প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৬২
ইনান হাওলাদার
প্রতিদিন মাগরিবের নামাজ শেষে বাড়ি ফেরার সময় আকবর চৌধুরী কিছু না কিছু হাতে করে নিয়ে আসেন। সিঙ্গারা, সমুছা,জিলেপি,বিভিন্ন প্রকারের চপ বা এই জাতীয় খাবার। আর এসেই বাড়ির দুই মেয়েকে ডাকবেন।বণ্টনের দায়িত্ব দিবেন বড় মেয়ের হাতে,যে এখন বাড়ির বড় বউ। আর সে করবে জান্নাতি ভাগ।বাড়ির প্রতিটা সদস্যের জন্য ভাগ রাখবে। যার মধ্যে একটা ভাগ বড় করে করবে।যেটা নিজের জন্যে আগ থেকেই বরাদ্দ । তূর্য যে এসব পছন্দ করে না তবুও ওর জন্যে একটা ভাগ তুলে রাখবে ।আর সেটা নিজ দায়িত্বে তার রুমে নিয়ে যাবে।কারণ ,জানে ওই লোক এসব খাবেন না ,ফেরত পাঠাবেন।তারপর সেগুলো নিয়ে নিজ রুমে চলে আসবে।আর খেয়ে-টেয়ে নিচে নামবে।
প্রতিদিনের মতো আজকেও আকবর চৌধুরী খাবার এনে ডাকলেন ওদের।ভাগের দায়িত্ব দিলেন আহিকে। তবে আজকের বণ্টন দেখে সবাই অবাক হলেন।সবগুলো ভাগ একদম সমান করে করেছে।নিজের ভাগে একটুও বেশি নেয়নি।বরং একটা ভাগে সিঙ্গারা একটা শর্ট পড়েছে সেটা নিজে নিয়েছে। বাড়ির সবাই সেটা লক্ষ্যও করলেন।আহি আকবর চৌধুরীর ভাগ নিয়ে ওনার কাছে এলো।তিনি মুচকি হেসে বললেন,
” তোমার ভাগে একটা কম পড়েছে দেখেছো? আর তূর্যের ভাগ করনি কেন?”
” তূর্য ভাই তো এসব খান না ”
” আগে যে করতে ? ” খাবার গুলো কি হতো জানা সত্ত্বেও মেয়েটা কি বলে শোনার জন্যে প্রশ্ন করলেন তিনি।আহি মুচকি হাসতে হাসতে বলল,
” তখন তো আমি খেয়ে ফেলতাম বড় আব্বু ” তারপর ফিক করে হেসে দিল।
” তাহলে এখন খাবে না কেন?” প্রশ্ন করলেন তিনি।
” পেটে জায়গা নেই হয়তো ” ফোড়ন কাটলেন মারুফা বেগম।আকবর চৌধুরী কিছুক্ষণ মেয়ের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,
” না,মেজো বউ।আমাদের মেয়ে সত্যিই বড় হয়েছে।আমরা শুধু এতদিন বুঝতে পারিনি বা নিজেরাই বাচ্চা ভেবে এসেছি।ও বাড়ির বউয়ের দায়িত্ব পালন করছে ।তাই না মা?”
আহি ‘ হ্যাঁ ‘ বা ‘ না ‘ কিছু না বলে দাঁড়িয়ে রইলো। আকবর চৌধুরী তো ঠিকই ধরেছেন।ও এখন কি বলবে? ওনার কথায় সাঁই দিতেও লজ্জা লাগছে।
আকবর চৌধুরী মেয়েকে ওনার প্লেটটা ফিরিয়ে দিতে দিতে বললেন,
” এখান থেকে তুমি আগে একটা নিয়ে ভাগ সমান সমান করবে।তারপর বাকিগুলো ছোট ভাইবোনকে দেও আর নিজে নেও।আমি খাবো না ”
আহি নিতে অস্বীকার করলো। ব্যস্ত হয়ে বলল,
” না,না বড় আব্বু আপনি খান । আমার এমনিতেই খেতে ইচ্ছা করছে না ”
এবারে আকবর চৌধুরী গম্ভীর হয়ে বললেন,
” যা বলছি তাই করো।তোমাকে বাড়ির বউ হতে কেউ বলেনি।তুমি এই বাড়ির মেয়ে মেয়েই থাকবে আজীবন ”
” তাহলে আমাদের বউকেও মেয়ে করে রাখতে হবে বড় আব্বু ।তাই না বল শান্ত ?” বলেই জ্বিভ কাটলো প্রান্ত।মুখ ফসকে কি বলে ফেললো বাড়ি শুদ্ধ সবার সামনে।ওদের দেখাদেখি তাহি বলল,
” তাহলে আমার বরকেও ছেলের মতো দেখতে হবে আব্বু।দেখবে তো?”
