ব্য’থা পেয়ে নাহয় একটু গা’লি দিয়েছি তাতে কি হয়েছে? ”
” আমি তোর গায়ের উপর পড়িনি। তুই সেধে এসে ….”
তাসিন ওকে আটকে বলল,
” নে ভাই হইছে।তোর জীবন বাঁচিয়ে আমিই অ’পরাধ করে ফেলেছি। ”
রুমে প্রবেশের সাথে সাথে তাজা ফুলের একটা মিষ্টি সুবাস নাকে এলো তূর্যের। এক মুহূর্তের জন্যে চোখ বন্ধ করে সেই সুবাস নাসারন্ধ্রে টেনে নিলো সে। রুমের চারিদিকে চোখ বুলালো। ড্রয়িং রুমের মতো সাদা গোলাপ দিয়ে পুরোটা রুম সাজানো।তবে এখানে কিছু লাল গোলাপের মিশ্রণ রয়েছে।সেসব গোলাপের ছড়াছড়ি বিছানা থেকে শুরু করে ঘরের মেঝে পর্যন্ত। বড় কোনো লাইট জ্বালানো হয়নি ঘরটায়।ড্রিম লাইটের নীলাভ আলো আর পুরো রুম জুড়ে মোমবাতির হলুদেভাব আলো। সেই মৃদু আলোয় সে দেখতো পেল বিছানার ঠিক মাঝখানে হাঁটু ভাজ করে বসে আছে এক রমণী। পা পর্যন্ত ঘোমটা টানা। প্রেয়সীকে দেখে ঠোঁট প্রসারিত হলো তার।দরজার কাছে থমকে যাওয়া পা জোড়া এবার ভেতরের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেল।ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে হাতের ঘড়ি খুলতে খুলতে বলল,
” লাইট অন করিসনি কেন? ”
বদ্ধ রুমে তূর্যের কথা প্রতিটা দেওয়ালে দেওয়ালে বাড়ি খেল।বারবার প্রতিধ্বনিত হলো সদ্য প্রণয় ঘটা মেয়েটির কানে। সে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে রইলো।
তূর্যের রুমের লাইটগুলোর সুইচ বোর্ড ওর বেড সাইটেই । সে এগিয়ে গেল সেদিকে । লাইট অন করে বললো,
” তিন হাত ঘোমটা টেনে বসে আছিস কেন? এমন ভাব করছিস যেন জীবনে দেখিনি ”
এবারে অভিমান ভর করলো রমণীর মনে। আজকের দিনেও কি লোকটা একটু ভালো কথা বলতে পারবেন না? সারাজীবন তো ত্যাঁড়া কথাই বলে গেলেন। তূর্য এবার বিছানার এক পাশ হতে কিছু ফুলের পাঁপড়ি সরিয়ে সেখানে বসলো। আলতো হাতে ঘোমটা টেনে তুললো। সাথে সাথে কপালে কয়েকটা ভাঁজ পড়লো। উতলা হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
” হোয়াট? মুখ কালো কেন? বাবা-মেয়ে কি শুরু করেছিস? তোকে নিয়ে কি আমি বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছি?”
আসল কারণ ধরতে পারল না সে।
আহি চুপ করে রইলো। নোনাজলে চোখের কোটর ভরে গিয়েছে।তূর্য বিরক্ত হয়ে বলল,
” হ্যাঁ, হ্যাঁ! আরেকটা পলক ফেল ভাঙ্গা নদী বাধ ছাড়ুক ”
এবারেও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখলো না আহি। দুই গাল বেঁয়ে তপ্ত নোনা জল গড়িয়ে পড়লো। তূর্য ভিতরে ভিতরে অস্থির হয়ে উঠলেও বাইরে সেটা প্রকাশ করলো না। প্রেয়সীর লাল হয়ে থাকা নাকের ডগায় একটা গাঢ় চুম্বন আঁকলো।দুই হাতের মধ্যে ওর মুখ আজলা করে ধরে নরম গলায় সুধালো,
” কাঁন্না করছিস কেন জা’ন?খারাপ লাগে না আমার? ”
এবারে কথা ফুটলো অভিমানী রমণীর মুখে। নিজের মুখ হতে ব্যাকুল হয়ে থাকা পুরুষটির হাত সরিয়ে অভিমানী গলায় বলল,
” ঘুমোবো না আপনার সাথে। সেই সকাল থেকে সং সেজে বসে আছি।কেন? আপনাকে দেখানোর জন্যেই তো।অথচ আপনাকে দেখুন,এসেই বললেন….”
