Home প্রণয় ব্যাকুলতা প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৭

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৭

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৭
ইনান হাওলাদার

পরীক্ষা শেষে কলেজ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে আহি।প্রতিদিন পরীক্ষা শেষের আগেই রহিম গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও আজ এখনো আসেনি।রহিম ছাড়া অন্য কেউ মানে আকবর চৌধুরী বা আসলাম চৌধুরী বা তূর্য যে ই আসুক না কেন পরীক্ষা শেষে বের হয়েই তাদের দেখতে পায়।আহি বারবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময় মাপছে।১০ মিনিট হয়ে গেছে এখনো কাউকে দেখা যাচ্ছে না।সে মাথা উঁচু করে ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক – ওদিক তাঁকিয়ে দেখার চেষ্টা করছে কেও এসেছে কিনা।
হঠাৎ রাস্তার ওপাশে তূর্যের গাড়ি দেখতে পেলো।সবে পার্ক করে গাড়ি থেকে নামছে সে। সাদা শার্ট ইন করে পরা ও চোখে কালো রোদ চশমা।শার্টের খুলে রাখা প্রথম তিনটা বোতামের ভাঁজে চশমা রাখতে রাখতে সেও এদিক – ওদিক তাঁকিয়ে আহিকে খোঁজার চেষ্টা চালাচ্ছে।আহি দ্রুত ভিড় ঠেলে তূর্যের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,

” তূর্য ভাই, এই যে আমি ”
তূর্য আহির হাতের কব্জি ধরে নিয়ে যেতে যেতে বলল,
” গাড়িতে ওঠ।প্রচণ্ড রোদ ,ফাস্ট”
আহি পা থামিয়ে দিলো।এভাবে দাঁড়িয়ে পড়ায় তূর্য চোখে মুখে বির’ক্তি নিয়ে ঘাড় বাকিয়ে আহির পানে তাঁকিয়ে বলল,
” কী?”
” আপনি না বলেছিলেন লাস্ট এক্সামের দিন আমাকে রিক্সায় নিয়ে যাবেন?”
তূর্য এবার পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়িয়ে আহির হাত ছেড়ে বলল,

” আমি বলেছিলাম? নাকি তুই বলেছিলি?”
” আমি বলেছিলাম ! কিন্তু আপনি তো ‘ না ‘ বলেননি।”
“তাহলে কি ‘ হ্যাঁ ‘ বলেছিলাম?”
” না।আপনি তো কোনো কথাই বলেননি।আর নীরবতা সম্মতির লক্ষণ ”
” চুপ চাপ গাড়িতে ওঠ ”
“রিক্সা করে না নিলে আপনি যে ১০ মিনিট লেট করে এসেছেন সেটা আমি বড় আব্বুকে বলে দেবো ”
“অনেকটা ভ’য় পেয়েছি ! নে এখন গাড়িতে ওঠ”
আহি এবার নরম কণ্ঠে মিনতির সুরে বলল,

” চলুন না ,ভাইয়া।প্লীজ !”
” ট্রাস্ট মি,আমি একবারের জন্য হলেও ভেবেছিলাম তোকে রিক্সা করেই নিয়ে যাব। বাট,এখন নিয়ে গেলে তুই ভাববি তোর থ্রে’ট খেয়ে নিয়ে যাচ্ছি।”
” ভাববো না ।নিয়ে চলুন না !প্লীজ”
” স্যরি ! এখন আর সেই সুবর্ণ সুযোগ নেয়।”
” প্লী….”
” চুপচাপ গাড়িতে উঠবি ? নাকি রেখে যাবো ?” আহির কথার মাঝেই বলে ওঠে তূর্য।
আহিও আর কথা না বলে চুপচাপ মন খারাপ করে উঠে পড়ে।সেও জানে তূর্য যখন একবার ‘ না ‘ করেছে সেটা আর ‘ হ্যাঁ ‘ হবে না।পৃথিবী উল্টে গেলেও না!শুধু শুধু অপমানিত হওয়া।