এবারে ড্রয়িং রুম শুদ্ধু সবাই জোরে-সোরে হেসে ফেললেন।আকবর চৌধুরী মেয়েকে কোলের মধ্যে নিয়ে বললেন,
” দেখবো, দেখবো। কিন্তু ঘর জামাই রাখবো মা ? ”
শান্ত আহির উদ্দেশ্যে বলল,
” আহিপু তুই হাসছিস কেন? বড় আব্বু মাত্র বললেন তুই মেয়ের মতোই থাকবি এই বাড়িতে। তারমানে তূর্য ভাইও তো ঘর জামাই-ই হলো। ”
” তাহলে আজ থেকে জিজু বলে ডাকিস ওনাকে ”
ব্যস শুরু হয়ে গেল কয় ভাই-বোনের হাসি মজা। আহির নাম
‘ ভাবিপু ‘ দিলো তাহি । আজ থেকে সে সেই নামেই ডাকবে ওকে।আহিরও নামটা বেশ পছন্দ হলো। বড়রা তাদের কথায় ব্যস্ত হলেন।কিছুক্ষণ বাদে আসলাম চৌধুরী এসে যোগ দিলেন।তারা দুই ভাইয়েও নিজেদের মধ্যে হওয়া নতুন সম্পর্ক নিয়ে ঠাট্টায় মশগুল হলেন।সেই মুহূর্তে আসিফ চৌধুরী খুব মিস করলেন।তিনি থাকলে হা-হুতোশ করতেন নিশ্চিত।
তূর্য ড্রয়িং রুমে পা ফেলে এত হাসি ঠাট্টা দেখে চোখ ছোট করে ফেললো। নাবিল-তাসিন-পিংকি-আলিয়াকে পৌঁছে দিয়ে মাত্র বাড়ি ফিরল ও।এ বাড়িতে সব সময়ই হৈচৈ চলে।মাঝে মাঝে তুলনামূলক ভাবে বেড়ে যায়।আজকেও তেমনটা হয়েছে।সে দেখলো বাড়ির লোক তিন দলে ভাগ হয়ে গিয়েছেন।তিন গিন্নি রান্না ঘরে গল্প-স্বল্প করছেন আর কাজ করছেন।দুই কর্তা ড্রয়িং রুমের মাঝ বরাবর — সোফায় বসে কথা-বার্তা করছেন।আর বাকি পিচ্চিগুলো ড্রয়িং রুমের আরেক পাশে। তূর্য ওদের দিকেই এগিয়ে গেল।কি আর করবে! বউ যেখানে জামাই সেখানে। ওদের দুষ্টুমির মধ্যে তূর্য সুবিধা করে উঠতে পারলো না। ওরা ওকে খেয়াল করলেও তেমন পাত্তা দিলো না।অগত্যা সে বাবা চাচার কাছে গিয়ে বসলো। ওকে দেখে আকবর চৌধুরী প্রশ্ন করলেন,
” ছেলে মেয়েগুলো ভালো ভাবে পৌঁছেছে ”
” হ্যাঁ ”
” এত দেরি করলি যে ?” আসলাম চৌধুরী প্রশ্ন করলেন ।
” তাসিনের আম্মু — আন্টি আটকে দিয়েছিলেন। আহিকে নিয়ে একদিন যেতে বললেন ”
” তাহলে যাও, বেড়িয়ে আসো ”
” দেখি! সময় করে যাবো একদিন। ” অতঃপর কিছু একটা মনে করার ভাব করে আসলাম চৌধুরী কে বলল,
” চাচ্চু আপনার সাথে কিছু কথা ছিল ”
সে কথার ধার না ধেরে তিনি বড় ভাইয়ের উদ্দেশ্যে আফসোস করে বললেন,
” আমি জানতাম ভাইজান।এই ছেলের সাথে আমার মেয়ের বিয়ে দিকে জীবনেও স্বশুর আদর পাবো না। চাচা ডাক শুনে শুনেই জীবন পার করতে হবে ”