তূর্য ওর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল,
” কি বললাম? মিথ্যা কিছু বলেছি? চেহারা তো তোর জন্মের পর থেকেই দেখে আসছি। যেগুলো দেখিনি সেগুলো দেখবো ! বি রেইডি !”
শেষ বাক্য দুটি হাস্কি স্বরে বলল সে ।
তূর্য ভালো করে জানে এই মেয়েকে কীভাবে আয়ত্তে আনতে হয়। সাথে সাথে কাজ করলো তার ট্রিক। অভিমান সরে লজ্জা ভর করলো তার মুখে।রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে রমণীর ফর্সা গাল। হাঁসফাঁস করে তূর্যের নাগালের বাইরে যেতে চাইলো। তূর্য বিছানা থেকে উঠতে উঠতে বলল,
” ফ্রেশ হবি না? ”
আহি দ্রুত উপর নিচ মাথা নাড়লো আর মুখে বললো,
” হুঁ ”
খাট থেকে নেমেই হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়লো ওর। চিন্তিত কন্ঠে তূর্যকে ডাকলো,
” তূর্য ভাই ? আমার কোনো ড্রেস নেই তো এখানে ”
গোপাল গোটালো তূর্য,
” নেই মানে? এত গুলো শাড়ি কিনলি সেগুলো কি করেছিস?”
” ওগুলো তো বড়মার কাছে ”
” আচ্ছা আমি এনে দিচ্ছি ।একটু ওয়েট কর ” বলে ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেলে চলে গেল তূর্য। আহি ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে পরণের জুয়েলারি খুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো।কিছুক্ষণ বাদে দরজায় নক করার শব্দ হলো।ততক্ষণে আহির জুয়েলারি খোলা শেষ।ও দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল,
” আসুন ”
কিন্তু দরজা ভেদ করে আসা আগন্তুককে দেখে দেখে অবাক হলো সে। পারভিন বেগম শাড়ি হাতে ভেতরে আসলেন।আহি মৃদু হেসে ওনার হাত হতে শাড়ি নিলো।একবার জিজ্ঞেস করতে চাইলো তূর্যের কথা।কিন্তু কেন জানি সেকথা জানতে চাইতে লজ্জা লাগছে।পারভিন বেগম নিজে থেকে ওর কৌতূহল দূর করলেন,
” তূর্য ওর বাবার সাথে কথা বলছে।একটু পর চলে আসবে ”
আহি জানতে না চাইলেও উনি কথাটা বলায় অপ্রস্তুত হলো ও।প্রসঙ্গ পাল্টে বলল,
” আপনি এখনো ঘুমাননি বড়মা? ”
” হ্যাঁ,শুয়েছিলাম।তূর্য ডাকলো।এখন আবার তোর বড় আব্বু ওর সাথে কথা বলছে ” বলে তিনি আহির হাত থেকে শাড়ি আবার নিজের হাতে নিলেন।বললেন,
” আয়,আমি পরিয়ে দিচ্ছি ”
ঘর জুড়ে শুনশান নীরবতা। বাবা-ছেলে মুখোমুখি বসে আছে।আকবর চৌধুরী খাটের উপর আর তূর্য ওনার সামনের চেয়ারে। তিনি খুব সিরিয়াস মুডে।কিন্তু তূর্যের মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে না সে সিরিয়াস , বিরক্ত নাকি অন্যকিছু। কোনো স্পষ্ট অভিব্যক্তি নেই ওর মুখে।শুধু বসে বসে বাবার কথা শুনছে।আর সামনে — অর্থাৎ ,দেওয়ালে ঝুলিয়ে রাখা ঘড়িটির দিকে ঘনঘন তাকাচ্ছে। আকবর চৌধুরী এতক্ষণে স্বাভাবিক কন্ঠে কথা বললেও এবারে কিছুটা রুষ্ট গলায় বললেন,
” আমি এত কথা বলছি তোমার মনোযোগ কোথায়?”