মাগরিবের নামাজ শেষে জায়নামাজে বসে তাসবীহ পাঠ করছেন পারভিন বেগম।সমস্ত ঘর জুড়ে হালকা আলো।তিনি তাসবীহ পাঠ করছেন আর সন্ধ্যায় ছেলে – মেয়েদের জন্য কী নাস্তা তৈরি করবেন সেটা ভাবছেন।
এরমধ্যে আকবর চৌধুরী রুমে আসলেন। ঘর অন্ধকার দেখে লাইট জ্বালিয়ে মাথার টুপিটা ঘরের পশ্চিম পাশে থাকা ওয়ারড্রপের উপর রাখলেন। এসির পাওয়ারটা আরেকটু কমিয়ে বিছানায় গা ছাড়লেন।
পারভিন বেগম জায়নামাজ ভাঁজ করে ওয়ার ড্রপের ভিতরে রেখে স্বামীর কাছে গিয়ে বসলেন।আকবর চৌধুরী চোখ বন্ধ করে বললেন,

” তূর্যের মা,তূর্যকে একটু ডেকে দেও তো ”
” তূর্য তো বাড়িতে নেয়”
আকবর চৌধুরী চোখ খুলে একবার সামনে ঝুলে থাকা দেওয়াল ঘড়িটার দিকে তাঁকিয়ে বললেন,
” রাত সোয়া ৯ টা বাজে ।সে এখন কোথায় ?”
” ওর বন্ধুরা ওকে না পেয়ে আমাকে ফোন দিয়েছিল।তূর্য নাকি ওদের ফোন ধরছে না।এদিকে ওর জন্য তারা বিকেল থেকে অপেক্ষা করছে, নালিশ জানালো।তাই আমিই জো’র করে পাঠালাম ”
” আচ্ছা! ওকে একবার বলো আমার সাথে দেখা করতে ।আর তুমি এখন বিশ্রাম নেও ”
” না…না।বাচ্চাদের জন্য নাস্তার ব্যবস্থা করতে হবে। বিশ্রাম নেও, তোমার চা আমি আহিকে দিয়ে পাঠিয়ে দিব।”
বলে পারভিন বেগম ড্রয়িং রুমের উদ্দেশ্যে চলে গেলেন।

তূর্যকে সামনে রেখে বাকি দুই বন্ধু তাসিন আর নাবিল এমনভাবে তাঁকিয়ে আছে যেন হাজার বছর ধরে খুঁজতে থাকা ফে’রারি আ’সামিকে ধরতে পেরেছে।আর আসামিকে ধরতে পারার আনন্দে যেন বোবা হয়ে গিয়েছে।শুধু শ’ক্ত দৃষ্টি মেলে তার দিকে তাঁকিয়ে আছে।তূর্য বি’রক্ত হলো ।নীরবতা ভে’ঙ্গে শ’ক্ত কন্ঠে বলল,
” কী সম’স্যা তোদের ? বলেছি তো যাবো না।আম্মুকে কেন কল করেছিস ?”
নাবিল চেঁ’চিয়ে উঠে বলল,
” বা ‘ড়ার কথা কইতে আহিস না,তূর্য।যাবি না ক্যান? ”
নাবিলের কথার সাথে তাসিন কথা যোগ করে বলল,
” হুম,বল? যাবি না কেন? পিংকি ,আলিয়া ওরাও যাবে ।তাহলে তোর কি স’মস্যা ?”
” ওরা গেলেই আমাকে যেতে হবে? তোরা যা ইয়ার ! আমি নেক্সট ট্রিপে যাবো । এবার তোরা ঘুরে আয় ”
নাবিল তি’রতিরে মে’জাজে আবার বলে উঠলো,
” এই বা ‘ড়া ! বা ‘ড়া,বা ‘ড়া অফ কর।২ মাস আগে কইলি দেড় মাস পরে যাইবি। এহন ২ মাস হইয়া গেলো। ২ মাস ধরে তোর বা ‘ ড়া ফেলানো হয় নাই ? এহন আবার না কইতাছস ?”
” তোর বা’ ড়া অফ কর।নাহলে আন্টি শুনলে তোর বা ‘ড়ায় লা’থি মেরে বাড়ি থেকে বের করবেন । “তাসিন কথাটা বলেই নাবিলের মাজায় এক লা’থি দিলো।
তূর্য চোখ – মুখ কুঁ’চকে বলল,