কপাল গোটাল তূর্য। গতকাল বিয়ে হয়ে পারল না,আর আজকেই মেয়েকে তুমি ডাকো,মেয়ের বাবাকে শ্বশুর আব্বা ডাকো।অথচ ,বাসরটাও কপালে জুটলো না। ও একবার দুষ্টুমিতে মত্ত প্রেয়সীর পানে তাকালো। আহি আগে থেকেই আড় চোখে বারবার তাকাচ্ছিল এদিকে।ফলস্বরূপ চোখাচোখি হলো। ও আহিকে ইশারায় কিছু বলে উঠে দাঁড়ালো।যার কিচ্ছুটি আহি বুঝলো না।প্রশ্নবিদ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইলো। ছেলেকে উঠতে দেখে পারভিন বেগম দ্রুত পায়ে হেঁটে এসে কফির মগ ধরিয়ে দিলেন।তূর্য সেটাকে হাতে নিলো।আসলাম চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে মায়ের উদ্দেশ্যে জোরে জোরে ওনাকে শুনিয়ে বলল,
” আম্মু আমার শ্বশুর বাবাকে এক কাপ চা দেও।আর তোমার একমাত্র বেয়াই বলে কথা একটু ঠিক মতো খেয়াল রেখ ”
অতঃপর প্রস্থান করলো ও।
পারভিন বেগম মুচকি হেসে বললেন,
” নেও ভাই ,তোমার ইচ্ছা পূরণ করে দিয়েছে আমার ছেলে ”
” আমার বিশ্বাস হচ্ছে না ভাবি? এটা তূর্য তো? দুষ্টুমি কবে শিখলো ও ?” আসলাম চৌধুরী এখনো ঘোরের মধ্যে।
” তোর ভাজতে বহুরূপী একটা ” বলে অগোচরে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি।পরপর আহিকে ডেকে বললেন,
” আহি? রুমে যাও মামনি ”
আহি খেয়াল করলো বড় আব্বুর দিকে।বলল,
” কেন বড় আব্বু ? কিছু হয়েছে ? ”
” না তেমন কিছু না।তূর্যের কিছু লাগে কিনা দেখ গিয়ে ”
” কফি তো নিয়েই গেলেন।আর কিছু লাগবে না হয়তো ”
” তাও জেনে এসো যাও ”
অনিচ্ছা সত্ত্বেও উপরে চলে গেল আহি। কিছুই লাগবে না সে নিশ্চিত তবুও বড় আব্বু এত জোর করলেন কেন কে জানে। ও যেতেই পারভিন বেগম বললেন,
” কি হয়েছে ? ওকে উপরে পাঠালে কেন? কিছু বলবে আমাদের ?”
আকবর চৌধুরী কন্ঠটাকে খানিকটা গম্ভীর করে বললেন,
” তোমাদের আর কি বলবো। ছেলে এখানে বসে মেয়েকে নাহলেও পঞ্চাশবার ইশারা দিয়েছে।আমাদের মেয়েটা তো আর ওর মতো সাড়ে শ’য়তান না। হয়তো ইশারাই ধরতে পারেনি ”
রুমে এসে কাবার্ড খুলতেই তূর্যের মুখে এক চিলতে হাসির দেখা মিললো। ঠোঁট জোড়া প্রসারিত হয়ে এক পাশে চলে গেল। কাবার্ডের একপাশে ওর জামাকাপড় আর অন্যপাশে মেয়েলি সকল পোশাক-আশাক। কত বছর ধরে এই স্বপ্ন দেখে আসছে সে,আর আজকে সেটা সত্যি হলো। তার কক্ষের ভাগীদার এসেছে। পরপর ঘাড় ঘুরিয়ে বিছানার দিকে তাঁকালো। যেখানে কাল সারা রাত ধরে একটা নরম,তুলতুলে শরীর ওর বুকের মাঝে লেপ্টে ছিল। ই’ডিয়টটা হুসে থাকলে নিশ্চিত মোচড়া-মুচড়ি করতো।ওর ভাবনার মধ্যে মেয়েলি কন্ঠস্বর ভেসে আসলো,
” তূর্য ভাই কিছু লাগবে আপনার?”