” বলুন ,শুনছি ” তূর্য মুখে এ কথা বললেও মন বলছে আরেক কথা।এভাবে বাসর ঘর থেকে লোক তুলে এনে বসিয়ে রাখলে মনোযোগ আবার কোথায় থাকবে? আকবর চৌধুরী পুনরায় গম্ভীর গলায় বললেন,
” এতদিন মেয়েটার সাথে যেমন খুশি তেমন ব্যবহার করেছ।কিচ্ছু বলিনি।এবার যেন গলা উঁচু করে কোনো কথা বলতে না শুনি ”
বাবার কথা মেনে নিলো সে । পালন করা না করা পরের কথা।এই মুহূর্তে ফটাফট উত্তর দিয়ে জায়গা ছাড়তে পারলে বাঁচে সে।বলল,
” আচ্ছা ”
কিছু একটা মনে ওঠার ভান করলেন আকবর চৌধুরী।বললেন,
” আর শোনো তুই-তুকারি বন্ধ করো এবার।”
” চেষ্টা করবো ”
” কি চেষ্টা করবে? বন্ধ করবে মানে বন্ধ করবে “একরোখা কন্ঠস্বর ওনার।তর্ক করে কথা বাড়ানোর কোনো ইচ্ছা তূর্যের নেই।সে অগত্যা মেনে নিলো ওনার কথা,
” আচ্ছা,ঠিক আছে ”
ছেলের এমন বাধ্য স্বভাব দেখে আশ্চর্য হলেন আকবর চৌধুরী।বললেন,
” এত ভদ্রতা কবে শিখলে ?”
” এখনই ! আর কিছু বলবেন?” তার কন্ঠে ব্যস্ততা স্পষ্ট। এদিকে আকবর চৌধুরী একের পর একেক দফা জারি করে যাচ্ছেন।এই মুহূর্তে নিজেকে প্রচন্ড অসহায় মনে হচ্ছে তূর্যের। শাড়ি নিতে আসায় ওর সবচেয়ে বড় পা’প হয়েছে। এর চেয়ে বরং আহিকে পাঠালেই ভালো হতো।ও আসলে নির্ঘাত দেরি করতো সেজন্যে নিজে এলো।আর এসেই ফেঁসেছে। ও একবার অসহায় মুখ করে বিছানার এক পাশে শুয়ে থাকা পারভিন বেগমের দিকে তাঁকালো।উনি সজাগ থাকলে হয়তো ব্যাপারটা বুঝতেন। হুট করে তূর্যের মনে আ’শঙ্কা জাগলো আহিটা আবার ঘুমিয়ে গেল না তো? ভাবনাটা মাথায় আসার সাথে সাথে তড়িঘড়ি করে বলে উঠলো,
” আহি একা একা রুমে আছে।ভ’য় পাচ্ছে হয়তো ”
এবারে যেন বুঝদার হলেন আকবর চৌধুরী।গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন,
” হ্যাঁ,যাও যাও ”
বাবার অনুমতি পেয়ে দ্রুত প্রস্থান করলো সে।আকবর চৌধুরী স্ত্রীর উদ্দেশ্যে বললেন,
” ছেলেটাকে আটকে রেখেছি তখন থেকে।তুমি তো একবার স্মরণ করাবে ”
” কতবার বললাম তোমায় ‘ আমার ঘুম আসছে ‘। মানে বুঝো না? সবকিছু ভেঙে বলতে হবে? ”
তূর্য আর আকবর চৌধুরীর কথার মাঝে পারভিন বেগম বারবার বলেছেন তার ঘুম আসছে।উত্তরে আকবর চৌধুরী প্রতিবারই বলেছেন ‘ তোমার ঘুম আসছে ঘুমাও ‘
অবশেষে তূর্যের আশঙ্কা-ই সত্যি হলো। কক্ষে এসে দেখলো বেঘোরে ঘুমিয়ে আছে আহি।একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাবার্ডের দিকে এগিয়ে গেল ও।সেখান থেকে টিশার্ট ,ট্রাউজার বের করে ওয়াশরুমে ঢুকলো। মিনিট পাঁচেক পর বের হয়ে পুনরায় বিছানার দিকে তাঁকালো।এখনো এলো-মেলো ভঙ্গিতে ঘুমিয়ে আছে মেয়েটা। তূর্য লাইট অফ করে ওর শিঁয়রে গিয়ে বসলো।মুখের উপরের এলোমেলো চুল গুলো গুছিয়ে দিয়ে হাস্কিস্বরে বলল,
” ঘুমিয়ে গেলি? দিস ইজ নট ফেয়ার জা’ন ”
অতঃপর কিয়ৎক্ষণ নিগূঢ় দৃষ্টিতে প্রেয়সীর স্নিগ্ধ রূপ অবলোকন করলো।মুখের উপর ঝুঁকে হিসহিসিয়ে বললো,
” ঘুমের ঘোরে একটা চু’মু খেলে তুই নিশ্চয়ই আপত্তি করবি না?”