” প্লীজ,স্টপ ইট ! আই উইল গো ! ”
তূর্যের মুখে কথাটা শোনা মাত্র নাবিল আর তাসিন একসাথে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বারবার ” থ্যাংক ইউ ,বন্ধু ” ” থ্যাংক ইউ ,বন্ধু ” বলতে লাগলো।এতে তূর্যের বি’রক্ত লাগলেও কিচ্ছুটি বলল না।আসলে এদের মতো বন্ধু পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।এরা তাকে এতটা প্রায়োরিটি দেয় কেনো তূর্য ভেবে পায় না ।সে যে দেয় না এমন না।তূর্যের কাছেও তারা ফ্যামিলি থেকে কোনো অংশে কম নয়।নেহাত সে নিজের ভিতরে থাকা অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে না তাই।তবে এটা তার বন্ধু মহলও জানে।
সে উপরে উপরে রু’ড় ব্যবহার করলেও ভেতরে ভেতরে বন্ধুদের কতটা ভালোবাসে।

সারা রুম তন্নতন্ন করে খুঁজেও তূর্য তার সদ্য কিনে আনা সাদা পাঞ্জাবিটা পাচ্ছে না।আলমারিতে আরও অনেক রঙের পাশাপাশি সাদা রঙের পাঞ্জাবিও আছে।কিন্তু গতকালের পাঞ্জাবিটা পাচ্ছে না।হাতে আর আধ ঘণ্টা সময় আছে ।তারপরই জুম্মার নামাজ শুরু হয়ে যাবে।বাবা – কাকারা মসজিদে আরও আগে চলে গেলেও শান্ত আর প্রান্ত তূর্যের জন্য অপেক্ষা করছে। সারা রুম খুঁজেও যখন পাঞ্জাবি পায়নি তখনই তার বোঝা হয়ে গেছে পাঞ্জাবি কে নিতে পারে।ওই বে’য়া’দব ছাড়া তার জিনিসে হাত দেওয়ার ক’লিজা আর কারো নেয়।তাই আর সময় নষ্ট না করে রুম থেকেই উ’চ্চস্বরে ডেকে উঠলো,

” আহি? আহি ?”
যেহেতু পরীক্ষা শেষ তাই আহি লতা বেগমের মোবাইলে ভিডিও দেখছিল।তূর্যের ডাক শুনে ফোনটা রেখে দ্রুত তার রুমের উদ্দেশ্যে রওনা দিলো।রুমে ঢুকে হাঁ’পাতে হাঁ’পাতে বললো,
” জ্বী,ভাইয়া ।বলুন ”
” আমার পাঞ্জাবি কোথায়?”
আহি দ্রুত দৌঁড়ে যেতে যেতে বলল,
” এনে দিচ্ছি ।১ মিনিট ”
তূর্য তার যাওয়ার পানে শ’ক্ত দৃষ্টি মেলে তাঁকিয়ে আছে।প্রায় ৩ মিনিট পর আহি পাঞ্জাবি এনে তূর্যের হাতে দিলো।তূর্য এমনিতেই রেগে আছে আর পাঞ্জাবির হাল দেখে রাগ যেন আরো বেড়ে গেছে।স্ত্রী করা পরিপাটি পাঞ্জাবিটা একদম কুঁ’চকে আছে।তূর্য দাঁতে দাঁত চে’পে বলল,
” আমার পাঞ্জাবি ধরার সা’হস কোথায় পেয়েছিস তুই? ইভেন কার পারমিশনে আমার রুমে ঢুকেছিস?”
আহি ভী’তু কন্ঠে আমতা আমতা করতে করতে বলল,
” নিয়েছিলাম , দিয়েও তো দিচ্ছি।”
তূর্য হাতের পাঞ্জাবিটা সজোরে মেঝেতে ফেলে দিয়ে ধ’মকে বলল,