সাথে সাথে নিজের মধ্যের গাম্ভীরতা ফিরিয়ে আনলো তূর্য।মুখের হাসি নিভিয়ে বিছানা হতে দৃষ্টি সরিয়ে কাবার্ডে মনোযোগী হলো।টিশার্ট-ট্রাউজার নিতে নিতে স্বাভাবিক কন্ঠে বললো,
” সকালের ডোজ ভুলে গিয়েছিস? ”
” অভ্যাস হয়ে গেছে এখন কি করবো ” অসহায় মুখ করে বললো মেয়েটা।
” অভ্যাস চেইঞ্জ কর। তোর জন্যে আমার বাচ্চারাও মামা ডাকা না শুরু করে দেয় ” বলতে বলতে ওর কাছে এগিয়ে এলো তূর্য।
বাচ্চার কথা আসতেই মেয়েটার হাসিখুশি মুখ চুপসে গেল।তূর্যের দিক থেকে চোখ সরিয়ে দ্রুত এদিক-ওদিক এলোমেলো দৃষ্টি ফেললো। মাথা নুইয়ে হাত দিয়ে নখ খুঁটতে খুঁটতে বলল,
” আমি আসছি।আপনার দরকার হলে একটু জোরে ডাক দিয়েন ”
” তার আগে বল তোর মাইন্ড এত ডার্ক কেন? আমি জাস্ট বাচ্চা বললাম আর তুই প্রসেসিং ভেবে ব্লাশ করে ম’রছিস ! ” বলতে বলতে নিজের ঘাড় নোয়ালো সে।প্রেয়সীর চোখে চোখ রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করল। আহি মাথা তুলে তাঁকালো।আমতা আমতা করে বললো,
” দরকার না থাকলে আমি যাই তূর্য ভাই ।একটু কাজ আছে ”
” কি কাজ আছে তোর ? ” ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইলো তূর্য।
” আছে একটা কাজ ” আবারো মিথ্যা বলল আহি।
” আচ্ছা! ডিনার রেইডি কর ”
” মাত্র সাড়ে সাতটা বাজে এখন খাবেন? ” অবাক হয়ে জানতে চাইলো আহি। রাত দশটার নিচে জীবনেও খাবারের কাছে যায় না লোকটা।আজকে তার মুখে এমন কথা শুনে আশ্চর্য হলো মেয়েটা।
” হুম ” ছোট করে উত্তর দিলো তূর্য।তারপর চেইঞ্জ করতে চলে গেল। কয়েক মিনিটের মধ্যে আবার ফিরে এলে আহি বলল,
” বেশি ক্ষুধা লেগেছে তূর্য ভাই ?”
” না “বলতে বলতে ল্যাপটপ নিয়ে বিছানায় বসলো ও।
” তাহলে একটু পরেই খান।এখনো রান্না হয়নি ”
” ঘুমাবো আমি।তুইও খেয়েনে ”
” আমি মাত্র এতগুলো সিঙ্গারা খেলাম।এখন ভাত কিভাবে খাবো?”