বলে একটা শুকনো ঘোক গিললো ও।পরপর ঠোঁট জোড়া এগিয়ে নিয়ে গেল ঘুমন্ত প্রেয়সীর দিকে। দুই প্রান্তের দুই জোড়া ঠোঁট ছুঁই ছুঁই অবস্থায় নড়ে উঠলো আহি।ফলস্বরূপ বিঘ্ন ঘটলো অপর প্রান্তের মানবের। তূর্য জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে সরে পড়লো দ্রুত।আহি’র ঘুম ভেঙে যাচ্ছে ভেবে সন্দেহ হলো ওর।আর চোখ খুলে ওকে এই অবস্থায় দেখলে কে’লেংকারি হয়ে যাবে।
কিন্তু ঘুম ভাঙলো না মেয়েটার ।চোখে মুখে বিরক্তি ফুটে উঠেছে খেয়াল করলো তূর্য। নড়াচড়া ক্রমশ বাড়তে থাকলো। তূর্য ভ্রু কুঁচকে ওকে ভালো করে পরখ করলো। অতঃপর খেয়াল করলো মেয়েটা ডান পা দিয়ে বাম পায়ের পাতা ডলাডলি করছে।চুলকাচ্ছে হয়তো।তূর্য একবার ওর আলসেমির লেভেল পরিমাপ করলো। একটু উঠে হাত দিয়ে চুলকাতে পারছে না। অগত্যা সে পায়ের কাছে এগিয়ে গেল।একটু চুলকে দিতেই শিথিল হলো নড়াচড়া।তূর্য সরে যেতে গিয়েও কি মনে করে গেল না।ঠোঁটে চুমু খাওয়ার মিশনে ফেইল করলেও এবারে আর ফেইল করতে চায় না।ঠোঁট ডাবিতে একটা গাঢ় চুম্বন আঁকলো প্রেয়সীর বাম পায়ের তালুতে। ঠোঁট জোড়া এখনো সেখানে স্থির।তবে স্থায়ী হলো না।চাপা চি’ৎকার দিয়ে সরে আসলো ও।নাকে হাত দিয়ে দাঁত পিষে আওড়ালো ,
” জা’নোয়ার ”
নাকের উপরের হাতটা এবার সামনে আনলো। চোখের সামনে ধরে ভালো করে দেখে নিলো একবার।না! রক্ত আসেনি।ও বিড়বিড় করে বলল,
” শেষে বাসরের বদলে বউয়ের লা’থি খেলি তূর্য?”