” নিয়েছিলি কেন? আমার কাছে জিজ্ঞেস করে নিয়েছিস? তোকে কতদিন বলেছি বিনা পারমিশনে তুই আমার জিনিস তো দূরে থাক আমার রুমেও পা রাখবি না।তাহলে এসেছিস কেন ?”
তুর্যের কাছে ব’কা খাওয়া আহির নিত্য দিনের কাজ।ধ’মকে কিছুটা কেঁপে উঠলেও তার এত এত কথা গুলো গায়ে না মেখে উল্টো সে বলল,
” কী করব বলুন! শান্ত আর প্রান্তের কাছে চেয়েছিলাম। কিন্তু ওরা দিলো না।আর আপনিও বাড়ি ছিলেন না।এদিকে আমারও সাদা জামা নেই ,যে গুলবাহার সাজবো ।তাই না বলেই ……”
আহিকে কথা শেষ করতে না দিয়ে তূর্য বলল,
” ওয়েট, ওয়েট!ওয়ান সেকেন্ড ! তুই গুলবাহার সাজার জন্য আমার পাঞ্জাবি নিয়েছিস?”
আহি মন খারাপ করে বললো,
” হ্যাঁ! কিন্তু কোনো লাভ হয়নি।একদম পা পর্যন্ত হয়ে গেছিল।”
তূর্য ধপ করে বিছানায় বসে চোখ বন্ধ করে একটা গভীর শ্বাস টেনে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করলো। আহি পুনরায় বলল,

” তূর্য ভাই,আপনি আমাকে একটা সাদা জামা কিনে দিয়েন।বুঝেছেন? লাল ওড়না আমার আছে ।”
তূর্য চোখ খুলে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
” কা’ফনের কাপড় কিনে দিবো। ”
” আপনি আমার বড় ভাই হন না ? বড় ভাইয়েরা তো ছোট বোনদের দিতেই পারে।আপনিও একটা জামা কিনে দেবেন ”
” আহি ,মে’জাজ খারাপ আছে। ছ্যাঁ’চড়ামি না করে যা এখান থেকে ”
আহি সত্যি সত্যি রুম থেকে বের হয়ে গেল।তূর্য এটা মোটেও আশা করেনি।সে তো ভেবেছিল না হলেও আরো ৫ মিনিট ধরে ছ্যাঁ’চড়ামি করবে দ্যান বের হবে।
” যে একটা জামা কিনে দিতে পারে না, সে আবার আরেক জনকে ছ্যাঁ’চড়া বলতে আসছে ।ভাব দেখলে বাঁচি না !”
রুমের বাইরে থেকে ইঁদুরের মতো মাথা বের করে কথাটা বলে একটা মুখ ভেংচি কেঁ’টে দৌঁড়ে চলে গেলো আহি।
তূর্য বিছানা থেকে উঠে ধেয়ে আসতে আসতে বলল,

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৬

” তোকে তো আমি …”
ততক্ষণে আহি পগারপার।তূর্য পা থামিয়ে আলমারির দিকে গেলো। সেখান থেকে অন্য একটা পাঞ্জাবি পরে নিলো।
একে যত বকাবকিই করুক না কেনো কোনো লাভ নেয়।একটা কথা গায়ে লাগায় না। পৃথিবীতে বে’হায়া আছে কিন্তু আহির মতো বে’হায়া আছে কিনা সেটা নিয়ে স’ন্দেহ আছে তার।তার রুমে আশা,বিভিন্ন জিনিস ধরা ,এলোমেলো করে রাখা ,এসব বিষয় নিয়ে ছোট বেলায় কম মা’রেনি সে ।আর এখন না মা’রলেও সবসময় ধ’মকের উপরে রাখে।তাতেও মেয়েটার স্বভাব পাল্টে না।
কোনো সময়ই একটু ভালো ব্যবহার করে না।তাহলে এত সা’হস কোথা থেকে পায় এই মেয়ে? জানা নেয় তার।

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৮