তূর্য বিষম দৃষ্টিতে ওর দিকে তাঁকালো।বিরক্ত হয়ে কিছু একটা বলবে এর মধ্যে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে তাহি এলো।এসেই তূর্যের গা ঘেঁষে বসলো।হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,
” ভাইয়া তোমার সাথে একটা ইম্পর্ট্যান্ট কথা আছে। ”
তূর্য ঊরুর উপর থেকে ল্যাপটপ রেখে বোনের দিকে মনোযোগী হলো।পা ঘুচিয়ে বসে বলল,
” হ্যাঁ,বলো ভাইয়া ”
” তোমার বউকে ভাবিপু ডাকবো বলেছি। কিন্তু তোমাকে কি ডাকবো বলতো? কিছুই মিলাতে পারছি না ”
” আমি তোর ভাইয়া হই না? ” কপাল গুটিয়ে প্রশ্ন করলো তূর্য।
” দুলাভাইও তো হও ”
” না! ভাইয়া হই ”
” না,দুলাভাই ! দুলাভাই ডাকবি তাহি ” বলে কোমরে হাত দিয়ে ওদের দুই ভাইবোনের সামনে এসে দাঁড়ালো আহি। তাহি কনফিউশনে পড়ে কোনো কথাবার্তা ছাড়া উঠে দৌঁড় দিলো।এক দৌঁড়ে রুমের বাইরে। আব্বুই পারবে এই সমস্যার সমাধান করতে।সে দৌঁড়ে আকবর চৌধুরীর কাছে গেল।
” আস্তে,পড়ে যাবি তো ”
হুশিয়ারি দিলো আহি।তারপর তাহির উঠে যাওয়া জায়গা বসলো সে। ভাবুক হয়ে বলল,
” তূর্য ভাই,একটা জিনিস ভাবলাম। আপনাকে আমিও দুলাভাই বলে ডাকব ”
তূর্যের কপালে ভাঁজ পড়লো। চোখ ছোট ছোট করে সামনে বসে থাকা রমণীর দিকে তাঁকালো। আহি পুনরায় বলল,
” তাহি আমার বোন।আর বোনের দুলাভাই মানে তো আমারও দুলাভাই ।তাইনা ? ”
” হ্যাঁ,তোর চৌদ্দগুষ্টির দুলাভাই আমি । স্টু’পিড ” দাঁত পিষে বলল তূর্য।পরপর সেও আহির কায়দায় বলল,
” তাহি যেহেতু আমার বোন।তাহলে তুইও আমার ভাবি।পাশের বাসার ভাবি ”
বিরোধিতা করলো আহি,
” ইশ..! শখ কত।আমি আপনার ভাবি হতে যাব কোন দুঃখে? বউ হই আপনার , বওওওউউউউ।বুঝেছেন ?”
তূর্য ভ্রু উঁচালো। সরু দৃষ্টিতে তাকিয়ে একনাগাড়ে প্রশ্ন করলো,
” আমার বউ হোস? হুম? বওওউউউ? কেমন বউ? আপন? নাকি পর?”
তূর্যের প্রশ্ন শুনে দুষ্টুমি চাপলো আহির মাথায়। মুচকি হেসে বলল,
” চাচাতো ।চাচাতো বউ তূর্য ভাই ”
তূর্য ক্ষেপলো না ওর কথায়।আচমকা মেয়েটাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে নিল।শক্ত করে চেপে ধরলো। পারলে বুকের মধ্যে ঢুকিয়ে নেয়। আহির মনে হচ্ছে ওর হাড্ডি মাংস সব দলা পাকিয়ে যাচ্ছে। মেয়েটার মাথায় উপর তূর্যের থুতনি ঠেকানো। ও মুখ নিচু করে সেখানে ক্ষুদ্র একটা চুমু খেল। তারপর মাথা নামিয়ে উন্মুক্ত ঘাড়ে শব্দ করে একটা চুমু খেয়ে বলল,
” আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না তুই এখন পুরোপুরি আমার, জা’ন।আমাদের মধ্যে আর কোনো সম্পর্কের দেওয়াল নেই। তুই আমি মিলে আমরা হয়েছি। এখন থেকে তোর উপর সবচেয়ে বেশি অধিকার আমার। ” তারপর গালে একটা চুমু দিয়ে বলল,
” সারাক্ষণ এভাবে চুমু খেতে পারবো।যখন-তখন এভাবে জড়িয়ে রাখতে পারবো।মন চাইলেই আদর করতে পারবো।কিন্তু …”
আহি এবার দুই হাতে আঁকড়ে ধরলো তূর্যকে।ওর কথার সাথে নিজের কথা যোগ করে বলল,
” কিন্তু এভাবে চেপে রাখলে তো আমি ম’রে যাব তূর্য ভাই ”
” যা ম’রে। ”
” সত্যিই ম’রে যাব কিন্তু।দম বন্ধ হয়ে গেল ”
” আরেকবার ম’রার কথা বললে আমিই মে’রে ফেলবো তোকে জা’নোয়ার ” বলে হাতের বাঁধন আলগা করলো তূর্য। আহি বুক হতে নিজেকে তুলে মন খারাপের নাটক করে বলল,
” গা’লি দিচ্ছেন তূর্য ভাই?”