নাবিল তাসিন দুজনেই চার হাত পা চার দিকে ছড়িয়ে শুয়ে আছে। তাদের একটাই চিন্তা তূর্য এখন কি করছে।কল করে একটু ডিস্টার্ব করতে পারলে হয়তো একটু ভালো লাগতো।কিন্তু মন চাইলেও সাহস নেই। অগত্যা দুজনেই তাকে নিয়ে নানান আলোচনা-সমালোচনায় মত্ত হলো। আলোচনা সমালোচনা দীর্ঘস্থায়ী হলেও তাদের ভ’য়টা আর স্থায়ী হতে পারলো না। এক বুক সাহস নিয়ে তূর্যের নাম্বার ডায়াল করলো।যদিও কল রিসিভ হওয়ার সম্ভাবনা শূন্যের কোঠায়।তাই কোনো রকম দায় সারা ভাবে কল করে বিছানার এক পাশে ফোন রেখে দিলো।সম্ভাবনা শূন্য পার্সেন্ট থাকা সত্ত্বেও কলটা স্পিকারে রাখলো যদি রিসিভ হয় এই ভেবে।তারপর পুনরায় নিজেদের মতো হা-হুতাশ শুরু করলো।
কিন্তু তাদের অবাক করে দিয়ে কল রিসিভ হলো।ওপাশ গম্ভীর কন্ঠ ভেসে আসলো,
” বল ”
নাবিল তার অতিরিক্ত এক্সাইটমেন্ট ধরে রাখতে পারলো না। অবাকের চরম পর্যায়ে পৌঁছে বললো,
” এই বা’ড়া ওয় কল রিসিভ করছে ”
ওর কথার তাসিন চট করে পাশে ফিরলো।সেও রীতিমতো অবাক।গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
” আসসালামু আলাইকুম ভাইজান।কি করেন? ”
” এটা জানতে কল করেছিস?” কাটকাট উত্তর তূর্যের।
এমন গলায় তাসিন কিছুটা ঘাবড়ে গেল।খুব বেশি রে’গে গেছে ভেবে দোষ নাবিলের উপর চাপিয়ে নিয়ে সাধু সাজতে চাইলো,
” হ ভাই.. একা একা কি করছিস না করছিস।তাই নাবিল তোকে টিপস দিতে চায়।আমি বারবার বলছিলাম ডিস্টার্ব করার দরকার নেই।শা’লা শুনলো না আমার কথা ” বলে নাবিলের কাছে ফোন দিয়ে দিলো ও ।
নাবিল চি’ৎকার করে বলে উঠলো,
” এ বা’ড়া আমি কহন কইলাম? আমারে ফাঁসাস কেন?”নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার যথাসাধ্য চেষ্টা করলো সে,
” ক’সম আমি কিছু কই নাই বন্ধু।ওই বা’ড়ার কুরকুরি বেশি।”
” ঘুমোতে দিবি তোরা ? “মৃদু কন্ঠে ধ’মকে উঠলো তূর্য।
” ইশ..! নাটক করো? তুমি ঘুমাও? “পাশ থেকে ফোঁড়ন কাঁটলো তাসিন।
” ঘুমাই না,ঘুমোবো । কল রাখ ”
এবারে নাবিলের থেকে ফোন নিয়ে নিলো তাসিন।কপট চিন্তিত হওয়ার নাটক করে বলল,
” ব্যর্থ হয়ে গেছিস না? এইজন্যেই বলছি ভাই নাবিলের থেকে টিপস নে।শা’লা দুইদিন পর বাপ হবে ”
” হয়েছে তোদের ফালতু কথা বলা?”
” আমি সিরিয়াস ভাই। ” ভোলাভালা মুখ করে বললো তাসিন।
” আহি কি করে রে?” নাবিলের কথায় তূর্য মাথা ঘুরিয়ে নিজের ডান পাশে তাকালো।আহির ঘুমন্ত মায়াবী মুখ পানে কিয়ৎক্ষণ তাকিয়ে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
” ঘুমায় ”
ফোনের ওপাশ থেকে ওরা দুজনেই একযোগে চেঁচিয়ে উঠলো,
” ঘুমায় মানে? ”
প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৫৯
তূর্য দ্রুত কানের কাছ থেকে মোবাইল সরালো। এদের কান্ড কারখানায় ওর কখনো মনে হয় না এই আধ ধামড়া গুলো থার্টি প্লাস। অগত্যা ওদের সাথে আর কোনো বাক্য ব্যয় না করে কল কাঁটলো সে । জানে কল কাটলেই রেহায় মিলবে না।তাই ফোন সাইলেন্ট করে বেড সাইড টেবিলে রাখলো।
অতঃপর এতক্ষণ ধরে না করা কাজটা এবার করে ফেললো। প্রেয়সীর লিপস্টিক পরিহিত ঠোঁটে শব্দ করে একটা চু’মু খেল। তারপর পরপর কয়েকটা। চোখ-নাক-গাল-কপাল কোথাও বাকি রাখলো না। সারা মুখ ভরিয়ে দিল চু’ম্বনে। অতঃপর কপালে কপাল ঠেকিয়ে জড়ানো গলায় বলল,
” খুব জ্বালাচ্ছিস জা’ন। একটু ওয়েট করতে পারলি না ?আজকে ছেড়ে দিলাম।কিন্তু কালও যদি এমন করিস তোর ঘুমের ধার আমি ধারবো না। গট ইট?”