” কেন? চু’মু খেতে চাস ? ”
” আপনি জানেন চুমু’ দিতে? শুধু কাঁ’মড়াতেই জানেন ”
” কাঁ’মড়ে মলম লাগাতেও জানি।আজকে প্রুফ পাবি সেটার ” আহির মুখের উপর ঝুঁকে ফিসফিসিয়ে বলে উঠলো তূর্য।মেয়েটা আলতো করে বুকে ধাক্কা দিয়ে সরালো ওকে।অতঃপর ব্যস্ত পায়ে ঘর ত্যাগ করলো। সেদিক চেয়ে মৃদু হাসলো তূর্য।মনোযোগ দিয়ে দেখলো হেলে দুলে চলে যাওয়া লাজুক লতাকে। পরপর হাসি নিভিয়ে ভ্রু কুঁচকে বিড়বিড় করলো,
” একটু মোটা হয়েছে ?নাকি শাড়ি পড়েছে তাই এমন লাগছে ”
যেই কর্মে যত বেশি তাঁড়া থাকে সেই কর্মে তত বেশি দেরি হয়। যা এখন উপলব্ধি করতে পারছে তূর্য। প্রতিদিন সাড়ে দশটার ভিতরে চৌধুরী বাড়ির খানা-পিনার পাঠ চুকলেও আজকে সাড়ে এগারোটা বেজে গিয়েছে। ঘন্টা খানেক দেরি। তারউপর বউয়ের ল’জ্জা সবসময় নাকের ডগায়।ডেকে ছাড়া রুমে আনা যায় না। বারবার এভাবে ডাকাডাকি করতে কার ভালো লাগে। কল করারও উপায় নেই।মোবাইলটাও রুমে রেখে গিয়েছে।তূর্য এবারে অধৈর্য হয়ে মায়ের মোবাইলে কল লাগালো।রিসিভ হতেই বললো,
” আম্মু খাওয়া হয়নি তোমাদের? হলে আহিকে একটু পাঠিয়ে দেও মাথা ব্য’থা করছে ভীষণ ”
” তোমার মা ড্রয়িং রুমে । কল না করে বউকে নিজে ডেকে নিলেই তো পারো ”
গম্ভীর গলায় বললেন আকবর চৌধুরী। তূর্য ওনার কন্ঠে চমকে উঠে দ্রুত কল কাটতে কাটতে বললো,
” জ্বি,আচ্ছা ”
আকবর চৌধুরী মোবাইল রেখে বিছানার দিকে এগোতে এগোতে বললেন,
” কিসের মাথা ব্যথা আমরা আর বুঝি না !”
বাবার কথা মতো সত্যি সত্যি নিচে গেল তূর্য। আহি তখন ড্রয়িং রুমে বসে বসে টিভি দেখছে। তূর্য সোজা এগিয়ে গেল ওর দিকে।অতঃপর গম্ভীর গলায় বললো,
” রুমে আসবি ? নাকি ডোর লক করে ঘুমোবো? ”
আহি পাশ ফিরে চাইলো ওর দিকে। এই লোকের মুড সুইং সম্পর্কে ধারণা নেই তার।রুমে একরকম রুমের বাইরে আরেক রকম।ও বললো,
” যান আসছি ”
তূর্য ওর হাত থেকে ছোঁ মে’রে রিমোট নিয়ে টিভি বন্ধ করে দিল। তারপর রিমোটটা টিভির উপরে রেখে বলল,
” নে, এবার পেট ভরে দেখ টিভি ”
তারপর সোজা রুমে চলে গেল। আহি ঠোঁট উল্টে কিছুক্ষণ বসে রইলো।কি সুন্দর করে অনায়াসে রিমোটটা টিভির মাথার উপর রেখে দিলো।আর সে পায়ের নিচে টুল দিয়েও টিভির গলা ছুঁতে পারবে কি সন্দেহ। মারুফা বেগম কিচেনের কাজ গুছিয়ে উপরে যেতে গিয়ে দেখলেন মেয়ে এখনো ড্রয়িং রুমে। তাঁড়া দিয়ে বললেন,
” তুই এখনো ঘুমাতে যাসনি ? শিগগির যা।আলো নিভিয়ে দিবো ”
যতটা দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসেছিল আহি কক্ষের কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে পায়ের গতি ঠিক ততটাই ধীর হয়ে এলো। কি লোকরে বাবা! পাঁচ মিনিটও দেরি হয়নি তার উপরে আসতে এর মধ্যেই লাইট-ফাইট বন্ধ করে শুয়ে পড়েছে। রুমটাকে একদম ঘুটঘুটে অন্ধকার করে রেখেছে। ভ’য় দেখাতে চায় নাকি লোকটা? নাহলে ড্রিম লাইটও কেন বন্ধ করে রেখেছে।
আহি ধীরে ধীরে সে এগিয়ে গেল, আধখোলা দরজাটা হাত বাড়িয়ে ঠেলে দিল। একটা কর্কশ আওয়াজ করে উঠলো দরজাটা। নীরব পরিবেশে এমন বিদঘুটে শব্দে মেয়েটার বুকের মধ্যে ধ্বক করে উঠলো। ও তূর্যকে ডাকতে ডাকতে রুমে প্রবেশ করলো,
” তূর্য ভাই? সব লাইটগুলো অফ কেন করেছেন? ”
ভিতর থেকে কোনো সাঁড়া-শব্দ এলো না।আহি রুমে ঢুকে পুনরায় বলল,
” কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছি না। মোবাইলের ফ্লাশটা একটু অন করুন ”
এবারেও কোনো সাঁড়া না পেয়ে সে বিরক্ত হয়ে বলে উঠলো,
” আশ্চর্য! আপনি রুমে নেই নাকি? কথা ……”
মুখ হয়ে আর কোনো শব্দ বের করতে পারলো না মেয়েটা। তার আগেই তার কোমল ওষ্ঠ জোড়া কারো আয়ত্তে চলে গিয়েছে। সে প্রথমে খানিকটা ভড়কে গেলেও অপর প্রান্তের রুক্ষ ঠোঁটের মালিককে চিনতে কোনো বেগ পোহাতে হলো না। সে দুই হাতে নিজের জামা খাঁ’মচে ধরে চোখ নিভিয়ে নিল। পুরুষালী খসখসে হাত জোড়া শাড়ি ভেদ করে উন্মুক্ত কোমর ছুঁয়েছে। আহির হাত চলে গেল সেখানে দিশেহারা হাত জোড়ায় বাঁধ সাধতে চাইলো।কিন্তু হিতে বিপরীত হলো ছোঁয়া আরো প্রগাঢ় হলো। এই মুহূর্তে মেয়েটার শ্বাস রোধ হয়ে আসছে।ওদিকে অপর প্রান্তের ব্যক্তিটির কোনো হুশ নেই সেদিকে।
হঠাৎ করে থেমে গেল তূর্য। কপালে কপাল ঠেকালো।হাঁপাতে থাকা রমণীর মুখের উপর বড় বড় কয়েকটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
” রেসপন্স কর জা’ন ”
অতঃপর চোখের পলকে শূন্যে তুলে নিলো প্রেয়সীকে। নরম বিছানায় আলতো করে ফেললো ।পরপর নিজেও উপুড় হলো। হিসহিসিয়ে ডাকলো,
” জা’ন? ”
এবারে আহির নীরবতার পালা ।সে চুপ করে রইলো।তূর্য ফের ডাকল,
” এই জা’ন ”
এবারেও সাঁড়া দিলো না ও।মনে হচ্ছে কোনো অদৃশ্য শক্তি কন্ঠ রোধ করে রেখেছে। মেয়েটা এখনো সেই আগের মতো কুঁকড়ে আছে। এক মুহূর্তের জন্যে চোখ খুলেনি। আবারো ধ্বনিত হলো তূর্যের মাদকীয় কন্ঠস্বর,
” জাআআন ”
আহি এবারে নিভু নিভু কন্ঠে বললো,
” আপনার ক..কি হয়েছে তূ.. তূর্য ভ..ভাই? ”
” নাথিং, পাখি ”
তূর্যের মুখে বলা এই আরেকটা নতুন নামের সাথে পরিচিত হলো আহি। হাতে গোনা কয়েকবার জা’ন ডাক শুনলেও পাখি জীবনের প্রথম। এসব আদুরে ডাক ও নিতে পারছে না। ভেঙে ভেঙে বলল,
” আপনার নিশ্চয় কিছু হয়ে গেছে ”
” উহু , ভয় পাচ্ছিলি না? লাইট অন করে দিয়েছি।এবার চোখ খোল জা’ন”
এত এত আদুরে কন্ঠস্বর,আদুরে ডাক তূর্যের হতে পারে বিশ্বাস হলো না মেয়েটার। এটা সত্যিই তার তূর্য ভাই তো? নিশ্চিত হতে টিপটিপ করে চোখ খুললো। বেড সাইড লাইটের হলদেভাব আলোয় তার সামনে জ্বলজ্বল করে উঠলো হলদে ফর্সা মুখখানা। সাথে এক জোড়া অন্যরকম চক্ষু। মাফকীয় চোখ জোড়ার দিকে তাকিয়ে রুহু অবধি কেঁপে উঠলো মেয়েটার। পরপর আবার চোখ বন্ধ করে নিলো সে।শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি বেড়ে গেছে। তূর্য তখনো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে। আর পারলো না নিজেকে আটকে রাখতে। ব্যস্ত হয় পড়লো শাড়ির আঁচল আটকে রাখা পিন খুলতে। তবে পিন আলগা হওয়া পর্যন্ত ধৈর্য তার হলো না।টেনে-টুনে ছিঁড়ে ফেলে বিরক্ত গলায় বলল,
” এভাবে আটকাতে কেন হবে? ”
আহি মৃদু গলায় আর্তনাদ করে উঠলো,
” ছিঁড়ে ফেললেন তূর্য ভাই? ”
ততক্ষণে শাড়ির আঁচল মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে।
” তাতে কি? কিনে দিবো ” মাতালের মতো কোনোরকমে কথাটা বের করে গলায় মুখ গুজলো তূর্য। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চুম্বনে ভরিয়ে দিতে লাগলো সমস্ত গলা,ঘাড়।
আহি কয়েক বার করে জিভ নাড়ল ,কিছু বলতে চায়। কিন্তু পারলো না। ওর অস্থিরতা টের পেল তূর্য।অনুরোধ করলো সে,
” ফর গড সেক,অজুহাত দেখাস না জা’ন ”
তারপর হুট করেই মেঘের গর্জন ভেসে আসলো। আহি আতঙ্কে আঁকড়ে ধরলো প্রিয় পুরুষটিকে। মিনিটের মধ্যে ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি নেমে পড়ল। আস্তে আস্তে অবাধ্য থেকে অবাধ্যতর হলো মানবের ছোঁয়া।নিজের ধৈর্যশীলতা ট্যাগ ধুলোয় লুটিয়ে দিলো মুহূর্তের মধ্যে। আহি চোখের সামনে ভদ্র-সভ্য পুরুষটির অভদ্রতা দেখলো। চিনতে কষ্ট হলো লোকটাকে। একটু আগের তূর্য এমন কীভাবে হতে পারে? মানতে পারছে না। সকল চেনা-জানার কসরতের মধ্যেও ছটফট করতে থাকলো মেয়েটা। আটকাতে চাইলো অবাধ্য পুরুষটিকে।ফলস্বরূপ রমণীর দুই হাতের আঙুলের ভাঁজে নিজের আঙুল দিয়ে চেপে ধরলো বিছানার নরম গদিতে। মেয়েটি সে বুঝলো এই মুহূর্তে কোনো কিছুর বাঁধা পরোয়া করবে না এই উন্মাদ মানব। ধ্বনিত হলো আকুল কণ্ঠস্বর,
” উফ জা’নপাখি, এত ডিস্টার্ব কেন করিস? আজকে অন্তত কথাটা শোন , প্লিইইইজ ”
পুনরায় ভেসে আসলো মেঘের গর্জন।আহি আর বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করলো না।করেও লাভ নেই বুঝলো মেয়েটা।
এই ঝুম বৃষ্টির মধ্যে তাদের কানে ভেসে আসলো গানের কিছু লাইন ——
প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৬১
ইউহি বারাস বারাস কালি ঘাটা বারসে
হাম ইয়ার ভিগ যায়ে
ইস চাহাত কি বারিশ মে
মেরি খুলী খুলী লাটো কো সুলঝায়ে
তু আপনী উংলিয়োঁ সে
ম্যায় তো হুঁ ইসি খোয়াইশ মে
সার্দি কি রাতোঁ মে
হাম সোয়ে রাহে এক চাদার মে
হাম দোনো তানহা হো
না কোই ভি রেহে ইস ঘার মে
জারা জারা ব্যাহেকতা হ্যায় ম্যাহেকতা হ্যায়
আজ তো মেরা তান বাদান
ম্যায় পিয়াসি হুঁ
মুঝে ভার লে
আপনী বাহোঁ মে
